Home ছোটগল্প নাহিদা আশরাফী / শাদা বাস কালো গাড়ি

নাহিদা আশরাফী / শাদা বাস কালো গাড়ি

প্রকাশঃ March 23, 2017

নাহিদা আশরাফী / শাদা বাস কালো গাড়ি
0
1

সাতটা বিশের বাস ধরার মত কষ্ট আর কোন কাজে হয় না সবিতার। না ধরেও উপায় নেই। সাতটা বিশের বাস ধরলে তবু ন’টার আগে ভাগে পৌঁছানো যায়। নইলে আরও দেরি। আর দেরি মানেই বসের নোংরা দৃষ্টির সাথে সাথে নোংরা কিছু কথাও বাড়তি পাওনা হয়। কিছু বলতেও পারে না। লোকটা বাবার বসের বন্ধু। এম এ পাশ করে টানা দুবছর যখন কয়েক জোড়া স্যান্ডেল আর কয়েক দিস্তা কাগজ শেষ করেও কোন যুৎসই চাকরি মেলাতে পারছিলো না সবিতা, তখন বাবাই একদিন এক টুকরো কাগজ এনে হাতে ধরিয়ে দিলো।

– কাল সকালে একবার দেখা করো ওনার সাথে সব কাগজপত্তর নিয়ে। আমার বড় সাহেবের বন্ধু। তার রেফারেন্স দিও। কিছু একটা হলেও হতে পারে।
সবিতা দেখা করলো। চাকরি ও পেলো। ছ’মাস প্রভিশনাল পিরিয়ড কাটিয়ে উঠতে পারলে চাকরি পার্মানেন্ট। অনেক কিছুই তাই মুখ বুঝে সহ্য করে। চার মাস শেষে বেতন নিতে গেলে ক্যাশিয়ার বাবুর ভাবলেশহীন জবাব, “বড় বাবুর রুমে চলে যান দিদিমনি।” স্যালারি স্যার নিজে দেবেন। সবিতা অবাক হলেও কিছু প্রকাশ করলো না। বড় সাহেবের রুমে গেলো। স্যালারির সাথে বাড়তিও কিছু পাওয়া গেলো। উপদেশ, নোংরা চোখের কুতকুতে চাহনি, প্রমোশনের লোভ আর শরীরের সব স্পর্শকাতর জায়গায় বসের কদাকার হাতের অযাচিত স্পর্শ দাতে দাত চেপে সহ্য করতে হলো। সবিতা চিৎকার করতে পারতো, অসভ্যটাকে অপমান করতে পারতো কিন্তু অই যে দিন শেষে বাজার, মায়ের ওষুধ, বাড়ি ভাড়া, মুদি দোকানের বিল এসবের চিন্তা ওকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো যে কি করবে কি করবে না ভাবতে ভাবতে বসের রুমে রাখা টেলিফোনটা ঝনঝন করে বেজে ওঠে। টেলিফোনটাকে ওই মুহূর্তে মনে হলো ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি। বসের ভেতরকার বীভৎস আগুন নেভাতে এসেছে। আজ না হয় টেলিফোন ওকে বাঁচালো রোজ তো আর তা হবে না। লোকটা রোজই সুযোগ নেবার চেষ্টায় থাকবে। রোজ কি করে ফাঁকি দেবে সবিতা?
ভাবতে ভাবতে কখন যে সে বাসস্টপেজ পার হয়ে এগিয়ে এসেছে খেয়ালই করেনি। এসেই যখন পরেছে আর একটু এগোলেই মুদি দোকানটা। আধা কিলো আলু কিনে নেয়া যাক। ভাতের সাথে ফুটিয়ে চটকে খেয়ে নিলেই হলো। আজ আর বাড়ির পাশের মুদি দোকানে যাওয়া যাবে না। যেভাবেই হোক দোকানদার চাচার চোখ এড়িয়ে ঢুকে পড়তে হবে।
– আগের পাওনা টাকা কবে দিবা?
