Home যুক্তি তক্ক গপ্প পাঁচ কবির আড্ডা [শেষ পর্ব] >> ‘জীবনানন্দের কবিতাও বুঝতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ’

পাঁচ কবির আড্ডা [শেষ পর্ব] >> ‘জীবনানন্দের কবিতাও বুঝতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ’

প্রকাশঃ February 7, 2017

পাঁচ কবির আড্ডা [শেষ পর্ব] >> ‘জীবনানন্দের কবিতাও বুঝতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ’
0
0

[সম্পাদকীয় নোট : আড্ডা। বাঙালির চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতাকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে। ‘এইসময়ের সাহিত্যচর্চা’ নিয়ে কথা বলার জন্যে কিছু দিন আগে এরকমই একটা আড্ডায় কবি জাহিদ হায়দারকে ঘিরে মেতে উঠেছিলেন কবি মাসুদুজ্জামান, ফরিদ কবির, সাখা্ওয়াত টিপু অরবিন্দ চক্রবর্তী। সেই আড্ডায় উপস্থিত কবিদের আলাপচারিতায় উঠে এসেছিল সমকালীন সাহিত্যচর্চার নানান প্রসঙ্গ। তুমুল তর্ক-বিতর্কে মেতে উঠেছিলেন তারা। আজ প্রকাশিত হলো ওই আড্ডার পঞ্চম ও শেষ পর্ব। উল্লেখ্য, আড্ডাবাজ কবিরা ওই আড্ডায় যা বলেছেন তা তাদের নিজস্ব মত, তীরন্দাজের নয়।]

পঞ্চম ও শেষ পর্ব

“আগে যেটা হয়েছে, বেশিরভাগের মধ্যে কবিতা পাওয়া যেত, কমের মধ্যে বিমূর্ত কিছু থাকত। এখন উল্টো।” – ফরিদ কবির

“এই জেনারেশনের একজন কবিকেও পাওয়া যাবে না, যে সত্তরের কবিতা সেইভাবে পড়েছে। কিন্তু আমি তো পড়ি তাহলে পারস্পরিক বোঝাপড়াটা হবে কি করে? কবিতার ধারাটাই বা তারা বুঝবে কী করে – আমি তরুণদের কথাই বলছি।” – মাসুদুজ্জামান

“কোনো বড় কবি ভালো গদ্য লিখতে পারে, ওই অর্থে তো আপনার কোনো ভালো গদ্য নাই। আপনার এমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ নাই। আমরা কবি হিসেবে পড়িনি। এটা আপনি কীভাবে দেখেন?” – সাখাওয়াত টিপু

“আপনি পরবর্তী জেনারেশনের কবিতাকে মনে করছেন দুর্বোধ্য। এই যে তরুণদের কবিতা ভালো না-লাগা, এই বিষয়টাকে আপনি কী মনে করেন? জেনারেশন গ্যাপ? নাকি ঘাটতি আছে?” – অরবিন্দ চক্রবর্তী

১১untitled

জাহিদ হায়দার : হ্যামলেটকে যখন পলেনিয়াস জিজ্ঞেস করছেন- হোয়াট আর ইউ ডুয়িং মাই লর্ড? তিনটি কিন্তু অসাধারণ ওয়ার্ড, মানে শব্দ। মাইকেল মধুসূদন বলছেন- শব্দে শব্দে বিয়া দেয় যে, সে-ই কবি। প্রতিটি ইনডিভিজুয়াল তার মতো করে জীবনকে দেখেন। একজন সিদ্ধার্থ যখন নদী পার হন, তখন তিনি নদী নিয়ে অনেক দার্শনিক কথা বলেন।

