Home অনুবাদ নিলোফার ইকবাল > তুষারকণার দেশে >> বিতস্তা ঘোষাল অনূদিত উর্দু গল্প

নিলোফার ইকবাল > তুষারকণার দেশে >> বিতস্তা ঘোষাল অনূদিত উর্দু গল্প

প্রকাশঃ March 3, 2018

নিলোফার ইকবাল > তুষারকণার দেশে >> বিতস্তা ঘোষাল অনূদিত উর্দু গল্প
0
0

নিলোফার ইকবাল > তুষারকণার দেশে >> বিতস্তা ঘোষাল অনূদিত উর্দু গল্প

‘নাম কি?’
‘শের আলি, স্যার।’
জেনারেল বুব্বার আলি কটমট করে তাকালেন তার দিকে। মনে হল নামটা তাঁর মোটেই পছন্দ হয়নি। শের আলি পা ঠুকে ফৌজি কায়দায় অভিবাদন করে পেছন ফিরল। অভিবাদন করার পদ্ধতি ঠিক আছে বলে জেনারেলের মনে হল। তিনি এবার তাকালেন ক্যাপ্টেনের দিকে। ক্যাপ্টেন তাঁর বুটের গোঁড়ালি ঠুকে স্যালুট করলেন।
‘শারীরিকভাবে ফিট বলেই মনে হল। তবে যত গন্ডগোল সব ব্যাটার ঐ নামটাকেই ঘিরে’,

– মনে মনে একটা খিস্তি করলেন সেনানায়ক বুব্বার আলি। তবে হ্যাঁ, ‘শের’ মানে যদি বনের রাজা হয়, তবে ‘বুব্বার’ মানে আরও বড়ো, একেবারে রাজাধিরাজ’। ক্যাপ্টেন বড়ো সাহেবের দিকে চাইলেন।
‘ওকে অল রাইট’।
কাপ্টেন সাহেব স্বস্তি পেলেন।  কেননা শের আলিকে তিনিই এনেছিলেন বড় সাহেবের খাস আর্দালিদের একটা শূন্যপদে নিয়োগের জন্য।  শের আলির বিশ্বস্ততা ও যোগ্যতা সম্পর্কে তিনি নি:সন্দেহ ছিলেন।  যেহেতু এতদিন সে তাঁর কাছেই কাজ করছিলো।
তবে শের আলি ফৌজিতে যখন প্রথম সুযোগ পায়, যদিও সে অনেক দিনের কথা, গোটা গ্রামটাতেই যেন আনন্দের তুবড়ি ফুটেছিলো।  নতুন ‘বর’কে দেখার মতো ভিড় করে সবাই তাকে দেখতে এসেছিলো।
গ্রামের মেয়েরা এসে তার মাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলো।  ‘এখন তুমি বীরের মা, কত সৌভাগ্য তোমার’, তারা বলেছিলো।
‘সবই আল্লাহর ইচ্ছা’, শের আলির মা তাদের বলেছিলেন। তিনি যে তাঁর সন্তানের জন্য গর্বিত হয়েছেন, সেকথা তাদের বুঝতে দেন নি। বরং তিনি তাদের তাঁর দড়ির খাটগুলিতে বসতে বলে সকলকেই মিষ্টিমুখ করেছিলেন।  একটা অ্যালুমিনিয়মের ট্রেতে করে তিনি অনেক মিষ্টি এনেছিলেন।
‘তুমি গিয়েই আমাকে চিঠি লিখবে, বুঝলে ব্যাটা?’ কাঁদতে কাঁদতে তিনি তাঁর আঁচলের খুটে চোখ মুছে, ছেলেকে বলেছিলেন।
‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই আম্মি। আমি পৌঁছিয়েই তোমাকে চিঠি দেব,’ শের আলি বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তার মাকে আশ্বস্ত করেছিলো।  সে পাঁচ ক্লাসে উঠেই পড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলো শুধু করিম মাস্টারের ছড়ির ভয়ে। না হলে সে এতদিন অনেকটাই বিদ্বান হয়ে যেতো।  তবে বহু ঘোরাঘুরি করে আর নাছোড়বান্দার মতো লেগে থেকে সে ফৌজিতে তার চাকরিটা শেষ পর্যন্ত জোটাতে পেরেছিলো।  তার আগে তাদের গ্রামের শুকুর আলি নামে একটি ছেলে সৈন্য বাহিনীতে কাজ পেয়েছিলো।  সে একজন মেজরের ‘ব্যাটম্যান’ ছিল।  ফলে বলা যায় তার চেষ্টাতেই শের আলির এই কর্মপ্রাপ্তি।
তবে আসার আগেই শের আলি সৈন্য বাহিনীতে কি কি কাজকর্ম করতে হবে সে সব বারবার প্রশ্ন করে শুকুর আলির কাছ থেকে সব খুঁটিনাটি জেনে নিয়েছিলো।
কাজে যোগ দেওয়ার পর খাঁকি প্যান্ট পরে, ফৌজি জামা গায়ে ব্যাগ কাঁধে প্রথম যখন সে গ্রামে ঢুকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাড়ি ঢুকছিলো তখন বহু ছেলে ছুটে এসে তাকে ছুঁয়ে দেখতে চাইছিলো।  মেয়েরা দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে তাকে দেখছিলো।  ফৌজের লোক মানেই তাদের কাছে অসাধারণ কিছু।  তারা তো আর মেজর, কর্ণেল বা একজন সাধারণ সৈন্যের কোন পার্থক্য বোঝে না।  ঐ খাঁকি ইউনিফর্মটাই যেন তাদের কাছে অনেক কিছু।
গ্রামে সে বের হলেই ছোটখাটো একটা ভীড় জমে যেতো।  সেনাদের গল্প শুনতে চাইতো সবাই তার কাছে।  সেও বানিয়ে বানিয়ে অনেক কিছু বলতো তাদের কাছে।  যেন সে সিন্দাবাদ হয়ে সমুদ্র অভিযানের নানা অভিজ্ঞতার কথা শুনাচ্ছে।  গ্রামের যুবক ছেলেদের চোখ চকচক করে উঠতো।  তার উইনিফর্মে আঁটা চোখ-ঝলসানো বোতামগুলো থেকে যেন তাদের দৃষ্টি ফিরতেই চাইতো না।
তবে তার বেশ মনে আছে। শুকুর আলি তার চাকরি খোঁজার সময় তার একটি প্রশ্নের উত্তরে একদিন জানিয়েছিলো, তাও ডাইনে বাঁয়ে তাকিয়ে তার কানের কাছে মুখ নামিয়ে একদম ফিসফিস করে, ‘হ্যাঁ, রাজার চাকরিই বটে, তবে সে সব অফিসারদের জন্য। আর ‘ব্যাটম্যান’দের জন্য…’ তারপর হঠাৎ কথা ঘুরিয়ে আরও নীচুস্বরে বলেছিলো, ‘সে তুমি অন্য চাকরি খুঁজলেই বোধ হয় ভালো করতে ভাই।’
‘আর্মিতে চাকরির সুযোগ ছেড়ে অন্য কিছু!’ শুকুর আলির কথায় আহত হলেও শেষ পর্যন্ত জেদ ধরে বসে ছিলো, আর্মিতেই সে চাকরি করবে।
শুকুর আলি রোগা পটকা কালো রঙের একটা ঢ্যাঙা ছেলে ছিলো, আর সে স্বাস্থ্যবান লম্বা, ফর্সা আর ইননিফর্ম পড়া চোখ ধাঁধানো একটি ছেলে। শুকুর আলির হিংসাও হতে পারে তাকে দেখে।
সেজন্য সে শুকুর আলির ওসব কথায় বেশি কান দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি।  চাকরির ভাবনার সঙ্গে মুনুওয়ারীর চেহারাটাও তার সামনে ভেসে উঠেছিলো। কথাবার্তা একরকম পাকা হয়েই আছে।  চাকরি পেতেই শুধু যা দেরী!
শেষ পর্যন্ত শুকুর আলির চেষ্টাতেই আর্মিতে তার একটা হিল্লে হয়ে গিয়েছিলো।
অবশ্য ক্যাপ্টেন সাহেবের বাংলোয় ‘ব্যাটম্যান’ পদে যোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে শুকুর আলির কথার মর্ম হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলো।
সে রান্নার কিছুই জানতো না। এমনকি একগ্লাস পানি ঢেলেও সে কোনদিন খায় নি। সবই তার মা করতেন।
মেজরের স্ত্রী বেশ লম্বা চওড়া ফর্সা সাইলা ছিলেন। তাঁদের দু’টি মাত্র সন্তান; একজনের বয়স চার আর একজনের পাঁচ।
‘তুমি রান্না করতে জানো?’
