Home পাঠসূত্র নাহিদা আশরাফী > বিরুদ্ধ বাতায়নে দোল খাওয়া দখিনা বাতাস >> পাঠসূত্র

নাহিদা আশরাফী > বিরুদ্ধ বাতায়নে দোল খাওয়া দখিনা বাতাস >> পাঠসূত্র

প্রকাশঃ February 27, 2018

নাহিদা আশরাফী > বিরুদ্ধ বাতায়নে দোল খাওয়া দখিনা বাতাস >> পাঠসূত্র
0
0

নাহিদা আশরাফী > বিরুদ্ধ বাতায়নে দোল খাওয়া দখিনা বাতাস >> পাঠসূত্র
রাষ্ট্রধারণার বিরুদ্ধে মামলা ও বিবিধ গল্প নিয়ে

 

ছোটগল্পের প্রথম দিককার প্রবক্তা এডগার এলেন পো অথবা সমালোচক আরনল্ড ম্যাথিউজের বক্তব্যকে পিছু ফেলে ছোটগল্প এগিয়ে এসেছে অনেক অনেক দূর। ক্যারেক্টার, ইভেন্ট, ইমোশনকে আশ্রয় করে ছোটগল্প বিস্তৃত করেছে তার বহুমুখী শাখাপ্রশাখা। গল্প এখন এক দর্পণ। পাঠক তার মতো করে আলো ফেলছে, গল্পে তার মতো করেই পথ আর মত এঁকে নিতে পারছে।গতিশীলতার সূত্র ধরে সেই আলো, পথ বা মতের প্রতিফলিত রুপটাই পাঠকের মননে আঘাত করছে। অর্থাৎ আধুনিক ছোটগল্পে বিশ্লেষণের বহুমুখী সম্ভাবনায় কড়া নাড়ার সুযোগ পাঠকের রয়েছে।
সংকট, সংকোচ কাটিয়ে শুধু ইনডিভিজুয়ালিটি ও সাব্জেক্টিভিটির কারণেও আধুনিক ছোটগল্প এক অনন্য ভাষারূপ নিয়ে ধরা দেয় পাঠকমনে।
‘রাষ্ট্রধারণার বিরুদ্ধে মামলা ও বিবিধ গল্প’ – গল্পকার আশরাফ জুয়েলের লেখা এই বইয়ের প্রতিটি গল্প আমি এক, দুই, তিনবার নয়, প্রকাশিত হবার আগেই অনেক অনেকবার পড়েছি। ‘এবং সন্দেহাতীতভাবে ঘটে যাওয়া কিছু তিক্ততা’ গল্পটি পড়ে ষোল বছর সাত মাস একুশ দিন কয়েক ঘণ্টা বয়সী তরুণ এক কবির প্রতি এই পৃথিবীর দৃষ্টিভঙ্গী কি হতে পারে তা ভাবতে ভাবতেই গল্পটি যখন শেষ হয়ে যায় তখন আমিই ঋদ্ধ। কবির জন্যে অপেক্ষায়। সেই অপেক্ষায় কিছুটা প্রলেপ হয়ে আসে ‘রাষ্ট্র হবি? ঋদ্ধি’ গল্পটি। ইচ্ছে করে শাহবাগ হয়ে বুক পেতে দেই এই তরুণ কবি ও কবির রাষ্ট্র ঋদ্ধির জন্যে।
বারোটি গল্প বারোটি ম্যাসেজ, বারোটি গল্প বারোটি স্তম্ভ। বারোটি গল্প বারোটি মাস। বারোটি গল্প একটি যুগ। সময়ের পিঠে চড়ে বসেছে যেন এক বিরুদ্ধ বাতাস। সেই বাতাস আমাকে ধূলিঝড়ে ফেলে দেয় নাকি দখিনের পরশ বুলিয়ে দেয় তাই এখন দেখবার বিষয়।
অনুভবের প্রতি স্তরে টোকা দিতে হলে শানিত কলমের শরীর বেয়ে নেমে আসতে হয় গল্পকারের শ্রমবিন্দু।
‘একজন ভাত ব্যবসায়ীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া কিছু খণ্ডদৃশ্য’ পড়ে লালা নামক কুকুরের জন্যে যতটা মায়া জন্মায়, ‘জাড়’ গল্পটি পড়ে ভাদুমন্ডলের তিন সন্তানের জন্যে ঠিক ততটাই ঘৃণা জন্মায়। ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব লাবু’ গল্পে লাবু তার মৃত বোন সাবিহার সাথে কথা বলে।আমার চট করে মনে পড়ে যায়, লাবুর সাবিহা বু’র মতো আমরা কি বেঁচে থেকেও অই তালিকায় নাম উঠাইনি? আহারে সত্য! নিয়ত ডুবে যায় সাবিহার মতো।