সাখাওয়াত টিপু : যেটা বললেন, কালো অক্ষরগুলো থাকবে। উল্টোটাও তো আছে কবিতায়। যেমন- শাদা পৃষ্ঠার চেয়ে তুমি যদি একটা ভালো কবিতা লিখতে পারতা, তাইলে আরো অনেক ভালো হইত। আপনার এই যে দৃষ্টিভঙ্গি, যা বলছেন…মায়াকভস্কির তো একটা থিওরিটিক্যাল পজিশন ছিল… একটা ইস্তেহার দিয়েছেন তার সময়কালে- ফিউচারিজম। এটা এসেছে রুশ রিয়েলিজম থেকে রুশ বিপ্লবের পর। এই পরিবর্তনগুলো তো নানাভাবে আসে। পিকাসোর কথাও বলা যায়। ধরেন যে-কোনো একটা আন্দোলনের প্রভাব…হেনরি মুরের কথা বলেন। আমাদের নজরুলের মধ্যেও আছে। ফলে, তিনি ১৯২২ সালেও কিন্তু মুক্তি’র মতো কবিতা লিখেছেন, আরো আছে অগ্নিবীণা বা  বিশের বাঁশি। আমি বলতে চাচ্ছি যে, এগুলি কি একদমই সময়ের কবিতা?

মাসুদুজ্জামান : আমি ওর সঙ্গে একটু পরিপূরকভাবে বলি- সময়ের অভিঘাত তো সব কবিতাতেই থাকবে। প্রশ্নটা হচ্ছে, তুই স্থায়ীত্বের দিকটা গুরুত্ব দিয়েছিস। বুদ্ধদেব বসু এই কথাটিই বলতে চেয়েছেন- সময়ের অভিঘাত থাকলে বা প্রাধান্য পেলে, সেই কবিতা টেকে না। কিন্তু এও তো ঠিক- কোনো কোনো অসাধারণ কবিতা আছে যে কবিতাগুলো রাজনৈতিক। নেরুদার কবিতা আছে, ফয়েজ আহমদ ফয়েজের কবিতা আছে, মায়াকভস্কির আছে – যেগুলো এখনো পড়ি আমি। আমার কাছে মনে হয় এগুলো রাজনৈতিক এবং উত্তীর্ণ কবিতা। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, কবিতাটি উত্তীর্ণ কিনা। বুদ্ধদেব বসুর প্রতি অভিযোগ ছিল যে, তিনি অতিমাত্রায় ‘আর্টস্ ফর আর্টস্ সেক’-এর কথা বলেছেন, ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ – এর বাইরে যেতে পারেননি। তুই বুদ্ধদেব বসুর একটা প্রবন্ধও দেখাতে পারবি যেখানে দার্শনিক দিক দিয়ে কোনো আলোচনা আছে; সমাজতাত্ত্বিক দিক থেকে, নৃতাত্ত্বিক দিক থেকে কিংবা রাজনৈতিক দিক থেকে? আমি দেখিনি। তিনি দেখেছেন শব্দ, উপমা, চিত্রকল্প, অর্থাৎ শৈলীর দিকটা তার কাছে প্রধান হয়ে উঠেছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সাহিত্যের আলোচনা করেছেন। এই সমালোচকরা কিন্তু আমাদের সর্বনাশ করেছেন। আমি একটা জিনিস বলতে চাই, বুদ্ধদেব বসু যেমন শুধু নন্দনতাত্ত্বিক দিক দেখেছেন, তেমনি আবদুল মান্নান সৈয়দও এই সর্বনাশটা করেছেন। কিন্তু দেখ, জীবনানন্দ দাশ কিন্তু এর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি কবিতার কথা বইতে ইতিহাসচেতনা বা কালজ্ঞানের কথা বলেছেন। শুধু তাই নয়, জীবনানন্দ দাশের মতো রাজনৈতিক কবিতাও খুব কম কবিই লিখেছেন এবং তার অনেক কবিতাই এখনো কালের চিহ্ন মুছে দিয়ে চিরায়ত হয়ে গেছে। এই যে ভূমেন্দ্র গুহ যে সম্পাদনাটি করলেন বেঙ্গল পাবলিকেশনস থেকে, জীবনান্দনের তাবৎ কবিতা নিয়ে একটা একক সংকলন করলেন, ‘জীবনানন্দ দাশের কবিতা : মূলানুগ পাঠ’ নামে, তাতেই দেখা যাবে কত বিচিত্র ধরনের রাজনৈতিক কবিতা জীবনানন্দ লিখেছেন এবং কত চমৎকার কবিতা সেসব। ওঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে, অর্থাৎ আত্মজৈবনিক কবিতা যে কত আছে- ভাবা যায় না। রাজনৈতিক কবিতাও প্রচুর। আমি যেটা বলতে চাই, আমরা কিন্তু খুব বেশি- বিশেষ করে ষাটের যারা সমালোচক তারা প্রচণ্ডভাবে বুদ্ধদেব বসুর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কবিতার সমালোচনা করেছেন, এখানে। দুইভাবে তারা প্রভাবিত হয়েছেন- একটা হচ্ছে বিশুদ্ধ সাহিত্যের মধ্যে থেকে যাওয়া; আরেকটা হচ্ছে বোদলেয়ারের আধুনিক ভাবনার বাইরে না আসতে পারা। ফলে আমাদের সমালোচনা-সাহিত্যও দেশজ হতে পারেনি। তুই এমন একজন সমালোচককেও পাবি না যিনি কিনা প্রাচ্য (ভারতীয়) ও প্রতীচ্যের কাব্যতত্ত্বের আলোকে কবিতা বা সাহিত্যের সমালোচনা করেছেন। দর্শন, ইতিহাসবোধ, সামাজিকবোধ, নৃতত্ব, এই যে বিশাল যোগাযোগের সূত্র তৈরি হলো গতশতকে – সংবাদপত্র ও বৈশ্বিক যোগাযোগ কাঠামোর মধ্যে আধুনিক বা উত্তর-আধুনিক মানুষেরা চলে এলো, এসব কথা কারো সাহিত্য বা কবিতার সমালোচনায় পাওয়া গেল না। বাংলাদেশে বিশ্বমানের সমালোচনা-রীতিটাই তাই দাঁড়ালো না।