‘জি,না!’ শের আলি একটু অবাক হয়েই কথার উত্তর দিয়েছিলো। তার ধারণা ছিলো ব্যাটম্যানের কাজ হচ্ছে তার নিজের রাইফেল এবং সে সঙ্গে সাহেবের সব জিনিষপত্র যেমন ইউনিফর্ম, জুতো ইত্যাদি সব ঠিকঠাক কিনা দেখা।
‘ঠিক আছে। তোমরা সব ব্যাটম্যানরাই ভীষণ সব চালাক চতুর।  কিছুই জানি না বলে আসো। ঠিক আছে; আমি তোমাকে সব শিখিয়ে পড়িয়ে নেব’, মেমসাহেব একটু মুচকি হাঁসলেন।
আপাতত তুমি পেঁয়াজ-রসুন কাটো। তারপর ঐ কি সব সবজিপত্র আছে বের করে ধুয়েটুয়ে কাটাকুটি কর।  তারপর দেখ বাসনপত্র সব ঐ জায়গায় ডোবানো আছে। এগুলো ধুয়ে সাফ-সুতরো করবে।  আর রান্নাঘরটা সাফটার্ফ দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করো। চারদিন ব্যাটম্যান ছাড়াই আমাকে থাকতে হয়েছে।  আজ পাঁচ দিনে পড়লো। উহ্ কি সাংঘাতিক ব্যাপার। কাটাকুটোর কোন সামান্য কুচিটুচি যেন ছড়িয়ে না থাকে।  কোথাও যেন একটু নোংরা না থাকে। শেশের ব্যাটম্যানটার স্বভাব ঐ রকম ছিলো, সে নোংরাগুলো পাঁচলের ওপার দিয়ে ছুঁড়ে ফেলতো। বাইরের ডাস্টবিনে ফেলার ব্যাপারটা ভুলেই গিয়েছিলো। ঐ জন্য লাথি মেরে তাকে হটিয়ে দিয়েছি।’ একনাগাড়ে কথাগুলো বলে চলে যেতে গিয়ে মেমসাহেব আবার ঘুরে দাঁড়ালেন।  ‘আর হ্যাঁ, এসব হয়েটয়ে গেলে ড্রয়িংরুমটা খুব ভালো করে ঝেড়েটেড়ে সব গোছগাছ করবে।  চারটের সময় ক’জন গেস্ট আসার কথা আছে।

–ওহ্ বলতে ভুলে গেছি।  হ্যাঁ, একবার স্টোর রুমে যাও আর যা সব লাগবে বের টের করে আনো। তুমি লিখতে জানো তো? জানো বৈকি? নইলে চাকরিটা পেলে কি করে?..যাই হোক, লিখে, যা বলছি সব একটা তালিকা করে নাও।  …তাড়াতাড়ি কর, একদমই দেরী না।  …আর গেষ্টদের জন্য আজকের চা টা তোমাকেই করতে হবে।  জানো তো ভালো করে চা করতে?’ মেম সাহেবের কথার তোড়ে শের আলির তখন ভেসে যাওয়ার অবস্থা।
দু’তিন দিনের মধ্যেই বকুনি টকুনি খেয়ে শের আলি বুঝে গেল তার ‘জব-চার্ট’ কি।  রান্না করা, বাসনপত্র মাজা-ধোওয়া, ঘর-দোর ঝাঁট দেওয়া, কাপড় কাঁচা, ইস্ত্রী করা, বাগান পরিষ্কার করা, বাচ্চা দু’টোর দেখা শোনা করা ইত্যাদি গৃহস্থালীর সব কাজই তাকে করতে হবে। এছাড়া বেগম সাহেবা তাকে তো প্রথম দিনেই সবক দিয়ে রেখেছে কি করে বাচ্চাদের দুধের বোতল দিতে হয়, ন্যাপকিন পরিষ্কার করতে হয়। সাহেব এবং বেগম সাহেবা প্রায় প্রত্যেকদিন বিকেলের পরে বেড়াতে যান।  আর এটা তখন তার ‘ডিউটি’ হয়ে যায় বাচ্চাদের ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখা, খাওয়ানো-দাওয়ানো এমন কি ঘুম পাড়ানোও।  অনেক রাত পর্যন্ত তাকে জেগে থাকতে হয় সাহেবরা না ফেরা পর্যন্ত।  কারণ গেট খোলা ও বন্ধ করার দায়িত্ব তারই।  যতক্ষণ পর্যন্ত সাহেব এবং বেগম সাহেব তাঁদের খাওয়া দাওয়া, খোশগল্প সেরে শোবার ঘরে না ঢুকবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কোয়ার্টারে গিয়ে শোবার পারমিশন তার নেই।
অল্পদিনের মধ্যেই শের আলি তার ফৌজি-জীবনের চাকরির সব নিয়ম কানুনে অভ্যস্ত হয়ে গেল।  তার ডিউটির প্রথম শর্তই হল ভালো ‘ব্যাটম্যান’ হওয়া এবং সে জন্য মনিব ও মনিব-পত্নীর সব হুকুম বাধ্য বান্দার মতো তামিল করা।
এইভাবেই সময় গড়াতে থাকলো।  শের আলির ‘প্রমোশন’ হল।  ক্যাপ্টেন সাহেবের আর্দালী থেকে সে মেজর সাহেবের আর্দালী হল।  বেশ কয়েক বছর পর আবারও প্রমোশন।  এবার মেজর সাহেবের কাছ থেকে ব্রিগেডিয়ার সাহেবের আর্দালীর পদে উত্তরণ।  তার অনেক বছরের চাকরির জীবনে এই ‘পোস্টিংটাই ছিল সবচেয়ে ভালো।
সে ছাড়া আরও দু’জন ‘ব্যাটম্যান’ ছিলো।  কাজকর্ম যা ছিলো সবই তিনজনের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিলো।  এই বাড়ির বেগম সাহেবা কোন কাজই করতেন না।  সকালে তাঁর সময়টা কাটতো ‘কফি পার্টি’র সঙ্গে এবং সন্ধ্যার পর ক্লাবে।  ফলে রান্নাঘর থেকে বাড়ি, বাগান সব কিছুই ‘ব্যাটম্যান’দের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিলো।
এরপর শের আলি একদিন শুনলো আবার তার ‘প্রমোশন’ হয়েছে।  ব্রিগেডিয়ার সাহেবের কাছ থেকে একবারে জেনারেল সাহেবের কাছে।  একজন ক্যাপ্টেন সঙ্গে তাকে জেনারেল বুব্বার আলির প্রাসাদোপম সুবিশাল বাংলোয় পাঠিয়ে দেওয়া হলো।
কেমন যেন এক আবেগের শিহরণ সে নিজের শরীরে অনুভব করছিলো।  যে কোন ব্যাটম্যানের জীবনে সবচেয়ে মর্যাদাকর পোস্টিং।  জেনারেল সাহেব যখন সত্যিই তার নিয়োগ অনুমোদন করলেন তখন তার বেশ আনন্দই হল।  এত বড় বাংলো, এত বড় সাহেব, এখানে সে থাকবে, ভাবতেই যেন তার কেমন লাগছিলো।  এরপর সে ক্যাপ্টেন সাহেবের সঙ্গে জেনারেল সাহেবের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এল তার নতুন কাজটি বুঝে নেওয়ার জন্য।
‘আমার সঙ্গে এস’, ক্যাপ্টেন সাহেব তাকে বললেন।
‘স্যার’, শের আলি তার বুটের গোড়ালী ঠুকে লম্বা স্যালুট ঠুকে ক্যাপ্টেন সাহেবকে অনুসরণ করে সুবিশাল বারান্দা দিয়ে এগিয়ে চললো।  ক্যাপ্টেন সাহেব বারান্দা পার হয়ে ক্রমশই বাংলোর দূরবর্তী এলাকার এগিয়ে চললেন।  সেখানে খোলা মাঠের মতো বাংলোর পেছনে এক বিশাল এলাকা তার চোখে পড়ল।  একদিকে দেখা গেল সারি সারি চাকর বাকরদের কোয়ার্টার, অন্য দিকে পেল্লায় দু’টো গাড়ি এবং গ্যারেজ।  এগুলোর পিছনে আবার ভারী মজবুত একটি আর্মি জীপ।  জেনারেল সাহেব যে সুদৃশ্য গাড়িটি ব্যবহার করেন সেটি সামনে এক কোনে দাঁড় করানো।
দ্বিতীয় গ্যারেজটির সামনে একজন সৈন্য তার এক পায়ের উপর আর একটি পা তুলে খাটিয়াতে বিশ্রাম নিচ্ছিলো।  তার হাতে বহু পুরনো একটি ইংরেজি ম্যাগাজিন ধরা, সম্ভবত সে ছবিগুলো দেখছিলো।  তার নাকটা মোটা এবং নাকের ফুটো দু’টোও তেমনি।  তার চোয়ালের হাড় দু’টো বেশ উচু এবং গাল দু’টো বসা।  মনে হচ্ছিল সে এমন একটা লোক যারা পৃথিবীর মধ্যে সবখানেই সব অবস্থাতেই ভালো থাকার ভান করে।  ক্যাপ্টেন সাহেবকে দেখামাত্রই বিদুৎগতিতে দাঁড়িয়ে দুই পা জোড় করে স্যালুট ঠুকলো।  তারপর মজার ভঙ্গিতে শের আলির দিকে তাকাল।
‘ভিতরে এস’ গ্যারেজের দরজা পেরিয়ে যেতে যেতে ক্যাপ্টেন সাহেব বললেন।
শের আলি সামনে এগুতে এগুতে গ্যারেজ পার হতে গিয়ে হঠাৎ আতঙ্কে লাফিয়ে পিছু হঠলো।  কারন সামনে লোহার হুঁকের সঙ্গে আটকানো চেন দিয়ে বাঁধা তিনটি ভয়ংকর ধরণের অতিকায় কুকুর।
