Home গদ্যসমগ্র গল্প নাহার মনিকা / অনুষঙ্গ

নাহার মনিকা / অনুষঙ্গ

প্রকাশঃ February 6, 2017

নাহার মনিকা / অনুষঙ্গ
0
1

[সম্পাদকীয় নোট : অসম্ভব সুন্দর এই গল্পটি। তীরন্দাজে প্রকাশের জন্য তীরন্দাজ পত্রিকাটি শুরুর দিকে প্রতিভাবান কথাসাহিত্যিক কবি নাহার মনিকার কাছে ছোটগল্প চেয়েছিলাম আমরা। তিনি কানাডা থেকে অল্প সময়ের মধ্যে কানাডার পটভূমিতে লেখা এই গল্পটি পাঠিয়েছিলেন। ‘ডায়াসপোরা’ সাহিত্যের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে গল্পটি। ‘আখ্যানের শিলালিপি : গল্পের ফলকে নারীমুখ’ সিরিজের তৃতীয় গল্প হিসেবে এটি প্রকাশিত হল। নাহার মনিকাকে ধন্যবাদ, তীরন্দাজকে এইভাবে সহযোগিতা করবার জন্যে।]

আজকে নিয়ে তিনদিন।

কোৎভার্তু মেট্রোর সামনে থেকে তার বাসায় ফেরার যে বাস ছাড়ে সেটা দু’ব্লক এগিয়ে গিয়ে ধরে শম্পা, যেখানে বাসস্ট্যান্ড শুনশান।

যে সময়টায় সে আসে, রোদের নীচে ছায়া খর্বকায় থাকে, ফিরে যেতে যেতেও ছায়ার খুব একটা তারতম্য হয় না। কিন্তু আজকে নিয়ে তৃতীয় দিনের মতো কাঁচঘেরা বাসশেডের বাইরের রোদের একফালি তেরছা হয়ে পায়ে পড়ছে। পা গুটিয়ে আনে শম্পা, যেন রোদটা খপ করে ধরে ফেলতে পারে।

বাসস্ট্যান্ডে আর কোন জনমনিষ্যি নেই। কিন্তু তার একা লাগছে না। লোকটা চলে গেল। কোন একটা পাতার ঘ্রাণ ভেসে এলো বাতাসে। বসে থেকে রাস্তায় হুশ হাশ গাড়ির চলে যাওয়া দেখতে ভালো লাগছে।

  • আপনাকে কার মত দেখায় জানেন?

পকেট থেকে ফোন বের হয়,  সার্চ চলে, তারপর একটা মেয়ের ছবি। চোখের পাপড়ি উপচে সারল্য, কিন্তু দৃঢ় চেহারা।  যাহ, লজ্জা পেয়ে হাসে শম্পা, এই মেয়ের সঙ্গে তার কোন মিল নেই! কে সে?

গোলশিফতে ফারাহানী। ইরানের মেয়ে, গান গায়, অভিনয় করে। ফরাসি ভাষায়ও কাজ করে।

নাহ, শম্পা বাংলা, হিন্দি আর কদাচিৎ ইংরেজির বাইরে সিনেমা দেখেনি। তবে ওই একটা ফটো যেখানে চুল চুড়ো করে বাঁধা, হাসির ভারে চিবুক নীচু হয়ে এসেছে, সেরকম একটা ফটোগ্রাফ তারও আছে, এরকম দেখতে। বিয়ের আগে তোলা, চিনিকলে তাদের বাংলোর বাগানে। কী দারুণ একতলা বাড়ি ছিল সেটা।

-‘চোখ বন্ধ করেন তো প্লিজ!’ অনুগত ভক্তের মতো সে চোখের দুই পাতা একত্র করে শম্পা। একটা সুর মৃদু ভঙ্গীতে বাস শেডের ভেতরে এসে দাঁড়ায়। বন্ধ চোখের সামনে সুরটা দুলে ওঠে, সামান্য। কোমরে ভাঁজ তোলার মতো। সুরটা তারপর এঁকেবেকে যায়, আর তার মনে হয় কোন ঘোর লাগা প্রেমিকা মরুভূমি আর মরুদ্যানের মধ্যবর্তী রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছে। সে নিজে কি?

সুরটা এবার উত্তুঙ্গ হচ্ছে। কীরকম সুর এটা? কীরকম? আর গানের কথাগুলি কিছুই বুঝছে না। কিন্তু গানটা যেন সবল দুটো হাত। তাকে জড়িয়ে ধরছে। প্রথমে গালে আঙুল ছুঁয়ে, কাঁধ, বাহুমূল, কোমর। নিস্তেজ লাগে। নিজেকে বাজার-সদাই বোঝাই ব্যাগ মনে হয় শম্পার। ভারি, তবু টেনে টেনে পাতাল রেলের সিঁড়ির গোড়ায় এনে ফেলতে হবে, এমন।

এসবকি এই বাসশেডের উল্টো দিকের রাস্তায় দুটো ব্লক হেঁটে গেলে ছোট্ট যে ফ্রেঞ্চ ক্যাফেটা আছে তার ভেতর মাত্র মিনিট ত্রিশেক আগে ঘটেছিল!

এ রাস্তায় বাস ঘন ঘন আসে। ড্রাইভার একজন যাত্রী বসে থাকতে দেখে গতি কমায়। কখনো থামে। শম্পা গা করে না।

 

এপার্টমেন্টের রান্নাঘরে আজকাল হাড়ি সসপ্যান সামলাতে গিয়ে প্রায়ই এটা ওটার সঙ্গে ঠোক্কর লাগলে অভিযোগের গলা উপচে আসে। একটা বিশাল রান্নাঘর, বড় সড় দুটো ফ্রিজ, ফ্রিজার। এত এত রান্না করতে গেলে এটা কি খুব বেশি চায় শম্পা?

ফারুক অন্যমনস্ক হু হ্যাঁ করে। দেখা যাক। নিজেরই এখনো একটা পাকাপাকি চাকরি জুটলো না। বউয়ের ক্যাটারিংয়ের তো মাত্র অর্ডার বাড়ছে। আর এটা কোনো ব্যবসা? আজকে আছে, কালকে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হলে মানুষ নিজেরাই চাল-ডাল ফুটিয়ে খাওয়া শুরু করবে। হ্যাঁ, রিসেশন এসব দেশেও হয়। সেসব বোঝার ঘিলু কি আছে তার বউয়ের! সে সময় কেউ তৈরি খাবার কিনবে? তখন? ফারুকের  প্রশ্নের মুখে অনেক কথা থাকলেও শম্পা চুপ করে যায়। আর হয়তো সত্যি সত্যিই সে বুঝবে না, রিসেশনের মাজেজা কি!  অথচ দূর-দূরান্ত থেকেও অর্ডার আসে তার।

দূর বলতে শহরের অন্য প্রান্ত, আধঘণ্টা, একঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে খাবার নিতে আসে কেউ কেউ। জন্মদিন, ঘরোয়া পার্টি এসবের জন্য বড় অর্ডার ফারুক পৌঁছে দিয়ে আসে।