20160927_181217
ফরিদ কবির

জাহিদ হায়দার : প্রিয়তমা সুন্দরিমারে যে আমার উজ্জ্বল উজ্জ্বল…

মাসুদুজ্জামান : … বোদলেয়ার তো। ষাটের কবিদের সমস্যাটা কোথায়, আরেকটু বলে শেষ করি। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘ভালোবাসার সাম্পান’টা পড়েছিস? দেখবি, এর পাতার পর পাতায় আছে বিপন্ন মানুষের কথা, এই বাংলাদেশের মানুষের কথা। সেখানে নিঃসঙ্গতা, একাকীত্ব, অনিকেত চেতনা, জীবন অর্থহীন কিছুই নেই, নষ্ট হয়ে যাওয়া, অর্থাৎ প্যারির রাস্তায় রাস্তায় বোদলেয়ার যেভাবে চলতেন…তার পুরোটা অনুসরণ করা হয়েছে বুদ্ধদেবের অনুবাদের সূত্র ধরে। কিন্তু পরবর্তীকালে দেখলাম কী? দেশ কিন্তু স্বাধীনতার উদ্দীপ্ত সময়ের দিকে এগিয়ে গেল। তাহলে উনসত্তরের আগে আমাদের লেখকেরা কেন ভবিষ্যতের বাংলাদেশের কথা বলতে পারলো না? কারণ তারা সমকালের রাজনীতিটা ধরতে পারেনি, যে রাজনীতির মহানায়কের আবির্ভাব তখন বাংলাদেশে ঘটে গেছে। অর্থাৎ ষাটের কবিরা ভুল ইন্টারপ্রিটেশন করলেন। প্রথম এই সময়টাকে ধরেছেন নির্মলেন্দু গুণ তার ‘হুলিয়া’ কবিতায়। আমার কাছে শঙ্খ ঘোষের একটা কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। আমি মনে করি, শঙ্খ ঘোষ সমকালীন আধুনিকতার অনেক গভীর এবং ভালো ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আধুনিকতার দুটো মুখ আছে- একটা মুখ নেতির দিকে, আরেকটা ইতিবাচক। এই যে নেরুদার কবিতার কথা উল্লেখ করলাম, তুই বুদ্ধদেব বসুর কোনো লেখায় তার কথা পেয়েছিস? পাবি না। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের পেয়েছিস? নাই। অথচ তুই দেখবি, এদেরকে তিনি ডিসকার্ড করেছেন, একেবারে আউটরাইট ডিসকার্ড করেছেন। গণনার মধ্যেই আনেননি। এটা তো ঠিক হয়নি। এখন ব্যাপারটা হচ্ছে এইখানে, শঙ্খ ঘোষ যখন বলছেন- ইতিবাচক দিকও আছে আধুনিকতার মধ্যে, নেতিবাচক দিকও আছে। এই দুইয়ের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই চলেছেন আধুনিক কবিরা। জীবনান্দের মধ্যে এই দুইয়ের সম্মিলন ঘটেছে আর এ জন্যেই কিন্তু জীবনানন্দের স্থান বাংলা কবিতায় সবার উপরে।

জাহিদ হায়দার : (একটা শাদা কাগজে বিন্দুর মতো কিছু বিমূর্ত চিহ্ন দেখিয়ে) টিপু, এগুলি কি কবিতা?

