Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ আখ্যান পথমলাটের এক পাতা > আখ্যান >> ইশরাত তানিয়া

পথমলাটের এক পাতা > আখ্যান >> ইশরাত তানিয়া

প্রকাশঃ June 30, 2017

পথমলাটের এক পাতা > আখ্যান >>  ইশরাত তানিয়া
0
0

পথমলাটের এক পাতা

কিছু অভ্যাস অনালোচিত ইতিহাস হয়ে যায়, কিছু অনভ্যাস উপেক্ষিত প্রেমিকার মতো, হলেও হতে পারত কিন্তু হয়ে ওঠে না। অভ্যস্ত ব্যাগে সময়ে বদলে যায় ক্রেডিট কার্ড, বিলের কপি, কতজনের ভিজিটিং কার্ড, খুচরো কয়েন। মলিন পুরনো হয়ে চাপা পড়ে এক সময়ের নতুন ফেসিয়াল টিস্যু। অপ্রয়োজনীয়তার সমস্তটুকু আলোগোছে ফেলে দিলে সে জায়গাটা ভরপুর হয়ে ওঠে নতুন কিছু প্রয়োজনীয় উপাচারে। এভাবেই একটু একটু বদলে যাওয়া। এভাবেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠা। হোক না সে বৃষ্টিতে ভিজে সপসপে হওয়া কি ঊষর বৃষ্টিহীনতায় চাতকের অভ্যাস। অথবা কারো কাছে থাকা কিংবা না-থাকা। সকলই অভ্যাস। অনভ্যাসের অস্বস্তিটুকু পেরোতে পারলে সেও এক যাত্রা। যেমন ধানগাছ থেকে সুপক্ক বীজের ঝরে পড়া আসলে এক অভ্যাস থেকে আরেক অভ্যাসে চলে যাওয়া।

পৃথিবী যেহেতু ঘুরছে, ঘুরছি আমিও। তাই হয়তো নিজের ভেতরটাকে স্থিতাবস্থায় কমই পাই। রিকশার চাকায়ও ঘুরছে চেনা পথ। প্রতিদিনের অভ্যস্ত পথঘাট অথচ ভালো করে তাকালে বোঝা যায়, না-দেখা রয়েছে কতটা। খানিকটা আবার স্পষ্ট-অস্পষ্টতার মাঝামাঝি কিছু। ঝিম ধরা দুপুর আশ্চর্য নরম বিকেল ছুঁই ছুঁই করে। কত না-শোনাও তখন শুনি। রিকশা চলে নিজস্ব ছন্দে। চাকা আর পথের ঘট ঘটা ঘটে মিলেছে চেইনের ক্যাচ ক্যাচ। কখনও ধীর কখনো দ্রুত লয়ের এমন সংগত গভীরভাবে কখনও কি শুনেছি? উড়ে আসছে পথের কত টুকরোটাকরা কথার খণ্ডিত অংশ। মুঠোফোনে কেউ বলছে টাকাগুলান দিলেন না, কিছু কইলেনও না… গেলেন গা। ফোনের আলোটুকু দেখা যায়। কানের পাশে জ্বলছে। ক্লাস শেষে টঙ দোকানে চা খায় ছেলে মেয়েরা। তিন কাপ চায়ের কথা বলে হাসিমুখে- মামা, আমার  চায়ে কালোজিরা দিয়েন, ওই দিন ভাল্লাগসে। দুটোর সাইজ কি একই? লেপ তোষকের দোকানে বালিশ দেখছে মধ্যবয়সী নারী। ভবঘুরের পায়ের টোকায় ছিটকে গেল সিগারেটের সোনালী ফয়েল। গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এ দাপুটে আর্দ্রতা। অযাচিত ঘাম মাথা থেকে পা অব্দি শরীরময় হাঁটছে। ভ্যানওয়ালার কালো চামড়ায় জ্বলজ্বল করে থেমে যাওয়া কয়েক ফোঁটা।

ফুল হাতে ছুটে আসে মিষ্টি মেয়েটা। এক গোছা গোলাপ কিনি বিশ টাকায়। নাম কী? জিজ্ঞেস করতেই জানালো- স্বপ্না। ওর বয়স সাত। বাবা নেই। মায়ের আলাদা সংসার। স্বপ্না থাকে নানীর কাছে। নানী ভোরে শাহবাগ থেকে ফুল কিনে দেয়। সেই ফুল দিনভর বেচে স্বপ্না। ব্যাঙ্ককের পথে পথে দেখেছি বেশিরভাগ ভ্রাম্যমান ভাজাভুজি কিংবা ফলের দোকান মেয়েরা দুহাতে সামলাচ্ছে। কোলকাতার রাস্তাও। মেয়েরা সেখানে ঝড়ের বেগে পাকোড়া-কচুরি বানায়। সাথে কচুরির অনুসঙ্গী নানান পদ। হাতে কচুরির প্লেট কি পার্সেলের প্যাকেট তুলে দিয়ে টাকা গুনে বাক্সে পুরে। বাকি টাকা ফেরত দেয়। নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই। জীবনের তাগিদে ঢাকার পথে এলোভেরা জেল চাঁছে গোলাপি। চিনি-নুন-সিরাপ মিশিয়ে দক্ষ হাতে শরবত বানায় খোলা আকাশের নিচে। স্বামী তার শ্বাসকষ্টের রোগী। রিকশা চালানোর দম পায় না। রাহেলা বারো মাস পিঠা, বেগুনীর দোকান চালায়। ফুলছাপ শাড়ির আঁচলে মাথায় আধাখানি ঘোমটা। গুনগুন করে গান গায় আর মাটির খোলায় চিতই পিঠার কাই ঢালে। বাঁ হাতে লাকড়ি ঠেলে দেয় চুলায় আর ডান হাতে পিঠা তোলে খুন্তি দিয়ে। একজন স্ট্রীট ওম্যান ওয়ার্কারের দিকে মুগ্ধ তাকিয়ে থাকি।

