Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ আত্মজৈবনিক নিশ্চয়ই আমি জানি, বাহু হতে তোমার দূরত্ব নয় লক্ষ কিলোমিটার > আত্মজৈবনিক >> লাবণ্য প্রভা

নিশ্চয়ই আমি জানি, বাহু হতে তোমার দূরত্ব নয় লক্ষ কিলোমিটার > আত্মজৈবনিক >> লাবণ্য প্রভা

প্রকাশঃ June 22, 2017

নিশ্চয়ই আমি জানি, বাহু হতে তোমার দূরত্ব নয় লক্ষ কিলোমিটার > আত্মজৈবনিক >> লাবণ্য প্রভা
0
1

লাবণ্য প্রভা

নিশ্চয়ই আমি জানি, বাহু হতে তোমার দুরত্ব নয় লক্ষ কিলোমিটার

নিঃশব্দে ঝরে পড়ে ছায়া ও শিশির।

চন্দ্র চাঁদোয়ার নিচে পাহাড় গলে যায়।

শিথানের পাশে লিখে রাখি মৃত্যুর চিরকুট…

মিহি অন্ধকার ফিকে হয়ে এলে পূব আকাশে হঠাৎ চাঁদের অস্তিত্ব টের পেলাম। অমন একফালি চাঁদ এখন তোমার আকাশে। আর এখানে ধীরে ধীরে আকাশটা লাল হয়ে সূর্য উঠছে। চাঁদ এবং সূর্যের এমন সহাবস্থান দেখা হয়নি আমার কখনো। কত কিছুরই তো সহাবস্থান দেখি এখন। যেমন কাল সারা রাত অর্ধদগ্ধ বিছানায় শুয়ে ছিলাম। যেন দেয়াল তার জিহ্বাগুলো বের করে চেটে নিচ্ছিল আমার সমস্ত জল। মসৃণ ময়দানে অলৌকিক ক্রীড়াচক্র;  সুঠাম উরু বেয়ে অন্ধকার গড়িয়ে পড়ে। অপেক্ষমাণ রাত্রিনিবাসে ভালোবাসা কম পড়ে যায়। নারী তাই মিশিয়ে দেয় চিনি ও প্রীতি। একেকটি চায়ের পেয়ালায় অমৃত ও হেমলক উপচে পড়ে। মনে পড়ে যায়, কোনো এক আলোর উন্মীলনে আমার জামদানি শাড়ি ছিঁড়ে গেলে নিভৃত সিঁড়ি বেয়ে রক্তেরা বারান্দায় ঘন হয়। কাল রাতে অপ্রত্যাশিত বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম। জানি,  এ রাতের কথা তুমি কোনোদিন ভুলতে পারবে না। যেমন ভুলতে পারবে না পৃথিবী জুড়ে মহামারী,  যুদ্ধ, দাঙ্গা, হানাহানি । ভুলতে পারবে না, শুল্কপক্ষের চাঁদ আর আমাকে।

আমি ইচ্ছে করলেই তোমার কাছে যেতে পারি। এই তো কয়েক পা এগুলেই তোমার ঘর। তোমার ঘরের সিঁড়ি উপড়ে উঠতে উঠতে আকাশ ছুঁয়েছে সেই শৈশবের শিম গাছটির মতো। যার শীর্ষে একটি করে সোনার ফুল থাকত! তুমি কথা বললেই তো দেখতে পাই রোদের আলনায় ঝুলে আছে রতিক্লান্ত শাড়ি। গোপন বিছানা বালিশ। দারুচিনি বৃক্ষের গায়ে হেলান দিলেই সে জানিয়ে জানিয়ে দেয়,  এতো এতো শূন্যতা মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে। জেনে যাই, দাগিস্তানের রূপসী পাথরগুলো হত্যার দায় স্বীকার করেছে। তাই আমিও স্বীকার করে নেই তোমাকে। বাতাসের তরঙ্গে ভর দিয়ে যখন তোমার কথা ভেসে আসে, ঠিকই দেখতে পাই লন্ড্রি টেবিল থেকে উড়ে যাচ্ছে ফুটন্ত জলরাশি। মসৃণ কার্পাসগুলো ক্রমশ শুষে নিচ্ছে স্টিম। তোমার ফুলে ওঠা বাইসেপ দেখে নিচ্ছে তৃষ্ণার্ত পৃথিবী। জানো তো, এভাবেই পতঙ্গনারীরা ঝাঁপ দেয় স্ফুলিঙ্গে। আর দৃশ্যান্তরে কারো কারো সুনীল আঁচল পুড়ে যায়।

