Home অনুবাদ পাবলো নেরুদা > বিশ্বকবিতা সিরিজ-১ >> অনূদিত কবিতাগুচ্ছ, নোবেল ভাষণ ও কবিজীবনী

পাবলো নেরুদা > বিশ্বকবিতা সিরিজ-১ >> অনূদিত কবিতাগুচ্ছ, নোবেল ভাষণ ও কবিজীবনী

প্রকাশঃ September 24, 2017

পাবলো নেরুদা > বিশ্বকবিতা সিরিজ-১ >> অনূদিত কবিতাগুচ্ছ, নোবেল ভাষণ ও কবিজীবনী
0
0

পাবলো নেরুদা

বিশ্বকবিতা সিরিজ-১

অনূদিত কবিতাগুচ্ছ

সুভাষ মুখোপাধ্যায় অনূদিত >>

ভুলতে পারছি না

যদি আমাকে জিগ্যেস করো কোথায় ছিলাম

বলতে হবে ‘এই রকমই হয়’,

বলব পাথরে পাথরে ঢেকে-যাওয়া জমির কথা

থেকেও যে নিজেকে খুইয়ে ফেলে, সেই নদীর কথা বলব।

আমি শুধু জানি পাখিদের হারানো জিনিস,

পেছনে ফেলে-আসা সমুদ্র কিংবা আমার বোনের কান্না।

কেন আলাদা এত অঞ্চল, কেন দিনের

পায়ে পায়ে দিন আসে? কেন কালো রাত

মুখের মধ্যে ঘনায়? মৃতের দল কেন?

 

কোথা থেকে এসেছি। যদি জিগ্যেস করো তাহলে ভাঙা জিনিসগুলোর কথা আমাকে তুলতে হবে,

ভয়ানক তেতো তেতো সব হাঁড়িকুড়ি,

প্রায়শ পচা বিশাল বিশাল সব জানোয়ার,

বলতে হবে আমার ব্যথায় কাতর হৃদয়ের কথা।

 

পরস্পরকে কাটাকুটি করা স্মৃতি নয়। সেসব

বিস্মৃতির রাজ্যে ঘুমিয়ে পড়া ছাইরঙা পায়রাও তারা নয়

চোখের জলে ভাসা সেসব মুখ,

গলায় তাদের আঙুল দেওয়া,

পাতার সঙ্গে টুপটাপ খসে পড়া,

একটি অতিক্রান্ত দিনের অন্ধকার,

যে দিনটিকে গিলিয়েছি। আমরা আমাদের দুঃখী রক্ত

দেখ ল্যাজঝোলা পাখি, দেখ বেগনে ফুল

যা কিছু আমাদের অসম্ভব ভাল লাগে৷

লম্বা ঝুলওয়ালা কার্ডের ছাপা ছবিতে যাদের দেখতে পাও

আর ভেতর দিয়ে বেড়িয়ে বেড়ায় সময় আর মাধুর্য।

 

কিন্তু এই দাঁতগুলো পেরিয়ে আর যেন আমরা ভেতরে না যাই

নৈঃশব্দ্যের জমানো খোলাগুলোর গায়ে যেন দাঁত না বসাই,

কেননা আমি কী উত্তর দেব আমি জানি না-

 

কত যে মরছে তার ইয়ত্তা নেই,

লাল রোদ্দুরে ছিন্নভিন্ন হয়েছে কত যে বাঁধ,

জাহাজের গায়ে ঠুকে গেছে কত যে মাথা,

চুম্বনের সময় গণ্ডি দিয়ে ঘিরেছে কত যে হাত,

এমনি আরও কত কিছু আমি ভুলতে চাই৷

 

মাটির স্বর্গে

শুচিশুভ্র একটি মেয়ের পাশে আজকে শুয়ে ছিলাম

যেন ধবল পারাবারের সংলগ্ন বেলাভূমিতে,

জ্বলন্ত এক নক্ষত্রের কেন্দ্ৰস্থলে

মন্থর ঠাই।

 

দীর্ঘায়িত সবুজ তার চাহনি থেকে

ঝরে পড়েছে আলো শুকনো জলের মতন,

তরুণ তাজা প্ৰাণশক্তির স্বচ্ছ এবং

গভীর বৃত্তে।

 

তার বক্ষ হুবহু দুই শিখার আগুন

উত্তলিত দুই এলাকায় প্রজ্জ্বলিত,

বুকে দ্বিগুণ নদীর নাগাল উদার অবাধ

পায়ের পাতায়।

 

জলে হাওয়ায় ধরাচ্ছে রং, পাকাচ্ছে রস

সারা অঙ্গে তারা আহিব্রুক দ্রাঘিমারেখা

ভরিয়ে দেয় দূরপ্রসারী ফল এবং

জাদুর আগুন।

 

আর কিছু নয়

আমি সত্যের সঙ্গে কড়ার করেছিলাম

দুনিয়ায় আবার এনে দেব রোশনাই।

 

আমি হতে চেয়েছিলাম অন্নের মতন।

সংগ্রামে আমি নেই এমন কখনও হয়নি।

 

আর যা ভালবাসতাম আমি এখন তার ঠাইতে,

আমার হারানো নির্জনতার মাঝখানে।

এই পাথরের কোলে আমার ঘুম নেই।

 

আমার নীরবতার মধ্যে সমানে খেটে চলেছে সমুদ্র৷

 

টমেটোর ভজন

টমেটোয়

টইটুম্বুর রাস্তা

ভরদুপুর,

গ্রীষ্ম,

রোদ

ভেঙে পড়ে

দু-

আধখানা

টমেটোয়,

ছুটে যায়

রস।

ডিসেম্বরে

টমেটোরা

বাঁধন ছেড়ে,

এসে চড়াও হয়

প্রাতঃরাশ, কবজ করে,

তাকগুলোতে

গা

ঢেলে দেয়,

বাটি গেলাস

মাখনের পাত্র

নীল লবণদানির সঙ্গে

গা ঘষে।

টমেটোর আছে

নিজস্ব চেকনাই,

বেশ একটা রাজকীয় ভাব।

কি যে বিচ্ছিরি

খুন আমাদের করতেই হবে

ওর জ্যান্ত কোমল অঙ্গে

ঢুকে যায়

একটা ছুরি,

লাল

আঁতড়ি,

এক তরতাজা

অতল

অফুরন্ত সূর্য

চিলি-র

আনাজ ভরে দেয়,

রাঙা টুকটুকে পেঁয়াজকে

হাসিমুখে পাত্ৰস্থ করে,

আর ভোজের জন্যে

জলপাই গাছের

নির্যাস

অপত্য স্নেহ

হাঁ-করা দুই গোলার্ধে

দু-হাতে

ঢেলে দেয়,

তাতে যোগ হয়

মশলার সুঘ্ৰাণ,

মন মজায় নুন,

বেজে উঠল, শোনো—

দিনের বিয়ে বাদ্যি :

ধনে পাতা

তুলে ধরছে টুকটুকে নিশান,

টগবগ টগবগ করছে আলু,

কাবাবগুলো ম’ ম’ করে

গন্ধ নিয়ে

দরজায়

ঘা দিচ্ছে :

সময় হয়েছে!

চলো বসে পড়ি।

আর টেবিলের

ওপর,

গ্রীষ্মের মেখলায়,

বহুগণিত

আর উর্বর তারাগুলো

তাদের সংবর্তন,

আর পরিপূর্ণতার

আর প্রাচুর্যের

খেল্ দেখাচ্ছে

হাতছাড়া,

খোলা, বা আঁশ বা কাটা বিনা

গরগরে

আর বিলকুল গরম-গরম

ভূরিভোজ৷

 

শামসুর রাহমান অনূদিত >>

 আমরা হারিয়েছি

এমনকি এই গোধূলিকে হারিয়েছি আমরা দুজন। নীল

রাত্রি পৃথিবীতে বিন্দু বিন্দু ঝরাল যখন, এ সন্ধ্যায় কেউ

আমাদের দ্যাখেনি, দ্যাখেনি আমাদের হাতে হাত রাখা।

 

আমার জানালা থেকে দেখেছি সুদূর

পর্বতচূড়ায় সূর্যাস্তের উৎসব।

 

কখনো কখনো একটুকরো রোদ মুদ্রার মতন

জ্বলেছে আমার দুটি হাতের ভেতর।

 

বিষাদে আঁকড়ে থাকা সত্তায় তোমাকে

করেছি স্মরণ আর আমার সে বিষাদ তোমার পরিচিত।

 

তখন কোথায় ছিলে তুমি?

আর কে ছিল সেখানে তখন?

কী-ই বা বলেছে?

 

যখন বিষগ্ন আমি আর ভাবি তুমি বহুদূরে, তখন সমস্ত

প্ৰেম অতর্কিতে কেন আমাকে করবে অভিভূত শুধু একটি আঘাতে?

 

সে বই, যা সর্বদা বদলে যায় গোধূলিতে, পড়ে গেল আর

আমার ফতুয়া চেটে-খাওয়া কুকুরের মতো পড়লে গড়িয়ে

আমার পায়ের কাছে।

 

সর্বদা, সর্বদা তুমি এই সব সন্ধ্যার ভেতর দিয়ে যাও,

ফিরে যাও সেখানে, যেখানে

গোধূলির রঙ মূর্তিদের ঘষে তুলতে তুলতে চলে যায়।

 

আজ রাতে আমি লিখতে পারি

আজ রাতে আমি সবচেয়ে বিষণ্ন পঙক্তিমালা লিখতে পারি।

যেমন উদাহরণস্বরূপ লিখতে পারি, রাতটি বিচূর্ণ

এবং নীল নক্ষত্রমালা দূরে কম্পমান।

রাতের হাওয়া আকাশে ঘুরে ঘুরে গান গায়।

আজ রাতে আমি বিষণ্নতম পঙক্তিমালা রচনা করতে পারি।

আমি ওকে ভালোবাসতম এবং কখনো সে আমাকেও ভালোবাসত।

 

আজকের মতো অনেক রাত জুড়ে আমিও তাকে ভালোবাসাতাম

কী করে কেউ ওর দিঘল, প্রশান্ত চোখ ভালো না বেসে পারবে?