শের আলিকে দেখামাত্রই তারা লাফালাফি আরম্ভ করে দিল।  একটা কুকুর গর্জন করতে করতে একবার সামনে একবার পেছনে নাচানাচি করতে লাগলো।  তার চকচকে চোখ আর লকলকে জিভ দেখে সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত বলেই মনে হলো শের আলির।  সে দাঁড়িয়ে পড়ল।   শের আলিকে পিছুতে দেখে ক্যাপ্টেন সাহেব তাকে আদেশের স্বরে ভারি গলায় ডাকলেন, ‘পেছনের দিকে যাবে না।  তোমাকে এদের জন্যই এখানে পোষ্টিং দেওয়া হয়েছে।  ’তারপর অন্য সৈন্যটির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘জামাল এ তোমার আন্ডারে দশ দিনের ট্রেনিং-এ থাকবে।  কি ভাবে কুকুরগুলোর দেখাশোনা করতে হবে সব তুমি তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে নেবে।  ‘আর তুমি’ শের আলিকে এবার তিনি বললেন, ‘সব কিছু ঠিকঠাক শিখে নেবে, কি করে এদের যত্ন-আত্তি করতে হয়, সব কিছু জানতে হবে তোমাকে।  এরা বহুমূল্যের কুকুর।  জেনারেল সাহেব এদের ভীষণ ভালোবাসেন।  জামাল কেবলমাত্র দশদিন তোমাকে শেখাবে, তারপর সব কিছু তোমার উপর নির্ভর করবে।  ক্যাপ্টেন সাহেব এভাবে তার নির্দেশ জানিয়ে চলে যাবার উপক্রম করতেই দু’জনেই সশঙ্কিত হয়ে তাঁকে স্যালুট করল।
এবার মীরজামাল কৌতুহলী দৃষ্টিতে এই আগন্তক সৈন্যটির দিকে তাকাল।  তারপর গ্যারেজের ভিতর দিয়ে গিয়ে সব চেয়ে বড় কুকুরটার পিঠে হাত রাখল।  তার হাতে তখন কালো রঙের মখমলের মত নরম ব্রাশ।  কুকুরগুলোকে তখন বেশ উত্তেজিত লাগছিলো।  তারা তার কাপড়ে ও হাতে নাক ঘষছিলো।  শের আলির তো তাদের কাছাকাছি হতে ভয় করছিলো।  তাদের হাঙরের মত হা আর লকলকে ভিজে লাল জিভ যে কোন লোকেরই আতঙ্কের জন্য যথেষ্ট।  নেকড়ের মত দেখতে ভয়ংকর কুকুরটা তার পেছনের পায়ে ভর করে লোকটির কাঁধে উঠার চেষ্টা করছিলো।  কুকুরগুলোর সাঁ সাঁ শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ গ্যারেজের গায়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।  তারা লকলকে জিভগুলো নাড়াচ্ছিলো আর লালা ঝরাচ্ছিলো।  হয়তো এ সবই তাদের আনন্দময় আবেগ প্রকাশের লক্ষণ।  ‘লে লো’ বলে জামাল কুকুরগুলোকে শের আলি দিকে এগিয়ে দিলো।
‘শোন, ডোভারম্যান, এই কুকুরটা খুব দামী।  একবারে খাঁটি জার্মান-বংশোদ্ভূত।  এই দেখ, এই ছোট নেজওয়ালা কুকুরটা; আর ওটা তো জার্মান শেফার্ড।  ওর বাবা মা দুজনকেই জার্মান থেকে আনা হয়েছিলো।  এটা খুবই খাঁটি এবং সম্ভ্রান্ত প্রজাতির কুকুর।  এর বাবা, মা উভয়ে আবার হল গিয়ে খাঁটি জার্মানী ও উচ্চ বংশজাত।  কখনই এদের মধ্যে কোন ক্রশ-ব্রেড হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো না।  আগের জেনারেল সাহেব আমাদের বর্তমান জেনারেল সাহেবকে এটা যখন দিয়ে যান, তখন তো এ একদম বাচ্চা।  হ্যাঁ, ঐ জেনারেল সাহেবের মেয়ের সঙ্গে আমাদের বর্তমান জেনারেল সাহেবের ছেলের বিয়ের কথাবার্তা চলছে।  তবে মনে রেখো এই প্রজাতির দামী কুকুর বাজারে খুব বেশি মেলে না।  লাখ লাখ টাকা দাম এদের।  রেস খেলানোর সময় এদের উপর মোটা টাকার বাজি ধরা হয়।  তোমাকে এ গুলোর উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে।  সব সময় বাইরের দরজা বন্ধ রাখবে, যাতে বেগানা কোন কুকুর-মর্দানা বা মর্দানী না ঢুকে পড়ে।  বাইরে যখন নিয়ে যাবে সব সময় দেশী কুত্তাদের কাছ থেকে এদের দূরে রাখবে।  এতটাই দূরে যাতে তাদের গায়ের কোন জীবানু এদের গায়ে না পড়ে।
ওই কুত্তা আর কুত্তিগুলো তো সব সময় সংক্রামক রোগ জীবানু নিয়ে ঘুরে বেড়ায় কি না।  আর একটা কথা প্রত্যেক দিন এদের দু’বার করে ব্যায়াম করাবে।  নইলে অলস হয়ে যাবে।  এদের সব সময় চনমনে আর টগবগে রাখা চায়।  প্রত্যেকদিন এদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ডাক্তার আসে এবং জেনারেল সাহেবের কাছে তার রিপোর্ট যায়।  অতএব খুব সাবধান।  তবে এদের রান্নার ব্যাপারটা আমি ঠিক জানি না।  আমি তো অস্থায়ীভাবে ডোবারম্যানের যায়গায় কাজ করছিলাম।  তোমাকে কিন্ত শিখে নিতে হবে এদের মাংস রান্নার আসল পদ্ধতিটা।  এদের জন্য হাতে গড়া রুটি খুব মোটা ধরণের হয়ে থাকে।
‘রান্নার জন্য কি আলাদা কোন ‘কুক’ নেই?’-শের আলি কিছুটা ভ্যাবাচাকা খেয়ে কথাটা জিজ্ঞাসা করে।  ‘আরে ‘কুক’ থাকবে না কেন? দু’দুটো কুক আছে এখানে।  কিন্ত তারা তো শুধু মানুষদের রান্না করে, কুকুরদের রান্না একটু আলাদা, অন্যভাবে করতে হয়।  তারা এসবও জানে বটে, কিন্ত করবে কেন?কুকুরগুলোর জন্যই তোমার পোষ্টিং ডোভারম্যান।  এদের রান্নার দায়িত্বও তোমার।  নয় কি? আমি তোমাকে অবশ্য এগুলোর গা ধোয়াবে কেমন করে, সেটা শিখিয়ে দেব।’
শের আলি কুকুরগুলোর দিকে ভয়ে ভয়ে তাকালো।  আর ওরা ভয়ের কারণও বটে।
ডোবার ম্যানের ঘাড় ও মাথা হালকা হলুদ রঙের, চোখ ও নাকের পাশগুলো কালো, আর পিছনের পা দু’টো একদম কুচকুচে কালো।  তার বড় ভাসা ভাসা চোখ দু’টো যেন তার অহংকারের প্রতীক।  তার ছিপছিপে চেহারা, শরীরের লোমগুলো মখমলের মতো তুলতুলে নরম ও মনোরম।  তার সরু বড় কান দু’টো সব সময় খাড়া হয়ে থাকে।  সব সময় বহুদূরের সামান্য আওয়াজও তার কানে এসে পৌঁচ্ছায়।  । সে শ্বাস প্রশ্বাসের সময় তার জিভটা যখন মুখের বাইরে করে, তখন তার সাদা দাঁতগুলো দেখা যায়।  ‘যে কোন মানুষের হাড়গোড় পর্যন্ত চিবিয়ে খাবার জন্য ও গুলোই যথেষ্ট’ শের আলি মনে মনে ভাবলো।  আর অন্য আর একটি কুকুর, যাকে মীরজামান জার্মান শেফার্ড বলছিলো,একদম দেখতে নেকড়ে বাঘের মত।  শের আলি তাদের গাঁয়ের কাছাকাছি চলে আসা অনেক নেকড়ে বাঘ দেখেছে, যেগুলোর সঙ্গে ওর কোনই তফাৎ নেই।
‘আর এই যে কুকুরটাকে দেখছ, এটার জন্ম নেকড়ে আর কুকুরের ‘ক্রশ’ থেকে।  এটাকে তুমি ভালো জাতের একটা কুকুর বলতে পারো’- মীরজামান গর্বভরে কথাগুলো বলল।  যেন এ সব কুকুরগুলোর মালিক সে নিজেই।
এই কুকুরটি ডোভারম্যানের থেকেও লম্বা, তবেই একই রকমের চওড়া বুক আর সরু কোমর এর।  এর চোখ দু’টো থেকেও অহঙ্কার ঝরে পড়ছে।  তবে তিন নম্বর কুকুরটাকে শের আলির ভালো লাগলো।  কুকুর যে দেখতে এত সুন্দর হতে পারে, সে কল্পনাও করে নি।  এ কুকুরটির উচ্চতাও ঐ কুকুর দু’টোর মতই, কিন্ত ওজনে অনেক হাল্কা।