অথচ তুমি তুমি জানো না, একা থাকতে আমার খুব ভয় করে। এতো এতো চিন্তার কামড় সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই। কে যেন একসময় বলেছিল, একদিন তোমার পাশে কেউ থাকবে না- এটাই তোমার নিয়তি। হয়তো তাই, আর তাই তার এতো ভয়। বন্ধুহীন মানুষ কী থাকতে পারে! কাউকে না কাউকে তো পাশে প্রয়োজন। যদিও সে জানে কোনো মানুষের সঙ্গেই বন্ধুত্ব শেষ পর্যন্ত ধ্রুব নয়। তাই বন্ধু না থাকার চেয়ে বন্ধু চলে যাওয়াটা বেশি কষ্টকর, এটা তার চেয়ে আর ভালো কে জানে! কেতকী কুশারী ডাইসন বলেছিলেন, “বন্ধুত্বের রীতি অনুক্রমিক একনিষ্ঠতার নয়। বন্ধুত্ব এলামেলোভাবে বা বাছবিচার না করে হয় না (ফ্রেন্ডশিপ ইজ নট প্রমিসকিউআস)। ঘটে নির্বাচনের ভিত্তিতেই (ইট ইজ ইফ এনিথিং সিলেকটিভ)। তিনি বলেন, এতো কিছু স্বত্বেও আমরা এই সময়ে একাধিক বন্ধুকে ভালোবাসতে সক্ষম (তিনি এখানে নিশ্চিত করেছেন, একাধিক আর অনেক এই শব্দদুটো এক নয়, এ দুটোর ব্যঞ্জনা আলাদা। যৌনপ্রেমকেও (এরটিক লাভকে) তিনি একই প্রকার বলেছেন। মূলত অন্যপ্রকারের নয়। কেননা এটা এমন একটা ঘটনা যে, আমরা একইসময়ে একাধিক ব্যক্তির প্রতি (ফর মোর দ্যান ওয়ান পার্সন) প্রেম ও আকর্ষণ অনুভব করতে পারি। যদিও এই সত্য সচারচর প্রকাশ্যভাবে স্বীকৃতি হয় না, কেননা দম্পতিদের পারস্পরিক স্বত্ব-সম্পর্ক ও বাস্তবতাকে আড়াল করে রাখে।” তিনি আরো বলেছিলেন, স্পর্শ ছাড়া ভালোবাসা হয় না।

একথা জানার পর আমি আর তপতী পথে হাঁটতে হাঁটতে কোনো গাছকে ছুঁয়ে দিতাম। আর বলতাম, এই যে তুমি গাছটিতে ছুঁয়ে দিলে,  এর নামই ভালোবাসা। তপতী আর আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কফি হাউজে বসে থেকেছি। শরীরের ভাষা নিয়ে কথা বলেছি। কলকাতার মেয়ে শ্বাশ্বতী তো শেষ পর্যন্ত লিখেই ফেলল দীর্ঘ একটা লেখা। নারী ও যৌনতা নিয়ে। সে লেখে :  এক সময় পর্যন্ত নারী তার নিজের শরীর নিয়েও ভাবতে পারত না। অথচ এই শরীরটাই একান্ত আপন। ভারতবর্ষের এক বিস্মৃত সময় পর্যন্ত আমরা দেখতে পেয়েছি নারী তার শরীরকে নিয়ে ভাবছে, কিন্তু নিজের জন্য নয়। কী করে পুরুষের কাছে নিজেকে উপস্থাপন করবে সে জন্য। বাৎসায়ন রচিত কামসূত্র তারই পরিচয়বাহী। কামসূত্রের পাতায় পাতায় আছে গণিকারা কিভাবে তাদের খদ্দের বা পৃষ্ঠপোষকদের কাছ থেকে আরো বেশি বস্ত্র অর্থ অলঙ্কার আদায় করবে তারই নানান পদ্ধতির বর্ণনা। পুরুষদের জন্য রয়েছে অনূঢ়া কুমারী বা পরস্ত্রীকে পছন্দ হলে তাকে প্রলুব্ধ করার নানা রাস্তা। পরবর্তীকালে যৌনতা নিয়ে আলোচনা ধর্মীয় ও সাহিত্যিক স্বীকৃতি পেয়েছিল, ইংরেজি শিক্ষার উন্মেষে বাংলার নবজাগরণের পরবর্তী সময়ে যৌনতা নিয়ে এই দেশজ চেতনা লুপ্ত বা নিন্দিত হয়েছে। পশ্চিমী দেশ তার ভিক্টোরীয় নৈতিকতার আবরণ খুলে ফেললেও আমাদের ওপরে এখনও তা চেপে আছে। নারীর যৌনতা পাপের উৎস। পুরুষের এই ধারণা থেকে ভালো মেয়ে বনাম খারাপ মেয়ে, মা বনাম বেশ্যা বা সতীত্ব বনাম ব্যাভিচারের দ্বন্দ্ব জেঁকে বসল। ভিক্টোরীয় মূল্যবোধের সচেষ্ট নৈতিকতা এবং রোমান্টিকতার আবরণ পরিয়ে বিষয়টি আরো জটিল হয়ে গেল।