সাখাওয়াত টিপু : হতে পারে।

অরবিন্দ চক্রবর্তী : হতে পারে।

জাহিদ হায়দার : পড়বেন কীভাবে?

সাখাওয়াত টিপু : চিহ্নই কবিতা।

অরবিন্দ চক্রবর্তী : এই বিরামচিহ্নগুলোই কবিতা…।

জাহিদ হায়দার : এটা পড়া যাবে না তো। মিরোস্লাভ হোলুবের কবিতা এটা।

মাসুদুজ্জামান : বর্ণমালা নিয়েও তো কবিতা আছে। এ থেকে শুরু করে জেড পর্যন্ত…

জাহিদ হায়দার : এই চিহ্নগুলো দেখার সাথে সাথে আপনি পাঠক অথবা দর্শক অনেকগুলি প্রশ্ন, মৃত্যু, দর্শন ইত্যাদি ইত্যাদি মনে পড়ে যাবে। কিন্তু পড়তে পারবেন না। কবিতা নৈঃশব্দ্য, নৈঃশব্দ্যই কবিতা যেভাবেই বলেন না কেন, এটা ঘটে গেছে। যে কোনোভাবেই হোক, আমরা আমাদের বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিত থেকে, আলোচনা থেকে যে দশকওয়ারি বিভাজনগুলো ঘটিয়ে ফেলা হয়েছে- চিন্তায় চেতনায়…যেমন বুদ্ধদেব বসু বলছিলেন সুনীলের লেখা দেখে- এদের কবিতা আমি বুঝতে পারছি না। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- বিষ্ণু দে-র কবিতা বুঝতে পারছেন না…

20160927_181301
সাখাওয়াত টিপু

সাখাওয়াত টিপু : জীবনানন্দের কবিতাও বুঝতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ।

জাহিদ হায়দার : কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যে মন্তব্যটি করেছেন সেই মন্তব্যটির উপরেই কিন্তু সবাই আলোচনা করে। ‘চিত্ররূপকল্পময়’ কবিতা বলেছিলেন উনি। এর উপরেই সবাই আলোচনা করে। এই কথাগুলি সুনীলের বইতে আছে, জীবনানন্দ দাশ বলেছেন- কবিতা অনেক রকম হয়। কিন্তু নিজের জীবনে একরকম কবিতাই লিখে গেছেন। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিত থেকে বলা যায়, ’৭০-এর পরে থেকে শব্দের ব্যয়াম আমরা করেছি যত, কবিতা তত লিখিনি। আমি এর আগে দুজন কবিকে তাদের কবিতার শব্দ দেখিয়ে বলেছি, এই শব্দের অর্থ কী বলেন তো? তারা জানেন না, বলেছেন। এমনিতেই নাকি বসিয়ে দিয়েছেন। আমি নাম বলতে চাই না, গীবত গাওয়া হবে।