ভাগ্য ভালো যে তাদের ফ্ল্যাট একদম লিফটের মুখে মুখেই। খুচরা আর পাইকারি বাজার শেষ করে ফিরলে প্রায় বিশ বাইশটা ভারি পলিথিনের ব্যাগ হয়। মিথিলা এগিয়ে গিয়ে লিফটের বোতাম টিপে দরজা আটকে রাখে, তারা স্বামী-স্ত্রী দফায় দফায় ব্যাগ বয়ে নিয়ে ঘরের মেঝেতে ফেলে। তেমন গায়ে লাগে না। শীত-গ্রীষ্ম প্রতি শনিবার, গত তিন বছরে তাদের সাপ্তাহিক রুটিনের রদবদল হয়নি। তবে সওদার পরিমাণ বেড়েছে, কারণ শম্পার রান্না করা খাবার মানুষ কেনে।

বাসায় ঢুকে ব্যাগগুলি ডাইনিং টেবিলের ওপরে নিচে কোনমতে রেখে ফারুক ধপাস করে হাত পা ছড়িয়ে সোফায় বসে যায়। মিথিলাও তার কোঁকড়া চুল আর কাঁধ নাচিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে যায়, কানে উঠে পড়ে তার আইপডের বোতাম, আবার বেশ ক’বার না ডাকা পর্যন্ত দুনিয়া বিচ্ছিন্ন থাকবে সে। রাগ, চেচামেচি করে দেখেছে শম্পা, সেই এক জবাব- সে পড়াশোনা করছে। চৌদ্দ বছরের মেয়েকে ঘাটাতে ভয় হয়, এ বয়সের ছেলেমেয়ে নিয়ে যা-সব গল্প শোনা যায় এখানকার কমিউনিটিতে! পুলিশ ডেকে বাবা-মা’র বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে এমনও। মা গো, ভাবলে গা কাঁপে। মেয়েও কিন্তু কথায় কথায় ঝাঁঝ দেখায় আজকাল। আর হ্যাঁ, তার মুখ বইয়ে, নয়তো আইপ্যাডে থাকে তো!

দুটো গ্লাসে পানি ভরে একটা স্বামীর দিকে এগিয়ে দিয়ে নিজে পিঠ সোজা আড়মোড়া ভেঙে বসে তার লম্বা চুল বাঁধে শম্পা। একটা গামছা কপাল বরাবর পেচিয়ে চুলসমেত খোপা করে এক টুকরো লেবু ত্বকে ঘষতে ঘষতে এ সপ্তার মেন্যু দেখে দেখে একহাতে মাছ মাংস আলাদা আলাদা প্লাস্টিকের গামলায় ভিজিয়ে রাখে। মোটামুটি কুড়ি-বাইশ পদের খানাখাদ্য তার মেন্যুতে। অর্ডার না থাকলে ফারুক ছুটির দিনে রান্নাবান্না পছন্দ করে না, সে তাই কিছু কিছু কোটা বাছা, মশলা মিশিয়ে রাখার কাজ এগিয়ে রাখে শুধু। তার হ্যান্ড গ্রাইন্ডারটা নষ্ট হয়ে গেছে, সুতরাং শিল পাটা নামাও। এই এক জিনিষ কতবার যে কিনলো! আসলে কফিবীন গুঁড়ো করতে যার জন্ম তাকে কি ঢেকি’র কাজ দিলে চলে! ধনেপাতা, আদা রসুন, জায়ফল কি-ই না গুঁড়ো করতে যায় সে!

সোম থেকে শুক্র তার স্বামী-কন্যা সকালে বেরিয়ে গেলে তার দক্ষযজ্ঞ শুরু হয়। সারাদিন বিরামহীন একের পর একপদ রান্না করে ট্যাপার ওয়ারের কন্টেইনারে ভরে ওপরে মাস্কিং টেপ লাগিয়ে নাম আর দাম লিখে রাখে। ঠাণ্ডা হলে ফ্রিজে। কখনো কখনো ফ্রিজে জায়গা থাকে না, তখন বসার ঘরে ফ্যানের তলায়। শীতকালে সুবিধে আছে, তাদের ব্যালকনি তখন আরেকটা খোলা ফ্রিজ। খুচরো অর্ডারের রান্নাগুলো দিব্যি জমে বরফ হয়ে থাকে।

নিয়ম হচ্ছে অন্তত আগেরদিন খাবার অর্ডার করতে হবে। তবু লোকে কিছু আইটেম  তৎক্ষণাৎ চায়। কাচকি মাছের চচ্চড়ি চাইলে শম্পা তখন দরকারি কণ্ঠে বলে,- ‘একটু সময় লাগবে ভাই। দুই আড়াই ঘণ্টা পরে আসতে পারবেন? মাছের বরফ গলানো, ধোয়া বাছা, তারপর রান্না বোঝেনই তো, আমি সবসময় ফ্রেশ দেই।’

কাচকি মাছের চচ্চড়ি গত সপ্তাহের রান্না আছে। ভালোমতো এয়ারটাইট কনটেইনারে ঢেকে ফ্রিজে রাখলে, পরে বের করে চুলায় কড়াই চাপিয়ে অল্প আঁচে গরম করলে একদম তরতাজা রান্না বলে চালিয়ে দেয়া যায়। প্রথম প্রথম সে রান্না করেই দিতো, নাভিশ্বাসও উঠতো তার। তারপর ঠেকে ঠেকে সময় বাঁচাতে শিখেছে। আর তার কাস্টমার মূলত ছাত্র, সিঙ্গেল নারী-পুরুষ অথবা ইমিগ্রেশন না হওয়া হতাশ ফ্যাক্টরি ওয়ার্কার, তা নইলে ব্যস্ত চাকরিজীবি স্বামী-স্ত্রী যাদের ছোট বাচ্চা আছে, রান্নার সময় নেই। খানাখাদ্য নিয়ে অনুসন্ধিৎসু প্রতিবেদন করার সময় কোথায়?

-‘থাকতো আম্মা, তাইলে বুঝতা। একদম বাই বর্ন ফুড টেস্টার।’ – তার স্বামী যখন গলায় হাসির সর মেখে বলে, শম্পা তখন মনে মনে রাগে গজরায়- হুহ, টে্স্টার। ইলিশের শাদা পাতুড়িতে আদাবাটা দেয়াতে একঘর নিমন্ত্রিতদের সামনে তার শাশুড়ি ফারুকের মতো এরকম হাসির সর গলায় মেখে কথা শুনিয়েছিল! শম্পার মা নেই, বাবুর্চির রান্না খেয়ে মানুষ ইত্যাদি। অথচ তাদের শাজাহান বাবুর্চির রান্না এই পদটা আব্বু কত শখ করে খেতো!আব্বুর জন্য বিচিত্রসব রান্না করতো শাজাহান চাচা। জেনারেল ম্যানেজার বলে কথা, তায় বিপত্নীক। তাদের দু’ভাইবোনের জন্য সব মজার মজার খাবার। কাবাব বিরিয়ানি, আর আব্বুর জন্য শাক, শুটকি, মোচার বড়া, ছোটমাছের চচ্চড়ি আরো কত কী!