আমরা খুঁজে খুঁজে বের করলাম, কিনসের রিপোর্ট। ১৯৫৩ সালে কিনসের রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর তার তথ্যগত প্রমাণে নারী-পুরুষ উভয়েই মানসিক এবং নৈতিকভাবে ধাক্কা খেল। ৫৯৪০ জন নারীর ওপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেল যে, তার মধ্যে ৫৫ শতাংশ নারী কোন দিন সুখ অনুভব করতে পারেননি। যৌনতায় নারীর ভূমিকা নিস্ক্রিয় এবং পুরুষ সক্রিয় এই ধারণাটা ধাক্কা খেল। তারপর একে একে মাস্টার্স জনসন ১৯৬৬, হাইটের সমীক্ষায় ১৯৭৭-এর পর বিতর্ক আরো এগিয়ে গেল। যৌনতা তো স্বীকৃত হলো কিন্তু যৌনতাকে উপভোগ করতে গিয়ে শরীরে মনে জড়িয়ে থাকা সন্তান ধারণের আতঙ্ক। নারীর পক্ষে অনিচ্ছুক মাতৃত্বের ভয় কাটিয়ে দিল আরেকটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। গর্ভনিরোধক পিল। ১৯৫৪ সালে আবিষ্কার হওয়ার পর থেকে ষাটের দশকে থেকে তার ব্যাপক বাণিজ্যিক প্রয়োগ শুরু হলো। নারী অবকাশ পেল তার নিজের কথা ভাবতে। ধর্মীয় অনুশাসন থেকে এ কথাটাই বলার  চেষ্টা করা হয়েছে সমাজে পুরুষরাই প্রধান।

এ জন্য ষাটের দশককে যৌনমুক্তির দশক হিসেবে চিহ্নিত করা হলো। মননের সঙ্গে শরীরের বোঝাপড়া করতে অনেক তরুণ-তরুণী পথে নামল চোখে স্বপ্ন নিয়ে, আন্দোলনে অংশ নিল। কিন্তু  মুক্তি কি সত্যিই এলো? প্রগতিশীল হবার আকাঙ্ক্ষায় হ্যাঁ-নার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েরা পুরুষের শরীরী আহ্বানে সাড়া দিতে বাধ্য হতো। দ্বিধা এবং সংকোচের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা মেয়েরা পিছিয়ে-পড়া বলে চিহ্নিত হলো। সেই সময়কার নারীনেত্রী বিয়ানস ক্যাম্পবেলের মতে এটা ছিল নিঃসন্দেহে স্বপ্নভঙ্গ।

‘‘ এটা ছিল তরুণদের বিদ্রোহ। এক তরুণের পৌরুষ এবং বহুগামিতাকে প্রতিষ্ঠা করা। তা কোনো বিধিনিষেধ মানত না এবং তাদের যৌনচাহিদা ছিল অনির্দিষ্ট (কেবলমাত্র মেয়ে হলেই যথেষ্ট)। তাই পিলের সঙ্গে এলো যে যৌনতার জয়গান,  সে জয়গান পুরুষের যৌনতার।’’

যৌনমুক্তি কতোটা মুক্তি আনতে পারল সেটা আসলেই ষ্পষ্ট নয়। কিন্তু  নারীর জন্য তৈরি হলো নানা নতুন শেকল- একদিকে পর্ণোগ্রাফি, অন্যদিকে মুক্তনারী হয়ে ওঠার চাপ।

নারী পুরুষের অনুগামী হবে, পুরোগামী কখনই নয়। হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান বা অন্য নানা ধর্মের যতই আভ্যন্তরীণ বিরোধ থাকুক না কেন একটি বিষয়ে তারা একমত- নারী সর্বত্রই নরকের দ্বার, পুরুষের সমাজের পতনের কারণ। কিন্তু নারী অপরিহার্য কারণ তারা সন্তান ধারণে সক্ষম। আর সন্তান উৎপাদনের প্রাথমিক প্রয়োজনটা বাদ দিলেও একমাত্র নারীই পুরুষকে চরম পুলক দিতে সক্ষম।