সে আমার ভাবনার নয়, তাকে হারিয়ে ফেলেছি অনুভব করা—

আজ রাতে আমি বিষন্ন পঙক্তিমালা রচনা করতে পারি।

শোনো, তার বিহনে অধিকতর ভারাক্রান্ত আত্মার কবিতা

ফসল-খেতে শিশিরের মতো ঝরে।

 

আমার ভালোবাসা ওকে ধরে রাখতে পারেনি।

এতে কী এসে যায়? চূৰ্ণবিচূর্ণ হয়েছে এই রাত আর সে

আমার সঙ্গে নেই।

এটাই সব। দূরে গান গাইছে। কেউ, দূরে তাকে হারিয়েছে

বলে আমার আত্মা সস্তুষ্ট নয়।

আমার দৃষ্টি তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, যেন তার কাছে যেতে

চাইছে। আমার হৃদয় ওকে খুঁজছে, আর সে আমার সঙ্গে নেই।

 

একই রাত্রি একই গাছগুলোকে শাদা করে ফেলছে।

সেই সময়ের আমরা আর একরকম নাই।

 

আমি আর ওকে ভালোবাসি না, এটা নিশ্চিত! অথচ

কী ভালোই-না ওকে বাসতাম! আমার কণ্ঠস্বর তার শ্রুতিকে

স্পর্শ করার জন্যে বাতাসকে খুঁজত।

অন্যের, সে অন্যের হয়ে যাবে। আমার আগের চুমোর মতো

তার কণ্ঠস্বর, তার উজ্জ্বল শরীর, তার অসীম নয়ন।

 

এটা নিশ্চিত আমি আর ওকে ভালোবাসি না, কিন্তু

হতে পারে আমি ওকে ভালোবাসি। ভালোবাসা

এত ক্ষণস্থায়ী, বিস্মৃতি বড় দীর্ঘস্থায়ী।

 

কারণ, এ রকম রাতে আমি তাকে আমার বাহুতে

জড়িয়ে ধরেছিলাম; আমার আত্মা তাকে হারিয়ে ফেলেছে।

 

যদিও আমাকে সে এটা শেষ যন্ত্রণা হিসেবে ভূগিয়েছে

এবং এই শেষের কবিতা তার উদ্দেশেই লিখেছি।

 

মাসুদুজ্জামান অনূদিত >> 

নারীশরীর

 

নারীর শরীর, শ্বেত শৈলচূড়া, শুভ্র ঊরু,

তুমি দেখতে এই ধরণীর মতো, সমর্পিতা, শয়ান।

বন্য চাষার মতো আমার শরীর তোমাকেই খুঁড়ে খুঁড়ে চলে

আর পৃথিবীর ভূমিতল থেকে উঠে আসে এক ছেলেশিশু।

 

সুরঙ্গের মধ্যে আমি ছিলাম একা। পাখিরা পালিয়ে গেছে,

প্রবল বিক্রমে রাত আমাকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলেছে।

আমি পরাভূত ছিলাম তার উত্তাল বিপুল প্লাবনে।

শুধু নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তোমাকে অস্ত্র করে তুলেছি,

তুমি যেন আমার ধনুক থেকে ছোঁড়া তীর, জ্যা থেকে নিক্ষিপ্ত পাথরকুচি।

 

কিন্তু আঘাতের সময় আর নেই, আমি তোমাকে ভালোবাসি।

মসৃণ ত্বকের শরীর তোমার, শ্যাওলার, পরিপুষ্ট স্তন দুধে ভরা।

হে আমার বৃত্তাকারে ঋদ্ধ মোহিনী স্তনের নারী! অনুপস্থিত চারুচোখ!

গোলাপের মতো রঙিন যোনি! আহ, সে যে কী মধুর কণ্ঠ,

মৃদু আর বিষণ্ন।

 

হে আমার নারীর শরীর, তোমার সুষমাতেই আমি চিরকাল থেকে যাব।

আমার তৃষ্ণা, আমার অন্তহীন বাসনা, তোমার পথেই পথ বদলে বদলে চলবে!

ঘনকৃষ্ণ নদীকূল, তাতেই আমার অন্তহীন তৃষ্ণা চিরকাল বহমান থাকবে

পিছু পিছু ছুটে আসবে অবসাদ, আর ঘনিয়ে উঠবে অনিঃশেষ বেদনা অপার।

 

অতল নির্জনতায় আবিষ্ট ছায়ায়

অতল নির্জনতায় আবিষ্ট ছায়ায় ভাবছি তোমার কথা

তুমি চলে গেছ বহুদূরে, সবার কাছ থেকে অনেক অনেক দূরে

ভাবছি তোমাকে, পাখিদের দিয়েছি মুক্তি, বাকপ্রতিমার প্রয়োজন নেই,

নিভিয়ে দিয়েছি আলো

 

আরো অনেক দূরে ওই শিখরে কুয়াশার মিনার

কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে যায় বিলাপে, চূর্ণ হয় ছায়াচ্ছন্ন আশা,

তোমার সুখের পরে নেমে আসে নতমুখী রাত, শহর থেকে দূরে

হে নারী।

 

তোমার উপস্থিতি এখন তেমন একটা নেই, অপরিচিত তোমার মুখ

নতুন একটা জিনিসের মতো

তোমার সঙ্গে পরিচয়ের সেই আগের জীবনটা নিয়ে ভাবছি,

কেমন ছিল আমার জীবন অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার আগে?

আমার কঠোর, কর্কশ, বন্যজীবন।

সমুদ্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চিৎকার,

পাথুরে পাহাড়ের গা ছুঁয়ে উচ্ছ্বসিত দৌড়ুনো

সমুদ্রের ফেনায়

ক্রোধ, বিষণ্নতা, চিৎকার, নিঃসঙ্গতা সমুদ্রের,

উত্তাল ঢেউয়ের মুখোমুখি, আকাশশূন্যে উৎক্ষিপ্ত।

 

হে নারী। তুমিও কি তখন সেখানে ছিলে, সমুদ্রের বিপুল

ডানায় একটা পালক, আলোর ধারায় একচিলতে রাত

এখনকার মতো তখনও তুমি ছিলে এমনই সুদূর।

 

বনের মধ্যে লাগলো আগুন, আগুনের কম্পমান নীল শিখা

পোড়ায় বন, চারিদিকে আলোর গাছে আলোর বিচ্ছুরণ!

 

কে আমাকে ডাকে? এ কোন প্রতিধ্বনিময় নীরবতা?

স্মৃতি-বেদনার ক্ষণ, আনন্দের ক্ষণ, একাকীত্বের ক্ষণ

ওদের সঙ্গে সঙ্গে আমারও ক্ষণমুহূর্ত।

বাতাসের ধ্বনি যেন গান গেয়ে ওঠে মেগাফোনে,

আমার শরীরে এ-কী কান্নার দমক আবেগ।

ঢেউয়ের আঘাতে শিকড়ে ক্রমাগত লাগে টান।

হৃদয়ের আনন্দময় নিরুদ্দেশ ভ্রমণ, বিষাদে কীর্ণ, অন্তহীন

তোমার কথা ভাবছি আমি, নির্বাপিত দীপাধার গভীর নির্জনতা,

কে তুমি? কে তুমি?

 

আঘাত

প্রিয়তমা, আমি তোমাকে আহত করেছি,

তোমার হৃদয়কে আমি করেছি ছিন্নভিন্ন।

 

আমাকে বুঝতে চেষ্টা কর।

সবাই জানে, কেমন আমি,

কিন্তু সেই ‘আমিই’ তো

তোমার পার্শ্ববর্তী বিশেষ মানুষ।

 

তোমার কাছে এলেই আমি কেমন যেন টলোমলো,

পড়ে যাই, আবার উঠে দাঁড়াই, জ্বলন্ত।

অন্য সবার মাঝে তোমারই জানার

অধিকার আছে কোথায় আমার দুর্বলতা।

যখন কোনো যুদ্ধটুদ্ধ থাকবে না

তোমার রুটি আর গিটার আঁকড়ে-ধরা ছোট্ট হাত

আমার বুক ছুঁয়ে দেবেই।

 

তোমার মাঝেই তাই আমি খুঁজি দার্ঢ্য

আমার খরখরে হাত তোমার রক্তের মধ্যে ঢুকিয়ে দিই

খুঁজি তোমার সেই কাঠিন্য আর সেই

গভীরতা যা আমার চাই,

যদি আমি খুঁজে পাই

তোমার ধাতব হাসি, যদি

আমার টলোমলো পা ফেলার ভারসাম্য

তোমার কাছে নাও পাই

তবু তুমি আমাকে ভালোবেসো, মেনে নিও

আমার দুঃখ আর ক্রোধ,

আমার শত্রুপ্রতিম হাত

তোমাকে হয়তো কিছুটা হলেও

ক্ষতি করেছে

তবু কাদার ভেতর থেকে তুমি আবার

উঠে দাঁড়াবেই

আমাকে আবার তুমি সংগ্রাম করবার শক্তি জোগাবে।

 

বিকাশ গণ চৌধুরী অনূদিত >>

কেন বিশালকায় উড়োজাহাজগুলো

তাদের ছানাপোনাদের নিয়ে ওড়ে না?