আর টেবিল সাজিয়েও দিতে জানতো। সালাদের প্লেটভর্তি শশা পেঁয়াজের নকশায় আকৃষ্ট হয়ে শম্পার সব্জি বিতৃষ্ণ ভাই শুভও আগ্রহভরে খেতো।

সন্ধ্যার ঘনায়মান অন্ধকারের আগে, আব্বু আসরের নামাজ পড়ে বারান্দায় বসে চা আর খাস্তা নিমকি খেতো। শাজাহান চাচা ট্রে হাতে করে বাগানে বেড়ানো শম্পার মুখোমুখি পড়ে যেতো। – ‘এত রান্না করতে পারেন চাচা আপনি! এ অনুযোগের উত্তরে হাসতো শাজাহান চাচা।

-‘মা গো, রান্ধাবাড়া হইল আমার কাছে ইবাদত। দিলে যা চায় তাই করো, আর তা যদি মানুষের উপকারে আসে, এর চাইয়া বড় ইবাদত কি হয়?’

চিনিকলের জেনারেল ম্যানেজার তো ক্ষমতাবান, তাকে তো শাজাহান চাচা খুশি করবেই, কিন্তু শম্পা আর শুভর আব্বুর পাতে কী পড়লে তার অবয়ব জুড়ে তৃপ্তির চিহ্ন দেখা যাবে তাই নিয়ে শলা পরামর্শ করতে করতে শাজাহান চাচার চুলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে শম্পাও কত রকম রান্না শিখে গেল! শিখে গেল- একজন ভালো বাবুর্চিকে কিভাবে পরিচ্ছন্ন রাখতে হয় রান্নাঘর, তৈজসপত্র আর নিজেকেও।

নিজের কাজের ভেতর এখন শম্পা কোথায় যেন সারাক্ষণ শাজাহান চাচাকে দেখতে

পায়। কাঁধে পরিস্কার গামছা নিয়ে জলচৌকিতে বসে বটিতে মাছের মুড়ো কাটছে,

কিংবা টিফিন ক্যারিয়ারের বাটি খুলে ছড়াচ্ছে পুডিংয়ের দুধ মাখন সুঘ্রাণ।

এখন যে লোকে শম্পার রান্নাবান্না পয়সা দিয়ে কিনে খায় আর কত স্তুতি করে, তার

প্রায় সবই শাজাহান চাচার কাছ থেকে শেখা রেসিপি। শম্পা একটু আধটু

এদিক সেদিক করে মাত্র। আর নিজেকে বিস্মিত করে দিয়ে দেখতে পায়, কানাডা

আসার পর তাদের তিন বৎসর হয়ে গেলো, ক্লান্তিবিহীন রেঁধে যাচ্ছে শম্পা, ঠিক

শাজাহান চাচার মতো।

 

শনি-রোববার শম্পা একটু রূপচর্চার চেষ্টা করে। একটা শর্ট কোর্স করেছিল লালমাটিয়ায় – এসথেটিক্স অ্যান্ড ফেসিয়াল কেয়ার।  কানাডা আসার আগে শম্পাই প্রসঙ্গ তুলেছিল। দেশে চাকরি-বাকরি  করতে পারেনি, কিন্তু বিদেশে গিয়ে সে বসে থাকতে চায় না, কাজকর্ম একটা কিছু তো করতেই হবে।

ফারুকের খালাতো বোনের মেয়ে সিমি তখন ছুটিতে দেশে বেড়াতে গেছে, টরন্টোতে এনজিওর চাকরি তার। নতুন আসা ইমিগ্রান্টদেরকে সেটেল হতে সহায়তা ইত্যাদি করে। একটু মোটাধাচের গড়ন, বড় চোখের শ্যামলা মেয়েটা শম্পাকে ভালো সব তথ্য দিয়েছিল। তার বিএ ডিগ্রিকে কানাডার সমকক্ষ করলে ভদ্রগোছের চাকরি জুটতে পারে যদি সে তার ইংরেজিতে যথেষ্ঠ ভালো করতে পারে। সেক্ষেত্রে বৃটিশ কাউন্সিল বা এজাতীয় প্রতিষ্ঠান থেকে কোর্স করে নিতে পারে যাওয়ার আগেই। ওখানে গিয়েও শেখা যায়, তবে তাতে সময় নষ্ট হবে। ইংরেজি আগে থেকে জানলে সে সেক্রেটারিয়াল, ডেন্টাল এসিস্ট্যান্ট, একাউন্ট্যান্ট ক্লার্ক এসবের কোর্স করে এডমিনিস্ট্রেটিভ চাকরিগুলোতে দরখাস্ত করতে পারে।

মেয়েটার কথাবার্তা শুনে মনে হয় ও বুঝি কেরিয়ার কাউন্সিলর।

হাসে সিমি- ‘হ্যা, মামী আমি ওই চাকরিও করেছি’।

যদি শম্পা ঘরে বসে আয় করতে চায়, তাহলে বেবী সিটিং করতে পারে। এটার বিশেষ ঝামেলা নেই, একটা শর্টকোর্স করে নিতে হয় শিশুদের সেফটি, সিকিউরিটি, ফার্স্ট এইড আর খাবার দাবার বিষয়ে। তারপর বাসা আর নিজের অবস্থা অনুযায়ী বাচ্চাদের রাখা যায়।

ফারুক নাক কুচকায়। অন্যের বাচ্চা ধোয়ানো মোছানো পছন্দ না তার। এমনিতেই একটু শুচিবায়ু আছে লোকটার, শম্পা জানে। খাবার-দাবারে চুল-টুল পেলে তুলকালাম করে।

আর পারা যায় রান্না করে কেটারিং, ফ্রোজেন এন্ড ইন্সট্যান্ট ফুড বিক্রি। অথবা হেয়ার কাটিং অ্যান্ড ফেসিয়াল এস্থেটিক্স। এগুলোরও চাহিদা আছে। কানাডার শহরগুলোতে বাঙালি বাড়ছে। কমিউনিটির কাগজে বিজ্ঞাপন দিলে মানুষ জানতে জানতে পসার জমে। ঘরে বসেও করা সম্ভব।

শেষের আইডিয়া দুটো পছন্দ হয় ফারুকের।

-‘শোন, আমি অন্যদের মতো না। সারাদিন খাটাখাটনির পরে বাসায় ফিরে বৌ- বাচ্চা না দেখলে আমার ভালো লাগে না। তুমি ওখানেও বিকালবেলা আমার জন্য চা নিয়ে অপেক্ষা করবে’, রাতে বিছানায় কণ্ঠস্বর ঘন হয়ে আসে ফারুকের। তার বেডসাইড স্টিরিওতে মৃদু ভল্যুমে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজে। শম্পার মাথা একহাতে টেনে নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে রাখে সে। বাইরে মধ্যরাতের ঢাকার জীবনতরঙ্গ ভেসে ভেসে আসে।

-‘আর একটা জিনিস করবেন মামী’, সিমি মেয়েটা সিরিয়াস, বেশি হাসে না। তবে কথা বলে খুব আন্তরিকভাবে। যেন শম্পাকে অনেকদিন থেকে চেনে। -‘পারলে অবশ্যই ড্রাইভিং শিখে যাবেন।’