হায় ঈশ্বর! এ কথাগুলো একবার এক বন্ধুকে বলার পর যে আমাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বহুগামী, স্বেচ্চাচারী, চরিত্রহীনা নানা অভিধায় অভিহিত করে চলে যায়।

আর আমি সারাদিন জীবিকার তাগিদে নানা মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ঠোঁটের কোণায় হাসি ঝুলিয়ে রাখি। মাঝে মাঝে নিজেকে এই শহরে আগন্তুক ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। এতো পরিচিত রাস্তা তবু নগরীর পথগুলো প্রতিদিনই অচেনা ঠেকে। এতো এতো মানুষ চারপাশে অথচ কেউ নেই।

সেই নব্বুইয়ের শেষার্ধের সূর্যজ্বলা দিনগুলো কেমন একঘেয়ে ছিল! অকারণে মধুমিতা সিনেমা হলের সামনে থেকে শাপলা চত্বর পার হয়ে দৈনিক বাংলার মোড় পর্যন্ত হাঁটতাম। আবার কী মনে করে চান্দ ম্যানশনের দিকে।  রেবাদি অফিসে যাওয়ার কথা। কিন্তু কিছুতেই সেখানে যাওয়ার মতো ইচ্ছাশক্তি জোগাড় করতে পারি না। এক দুপুরে সিঁড়ি আর লিফটের ঝঞ্ঝাট পেরিয়ে রেবাদির অফিসে ঢুকে গেলাম। রেবাদি আমাকে দেখেই তড়বড় করে অনেক কথা বলে ফেলে। আমিও চাইলাম। কেমন যেন অসার হয়ে আসে জিহ্বা। গা গুলানো ভাব শরীরে। জিহ্বা টেনে টেনে উচ্চারণ করি, আমি যাই। রেবাদিকে কিছু বলার সুযোগ দেই না। সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামতে থাকি। লিফটের অপেক্ষা না করে। সিঁড়ির তলায় গোঙানির আওয়াজ। উপরে ওঠার সময় মেয়েটিকে ভিক্ষা করতে দেখেছি। এখন তার বাচ্চা হচ্ছে। আমার ভয় লাগে। সাতাশ বছরের জীবনে এ অভিজ্ঞতা একেবারে প্রথম। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। কান্না পায়, কেন মানুষ এতো অসহায়, কেন মানুষ পৃথিবীতে আসে! কী প্রয়োজন তার! নিজেকে তো কীট ছাড়া কিছুই ভাবতে পারছে না সে।

আজ এতো বছর পর, একুশ শতকের শেষার্ধে দাঁড়িয়েও সেই রকমই মনে হয় সবকিছু। একটুও পরিবর্তন নেই, যেন একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে জীবন। সেই গাগুলানো ভাব, কথা বলতে গিয়ে সেই জড়তা, সব আগের মতোই আছে তার জীবনে।

অতঃপর তুমি এলে। তুমি আমায় ডাকলে। এক্ষুনি এসো। এমন করে কেউ কখনো ডাকে নি আমাকে। কতো চেয়েছি,  কেউ জোর করুক। কেউ বলুক। এসো,  তোমার জন্য জমিয়ে রেখেছি উতল যমুনা। কেউ বলুক, এতোগুলো বছর শুধু তোমার সঙ্গে দেখা হবে বলেই অপেক্ষা করেছি। যেমন, আমি আমার বছরের পর বছর ধরে জমিয়ে রেখেছি আমার চুম্বনগুলো। যারা তোমার সমস্ত পিঠে, বুকে, বৃষ্টিধারার মতো ঝরে পড়বে। আমার ভেজা অন্ধকারে মাংসের চুম্বন গভীরতর হবে।