 

কোন হলুদ পাখি

লেবু দিয়ে তার বাসা ভরায়?

 

কেন তারা হেলিকপ্টারগুলোকে

সূর্যালোক থেকে মধু চুষতে শেখায় না?

 

কোথাও পূর্ণিমা রেখেছিল

আজ রাতে তার ময়দার বস্তা?

 

আমায় বলো, গোলাপ কি বিবসনা

নাকি ওটাই ওর জামা?

 

কেন গাছেরা লুকিয়ে রাখে

তাদের শিকড়ের জাঁক?

 

কারা শোনে অপরাধী গাড়িদের

পরিতাপ?

 

বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের থেকে

বিষণ্ন কিছু কি পৃথিবীতে আছে?

 

৩৪

যেসব গুণ আমি ভুলে গিয়েছি সেগুলো দিয়ে

আমি কি একটা নতুন স্যুট সেলাই করতে পারব?

 

কেন সেরা নদীরা

ফ্রান্সের বাইরে বয়?

 

গুয়েভারার রাতের পরে

কেন বলিভিয়ায় ভোর হয় না?

 

মরুভূমির কালো আঙুরদের কি

মৌলিক অশ্রু-তৃষ্ণা থাকে?

 

৬১

টলটল করতে থাকা পারদবিন্দু কি

নীচের দিকে গড়ায় না চিরকালের দিকে?

 

আমার বিষাদের কবিতাগুলো কি

আমার চোখ দিয়েই দেখে?

 

আমার গন্ধ, আমার ব্যথা কি আমারই থাকে

যখন আমি ঘুমে ধ্বংস হয়ে যাই?

 

৬৩

পাখিদের দিয়ে কীভাবে সাজাবো

তাদের কথার অনুবাদ?

 

কীভাবে একটা কচ্ছপকে বলবো

যে আমি তার থেকেও বীর?

 

কীভাবে আমি একটা মাছিকে জিজ্ঞাসা করবো

তার প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হবার পরিসংখ্যান?

 

কিংবা গুলনারকে জানাবো

তার সুগন্ধের জন্য আমার কৃতজ্ঞতা?

 

৬৭

আমায় কি ভালোবাসতে পারো, অক্ষরমালা,

আর দিতে কি পারো একটা সত্যি সত্যি চুমু?

 

অভিধান কি একটা পাথরে তৈরি কবর

না কি একটা বন্ধ মৌচাক?

 

গোরে যাওয়া সময়কে দেখার জন্য

আমি কোন জানালায় দাঁড়াব?

 

না কি দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকবো

সেই সময় যা আমি এখনো বাঁচিনি?

[বিকাশ গণ চৌধুরী অনূদিত প্রশ্ন-পুঁথি কাব্যগ্রন্থ থেকে সংকলিত]

 

নোবেল পুরস্কার বক্তৃতা > হায়াৎ মামুদ অনূদিত

যা বলতে চাইছি তার জন্য অনেক দূর যেতে হবে। এ প্ৰব্ৰজ্যা নিতান্তই ব্যক্তিগত— কতো দূর-দূরান্তের জমি, নিসর্গ, দূরান্তিকতা পার হতে-হতে যেতে হয়, তবুও উদীচীর নিসর্গ ও নৈঃসঙ্গ্য। সেখান থেকে একটুও সরে না। আমি বলছি আমার দেশের দক্ষিণতম ভূখণ্ডের কথা। আমরা চিলেবাসীরা পিছনে, আরো পিছনে, কেবলই সরে যেতে থাকি যতোক্ষণ-না দক্ষিণ মেরুর সীমানায় পৌঁছে যাই আর সেটাই হলো সুইডেনের ভূগোলের সঙ্গে আমাদের সাদৃশ্যের উৎসমূল— সেই সুইডেন যে কি-না তার মাথার ঝাকুনিতে এই গ্রহের তুষারাচ্ছন্ন উত্তর মেরুর উপরে নকশা কাটে।

আমার জন্মভূমির সেই কোন সুদূরের আরণ্যকতার ভেতরে আমি আমার নিজেকে খুঁজে পাই। এর পেছনে অনেক কারণ, ঘটনাপ্রবাহ, এখন বিস্মৃতির অতলে; তবে কাউকে তো সেখানে যেতেই হবে। যদি সে আদৌ চায় আর্হেন্তিনার সীমান্তে পৌঁছুতে, তো তাকে আন্দেস পর্বত পেরোতে হবে তো প্রথম। ঐ সব অগম্য অঞ্চলে ঘুরে বেড়াতে হলে বিশাল সব অরণ্যানীর ভেতর দিয়ে, যেন-বা রেলসুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে এবং অন্ধকার ও নিষেধ-হাঁকা রাস্তা ধরে- যার কোনোখানে কোনো নিশানা থাকে না, পথ চিনতে পারা কঠিন ব্যাপার, এ-সবের ভেতর দিয়ে যেতে হয়; কিন্তু তারপরও, যে-জমিতে কোনো পথরেখা থাকে না, কি গাড়ির চাকার গতিপথ, সেখানে আমি আর আমার চার বন্ধু সাপিল ক্যারাভানে যেমন ঘটে— দানবীয় সব মহীরুহ, অন্যতিক্রম্য নদীতরঙ্গ, বিশাল প্রস্তরখণ্ড সমুদয়, পরিত্যক্ত তুষারাস্তুপ ইত্যাদি অবলীলায় পার হতে-হতে খুঁজে ফিরি— আরো সঠিক হবে বললে, চিনে নিতে চাই- আমার পথ, মুক্তির স্বাধীনতা। আমার সঙ্গীরা জানতো কোন পথ ধরে আমাদের যেতে হবে, জানতো পায়ের নিচে মাথা-চাড়া-দিয়ে ওঠা কোনো আগাছার দঙ্গলের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে গেছে ঐ জবরদস্ত যাত্রাপথ। তবে, আমাকে আমার ভাগ্যের হাতে সঁপে দিয়ে তারা যখন আমাকে ছেড়ে চলে গেল তখন নিজেদের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিততর করতে তারা তাদের ঘোড়ার পিঠে চাবুক চালিয়েছিল আরো জোরে, আকাশচুম্বী মহীরুহের ওপরে বিজলিরেখা এঁকে দিতে দিতে।

আমাদের প্রত্যেকেই সে অনন্ত নৈঃসঙ্গ্যের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকি, সেই হরিৎ ও শুভ্ৰ নিস্তব্ধতা, বৃক্ষরাজি, বিশালকায় লতানো গাছপালা, নিচে পড়ে থাকা হাজার বছরের সঞ্চিত পত্র-পল্লবের পচানো সার, এসবের ভেতরে দিয়ে যেতে থাকি, হঠাৎ সামনে পথ রোধ করে দাঁড়ায় মাজা-ভাঙা উল্টে পড়া গাছ। প্রকৃতির রূপ চোখ ধাঁধানো ও গোপন, আবার একই সঙ্গে হিম, তুষার ও হাননের চিরবর্ধিষ্ণু আশঙ্কা। সবকিছু মিলেমিশে লীন হয়ে থাকে : নৈঃসঙ্গ্য, বিপদ, নিস্তব্ধতা আর আমাদের ব্রতসাধনার গরজ।

কখনো-কখনো পায়ে-চলা-পথের সরু রেখা ধরে আমরা এগিয়ে যাই— হয়তো তা তৈরি হয়েছে চোরাচালানিদের পায়ে-পায়ে কিংবা হতেও পারে দস্যু-ডাকাতদের দিয়ে। আমাদের জানার তো কোনো উপায় নেই কতোজন হয়তো এই পথে নিশ্চিহ্ন হয়েছে, শীতের বরফহিম হাত হতচকিত তাদেরকে হঠাৎ জাপটে ধরেছে, আন্দেস পর্বতমালা থেকে এসেছে তুষারঝড় হয়ে মহা দাপট— আনমনা পথিককে ঢেকে ফেলার জন্য যথেষ্ট। ধবল তুষারের সপ্ত তবক নিচে সমাহিত করার জন্য।

পথের যে-কোনো পাশে চোখ ফেললেই দেখি জনমানবহীন বন্যতার মধ্যখানে কিছু যেন দেখা যায়, যার সঙ্গে সাদৃশ্য মেলে মানুষের হাতের কারুকাজের। ডালপালা কাঠকুটাে স্তুপীকৃত পড়ে-থাকা, এখানে সেখানে, এদের সইতে হয়েছে কতো-না অজস্র শীতের কামড়; এগুলো হলো শত শত পথিকের অঞ্জলি, পতিতজনের স্মৃতিতর্পণে সঞ্চিত হয়ে ওঠা কাঠের স্তূপ- তাদের কথা মনে করিয়ে দেয়ার জন্য যারা থেমে গছে আর যেতে পারেনি, যারা শুয়ে আছে চিরকালের জন্য বরফের তলায়। পথে যে-সব গাছ চওড়া ডালাপালা ছড়িয়ে আমাদের মুখে ঝাপটা মেরেছে আমার সঙ্গী-সাথীরা ধারালো চওড়া লম্বা ছুরির ঘায়ে তাদের ছাঁটতে-ছাঁটতে এগিয়ে গেছে। বিশাল ঝাঁকড়ামাথা গাছের ডাল নুয়ে পড়েছে, ওকের শেষ কটি পাতা তুষার ঝড়ের আগেই হি হি করে কাঁপছে। এগিয়ে যেতে-যেতে আমি প্রতি স্তুপের উপরেই স্মারকচিহ্ন ফেলে রাখি, কাঠের অবশ্যই, এই অরণ্যানীর কোনো বৃক্ষ থেকে ছিন্ন করা শাখা, অচেনা কতো-না পথিকের ঐ সব সমাধিস্তম্ভের উপরে আদরে সাজিয়ে দিই।

