Home মুক্তগদ্য নির্ঝর নৈঃশব্দ্য / মুক্তগদ্য ত্রয়ী

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য / মুক্তগদ্য ত্রয়ী

প্রকাশঃ January 8, 2017

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য / মুক্তগদ্য ত্রয়ী
0
1

প্রিয়তম ভুল

তুমি শাদা, আমি কালো। আমাদের চারচোখ অশ্রু টলোমলো। তুমি সমুদ্রের ঢেউয়ের ফনায় নাচবে দুলে দুলে। তুমি আসবে। তুমি আসবে। তুমি আসবে। বাতাস কেঁপে উঠবে। আমি একা কেঁপে যাবো সুতীব্র শরীর। আমি স্বপ্নের দরোজায়। তোমার আগে এইখানে ঝড় ছিলো হাওয়া। আমার উত্থিত রক্তে ধরেছি সমুদ্র। ঝড়ের মৃত্যু হলো। ফেনাগুলি ভেসে আসছিলো আমার দিকে। তুমিতো উৎসে ছিলে তারও আগে। আমি আনন্দকে অতিক্রম করে সরে এলাম। ঘুমিয়ে জেগে উঠলাম আবার। কিছুই বলার নেই। মন্ত্রণারহিত সকল অন্ধকার। তুমি আসো বাহির হতে। তুমি দ্বার ভেঙে আসো। তোমার মুখে হাসি। তুমি কৃষ্ণপক্ষে একাদশী।

 

দেখো, এখানে নীলাভ ঘুম থির হয়ে আছে। তোমাকে ছুঁয়ে যাওয়া নদী হারিয়ে যাচ্ছে। তুমি একটি পাতায় তিরতির করে কাঁপো। শ্রীমতি, তুমি কোনারকের মন্দিরের গায়ে সারি সারি তন্দ্রাচ্ছন্নতা; কেঁপেছিলে রোদের কোমল। এমন নিভৃত সুন্দরের বিষ ছড়ালে চারপাশে। এইপাশে পাহাড় নামে। দুরন্ত দূরের টান এনেছিলো আয়োজন, এখনো আনে। ওইপাশে সকাল নামে। সকালের ক্ষতচোখ অবিমল সুর। ধরে থাকে বন্ধ্যা সুদূর।

 

এই লিপ্সা অযাচিত অক্ষরের গর্ভপাত। পুনর্বার মৃত্যুর পর জন্মের প্রতিবেশী হতে সাধ। তারও আগে রাত্রিকে ছুঁয়েছিলো শাদাহাত। পদতলে ধরেছে সে সবকটা রাত। রাত এখনো জ্বলছে দেখো। একজন নিজের আগুনে কেবলই পুড়ে যাচ্ছে ধীরে। ঘুম ছিঁড়ে যাক চোখের বারান্দায়। ক্লান্তি এসে শুয়ে থাকুক অপরাজিতা। কেউ কুড়িয়ে নেবে তাই ফুলগুলি ঝরে। মধুগন্ধে ডাকে উন্মাতাল ঝড়। বকুলও একটি ফুল। সে আমার মুঠোবন্দী আলো। কার কাছে গেলো জানতে পারিনি। কারো কেঁদে যাওয়া কান্নার ঋণ তিনটি বকুলের দামে শোধ হয়ে যায়। তারপরও সেই কান্নাগন্ধে কবিতা পাগল পাতাঝরার উৎসবে। কেউ মুছে দেবে তাই কান্না ঝরে।

 

প্রিয়তম ভুল, আমি নিদারুণ অগ্নি আবেষ্টন ভেঙে শীতের কাছে এসেছি। আমি স্বাহা ও অরুন্ধতীর রক্তলগ্ন বাসনা। যা কিছু শূন্যতা আছে আমার রক্তের ভিতর—কম্পমান সমুদ্র হয়ে দুলছো পূর্ণতার প্রতুলতায়। সুন্দর তুমি অন্ধ অসুখের দেশ হতে এসে ঝিরিঝিরি শয্যা জ্বেলে আমাকে রোপন করলে আরোগ্য প্রান্তরে। সঘন সন্ধ্যা অস্থির শীতার্ত প্রতিবেশকে পরিতাপ দিলে তোমার হাতে ছিলো উষ্ণতার খড়কুটো বৈভব। তুমি চুপিচাপ ধরে রেখো চৈত্রের রাত, হয়তো আমি গ্রাস করতেও পারি।

 

