Home ছোটগল্প নাহিদ ধ্রুব > একটি বনের ঘুমিয়ে যাওয়ার পূর্বের কথা >> মুক্তগল্প

নাহিদ ধ্রুব > একটি বনের ঘুমিয়ে যাওয়ার পূর্বের কথা >> মুক্তগল্প

প্রকাশঃ March 28, 2018

নাহিদ ধ্রুব > একটি বনের ঘুমিয়ে যাওয়ার পূর্বের কথা >> মুক্তগল্প
0
0

নাহিদ ধ্রুব > একটি বনের ঘুমিয়ে যাওয়ার পূর্বের কথা >> মুক্তগল্প

 

কুয়াশার ক্ষেতে হেঁটে যেতে যেতে মনে হয় দূরে কোথাও ফুটে আছে মেঘফুল কিংবা অনেকটা উটের পেটে জমে থাকা পানির মধ্যে ডুবে যেতে যেতে, আজ জোর বৃষ্টি হবে মনে হয় ফাহাদের। এইসব জটিলতা আছে বনের ভেতর। যেখানে একটি জন্মান্ধ পাখি কল্পনায় বাতাস আঁকতে পারে এবং ঝড়ে ভেঙে যেতে পারে ক্যানভাস। ফাহাদকে মোহিত করে বনের এই চরিত্র। আকাশের গায়ে শেকড় ছড়িয়ে দেয়া এক গাছের নীচে বসে ফাহাদ দেখে কীসব ছায়ার অলংকার, কোন এক ময়ূর নাচছে কাছে, যার পায়ে ঘুঙুর থাকার কথা কিন্তু মনে হয় কোথাও ভাঙছে কাঁচ। শব্দটা অনেকটা মানুষের মতো, থেমে যাচ্ছে, ডানেবামে, উত্তর দক্ষিন করে ঠিকঠাক কম্পাসে ঢেউ তুলে ঢুঁকে যাচ্ছে মাথায়।

এইসব দৃশ্যের মধ্যে যেসব দৃশ্যের জন্ম হয় তার জন্মান্তরে আরও কিছু দৃশ্যের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কথা, হয়তো অতীত বলতে যে সময় তার সময়ে যেতে এখনকার সময়কে উতরে যাওয়াই একটি চ্যালেঞ্জ। তবুও, ফাহাদ একটি সময়কে সূচক ভেবে আরেকটি সময়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে যখন আঙ্গিক দিলো তখন ঝোঁপ কেটে কেটে রাস্তা বানাচ্ছিল একদল হায়েনা। তারা ক্ষুধার্ত কিংবা তারা জানতো এই পথে কেউ আসে না। ফাহাদের অস্তিত্ব তাই তাদের কাছে ঠিক একটা নাতিশীতোষ্ণ ফুলের মতো মনে হয়। হায়েনারা তখন ভুলে যেতে থাকে ক্ষুধা আর পাশেই গমের দল ব্রতী হয় আত্মহত্যায়। এমন অনেক আত্মহননকে মাড়িয়ে একটি ঘোড়া ফাহাদের কাছে এসে দাঁড়ায় এবং শিশিরের হাত থেকে ফসকে যায় মাটির আভা। ফাহাদ জানে এই পথে কেউ আসে না।

এই পথের কথা মূলত একটি শাঁখানদী জানতো, যার তীরে বসে বসে যৌবনের দিকে ভেসে গিয়েছিল একটি কৈশোর। ফাহাদ কখনও হয়তো ঢিল ছুঁড়েছিল আর নদীটি কোন আলোড়ন না তুলে হয়ে গিয়েছিল চিলের সাগর। এইসব চিলের সাথে ফাহাদের যে সখ্য হয়েছিল তা কেবল সমুদ্রের ঐপাড়ে উড়ে যাওয়ার বাসনায়। নদী জানতো, সাগর পাড়ি দিতে হলে পাল মেলে দিতে হয়। আর সেইসব পালের কাঁচামাল এসেছিল এই বন থেকে। একদিন কথায় কথায় নদী বলে এই বনেই ফাহাদের মা হারিয়ে গেছে।