-‘সংসারে একটা গাড়ি, আর একজন ড্রাইভারের বেশি কি দরকার?’ বাসায় ফিরে প্রস্তাবটা নাকচ করে দেয় ফারুক।

-‘দূর! সিমি বললেই হলো নাকি? আমি তোমার পাশে মেমসাহেবের মতো বসতে চাই। তুমি গাড়ি চালাবে আর আমি লাইটার দিয়ে তোমার সিগারেট জ্বালাবো, বুঝছো মশাই!’ ক্যানাডায় ইমিগ্রেশন হয়ে যাওয়ার সুখে তখন তারা দু’জনেই উদ্বেল।

তবুও, মুখে মুখে ফারুকের সঙ্গে তাল দিলেও এস্থেটিক কোর্সে যাওয়া-আসার পথে ড্রাইভিং ট্রেনিং সেণ্টার চোখে পড়লে সাইনবোর্ডটা মনযোগ দিয়ে পড়েছে শম্পা। ইচ্ছে করেছে, নেমে খোঁজ খবর করে শিখে নেয় ড্রাইভিং। কিন্তু ফারুকের কাছে বিষয়টা উত্থাপনের সাহস পায়নি।

সমস্যা টের পাচ্ছে এখন।

কাস্টমারদের মধ্যে যাদের গাড়ি আছে, বা সময় বের করতে পারে তারা নিজেরাই খাবার নিতে আসে। ঝামেলা হয় গাড়িবিহীন লোকজনদের নিয়ে। ফারুক ফেরে বিকেলে। ক্লান্ত শরীরে অর্ডার নিয়ে আবার বাইরে যেতে গাইগুই করে। তাছাড়া গ্যাস খরচাও আছে। মুখে কথা আটকায় না ফারুকের। ঘন ঘনই বলে ফেলে -‘তোমার দুই পয়সার খাওয়া পৌঁছায়া আসতে যাইতে আমার দশ ডলারের তেল গেল।’ গ্যাস পেট্রোলের দাম না কি বেড়ে গেছে।

শম্পা বলতে গিয়েও বলে না যে তার এই দুই পয়সা দিয়েই কিন্তু সংসার চলে আজকাল। বাড়ি ভাড়া ছাড়া আর কিছুর জন্য তো ফারুককে পকেটে হাত দিতে হয় না। লোকটা যেন কেমন হয়ে গেল বিদেশ এসে। শম্পার প্রায়ই মনে হয় তার সামনে যে ফারুক বসে আছে সে অন্য কেউ। চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়েও তার মনে হয়- এ অন্যজন। আসল ফারুক যে-কোনো সময় এসে হাজির হবে। শম্পা যাকে ফারুক ফারুক বলে ডাকছে, আর যে সাড়া দিচ্ছে, সে এ নয়, অন্য কেউ, অন্য কোথাও থাকে। বিয়ের সময় যার নম্র স্বভাব দেখে সে মুগ্ধ হয়েছিল, আর আব্বুর স্বস্তির নিশ্বাস ছিল যে ফারুকের ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি, বংশগরিমা ইত্যাদিতে, এ সেই ফারুক না। ইউনিভার্সিটি ভর্তি হতে না হতেই আর পড়ার তোয়াক্কা না করে বিয়ে হয়ে গেল। প্রাইভেটে বি এ পরীক্ষা দিল শম্পা। লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া চিনিকলের চাকুরিবিহীন জেনারেল ম্যানেজার ঝটপট মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলেন। আব্বুর কথার অবাধ্য হয়নি বলে দীর্ঘদিন মনের মধ্যে ভালোলাগা অনুভব করেছে শম্পা।

মিথিলাকে দিয়ে মন্ট্রিয়াল শহরে ড্রাইভিং শেখার নিয়মগুলো খোঁজায়। মিথিলা বলেছে- দু’দফায় থিয়োরি আর প্র্যাক্টিকাল পরীক্ষা পাশ করে এক বৎসরকাল একজন লাইসেন্সধারী চালকের পাশে বসে গাড়ি চালাতে হবে, তারপর সে একা গাড়ি চালানোর অনুমতি পাবে।

সুতরাং অন্যভাবে কথা পাড়ে শম্পা। ফারুক আবারো ভ্রু কুঁচকায়।

-‘তুমি যাবা’?

-‘তাহলে মিথিলা যাক। মেট্রা স্টেশনে অনেকেই আসতে চায়। তোমার ওপর চাপ কমবে, আর ও বড় হয়েছে না এখন, একটু হেল্প তো করতেই পারে!’

– ‘মাথা খারাপ তোমার? খবরদার, এইসব রান্নাবাড়া বাবুর্চির কাজে ফারুকের মেয়েকে লাগাবে না।’

শম্পার মুখে নেমে-আসা পাতলা ছায়ার রেশ টের পেয়ে দ্রুত স্বর বদলায় ফারুক- ‘আরে, আমাদের মেয়ে এখানে ডাক্তার বা সায়েন্টিস্ট হবে। ওর পড়াশুনা আছে না? ওর জন্যই তো আমাদের বিদেশে আসা।’

শেষমেষ সাব্যস্ত হয় শম্পাই যাবে। অন্তত দিনে একটা ট্রিপ সে পার্ক এক্সটেনশন বা কোৎভার্তু মেট্রোতে পৌঁছে দেবে। একসঙ্গে কয়েকজনকে খাবার নিতে আসতে সময় দিতে পারে। ফারুক চোখ নামিয়ে গলা খাটো করে বলে- ‘একটু পর্দা করে যাইও শম্পি, শত হইলেও এখন মানুষ আমাদেরকে নামে চেনে।’

-‘হ্যা, শম্পা ভাবীর ডালপুরি আর মাটনকারি চেনে’- ­শম্পা ঠাট্টা করে হাসে।

ওড়না পেচিয়ে ঘোমটা দেয়া শুরু করে সে।

 

সেদিন তিনজনের অর্ডার ছিল। শম্পা ট্রলিব্যাগটা টেনে মেট্রোর পাতাল থেকে ওপরে উঠে এক্সিটের কাছে একটা বেঞ্চিতে বসেছিল। তার কাস্টমারদের দু’জন পূর্বপরিচিত, ছাত্র। খাবারের কন্টেইনার বুঝে নিয়ে টাকা দিয়ে তড়িঘড়ি চলে গিয়েছিল।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করার সময় শম্পারও তো নেই। রান্নাঘরে রাজ্যের কাজ! শামিকাবাবের জন্য মাংসের ফ্রোজেন কিমা সিংকের ওপর রেখে সে বেরিয়েছে।

সাবওয়ে স্টেশনও হঠাৎ কেমন শুনশান হয়ে ওঠে। একটু ছটফট করে ফোন বের করে সে। তৃতীয় কাস্টমারকে একটা ফোন দিতে হবে। ফোনের রিং বাজিয়ে একটা ক্রাচের খটখট শব্দ এগিয়ে আসে তার দিকে।