আমরা জন্মান্ধ। তুমি হাঁটতে হাঁটতে থেমে গেলে। শিখতে চাইলে  কেমন করে হাঁটতে হয়। যখন ঘুম আর শীত একসঙ্গে আসে,  যখন চোখের ঘুম রাত্রিকে ভালোবাসে, যখন ঘুমের রাত্রি জাগরণকে ডাকেÑ আমি তোমার দিকে সরে আসি। তোমাকে শোনাই আঁধারের আখ্যান। তোমাকে শোনাই আলোর আখ্যান। তুমি শাদা, আমি কালো। আমাদের দুজনের চুল চির এলোমেলো।

 

রঙের দুঃখ

 

রঙের দুঃখ কেবল আমি জানি, আমি জানি। আকাশ আমার কাছে আসতে চাইতো তার সমস্ত নীল নিয়ে। কিন্তু আসতে পারতো, না। আমার দরিদ্র ক্যানভাস হালকা নীল নিয়ে বেদনা লুকাতো। আমি জানতাম শরতের আকাশের রং ফ্রেঞ্চ আল্ট্রামেরিন। ওই নীল আমার কাছে ধরা দিতো না একদিনও, কেবল মেঘ এসে বসতো আমার জলরং হয়ে, ভেজা কাগজে। আহা, সূর্যকে কতোবার বলেছি তার সমস্ত হলুদ আমার। সূর্য আমাকে দিলো না, দিলো সূর্যমুখীকে। আমি তাই গাঢ় শ্রাবণে একদিন কচি লেবুপাতার বনে ডুবে ডুবে লেবুফুলের কাছে নিয়েছি লেমন ইয়েলো। আর আমার লাল এখনো আছে প্রিসলিনের শিরার ভিতর, প্রিয় ভিনসেন্ট আমাকে শিখিয়েছিলো রঙের তৃষ্ণা। সে আকাশ থেকে নীল নিয়ে ছবি আঁকতো। আর সূর্য থেকে নিতো হলুদ, নিতো লালের অনেক গ্রেড। আমি স্বপ্ন দেখতাম একদিন আমি অনেক বড় হলে, একগাড়ি রং কিনবো, ঘরভর্তি শাদা ক্যানভাসে এঁকে দিবো প্রগাঢ় রক্তজবার বনাঞ্চল, প্রাচ্যের সকল ধনেশ সচঞ্চু শৃঙ্গারে একাকার। আরো এঁকে দেবো নীলকণ্ঠের যতো আছে খণ্ডিত অভিমান। ইচ্ছে ছিলো কবেকার সাবিত্রীর প্রার্থনার রূপ এঁকে হয়ে যাবো আমিও হিরণ্ময়। হলো না।

 

ভেবেছিলাম, লালপাড় এঁকে দেবো পৃথিবীর যতো আছে শাদাশাড়ির। পৃথিবীর সব শাদাপায়ের পাড়ে এঁকে দেবো আলতাহরিণ। হলো না। আমার শিরার ভিতর এতো নেই লাল। আমার শিরার ভিতর শাদারাত্রির নাশতেংকা দীর্ঘশ্বাসে প্রলম্বিত করছে হাহাকার। রঙের দুঃখ এই-ই, আমিই তাকে চিনি সব থেকে বেশি। আর সে ধরা দিতে পারে না আমার প্যালেটে। আমার প্যালেট রোদ লেগে হয়ে যাচ্ছে রূপকথার তেপান্তর। আমার শিরার ভিতর, ধমনীর ভিতর যতো আছে লাল—জমিয়ে রেখেছি ওষ্ঠাধরে সংগোপনে। আমার উজ্জয়িনী বিরান হলে আমিও হেঁটে যাই নীল পাহাড়ের দিকে। নীল পাহাড় দূরে সরে যায়। আমার স্বপ্নের রঙের ভিতর ডুবে যায় দুইটি রাজহাঁস, বাদামের যুগলঘরে বন্দী দ্বৈতবাসনা।

 

আমার স্মৃতিতে ছিলো ঝড়ের স্পর্শ। বৃষ্টির আগে ঝড় এসে রাঙিয়ে দিয়েছিলো ধূলিকারণ্য। তুমিও ছিলে না। আমি একাই পান করেছি অন্ধকার দিবসের সকাতর রং। বুকের একপাশে ঝড় বিজলি আর বৃষ্টি ছিলো। আর পাশে যে তুমি ছিলে, তা বলতে পারি না। শূন্যতার অন্য নাম যদি তুমি তবে ছিলে। বৃষ্টির আঘাতে বকুলেরা কেঁদেছিলো। কেঁদেছিলো তোমাদের পাশের প্রান্তরে। সেদিন আমিও ছিলাম। তাদের কান্নার ভারে আমি কাঁদতে পারিনি। আমি তাদের কান্না হয়েই ছিলাম। তেরোতলার জানলার কাচে চোখ রেখে তুমি বাষ্পখাতা। দেয়ালের ওধারে মাঠ ছিলো শূন্যতার রং। আর আনন্দ ছিলো সেই রঙের প্রিয়তম ভাই।