কি অসাধারণ রুপকল্প এই গল্পটিতে! সহজাত বর্ণনায় সমাজের বৈষম্যে, অসামঞ্জস্যের তীব্র আঘাত করতে পারার ক্ষমতা সবার থাকে না।এই গল্পকারের আছে বলতে হবে।
কথাসাহিত্যে গল্পের অবস্থান বরাবরই অনন্য ও সুদৃঢ়। গল্প তার নিজস্ব ছন্দে, প্রকরণের প্রাচুর্যে, বয়ানভঙ্গির বিবর্তনে এবং সময়ের সাবলীলতা না মেনে এগুলে তা একসময় মুখ থুবড়ে পরতে বাধ্য। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বারঘরিয়া ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের মতন হাওয়ার পালে তাল দিয়ে বর্ধিষ্ণু হবার সুযোগ তার নেই। তাকে শক্ত হাতে সাহিত্যের স্রোতে ভেসে বেড়ানো গল্পনৌকার বৈঠা ধরতে হবে। উজানভাটি বুঝতে হবে, খরস্রোতের সাথে ঝুঝতে হবে। তবেই না গল্পকার খুঁজে পাবে তার কাঙ্ক্ষিত দিক।আহ তখন আর তাকে পায় কে? গল্প তখন গল্পকারের সত্যিকারের প্রেমিক/ প্রেমিকা। দুজনই দুজনার নজর আর বাহুবন্দি। উভয়ের ঈর্ষা, প্রেম, পরশ্রীকাতরতা, ক্ষোভ, ক্ষেদ, আদর, আকাঙ্ক্ষা, বাতুলতা, বিগ্রহ, কাম, কদর্যতা সব মিলেমিশে একাকার হয়ে জন্ম নেবে সাহিত্যের পৃথিবীতে এক সোনালি ফসল। পাঠক তখন নবান্নের নতুন ধানের মতো নানা উপঢৌকন নিয়ে সেই সোনালি ফসলকে আপনিই বরণ করে নেবে। সেই উপঢৌকন কি? সেই উপঢৌকন হলো পাঠকের মনোযোগ, আগ্রহ, আবেগ।
আসি এবার মূল কথায়।পাঠক নিশ্চই এতক্ষণ ভাবছেন এত কিছু থাকতে লক্ষ্মীপুর গ্রামের প্রসঙ্গ টেনে আনা কেন। আসলে একটা ভালো গল্প আপনার চিন্তাকে কতভাবে প্রসারিত করতে পারে, পরিমার্জিত করতে পারে, ‘কামরুল পাগলা ও অশুভের দেবতা’ গল্পটি তার স্পষ্ট ও শক্তিশালী উদাহরণ। কামরুল আর আলো। বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা চেয়ারম্যান, রঘুদের মতন কিছু হায়েনা। দেবতা বরাবরই উদাসীন। যুগ যুগ ধরে এমনি তো হয়। রক্ষক ভক্ষক হয়। ভক্ষক হয় দেবতা। ‘হে দেবতা, তোমার দিকে হেঁটে যেতে গিয়ে কোন সরলরেখা খুঁজে পাইনি আমি।’ – এই একটি বাক্য গল্পকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এক তীব্র সত্যছুড়ির মুখোমুখি। গল্পকারের কথাই গল্পকারকে ফেরৎ দিতে হয়। ‘ছুরি তো আর নিজের ইচ্ছেতে কারো ওপর চলতে পারে না।মানুষই তাকে চালায়।’ এই সত্যছুরিও তাই নিজের ইচ্ছেতে চলেনি। চলেছে গল্পকারের দীর্ঘপাঠের অভিজ্ঞতার আলোকে।
প্রতিটি গল্প তার আলাদা অবস্থানে দাঁড়িয়ে নিজেরাই যেন এক স্বাতন্ত্র্যবোধের ঘোষণা দিচ্ছে। ভাষার মেদহীনতা, বাক্যের বুনন কৌশল, উপস্থাপনের স্মার্টনেসের কারণে বইটি আপনাকে ভাবাবে। আবেগের অতিরঞ্জনে পাঠকের মনের আঙিনা সয়লাব করার প্রয়াস গল্পকার একেবারেই করেননি বরং বাস্তবতার করাতকলে ফেলে গল্পের এমন এক নিরেট ছাঁচ তিনি পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন যা কেবলই বোধের বিস্ফোরণ ঘটাবে।