অতঃপর…

দীর্ঘ দীর্ঘ দিবস আর মহা অন্ধকার রজনীগুলোর মাটি সরিয়ে আমি উঠে দাঁড়াই। সূর্যের দিকে মুখ করে তাকিয়ে থাকি। টকটকে নতুন সূর্যটা, নতুন করে জীবনের আবাহন দেয়, ভোরের কোমল সৌররশ্মি আমার শরীরের প্রতিটি রোমকূপের ভেতর দিয়ে রক্তে প্রবেশ করে। আমি যেন এক নবজাতক, যেন এইমাত্র পৃথিবীতে ভূমিষ্ট হয়েছি। ইনকিউবেটরের উত্তাপ পাই। দৃশ্যগুলো বদলে যাচ্ছে দ্রুত, গাছের পাতারা ক্রমশ সবুজ হয়ে উঠছে। ছোট্ট সদ্য অঙ্কুরিত খয়েরি পত্রটিও আমার দৃষ্টি আটকে দেয়। দূরে কোথাও শিরিষের ফুল ফুটেছে- তার মাদকতাময় সৌরভ নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করে আমায় অবশ বিবশ করে দেয়। অথচ, গতকাল পর্যন্ত আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় ভোঁতা হয়ে ছিল। আমার চোখ, কান, নাক, জিহ্বা, ত্বক তাদের কাজ থেকে অব্যাহতি নিয়ে নিয়েছিল। যে চোখ দিয়ে আমি বিস্তীর্ণ সবুজ আর ঘাসের বুকে সৌররশ্মি পড়ে চিক চিক করে উঠতে দেখতে চাই, মাঠের মাঝে ঘাসফড়িং কিংবা পাতার ফাঁকে দোয়েলে উড়াউড়ি দেখতে চাই, কিংবা পথের ধারে অলক্ষ্যে গজিয়ে ওঠা বটপাতার কাঁপন দেখতে চাই, সে চোখ প্রতিদিনকার ভাঁড়ামো আর ভাঁড়দের দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। সে তাকিয়ে থাকে কিন্তু  দেখে না, তার কাছে সব মুখ একইরকম মনে হয়, ভাঁড়দের মুখ, ভাঁড়দের পেছন পেছন মুর্খদের দীর্ঘ স্রোত দেখতে দেখতে সে ক্লান্ত বোধ করে। চারদিকে উচ্চগ্রামে বাজতে থাকে বিজ্ঞাপনী জিঙ্গেল- গাড়ির হর্ন, মানুষের খিস্তি, আমার কান বধির হয়ে যেতে থাকে- যে কর্ণদ্বয় আমার বিলম্বিত লয়, রাগ কাহারবা দাদরার তাল দূর থেকে শুনেই বুঝতে পারে সে বধির হয়ে যেতে থাকে। তুমি তো জানো, কিশোরী আমানকার না শুনলে আমার কর্ণদ্বয় আর তৃপ্ত হয় না, তুমি তো জানো বৃষ্টির ধারা না হলে আমার ত্বক লাবণ্যময় হয়ে ওঠে না। অথচ গতকাল পর্যন্ত ভাবনার এই অবকাশটুকুও আমার মস্তিষ্ক হারিয়ে ফেলেছিল। আমি অনুনয় করি,  হে আমার পঞ্চইন্দ্রিয় তোমরা আমাকে ছেড়ে চলে যেও না। অনুনয়ের পর অনুনয়ে তাদের দয়া হয়। তাদেরকে আমি বলি, দ্যাখো আমি ঘুরে দাঁড়িয়েছি। আমি আমার নিজস্ব ভাষা খুঁজে পেয়েছি।

হায় আমার ভাব এবং ভাষা!

অতঃপর পৃথিবীতে একটিও শব্দ থাকে না…

একেকটি বৈকুণ্ঠ পেরিয়ে বসে থাকি স্থবির

তালপুকুরের অতলান্তে ডুবে যাচ্ছি দ্যাখো,

সমূহ-সাঁতার আমার শেখা হবে না কোনো কালে…

কোনো কালেই নয়, বিশ্বাস করো সাঁতার জানি না বলে জলে নামতে বড়ো ভয় আমার। তাই পাহাড়কে ভালোবেসেছি, গাছকে ভালোবেসেছি। বৃক্ষ! মা। আমার কোথায় তুমি! এই অতলান্তিক অন্ধকার থেকে আমায় মুক্ত করো। এখন নিঃশ্বাস পতনের শব্দেও আমার ভয় হয়।

অথচ আমি স্বাধীন হতে চাই। ক্রমশ আমর চারপাশের প্রতিবেশ থেকে। কিন্তু স্বাধীন হওয়া অতো সহজ নয়, যে মুহূর্তে তুমি স্বাধীন হতে চাইবে, সে মুহূর্তে চারপাশ থেকে অজস্র শেকল ঝন ঝন করে উঠবে। স্বাধীন হওয়ার জন্য ব্যক্তিকে জানো তো প্রচণ্ড মনোবলের অধিকারী হতে হয়।

মন! মন! মন!