এগিয়ে এসে লোকটা বিনীত হাসে- ‘সরি দেরী করে ফেললাম, আপনার ফোন বাজছিল দেখলাম, ইচ্ছে করে ধরিনি তা কিন্তু না।’

শম্পা একটু থতমত খেয়ে যায়। লোকটা যখন কথা বলে উঠলো, তার ঘরে দেশ থেকে আনা বড় শঙ্খ দুটির কথা ধা করে মনে পড়লো কেন? বিয়ের পর কক্সবাজারের প্রবালদ্বীপে বেড়াতে গিয়ে এনেছিল। এখনো কোনো মনখারাপের দুপুরে, চুলায় উথলে আসা দুধের বলক দেখতে দেখতে শঙ্খ দুটোকে দু’কানে চেপে দাঁড়িয়ে থাকে সে। শোঁ শোঁ সমুদ্রের হাওয়া এসে তাকে মুহূর্তের জন্য ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ঘন গাছের ছায়ার মতো গাত্রবর্ণ আর শম্পার শরীর বিহ্বল করা দৃষ্টির সঙ্গে লোকটার কণ্ঠস্বর বড় বড় সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো, ভাসিয়ে নিচ্ছে।

অপ্রস্তুত হয়ে যায় সে নিজের কথা ভেবেও। ইশ, আরেকটু ভদ্রস্থ হয়ে আসতে পারতো না সে? নিদেনপক্ষে মাথায় এমন ওড়না না পেঁচিয়ে! পাতালে রেলের কালো গ্রানাইটের মেঝেকে তো আর দু-ভাগ হওয়ার কথা বলা চলে না। তবু মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে সে।

তিনপদের তরকারি আর সঙ্গে ভুনা খিচুরির অর্ডারও আছে।

-‘দেখতেই পাচ্ছেন রান্না করা আমার জন্য কত ঝামেলা’, ক্রাচের দিকে ডানহাতের তর্জনী নেমে আসে।

হাতে টাকা নিয়ে অপসৃয়মান খটখট শব্দের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ স্থাণু হয়ে বসে থাকে শম্পা।

কত কী প্রশ্ন করতে মন চাইছে। কিন্তু নিজের নামও বললো না। আজকে তিনজনের অর্ডার আর ফোন নাম্বার কাগজে লিখে এনেছে। কী আশ্চর্য, শম্পা যখন মেয়ের জন্য পিজ্জা অর্ডার করে, ডেলিভারির লোকটা কি এসে তার নামধাম পরিচয় দেয়, নাকি তারা জানতে চায়? তবুও কেন জানি সামান্য সময়ের জন্য নিজেকে চলচ্ছক্তিহীন মনে হয়।

সকাল এগারোটার সাবওয়ে স্টেশনে ভীড় কম। ট্রেনের সীটে বসে ব্যাগ থেকে লিস্ট বের করে নাম দেখে শম্পা। তার ছোট্ট খাতার এই পাতায় বেজায় কাটাকুটি, খাবারের আইটেম, পরিমান, দাম ইত্যাদিসহ অন্যান্য কাস্টমারদের নামের ভীড়ে কোনো নাম এই লোকটির সঙ্গে জুড়ে দেয়া যায়? কেন কোনো নাম জ্বলজ্বল করছে না!

বিকেলে ফারুক ফেরার আগপর্যন্ত অন্যমনস্ক রান্নাবান্না করে চলে। মিথিলার জন্য কম মশলার আলাদা রান্না সেরে রাখে। ফারুকও আজকাল অর্ডারের বারোয়ারী রান্না খেতে গেলে নানা টিপ্পনী কাটে। শম্পা তাই সবকিছুর মধ্যেও অন্যরকম কিছু, শাজাহান চাচার কাছ থেকে শেখা আরো ঘরোয়া রসনাবিলাসী পদ বানাতে চেষ্টা করে- কলাপাতায় চিংড়ি নারকেল কোরা দিয়ে তাওয়ায় ভাপায়, কইমাছ শর্ষেবাটায় মাখিয়ে লাউপাতা জড়িয়ে ভাজে।

চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ফারুক যখন ক্রিকেট খেলা দেখতে শুরু করে শম্পা তখন উৎসাহ নিয়ে পাশে এসে বসে। খেলা দেখতে বসলে ফারুক দুনিয়ার সবচে ব্যস্ত মানুষ, ওর ফর্সা কপালে ভাঁজ পড়ে। এই লোকটার অর্ডার ফারুক নিশ্চয়ই ফোনে নিয়েছিল। তাকে দেখার ঘটনা শম্পা বলবে ভেবে ফারুকের পাশে এসে বসলেও শামুকের মত গুটিয়ে আসা অস্বস্তি তাকে থামিয়ে দেয়।

আবার ফোন আসে দিনপাঁচেক পরে। ফোনে তার কন্ঠ সাবওয়ের খোলা হাওয়ার দঙ্গলে শোনা কন্ঠস্বরের চেয়ে ভারী। কক্সবাজারে হানিমুনের সময়, শম্পার মনে আছে গরমে সমুদ্রের ঈষদষ্ণু পানি, বাতাসেও হলকা। তবু বিকেল বেলায় হাওয়ার তোড়ে শিরশির করে মৃদু কাঁপতো তার শরীর। আজকে নিজের ঘরের মধ্যে বসে তেমন বোধ হচ্ছে। একহাতে ভাজা মাছের খুন্তি কাৎ করে কলম আর রাইটিং প্যাড টেনে নেয় সে।

লোকটা বলে- ‘না, আজকে খাবার নিতে ফোন করিনি। ঐদিনের খাবারের জন্য থ্যাঙ্কস দিতে চাই। এত ভালো রান্না! আচ্ছা, আপনি কি সারাদিন রাঁধেন?’

কি বলে লোকটা! ঠোঁটে কোন কথার যোগাড় থাকে না শম্পার। দু’রকমের প্রতিক্রিয়া চিন্তা করতে পারে সে। প্রথমত, কত লোককেই তো সে খাবার ডেলিভারি দেয়। হয় সে, নয় ফারুক। কার এত সময় আর দায় তাকে ফোন করে ধন্যবাদ জানায়। দ্বিতীয়ত, লোকটা ক্রাচ নিয়ে চলাফেরা করে, চলচ্ছশক্তি স্বাভাবিক না আর নিশ্চয়ই একা থাকে, তার কথা বলার কেউ নেই। এই ধরনের প্রাপ্তবয়স্কের জন্য কতটা প্রশ্রয় থাকা তার পক্ষে সমীচিন, স্বাভাবিক। হ্যা, সমীচীন আর স্বাভাবিক এই দুই শব্দ তার মাথায় পাক খায়।

নিজেকে আশ্চর্য করে শম্পা নিজের টেনে টেনে গলায় যথেষ্ট আবেগ জড়ানো কথা শুনতে পায়- ‘হ্যা, সারাদিন রাঁধি। আমার আর কী কাজ রান্নাবান্না ছাড়া?’