মাসুদুজ্জামান : শুধু শব্দ না। আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে, আমি নিজেও লক্ষ্য করেছি, শব্দ বা কিছু কিছু ভালো লাগতে পারে বা নতুন মনে হতে পারে, এরকম কিছু কিছু শব্দবন্ধ, তিন-চারটে শব্দ মিলে একটা বাক্যাংশ তৈরি করেন অনেকে। এবং আমি এও অদ্ভুতভাবে লক্ষ্য করেছি ফেসবুকে ঐ কবিতাগুলো পোস্ট করার পরে ঐ জায়গাগুলোই সবাই পিকআপ করেছে, বলছে- এই জায়গাটিই সুন্দর হয়েছে, এই জায়গাটিই চমৎকার কবিতা। অথচ খণ্ডভাবে একটা-দুটো শব্দ ধরে কবিতা ভালো কী ভালো নয়, বলার ব্যাপারটা কতকাল আগে শেষ হয়ে গেছে। কেননা, কোনো কবিতার কোনো খণ্ডাংশ তো কবিতা নয়। একটা সামান্য অংশ কবিতা হতে পারে না। কবিতা একটা সামগ্রিক ব্যাপার। টোটাল ব্যাপার। কিন্তু এখনকার অনেক কবি, আমার কাছে মনে হয়েছে, এই জায়গাটায় আবার আটকে গেছে। গত ১০-১৫ বছর একনাগারে এরকম কবিতাচর্চার কারণে ব্যাপারটা এখন ক্লিশ হয়ে গেছে। আশির থেকেই ধরি, আশির কবিদের মধ্যে কিন্তু অন্য ব্যাপার ছিল। তারা কিন্তু শব্দের বা উপমা ধরে বা শব্দ ধরে কবিতার চর্চা করেনি। তারা কিছু বলতে চেয়েছে। কিছু বোঝা গেছে, কিছু বোঝা যায়নি, কিন্তু একধরনের ইম্প্রেশন বা প্রতীতি তারা জাগাতে পেরেছে তাদের কবিতাতে। কিন্তু এখনকার কবিতাতে আমি দেখতে পাচ্ছি কোনো কোনো কবিতা এত বিমূর্ত যার কোনো অর্থ খুঁজে পাই না। কিন্তু আমার তো কবিতাপাঠের – বাংলা কবিতার ও বিশ্বকবিতার – অভিজ্ঞতা আছে। নতুনভাবে কবিতা কোথায় কী বাঁক নিয়েছে তারও তো খোঁজ রেখেছি। তাহলে, আমার প্রশ্ন আমাদের কবিতা, সবার কথা বলছি না, অধিকাংশ তরুণ কবি ভালো লিখছেন, কিন্তু বিমূর্ততা যেন অনেকের কবিতাকেই অর্থহীন করে তুলছে, যা ঠিক কবিতা নয়।

ফরিদ কবির : আগে যেটা হয়েছে, বেশিরভাগের মধ্যে কবিতা পাওয়া যেত, কমের মধ্যে বিমূর্ত কিছু থাকত। এখন উল্টো।

মাসুদুজ্জামান : আমি একথাটি বলছি এ কারণে যে, এরা কিন্তু পরস্পরের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। তুই (জাহিদ হায়দারকে লক্ষ করে) তো ফেসবুকে থাকিস না, তুই এটা জানিস না। এটা তোর অজানা থেকে যাচ্ছে। এভাবে অজানা থাকাটা কিন্তু তুই পরে ফিল করবি।

জাহিদ হায়দার : খাবার টেবিলে যখন কাঁচ লাগানো হয়, সেটা ফ্যাশন। যখন কাঠ লাগানো হয়, সেটা ক্লাসিক। জিনিসটা বুঝতে হবে। খুব পরিষ্কার উদাহরণ। ফেস ইজ চেঞ্জিং ফ্রিকোয়েন্টলি। আপনি যখন ফেসবুকে এইসব করছেন তখন এইসবের বড় ওস্তাদ যদি ধরা হয়, তবে তিনি হচ্ছেন বিল গেটস। তার লাইব্রেরি গাড়ির ভিতরে, প্লেনের ভিতরে, অফিসে, ঘরে, সব জায়গায়। তিনি এইগুলি পড়েনও না, দেখেনও না। মুনীর চৌধুরীকে যখন বলা হত যে, ‘আচ্ছা আপনি তো রেডিওতে যাচ্ছেন টকশো দিতে, আপনি কিছু লিখে নিয়ে গেলেন না কেন?’ বলতেন- ‘হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে।’ মুনীর চৌধুরীর বিখ্যাত ডায়লগ- ‘হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। ফেসবুকের জায়গাগুলি এত দ্রুত ওইভাবে হাওয়ায় হয়তো মিলিয়ে যাবে। যেমন আমি আমার ভাইস্তাকে জিজ্ঞেস করছি এই ইংরেজি শব্দের অর্থ কী? ও সেভেনে পড়ে। ও বের করে দিয়েছে। আমি পনের মিনিট পরে আরেকটা জিজ্ঞেস করেছি। আবার বের করতে গেছে। আমি তখন বলেছি- তুই যন্ত্রের ভিতরে থাকবি, না মাথার ভিতরে থাকবি? ফেসবুকের আনন্দ হচ্ছে এই সময়ের। তাৎক্ষণিক।