সে কি নিজের কাছে স্বচ্ছ সবসময়। আমি দেখেছি মানুষ খুব অল্পেই ভেঙে যায়। সে একদিকে যেমন স্নেহের কাঙাল, অন্যদিকে ক্ষুৎপিপাসার মতো যৌনতার আকাঙ্ক্ষাও তার মধ্যে থাকে। তার থাকে ভালোবাসা পাবার এবং দেবার আকুতি। সেই ভালোবাসার একটা স্বরগ্রাম থাকে, যার মধ্যে যৌনতার চমক মিশে গিয়ে তাকে অতিরিক্ত তীব্রতা দেয়। কখনোবা তার স্পর্শ ছাড়াই সে সচল থাকে। কখনো দেখা যায় স্বর্গের স্বপ্ন মানুষকে উন্মাদ করে,  অপ্রাপনীয়কে প্রাপনীয় করার জন্য মানুষ উঠেপড়ে লাগে। তারপর হয়তো দেখা যায় যা স্বর্গের স্বপ্ন তাই মহাসমুদ্রে ভাসমান কাঠের টুকরো। কিছুকাল সেটাই আঁকড়ে ধরে পাগলের মতো বাঁচতে চেষ্টা করে সে। কখনোবা অপেক্ষাকৃত নির্ভরযোগ্য যা পাওয়া যায় তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। হয়তোবা।

আমি কি এখন হিসাব মেলাতে বসেছি! জীবনে কি কেনো প্রাপ্তি ছিল না কিছুই? এখন কি তবে সবকিছু মাটিচাপা দিয়ে দেবো। সেই ছোটো ছোটো সিকি-আধুলি সুখ যা দীর্ঘদিন ধরে আমি জড়ো কেরেছি তা কি ন্যাপথালিন মেখে ওই কাঠের সিন্দুকে পুরে রাখব নাকি ওই ইচ্ছাকুপটিতে ফেলে দেবো! ওই বেহিসাবী ক্ষণগুলো কি কখনো সঙ্গী ছিলো না আমার! আমি বিষম খাই।

শিয়রে নিঃস্ব মেঘ

ছায়া ও শরীর নিয়ে ফড়িংয়েরা দূরগামী হলে তাহাদের চোখ চঞ্চল হয়ে ওঠে। চোখের প্রক্ষেপনে অজস্র প্রলোভন আকস্মিক নিমগ্নতা ভেঙে তুমি ও তোমরা তুলে নাও সময়ের চেয়েও দ্রুততম ধনুর্বাণ। তবু তারা পলায়ন করে। ছেড়ে যায় ঘাটশিলা, নবীর বাগান। অথচ দ্যাখো এখনো অত্যজ্জ্বল দীপ জেগে আছে শিয়রে। বিহ্বল পায়ে নুপুর বেজে উঠলে পত্রবালিকারা শিহরিত হয়। অথচ আমি!

পড়ে থাকি একা।

হে মেঘ

হে অপ্রকাশ্য প্রেম

তুমি অনুগামী হও বাতাসের

ওইখানে, ওই দূর পরগনায় চিতার আগুনে পুড়ে যায় জীবনের উল্লাস।

আমার খুব মায়ের মুখ মনে পড়ে।

একদা এই প্যারাফিন আলোর রেখা ধরেই তো তারা হেঁটে গিয়েছিলেন। সেই শীর্ণ পথরেখা আর বিবর্ণ ঘাসের কঙ্কাল এতোটা অতীতাশ্রয়ী যে ঠিক বুঝতে পারি না।

প্রেক্ষাগৃহ অন্ধকার।

একাকী বেড়াল কোথাও কি ক্রন্দনরত!

কি জানি!

বিরামহীন প্রতিসরিত আলোর অবভাস দেখে দেখে

ভেঙে ফেলি প্রিজমগুলো।

কী হতে চেয়েছি আমি!

কবি হতে!

নারী হতে!

বৃহত্তর পৃথিবীতে নিজেকে সমর্পিত করতে!

কী ভুল! কী ভুল!