-‘রাঁধতে রাঁধতে কি ভাবেন?’ – এই লোক কি আবৃত্তিশিল্পী? মন্ট্রিয়ালে ইদানিং কত লোক, কত অনুষ্ঠানাদি হয়। প্রথম বছর বাঙালিদের মেলা ইত্যাদিতে খাবারের স্টল দিতো শম্পা, ফারুক তাকে স্টলে বসিয়ে খাবার আনা-নেওয়া করতো। ইদানিং ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় আর স্টল দেয় না।

-‘নাহ, কই তেমন কিছু ভাবি নাতো!’ এইবার শম্পা একটু নরম হাসে। আহারে মানুষটার পা ভাঙা।

-‘গান শোনেন না রাঁধতে রাঁধতে?’

-‘গান!’

-‘হ্যা, আপনাকে দেখে কেন যেন মনে হলো আপনার রান্নাঘরের এক কোনায় সিডি প্লেয়ারে গান বাজে। একেকদিন একেক গান, রাঁধতে রাঁধতে রাত গভীর হলে দরবারি কানাড়ায় – ‘আজ ঘুম নহে নিশি জাগরণ, আরেকদিন ‘আমার প্রাণের মাঝে সুধা আছে চাও কি? অন্যদিন পুরানো হিন্দি সিনেমার গান- ‘আপকো হামারি কসম লওট আয়েঙ্গে…’

-‘আমাকে দেখে এইসব মনে হলো আপনার?’- এইবার শম্পা হতবুদ্ধি।

রান্নাঘরের একজস্ট ফ্যানটা ফোন বাজলে বন্ধ করে দিতে হয়, তা নইলে মনে হয় সে কোন ফ্যাক্টরিতে আছে। অতিরিক্ত শো শো শব্দে সারাদিন রান্না করে দিনশেষে মাথা ধরে, ফারুককে সে বলেছেও, বিল্ডিং এর মিস্ত্রি ডেকে যদি ঠিক করা যায়। ও গা করে না। এমন না যে ফারুক আগে কিছু বেশি করিৎকর্মা ছিল, মিনারা কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে করে ফেলতো। ও এমনই, এসব পারে না। এভাবে ভাবে শম্পা। এভাবে ভাবলে অনেক ল্যাঠা চুকে যায়।

-‘হ্যা, মনে হলো তো।’

-‘ভাই, আপনি যেদিন খাবার অর্ডার করতে হবে তখন ফোন করবেন,’ এবার যথাসম্ভব ভদ্র হয়ে ওঠে শম্পা।

-‘দেখুন, আপনি রাগ করছেন না, আমি জানি। আমি ফোনটা রেখে দিলে আপনার কান আবার খাড়া হয়ে থাকবে আমি ফোন করি কি না। অথচ আপনি অজুহাত খুঁজে বেড়াচ্ছেন কি করে আমাকে কাটাবেন। আসলে কাটাবেন না, কি করে প্রমাণ করবেন আপনি না, আমিই জোর করে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছি।’

-‘মানে?’

-‘খুব সিম্পল। শম্পা, আমি পা ভেঙে বাসায় পড়ে আছি। এই ব্যস্ত শহরে আমি অনুমান করি যে একমাত্র আপনি একা একা রান্নাঘরে রান্না করছেন। আর রান্না করতে করতে কথা বলা যায়। আমি যখন রাঁধি, আমিও পারি।’

-‘আপনি রান্না করেন? তাহলে খাবার কিনেন কেন?’- শিশুতোষ প্রশ্ন বেরিয়ে আসে শম্পার, যেন লোকটা রান্নাবান্না শুরু করলে তার লোকসান হয়ে যাবে।

-‘আমরা সবাই রান্না করি তারপরও রেস্টুরেন্টে খাই কেন?’ লোকটাও যেন বাচ্চাদের বোঝাচ্ছে।

-‘আচ্ছা, আমি যদি মাঝে মাঝে আপনাকে ফোন করি কিছু মনে করবেন? ব্যস্ত থাকলে আমার ফোন ধরার দরকার নেই, এখানে সবসময় ফোন করলে ভয়েস মেইল, প্রেস ওয়ান ফর ইংলিশ, প্রেস নাইন ফর ফ্রেঞ্চ, হেন সার্ভিস চাইলে ওয়ান, তেন সার্ভিস চাইলে টু। যন্ত্রের কণ্ঠস্বর শুনতে শুনতে রোবটের মত লাগে নিজেকে। আমার মানুষের কন্ঠস্বর শুনতে ইচ্ছে করে। রাগ করবেন ফোন করলে?’

ফোন রেখে দিয়ে তড়িঘড়ি করে কলার আইডি চেক করে শম্পা। প্রাইভেট নাম্বার, নাম নেই!

সেদিন রান্নাশেষে বাথটাবে একটু বেশী সময় নিয়ে পায়ের গোড়ালি ঘষে শম্পা। আহ, হাতের নখের ধার ঘেষে তেল হলুদের আস্তর। এখন থেকে গ্লাভস পরার অভ্যাস করতে হবে। প্যানট্রিতে কবেকার কিনে রাখা প্লাস্টিকের হ্যান্ড-গ্লাভস বের করে আনে। ততক্ষণে ফারুক ফিরে এসেছে, তার হাতে কোল্ড ড্রিংসের ক্রেট, তকতকে রান্নাঘর দেখে খুশী হয়। শম্পা ম্যারিনেটেড ফ্রোজেন বীফ কাবার বের করে বেকিং ট্রে’তে সাজায়।

 

আজকে ভালো করে দেখে শম্পা। ফোল্ড করা জিন্সের পা ছাপিয়ে ব্যান্ডেজ ডান পায়ে। অন্য পায়ে নাইকি’র কেডস। এক-দু’দিনের না কামানো দাড়ি কেমন যেন  বিষন্নতা এঁকে দিয়েছে মুখটায়। বাঁ হাতে একটা স্টিলের বালা। পাতলা হয়ে আসা চুল। বেঞ্চে বসে নীচু হয়ে বসে শম্পার বুঝিয়ে দেয়া খাবারের বাক্স কোলের ওপর রাখা ব্যাগে ভরছে। বয়েস কত লোকটার? কে কে আছে? ঝকঝকে কালো চোখের মনি তুলে হাসলো। মনে হলো তার চারপাশে একঝাক গাংচিল উড়ে গেলো। শম্পা কি ঝাঁপ দেবে গাংচিলের দলে। বেশ উড়ে যাবে দেশ থেকে দেশান্তরে।

-‘শম্পা আপনার আসলে একটা রেস্টুরেন্ট খোলা উচিত। সত্যি! দেখবেন খুব ভালো চলবে। আপনার রান্নার সঙ্গে তো সবাই পরিচিত।’ এইবার ক্রাচে ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

-‘আমি তো শুধু বাবুর্চি, ম্যানেজার হওয়ার লোক নাই যে!’- আজকে শম্পা চুল ঢাকেনি। পোশাক বাছতে সময় লাগিয়েছে, আর তার পছন্দের লিপস্টিক। আর এনেছে মেয়ের আইপড, গান শুনতে ইচ্ছে করছে তার।

-‘ওটা নিয়ে ভাববেন না, ম্যানেজার পেয়ে যাবেন। সিরিয়াসলি, আমি কিন্তু জোর করছি আপনাকে। একটা প্রজেক্ট হাতে নেন। ব্যবসা আপনার চলবেই। এত ভালো রান্না আমার মা-ও কিন্তু পারতো না’।

এবার শম্পার বুকের ভেতরে ছলাৎ করে ঢেউ ওঠে। তার নিজের মায়ের রান্নার স্বাদ নেয়ার ভাগ্য তো তার হয়নি, কেমন থাকে মায়েদের রান্না! তার মা বেঁচে থাকলে কি শাজাহান চাচার চেয়েও ভালো রাঁধতো?

