Home যুক্তি তক্ক গপ্প পাঁচ কবির আড্ডা / বিষয় : ‘এই সময়ের সাহিত্যচর্চা’ [পর্ব ২]

পাঁচ কবির আড্ডা / বিষয় : ‘এই সময়ের সাহিত্যচর্চা’ [পর্ব ২]

প্রকাশঃ January 28, 2017

পাঁচ কবির আড্ডা / বিষয় : ‘এই সময়ের সাহিত্যচর্চা’ [পর্ব ২]
0
0

[সম্পাদকীয় নোট : আড্ডা। বাঙালির চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতাকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে। ‘এইসময়ের সাহিত্যচর্চা’ নিয়ে কথা বলার জন্যে কিছু দিন আগে এরকমই একটা আড্ডায় কবি জাহিদ হায়দারকে ঘিরে মেতে উঠেছিলেন কবি মাসুদুজ্জামান, ফরিদ কবির, সাখা্ওয়াত টিপু অরবিন্দ চক্রবর্তী। সেই আড্ডায় উপস্থিত কবিদের আলাপচারিতায় উঠে এসেছিল সমকালীন সাহিত্যচর্চার নানান প্রসঙ্গ। তুমুল তর্ক-বিতর্কে মেতে উঠেছিলেন তারা। আজ প্রকাশিত হলো ওই আড্ডার দ্বিতীয় পর্ব। উল্লেখ্য, আড্ডাবাজ কবিরা ওই আড্ডায় যা বলেছেন তা তাদের নিজস্ব মত, তীরন্দাজের নয়।]

Part-2

জাহিদ হায়দার : আমরা কি একটা ভ্যালুয়েবল আড্ডা বা কোয়ালিটিফুল আড্ডা কি আগেও দিয়েছি, যেটা আমরা মনে করছি এখন একেবারেই নাই?

ফরিদ কবির : আড্ডার ক্যারেক্টারে কখনো এটা হবে না।

অরবিন্দ চক্রবর্তী : একজন লেখকের প্রবণতা হওয়া উচিত…যেমন আমি যেহেতু কবিতা লিখি, আমার বিষয়আশয় আমার চলাফেরা, আমার সবকিছুর ভিতরে একটা কবিতাবোধ থাকা জরুরি।

জাহিদ হায়দার : এই সমস্যাটা বুদ্ধদেব বসুর ছিল। উনি যেখানেই যেতেন, পুরো পরিবেশটিকে ভাবতেন যে, আমি একটি কবিতার আবহে আছি। মানুষ তো তা না।

অরবিন্দ চক্রবর্তী : মানুষ তা না। কিন্তু আমি যখন একজন কবির সাথে বসি, তার সাথে নিশ্চয়ই আলু-পটলের…

জাহিদ হায়দার : না না, আমি এর সাথে দ্বিমত পোষণ করছি এই কারণে যে, কবি হচ্ছে শয়তান এবং দেবদূতের সংমিশ্রণে তৈরি একটি প্রাণী। সে যদি আলু-পটলের ভেতরে সৌন্দর্য খুঁজে পায়, সেটা হচ্ছে শিল্প আলোচনা। একটা সংখ্যায় ছাপা হয়েছে- ‘কালি ও কলমে’র। রবীন্দ্রনাথের লেখা। এটা কোথাও নাকি সংকলিত হয়নি। ওখানে নতুন কবিতার উপরে বক্তৃতা দিচ্ছেন উনি। সেখানে উনি বলেছেন, ভালো কবিতা হচ্ছে যেটাতে পজিটিভ সেন্স থাকে। রবীন্দ্রনাথ এখানে নেগেটিভ-পজিটিভ ডিফার করছেন। আমরা আলোচনা করছিলাম, প্যারির রাস্তায় একটি লাশ দেখছে প্রেমিক প্রেমিকা। কিন্তু ক্যাথারসিস্ট নিয়ে কথা হচ্ছে, সেখানে কিন্তু পজিটিভ ব্যাপার আসতে পারে। মজার বিষয় হচ্ছে, আমাদের কিছু সাজানো কথা আছে, সেই সাজানো কথা ভেঙে ফেললেই আমরা ভাবি ওখানে হয়তো যৌনতা ঢুকতে পারে। মনে করেন, এখানে একজন নারী ছিল কিছুক্ষণ আগে। আমি রসিকতা করে ঐ নারীকে বললাম, আপনার গলাটা সুন্দর, আপনি গান করলে ভালো হত। তিনি খুশি হন। কিন্তু তারপর যদি বলতাম, আপনার গ্রীবা সুন্দর। তাহলে আপনারা কেউ বলতেন, সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট। ইউরোপের একটি ছেলে-মেয়ের সাথে আড্ডা দিতে বসলে যৌনতা নিয়ে কথা বললে কোনো অশ্লীলতা হয় না, কারণ এটি জীবনের অংশ। এখন কবিরা বা লেখকরা যখন বসবে, তখন কবিতার আলোচনা হতে পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে সেটাই সেন্ট্রাল হবে। বুদ্ধদেব বসুর বাসায় সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, জ্যোতির্ময় দত্ত, বুদ্ধদেব বসু- এরা সব যাচ্ছেন, আড্ডা মারছেন; সেখানে বুদ্ধদেব ধরেই নিতেন এখানে অন্যধরনের কথা বলা যাবে না। বুদ্ধদেবরা কোনোদিন কারো নিন্দে করতেন না, কক্ষনো না।