নিরন্তর কুকুরের দল ঘেউ ঘেউ করছে চারদিকে। এক-একটা দাঁতালকে সরিয়ে দিতে না দিতেই আরেকটি এসে হাজির। কখনো প্রবোধ দিয়ে, কখনো উপেক্ষা দিয়ে, কখনো পিছু হটে লক্ষ্য স্থির করতে চেয়েছি। যদিও লক্ষ্য কী তা আমার কখনো জানা ছিলো না। কেবল জানতাম পায়ের নিচে মাটি তৈরি করতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে স্ব-অধীন হতে হবে। বিশ বছর ধরে কেবল তৈলাক্ত বাঁশের গায়ে বানরের মতো পিছলে গিয়েছি, আবার শুরু করেছি গোড়া থেকে।

মাঝে মাঝে তাহাদের বাক্যবাণে আমি এতোটাই বিহ্বল হয়ে যেতাম যে ইচ্ছে হতো মুখে কালি মেখে বসে থাকি, যেন কেউ না চিনতে পারে আমাকে, তাহলে অন্তত কেউ কিছু বলতে পারবে না। মাঝে মাঝে মনে হতো এ মুখ আর কাউকে দেখাবো না। একদিন তো নিজের মাথায় নিজেই বাড়ি মেরে বসলাম। হেগেল বলেছেন, মানুষের ইতিহাস নাকি ক্রম অগ্রসরমান। একটি মানুষ আরেকটি মানুষকে অতিক্রম করবে! একটি সভ্যতা আরেকটি সভ্যতাকে অতিক্রম করে অগ্রসর হবে! আর আমি তো আমাকেই অতিক্রম করতে পারছি না!

আমার বন্ধু তানজিনা বলে,  তোমার লেখা এতো ভয়ঙ্কর কেন? একটা সুন্দরতার গল্প লেখো না প্লিজ!

আমি তো গল্প লিখতে জানি না। আমি তা তাদের কী করে বুঝাই, আমি যে জীবন লিখে যাই।

কোন সুন্দরতার কথা লিখবো আমি!

আমি কী করে লিখবো ভালোবাসার কথা, প্রেমের কথা!

ভালোবাসাহীনতা, ঘৃণা, বঞ্চনা, শাস্তি ছাড়া আর যে কিছুই মনে করতে পারি না। সেই শৈশবে বাবার হাতে শাস্তি পেতে পেতে সারাটা জীবনই যে শাস্তিময় হয়ে গেছে। আমি তো বার্বি গার্ল নই। আমার জগতটাও বার্বি গার্লের জগত নয়। আমি নক্ষত্র বিচ্যুত এক নারী, মিসিং লিংক…

আমার স্বামী বলে, তুমি মরে যেতে পারো না, তুই মর!

আমার সন্তান বলে, তুমি মরে যাও

তুমি আত্মহত্যা করো

আমি প্রতিদিন একটু একটু করে মরে যেতে থাকি

আমি প্রতিদিন একটু একটু করে বেঁচে উঠতে থাকি

আমার মোটেও মরে যেতে ইচ্ছে করে না। কেবল মনে হয় দেখি না পথের শেষে কী আছে!

রাতে গোল হয়ে চাঁদ উঠলে নিজেকে নিয়ে লেখার টেবিলে বসি। ঘুণে-খাওয়া আধভাঙা টেবিলটি আমার শ্বেতপাথরের টেবিল হয়ে যায়। স্বর্ণপেয়ালায় চা আসে, আমি চায়ের কাপে চুমুক দেই…

হায় নারী! হায় দেবী

বিশ্ব রূপেনা সংস্থিতা। আর কতো প্রতারণা নিজের সঙ্গে! একেকটা কুয়াশার মাঠ ডিঙিয়ে আমি বড়ো রাস্তায় দাঁড়াই। প্রতিদিন নিয়ম করে বাস ধরি, কর্মক্ষেত্রে যাই। বাড়ি ফিরি। বাড়ি! আমার আবার বাড়ি কোথায়! কোনো কালে আমার কি বাড়ি ছিল কোথাও?

আমি যে কষ্ট পাচ্ছি এ কথাটাও কাউকে জানাতে চাই না। কেউ খারাপ ব্যবহার করলেও অবাক হই না আমি। কষ্ট পেতে পেতে একেই স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছি। বরং কষ্টের জানালা গড়িয়ে যখন সুখের মৃদু হাওয়া আমার আঙিনায় ধাক্কা খায় তাকেই বড়ো অত্যাশ্চর্য মনে হয়। আমি তো ধরেই নিয়েছি অনিঃশেষ কষ্ট ভোগ করার জন্যই এ পৃথিবীতে এসেছি। পিতা পিতৃত্ব অস্বীকার করবেন, মাতা ত্যাগ করবেন, স্বামী ত্যাগ করবে, রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হবে। প্রথমে উঠোনে, পরে রাস্তায়। তুমি কেমন করে রাস্তা থেকে উঠে দাঁড়ালে মেয়ে! কিছু আপোষও করলে? আপোষ কেন? সন্তান আছে যে! তানজিনা, আমি জানি না, তোমার কি এমন দিন এসেছে সন্তানের জন্য রক্ত বিক্রির কথা ভাবতে হয়! তোমার কি এমন দিন এসেছে টাকার বিনিময়ে স্বামী তোমাকে তার বন্ধুর হাতে তুলে দিতে চায়!