-‘আপনি কফি খাবেন?’ কাছেই টিম হর্টন আছে, কিন্তু আরো দুটো ব্লক হেঁটে গেলে লোকটার নাকি একটা পছন্দের জায়গা আছে। অনেক পুরানো, ফ্রেঞ্চ ক্যাফে। শম্পা রাজি থাকলে সেখানে যাওয়া যেতে পারে।

বুলাঞ্জরি দ্য কোঁয়ে, উনিশ’শো বিয়াল্লিশ এ তৈরি। ক্যাফের সামনে কালো ব্ল্যাক বোর্ডে চক দিয়ে সেদিনের মেনু লেখা। একা তো না অবশ্যই, ফারুকের সঙ্গেও শম্পা কোনদিন এসব দোকানে ঢোকেনি।

দোকানটা প্রায় বেইজমেন্ট-এ। হুইল চেয়ারে বসা লোকজনের জন্য ঢোকার সিঁড়ির একপাশে সিমেন্টের ঢাল তৈরি করা আছে। নীচু কাঠের টেবিল আর বেঞ্চ পাতা। কাঠের টেবিলের ওপর অসংখ্য আঁকিবুকি। ভালো করে খেয়াল করলে বোঝা যায় খদ্দেররা যখন যা ইচ্ছে লিখে রেখেছে।  একটা ক্রাচ টেবিলের কোনায় অল্প ধাক্কা খেয়েছিল, ব্যালান্স ঠিক করার আগেই মুহূর্তের মধ্যে শম্পা ওর ডান বাহু ধরে ফেললো। ক্যাফের সবাই দেখি লোকটাকে চেনে।

ওয়েটার ক্রোয়াসঁ আর কফির অর্ডার নিয়ে চলে গেলে বলে- ‘সারাক্ষণ তো নিজের রান্না খান, এবার এখানে বসে একটু আরাম করে অন্যের সার্ভ করা কিছু খান তো!’

-‘আসলে আমি আপনার মা’র গল্প শুনতে চাচ্ছিলাম।’

-‘বলবো, মা’র গল্প, আরো সবার গল্প বলবো। তার আগে বলেন কবে রেস্টুরেন্ট খুলবেন।’

ক্যাফের চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে আনে, বলে- ‘এই রকম একটা ছোট্ট দিয়ে শুরু করতে পারেন। বাঙালিদের বাইরেও আপনার কাস্টমার আসবে, আমি বলছি, আসবেই। খাবার-দাবার আসলে পরিচিত করানোর বিষয়। ইংল্যান্ডে যেমন ধরেন ইণ্ডিয়ান মানে, বাংলাদেশী খাবারের কত চাহিদা। বারো চৌদ্দ হাজার রেস্টুরেন্ট কি শুধু বাঙালি খেলে টিকে থাকতে পারতো? স্বয়ং রানী খায়, কুইন!’

 

সেদিন বাসায় ফিরে রান্না শেষ করে ঘরদুয়ার পরিস্কার তকতকে করা হলো না শম্পার।  জন্মদিনের পার্টির অর্ডারের কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। একটা ঘোরের মধ্যে সময় কাটিয়ে সারা পথ গান শুনতে শুনতে ফিরেছিল। মাথায় এখনো গান ঘুরছে, লোকটা  ফোন থেকে তার আইপডে গান ডাউনলোড করে দিয়েছে। এই গানটা যে অনেক আগে একদিন সে শিখতে শুরু করেছিল সেটা ভুলেই গিয়েছিল।

যখন তার গলায় গানের সুর বসতে শুরু করেছে, রেওয়াজ করতে ভালো লাগে ঠিক সে সময় বিয়ের কথাবার্তা পাকা হয়ে গেল। তার সুরও গলায় পাকতে পাকতে টুপ করে খসে পড়লো। তখন এত মনযোগ দিয়ে গানের কথা শোনেনি সে। গাইতো, বোঝা না বোঝার মধ্যে মিশে গিয়ে, বোধ আত্মস্থ করতে শেখেনি। অথচ আজকে  ‘বিশাল চোখে মিশায়ে মরু, চাহিলে কেন গো বেদরদি- মিলন হবে কোথায় সে কবে, কাঁদিছে সাগর সহিয়া নদী…’- এই লাইন তাকে গাছের প্রতি সদ্য ছিঁড়ে আনা তাজা ফলের মত আকুল করে তুলছে।

‘কেন আসিলে ভালোবাসিলে দিলে না ধরা জীবনে যদি’- শিল্পী সুর উৎসর্গ করে গায়। আর এই গানকেই কেন এত লাগসই লাগে শম্পা, বুঝে পায় না সে।

লোকটা গান সেইভ করতে করতে বলছিল- ‘বুঝলেন শম্পা, আপনার রান্না, আমার পছন্দের গান আর একবোতল কনিয়াক হলে আমি মনে হয় ওমর খৈয়ামের মত লিখে বলে দেবো যে বেহেস্তে আছি, হা হা হা।’

ব্যাগে গরমমশলা ইত্যাদি কেনার লিস্ট ছিল, ইচ্ছে ছিল খাবার ডেলিভারি হয়ে গেলে সে ড্যানফোর্থে বাঙালি গ্রোসারি হয়ে সেসব কিনে ফিরবে।

কোথায় কি? সে তো মাংসই ডিফ্রস্ট করে যায় নি। গরম পানির ধারায় বরফ গলতে দিয়ে চুলায় কড়াই চাপিয়ে বেরেস্তা ভাজে শম্পা। তার চোখে ক্যাফেটা ভেসে ওঠে। সে নিজের ঐ রকম একটা দোকান দিয়ে মাথায় টুপি, হাতে দস্তানা পরে রান্না করছে। বাবুর্চি থেকে সার্ভিসের সবাইকে বাঙালি পোশাক পরিয়ে দিলে কেমন হয়? একা একা হেসে ফেলে সে। কিন্তু পারা যায় তো। বিমানবালারা শাড়ি পরে কাজ করে না?

আজকে জন্মদিনের পার্টির এই খাবার ডেলিভারি দিতে যাওয়ার কথা সন্ধ্যা ছ’টায়। না হোক ঘণ্টাখানেক দেরি হবে আজকে। ফারুক চটবে? হাত-পা চালিয়ে কাজ করতে করতে শম্পা মনে হয়- সত্যি একটা রেস্টুরেন্ট খুললে কেমন হয়? কি নাম দেবে তার রেস্তোরাঁর? লোকটার সঙ্গে আরেকবার দেখা হলে আরো পরামর্শ নিতে হবে।

সাড়ে পাঁচটায় ঘরে ঢুকে ফারুকের কপাল কুঁচকে যায়।

-‘কি করছো তুমি এতক্ষণ?’