– চাচা দিয়া দিবো। একটু অপেক্ষা করেন। এমাসের বেতন পেয়েই দিয়ে দিবো।
– প্রত্যেক মাসেই তো এই কথা শুনি। টাকা না থাকলে অন্য ভাবেও তো শোধ করা যায়।

গত দু’দিন আগে সবিতা আর দোকানদার চাচার এহেন কথোপকথনের পর থেকে সবিতা আর ওমুখো হয় না। একদলা থুতু গলা থেকে মুখ অবধি এলেও তা আর চাচার দিকে ছুঁড়ে মারা হয়নি।
হঠাৎই লক্ষ্ করে সবিতা দোকানের পর রাস্তাটা যেই ডানদিকে মোড় নিয়েছে ঠিক তার কোন ঘেঁসে বসের কালো গাড়িটা দাঁড়িয়ে। সবিতা দেখেও না দেখার ভান করে দ্রুত সরে যায় দোকান থেকে। পরদিন, তার পরের দিন একইভাবে চলতে থাকে। অলরেডি বসের খারাপ ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে অফিসে। চাকরিটা বোধহয় বাঁচানো যাবে না। কিন্তু এই চাকরিটা চলে গেলে কি হবে তা স্বপ্নেও ভাবতে পারছে না  সবিতা। দীপককে আজই বলতে হবে ওর দিদিকে মায়ের কাছে পাঠাতে। আর অপেক্ষা নয়।

দুই তারিখ বিকেলে পরমাদি এলো। মা আর দিদি মিলে বেশখানিক গল্প করলো।
– কাকিমা সবিতার তো এখন একটা বিয়ে না দিলেই নয়।
– আমি তো মা বেঁচেও মরে আছি। তোমরা দশজন আছো। ভগবান আছেন। তোমরা না দেখলে কে দেখবে মা?
আড়াল থেকে পরমাদি আর মায়ের কথায় শুনে বেশ উৎসাহ নিয়েই কান পেতেছিলো সবিতা। দীপক তো গত সপ্তাহেই বললো দিদিকে সে তার আর সবিতার বিষয়টি বলেছে। তবে কি তারই প্রতিফলন আজকের এই আলাপ? ভেতরে ভেতরে সবিতা খুশি হয়, স্বস্তিও পায়। দীপক আর তার ব্যাপারটা ফয়সালা হলে অনেক দিক রক্ষা হয়। একা তরী-বাওয়া পুরুষদের জন্যে কষ্টকর হলেও অসম্ভব নয়। কিন্তু এই সমাজে মেয়েদের জন্যে ব্যাপারটা একরকম অসম্ভবই হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিঁথিতে একটা সাইনবোর্ড ঝুললে তবু কিছুটা বাঁচোয়া। তাছাড়া সম্পর্কটাও তো আর কমদিন টানা হয়নি। সেই ক্লাস এইট থেকে। মনে-প্রাণে, শরীরে, বহুদিন থেকেই ওরা বৈবাহিক জীবনই যাপন করে শুধু এখন একজন পুরুত ডেকে একটা সামাজিক সার্টিফিকেট পেলেই হয়। বিয়েটা আরও আগেই হতো কিন্তু ওই যে দীপকের দিদি। সে কেন যেন শুরু থেকেই মোচড় দিয়ে আছে। বিধবা বলে কষ্টও দিতে চায়নি দীপক। তাছাড়া বোনটি ছাড়া সাতকুলে দীপকেরও তো কেউ নেই। যাক এবার বোধহয় ভগবান মুখ তুলে চাইলেন। অনেক কষ্টে তাই দীপকের দিদির জন্যে একটা বঙ্গজের প্যাকেট আর পাশের ঘর থেকে এক চামচ চা-পাতা ধার করে নিয়ে এলো। গুড়ের চা আর বিস্কুট দিয়ে দিদিকে আপ্যায়িত করে সন্তুষ্ট রাখার একটা চেষ্টা আরকি।