আমাদের নদী পার হতে হয়েছে। এইসব নদী আন্দেসের অজস্র শিখরচূড়া থেকে তীব্র স্রোতধারায় গোঁত্তা দিয়ে নিচে এসে পড়েছে। তীব্র ভীষণ ঘূর্ণিস্রোত আছড়ে পড়েছে জলপ্রপাতের মতো, মাটি ও পাথর চুর্ণবিচূর্ণ করে কী অপরিসীম শক্তি ও পুঞ্জীভূত গতি একত্র করে সেইসব ধ্যানমগ্ন উচ্চতা থেকে; কিন্তু আমরা অবশেষে বদ্ধ, নিস্তরঙ্গ জলরাশি পেয়ে যাই— যেন এক বিশাল প্রশস্ত আরশি। ঘোড়াগুলো জল ঠেলে এগুতে থাকে, তারপর একসময় পায়ের নিচে মাটি মেলে না, তারপর অন্য পারে গিয়ে ছিটকে পড়ে। আমার ঘোড়াটি তো জলে হাবুডুবু খাচ্ছিল, আমি আসন থেকে পড়ে যেতে-যেতে টাল সামলাতে থাকি; জন্তুটি পানির উপরে মাথা তুলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যায় আর আমি আমার পা দুটি জল কাটার জন্য আছড়াতে থাকি। এভাবেই আমাদের সন্তরণের পালা শেষ করে পাড়ে ওঠা হয়।

পাড়ে পৌঁছুতেই আমাদের যারা পথ দেখাচ্ছিল, ঐসব দেহাতি মানুষজন, মৃদু হেসে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় : “ভয় পেয়েছেন বুঝি?” বলি, “অবশ্যই। আমি তো ভেবেছি। এখানেই জান খতম।”

“আমরা তো দড়িদাড়া নিয়ে আপনাদের পেছনেই তৈরি হয়েছিলাম”, তারা বলে ওঠে। একজন আবার বলে, “আমার বাবা তো ঠিক এখানটাতেই ডুবে গিয়েছিল, তারপর স্রোতের টানে কোথায় ভেসে যায়। আমরা কখনোই তেমনটি এবার আর ঘটতে দিতাম না।”

আমরা ঘোড়ায় চেপে যেতেই থাকি। একটা সুড়ঙ্গ সামনে পড়ে, প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি-হয়ে-ওঠা সুড়ঙ্গ বিশাল এক পাথরের চাঙ্গড় ফুটে বেরিয়ে আসা, হয়তো কখনো আদ্যিকাল কোনো ভীমগর্জন-ভরা-নদীর প্রবাহ তৈরি করেছিল একে, এখন আর নেই; কিংবা কে জানে হয়তো কোনো এক ভূকম্পনে তৈরি-হয়ে-ওঠা এই গ্রানাইট পাথর ভেঙে দিয়ে। আমরা তার ভিতরে ঢুকে যাই। কয়েক গজ যেতেই আমাদের বাহনেরা পা হড়কাতে থাকে, এদিকে-ওদিকে কাত হয়ে ঢলে পড়তে চায়, কঠিন এবড়ো-থেবড়ো পাথরে পা রাখার কসরত করতে থাকি; তাদের পাগুলো জড়াজড়ি করে ধাক্কা খায়, খুরের ঘর্ষণে চকমকে আগুন ঠিকরে বেরয়; আমি তো একাধিকবার ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটকে পড়ে গেলাম। আমার ঘোড়ার নাক দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছিল, পা-ও রক্তাক্ত; কিন্তু তারপরও আমরা ভয়ানক একগুঁয়ের মতো ঐ অন্তহীন অপূর্ব দুরারোহ পথ অতিক্রম করতেই থাকি।

গভীর অরণ্যানীর মাঝখানে কিছু যেন অপেক্ষায় ছিল আমাদের। হঠাৎ যেন অলৌকিক দৃষ্টি পেয়ে যাওয়ার মতো, আমরা দেখি যে আমরা ছোট্ট ঝকমকে তৃণভূমিতে এসে দাঁড়িয়েছি, সে যেন পাহাড়ের কোলে শুয়ে আছে : স্বচ্ছ জল, সবুজ মাঠ, অরণ্যকুসুম, নদীর কলধ্বনি, মাথার উপর সুনীল গগন, অনাচ্ছাদিত প্ৰসন্ন আলোকের ঝর্নধারা।

সেখানে আমরা থেমে পড়ি। যেন কোনো জাদু-করা লক্ষ্মণরেখার বৃত্তের ভেতরে। যেন কোনো পবিত্র দেবালয়ে দর্শনার্থী আমরা; আর আমি নিজে যে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ঢুকে পড়ি তার দৈবী মহিমা চির পবিত্র। ঘোড়ার পিঠ থেকে ঘোড়সওয়ার রাখালেরা নেমে পড়ে। ঐ ফাঁকা ময়দানের মধ্যিখানে, ঠিক যেন কোনো ধর্মানুষ্ঠান, রাখা ছিল ষাড়ের মাথার খুলি। একে একে আমার সব সঙ্গী নীরবে এগিয়ে যায় তার পানে, ঐ খুলির গহবরে দু’চারটি ধাতব মুদ্রা আর সামান্য খাদ্যের ছিটেফোটা রেখে দেয়। আমিও তাদের সঙ্গে এককাতারে দাঁড়িয়ে আমার অর্ঘ্য নিবেদন করি; এ-সবই পোড়-খাওয়া ভ্ৰাম্যমাণ ইউলিসিসদের জন্য, যারা পালিয়ে বেড়াতে-বেড়াতে যদি-বা কখনো মৃত ষাড়ের চক্ষুকোটরে রাখা রুটি ও পাথরের সন্ধান পায় তো কাজে লাগবে।

কিন্তু এই অবস্মিরণীয় অনুষ্ঠানের এখানেই শেষ নয়। আমার এইসব গেঁয়ো বন্ধু মাথা থেকে টুপি খুলে রেখে এক অদ্ভুত নাচ নাচতে থাকে, লাফিয়ে লাফিয়ে এককদমের নৃত্য ঐ পরিত্যক্ত খুলিকে ঘিরে, এই নাচ বৃত্তাকারে অনুসরণ করে যাচ্ছে পূর্ববতী অগণিত নৃত্যমণ্ডলকে— আগে যারা এসেছিল তাদের ফেলে-যাওয়া নাচের রেখা অনুসরণ করতে-করতে। আমার তখন যেন কীরকম এক অস্বচ্ছ বোধ জন্ম নেয় ভিতরে-ভিতরে, ঐখানে আমার নির্বাক সঙ্গীতের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে যে অচেনা-অজানা মানুষদের ভিতরে কোনো বন্ধনসূত্র গ্রথিত হতে পারে পৃথিবীর এই দূরতম বিচ্ছিন্নতম নৈঃশব্দ্যের ভিতরে- পারস্পরিক ভাববিনিময়ের, আবেদনের, এমনকি আহবানে সাড়া দেওয়ার।

আরো দূরে সরে যেতে-যেতে, ততক্ষণে আমার দেশের সীমান্তের কাছে প্রায় চলে এসেছি, যা পেরুলেই বহু বছর আর তার সঙ্গে আমার কোনো সংযোগ থাকবে না, আমরা পর্বতমালার সর্বশেষ জলস্রোত পার হতে থাকি। তখন রাত্রিকাল। হঠাৎ চোখে পড়ে দূরে একটি আলো, নিৰ্ঘাত লোকালয়ের চিহ্ন; কিন্তু কাছাকাছি হলে দেখি ওগুলো কিছু ভেঙে পড়া ঝুপড়ির স্তুপ, জরাজীর্ণ, বাহ্যত জনশূন্য। আমরা একটার মধ্যে ঢুকে পড়ি। দেখি ঘরের মাঝখানে গাছের অনেক গুঁড়ি দাউদাউ করে জ্বলছে, দিবানিশি ঐগুলো জ্বলতে থাকে, তাদের ধোঁয়া চালের ফাঁক দিয়ে ঘন নীল ঘোমটা মুখে টেনে উড়ে যাচ্ছে। আমরা দেখতে পাই একপাশে অনেক পনির জড়ো করা আছে। নিস্তব্ধতার ভেতরে টুংটাং ধ্বনি এসে বাজে গিটারের এবং সঙ্গীতেরও শব্দকণা, যেন অগ্নিবলয় ও অন্ধকার থেকে জন্ম নেওয়া; এই আমরা কোথাও আমাদের দীর্ঘ যাত্রাপথে মনুষ্যকণ্ঠ প্রথম শুনতে পাই। ভালোবাসা ও দূর দিগন্তের জন্য গান, হাহাকার প্রেমের ও দূরবসন্তের জন্য, নগরের জন্য — যেখান থেকে আমরা এসেছি, জীবনের অন্তহীন অসীমতার জন্য তৃষ্ণা। আমরা কে তারা তা জানতো না, কোনো পলাতক সম্পর্কে ধারণা ছিল না। তাদের, আমার নাম বা কবিতা কিছুই তারা শোনেনি। না-কি তারা জানতো এসব, আমাদেরকে? বিবেচনার ব্যাপার যা হলো তা এই : আমরা একসঙ্গে গান করেছিলাম, অগ্নিকুণ্ডের পাশে বসে একসঙ্গে আহারও এবং তারপর অন্ধকারের ভেতর  দিয়ে আমরা কতিপয় আদিম ঘরের ভেতরে চলে যাই— সেখানে মৃত আগ্নেয়গিরির উষ্ণ প্রস্রবণ বয়ে যাচ্ছিল, সেখানে স্নান সারি, পর্বতপুঞ্জনির্গত ঐ উষ্ণতা আমাদেরকে আলিঙ্গনে বুকে তুলে নেয়।