দেখতে রুপোর মত সাদা রঙের, চিতাবাঘের মত বড় বড় উজ্বল কালো কালো ছোপ সারা গায়ে, সরু কোমর আর প্রশস্থ চাপা বুক।  এর লেজটা চাবুকের লম্বা এবং সরু, একদম ধবধবে সাদা।  তার উজ্বল বড় বড় গোল গোল চোখে যখন সে শের আলির দিকে তাকালো, তখন সে যেন তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে পড়ল।  শের আলির কুকুরটির দিকে বারবার তাকানো দেখে মীরজামাল বলল, ‘এর কুলজি বা বংশ পরিচয় খুব প্রাচীন। তিনশ বছরেরও আগের। যখন একে এখানে আনা হয়, তখন এর সঙ্গের বংশ-বিবরনী শংসাপত্রও ভালো ভাবে যাচাই করা হয়। এডিসি সাহেবের কাছে শংসাপত্র গুলো এখনও আছে। আমি একদিন তোমাকে ও সব গুলো দেখাবো।  স্পেনের শিকারী প্রজাতির কুকুরের সঙ্গে ডালকুত্তার সংমিশ্রণে এদের জন্ম। জেনারেল সাহেব শিকারে যাবার সময় একে সঙ্গে করে নিয়ে যান। এর মত ঘ্রান শক্তি অন্য কোন কুকুরের নেই। এক আরবের শেখ একে দু’লক্ষ টাকায় কিনতে চেয়েছিলো, কিন্ত আমরা দিইনি। একজিবিশনে গিয়ে অনেক ট্রফি এনেছে এটি। এর বংশপুঞ্জী…বংশপুঞ্জী এত’…বলতে গিয়ে জামাল থামলো একটু এবং শের আলির প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলো।  ‘এর মর্যাদা বুঝলে কিছু?’ শের আলি মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল, ‘না, একেবারেই এ সবের মানে সে বুঝতে পারছে না।’ ‘যাই হোক, তোমাকে আবার আরও ভালো করে বুঝাতে হবে দেখছি, মীরজামান একটুখানি বিরতি নিলো।
ওদের দেখতে ভয়ংকর লাগলেও আসলে কিন্ত ওরা তা নয়। তারা তাদের মনিবের জন্য জান পর্যন্ত দিয়ে দিতে পারে। এই যে জার্মান শেফার্ডটাকে দেখছ, এরা এমনই যে মনিব মারা গেলে খাওয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দেয় এবং প্রভুর জন্য শোকে শেষ পর্যন্ত প্রাণও বিসর্জন দেয়। তবুও এদের কিন্ত কখনই শিশুদের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া ঠিক নয়। কারণ যে কোন সময় তাদের স্বভাবে বন্য হিংস্রতা প্রকাশ পাওয়া কিছু মাত্র অস্বাভাবিক নয়। আগে রাতের বেলায় এদের চেন খুলে রাখা হত। একবার ডোভারম্যান খবরের কাগজ বিলি করা লোকটার ছেলের পা কামড়ে ধরে। সেই সময় চারজন উপস্থিত ছিলো বলে কোনক্রমে তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়। তাও বহু কষ্টে। পেটে চৌদ্দটা ইনজেক্সন সহ ছেলেটিকে বেশ কিছুদিন হাসপাতালের চিকিৎসায় থাকতে হয়। সেই থেকে এদের বেঁধে রাখা হয়। কেবলমাত্র সকাল-সন্ধ্যায় বের করে বাইরে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হয় । কিন্ত প্রত্যেকদিন তাদের দু’বার করে ব্যায়ামও করাতে হয়। না, ভয়ের কিছু নেই। তেমন খারাপ কিছু নয় এরা। এসো ভাই, কাছে এসো, আরও কাছে। প্রথমেই ডোভার ম্যানটার কাছে এসো। গায়ে হাত দাও।  ও: দূরে যাচ্ছ কেন? ওরা তোমাকে মেরে দেবে ভেবো না। ওরা দোস্ত-দূষমন ঠিক চিনে নেয়। দেখছো, ওরা কেমন নেজ নাড়ছে। বাইরের কেউ মনে করলে দেখতে ওদের অন্য রূপ, ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দিত। সেও থাকত না, তার দেহও থাকতো না। দেখতে কিছু হাড়গোড় রক্তে মাখামাখি হয়ে তালগোল পাকিয়ে পড়ে আছে। ..হ্যাঁ, ঠিক আছে আরও কাছে যাও, ওরা কাপড় টানবে, হাতে মুখ ঘষবে…’।  ‘কিন্ত আমি দিনে পাঁচবার নামাজ পড়ি। আমার কাপড় চোপড় সব নাপাক হয়ে যাবে যে।’
‘হ্যাঁ, নামাজও পড় এবং নিজের কাজও কর। তুমি কি একাই নামাজ পড় নাকি? আমিও তো নামাজ পড়ি। তবে সকালে ও রাতে পড়ি। ঐ দেখগে গ্যারেজের সামনের দেওয়ালে টাঙ্গানো নামাজ পড়ার জন্য আমার আলাদা কাপড় রাখা আছে। ‘ডিউটি’ শেষে পাকসাফ হয়ে নামাজ পড়ি।’  শের আলি সামনের দেওয়ালে তাকিয়ে দেখলো যে, পেরেকে ঝুলানো রয়েছে এক জোড়া কাপড়।
‘তোমার কোয়ার্টার কোথায়?’ শের আলি জিজ্ঞাসা করলো এবং তাকিয়ে দেখলো দূরে দেওয়াল ঘেঁষে একটি দড়ির খাটিয়া পাতা আছে।
‘আমার ট্রাঙ্কটা আছে বাবুর্চির ঘরে। অন্য চাকররা কোয়ার্টারে থাকে। কোয়ার্টারের ঘর ফাঁকাও আছে। কিন্ত কুকুরের চাকরকে তো কুকুরের কাছাকাছি থাকতেই হবে। সব সময় তাদের উপর লক্ষ্য রাখতে হবে। নাহলে তো বিপত্তি। সাহেবের কাছে রিপোর্ট গেলে লাথি মেরে তো তাড়াবেই, চাকরি রাখাও দায় হবে। …তোমার ট্রাঙ্কটাও ওখানে রাখবে। বাবুর্চি মেহেরগুল খুবই ভালো লোক। ওর সঙ্গে দোস্তি রাখবে, দেখবে সকাল সন্ধ্যায় দু’বেলা চা-ও পেয়ে যাবে।’
‘কিন্ত আমার আহারের ব্যাপারটা?’
‘চাকরদের জন্য আলাদা সবজি-রুটি হয়। তুমি মেসে গিয়েও খেয়ে আসতে পারো। তবে তোমার ফুড-অ্যালাউন্স’ কাটা যাবে। তুমি তো আর নতুন নও। জানো তো সবই।’
‘সেটা সব সময় হয় না। এর আগে তো আমি ব্রিগেডিয়ার সাহেবের বাংলোয় ছিলাম। আমরা চারজন ব্যাটম্যানই খেতে পেতাম। আর সাহেব এবং বেগম সাহেবা প্রায়ই বাইরে খেতেন। আমরা কিচেনে কি করছি, কি রান্না করছি বেগম সাহেবা কোন দিন তার খোঁজ নিতেন না।
‘বাদ দাও ওনাদের কথা। ওনারা ঐ রকম ছিলেন বলে সবাই তা হবে মানে নেই। আর তাছাড়া এখানে ‘সার্ভেন্ট-জবে’ সাত সাতজন আছে। পাতলা সব্জী আর তন্দুরের রুটি মিলে এখানে। ঐ ঢের বলে খাও আর মালিককে ধন্যবাদ দাও।’
‘আর ওরা?’ শের আলি আঙ্গুল দিয়ে কুকুরগুলোর দিকে ইংগির করলো।
‘ওরা?’ মীরজামান ‘ওরা’ শব্দটির উপর জোর দিয়ে মুচকি হাসলো। আরে ‘ওরা’ তো রাজপুত্তুর। ওদের বংশমর্যাদা, আভিজাত্য সবই তো শুনেছো।  প্রত্যেকদিন ওদের এক একজনের জন্য পাঁচ কিলো করে মুরগীর মাংস রান্না হয়। তাছাড়া ওদের প্রত্যেকটির জন্য দেড় লিটার করে দুধ বরাদ্দ আছে। ওদের রুটিও খুব পরিপাটি করে বানাতে হয়। আর বিদেশ থেকে ওদের জন্য বিশেষ ধরণের বিস্কুট আসে। ঐ যে টিনগুলোর দিকে তাকাও। কি লেখা আছে? ইংরেজিতে ‘স্পেশাল বিস্কুট, ডগস ফুড।’
তারপর মীরজামান ওর দিকে চেয়ে একটু মুচকি হাসল, ‘ভাই, পরের জন্মে যদি ব্যাটম্যান না হয়ে ডোভারম্যান হয়ে জন্মাতে পারো তাহলে তুমি ঐ রকম বাদশাহী খানা পাবে।’
‘ঠিক আছে ভাই, ঠিক আছে। আমি অন্য সাহেবদের আন্ডারেও কাজ করেছি। তাঁদেরও কুকুর আছে। কিন্ত আমাকে কখনও কুকুরদের দেখাশোনা করতে হয় নি। ..এখন আমাকে আমার কোয়ার্টারটা একটু দেখিয়ে দাও তো। খুব ক্লান্ত, একটু শোব। ..হলফ করে বলছি এর আগে জন্ত্তর মত এই ধরণের সব কুকুরও আমি দেখেনি। ..গ্যারেজের দরজা বন্ধ করে শোবো তো? নইলে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকবে। আর ওগুলো কি রাতে ঘেউ ঘেউ করে চেঁচায়?’