মায়ের স্মৃতি বলতে ফাহাদের মনে আসে কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকার কথা কিংবা এই স্মৃতির মধ্যে যে যাত্রা তাতে ফাহাদের ভীষণ ঘুম পায়। এভাবে কোন একদিন ঘুমের ভেতর কিংবা ঘুম ভেঙে ফাহাদ যায় এই বনের সন্ধানে। মায়ের গল্প শুনতে। কে জানে হয়তো বনের জঠরে তার মা সংসার পেতেছে, কোন এক বনবাসে যাওয়া নক্ষত্রের সাথে নিয়মিত চাঁদ দেখতে যায় তার মা! ফাহাদ আকাশের দিকে তাকিয়ে সে সব গল্প শুনতে চায়। এভাবেই ফাহাদের এই বনের মধ্যে আসা।

এই বনের মধ্যে আছে অনেক আগুনরঙা গাছ, যারা তাদের শেকড় ছড়িয়ে দিয়েছে আকাশে আর টিপটিপ বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে তাদের পাতা। এমন একটা গাছের সাথেই ফাহাদের প্রথম পরিচয়। ফাহাদ যতো প্রশ্ন করে তাকে, গাছ ততো শরণাপন্ন হয় একটি পাখির। জানা যায়, গাছটা মূলত বোবা আর এই যে পাখি যার দিকে ঝুঁকে আছে গাছ সে মূলত চোখে দেখে না। তাদের জন্য ফাহাদের ম্রিয়মাণ কষ্ট হয়। ফাহাদ মন খুলে তাদের শিয়রে নিজেকে মেলে দেয় কিংবা দেয় না, দিতে চায় হয়তো দেয় তার আগমনী বার্তা। সে জানতে চায় এইখানে, কোনখানে ওরা কী কেউ কোনদিন তার মা’কে দেখেছিল কিনা।

হয়তো পাখিটি জানে এই বনে কতকাল ধরে পশুপাখি আর হাওয়া মিলে চালু রেখেছে বাস্তুসংস্থান কিংবা একটি পোকা যাকে খেয়ে শুরু হয়েছিল সন্ধ্যা তার কাছে আছে পাখিটির প্রাণ। মায়ের কথা বলতেই তাই পাখিটি বারবার বলে বাঘ শিকারের কথা, সেই যে একবার একদল হরিণ মিলে খেয়ে ফেলেছিল কয়েকটি স্বৈরাচারী বাঘ তারপর থেকে এই বনে কেউ আসে না। গাছটি চোখ টিপে সায় দিলো যেন স্বৈরাচারের পতন ছিল অনিবার্য কিংবা এই চোখের ইশারায় ছিল সমাজতন্ত্রের সূচনা। পাখিটি হয়তো এই ইঙ্গিত বোঝে কিংবা বোঝে না, কে জানে! ফাহাদের উদাসী ভাব কাটে না। ফাহাদ হয়তো ভাবে সেই পোকাটির কথা, ভাবে পোকাটি হয়তো সমাজতন্ত্র পেলো না কিংবা পোকাটি জানতো তার মায়ের ঠিকানা যাকে খেয়ে ফেলেছে এই পাখি যে খুব আমোদী, চোখে দেখে না অথচ ছবি আঁকে পিকাসোর মতো, নাকি দালি, চারিদিকে পরাবাস্তবতা একটা ফুল বলতেই যেন কেউ ছুঁড়ে দিচ্ছে পালক, পাখির পালক।

এমন নরম পালক, এমন নরম বিছানা, ফাহাদের ফের ঘুম পায়। ঘুমের মধ্যে কী ফাহাদ ঘুমিয়ে যায় নাকি এ এক নতুন ঘুমের সূচনা! ফাহাদ কিছু বুঝতে পারে না। সে ভাবে হয়তো স্বপ্ন, স্বপ্ন দৃশ্য, মানুষের তো এমন কতোই হয়, পাখিকে কথা শেখায় নিজের মতো, পাখি কথা বলে, মানুষ আনন্দ পায় কিংবা পোষ না মেনে কিছু পাখি খাঁচাতেই মরে যায়। এমন এক খাঁচার মধ্যে ফাহাদ নিজেকে আবিষ্কার করে। এই বনে কে যেন তাকে কাঁধে নিয়ে করছে ফেরী, বাজারে নিয়ে তাকে হয়তো বিক্রি করা হবে চড়া দামে। ফাহাদ ভাবে, কেউ যদি তাকে কিনে নেয় তবে সে কী তাকে পোষ মানাবে নাকি তার মাংস দিয়ে রান্না করবে বিরিয়ানি। বাজারে কেউ গরম তেল ছুঁড়ে মারে ফাহাদের মুখে, ভেঙে যায় তার ঘুম।