মাসুদুজ্জামান : তুই কি মোবাইল ফোনের ব্যবহারকে  অস্বীকার করতে পারিস? তাহলে ল্যান্ডফোন ইউজ করিস না কেন? তুই প্রযুক্তির মধ্যে চলবি, প্রযুক্তির মধ্যে থাকবি, কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহার করতে গিয়ে সেটাকে ডিসকার্ড করবি?

জাহিদ হায়দার : ফেসবুক আর মোবাইল কিন্তু অন্য জিনিস। প্রযুক্তি এক জিনিস আর প্রযুক্তিতে সাহিত্য করা আরেক জিনিস।

মাসুদুজ্জামান : প্রযুক্তিতে সাহিত্য করছে, তা তো না। প্রযুক্তিটা ব্যবহার করছে মিডিয়া হিসেবে। ফেসবুক ইজ এ মিডিয়া। মিডিয়া এন্ড ক্রিয়েশন ইজ ডিফারেন্ট- আমিও জানি সেটা। আমি একটা কবিতা লিখছি, তারপর সেটা প্রকাশ করছি কবিতার বইয়ে, কম্পিউটারে কিংবা ফেসবুকে। আমি কোন মিডিয়ার আশ্রয় নেব সেটা আমার ব্যাপার। এই মিডিয়াটাকে – ফেসবুককে কি তুই অস্বীকার করতে পারবি? কীভাবে? তুই তো সংবাদপত্র এবং টেলিভিশনকে অস্বীকার করছিস না!

জাহিদ হায়দার : মিডিয়া তাৎক্ষণিক সুখ দেয়।

মাসুদুজ্জামান : তুই গান শুনিস। তাৎক্ষণিক সুখ পাস না? মিডিয়ার সূত্রেই সবকিছুর চর্চা। শুধু তার রূপটা বদলেছে, এই যা- সংবাদপত্র থেকে ফেসবুকে।

জাহিদ হায়দার : আমি তো তা-ই বলছি। মিডিয়া তো তাৎক্ষণিক সুখ দেয়।

সাখাওয়াত টিপু : জাহিদ ভাই আমি একটা কথা বলি। আপনি যে মুনীর চৌধুরীর রেফারেন্স দিলেন- রেডিও হাওয়ায় চলে যাবে। কিন্তু ফেসবুক কিন্তু একটা ডাটা সোর্স। আরকাইভের মতো।

মাসুদুজ্জামান : আমি টিপুর সাথে একমত। আড়াই হাজার বছর ধরে, ধরা যাক, প্লেটো থেকে বই লেখা শুরু হয়েছে। তারা যে দার্শনিক চর্চাটা শুরু করেছিল সেখান থেকে শুরু করা যাক। দেখা গেছে ৫০০ বছরে এই কম্পিউটার/ইন্টারনেট আসার আগে যে জ্ঞানচর্চা হয়েছে, তার পরবর্তী ৫ বছরে সেই পরিমাণ জ্ঞানচর্চা হয়েছে। আড়াই হাজার বছরে যে জ্ঞানচর্চা হয়েছে তার পরিমাণ যত, গত মাত্র দশ বছরে তার পরিমাণ বেড়েছে দ্বিগুণ- বিজ্ঞানীরাই এটা বলছেন। এও বলছেন, প্রতি ১২০ দিনে এখন পৃথিবীর জ্ঞান দ্বিগুণ হচ্ছে শুধু ইন্টারনেটের কারণে, ইন্টারনেট স্টোরেজের কারণে। এই জন্য ইউনেস্কো বলেছে, জাতিসংঘ বলেছে- টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি হবে সেঞ্চুরি অব ইনফরমেশন।

সাখাওয়াত টিপু : আমি একটু অ্যাড করি? ধরেন, এখনকার যে ওয়েস্টার্ন টেকনোলোজি, বই তো তারা গোডাউনে রাখে না। তারা কম্পিউটার মেমোরিতে রাখে।