অরবিন্দ চক্রবর্তী : পরচর্চা জিনিস তো ভালো, জাহিদ ভাই।

জাহিদ হায়দার : না, পরচর্চা হচ্ছে শিল্পের পরচর্চা আর ব্যক্তির পরচর্চা, দুইটা কিন্তু দুইরকম। যেমন, রবীন্দ্রনাথের লেখার কোনো কোনো বাক্য রবীন্দ্রনাথ এইখানে ভুল লিখেছেন- সমাপিকা ক্রিয়া এবং অসমাপিকা ক্রিয়া এইসব রবীন্দ্রনাথ বুঝতেন কিনা তাই নিয়ে কথা হতো না।

মাসুদুজ্জামান : আমি কিন্তু একটা জিনিস ডিফার করি। ছোট ছোট গোষ্ঠীর মধ্যে নিজের গোষ্ঠীর কাউকে না কাউকে ভালো লাগতেই পারে; যেমন ফরিদের খুব অনুরাগী ৪ জন তরুণ কবি আছে। ফরিদকে তারা বড় কবি মনে করতেই পারে, এটা কিন্তু অস্বাভাবিক নয়। এরকম জাহিদকে বা টিপুকেও মনে করতে পারে। তাহলে দাঁড়াচ্ছে তিনজনই এখানে প্রধান কবি। অন্যরা যাদের সমর্থন করছে তারা অপ্রধান বা একটু গৌণ। এভাবে চিন্তা করাটা কিন্তু অযৌক্তিক। এখানে যারা সমর্থন করছে তাদেরকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হবে যে তারা কী কী কারণে কাদের সমর্থন করছেন, বড় কবি বলছেন। অথবা কোন কোন কারণে কাদের লেখা ভালো লাগছে। এ ব্যাপারে আমার কোনো দ্বিমত নাই। এটা নিয়ে প্রবল লড়াই হইতে পারে, প্রবল ঝগড়াও হতে পারে। বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে, মার্কসবাদী কবিদের সাথে অমার্কসবাদী কবিদের ঝগড়া হয়েছে। সিদ্ধেশ্বর সেনরা একরকম কবিতা লিখছে বা ঐ সময় কৃত্তিবাসের মধ্যেও দু-তিন রকমের ধারা দেখা গেছে, আমাদের এখানেও দেখা গেছে। কিন্তু এখন এটা আরো প্রবল আকার ধারণ করেছে। আমি মনে করি, এই দ্বন্দ্বটা থাকতেই পারে, কারণ এটা হচ্ছে শিল্পের মধ্যে একেকজনের পছন্দের অপছন্দের দ্বন্দ্ব। এই চর্চার ভিতর দিয়ে একজন কবির সত্তাটা কিন্তু উঠে আসে অন্যান্য পাঠকদের কাছে। কিন্তু এর খারাপ দিকটা হচ্ছে, যদি ব্যক্তি আক্রমণ করা হয়। যদি কবিতা বা লেখাকে ভুলে গিয়ে ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হয়। আমাদের এখানে দেখতে পাচ্ছি, এই ব্যক্তি-আক্রমণ চলছে বা ব্যক্তি-স্তুতি। দুইটাই খারাপ। এ যেন ঠিক পীরপুজার মতো ব্যাপার হয়ে গেল।

ফরিদ কবির : আপনার সাথে আমি একটি জায়গায় দ্বিমত করি। আমরা দেখেছি যদি সাহিত্যের ‘মুগ্ধ’ আলোচনা হয়, তাহলে তা গুরুত্বের জায়গায় থাকে না। ছোট ছোট গোষ্ঠীবদ্ধ কবিরা মনে করেন, তারা যেরকম কবিতা লিখছেন, কবিতা কেবল সেরকমই হওয়া উচিত। এটা কিন্তু একটা বড় বিপদের বিষয়।