 

এই রং মানে আমি। পাইনি নিজেকে কোনোদিন। এই রঙের ভিতর পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে পৃথিবীর সকল তৃষ্ণা। এই আলেখ্য তোমাকে দেবো না, প্রিয়।

 

এইবার অন্ধ হও

 

ফুরিয়ে গেলো দৃশ্য। দৃশ্যের ওপারে বনাকীর্ণ ছায়ায় ফুরিয়ে যায় প্রিয়তম স্বজনের সমাধি। এপিটাফে লেখা ফুল, পাপড়িছিন্ন পতঙ্গের রূপ ধরে বিবরের প্রতিবেশি হয়। তুমি চুলের ভিতর ঢেকে রেখে চোখ অশ্রুকে করো কণ্ঠহার। জন্মান্ধ চোখে আমি সবুজকে পীতাভ রাত্রি ভেবে দূরে—অনেক দূরের বনপাড়ে মেষপালকের নিয়তির খাতা পড়ি। ইদিপাস আমাদেরও সহোদর—যে জননী জোকাস্তা, ভার্যা জোকাস্তার মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে অন্ধ হয়ে যায়। সে নিহত ভার্যা জননীর  চুলের কাঁটা আপন চোখে বিদ্ধ করতে করতে বলে, অন্ধ হও, অন্ধ হও। এইবার তোমরা অন্ধ হও। যা তোমাদের এতোদিন দেখার কথা ছিলো তা তোমরা দেখোনি; যা তোমাদের দেখার কথা নয়, তাইই তোমরা দেখেছো।  অন্ধ হও, এইবার অন্ধ হও।

 

ইদিপাসের চোখেরা কথা শোনে না। দৃষ্টিরহিত চোখ যে স্মৃতি ও দৃশ্যের জন্ম দেয়, তার নাম যন্ত্রণা। এই যন্ত্রণার ভার মানুষের বুকেই প্রোথিত হয়। তুমি আন্তিগোনি, তোমার বুকে বেদনাফল দীর্ঘশ্বাসকে আড়াল করে রাখে। তুমি ইলেকত্রা; তোমার বুকের ভিতর প্রতিহিংসা যাতনা হয়ে যায়। সোনিয়া, আমি শাদারাত্রির অমল কথক। আমি নিজেকেই খুন করেছি। রাস্তায় আমার ছায়া দীর্ঘ হাঁটে, ছায়ার চোখে অশ্রু। অশ্রু কারো সঙ্গে প্রতারণা করে না। পানশালায় ভিজে যায় আগুন। ছায়ার হাতে হাতকড়া। কড়া রোদের পাহাড় চাপা পড়ে দরিদ্র শার্টের আস্তিনে।

 

অনেক দেখেছো সংলগ্নতা। নদী ও মাছের গোপনীয়তা। ভবঘুরে মাঠের নৃত্য দেখেছো। অনেক দেখেছো আশ্বিনের ধান কার্তিকে গিয়ে পাকে। পাকা ধানে পোকামাকড়ের দল দেখেছো, দেখেছো মুষিকরূপী ইঁদুর। চোখের ভিতর মাইল মাইল ডুমুরের বন নিয়ে দেখেছো স্বপ্ন। স্বপ্ন আর রূপের মধ্যকার দ্বন্দ্ব তোমাকে বিকলাঙ্গ করে ছেড়ে দিয়েছে মাঝরাস্তায়। পুকুরের মাঝে, পানিতে সাবলিল সাঁতরে বেড়ায় কালো হাঁসের পাল। হাঁসের পালক কচুপাতা। সব তোমার সঙ্গে প্রতারণা করে। রাইয়ের ক্ষেতে সূর্য নেমে এলে নিজেকে বিয়াত্রিচ ভাবো, একশো তিনটা ইনফার্নো ঘুরে এসে বসো উল আর কাঁটা নিয়ে। জোকাস্তার চুলের কাঁটায় বুনে চলো হাত মোজা। এ বছর দেশে বৃষ্টির বদলে তুষারপাত হবে। তুমি উলের মোজায় হাত ঢেকে কুয়া থেকে তুলবে বালতি বালতি পানি। তোমার উঠানো পানিতে বন্যা হলে দূরের মাঠে খরা মরে যাবে। মাঠের মাঝখানে জন্ম নেবে একটি শিরীষগাছ। এই গাছ তোমার সঙ্গে ছায়া ছায়া খেলা খেলবে। চুলের ভিতর হারিয়ে যাবে তোমার মুখ। তুমি এইসব সার্কাস দেখতে দেখতে ক্লান্ত। তুমি এইবার অন্ধ হও।