‘অর্ধেকটা বন্ধ রাখবে’, মীরজামান বলল ‘নইলে এদের তাজা বাতাসের অভাব হবে। আর ঘেউ ঘেউ করার কথা বলছো? সে তো ওরা করবেই। ডোভারম্যান বলে কি ও ইংরেজী ভাষায় ডাকবে। আরে এক্ষেত্রে ওদের ডাক একই, সে দেশী হোক বা ডোভারম্যান হোক। শুধু শুনতে একটু অন্য রকম লাগে এই যা। তবে শীতকালে তারা ভিতরের দিকে চলে যায়, এখানে থাকে না। সকালে নিয়ে আসতে হয় এখানে রোদ খাওয়ানোর জন্য। তবে গ্রীষ্মকালের জন্য অন্য ব্যবস্থা আছে। তখন তাদের এয়ার-কন্ডিশন’ ঘরে রাখা হয়।’
‘এয়ার কন্ডিশন?’ শের আলি চমকে উঠলো।
‘হ্যাঁ, এয়ার কন্ডিশন। ওরা শীত প্রধান দেশের প্রাণী কিনা; বেশি গরম ওদের সহ্য হয় না।’
‘আমরা তো মরুভূমি থেকে আসিনি। তবুও আমাদের সব সহ্য হয়।’
‘আরে ভাই, ব্যাটম্যানদের জীবন তো ঐ রকম ‘শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা’ সব নিয়ে থাকা। ব্যাঙের আবার সর্দি!’
মীরজামানের ব্যাঙ্গোক্তিতে শের আলি একটু আহত হলেও সেই থেকে শুরু হয়ে গেল তার আর এক জীবন। মানুষের ব্যাটম্যান থেকে কুকুরের ব্যাটম্যান। শুক্রবার শের আলি মসজিদ গিয়েছিলো,জুম্মার নামাজ পড়ার জন্য। মৌলানা সাহেব তখন ‘মিম্বরে’(ইমামের নামাজ পড়াবার ডানপাশে সিঁড়ির মত তিনটি ধাপ) দাঁড়িয়ে খুতবা (ভক্তদের উদ্দেশ্যে ধর্মীয় উপদেশ)শুরু করে দিয়েছেন। শের আলি ‘অজু’ করে লম্বা সারিগুলোর বসে থাকা মুসল্লীদের মধ্যে এক জায়গায় বসে পড়ল।
এই শুক্রবারের জন্য সে সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করে। জামা কাপড় থেকে কুকুরের দাগটাগ সব ধুয়ে ভালোভাবে গোসল সেরে সে মসজিদের দিকে পা বাড়ায়। অনেক লোক দেখা এবং অনেক জ্ঞানের কথা শোনার সৌভাগ্য তার এ দিনটিতেই হয়।
আজও সে অনান্য নামাজীদের সঙ্গে মৌলভী সাহেবের মুখ থেকে ভালো ভালো কথা শোনার জন্য ভক্তি ভরে মাথা নীচু করে বসে আছে। যদিও এই সময়টা সে নামাজের জন্য কিছুক্ষণ বাইরে থাকে তবুও নিরুদ্বিগ্ন থাকতে পারে না ঐ কুকুরগুলোর জন্য। তবুও সব সময় কুকুরদের সঙ্গে থেকে থেকে মনের উপর পড়ে থাকা দাগ আর গ্লানি মোছার জন্য এটাই তার প্রকৃষ্ট সময়।
মৌলভী সাহেব রাজাবাজারের রাস্তা দিয়ে মসজিদে আসছিলেন। কিন্ত আজ মসজিদে ঢোকার আগেই একটা বিপর্যয় ঘটে গেছে। কয়েকটি চালু দোকানের সামনে একটি ‘সুজুকি গাড়ি’ তখনও পার্কিং করা ছিল। কিছুক্ষণ আগেই সেখানে একটি বিস্ফোরণ ঘটে। বেশ কয়েকটি মানুষের রক্তাক্ত দেহাবশেষ চারদিকে ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সেই রক্তাক্ত পথ দিয়ে আসতে গিয়ে মৌলভী সাহেবের পেশোয়ারী স্যান্ডেলের তলায় বেশ খানিকটা জমাট রক্তের দাগ লেগে যায়। অনেকক্ষণ ধরে ঘষেও সে দাগ সম্পূর্ণ মোছা যায় নি। মানুষের রক্ত পশুর থেকেও আঠালো।
আজ তাই বক্তৃতার সময় মৌলভী সাহেবকে খুবই উত্তেজনাপূর্ণ দেখাচ্ছিল। ‘ভেবে দেখ মুসলমান ভাইসব, ভালো করে ভেবে দেখ, যে মানুষ-সম্প্রদায়কে আল্লাহ ‘আশরাফুল মখলুকাত’(সৃষ্টির সেরা) করে সৃষ্টি করেছেন তাদের কার্যকলাপ ভেবে দেখ।’
‘তিনি কি বলছেন?’ শের আলি তার পাশে একজন মানুষকে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল, ‘আমি খুব একটা শিক্ষিত নই তো।’
‘আশরাফুল মখলুকাত।’
‘আশরাফ মফলুক?’
‘মফলুক নয়, মখলুকাত।’
‘মানে কি?’
‘অন্যান্য সমস্ত জীবদের থেকে সেরা অর্থাৎ সর্বসেরা বা সর্বশ্রেষ্ঠ।’
‘ঠিক আছে বুঝেছি। কিন্ত সর্বসেরা বলতে কাদের নাম করা হচ্ছে?’
তাদের এই অনবরত ফিসফিসানীর জন্য পাশের লোকটি বিরক্ত হয়। ইঙ্গিতে তাকে চুপ করতে বলে লোকটি মৌলভী সাহেবের বক্তৃতার দিকে কান দিল বলে।
শের আলির এইভাবে কুকুরদের সেবা-যত্নের কাজে চার মাস কেটে গেল। সে নভেম্বরের গোড়ার দিকে যখন এখানে এসেছিলো তখন শীত কেবল পড়ব পড়ব করছে। এখন সত্যিই আসল শীত কাকে বলে বোঝা যাচ্ছে।
উত্তর পাকিস্তানে ফেব্রুয়ারি মাসই সবচেয়ে বেশি ঠাণ্ডা। মারীর পাহাড়ি উপত্যকা এই সময় বরফে ঢেকে যায়। কনকনে হাড়-কাঁপানো ঠাণ্ড। আধখোলা গ্যারেজের দরজা দিয়ে রাতে এমন ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকে যে শের আলির শরীর জমে যাওয়ার জোগাড়। কারণ বিছাবার জন্য ও গায়ে দেওয়ার জন্য সে রকম মোটা কম্বল তাকে দেওয়া হয় নি। আর শীতের দেশের এই জন্ত্তগুলো বেশ মজে করে এক রকম সারা রাতই জেগে থাকে। আর দিনের মিষ্টি রোদে আরাম করে ঝিমোয়। রাতে যদিও তারা কখনও ঘুমোয়, সে যৎসামন্য। আর দূরের কোন কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ শুনলে এদের উৎসাহ দেখে কে? এরা তারস্বরে সমানভাবে চিৎকার শুরু করে দেয়। আর সঙ্গে সঙ্গেই শের আলির ঘুমের দফা রফা হয়ে যায়। শীত পোশাক ও ভারী কম্বলের অভাবে কনকনে ঠাণ্ডায় সে সারারাত প্রায় কাঁপতে থাকে।
‘এর বেশি দিন আর শীতের কাঁপন তোমাকে সহ্য করতে হবে না। এখানে কুকুরদের ব্যাটম্যানদের জন্য নির্ধারিত যে রকম কম্বল টম্বল থাকে সে সব তো তুমি পেয়েছ? প্রথম প্রথম ওতে শীত কাটতে না চাইলেও দেখবে ধীরে ধীরে কেমন অভ্যাস হয়ে যাবে।’  মীরজামান এসে তাকে সান্ত্বনা দেয়।
শের আলি ভাবে, মীরজামান হয়তো ঠিকই বলেছে। শরীরের কোন স্থান অসাড় হয়ে গেলে তখন সেখানে চিমটি কাটলেও ব্যথা লাগে না। কিন্ত কুকুরগুলো যতই বড় বংশের কুকুর হোক না কেন, স্বভাব কিন্ত একই। বহুদূরের কোন দেশী মাদী কুকুরের সামান্য চিৎকারও এদের সুঁচালো কান সঙ্গে সঙ্গে খাড়া হয়ে উঠে। আর তারস্বরে চিৎকার ও দাপাদাপি করে তার জবাব দেয়। তখন ঘুমহীন চোখে সে শুধু কাঁপে আর সাত পাঁচ কথা মনে এসে ভীড় করে। মুন্নুওয়ারীর সঙ্গে তার শাদীর কথাবার্তা হওয়ার পর একদিন হঠাৎ রাস্তায় চোখাচোখি। আর সঙ্গে সঙ্গে সে পাশের গাছগুলোর পেছনে গিয়ে লুকোয়। শের আলি একটু মজা করার জন্য গাছগুলোর দিকে এগুতেই মুন্নুওয়ারী অস্ফুট চিৎকার করে দোপাট্টায় মুখ ঢেকে আরও ভিতরের গাছগুলোর আড়ালে ক্রমশই সরে যেতে থাকে। আর তাতেই বেশ মজা পেয়ে শের আলি সারা রাস্তা হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরে।
এই চাকরীতে সামান্য ছুটিছাটা পেলেই সে বাড়ি যায়। তার ঘরের জেনানার সঙ্গে বছরে ক’দিনই বা তার মেলামেশার সুযোগ হয়? তবুও কিন্ত সে অনেকগুলো সন্তানের জনক এখন। তাদের কারও কারও অসুখ বিসুখের খবর পেলে কিংবা কেউ স্কুল যেতে না চাইলে শের আলির আক্ষেপ করা ছাড়া কিছু করার থাকে না।
যেদিন থেকে সে আর্মিতে জয়েন করেছে সেদিন থেকেই তার পারিবারিক জীবনের দফারফা হয়ে গিয়েছে। অফিসারদের কাছে ছুটি চাইতে গেলেই তাদের মেজাজ বিগড়ে যায়। সে তার পরিবারের জন্য সময় দিতে পারে না, শুধু মাসের প্রথমে ‘মানি-অর্ডার করে টাকা পাঠাতে পারে। তা সে করে। নিজের জন্য বিশেষ কিছু রাখে না।
তাতেই তার তৃপ্তি। কিন্ত বাড়ি থেকে একটি চিঠি এসেছে যে, তার মা খুব অসুস্থ। তাদের অজ পাড়াগাঁ। তেমন ডাক্তার নেই। গরুর গাড়ি করে কিংবা ডুলিতে চাপিয়ে দূরের শহরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়। কিন্ত কে নিয়ে যাবে তার মাকে? আব্বা নেই। সেই একমাত্র সন্তান। সে মীরজামানকে গিয়ে ধরলো কি ভাবে ছুটি মিলবে?