বাবার রিটায়ার্ডের পর একা সংসার টানতে গিয়ে সবিতার যাচ্ছেতাই দশা। বাবার দুবেলা ইনসুলিন, মায়ের থেরাপি। এত বাহুল্য খরচ সবিতাদের মতো মানুষের কাঁধে কেন যে ভর করে। এখন সবিতা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে বাবা কী করে এই জীবন বয়ে বেড়িয়েছেন। এক-দু’দিন তো নয়। টানা এগারোটি বছর। আর ওতো মাত্র তিন বছরেই হাঁপিয়ে উঠেছে। হ্যাঁ সব মিলিয়ে চৌদ্দ বছর মা পঙ্গু হয়ে বিছানায় পরে আছে। এই দুর্বিষহ জীবন থেকে মাঝে মাঝে পালাতে ইচ্ছে করে। কোন এক ঝকঝকে ভোরে সবিতা ঘুম ভেঙে যদি দেখতে পেতো ও আর বেড়িবাঁধের এই এঁদো পচা গলিতে নেই, পঙ্গু মহিলাটি ওর মা নয়, দু’বেলা ইনসুলিন নেয়া লোকটা ওর বাবা নয়। স্বপ্নটা আর এগোয় না। দীপক পর্যন্ত এসে থমকে দাঁড়ায়। এ-জীবন থেকে পালাতে গেলে এ-জীবনের সবটুকু ছেড়েই পালাতে হবে। দীপককে ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয় সবিতার জন্যে। দীপকের জন্যে সেই রূপকথার ঝকঝকে জীবন কেন, আরও অনেককিছু হাসিমুখে ছেড়ে দিতে পারে। চাইলেই কী ভালো থাকতে পারে না সবিতা? পারে তো। দেখতে তো নেহায়েত মন্দ নয়। সেই স্কুলে পড়ার দিনগুলো থেকেই তো প্রলোভন, ইশারা, ইঙ্গিত ওর পিছু নিয়েছে। এতসব ঝড়ঝঞ্ঝাট বিপদে দীপকই দেয়াল হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে ওকে সুরক্ষা দিয়েছে। সবিতার নোনাধরা স্যাঁতসেঁতে জীবনের একমাত্র আলোই তো দীপক।
সকাল আর দুপুর বেলাটা অফিসেই কাটে। বাড়ি থেকে বেরুনোর আগে দুটো রুটি বক্সে ভরে নেয়। সাথে আগের রাতের ভাজি শুকনো ডাল যা থাকে। সেই সকাল বেলা মায়ের জন্যে রুটি সেঁকে বিছানার পাশে রেখে এসেছে সবিতা। সারারাত একনাগারে চিৎকার চেঁচামেচি কান্নাকাটি করে বেচারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সবিতা ওই মুহূর্তে তাই মাকে আর জাগাতে চায় না। জেগে গেলেই আবার সেই এক কথাই ভাঙা রেকর্ডের মতো বাজাতে থাকবে। তার চেয়ে এই ভালো, সবিতা চুপচাপ কাজ সেরে মা জেগে ওঠার আগেই বাড়ির বাইরে চলে যাবে।