‘বিবর্ণ পৃথিবীর আলোকোজ্জ্বল প্রান্তর ‘ গল্পটির প্লট আমাদের পরিচিত। চলচ্চিত্রে, উপন্যাসে, নাটকে, গল্পে এই কাহিনি এতবার আমরা পড়েছি বা দেখেছি যে তাকে আনায়াসে পাশের বাড়ির মেয়েটি বা ছোট পিসির বড় ছেলেটির সাথে তুলনা করা যায়। কিন্তু একবার ভাবুন সেই পাশের বাড়ির মেয়েটি বা ছোট পিসির ছেলেটি যখন প্রাণময়ী উপস্থিতি দিয়ে আপনার মননে নীরব রেখাপাত করবে তখন তাকে ঠেলে সরিয়ে দিতে গেলে আপন অস্তিত্বকেই দূরে ঠেলে দেবার মতন ব্যাপার ঘটে। আটপৌরে সাধারণই তখন অন্তরবন্দরের শক্তিশালী ঘাটি। কি করে সরাবেন তাকে? জনাব লকিয়তুল্লা, সোফি বা জাহিদ সব তো আমার চেনা চরিত্র। অথচ মুগ্ধতার মাস্তুল হাতে তারাই আমাকে পৌঁছে দেয় এক অনাগত সম্ভাবনার ঘাটে।
‘ভুল সন্তান জন্ম দেয়া পরিত্যক্ত পাউডারের কৌটায় উৎসব জমা করার মতোই’ – লাইনটা মাথায় ঢুকে বেরুনোর পথ পাচ্ছে না, নাকি আমিই ওকে বেরুতে দিচ্ছি না? এই দ্বান্দ্বিক অবস্থান থেকে উদ্ধার হবার জন্যেই কি আরো ডুব দিলাম ‘গল্পটি অসমর্থিত’তে ?
হ্যাঁ, ডুবেই অবশেষে উদ্ধারলাভ। ডুবে যদি নিশ্বাসপ্রশ্বাসের পথ প্রশস্ত হয় তবে আর ভাসা কেন?
তবে ভাসি আর ডুবি যা-ই করি না কেন, মামলা কিন্তু আমিও করেছিলাম। গল্পকারের বিরুদ্ধে পাঠকের বিচারালয়ে। অপরাধ? ছোটগল্পে এক ভিন্নতর ট্র্যাক সৃষ্টির চেষ্টা। ‘রাষ্ট্রধারণার বিরুদ্ধে বিবিধ মামলা’ গল্পে যৌতুকের দায়ে মোড়লের মেজো ছেলের বউকে রাইফেলের নল দিয়ে যেমন খুঁচিয়ে মারা হয়েছিলো আমিও ঠিক তেমনি নিষ্ঠুরভাবে খুটিয়ে খুটিয়ে আপনার গল্পের দুর্বলতম দিক ধরার চেষ্টা করেছি। মজিদ স্যার, রাজেকুল স্যার হয়ে গল্পের পাস্ট-প্রেজেন্ট-ফিউচার উল্টেপাল্টে দেখেছি। খুঁজতে খুঁজতে আমার মাথার চুলও রাশেদ স্যারের মতো লম্বা হয়ে গেছে। অবশেষ মায়ের পোড়া মুখ দেখে অভ্যস্ত টিয়াপাখির মতো আমাকেও ফিরতে হয়েছে আপনার গল্পের পৃথিবীতে। ততক্ষণে এই পৃথিবী আপনার লেখায় বুঁদ হয়ে আছে।
মামলা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম গল্পকারের মুখোমুখি। কখন যেন বিভক্তিরেখা পার হয়ে গল্পকারের হাতে হাত রাখলাম। তাকিয়ে দেখুন গল্পকার হাতের সংখ্যা বাড়ছে। আপনার ডানহাতে কলম চলুক। বা হাতে হাতের সংখ্যা বাড়ুক।
মামলা তো আমাদের করতেই হবে।
চলুন সব অসংগতির বিরুদ্ধে একসাথে মামলা করি।
জয় আমাদের সুনিশ্চিত।
জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত এই বইটি প্রকাশিত হয়েছে কাগজ প্রকাশনী থেকে। প্রকাশিত এই বইটি কিনলে পাঠক মননে ও মানিব্যাগে- দুদিক থেকেই জিতবেন একথা নিশ্চিত। তবে কেনার আগে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করুন। বইটি পড়বেন নাকি বাড়ির সেলফের শোভা বৃদ্ধি করবেন।দ্বিতীয়টি হলে কেনার দরকার নেই। আমি চাই যোগ্য পাঠকের হাতেই পৌঁছাক বইটি।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close