‘ছুটি? এখান থেকে?’ মীরজামান যেন নতুন কিছু শুনছে এমনিই মনে হল।  ‘শুন ভাইটি আমার, এখানে ছুটি পাওয়া সহজ নয়?’ আমার আব্বা মরাতেও আমি ছুটি জোগাড় করতে পারি নি। নিজের মনে কাঁদতে পেরেছি। আমি বলতে পারবো না এই বাংলোর আদার্লীদের ভাগ্যে ক’দিন ছুটি জুটে। আর কুকুর-ওয়ালা হলে তো কথাই নেই। তুমিই বল, কুকুরদের ‘ব্যাটম্যান’যদি বাইরে থাকে, তার জায়গায় কে ডিউটি করবে বল? জেনারেল সাহেব কি? ছুটির কথা ভুলে যাও দোস্ত।’
সে তখন কাতরভাবে বাড়িতে একটি খত পাঠিয়েছিলো, অনেক চেষ্টা করেও সে ছুটি জোগাড় করতে পারে নি। তারপরও তো অনেক দিন হয়ে গেল বাড়ি থেকে কোন চিঠি আসে নি। সে জানে না সত্যিই তার মা বেঁচে আছে কিনা!
একদিন সকালে উঠে সে অনুভব করল,তার সর্দি-জ্বর হয়েছে। নাক দিয়ে জল পড়ছে, চোখ দু’টো করমচা ফুলের মত লাল হয়ে উঠেছে। মাথা ভার, সারা শরীরে অসহ্য কামড়ানি ব্যথা। পর পর দু’কাপ গরম চা ও দু’টো ‘অ্যাসপিরিন’ খেয়ে শরীরটা সামান্য ভালো মনে হল। সে কুকুগুলোকে বাইরে ‘মর্নিংওয়াক’ করাতে বের হল। তার মনে হল, এটা সামান্য জ্বর। আগামী কালের মধ্যে অনেকটাই ভালো হয়ে যেতে পারবে। কিন্ত রাতে তার শরীরের অবস্থা খারাপ হল এবং সেই সঙ্গে জ্বরও বেড়ে গেল। সারা রাত ধরে কাঁপুনি চললো। আর উত্তরের কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস গ্যারেজের দরজা দিয়ে ঢুকে তার অবস্থা আরও কাহিল করে তুললো।
তবে এক সময় সকালও হল। রোদও উঠল। কিন্ত তার নিজেকে আজ খুব দুর্বল বলে মনে হতে লাগল। তবুও সে আস্তে আস্তে তার রুটিন কাজকর্মগুলি চালিয়ে নেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকল। সে গ্যারেজ পরিষ্কার করল, কুকুরগুলোর খাবারের পাত্রগুলোও ধুয়েটুয়ে পরিষ্কার করল। তারপর ওদের ‘মর্নিংওয়াক’ করাতে বের হল। কিন্ত কোনক্রমে ফিরে এসে সে আর পারলো না। বিছানায় এলিয়ে পড়ল। তার অবস্থা দেখে বাবুর্চি মেহেরগুলের দয়া হল। সে বলল ‘কুকুরদের খাবার আজ আর তোমাকে রান্না করতে হবে না। আমিই করে দেব।’  সে তাকে তার নিজের কাছে রাখা জ্বরের ট্যাবলেটও খেতে দিল। বলল, ‘তোমাকে আমি গরম গরম চাও করে দেব। চিন্তা করো না।’
কিন্ত খালি পেটে ট্যাবলেট খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বমি হবে সব উঠে গেল।
‘শের আলি ভাইয়া, আজ রাতে তুমি আমার ঘরে এসে শোবে। গ্যারেজে ভীষণ ঠাণ্ডা, থাকতে পারবে না ঐ অসুস্থ শরীরে। কাল আমি তোমাকে ‘ডিসপেন্সারি’তে নিয়ে যাব।’ সন্ধ্যার সময় মেহেরগুল এসে তাকে বলল।
‘না, না, ঠিকই আছে। রাতটা আমি এখানেই কাটাতে পারব। কুকুরগুলোর জন্য তো কাউকে না না কাউকে এসে এখানে শুতেই হবে। সে আমি যাই হোক একরকম করে চালিয়ে নেব। কাল সকালে ছুটির জন্য দরখাস্ত করব। আমাকে একবার বাড়ি যেতেই হবে। কোন খবর পাইনি। মা বেঁচে আছে কি না।’
পরের দিন সকালে সূর্য ভালভাবে উঠলে সে কুকুরগুলোকে রোদে বের করে আনলো। তারপর বহুকষ্টে তার দড়ির খাটটি রোদে টেনে এনে শুয়ে পড়ল। সে আজ কুকুরগুলোকে নিয়ে রাস্তায় বের হতে পারলো না। তার নিজেকে ভীষণ দুর্বল মনে হচ্ছিল।
চড়া রোদ।  হাই ফেভার আর ডিসপেন্সারির ওষুধ খেয়ে কম্বল গায়ে সে ভালো ভাবেই ঘুমিয়ে পড়ল। ‘জেনারেল সাহেব আসছেন, জেনারেল সাহেব আসছেন’ বলে একজন আর্দালী এসে তাকে ধাক্কা মেরে ঘুম থেকে তুললো। সে আতঙ্কে তড়াক করে লাফিয়ে উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়তে যাচ্ছিল। পাশের আর্দালীটি কোনক্রমে সামাল দিল। তার বিছানা গুটিয়ে এক পাশে রেখে দিল। জেনারেল সাহেব আসছেন কুকুরগুলোকে দেখার জন্য। তাঁর সঙ্গে থাকবেন আর একজন জেনারেল যিনি তাঁকে জার্মান শের্ফাডটাকে বাচ্চা অবস্থায় উপহার দিয়েছিলেন। শের আলি শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে খাটিয়াটিকে টেনে গাছগুলোর আড়ালে লুকিয়ে দিল। যেন সে সম্পূর্ণ সুস্থ আছে এমন ভান করে ‘অ্যাটেনসন’ নিয়ে তৈরি হয়ে কুকুরগুলোর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো।
দুই জেনারেলই একই রকম লম্বা, তাদের ঘাড় ও গলা একই রকম। জ্বরের ঘোরে শের আলির চোখে যেন ঝলক খেলে গেল। সে চোখের সামনে বড় সড় বুলডগটিকে একবার দেখছে, পরক্ষণেই দেখছে জেনারেল বুব্বার আলিকে। সে কিছুতেই স্থির করতে পারছে না সঙ্গের অন্য জেনারেল সাহেবের চেহারার মিল রয়েছে কার সঙ্গে। অন্য কার সঙ্গে তারও নিশ্চয়ই চেহারার মিল খুঁজে পাওয়া যাবে, কিন্ত শের আলি ঠিক বুঝতে পারছে না।  বলা হয়ে থাকে যে মনের কোন কোন অবস্থায় বিশেষ করে সিদ্ধ পুরুষদের ক্ষেত্রে তাঁদের চোখ কোন মানুষের উপর পড়লেই সেই মানুষের সঙ্গে কোন না কোন জন্তুর সাদৃশ্য তার মুখাবয়বের মধ্যে ফুটে উঠে।
কাউকে দেখে তাঁদের খুব মজা লেগেছে মনে হয়।  উচ্চস্বরে হাসিতে ফেটে পড়ছেন তারা। জেনারেলদের মধ্যে একজন অন্য জেনারেলের পিঠে চাপড় মারলেন সেটা কিন্ত শের আলি স্পষ্ট বুঝতে পারল। ‘আল্লাহ্ ওঁদের উপর দয়াবান, তাই এত সুখ ওঁদের’, মনে মনে ভেবে নিল সে।
তাঁরা উভয়েই ইংরেজিতে কথাবার্তা বলছিলেন। যদিও শের আলি সারাক্ষণই সুস্থ শরীরে একজন সৈন্যের মতো স্যালুটের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিল, তাঁরা কিন্ত একবারও তাকে লক্ষ্য করলেন না। তাঁরা মদের ঘোরে ছিলেন। তাঁদের লালচোখ থেকে স্নেহ ঠিকরে পাড়ছিল কুকুরগুলো জন্য, কুকুরওয়ালা ব্যাটম্যানের দিকে তাকাবার মতো সময় কোথায়?