আমরা উল্লসিত শিশুর ন্যায় জলে ঝাঁপঝাঁপি করি, ডুব মারি, দীর্ঘ আশ্বারোহণের ক্লান্তিভার ধুয়ে ফেলি শরীর থেকে। ভোর হতেই আমরা আমাদের যাত্রাপথের অবশিষ্ট অংশটুকু পাড়ি দেওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়লাম। রাহুগ্রস্ত আমার প্রিয় জন্মভূমি থেকে তারপরই আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বো; এরই মধ্যে আমরা চাঙ্গা হয়ে গেছি, যেন পুনর্জন্মলাভ, নবদীক্ষিত। ঘোড়ায় চড়ে যেতে-যেতে গান ধরি, নববলে বলীয়ান, নবজাগ্ৰত আশায় প্রশস্ত দূরগামী পথ ধরে যেতে থাকি অপেক্ষমাণ আমার পৃথিবীর দিকে। অনুপুঙ্খভাবে স্মরণে আছে, আমরা যখন ঐ পাহাড়ী বন্ধুদের– তাদের গান, তাদের দেওয়া খাবার স্নানের উষ্ণ জলধারা, মাথার উপরে একটুখানি ছাদ আর শোয়ার বিছানা দেওয়া, মানে আমাদের আশ্রয়দানের জন্য যৎসামান্য পয়সাকড়ি দেওয়ার চেষ্টা করলাম তারা ভাবলেশহীন মুখে তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। তারা যা পেরেছে তা করেছে, ব্যস, এই তো মিটে গেল। আর, তাদের এই ‘ব্যস মিটে গেল’ কথা ক’টি ছিল গভীর, অকথিত সহমর্মিতার— হয়তো-বা স্বীকৃতিদান, হয়তো একই স্বপ্ন।

ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ, কবিতা লেখার কোনো ফর্মুলা আমি কখনো কোনো বইয়ে পাইনি, অগত্যা আমি লিখিতভাবে উপদেশসূচক একটি শব্দও কি কোনো পদ্ধতি বা কোনো শৈলীর কথা উচ্চারণ করার ইচ্ছা পোষণ করি না যাতে তরুণ কবিকুল আমার নিকট থেকে প্রত্যাশিত জ্ঞানের ছিটেফোঁটাও পেতে পারেন। যদি আমি আমার এই বক্তৃতায় অতীতের কিছু ঘটনা উপস্থিত করেই থাকি, যদি আমি এই উপলক্ষকে কেন্দ্র করে অবিস্মরণীয় অ্যাডভেঞ্চারের ভিতরে নিজেকে ফের জাগিয়ে তুলেই থাকি এবং তা এইরকম এক স্থানে যা ঐ অভিজ্ঞতা থেকে এতোখানি দূরে, তা তো শুধু এইটুকু বোঝাতে যে জীবনের পথে চলতে গিয়ে আমি সর্বদাই প্রয়োজনীয় সমর্থন, অনুসৃতব্য কোনো কর্মপন্থা আমার জন্য অপেক্ষমান দেখেছি। বেদবাক্যের মতো নিজের শব্দের মহিমায় আচ্ছন্ন থাকার জন্য নয়, বরং নিজেকে আমার নিজের মতো করে বুঝে নেওয়ার লক্ষ্যবিন্দুতে এই পথ আমাকে নিয়ে যায়। ঐ দূরগামী যাত্রাপথে কবিতা রচনার ব্যবস্থাপত্র আমি পেয়ে গিয়েছিলাম। মৃত্তিকা ও আত্মার ভিতর থেকে উৎসারিত দান আশিস হিসেবে আমার ওপর অর্পিত হয়েছিল। আমার বিশ্বাস এই যে, কবিতা হলো এক পবিত্র ক্ষণস্থায়ী কর্মানুষ্ঠান যার ভেতরে নৈঃসঙ্গ্য ও ঐক্য, আবেগ ও সকর্মতা, কারো একান্ত পৃথিবী, মানুষের একান্ত পৃথিবী ও প্রকৃতির গোপন উন্মোচন সমভাবে সমপরিমাণে অংশ নিয়ে থাকে। অনুরূপভাবে আমি সংশহীন এই ধারণায় উপনীত হয়েছি যে, এইসব কিছুই— মানুষ ও তার অতীত, মানুষ ও তার অঙ্গীকার, মানুষ ও তার কাব্য সংরক্ষিত হয়ে থাকে সর্বদা প্রসরমাণ জনগোষ্ঠীর ভিতরে, এমন-এক কর্মপ্রণোদনার মধ্যে যা কোনো একদিন বাস্তবতা ও স্বপ্নকে এক অখণ্ড সমগ্রতায় গেঁথে নেবে, কারণ এভাবেই তো তারা পরস্পরে মিলিত হয়। আমি আপনাদেরকে বলছি, এরপরে এত বছর যে পার গেল আমি এখনো পর্যন্ত জানি না— যে-পাঠ আমি নিয়েছিলাম খরস্রোতা নদী পার হতে হতে, খুলির চারপাশে ঘুরে-ঘুরে নৃত্যের সময়, গগনভেদী চিৎকারে পর্বতের বুক চিরে বেরুনো পুণ্যগামী জলে গা এলিয়ে দিয়েছি। যখন— আমি বলছি আপনাদের, আমি জানি না। তখন আমার মনে কবিতা-জন্মের অভিজ্ঞতা জন্মেছিল কি-না, যা অন্য মানুষদের হাতে পরে তুলে দিতে হবে, না-কি আমার কাছে দাবি জানিয়ে ও জবাবদিহিতা চেয়ে অন্যেরা খবর পাঠিয়েছিল আমার কাছে। আমি জানি না সত্যই এর ভিতর দিয়ে আমায় যেতে হয়েছিল কি-না, নাকি এ শুধুই আমার মনের রচনা; আমি জানি না কবিতায় যে-অভিজ্ঞতা আমার কাছে এসেছিল, যে সব অভিজ্ঞতা পরে আমি গেয়ে উঠেছি তা বস্তু সত্য না কবিতা, মরীচিকা না শাশ্বত।

বন্ধুগণ, এ ধরনের ব্যাপারস্যাপার থেকে কোনো একরকমের আলো এসে পৌঁছয় কবির কাছে যা তিনি তার সহগামী বান্ধবদের কাছ থেকে পেয়ে থাকেন। অনতিক্রম্য একাকিত্ব বলে কিছু নেই। সব পথেরই গন্তব্যবিন্দু এক : আমরা কে তা জানা নেই। বিচ্ছিন্নতা ও নৈঃশব্দ্যের ভেতর দিয়ে আমাদের নির্জন ও বন্ধুর উপত্যকা পার হয়েই-না পৌঁছুতে হবে সেই জাদুকরী এলাকায় যেখানে আমরা কোনো কিম্ভূত নৃত্য নাচতে পারবো কিংবা গাইতে পারবো কোনো বিষগ্ন গান; কিন্তু এই মৃত্যু ও সঙ্গীতের যুগলমিলনের মধ্যেই যে রয়ে গেছে আত্মচেতনার প্রাচীনতম কুললক্ষণ— মানুষ হওয়ার আত্মচেতনা এবং মানুষের একই মানবভাগ্যে বিশ্বাস স্থাপন।

মোদ্দা কথা হচ্ছে, যদি কেউ কিংবা অনেকে এমন মনে করেন যে আমি একা আলাদা গোত্রভুক্ত মানুষ, বন্ধুত্বের দাওয়াতে বসে একপাতে খেতে পারি না, যৌথ দায়িত্বে অংশ নিতে অক্ষম, তো আমি নিজের জন্য কোনো সাফাই গাইতে যাবো না। আমি বিশ্বাস করি না যে, কবির দায়-দায়িত্বের মধ্যে অভিযোগ করার বা তা খারিজ করার কোনো জায়গা আছে। শত হলেও কোনো একজন মাত্র কবি তো আর কবিতা নিয়ন্ত্রণ করেন না; তাছাড়া কেউ যদি সহগামীদের অভিযুক্ত করার জন্য থেমে পড়েন কিংবা কেউ যদি যুক্তিগ্রাহ্য বা অযৌক্তিক অভিযোগের মুখোমুখি হয়ে নিজেকে বাঁচাতে জীবনভর সময় নষ্ট করাকেই নিজের কাজ হিসেবে বিবেচনা করেন, তো তার অর্থ- তার আত্মগরিমা এ জাতীয় চূড়ান্ত পথে তাকে ঠেলে দেয়- এটাই আমার বদ্ধমূল বিশ্বাস। আমার বলবার কথা এটাই যে, যারা কাব্যচর্চা করেন বা যারা কবিতার পৃষ্ঠপোষক তাদের ভিতরে কবিতার শক্রকে খুঁজলে পাওয়া যাবে না, বরং দেখা মিলবে কবির মধ্যেই সংগতিহীনতার ভিতরে। এ থেকে যে-কথাটা বেরিয়ে আসে তা হলো : নিজের সমকালীন মানুষজনের মধ্যে যারা সবচেয়ে অবুঝ ও সর্বাধিক নির্যাতিত তাদের সঙ্গে ভাবনা বিনিময়ের অক্ষমতা ব্যতিরেকে কোনো বড়ো মৌলিক শত্রু কোনো কবির থাকতে পারে না এবং সকল সময় ও সকল জাতির ক্ষেত্রে একথা প্রযোজ্য।