হাজারও সরু গলি, প্রশস্ত গলি, সরণী, এভেনিউ, রোডে ধাক্কা দিলে অবিশ্রান্ত চেনাজানা পি-পিপ, পপপপ। সে সময় বাসের পর বাস দাঁড়িয়ে অকটেনের নিঃশ্বাস ছাড়ে। হেল্পারের হাঁকডাকে ভেঙেচুড়ে পড়ছে মিরপুর দশ, এগারো, বারো। মলম আর ওষুধের প্যাকেট সাজানো ভ্যানে। মাইকে রেকর্ড বাজছে। মানব দেহের যে কোনো ব্যথা এই মলম পাঁচ মিনিটে দূর করে। আপনার খাটের কোনায় কোনায় ছারপোকা। একটু এগোলেই খালি দশ, খালি দশ…বাইচ্ছা লন, দেইখ্যা লন। মাঝে মাঝে ক্রিংক্রিং কিংবা বাইকের ভোঁও।

চেনা শহর অথচ বদলে যাচ্ছে কত জলদি। অনভ্যস্ত চোখ দেখে সারি সারি খাবারের অস্থায়ী দোকান। ঢাকায় এতো স্ট্রীট ফুড আগে দেখিনি। দোকানী তেল থেকে ছেঁকে তুলছে ফোলা ফোলা গরম আলুপুরি। মৃদু ধোঁয়া উড়ছে একটু কামড় দিতেই, যেন আলাদীনের প্রদীপ ঘষে দিল কেউ। খুশবুদার বিরিয়ানী, খিচুরির গন্ধ হাঁড়ির ঢাকনি সরালেই হৈ হৈ বেরিয়ে আসে। নুডলস, হালিমের পাশে ফুটফুটে চপ-কাটলেট। গলদা চিংড়ি ফ্রাই তাকিয়ে আছে। ঝোল-ঝোল, মুচমুচে, মাখোমাখো এক্কেবারে যেমন চাই তেমনি সমস্ত কিছু পথে পথে মিলে যাবে। একটু কোণঠাসা হয়ে পড়েছে মুড়িচানাচুর আর ঘুগনিমটর। ইদানীং কিছু দূর পর পর ছোটখাট কোল্ড কফি, শরবতের দোকান, জুস বার। শুধু আম, জাম? উঁহু! সে বড় সেকেলে। এবার স্ট্র বেয়ে উঠে শুষ্ক গলায় ভালোবাসা ঢেলে দেয় বরফকুচি লাগা কতবেলের শরবত।

অনভ্যস্ততাকে নিজের সাথে এভাবেই একটু একটু মিলিয়ে নেই। কত সব বিকল্প আয়ের উৎস খুঁজে নিয়েছে মানুষ। জিডিপির প্রবৃদ্ধি এখন সাত দশমিক এগার। ছয় শতাংশের ঘরে ঘুরপাক খেয়ে অবশেষে সাতে পা। কে ছাই গুনে গুনে মোট জাতীয় আয়ে এদের অবদানের শতকরা হিসাব বের করে? এরা অন্তত ইভটিজিং করছে না, ছিনতাই করছে না। খেটে খাওয়া লোক। পথ চলতি ব্যস্ত, কর্মজীবী লোকের খাবার জুটিয়ে চলছে।

হৈহট্টগোলে চৌমোহনীতে দাঁড়িয়ে ভাবি, পথের চারটি বিন্দু মিলেছে যেখানে, সেখানে থেকে আসলে খুলে গেছে চারটি দ্বিধাহীন পথ। একটি পথে আমরা বহুদূর হাঁটি। বাকি তিনটি পথ রবার্ট ফ্রস্টের ‘দ্যা রোড নট টেকেন’ হয়ে গভীর ঘুমিয়ে পড়ে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনিশ্চয়তায় কোনোদিন কি বলব-‘যদি ফিরে যেতে পারতাম!?’ এই অভ্যস্ত রাজপথ শেষ অব্দি হয়তো কোনো এক আলপথে মিশেছে আর আলপথ গিয়ে পৌঁছেছে মহাকালের পথে।

একটু পরই মোড়ে মোড়ে জ্বলবে সাঁঝবাতি। আগরবাতির গন্ধে আহ্লাদী হবে সন্ধ্যাবেলাটা। গতিময়তায় বিরামহীন দুপা চালাই আমি। পেছনে অবলীলায় পড়ে থাকে হাওয়ায় ভাসা পথচলতি কথকতা।

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close