মার কষ্টটা যে সে বোঝেনা এমন নয় কিন্তু কী-ইবা করার আছে। বাবার এমন উদ্ভট অস্বাভাবিক আচরণ সবিতাও মনে মনে মেনে নিতে পারছে না কিন্তু অদ্ভুত একটা ব্যাপার হলো বাবার বিরুদ্ধে বা বিপরীতে দাঁড়ানোর মতো কোন শক্তিশালী যুক্তিও খুঁজে পাচ্ছে না। অনেক ভেবেছে সবিতা। মা শয্যাশায়ী আজ চৌদ্দ বছর। বাবাকে বাবা হিসেবে নয় একজন পুরুষ হিসেবে দাঁড় করালেই সবিতা আর এগুতে পারে না। প্রত্যেকটা মানুষ জীবনে খুব স্বাভাবিক কিছু অনুষঙ্গ খোঁজে। মানবিক আর সামাজিক জীবের আড়ালে সে এক কামুক আর লোভী জীবও বটে। কিন্তু তা কতটা? স্বার্থান্ধ আচরণ বা জৈবিক চাহিদা কতটা মানুষকে গিলে খায়? কতটা গ্রাস করলে মানুষ তার সমাজ, সংসার পরিজনের কথা ভুলে নিজেকে লোভ বা কামের ক্ষুধার কাছে খাবার করে তুলে দেয়? বাবাকে কী সেই অবস্থানে ফেলা যায়? একবার সবিতার মনে হয় যায়। আবার পরক্ষণেই মনে হয়, না যায় না। কারণ সবিতা নিজেও কী এমন চিন্তা হাজারবার মাথায় আনেনি? সেও কি একটু সুখের জন্যে, একটু প্রেমের জন্যেই দীপনের কাছে যায়নি? তবে বাবারই বা কি দোষ? শুধু বাবা আর স্বামী বলেই যদি তার সুখ, আনন্দ সব মেরে ফেলতে হয়, তবে সেই বিসর্জনের পথ ধরে মানবিকতা, আদর্শ, নীতিও যে বিসর্জিত হবে না এমন দাবী কে করতে পারে? কিন্তু সবকিছুর পরও একটা বিস্ময় ওকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। এমন কাজটা ওর নিরীহ, শান্ত, নির্বিরোধী ও আপাতদৃষ্টিতে এক গোবেচারা বাবাকে দিয়ে কী করে সম্ভব হলো?
খবরটা প্রথম শোনে রত্না পিসির কাছে। প্রথমটায় ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি সবিতা। বাস থেকে নেমে গলির মুখে দাঁড়াতেই মনে হলো চোখগুলো সব ওকে গিলে খাচ্ছে। রোজই খায়। কিন্তু আজকের চোখগুলো যেন কেমন। একটু এগোতেই মায়ের বিলাপ কানে এলো। প্রথমটায় ভেবেছিলো মায়ের কিছু হলো? দৌঁড়ে কাছে যেতেই বুঝলো ব্যাপারটা মোটেই তা নয় সে যা ভেবেছিলো। আশেপাশে বেশ ভিড়ও জমে গেছে। রত্না পিসি ওকে ধরে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। মায়ের বিলাপ, রত্না পিসির নাঁকি কান্নার সাথে কিছু একটা বলার চেষ্টা, আশেপাশে কিছু মুখের উৎসাহের প্রাবল্য, সাথে কৌতুক মিশ্রিত চোখ-টেপাটেপিতে সবিতা কিছুটা উদভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
– মা, এরকম না কাইন্দা বলবা তো কি হইছে?