কবি ‘ক্ষুদে ঈশ্বর’ নন। না, তিনি ‘ক্ষুদে ঈশ্বর’ নন। তিনি বিশ্ববিধানের ভবিতব্য দ্বারা বিশেষ নির্বাচিত কেউ নন যে তিনি অসংখ্য মানুষ— যারা হাজার রকমের কাজ আর দায়িত্ব সামলাতে জেরবার, তাদের চেয়ে উন্নততর কেউ নন। আমি প্রায়ই বলে থাকি যে, সর্বশ্রেষ্ঠ কবি তিনি যিনি আমাদেরকে প্রত্যেক দিনের রুটি প্রতিদিন যোগান দিতে পারেন : প্রতিবেশী রুটির দোকানি, তিনি তো নিজেকে ঈশ্বর ভাবেন না। ঐ রাজকীয় অথচ বিনয়াবনত কর্তব্যকর্মটি তিনি পালন করে যান— খামির তৈরি, তন্দুরের ভেতরে সেগুলো ঢুকানো, পুরো সেঁকে লালচে রং না-করা পর্যন্ত সেদিকে চোখ রাখা, সবশেষে তৈরি রুটি আমাদের হাতে পৌঁছুনো- সামাজিক যৌথ কর্তব্যপালন। এরকম সহজ-সরল বিবেকবোধের তাড়নায় কোনো কবি যদি আলোড়িত হন তো তিনি এক বিশাল শিল্পকর্মযজ্ঞের অংশ হিসেবে নিজেকে দেখতে পারেন— সেটি হলো সমাজের সরল অথবা জটিল নির্মাণকৌশল, মানুষের অবস্থার রূপান্তর, তার ঘর-গোরস্থালির যোগান দেওয়ার সহজ কাজকর্ম : রুটি, ঔষধপত্র, সুরা, স্বপ্ন। কবিরাই চিরন্তন সংগ্রামে অংশ হয়ে ওঠেন, যদি আমরা প্রত্যেকেই আমাদের দায়বদ্ধতা, আত্মোৎসর্গতা ও মায়ামমতার কিঞ্চিত নির্দিষ্ট অংশ সরিয়ে রেখে অন্যের হাতে তুলে দিয়ে সকলের প্রাত্যহিক শ্রমে নিজের শ্রমকে অন্তর্ভুক্ত করে নিই তা হলে কবি হয়ে দাঁড়াবেন সমগ্ৰ মানবতার শ্রমের স্বেদবিন্দু, আহার্য অন্ন, পেয় মদিরা ও স্বপ্ন। নিতান্ত সাধারণ মানুষজনের যে-ভূমিকা একমাত্র সেটিকে গ্রহণ করলে আমরা সক্ষম হবো কবিতায় সে-সব চারিত্র্যগুণ পুনরায় স্থাপিত করতে যা কাটাছাঁটা-ঝাড়াইবাছাই করে সর্বসার হিসেবে রেখে-দেওয়া, কবিরা নিজেরা রেখে দেন একইভাবে।

যে-সব ভুল আমাকে আপেক্ষিক সত্যের দিকে নিয়ে গেছে এবং যে-সব সত্য প্রায়শই আমাকে সৃষ্টি-প্রক্রিয়া, সাহিত্যে শীর্ষদেশ ও অতল গহ্বর কাকে বলে তার ব্যাখ্যা করতে, প্রভাব ছড়াতে কি শিক্ষা দানে আমাকে অনুমতি দেয়নি— এমন নয় যে এসবের কোনোটারই চেষ্টা আমি কখনো করেছি। তবে আমি একটি ব্যাপার বুঝে গেছি, তা হলো : আমরা নিজেরাই আমাদের স্বনির্মিত কিংবদন্তির প্রতিচ্ছায়া তৈরি করি। যে-মালমসলা সহযোগে আমরা কিছু সৃষ্টি করি বা সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা করি সবই শুরু থেকেই আমাদের আত্মবিবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এতে করে বাস্তব ও বাস্তবতার দিকে আমাদের ছুটে যাওয়ার টান আমরা হয়তো বুঝতেও পারি না, মানে বাস্তবতাকে নির্বিচারে গ্রহণ ও পরিবর্তনের পথে পা রাখা— তারপর একসময়ে বুঝি, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে, যে আমরা এত সব ভয়াবহ বাধ্যবাধকতায় নিজেদের জড়িয়েছি যে জীবনকে পূর্ণতা ও ফলবানতার দিকে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে তাকে হত্যা করেছি। আমরা নিজেদের ওপরে বাস্তবতা নিজেরাই চাপিয়ে দিয়েছি, তা ইট তৈরির চেয়ে গুরুভার; আমাদের কর্তব্য হিসেবে যে ভবন নিৰ্মাণকে আমরা ভেবেছিলাম আমাদের প্রথম দায়িত্ব তা নির্মাণের ধারে-কাছে আমরা যেতে পারিনি। আর এর চূড়ান্ত বিপরীতে রয়েছে : আমরা যদি বোধের অতীত (অথবা মাত্র দু’চারজনের নিকট কেবল বোধগম্য) কোনো কিছুকে fetish করে তুলতে সক্ষম হই, কোনো অসাধারণ ও দুর্জ্ঞেয়কে fetish করে তুলতে, যদি আমরা বাস্তব ও তার অনিবার্য অবক্ষয়কে দমন করি, তাহলে আমরা অকস্মাৎ নিজেদেরকে এমন এক অরক্ষণীয় অবস্থায় আবিষ্কার করবো যে মনে হবে ছেড়াপাতা, মৃত্তিকা ও মেঘের চোরাবালিতে আমরা তলিয়ে যাচ্ছি, ডুবে যাচ্ছি। ভাববিনিময় না-করতে পারার অক্ষমতার ভীষণ চাপের তলায়।

আমেরিকা ভূখণ্ডের বিশাল আয়তনে যারা লেখালেখি করছেন তাদের কথা বিশেষভাবে বিবেচনায় আনলে আমরা অবিরামভাবে শুনে যেতে থাকি এক আহবানধ্বনি যা এক বিশাল এলাকার রক্ত-মাংসের জ্যান্ত অবয়বকে ক্রমাগত ডাক দিয়ে যায়। আমরা আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন যে, এই মানুষের আবাদ গড়তে হবে, আবার একইসঙ্গে বুঝতে পারি যে আমাদের মৌলিক ও সঙ্কটময় কর্তব্যকর্ম হলো অবিচার শাস্তিভোগ ও যন্ত্রণাময় জনপ্রাণশূন্য জগতের সঙ্গে ভাবনা বিনিময় করা, কারণ ঐ জগৎ যে জনপ্রাণশূন্য। আমাদের প্রস্তরমূর্তিগুলোর ভেতরে, আমাদের প্রাচীন-ধ্বংসপ্রাপ্ত স্তম্ভরাজির ভিতরে, আমাদের বৃক্ষহীন দিগন্তবিস্তারি তৃণভূমির সীমাহীন নৈঃশব্দ্যের ভিতরে, আমাদের ঘন গভীর অরণ্যনানীর ভিতরে, বজ্রনিনাদী আমাদের নদীগুলোর কলস্বরের ভিতরে যে-স্বপ্নেরা ঘুমিয়ে তাদের জাগিয়ে তুলবার তাড়নাও সেই একইসঙ্গে আমরা অনুভব করি। এক বোবা মহাদেশের অতল শূন্যতা শব্দ দিয়ে ভরে তুলবার আহবান আমাদের কাছে এসে পৌঁছয়, আর আমরা তার নামগানের নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে থাকি। আমার এই যে নগণ্য লেখকবৃত্তি তার পেছনে চালিকাশক্তি হিসেবে সম্ভবত এটাই কাজ করেছে, আর সেক্ষেত্রেও আমার ভিতরে যা-কিছুর বাহুল্য অথবা প্রাচুর্য অথবা বাকপ্ৰাবল্য, সবকিছুই এক স্বাভাবিক সরল সহজ লাতিন আমেরিকানের প্রতিদিনের নিত্যকর্মের বেশি কিছু নয়। আমার প্রতিটি কাব্যপঙক্তি স্পৰ্শগ্রাহ্য হওয়ার অভিলাষী, আমার প্রতিটি কবিতা খুঁজে ফেরে সে কীকরে কাজে লাগবার মতো উপকারী আমার প্রতিটি গানের বাসনা শূন্যতার বুকে প্রতীকচিহ্ন হয়ে দাঁড়ানো যা চৌমাথায় জড়ো হওয়া জমায়েত বোঝাবে কিংবা যা একটুকরো পাথর বা কাঠ বোঝাবে যার উপরে কোনো একজন কিংবা বহু যারা ভবিষ্যতে রয়ে গেছে আসবার জন্য, তারা কোনো নতুন চিহ্ন তার বুক চিরে আঁকবে।