ঘরে একজস্ট ফ্যানের বিকট ফরফর শব্দ। শামীকাবাব ভেজে ভেজে এলুমিনিয়াম ফয়েলের বড় ট্রেতে রাখছিল শম্পা। ফারুকের গলার ঝাঁঝ কানে এসে লাগে। এতদিনেও কেন যে অভ্যাস হলো না ফারুকের ঝাড়ি সহ্য করার, সে শুরুর দিনের মতই এখনো মন খারাপ হয় তার।

-‘তাড়াতাড়ি কর, জলদি!’

দুটো কুলারবক্স আর তিন চার ট্রে বোঝাই খাবার ফারুকের সঙ্গে সঙ্গে পার্টি হলে নামিয়ে দেয় শম্পা। ফারুক যতই হম্বিতম্বি করুক। পার্টির লোকেরা খাবার দেরিতে পেয়ে অসন্তুষ্ট না। মেহমান এখনো সবাই এসে পৌঁছেনি। সুতরাং গরম খাবার ভালো।

ফেরার পথে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে টাকাটা গোনে ফারুক।

-‘বুঝছো, ক্যাশ টাকা পেতে বেশ লাগে, তাই না?’ রাগ পরে গিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরে খুশী খেলা করে তার।

-‘আচ্ছা, একটা রেস্টুরেন্ট খুলি না কেন আমরা?’

-‘রেস্টুরেন্ট? পাগল না মাথানষ্ট!’

-‘না, মানে এখন তো আমরা খালি বাঙালিদের কাছে বেচি। তখন শাদারাও আসবে, আমাদের রান্নার কত চাহিদা। কাস্টমারদেরকে দিয়ে সারতে পারি না,’ বেছে বেছে ‘আমার’ বদলে ‘আমাদের’ শব্দ ব্যবহার করে সে।-‘চল না, একটা ছোট দোকান দিয়ে শুরু করি, তারপর ব্যবসা বাড়লে বড় জায়গায় বড় ব্যুফে করবো। ভালো হবে না বলো?’– এবার নিজের গলায় যতটা সম্ভব আহ্লাদ ঢালে শম্পা।

-‘তোমার কি মাথা পুরাই খারাপ হয়ে গেছে শম্পা? ঘরে বসে রান্নাবাড়া কর সেটা এককথা। ঘরের বউ দোকান দিয়ে বাজারে বসলে আমার মান সম্মান থাকবে? আর আমি কি করবো, বৌয়ের হোটেলের ম্যানেজারি?’ ধমক দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফারুক বেছে বেছে এত খারাপ শব্দ বলতে ভালোবাসে! হঠাৎ বমিভাব লাগে শম্পার।

সে চুপ করে থাকে। গাড়ির জানালা একটু খুলে দেয়। হাইওয়ে ধরে দ্রুতগতিতে গাড়ি চলে। জানালায় মুখ চেপে অনেকক্ষণ অন্ধকারের পানির দিকে চেয়ে থাকে।

ফারুকের গাড়িতে রেডিও বাজে। এ এম রেডিও। সিবিসি, ক্যানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন। নিউজ, বুলেটিন।

‘বিশাল চোখে মিশায়ে মরু, চাহিলে কেন গো বেদরদি’– এই লাইনটার মানে ফারুককে বললে কেমন হয়? বুঝবে?

হঠাৎ রেডিও বন্ধ করে নিরবতা ভেঙে ফারুকই কথা বলে- ‘তোমার মাথায় এইসব আইডিয়া কোত্থেকে আসলো?’

-‘ওই যে লোকটা, খাবার নিতে কোৎভার্তুন মেট্রোতে আসলো, বলছিল, আপনি একটা রেস্টুরেন্ট খোলেন। খুব চলবে।’ ঝটপট জবাব বেরিয়ে আসে মিনারার, একটু স্বস্তিও লাগে ফারুককে বলে ফেলতে পেরে।

-‘কোন লোক? আমি চিনি?’- চোখ সরু করে ফেলে ফারুক।

-‘অর্ডার তো তুমি রিসিভ করছো, ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটে ‘

-‘কী বললা, ল্যাংড়া লোক? এইরকম কারো অর্ডার আমি নেই নাই,’ ফারুক আবারো গলা চড়ায়।

-‘তাইলে কি আমি নিছি? আর ফোনে তুমি ক্রাচ দেখতে পাবা?’- লোকটাকে  ল্যাংড়া বলায় শম্পারও রাগ চেপে ওঠে। বাসায় গিয়ে তুমি দেখো, নাইন জিরো ফাইভ দিয়ে নাম্বার। কলার আইডিতে আছে।

লিফটে মুখ গোঁজ করে দাঁড়িয়ে থাকে সে। মনে মনে ইচ্ছে ছিল ফারুকের সঙ্গে লোকটার আলাপ করিয়ে দেবে। পারিবারিক বন্ধু হয়ে গেলে ভাল হবে। কিন্তু ফারুক লোহার ঢাল বাগিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে।

বাসায় ঢুকে ফোন হাতে নিয়ে নাম্বার খোঁজে শম্পা। স্ক্রল করে রিসেন্ট কলারের তালিকা ধরে নিচে নামে। হাত পা শিরশির করে তার। কিন্তু কোথায়, নাম তো ছিল না,  নাম্বারটাও কি উধাও হয়ে গেছে। ফারুক ঠোঁটের কোনায় বাঁকা একটা হাসি ঝুলিয়ে টিভির রিমোট টিপে চলেছে।

একটা ফোন নাম্বার আর তার পেছনে সমুদ্রের হাওয়া বইয়ে নিয়ে আসা পুরুষের কণ্ঠস্বর পাওয়ার জন্য তন্ন তন্ন করে প্রতিটি নাম্বারের ভেতর ঢুকে যেতে থাকে শম্পা।

হঠাৎ কি মনে হতে মিথিলার ঘরে ঢোকে, মেয়ে গোসল করছে। ওর কম্প্যুটার খোলা। শম্পা গুগল সার্চ দেয়, গোলসিফতে ফারাহানি। দীপ্ত, আত্মবিশ্বাসী সুন্দর মেয়েটির চেহারা ভেসে আসে। শম্পা গান সার্চ দেয়, সেই সুরটা ভেসে আসে, শরীর অবশ করা সুর। মেয়েটির সঙ্গে চিনিকলের বাংলোয় তোলা তার ছবির কি মিল!

গুগলে এই শিল্পী অভিনেত্রীর ছবি সত্যি, মেয়েটির গানের ইউটিউব ভিডিও সত্যি। শম্পার মাথায় রেস্টুরেন্ট খোলার জাগ্রত ভাবনা সত্যি। কী যায় আসে ফোনে লোকটার নাম আছে কি নেই, তাতে?

গান শেষ হলে বসার ঘরে এসে ফারুকের দিকে চেয়ে হাসে শম্পা। মনে মনে ঠিক করে, এই ফারুকের দিকে তাকিয়ে সে আর তার আগের চেনা ফারুকের অপেক্ষা করবে না।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close