প্রশ্নটা মায়ের প্রতি থাকলেও উত্তরটা এলো রত্না পিসির মুখ থেকে।
– কি হইছে? তোর কপাল পুড়ছে। তোর মায়ের কপাল পুড়ছে। আর কি জানবি? পুরুষ জাত আর কুত্তা সমান। এগো বিশ্বাস ক্যাম্নে করে? সব নিমকহারাম। সব শয়তান।আগুন ছাড়া মরবো।
– পিসি গালি কাকে দিতেছো এইটাও যদি বলতা।
সবিতা ক্লান্ত বোধ করে। কেউ আসল কথাটা বলছে না। মা ওকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে। অদ্ভুত ভাবে গোঙাচ্ছে।
– কার কথা কমু? কই তোর বাপের কথা। মিনমিনা বুড়া ভামটার কথা।

সবিতা আর দাঁড়াতে পারছে না। অসহ্য লাগছে সব। মায়ের হাতটা ছাড়িয়ে পাশের ঘরটায় যেতে পারলে বেশ হতো। নাহ, তাই করতে হবে। এখানে আর বেশিক্ষণ থাকলে পাগল হয়ে যাবে ও।
– পিসি বাবাকে গালি দাও। ঠিক আছে। কিন্তু কুকুরের সাথে পুরুষ মানুষকে মিলাইতেছো কেন? দেখছো কোন কুকুররে বিশ্বাসঘাতক হইতে? আর একটা কথা বাবারে নিমকহারাম বলাটাও ঠিক হয় নাই। বাবার নিমক তো আমরা খাইছি। বাবায় আমাগো নিমক খায় নাই। তয় বাবারে এইসব গালি ক্যান দাও। আমি অক্ষণও জানি না সে কি করছে। তয় যা করছে সেইমতে গালি দাও।
পিসির হা-করা মুখের দিকে তাকিয়ে আরও ক্লান্ত লাগে সবিতার। মায়ের হাত ছাড়াতে গিয়ে বালিশের নীচ থেকে মা একটা চিঠি তুলে দেয় সবিতার হাতে।
– মা, একটু ছাড়ো। পাশের ঘরে গিয়া চিঠিখান পড়ি।তারপর আসিতেছি। বিষয় না বুঝলে তো কিছু কইতে পারবো না।
পাশের ঘরে গিয়ে আস্তে দরজাটা ভেজিয়ে দেয় সবিতা। দক্ষিণের জানালাটা খুলে দেয়। সাথে চিঠিটাও খোলে। একঝলক দেখেই বুঝতে পারে বাবার লেখা চিঠি। চিঠির শুরুতেই ওর আর মায়ের নাম লেখা। একই চিঠি মা ও মেয়েকে লেখা। সবিতা অবাক হয়ে পড়তে শুরু করে।
চিঠি পড়তে গিয়ে আরেক দফা ক্লান্ত হয় সবিতা। এত এলোমেলো লেখা। কোথা থেকে শুরু করেছে কোথায় গিয়ে শেষ করেছে সেই জানে। চিঠি পড়ে একটা বিষয় সবিতা বুঝেছে বাবার জীবনে এটাই প্রথম প্রেম। নইলে ইনিয়ে-বিনিয়ে সাড়ে তিন পাতা খরচ করে বাবা যা লিখেছেন তা সাড়ে তিন লাইনেই শেষ হতে পারতো। চিঠি লেখা বাবার সাথে বাস্তবের বাবাকে মেলাতে পারছে না ও। হিসেব করে চলা, হিসেব করে খরচ করা, হিসেব করে কথা বলা বাবা চিঠি লিখতে এত বেহিসাবি হয় কেমন করে? নাকি প্রচণ্ড অস্থিরতায় মানুষের স্বাভাবিক বুদ্ধি লোপ পায়। যেমন চিঠি পড়ার পর টানা একমিনিটে সে মনে করতে পারেনি পরমাটা কে।অথচ পরমাদিকে মনে করতে না পারার তো কোন কারণ নেই। অবশ্য মনে পড়ার পরও সবিতা বুঝে উঠতে পারছিলো না কীধরনের প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত তার। ওর কী কাঁদা উচিত রত্না পিসি আর মায়ের সাথে সুর মিলিয়ে?  নাকি দীপনকে খুঁজে বের করা উচিত? খুঁজে বের করে দীপনকেই বা কি বলবে?
– আচ্ছা তোমার বিধবা বড় বোন আর আমার বাবা যা করেছে তা কি তুমি জানো? আমরা এখন কি করবো? আমাদের ভবিষ্যৎ কী এখানেই শেষ?