মাসুদুজ্জামান : সহমত, তারা নিজেরা যেন একটা ছক তৈরি করে নিয়েছে।

ফরিদ কবির : এদের কেউ বলছে ছন্দ মানি না। আবার কেউ বলছে কবিতা ছন্দেই হতে হবে। এদের মতামত কিন্তু একধরনের ফ্যানাটিক মতামত। যারা ছন্দে লিখছেন তারা ভাবছেন ছন্দের বাইরে কবিতা হয় না। আবার যারা ছন্দে লিখছেন না, তারা মনে করেন ছন্দের মধ্যে আবদ্ধ থেকে ভালো কবিতা লিখা সম্ভব না। ‘গাণ্ডীব’ একসময় মনে করত, তাদের বাইরে আর কেউ কবিতা লিখছেই না। এমনকি আরো ভাবছে, বাকি কোনো লিটলম্যাগও আসলে লিটলম্যাগ না। আলোচনার ব্যাপারটা তখনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন নিরপেক্ষভাবে আলোচনা হয়।

মাসুদুজ্জামান : আমিও সেটাই বলছি, মুগ্ধতার বা বিরূপ আলোচনা নয়, আলোচনা নিরপেক্ষ হওয়া দরকার আর তা হওয়া উচিত লিখিত আলোচনা। তাহলে কে কী যুক্তি দিচ্ছে সেটা বোঝা সম্ভব। যে ছন্দ পছন্দ করে সে তার পক্ষে যুক্তি দিতে পারে, কিন্তু আক্রমণাত্মক হওয়া উচিত নয়। কারণ কবিতায় ছন্দ এবং ছন্দহীনতা- দুইয়েরই ইতিহাস আছে এবং দুটোই কিন্তু গ্রাহ্য।

জাহিদ হায়দার : কিন্তু প্রথমত কবিতা হতে হবে।

অরবিন্দ চক্রবর্তী : জাহিদ ভাই, সবাই কিন্তু একই কথা বলছে যে ‘কবিতা হতে হবে’।

সাখাওয়াত টিপু : আমি উদাহরণ স্বরূপ বলি, পথের পাঁচালী উপন্যাসটা। একটা আড্ডা করা হয়েছিল, ওখানে নিরোদ সি চৌধুরী ছিলেন। উনি বিভূতিভূষণকে বললেন, পাঁচালী-মাচালী এগুলো হবে না, আমরা তো এখন মডার্ন হয়ে গেছি। সাহিত্যে পাঁচালী শব্দটা এখন বেমানান। তবে তোমার উপন্যাসটা ভালো। উপন্যাসের ভিতরে ভালো কিন্তু নামটা ভালো না। তখন বিভূতিভূষণ খুব মন খারাপ করলেন। অনেক প্রকাশকের কাছে গেলেন, কিন্তু এরকম নামের কারণে কেউ বইটা বের করতে চাইলো না। সবশেষে সজনীকান্ত দাস উপন্যাসটা পড়তে চাইলেন, পড়ে দেখলেন উপন্যাসটা বেশ ভালো, কেবল নাম নিয়ে একটা সংকট। বিভূতিভূষণ নাম পাল্টালেন না, তবু সজনীকান্ত বইটা ছাপালেন। এখানে কিন্তু আমরা বলতে পারছি না, পরচর্চা জিনিসটা খারাপ।

জাহিদ হায়দার : পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম ঘটনা বহুবার ঘটেছে। যেমন দশজন ভালো লেখক বলেছেন, এটা ভালো লেখা নয়, কিন্তু হঠাৎ করে একজন বলেছেন, এটা একটু অন্যরকম। আমাদের এখানেও ঘটেছে এরকম, কিন্তু আমরা ঠিক ঠিক তথ্যগুলি জানি না, কারণ এর ডকুমেন্টেশন নেই।

ফরিদ কবির : এর একটা কারণ হতে পারে, যেমন আমাদের এখানে অগ্রজেরা তাদের পরবর্তী প্রজন্মের যারা লিখছেন তাদের বিষয়ে কিন্তু মুখ খোলেননি। আবার অগ্রজদের পূর্ব-অগ্রজেরাও কিন্তু তদ্রূপ পরবর্তীদের নিয়ে মুখ খোলেননি। কিন্তু দেখেন, জয় গোস্বামীকে নিয়ে শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন। কিন্তু আমাদের এখানে কিন্তু অগ্রজেরা তাদের নিয়েই লেখেন যারা তাকে নানাভাবে তোয়াজ করে। বাংলাদেশের শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ থেকে শুরু করে এমন কোনো কবি নাই যারা আনওয়ার আহমেদ সম্পর্কে লিখেন নাই। কারণ তিনি যেহেতু অনেক খাওয়াতে পারতেন। আমি তার নিন্দা করছি না। তারা কিন্তু স্বতপ্রণোদিত হয়ে কাউকে নিয়ে লেখেননি।