কোনো কবির যুক্তিসঙ্গত কর্মপরম্পরার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি, জানি না নির্ভুলভাবে কিংবা ভুল করে, এই সিদ্ধান্তই নিয়েছি যে আমি দায়বদ্ধ রয়েছি সমাজের কাছে ও জীবনের কাছে— আমি তার এক বিনীত ভক্ত-বংশবদ। গৌরবময় ব্যর্থতা, কি নিরুত্তাপ বিজয় অথবা হতবুদ্ধিকর পরাজয় দেখার অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও এ সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছি। লাতিন আমেরিকার সংগ্রামসাধনায় নিজেকে একজন অংশীদার বলে মনে করায় আমি বুঝতে পেরেছি যে আমার মানবজন্মের সার্থকতা অন্য কিছুতে নেই, আছে সংঘবদ্ধ জনতার উত্তাল বেগের ভিতরে আমার সৃষ্টিক্ষমতাকে যুক্ত করায়, কায়মনোবাক্যে ও আবেগে ও আশায় তাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ায়; কারণ এমন উত্তাল আলোড়নের ভিতর থেকেই জন্ম নিতে পারে সেই প্ৰগতি যা লেখক ও জনগণ উভয়ের জন্য প্রয়োজন। আমার যা অবস্থান তার বিরুদ্ধে সহনীয় বা অত্যন্ত বিরূপ প্রতিবাদ নানাদিক থেকে উঠলেও ঘটনাটা এটাই যে, যদি আমরা অন্ধকারকে বাড়-বাড়ন্ত হতে না-দিই, যদি আমাদের আশা থাকে- লক্ষ লক্ষ লোক যারা আমাদের কিছু পড়ে শোনাতে পারে না বা আদৌ পড়তেই জানে না হয়তো, কি যারা আমাদের কাছে কিছু লিখে জানাতে পারে না কিংবা লিখতে আদৌ জানে না হয়তো, সেইসব লক্ষ লক্ষ মানুষও বাঁচুক মাথা উঁচু করে মর্যাদার সঙ্গে, যা নইলে পরিপূর্ণ মনুষ্যপদবাচ্য হওয়াই অসম্ভব, তো আমাদের এই বিশাল উন্মুক্ত রুক্ষকঠিন নিসর্গের একজন কবি হতে হলে ভিন্ন কোনো পথের হদিস আমি দেখতে পাইনি।

আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি শত শত বছরের দুর্ভাগ্যতাড়িত জনগণের অপরিসীম দুঃখ-দুৰ্দশা, অথচ এই মানুষগুলো যেন নন্দনকানন থেকে চলে আসা, এত পবিত্র; এরা পাথর ও ধাতু দিয়ে অলৌকিক বিস্ময়কর মিনার নির্মাণ করেছে, চোখ ঝলসানো কতো রত্ন : এরাই হঠাৎ আবিষ্কার করে বসলো কী অকস্মাৎ তাদের জীবন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে, মুখের কথা কেড়ে নেওয়া হয়েছে ঔপনিবেশিকতার ভয়াবহ নিষ্পেষণে, সেই সময় তো এখনো চলছে।

আমাদের পথ-দেখানো যে-আদি ধ্রুবতারকা রয়ে গেছে তা হলো— সংগ্রাম ও আশা। কিন্তু অবিমিশ্র আশা বা সংগ্রাম বলে তো কোনো ব্যাপার হয় না। প্রতিটি মানুষের ভিতরে অতীতের সমুদয় কালপরম্পরা, নৈষ্কর্ম্য, ভ্রান্তি , আবেগ, সময়ের তাৎক্ষণিক দাবি, ইতিহাসের দ্রুত গতিধারা সব মিলেমিশে একসঙ্গে থাকে। কিন্তু আমাদের মহান লাতিন আমেরিকা মহাদেশে প্রবহমাণ সামন্ততন্ত্রে আমাকে যদি কোনো অবদান রাখতে হয় তা হলে এই আমি মানুষটার রূপ ঠিক কী দাঁড়াবে? আমার দেশে বর্তমানে সংঘটিত পরিবর্তনাদির ভিতরে আমার সামান্যতম ভূমিকার জন্য যদি আমার অন্তরে কোনো গর্ববোধ না জাগে, তো আজ সুইডেন থেকে যে-সম্মানের মুকুট আমার মাথায় পরানো হলো, সেই মাথা কী করে আমি খাড়া রাখতে পারবো? আমেরিকার মানচিত্রের দিকে, তার অপার বৈচিত্ৰ্য, আমাদের আবাসভূমির চতুস্পার্শ্বের অকৃপণ বিস্তারের দিকে আমাদের অবশ্যই চোখ রাখতে হবে, উপলব্ধি করতে হবে কী কারণে অতীতের লুটপাট ও অসম্মান লাতিন আমেরিকান জনগণের কাছ থেকে যা-কিছু কেড়ে নিয়েছে ভয়ালদৰ্শন অপদেবতার দল- সে-সব কিছুর ভাগ নিতে আমাদের বহু লেখক অস্বীকার করেছেন।

দায়িত্ব ভাগ করে নেয়ার যে-সুকঠিন পথ সেটিই আমি গ্রহণ করেছি, জীবনব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ও সৌধ হিসেবে কোনো একক ব্যক্তির স্তবগীত আমি আওড়াইনি, বরং আমি উত্তম মনে করেছি এটাই যে, আমার এই সামান্য সেবাটুকু প্রয়োজনমতো আমি দিয়ে যাবো। সংঘবদ্ধ লড়াকু জনগণকে- তারা কখনো কখনো ভুল রাস্তায় পা ফেলে বটে, কিন্তু চলা থামায় না, ক্লান্তিহীন তারা প্রতিদিন একরোখা-প্রতিক্রিয়াশীল, নির্দিষ্টপন্থী, ধৈর্যহীন ও অজ্ঞ মানুষজনের মুখোমুখি হয়েও জোর কদমে সামনে এগিয়ে চলে। এর কারণ হলো, আমি বিশ্বাস করি : কবি হিসেবে আমার দায়িত্ব গোলাপকুসুম ও সুসামঞ্জস্যতা, প্রেমের উল্লাস ও অতল স্মৃতিবিধুরতা তো বটেই, আরো— আমার কবিতার ভিতরে কণ্টকাকীর্ণ মানবিক দায়িত্বপালনকেও আলিঙ্গন করা।

ঠিক শতবর্ষ অতিক্রান্ত হলো, তখন এক দুর্ভাগা অথচ দীপান্বিত কবি, ভাগ্য-তাড়িতদের মধ্যেও সর্বাধিক যন্ত্রণাক্লিষ্ট, ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারণ করেছিলেন : ‘আ লোরর, আর্মে দ্যুন, আরদ্যঁৎ পতিয়ঁস, নুঁজত্রেরঁ ও স্পলঁদিদ ভিই।’ [ভোরবেলায় অপরূপ নগরে গিয়ে আমরা পৌঁছুবো, জ্বলন্ত সহিষ্ণুতা বুকে নিয়ে।]

সত্যদ্ৰষ্টা র‌্যাঁবোর এই ভবিষ্যদ্বাণী আমি বিশ্বাস করি। আমি এসেছি এক অন্ধকার এলাকা থেকে, এমন এক দেশ থেকে যাকে নির্মম ভূগোল অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে দিয়েছে। কবিকুলে আমি সবচেয়ে পরিত্যক্ত একজন কবি আর আমার কবিতা হলো আঞ্চলিক, বিষণ্ন, বর্ষণসিক্ত। তবে, মানুষের প্রতি আস্থা সব সময়ই রয়ে গেছে। আমি কখনো আশা ছাড়িনি। এটাই হয়তো সেই কারণ যে জন্য আমি আমার কবিতা নিয়ে, আমার পতাকা নিয়ে আজ এখানে উপস্থিত।

সবশেষে, আমি শুভার্থী সকল মানুষকে, শ্রমিকদের, কবিদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই যে, র‌্যাঁবোর ঐ বাক্যে মানুষের ভবিষ্যৎ উচ্চারিত হয়েছে : একমাত্র জ্বলন্ত সহিষ্ণুতাই জয় করবে সেই অরূপনগরী- যা আমাদের সকল মানুষকে আলো দেবে, ন্যায় দেবে, আত্মমর্যাদা দেবে।

এভাবেই কবিতার গান গাওয়া কখনো বৃথা যায় না।

 

সুভাষ মুখোপাধ্যায় > নেরুদার জীবন ও কবিতা

পাবলো নেরুদার আসল নাম রিকার্দো এলিয়েজের নেফতালি রেয়েজ বোসোয়ালতো। ১৯০৪ সালে পারালে তার জন্ম। ১৯০৬ সালে বাড়ির লোকদের সঙ্গে তিনি চলে যান দক্ষিণ চিলির সীমন্তবর্তী তেমুকো শহরে। সেখানেই অতিবাহিত হয় তার গোটা কৈশোর আর শৈশব।

আরাউকে প্রদেশের (‘আরাউ’ হল ‘মাটি’ আর ‘কো’ হল ‘জল’) ইণ্ডিয়ানদের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার ফলে সেই সময়ে চিলির অনেকেই সে অঞ্চলে বন কেটে বসত করতে শুরু করেছে। নেরুদার বাবা যোগ দেন সেই দলে। তার ছিল নতুন নতুন এলাকায় রেললাইন বসানোর কাজ।

জঙ্গলমহালের সেই অহল্যা মাটিতে তখন শুরু হয়েছে প্রথম চাষবাস আর পশুপালন। নেরুদার ছেলেবেলা কাটে চারদিকের এই বন্য প্রকৃতির মধ্যে আর সমাজের বা ধর্মের অন্ধসংস্কারমুক্ত খোলামনের আবহাওয়ায়। নেরুদার স্মৃতিকথা যারা পড়েছেন তারা তার জীবনবৃত্তান্তে এর সুগভীর ছাপ খুঁজে পাবেন।