ধুস! এইসব সিনেমাটিক ডায়লগ দেয়া ওর পক্ষে সম্ভব নয়। এর চেয়ে দক্ষিণের এই জানালার ধারে বসা যাক। মা ডেকেই চলেছেন। রত্না পিসি কয়েকবার এসে দরজা ধাক্কা দিয়ে গেছেন। সবিতার অনেক অনেকক্ষণ পর মনে হলো তার কান্নার প্রয়োজন। ভেতরকার যত চাপা কষ্ট জমাট বেঁধে আছে, ওর ভেতরটা যেমন করে পেঁচিয়ে, গুলিয়ে দলা পাকিয়ে উঠছে তার একমাত্র সমাধান কান্না। বৃষ্টিপাতের মতো কান্না, ঝর্ণাধারার মতো কান্না। অবসন্ন শরীর বিষাদগ্রস্ত মন মুক্তি চাইছে।
সেই থেকে জানালার পাশেই বসে আছে ও। উঠে আসতে চাইছে তাও পারছে না। অনেক ঘুম দরকার সবিতার। অনেক ঘুম। হঠাৎ বিদ্যুৎ-চমকে চমকে ওঠে সবিতা। মনে হলো ভেতর বাইরের অনেককিছু খুব স্পষ্ট দেখতে পেলো সে। রাত চারটে নাগাদ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো। আকাশ-ভাঙা এই বৃষ্টি দেখে সবিতার মনে হতে লাগলো গতকাল আর আজ রাতটাকে যদি ধুয়েমুছে সাফ করে দিতে পারতো এই বৃষ্টি। দরজা খুলে সবিতা বাইরে এলো। বৃষ্টির ছিটা আর ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটা ওকে একসাথে আলিঙ্গন করলো। সবিতা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে এই আলিঙ্গনটা উপভোগ করলো। উঠোনটা জলে ভরে উঠেছে। শুধু মাঝে-মাঝে হাঁটা পথের ইঁটগুলো অল্প জেগে আছে তাদের অস্তিত্ব ঘোষণার জন্যে। সবিতা জানে আর বেশীক্ষণ নয়। একটু পর ওরাও ডুবে যাবে। তার উপরে দাঁড়িয়ে ভিজতে ভিজতে সবিতার ক’টি লাইন মনে পড়ে গেল :
আকাশ রে তোর কষ্টগুলো থাকে মেঘের ’পরে।
খুব জোরালো বেদনা তোর বৃষ্টি হয়ে ঝরে।
আমার মনের ব্যাকুল ব্যথা মনেই জমে থাকে।
আমার আকাশ আমাকে তাই পাথর বলে ডাকে।
ঘুমন্ত মায়ের মুখটার দিকে তাকিয়ে খুব মায়া হলো সবিতার। ঠিক সাতটা দশে বাস ধরতে গলির মুখে এসে দাঁড়ালো। বাসে উঠতে গিয়ে হেল্পারের অযাচিত চাপকে আজ খুব স্বাভাবিক ভাবেই নিলো। রোজ হেল্পার বা ড্রাইভারের দিকে যে রক্তচক্ষু সবিতা নিক্ষেপ করতো আজ আর তা করলো না। ওর নিষ্ফল আক্রোশ দেখে এক নোংরা তৃপ্তি পেত ওরা। আজ আর তা হলো না। সবিতা সিটে বসতে বসতে ওদের অবাক দৃষ্টি দেখে বরং মজাই পেল।
সবিতার কাছে এখন বাবা, অফিসের বস, মোড়ের দোকানি, বাসের হেল্পার, ড্রাইভার, সব তো একইরকম। এরপর হয়তো আর তার বাসে ওঠাই হবে না। অফিস ছুটির পর তার গন্তব্য কোন দিকে? অফিসের সামনে দাঁড়ানো শাদা বাস না ডান গলিতে রাখা বসের কালো গাড়ি? এ শুধু সময়ই জানে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. আকাশ রে তোর কষ্টগুলো থাকে মেঘের ’পরে।
    খুব জোরালো বেদনা তোর বৃষ্টি হয়ে ঝরে।”……………

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close