জাহিদ হায়দার : আমি নিজের সম্পর্কে বলি, এর আগে আমি যখন ফরিদের পত্রিকায় সাক্ষাতকার দেই, সেখানে কিন্তু আমি কয়েকজন কবির নাম বলেছি। ব্রাত্যর নাম বলেছি, আপনার নাম বলেছি, বদরে মুনীরের নাম বলেছি। বদরে মুনীর কোথায় থাকে আমি জানি না, চিনিও না তাকে। আমি তার একটি কবিতা পাঠের আসরে বেঙ্গলে কবিতা শুনতে গেছি। আমি গিয়ে বলেছি, আমি কেবল আপনার কবিতা শুনতে এসেছি। এটা হচ্ছে আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে আমি আপনার সাথে সম্পূর্ণ একমত যে, আমরা সাধারণত আমাদের পরবর্তী সময়ের তরুণ লেখকদের নিয়ে লিখি না। যেমন নওশাদ জামিলের কবিতার বই আমি পড়েছি, আমি ইমেইলে তাকে লিখেছি। যেমন রহিমা আফরোজ মুন্নি, তাকে আমি একটি দীর্ঘ চিঠি লিখেছি ইমেইলে। আমি তাদেরকে বিস্তারিত লিখেছি যে, তাদের কবিতা কোথায় কোথায় আমার কী রকম লেগেছে এবং কী কী জিনিস নেই। কারণ একেকজনের চিন্তার স্তর আলাদা। এটা বিশ্বজনীন। যেমন রবীন্দ্রনাথকে একজন বলেছিল, অমুক তো আপনার লেখার ঐ রকম অর্থ করলো। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ওর চিন্তার মান তো ঐটুকুই।

মাসুদুজ্জামান : আমি নিজে কিন্তু বইমেলা চলাকালে একবার হিজল জোবায়ের, আল ইমরান সিদ্দিকী, বিজয় আহমেদের বইগুলি যখন বেরোয়, ফেসবুকে তাদের সপ্রশংস দীর্ঘ লেখা লিখেছি, কাভারসহ ওদের ছবি দিয়ে। কাজেই, এটা কিন্তু আমরা করি না তা না। তবে খুবই কম। অগ্রজরা তো এটা একেবারেই করেন না। অনেক তরুণ কবি তাই আমাকে বলেছে, আপনি তরুণদের নিয়ে লেখেন এটা তো আর কেউ করেন না। বিষয়টা ঠিকিই।

অরবিন্দ চক্রবর্তী : আমি একটি প্রশ্ন করি। জাহিদ ভাই, আপনি কি মনে করেন না, তরুণদের বিষয়ে আপনার পর্যাপ্ত পড়াশোনা আছে।

জাহিদ হায়দার : মনে করি আছে, আমি দাবী নিয়ে এটা বলতে পারি।

অরবিন্দ চক্রবর্তী : আমি এ বিষয়ে একটু দ্বিমত পোষণ করছি। নওশাদ জামিল, রহিমা আফরোজ মুন্নী, হিজল জোবায়ের তাদের বাইরে আরও অনেকে কিন্তু প্রচুর ভালো কবিতা লিখছে। সেই তথ্যগুলা বা এর বাইরে কি কারো কবিতা আপনার ভালো লাগে না?

জাহিদ হায়দার : আমার এই মুহূর্তে এই নামগুলি মাথায় আসলো। এখানকার লিটলম্যাগ যতগুলো বেরোয়, তার বেশিরভাগ আমি কিনে পড়ার চেষ্টা করি। দৈনিক কাগজে যা বের হয় আমি কিনে পড়ার চেষ্টা করি। যেমন মুক্তি মণ্ডল নামে এক ছেলে আছে, তাকে আমি কোনোদিন দেখিনি। আমি তখন দেশের বাইরে থেকে তার কবিতা পড়লাম প্রথম আলোতে। ভালো লেগেছে। পড়াটা এভাবেই হয়।

[চলবে]

অনুলিখন : আরিফ শামসুল 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close