জেনারেল বুব্বার আলি জার্মান শেফার্ডের দিকে হাত বাড়িয়ে আদর করলেন, সে তার লকলকে জিভ বের করে প্রভূর হাত চেঁটে এবং লেজ নেড়ে কৃতজ্ঞতা জানালো। তাঁরা উভয়ে খুশীতে গদগদ হয়ে নিজেদের মধ্যে অনর্গল ইংরেজিতে কথাবার্তা বলছিলেন। শের আলি সে সবের এক বর্ণও বুঝল না। তবে একজনের মুখে ‘ওয়ান লাখ’ কথাটা সে বুঝতে পারল। তা থেকে অনুমান করলো হয়তো ঐ কুকুরগুলোর কোন একটিকে এক লাখ টাকা দামে কেনার খদ্দের আছে কিংবা ওর বাজার মূল্য এখন এক লাখ টাকাও ছাড়িয়ে গিয়েছে বলে গর্ব করছেন সাহেবরা।
তারপর হঠাৎ করে জেনারেল বুব্বার আলির চোখ পড়ল ডোবারম্যান শের আলির দিকে, ‘ওদের প্রত্যেকদিন মর্নিংওয়াক করানো হয়?’
‘স্যার’ স্যালুট ঠুকে শের আলি উত্তর দিল।
‘ঠিক মতো স্নান করানো?’
‘স্যার’ শের আলির ‘অ্যাটেনশন’-এ কোনরূপ ক্রটি ধরা পড়ে না।
‘মাংস ঠিক মতো রান্না করে খাওয়ানো হয়?’
‘হ্যাঁ, স্যার’ বলতে বলতে শের আলির গলা বুজে এলো, হ্যাঁচচো করে সিঁক উঠলো।
পাশের আদার্লীর দিকে সপ্রশ্ন চোখ ফেরালেন জেনারেল সাহেব।
‘স্যার ওর জ্বর হয়েছে। হঠাৎ করে ফ্লু-জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে স্যার’ আদার্লী চটপট উত্তর দিল।
‘কোথায় শুয়ে থাকে?’
‘গ্যারেজে স্যার, কুকুরগুলোর সঙ্গেই।’
‘হুম’ বলে জেনারেল বুব্বার আলি থামলেন একটু।
‘কিন্তু এটা ঠিক নয়।’ অন্য জেনারেলটি মন্তব্য করলেন, ‘ফ্লু’তো জীবানু ঘটিত রোগ। ঐ রোগ নিয়ে ওখানে শোওয়া ওর উচিত নয়। দামী ডগগুলো যে কোন সময় আক্রান্ত হতে পারে।’
‘ঠিক। তুমি কুকুরদের সঙ্গে শোবে না।’
জেনারেল বুব্বার আলি নির্দেশ দিলেন শের আলিকে। শেফার্ডের জেনারেল সাহেব এবার মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললেন, ‘এই লোক গুলো’…সাংঘাতিক কথাটি অনুচ্চারিত হলেও সেটা বোঝা গেল শের আলির দিকে তাঁর লাল চোখের ক্রদ্ধ চাহনি থেকে।
শের আলির হাঁটু দু’টোর কাঁপুনি বেড়ে গেল, তার পাগুলো যেন ক্রমশঃ মাটিতে সিঁধিয়ে যাচ্ছে বলে তার মনে হল। দুই জেনারেল সাহেবই যে তার উপর ভীষণ রেগে গেছেন বোঝার মতো বোধশক্তি তখনও তার ছিল। তার এতদিনের চাকরির জীবনে এমনটা কখনও ঘটেনি। লজ্জায় তার মরে যেতে ইচ্ছে হল। সে আর একবার ভাবলো জেনারেল সাহেবদের কাছে এখুনিই ক্ষমা প্রার্থনা করা তার প্রয়োজন। কিন্ত তার ঠোঁট এমন ভাবে সেঁটে গিয়েছিল যে সে কিছুই বলতে পারলো না। অসহায়ভাবে শুধু শেফার্ডের জেনারেল সাহেবের বাদামী রঙের জুতোর শুকতলা থেকে বের হওয়া কুচি খড়ের দিকে চেয়ে থাকল।
‘তুমি ঐ বারান্দায় শুয়ে কুকুরগুলোর দিকে নজর রাখবে।’  স্পষ্ট বিরক্তি এবার ঝড়ে পড়ল জেনারেল বুব্বার আলির কণ্ঠে। ‘তুমি ওষুধ জোগার করে খেয়ে নেবে।  নইলে কুকুরগুলো তোমার মত লোকদের সংস্পর্শে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে’।
শের আলি জেনারেল সাহেবদের চলে যাওয়ার দিকে লক্ষ্য করল,প্রতি পদক্ষেপে যেন গর্ব ঠিকরে পড়ছে। তারপর সে কুকুরগুলোর দিকে চাইলো। তারাও যেন গর্বিত চোখে তার দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছে।
সে খুব আস্তে আস্তে তার লুকানো খাটটির দিকে এগুতে থাকল। তার মাথা যতই ভার হয়ে থাক, চিন্তাশূন্য তো নয়। হঠাৎ একটা চিন্তা তার মাথায় এসে ঢুকলো, যার মানে সে সেদিন পাশে বসা সহ-নামাজীর কাছে জানতে চেয়েও সঠিক উত্তর পায়নি… আশরাফ কি অর্থাৎ আশরাফ বলতে কি বোঝায় সেটাই সে সেদিন জানতে চেয়েছিল…। কিন্ত এখন সে এর মানে একটু একটু বুঝলো। ‘আশরাফ’ মানে সেরা। জেনারেল সাহেবরা সেরা, কুকুরগুলোও সেরা। কিন্ত সে নিজে এ সবের কিছু নয়।
সেই রাতে শের আলি বারান্দায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। বারান্দাটা বাড়ির পিছনে, গ্যারেজের মুখোমুখি। এর তিন দিক খোলা। একটা গেষ্টরুমের বারান্দা এটি। এখন রিপেয়ারিং-এর জন্য গেষ্টরুমের বড় দরজাটি খোলা, ওপাশের জানলাও খোলা।
সে ডিসপেন্সারী থেকে পাওয়া দু’টো ট্যাবলেট এবং গরম চা খেয়েছিল গত রাতে। কিন্ত সারা রাত সে তার খাটে অর্ধ-চৈতন্য অবস্থায় পড়ে থাকলো। তার পা দু’টো এত ভারী ঠেকলো যেন এগুলো তার না। সকালে তার জন্য এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে মেহেরগুল দেখলো, সে বেভুল হয়ে ঘুমিয়ে আছে।  কাজেই দুধের গ্লাসটা সে ফিরিয়ে নিয়ে গেল।
দু’দিন পর মেহেরগুল বলল, ‘দেখ ভাই, তুমি এখনও পর্যন্ত কিছু খাও নি। নড়াচড়াও তেমন করতে পারছো না। আজ থেকে আমার ঘরে গিয়ে ঘুমুবে। আমি তোমাকে বড় হাসপাতালে সি এম এইচে নিয়ে যাবো।
আজ রাতে আকাশ কালো মেঘে ঘোর হয়ে আছে। একটু আগে বিদ্যুৎ চমক দেখলাম। খুব বাজে ধরণের বৃষ্টিপাত হতে পারে। চল,আজ তুমি আমার ঘরে গিয়ে শোবে। ছোট ঘর, তবুও দু’জনের কোনক্রমে থাকা যাবে। গেটম্যান নাজির এসে এভাবেই তাকে সমবেদনা জানালো।
‘মানুষের রোগ হলে তার জীবানু গিয়ে কুকুরদের আক্রান্ত করে কস্মিনকালেও এমনটা শুনিনি’ আর একজন ব্যাটম্যান আলম খান কথাগুলো বলল।  ‘এই জেনারেল সাহেবরা তখন যে অবস্থায় ছিলেন তখন ঐ রকমটা তাদের মনে হয়েছিল। আল্লাহর কাছে মিনতি, ওদের যেন সুবুদ্ধি দেন।’
‘খুব সাবধান। কথা বার্তা সমঝিয়ে বল। নাহলে তুমি তো বটেই, আমাদের সকলের শীর্ষ কোর্টে কোর্টমার্শেল হয়ে যাবে’, মেহেরগুল আলম খানকে সতর্ক করলো।
‘এই শের আলি আজকের রাতে চল আমাদের যে কোন একজনে ঘরে। নইলে চারদিকের হু হু বাতাসে তুমি মারা পড়বে নির্ঘাত’ তবু আলম খান বলল কথাগুলি।  ‘এত জ্বরে এই ফাঁকা মাঠে কেউ কি শোয়!’ সহানুভূতি ঝরে পড়লো আলম খানের কন্ঠে।
‘না, আমাকে এখানেই থাকার অর্ডার হয়েছে উপর থেকে। এটা যা তা ব্যাপার নয়। কুকুরগুলোকে তো দেখতে হবে, সেজন্যই আমাকে মাইনে দেওয়া হয়।’ খুব কষ্টের সঙ্গে আস্তে আস্তে টেনে টেনে কথাগুলো বলে চলল শের আলি; ‘ডিসপেন্সারির ওষুধ আছে, গায়ে দেওয়ার কম্বল আছে। আল্লার ফজলে রাত কেটে যাবেই। কাল হাসপাতালে ভর্তি হব। সাতদিনের মেডিকেল লীভের দরখাস্ত লিখে দিবে, আমি সই করবো। এখন তোমরা গিয়ে নিজের নিজের বিছানায় শুয়ে পড়। আমার জন্য তোমাদের এত ভাবা ঠিক নয়।’