আমাকে প্রায়শই শুনতে হয় তুমি আসলে ভালোবাসতে জানো না। জানি না তো জানি না, তো কি হয়েছে! কেন ভালোবাসতে হবে আমাকে? আমি তো সবাইকেই ধরে রাখতে চেয়েছি। কেউ আমার কাছে থাকে না, কেউ আমার ভালোবাসার ভেতর থাকতে চায় না, এটা কি আমার দোষ? আমি জীবনকে সহজ করার নানা উপায় খুঁজতে থাকি। একটা অবাক ব্যাপার কি জানো, যতোবার মনোজাগতিক সমস্যায় উপনীত হই ততোবার ঘুমের মাঝে পিতা এসে সামনে দাঁড়ান। অথচ একই শহরে বসবাস করে তার সঙ্গে আমার দেখা হয় না। আমার আসলে দোষ কি আমি ভেবে পাই না, বাবা ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে রাস্তায় বের করে দিলে আমি রাস্তায়েই শুয়ে থাকি।

ওই তো স্বাতী, বৃহস্পতি, ধ্রুবতারা, সপ্তর্ষীমণ্ডল। কে একজন ঘরে নিয়ে যায়। কে হাত ধরে! কেউ না। এ কার ঘর! কারো না!

আমি ঘুরে দাঁড়াই, ঘরের ভেতর থাকি, কিন্তু কোথাও থাকি না আমি। ঘরের ভেতর নিস্পৃহ জীবন যাপন করতে থাকি আমি…পথে পা রাখি…যেন অযুত-নিযুত বর্ষ পরে পা রাখি পৃথিবীর পথে…

আজ এতো এতো আলো চারদিকে! আমার তো ঘুরে দাঁড়ানোর দিন। অথচ এই মুহূর্তে নিজেকে কবর থেকে উঠে আসা মানুষের মতো মনে হচ্ছে কেন! অবসন্ন পা যেন চলতে চায় না। যেন দীর্ঘ দীর্ঘ দিবস ও রজনী কবরের অন্ধকারে নিজেকে মেলে রাখতে রাখতে হাত পা শরীর মুখের অনেকটাই ক্ষয়ে গেছে। দু’পায়ে ভর দিয়ে শান্তভাবে মাটির ওপর দাঁড়াতে চাই, কোনোভাবেই টাল সামলানো যাচ্ছে না। এই একদিকে অধিক ভাড়ি হয়ে ঝুলে পড়ছে, পরক্ষণেই পালকের মতো হালকা। পতন আর উড্ডয়নের টাল সামলাতে সামলাতে অনেক সময়ক্ষেপণ করি। শরীরের বাইরে কিছু ভাবতে পারছি না কেন?

শরীরের বাইরে ভাবনা? কী তা? এই যেমন জীবনের দার্শনিক জিজ্ঞাসা- গল্প-কবিতা-সঙ্গীত কোনো কিছুর মধ্যেই তো মনোনিবেশ করা যাচ্ছে না। কেমন হাঁপ ধরে গেছে বুকে। একবার নাক দিয়ে নিঃশ্বাস নেই আরেকবার মুখ দিয়ে বের করে দেই। একবার বুক ভরে বাতাস গ্রহণ করি, আবার নাক দিয়ে তা বের করে দেই। যেন অনন্ত কাল ধরে এই গ্রহণ-বর্জনের খেলা চলতে থাকবে। এখন কেবল একটাই চাওয়া বুকের ভেতর ফুসফুসের ভেতর বাতাস চাই, বিশুদ্ধ বাতাস; অক্সিজেন।

হায় ঈশ্বর! এই মনোকার্বনের আস্তরণে ঢাকা নগরে আমি বিশুদ্ধ বাতাস কোথায় পাবো?

১৫/০৬/১৭

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. অসম্ভব সুন্দর! বেদনা, শোকও যে ভাষাগুণে সুন্দর হয়ে ওঠে, এই আত্মজীবনীটি যেন তারই উদাহরণ। ‘এখন কেবল একটাই চাওয়া, বুকের ভেতর ফুসফুসের ভেতর বাতাস চাই, বিশুদ্ধ বাতাস; অক্সিজেন।’

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close