 

বেগুনি সুতোতে জোনাক গেঁথেছে এই জন্মান্ধ চোখ—ঘর, উঠান আর পাহাড়ের ওপার জেগেই থাকে, নির্ঘুম নির্ঘুম। ভাঁটফুল ক্ষেত উলম্ব দিগন্তচুর লাল অসুখ। গাছের ডালে বসে একটি শাদা কাক। কাক কেমন করে শাদা হয়? কলসিতে ছয়মাস রেখে দাও শাদা হবে কাক। শূন্যতার ওষ্ঠাধরে আচঞ্চু চুম্বনে সে বাজাবে রাতে দীর্ঘরাতের শাঁখ, শাঁখের করাত। দীর্ঘশ্বাসের পাশে আমি চুপিচাপ বসে থাকি চিরদিন। তার পাশে শুয়ে থাকি আমি দৃশ্যখোদক। দৃশ্য খুঁড়তে খুঁড়তে নীরবতা নামে ধানক্ষেতে, জাগে গূঢ় নক্ষত্রের দাগ।

 

পতঙ্গ কারো বুকের ভিতর সুমসাম উড়ে। ওখানে দুলছে আলোর নিষাদ। আলোর গন্ধে আর খড়ের আগাছায় ছেয়ে আছে তোমাদের মাঠ। শুক্লচোখে দেখি চাঁদ পুড়ে ছাই। এই চাঁদ রূপজীবার ত্বকে পুড়ে গেছে; এই চাঁদ ভিক্ষার নেশায় পথ হনন করে। আমরা ফিরে যাই গোরের নদীস্বর। আমি সবকিছু কেচে দিয়ে বাতাস ছিঁড়ে ফেলি। পাশাপাশি ক্যানভাস সাজানো, ছড়ানো রং আর ব্রাশ। রং চিনি একা পূর্ণিমার পরে। যে গেছে—সে স্তনহীনপুষ্পের চির দুর্গন্ধ পাতালে—সুন্দর সবকিছু আছে, পাশে ও প্রবাসে। প্রবাস পাহাড়ের ওপারে। আমি পাহাড়ের দেশে থাকি, তুমিও আছো জন্মাবধি।

 

তোমার দেশ, তোমার পৃথিবী একটা সার্কাস। মানুষগুলি এক একটা জোকার। তুমিও জোকার। তোমার রং হলুদ। তোমার নাক লাল, তোমার আঙুল নীল। জোকার সব সময় খেলার বাইরে থাকে। আসল খেলা খেলে অমানুষেরা। এইসব দৃশ্য দেখতে দেখতে তোমার চোখে ক্লান্তি নেমে আসে। তুমি ঘুমোতে যাও, কিন্তু ঘুমোতে পারো না। ঘুম ঘুম তন্দ্রার ভিতর দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠো, কান্নায় ভেঙে পড়ো সরীসৃপ বেদনায়। এই বেদনা বুকে হেঁটে পার করতে চায় একটি জীবন। দৃশ্য ফুরিয়ে যায়, ফুরায় না জীবন।

 

সমাধির খোঁজে তুমি পাড়ি দাও মহাসমুদ্র। ছুঁয়ে দেখো লাবণ্য। তোমার চোখে ক্ষয় নামে। তোমার চোখ বিতৃষ্ণ বেদনায় অন্ধ হতে চায়। তুমি তোমার চোখেদের পাশে দাঁড়াও। তুমিই ইদিপাসের যাতনার সর্বনাম। দুঃখি পৃথিবী লজ্জা পাচ্ছে। তাকে আর দেখো না। প্রিয়তম ভুল, এইবার তুমি অন্ধ হও।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. ভেঙে ভেঙে নিজেকে অন্ধকারে গুঁড়িয়ে ফেলা, নির্মম পরাজয় একলা একা। মানতে বড়ো কষ্ট হয়। তবু পাঠকমন বুঁদ হয়ে কালো কালো এই অক্ষরমালায় আলো খোঁজে। অভিবাদন কবি।

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close