অরবিন্দ চক্রবর্তী : জাহিদ ভাই, বইয়ের বিরুদ্ধে কিন্তু কেউ কথা বলছেন না।

মাসুদুজ্জামান : তুই ভেবে দেখ, আমি ইন্টারনেটে অ্যারিস্টটলের গ্রিক ভার্সনের একটা বই হুবহু পেয়ে যাচ্ছি।

জাহিদ হায়দার : আমার পয়েন্ট তো সেখানে না। তুই কয়েকবার স্টোরেজ শব্দটা বলেছিস। এখন কথা হচ্ছে যে, এই যে আড্ডা মারছি আমরা এখানে- একটা ইনফরমেশনের জন্য যদি আমাকে যন্ত্রের কাছে যেতে হয় তাহলে মাথার কাজ কী?

মাসুদুজ্জামান : মাথার একটা সীমাবদ্ধতা আছে- কতখানি স্টোরেজ করতে পারে মানুষের মাথা?

জাহিদ হায়দার : মানুষের মস্তিষ্কের সীমাবদ্ধতা নাই, এটা ভুল করছো।

মাসুদুজ্জামান : আছে।

সবাই : আমরা অন্য প্রসঙ্গে চলে যাই…

মাসুদুজ্জামান : আমি মনে করি, এখন তরুণ হিসেবে অরবিন্দ এবং টিপু প্রশ্ন করুক।

সাখাওয়াত টিপু : আমার দুইটা প্রশ্ন [১] আপনার সময়ে আপনি নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা ভাবেন কিনা এবং আলাদা হলে সেটা কীভাবে? [২] কোনো বড় কবি ভালো গদ্য লিখতে পারে, ওই অর্থে তো আপনার কোনো ভালো গদ্য নাই। আপনার এমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ নাই। আমরা কবি হিসেবে পড়িনি। এটা আপনি কীভাবে দেখেন?

জাহিদ হায়দার : দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে আগে আসি। আমি এখনো প্রবন্ধ লেখার জন্য যে যুক্তি-কাঠামো, যে ব্যাপক পড়াশুনা, সে জায়গাটায় তৈরি নই। এই কারণে আমি প্রবন্ধ লিখতে পারি না। আমি লিখতে গিয়ে দেখেছি যুক্তি দিয়ে লিখতে যে ভাষার ক্ষমতা দরকার হয়, সেটা আমি এখনো অর্জন করিনি। ভালো গদ্য লিখব কি খারাপ গদ্য লিখব এ ব্যাপারে কারো কাছে আমি দায়বদ্ধ না। আমি তো গদ্যই লিখি না। এখন ১ নম্বর প্রশ্নের উত্তরে বলি, আমি আলাদা কিনা। আমি আপনাকে প্রশ্ন করি, আমার পরবর্তী জেনারেশন হিসেবে আপনি আমার মধ্যে কিছু আলাদা পেয়েছেন কী?

সাখাওয়াত টিপু : না আমি পাই নাই।

জাহিদ হায়দার : গুড। এ প্রেক্ষিতে আমি কিন্তু আপনাকে অনেকগুলো প্রশ্ন করতে পারি, আপনি কী কী পান নাই? এখন আমি যদি বলি, হ্যাঁ, আমি আলাদা কিছু করবার চেষ্টা করেছি। ৬টি কবিতার বই আমি লিখেছি। আমি কিন্তু আলোচনার শুরুতে বলেছি, প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব চিন্তা-চেতনার ভিত্তিতে লিখতে চায়। যেহেতু আপনি মনে করেন না, আপনার মনে করার পেছনে অনেক যুক্তি থাকতে পারে। আমি ব্যর্থ হতেই পারি, কিন্তু আমার চেষ্টায় অসততা ছিল না। প্রথম বইয়ের যে ভাষা এবং বিষয়, তা দ্বিতীয় বইয়ের ভাষা এবং বিষয় থেকে আলাদা। নাট্যবিদরা বলেন, বিষয় পৃথিবীতে ২১টির বেশি নেই। আমার ৬টি বই যদি বিচার করেন, আমি আমার আত্মবিশ্বাস থেকে বলছি, পার্থক্য কিন্তু আছে।

