Home কবিতা নুসরাত নুসিন > স্বনির্বাচিত একগুচ্ছ নতুন কবিতা ও কবিতাভাবনা >> পাঠপ্রতিক্রিয়া মাসুদুজ্জামান
0

নুসরাত নুসিন > স্বনির্বাচিত একগুচ্ছ নতুন কবিতা ও কবিতাভাবনা >> পাঠপ্রতিক্রিয়া মাসুদুজ্জামান

প্রকাশঃ September 7, 2017

নুসরাত নুসিন > স্বনির্বাচিত একগুচ্ছ নতুন কবিতা ও কবিতাভাবনা >> পাঠপ্রতিক্রিয়া মাসুদুজ্জামান
0
0

নুসরাত নুসিন > স্বনির্বাচিত একগুচ্ছ নতুন কবিতা ও কবিতাভাবনা >> পাঠপ্রতিক্রিয়া মাসুদুজ্জামান

কবিতাগুচ্ছ

প্রাগকথনকাল

হিম কোনো কুয়োর শরীরে বসে আছি।

কুয়োর মুখোমুখি।

দূরগামী সরল চোখ

ক্রমাগত নিজের দিকে ফিরে এলে

সকল সচেতন অদৃশ্যকে মনে হয়

শরীর,

ছায়ার বিপরীতে নৃত্যের ভঙ্গিমা।

একটা মন্দ ঢিল ছুঁড়ে দেখে ফেলি

একটি ভ্রুণ’র প্রতিধ্বনি

জলপতনের মতো।

 

আর তাই

কুয়ো কোনো অন্ধকার দৃঢ়তা নয়।

 

তুমি যদি কখনো কুয়োর শরীরে ফিরে আসো

তোমার শরীর জুড়ে ভেসে উঠতে থাকবে

তরঙ্গের অপূর্ণ অবয়ব

অথবা আবছায়া একটি ভ্রুণ

 

যাকে আমরা কখনো চিনি না।

 

পতন সম্পূরক

জলপতনের যেকোন শব্দে

স্খলনের কথা মনে পড়ে

পাপের কথা মনে আসে।

ভাবি,

যেকোন দিন কিছু বৃষ্টি কলসে ভরে

আমি হেঁটে যাবো বাড়ির দিকে।

 

স্বর্গ থেকে ছিটকে যাবার কালে

পতনের মহিমা এসেছিল।

সমতলের উল্টো আকাশকে ভাবতে লাগলাম

সুদৃশ্য গুঞ্জরণমালা-

চাঁদকে অতিশয় প্রিয়।

 

সন্ধ্যার তন্দ্রায় তিরতির সাপ

বুনোসাঁতার

এভাবে জলসিঞ্চনের যেকোন শব্দে

স্খলনের পৃথিবী কাছে আসে

আমার অনিন্দ্য পাপের কথা মনে পড়ে।

 

পুনরাগমনের দিকে

নিকট সুরের মতো বেজে ওঠে গমন- অধিগমন!

 

আমার নদীর দিকে ঝোঁক। নদীরা মনের দিকে ফেরে

জলেরা নদীর দিকে আর আমরা বাড়ির দিকে ফিরি।

জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যে নদী মনের দিকে ফেরে

তার শরীরজুড়ে প্রণয়ের বাঁক, ফেরার সুক্ষ্ণ যাতনা থাকে।

 

আমি যখন বাড়ির দিকে ফিরি, সঙ্গে নেই জলের কলস।

আমাকে যেতে হয় জলপাই বনের ধার দিয়ে।

কেননা আমার শরীরেও আছে অজ¯্র বাঁক।

আমি যখন মনের দিকে ফিরি লুকিয়ে রাখি গোপন তাবিজ।

কেননা আমার নদীর দিকে ঝোঁক, ফেরার দিকে ঝোঁক

আর পুনরাগমনের দিকে ঝোঁক।

 

তোমাকে যেতে হবে সন্তর্পনে। বিস্তর সবুজ হয়ে এভাবে মুহুর্মুহু ঘুরে আসা যায়

বাড়ির দিকে, জলপাই বনের দিকে।

 