ঘুম ভাঙলে সে নিজেকে আবিষ্কার করে নদীর পাড়ে, সেই যে শৈশবের নদী যারে মৈথুন করে যৌবন ভেসে গেছে একা একা। ফাহাদ নদীতে ডুব দেয় যেন ভেঙে যায় সমস্ত ঘোর। তবুও, কোথায় যেন কোন এক বুকে মায়ের গল্প শোনার ইচ্ছে তখনও তাজা। তার মনে হয় এই যে লোকালয়, কতো কতো মানুষ চারপাশে খুন করছে দিনে-দুপুরে, পাগলী রাস্তায় জন্ম দিচ্ছে বেওয়ারিশ বাচ্চা কিংবা একজন ধর্ষিতার পিতা কাটা পড়ছে ট্রেনলাইনে, এরা কী কেউ সে বনের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন না? নাকি এরা এখনও বিশ্বাস করে এই পৃথিবীতে ঐ যা বলে গণতন্ত্র সে সব প্রতিষ্ঠিত হবে অথবা লাল পতাকায় ছেয়ে যাবে আকাশ, ঐসব পাখি এবং গাছেরা বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক স্লোগান তুলে ফিরে আসবে লোকালয়ে। ফাহাদ লোকালয় ছেড়ে এই নদীর কিনারে বসে বসে ভাবে এইসব কথা কিংবা সে ভাবে নদীটিও কী এই লোকালয়ের অংশ, শীত এলে কেমন শুকিয়ে যায় আর বর্ষায় কালো কালো পানির উত্তাপে ভেঙে দেয় ঘরদোর, সে জানে একটি নদীভাঙা মানুষের কথা যে একদিন কারখানা থেকে ঢেলে দিয়েছিল এই কালো বর্জ্য আর রাত্রিতে যখন ঝড়, তার ঘর ডুবে গিয়েছিল, ভেসে গিয়েছিল তার বিছানা। ফাহাদের মনে তখন সে রাতের স্মৃতি, টিনের চালে মধুর বৃষ্টির শব্দ, ঝড়ের রাতে ফাহাদ ঘুমিয়ে যায়, তার ঘুম ভাঙে না।

ঝড়ে যখন টিনের চাল উড়ে গিয়ে পড়লো নদীতে, ফাহাদ তখন দেখলো একটি গাছ তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে যার শেকড় মূলত আকাশে ছড়িয়ে আছে নক্ষত্রের মতো, তার চোখের মধ্যে কথা বলছে একটি পাখি, বলছে ভয় নেই কোন। ফাহাদের মনে হয় এই বুঝি মাতৃজঠর, যার খোঁজে সে গিয়েছিল কোন এক জঙ্গলে। ফাহাদ গাছের কাছে জানতে চায় মায়ের ইতিহাস। কেন মা তাকে ফেলে গেছে, নাকি সে মরে গেছে সেই শৈশবে, জন্মের পরপর, ফাহাদ জানতে চায় সবকিছু যা কিছু অবিনশ্বর। পাখি তখন শুরু করে ঘুম পাড়ানি গান, ফাহাদ নিশ্চিত হয় ওরা, ওরাই জানে তার মায়ের ঠিকানা। হঠাৎ ঝড় থেমে যায়, চারপাশ শুনশান, কোথাও থাকে না কোন গাছের অস্তিত্ব।

ফাহাদ হয়তো ভাবে সে তখন বনে কিন্তু সে মূলত লোকালয়ে কিংবা এই যে লোকালয় যা রবীন্দ্রনাথের মতো ফিরে পেতে চায় অরণ্য, তার মাঝে আছে এক অদ্ভুত গোলকধাঁধা। এই গোলকধাঁধায় পৃথিবী খেলে কানামাছি। কেউ পৃথিবীর চোখ বেঁধে দেয় আর বন ক্রমশ গভীর থেকে লুকাতে থাকে গভীরে। পৃথিবী চাইলেও তাকে আর খুঁজে পায় না। এমন এক গোলকধাঁধা, এমন মায়াবী, যার সন্ধানে একটি গাছ হয়ে যায় বোবা আর একটি পাখি যে কখনও চোখে দেখে না তার সাথে বন্ধুত্ব হয় ফাহাদের কিংবা তাদের সাথে ফাহাদের কখনও দেখা হয় না। এ সব গল্প হয়তো ফাহাদের মা’য়ের জানা, যে ফাহাদকে ঘুমের ভেতর রেখে চলে গেছে বনে আর কখনওই ফিরে আসে না।

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close