20160927_181226
অরবিন্দ চক্রবর্তী

অরবিন্দ চক্রবর্তী : আপনার একটা কবিতার ভালো লাগাটা বলে রাখি। একটা কবিতা নিয়েই আমি বলছি। আপনি চিরুনী বিক্রি করছেন মন্ত্রণালয়ের সামনে। এই যে কবিতাটা, এটা আমার ভালো লেগেছিল। আপনি পরবর্তী জেনারেশনের কবিতাকে মনে করছেন দুর্বোধ্য। এই যে তরুণদের কবিতা ভালো না-লাগা, এই বিষয়কে আপনি কী মনে করেন? জেনারেশন গ্যাপ? নাকি ঘাটতি আছে?

জাহিদ হায়দার : আমি বলেছি, কোনো কোনোভাবে আমার চিন্তাচেতনায় প্রাচীনতা আছে। এটা সুন্দর কি অসুন্দর এটা অন্য ব্যাপার। আমি ঐ কবিতাকেই ভালো মনে করি, যেটাকে আমি মনে রাখতে পারি।

অরবিন্দ চক্রবর্তী : আমি একটা জিনিস দাবি করি। আপনি যে টেক্সটা নিয়ে কথা বলছেন, এই টেক্সটার নিকট হয়ত আপনারা আসেননি অথবা এই টেক্সটা আপনাদের কাছে যায়নি। এখনকার কবিতা পড়েননি।

জাহিদ হায়দার :’৮০ থেকে প্রথম দশকের ৪টি সংকলন আমার কাছে আছে। এর বাইরে টেক্সট কোথায়?

মাসুদুজ্জামান : এখানে একটি ব্যাপার বলা দরকার। আমাদের পঠনপাঠনের দিকটা। দেখা যাচ্ছে, এখনকার জেনারেশন আমাদের কবিতা পড়ে না এবং আমাদের জেনারেশনের অধিকাংশই এই জেনারেশনের কবিতা পড়ে না। এই জেনারেশনের একজন কবিকেও পাওয়া যাবে না, যে সত্তরের কবিতা সেইভাবে পড়েছে। কিন্তু আমি তো পড়ি তাহলে পারস্পরিক বোঝাপড়াটা হবে কি করে? কবিতার ধারাটাই বা তারা বুঝবে কী করে – আমি তরুণদের কথাই বলছি।

সাখাওয়াত টিপু : ব্যর্থ কবি বা কবিতাকে আপনি কীভাবে চিহ্নিত করবেন?

জাহিদ হায়দার :  যে কবি আমাকে নেয় না সেই ব্যর্থ কবি।

সাখাওয়াত টিপু : ‘নেয় না’ মানে কী?

অরবিন্দ চক্রবর্তী : নেয় না? নাকি যেতে পারেন না?

জাহিদ হায়দার : খুব ভালো প্রশ্ন করেছেন। আমি আবার ওই কথাতেই ফিরে আসি, আমার বুদ্ধির স্তর ওই পর্যন্তই- যে-পর্যন্ত গ্রহণ করে এবং ত্যাগ করে। যেমন রাব্বি আহমেদ নামে এক কবির কবিতা পড়লাম। কবিতাটা পড়ার সাথে সাথে পুরোটা মাথার ভিতরে ঢুকে গেল।

সাখাওয়াত টিপু : (ফেসবুকে চোখ রেখে) হক ভাই (সৈয়দ শামসুল হক) মারা গেছেন।

সবাই : মারা গেছেন ! ওহ্ !

মাসুদুজ্জামান : আজকেই ওরকম নিউজ ছিল, হক ভাইকে আইসিইউতে নেয়া হয়েছিল।

জাহিদ হায়দার : এরপর আর আলোচনা এগোবে না।

সবাই : আমরা সৈয়দ হক-এর প্রতি সম্মান জানিয়ে আলোচনাটা শেষ করি। সবাই একটু দাঁড়াই। দাঁড়িয়ে তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করি।

মাসুদুজ্জামান : কবির মৃত্যু হয়, কবিতার মৃত্যু নাই।

[শেষ]

অনুলীখন : আরিফ শামসুল, সহযোগী সম্পাদক, তীরন্দাজ।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close