সকাল তন্দ্রা গান

আজকাল ঘুম সম্পন্ন হলে চোখের কাছে ফুটে ওঠে

মেঘের নিরাকার বাড়ি

আর সুরম্য জলগ্রাম।

যেকোনো অন্ধতা ও আবেশে

কতদিন জলের শরীরে যেতে চেয়েছি।

দেখতে চেয়েছি

সেইসব জলের গোপন পরিহাস

মেঘেদের ছুটন্ত মুদ্রাবান-

দূরদর্শনের গ্রামে কেন তাদের নিরাকার

ঠিকানা আঁকা হলো,

উদ্বাস্তু অভিযোজন হলো।

 

ঘন হতে হতে একবার মেঘেদের পথে যাওয়া যেতে পারে।

সামান্য স্থিরতায় আমি এঁকে যাই

সেইসব প্রাপ্যতা

সুমধুর পত্রযাত্রা-

একটা ঠিক সময়ে

পৃথিবীতে আমার তোমাকে পাবার কথা ছিল

সম্পূর্ণ সাঁতার, নুনবিহীন জলের বয়াম

পারিবারিক যত্ন, আমার তোমাদের পাবার কথা ছিল

চেনা পথঘাট- বিবিধ কাঁঠালবাগান পাবার কথা ছিল।

 

এখন সামান্য স্থিরতায় আমি এঁকে যাই

পরিযায়ী মেঘের দর্পন

আলো আর ছায়া ফেলে

নিরাকার সকাল তন্দ্রা গান।

 

দিক জানা নেই

দিক জানা নেই।

উত্তল দৃষ্টিতে নিচ্ছিদ্র পর্দা ঝুলে আছে

ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশা কেটে চলেছি।

ধাপে ধাপে।

দৃষ্টিভ্রম অথবা স্বপ্নে নেই

তবু স্বপ্নদৌড়ের মতো অবোধ

আশ্চর্য গতিহীন।

 

বাকিসব সাঁই সাঁই

মনে হয় স্পষ্ট দিক জানা আছে।

 

কবিতাভাবনা

রক্তের ভেতরে যে নিমফল বেদনা তার ভেতরে তার প্রবাহের ভেতরে একটা একান্ত অধিকারের জায়গা আছে। কেননা এর ভেতরে বিভিন্ন মাধুর্য পরিবাহী ঝোঁক আছে। এর নাম কবিতা। রেটিনায় প্রতিবিম্ব না দেখে কেবল নিঃশ^াস ছুঁয়ে আমরা এখানে মিলতে শিখি। হৃৎপিণ্ডে শরীরের কোনো অংশ না রেখে কে কবে মিলতে পেরেছে এতটা- মানুষে!

কবিতা হয়ে পড়লো তাই মহানুভব- মিলনের অধিক সরল লীলায়িত গোপন। এখানে চোখের পাতা বেয়ে দূরের নৈকট্যকে ভালবেসে আসা যায় চুপচাপ, অদৃশ্য ছায়াকে ভাবা যায় মিলনের প্রফেট। একদম নাগালে পড়ে থাকে সময়- তার অসংখ্য প্রাণ, অভিজ্ঞান। এখানে তাই মিলতে পারার আস্বাদ আছে- অমিলনের নিঃসীম প্রস্থান আছে। তৃষ্ণায় পাপ আছে কিনা! মানুষ হয়ে পড়লো যূথ ও অযূথচারী।

আর এটা সেই কোমলগান্ধার- যা বাস্তবের চেয়ে কোমল, খুব রুঢ়, পরিণত, কল্পনার অধিক। কবিতা তার কোমল ফলা দিয়ে ভাঙছে, গড়ছে, আহত হচ্ছে রোজ। এই যে কোমলতা- এখানে আমি তুমি কেমন একাকী।

তাই কবিতার নাম দেই মহাস্পর্শ। শরীর ও আত্মা পান করা দেবালয়। আমরা কেউ না। আমরা এর মাঝখানে সাঁকো। সঙ্কট। সংস্পর্শ। আনন্দ। আমরা পেয়ে গেছি মন্দ্রমগ্ন কামুক কাঙ্খা। নিয়মিত শরীর ও আত্মা পান করি। এর বেশি কি অতিক্রম করতে পেরেছে মানুষ?