শের আলি গরম কোর্ট গায়ে দিয়ে কম্বল জড়িয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢেকে শুয়ে থাকলো। কিন্ত রাতে জ্বর আরও বেড়ে গেল। যন্ত্রনায় মাথা যেন ফেটে যাবে মনে হল। ঠক ঠক করে কাঁপতে থাকলো সে। সারা শরীর যেন কামড়াচ্ছে, ব্যথায় দুমড়িয়ে মুচকিয়ে যাচ্ছে। সে কোনক্রমে মুখ থেকে কম্বলটা একটু সরিয়ে তাকিয়ে দেখলো সামনে সারি সারি আদার্লী কোয়ার্টারের দিকে। সব ঘরের লাইট নিভে গিয়েছে। কারও নাক ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে।  সেই সঙ্গে ঝড়ো বাতাসের শব্দও বাড়ছে। হঠাৎ একটা শুকনো ডাল বিরাট আওয়াজ করে ভেঙে পড়ল। ঘুটঘুটে অন্ধকার আকাশ। হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলক, পরক্ষণেই দূরে কড়কড় করে মেঘেদের গর্জন। বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেল। তার মুখে ছিটকে ক’ফোটা বৃষ্টি পড়ল। সে তৎক্ষনাৎ কম্বলে মুখ ঢেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্ত ঠান্ডা বাতাসের ঝাপট, হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় মনে হল তার হাত পা সব জমে যাচ্ছে। আর কাপুনিও বেড়ে যাচ্ছে। তারপর সে শুধু ঠান্ডায় কাঁপতেই থাকল, কাঁপতেই থাকল। সেই বিদঘুটে, বিশ্রী রাতে কুকুরগুলো কি যেন অজানা কারণে একেবারেই গুম মেরে গেল। সারা রাতের মধ্যে একবারও চেঁচালো না।
পরের দিন। জ্বরের কারণে অথবা নতুন ওষুধের প্রয়োগের ফলে শের আলির ঘুমুতে খুব ইচ্ছা হল। কিন্ত তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে। ‘পানি’ বলে সে চীৎকার করতে চাইলো। কিন্ত গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বের হল না।  কখন যেন সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। ঘুমের মধ্যে তার মনে হল, তার কান দু’টি খুবই সতর্ক। গাছের পাতা পড়ার শব্দও তার কানে আসছে। হঠাৎ শুনলো মায়ের ডাক, সেই গলা, সেই ডাক। ‘মা, মা’, ঘুমের ঘোরে শের আলি আবারও চীৎকার করে উঠতে চাইলো। কিন্ত গলা দিয়ে শব্দ বের হল না।
‘শের আলি, আমি এসেছি বাবা। তোকে আমি নিয়ে যাবো আমার কাছে। আর তোকে এখানে একা পড়ে থাকতে দেব না।’
‘অনেকদিন হয়ে গেল মা, গাঁয়ে যাওয়া হয়নি। তোমার অত অসুখেও ছুটি মেলে নি। এবার যাবো। ছুটি পাবো।’ শের আলি ছুটে গিয়ে মায়ের সাথ ধরলো, শৈশবের সেই শিশুটি।
কিন্ত গ্রামটা আর সে রকম নাই। সারা গাঁ বরফে বরফে ঢেকে গিয়েছে। কিন্ত আশ্চর্য তার মা তার মধ্যে দিয়েই কেমন জোরে জোরে পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। যেন পাখায় ভর করে উড়ে যাচ্ছে। কিন্ত সে যতই পা চালিয়ে মায়ের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছে, কোথা থেকে বরফ এসে তার পথ আটকাছে।  তার মোটা আর্মি বুটও যেন বরফের,তার খাঁকি পুরু মোজাও যেন বরফের। বহুক্ষণ ধরে অনবরত চেষ্টা করে কোনক্রমে একটা পা তুলে সামনে ফেলতে গিয়ে সে তার গ্রামকে দূর থেকে এবার স্পষ্ট দেখতে পেল। তাদের ছোট্ট মাটির বাড়ি, তার টিনের চাল, সব বরফে একদম ছয়লাফ।
গাছগুলোও যেন সব বরফের গাছ। সে গাছের ডালগুলোর দিকে তাকাতে গেলে তার মাথায় কাঁধে বরফ এসে জমা হল। তার চলা ক্রমেই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে হচ্ছে ঐ বরফ পথে। সে তার পা তুলতেই পারছে না। অবশেষে দুই হাত দিয়ে একটি পা’কে চেপে ধরে সর্বশক্তি দিয়ে ওঠাতে চাইলো পা’টিকে। সে আবার মাকে দেখল। তার সামনে দিয়ে মা যেন বাতাসের মত উড়ে যাচ্ছে। তার মায়ের চারপাশের আকাশ, মাটি, গাছ, নদী সব যেন হালকা ধূসর বর্ণের। দিগন্ত থেকে দিগন্তে শুধু কালো ও ধূসর মেঘের ঘোরাফেরা। তার মধ্যেই হঠাৎ ঝড়ের বেগে ধেয়ে এল কুয়াশা, দৃশ্যপটে আর মাকে দেখা গেল না। কুয়াশার আবর্তে আবারও পথ হারালো সে। হঠাৎ এক ঝলক বিদ্যুতের মত আলোয় সে দেখতে পেলো তার গ্রামকে। পরক্ষণেই গভীর নিকষ কালো অন্ধকারে কোথায় হারিয়ে গেল তার সেই গ্রাম।
কেটে গেল কিছু সময়। গ্রাম দেখা গেল। কিন্ত জনশূন্য, প্রাণশূন্য যেন এক মৃত্যুপূরী। বিরাণ, পরিত্যক্ত; যেন ওঁৎ পেতে বসে আছে তাকে গেলার জন্য। সে আর্তনাদ করে উঠলো, মুক্তি পেতে চাইলো এই বিভীষিকা থেকে। কিন্ত আবারও বরফ এসে ঘিরে ফেলল তার চারিপাশ। সে আবারও আর্তনাদ করে উঠলো, কিন্ত শোনার জন্য কেউ নেই। বরফ পড়তে লাগল তার মাথায়, কাঁধে, সারা শরীরে।
বরফের দৈত্যরা নাচ শুরু করে দিলো চারপাশে। সামনে, পেছনে, ঊর্ধ্বে, নীচে কোথাও কিছু নেই। শুধু বরফ আর বরফ। বরফের খাঁচায় বন্দী যেন সে এক অসহায় পশু।
তারপর ঘন কুয়াশা ক্রমশ: একটু ফিকে হতেই আবারও দেখা গেল দূরে সেই গ্রাম। সেই গ্রাম থেকে এবার যেন ছায়া মূর্ত্তির মত তিনজন তার সামনে এগিয়ে আসছে। ব্রাউন রংগের কোর্ট পড়ে রয়েছে তারা।
‘এই যে আমি এখানে। এই যে…’ তার ঠোঁট নড়লো; কিন্ত শব্দ বের হল না।
একজন লোক তাকে দেখল এবং তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত তার মোটা কম্বলে ঢাকা। যতই সে কাছে দিয়ে এগিয়ে আসতে থাকে তাকে ততই ছোট মনে হয়। তারপর সে তার কাছে এসে স্থির হয়ে দাঁড়াল। ভয়ংকর দু’টি চোখ তুলে তার দিকে তাকাল। তারপর কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করে চিৎকার করতে লাগল। শের আলি তাকে ধমক দিল, তাই তার এত চিৎকার অথবা ধমক দিল বলেই সে চিৎকার করতে আরম্ভ করল। শের আলি তখন সত্যিই কিছু বলতে পারল না। সে শুধু বড়ো করে চোখ খুলে দেখতে চাইলো। সে ঠিক বুঝতে পারলো না কাকে দেখছে সে। তামাটে রংগের লোমে ঢাকা জার্মান শেফার্ডটিকে অথবা খাঁকি ইউনিফর্ম পড়া জেনারেল সাহেবকে। কিন্ত ডোবারম্যানের গলার বেল্টের সংগে আটকানো ছোট ছোট চাকতির মত জিনিষগুলোতে তার চোখ আটকিয়ে গেল। কিন্ত আবার বুঝতে পারলো না ডোভারম্যান আর জেনারেল সাহেবের পার্থক্যটা। কারণ ওগুলো সুস্পষ্টভাবে জেনারেল সাহেবের ইউনিফর্মের সঙ্গে বুকে সাঁটা মেডেলগুলোই বলে মনে হচ্ছে। সে হাত তুলে স্যালুট করতে চাইল ফৌজী কায়দার। কিন্ত তার পা বরফের মধ্যে ঢুকতে লাগলো,… কোমর পর্যন্ত,.. তারপর কাঁধ পর্যন্ত… সবই বরফ গিলে নিল। তার হাত দু’টোও এবার বরফে তলিয়ে যেতে লাগল। সে স্যালুট করতে পারলো না। সে শুধু বিস্ময় ভরা দুই চোখে চেয়ে রইলো,তার সামনে দাঁড়িয়ে ও তো ডোভারম্যান!না ডোভারম্যান নয়,জেনারেল সাহেব নিজে।
‘দোহাই আল্লাহর, একবার শুধু তুমি আমাকে বল, তুমি তো আমাদের ডোভারম্যান, এখন ‘আশরাফ…’
‘হ্যাঁ, আমিই ডোভারম্যান। আমিও আশরাফ, আমিও সেরা, ‘আশরাফুল মখলুকাত’, সৃষ্টির সেরা সৃষ্টি, গর্বিত উত্তর ডোভারম্যানের।
‘হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি। এখন বুঝতে পেরেছি। সে তার ঠোঁট খুলে ঘোষণা করতে চাইলো এটা, কিন্ত মনে হল তার ঠোঁট আর তার নেই। বরফে জমে গেছে সব। তার চোখের আলো ঝাপসা হয়ে এলো। ধীরে ধীরে নেমে এল, দু’চোখের পাতা, ঘুমন্ত শিশুর মতো। এখন শুধু বরফ আর বরফ। নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে সে এখন বরফ হয়ে, অনেক অনেক দিন।…

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close