আত্মা ও শরীরের পরিচয় হলো তাই কবিতা- মানুষের পরিচয় হলো ফেরারি। আমরা একই সূত্রে গাঁথা অথচ পৃথিবী, আমি আর অমিলন এই ত্রিভূজ দুরত্বের নাম হলো অস্তিত্ব। যা শুধুই প্রহসন ও পরিবেদনা। কবিতা এই প্রহসন ও পরিবেদনাকেই উস্কে দেয়।

পাঠপ্রতিক্রিয়া > মাসুদুজ্জামান

কবিতা যে কবির মানবিক অস্তিত্বের এষণা, কে না জানেন সেটা? জানেন তাই কবিও। নিজেকে খুঁজে ফেরেন বা নিজেকেই প্রতিবিম্বিত করেন কবিতায়। কিন্তু কীভাবে সেই তানবিস্তার ঘটবে, সেটাই হলো মূল কথা। কবির আশ্রয় তো শব্দে, আবার শব্দই তাঁকে নিরাশ্রয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। যদি অনুভূতির সঙ্গে শব্দ ও শব্দবন্ধের সংশ্লেষ না ঘটে, তাহলে এমনটাই হবার কথা। হোর্হে গিয়েনই তো বলেছিলেন, কবিতা এমন একধরনের সৃষ্টি যা আসলে জলন্ত বাস্তবতার প্রেমময় নির্মাণ (অ্যাক্টস্ অব লাভ)। আর এ হলো সেই বাস্তবতা, কবির কাছে যা নিঃসন্দেহে নিজের চারপাশের প্রত্যক্ষ আর মনোময় এক পৃথিবী। কবিতা তাই শেষ অব্দি হয়ে দাঁড়ায় কবির মনোময় বাস্তবতার প্রতিভাস। নুসরাত নুসিনের কবিতাগুলি পড়তে পড়তে এমনটাই মনে হচ্ছিল।

প্রথম কবিতার শুরুতেই পড়ছি :

হিম কোনো কুয়োর শরীরে বসে আছি।

কুয়োর মুখোমুখি।

দূরগামী সরল চোখ

ক্রমাগত নিজের দিকে ফিরে এলে

সকল সচেতন অদৃশ্যকে মনে হয়

চোখ দূরগামী, কিন্তু তিনি দূরস্থিত কোনোকিছুর প্রতি অভিনিবেশ স্থাপন করছেন না, ফিরে আসছেন নিজের কাছে। দূরের যা কিছু মনে হচ্ছে অদৃশ্য। ফলে দৃশ্যময়তার যা কিছু সন্তাপ সে তো কবির নিজেরই। ফলে কবিতাটির শেষে তিনি বলেন, সবকিছুই থেকে যায় অচেনা। চেনা ও অচেনার এই যে বিভ্রম, সেই বিভ্রমই তৈরি করেন এই সময়ের কবিরা।

কবি কি তাহলে পাপভ্রষ্ট পৃথিবীর কেউ, যেমনটা বলেছিলেন বোদলের বা র‌্যাঁবো? নুসিনও মনে হয় এমনটাই মনে করেন :

স্খলনের পৃথিবী কাছে আসে

আমার অনিন্দ্য পাপের কথা মনে পড়ে।

নুসিনের কবিতার বিষয়আশয় তাই কিছুটা সরল মনে হয়, বহুচর্চিত বিষয় এসে ভর করে তার অনুভবে। কিন্তু তিনি কথা বলেন নিজস্ব স্বরে, নিজের ভঙ্গিতে।

গমন ও প্রত্যাগমনের স্মৃতি তখনই উঠে আসে তার কবিতায় :

আমার নদীর দিকে ঝোঁক। নদীরা মনের দিকে ফেরে

জলেরা নদীর দিকে আর আমরা বাড়ির দিকে ফিরি।

কিন্তু এই প্রত্যাবর্তনে জড়িয়ে থাকে বিষণ্নতা আর যন্ত্রণা বিধুর নানান অনুষঙ্গ।

কবিকে তবু পরিব্রাজকের ভূমিকা পালন করতে হয়। তার অস্তিত্ত্ব অন্বেষার ভ্রমণ কখনও শেষ হয় না।তিনি নিজেই তো বলেছেন, “কবিতাভাবনা রক্তের ভেতরে যে নিমফল বেদনা তার ভেতরে তার প্রবাহের ভেতরে একটা একান্ত অধিকারের জায়গা আছে। কেননা এর ভেতরে বিভিন্ন মাধুর্য পরিবাহী ঝোঁক আছে। এর নাম কবিতা। রেটিনায় প্রতিবিম্ব না দেখে কেবল নিঃশ্বাস  ছুঁয়ে আমরা এখানে মিলতে শিখি। হৃৎপিণ্ডে শরীরের কোনো অংশ না রেখে কে কবে মিলতে পেরেছে এতটা- মানুষে!

কবিতা হয়ে পড়লো তাই মহানুভব- মিলনের অধিক সরল লীলায়িত গোপন। এখানে চোখের পাতা বেয়ে দূরের নৈকট্যকে ভালবেসে আসা যায় চুপচাপ, অদৃশ্য ছায়াকে ভাবা যায় মিলনের প্রফেট। একদম নাগালে পড়ে থাকে সময়- তার অসংখ্য প্রাণ, অভিজ্ঞান। এখানে তাই মিলতে পারার আস্বাদ আছে- অমিলনের নিঃসীম প্রস্থান আছে। তৃষ্ণায় পাপ আছে কিনা! মানুষ হয়ে পড়লো যূথ ও অযূথচারী।

আর এটা সেই কোমলগান্ধার- যা বাস্তবের চেয়ে কোমল, খুব রুঢ়, পরিণত, কল্পনার অধিক। কবিতা তার কোমল ফলা দিয়ে ভাঙছে, গড়ছে, আহত হচ্ছে রোজ। এই যে কোমলতা- এখানে আমি তুমি কেমন একাকী।

তাই কবিতার নাম দেই মহাস্পর্শ। শরীর ও আত্মা পান করা দেবালয়। আমরা কেউ না। আমরা এর মাঝখানে সাঁকো। সঙ্কট। সংস্পর্শ। আনন্দ। আমরা পেয়ে গেছি মন্দ্রমগ্ন কামুক কাঙ্খা। নিয়মিত শরীর ও আত্মা পান করি। এর বেশি কি অতিক্রম করতে পেরেছে মানুষ?

আত্মা ও শরীরের পরিচয় হলো তাই কবিতা- মানুষের পরিচয় হলো ফেরারি। আমরা একই সূত্রে গাঁথা অথচ পৃথিবী, আমি আর অমিলন এই ত্রিভূজ দুরত্বের নাম হলো অস্তিত্ব। যা শুধুই প্রহসন ও পরিবেদনা। কবিতা এই প্রহসন ও পরিবেদনাকেই উস্কে দেয়।” কিন্তু সেই ভ্রমণও লক্ষহীন হতে হতে কোথাও যেন থিতু হতে চায় :

ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশা কেটে চলেছি।

ধাপে ধাপে।

দৃষ্টিভ্রম অথবা স্বপ্নে নেই

তবু স্বপ্নদৌড়ের মতো অবোধ

আশ্চর্য গতিহীন।

বাকিসব সাঁই সাঁই

মনে হয় স্পষ্ট দিক জানা আছে।

নুসিনের কবিতার এই জার্নিটাই ভালো লাগবে পাঠকের। তিনি নিরুদ্দিষ্ট নিরাবেগ ভ্রমণে আগ্রহী নন, কোথাও না কোথাও পৌঁছুতে চান। ফ্রস্টই তো এরকম একটা বনাঞ্চল ভ্রমণের শেষে পৌঁছেছিলেন শান্ত স্নিগ্ধ একটা লোকালয়ে, নিজের অস্তিত্বের কাছে। নুসিন, হয়তো সেভাবেই এগুচ্ছেন।

খুব বেশিদিন হয়, কবিতা লিখছেন না তিনি। অন্তত, আমি আগে তার কবিতা পড়িনি। কিন্তু কিছু দিন আগে তার কয়েকটা কবিতা পড়ে আমার মনে হয়েছে, তিনি সম্ভাবনাময় এক কবি, যার কথা বলার ধরনটা নিজস্ব। বলা কথাকেও তিনি কবিতার বাণীবন্ধে প্রকাশও করতে পারেন। এই কবিতাগুলিতে পাওয়া গেল সেই ইশারা। কিন্তু তাকে যেতে হবে আরো অনকটা পথ। শুভকামনা থাকলো নুসিনের জন্য।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close