নেরুদা যখন কবিতা লেখা শুরু করেন তখন তার বছর দশেক বয়স। তেমুকো এমন এক জায়গা, যেখানে সাহিত্যসংস্কৃতির বড়ো একটা চল ছিল না। তার মাথার ওপর কেউ ছিল না যাকে তিনি অনুসরণ করতে পারেন। চারিদিকে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, তুমুল বর্ষণ আর ঝড়তুফান। এরই মধ্যে নেরুদা লিখলেন তার প্রথম কবিতাগুচ্ছ :

আর আমার প্রাণের গভীরে কী যেন কী ন’ড়ে উঠল,

জ্ব’লে-ওঠা ভাব কিংবা ভুলে-যাওয়া ডানা,

সঙ্কেতলিপি প’ড়ে নিয়ে,

আমি কাটলাম আমার নিজের রাস্তা,

আর আমি লিখলাম সেই প্রথম অস্ফুট ছত্র,

অস্ফুট, ধরাছোঁয়ার বাইরে, বিশুদ্ধ

আবোল-তাবোল,

যে কিছুই জানে না।

তার অবিমিশ্র প্রজ্ঞা,

আর অকস্মাৎ আমি দেখতে পেলাম

অবারিত

উন্মুক্ত

জ্যোতির্লোক।

ষোল বছর বয়স অবধি নেরুদা ছিলেন তেমুকোতে। এরপর যখন তিনি সান্তিয়াগোতে লেখাপড়া করতে যান। তখন তিনি পুরোদস্তুর কবি। তাঁর কবিতা ছাপা হতে আরম্ভ করেছে পিতৃদত্ত নামে নয়, নিজের দেওয়া ‘পাবলো নেরুদা’— এই ছদ্মনামে। সে সময়ে চেকোশ্লোভাকিয়ায় ইয়ান নেরুদা বলে একজন নামকরা লেখক ছিলেন। ‘নেরুদা’ উপাধি সেই সূত্রে। ১৯২৪ সালে বার হয় নেরুদার দ্বিতীয় কবিতার বই ‘কুড়িটি প্রেমের কবিতা’। সারা দেশে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর বয়স তখন খুব বেশি হলে কুড়ি। ১৯২৬ সালে বার হয় তাঁর একটি উপন্যাস (‘নিবাসী ও তার আশা’) এবং একগুচ্ছ কবিতা (‘অসীম মানুষের, বাজিয়ে দেখা’)। ১৯২৭ সালে নেরুদা কুটনৈতিক চাকরি নিয়ে যান বর্মায়। তারপর রেঙ্গুন থেকে কলম্বো এবং তারপর জাভা। পাঁচটা বছর এইভাবে তাকে কাটাতে হয় বিচ্ছিন্নের জীবন। এমন সঙ্গী নেই যার সঙ্গে নিজের মাতৃভাষা স্পানিশে কথা বলতে পারেন।

দেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে থেকেই তাঁর কবিতায় একটা বিচ্ছিন্নতার ভাব প্রকাশ পাচ্ছিল। বিশেষ করে তেমুকো থেকে চলে আসার পর। প্রাচ্যের দেশগুলোতে এসে তিনি আরও বেশি নিজের মধ্যে গুটিয়ে যান। সেখানকার মানুষজন, জলমাটি— কিছুই স্বচ্ছ নয়, কেউ সাড়া দেয় না। এই সময় তাঁর এক বন্ধুকে তিনি লিখেছিলেন, “আমি অনুভব করি, যাবতীয় জিনিস খুঁজে পেয়েছে তার নিজস্ব অভিব্যক্তি অথচ তাতে আমার না আছে কোনো অংশ, না আছে তার মর্মোদ্ধার করার কোনো ক্ষমতা।” তার এই সময়কার লেখা কবিতাগুচ্ছের (‘পৃথিবীতে বাসা’) প্রথম খণ্ডটি স্পেনদেশে বার হয় ১৯৩৩ সালে। এইসব কবিতায় তুলে ধরা হয়েছে এক পারম্পর্যহীন জগৎকে, যেখানে পলকে দেখা দেওয়া তাদের মিছিলে মৃত্যুর অভিমুখে চলেছে বস্তুনিচয়, ইন্দ্ৰিয়ানুভূতি, নিসর্গ। পরে নেরুদা তার এই সময়কার কবিতাবলীকে অগ্রাহ্য করতে চাইলেও কারো কারো মতে, এ যুগের মেজাজ সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশ পেয়েছে তার এইসব কবিতায়।

১৯৩৪ সালের পর নেরুদার কবিতায় দেখা দিল এক নতুন পালাবদল। চিলির কনসাল হয়ে তখন তিনি বাস করছেন স্পেনদেশে। প্রথমে বার্সিলোনায়। তারপর মাদ্রিদে। এখানে তিনি যে কবিদের সান্নিধ্যে এলেন তাঁদের সঙ্গে ছিল জনসাধারণের ঘনিষ্ঠ যোগ। তাঁর মধ্যে ছিলেন স্পেনের গৃহযুদ্ধে নিহত কবি ফেদেরিকো গার্থিয়া লরকা (১৮৯৯–১৯৩৬)। এদের সাহচর্যে আস্তে আস্তে রাজনীতির প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন। লরকার হত্যার বিরুদ্ধে তিনি যে আবেগময় প্রতিবাদ জানান, তার ফলে তাকে কনসালের পদ হারাতে হল।

১৯৩৮ সালে বার হয় নেরুদার নতুন কবিতাগুচ্ছ ‘স্পেন আমার হৃদয়ে’। এইসব কবিতায় আস্তে আস্তে ফুটে উঠল একটা নতুন সুর। আর নিভৃতে স্বগতোক্তি নয়, নেরুদা এবার জোর গলায় তাঁর কবিতাকে শ্রোতাদের কানে তুলে দিলেন। শুধু কলম দিয়ে লেখা নয়, মুখ ফুটে বলা—যাতে কানের ভেতর দিয়ে মর্মে প্রবেশ করে, শ্রোতার মনে যাতে সাড়া জাগে।

এর বারো বছর পর ১৯৫০ সালে বার হয় ‘কান্তো হেনেরাল’ (‘কাণ্ড সর্বময়’)। একে বলা হয় চিলির মহাকাব্য। এই বারো বছর নেরুদার জীবনের এক স্মরণীয় পর্ব। শুধু দাঁড়িয়ে দেখা নয়, এবার তিনি কাঁধে কাঁধ দিয়ে লড়াইয়ের শরিক। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৩—শুধু এই তিন বছর তিন কনসাল হিসেবে ছিলেন দেশের বাইরে মেক্সিকোয়।

১৯৪৫ সালে তিনি চিলির আইনসভা সিনেটের সদস্য হন এবং কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে এই সময় তার নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৪৮ সালে চিলির প্রেসিডেন্ট ভিদেলা সাধারণ মানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে পূর্ব ইউরোপের বহু দেশের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেন। নেরুদা প্রকাশ্যে তাকে সমালোচনা করলে নেরুদাকে গ্রেপ্তার করার চক্রান্ত হয়। নেরুদা আত্মগোপন করেন। এই সময় সরকারবিরোধী তাঁর বেশকিছু ছড়া প্রাচীরপত্রে লেখা হয়, লোকের মুখে মুখে ছড়ায়। ‘পলাতক’ কবিতায় তার এই আত্মগোপন পর্বের চিত্রটি ধরা আছে।

‘কাণ্ড সর্বময়’ মহাকাব্যে যেন ঘটেছে নেরুদার কবিসত্তার পুনর্জন্ম। তাঁর বিশ্বভুবনে দেখা দিল আবার কার্য-কারণের শৃঙ্খলা আর তাৎপর্য।

স্পেন থেকে স্বদেশে ফিরে নেরুদা কখনও খনিমজুরদের কাছে গিয়ে, কখনও রাজনৈতিক জনসভায় তাঁর কবিতা পড়তে শুরু করলেন। তাঁর কবিতা মুষ্টিমেয় পাঠকের বেড়া ডিঙিয়ে সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে পৌঁছে গেল। তাঁর কবিতার ধরনধারণেও অনেক বদল ঘটল। তিনি তাঁর কবিতা লিখলেন উঁচু গলায় কথা বলবার ভাষায়। সে ভাষা নিতান্ত আটপৌরে একঘেয়ে নয়। চিত্রগুণে বর্ণাঢ্য, সঙ্গীতময়তায় ঝংকৃত। তাঁর কবিতায় উদঘাটিত হল প্রকৃতি আর ইতিহাসের অন্তর্লীন ছন্দােবন্ধ, আমেরিকার প্রকৃত আখ্যান, তার ভৌগোলিক বিন্যাস, বিজেতা আর স্বৈরশাসকদের হাতে দেশবাসীর লাঞ্ছনা। আর সেইসঙ্গে কবির আত্মকথা। এই মহাকাব্যে ফুটেছে রসের যেমন বৈচিত্র্য, তেমনি কবির কণ্ঠে খেলেছে আবেগমুখর নানান সুর।

এরপর নেরুদা হতে চাইলেন আরও বেশি সহজ। সাহিত্যের বাইরেকার যে মানুষ, তাদের কাছে নেরুদা চাইলেন নিজেকে খুলে ধরতে। ১৯৫৪ সালে বার হল তাঁর ‘পঞ্চভূতের স্তোত্র’। কোনো সমারোহ নেই, উচ্চকণ্ঠের ভাষণ নেই—তাঁর কবিতা হল প্রায় গানের মতন স্বতোৎসারিত। কবিতাকে তিনি চাইলেন জীবনের ছাঁদে গড়তে। নেরুদা লিখলেন :

বই, আমি যাই।

বহু খণ্ডের পোশাক পরে

আমি যাব না,

রচনাবলী থেকে

আমি বেরিয়ে আসি না,

আমার কবিতাগুলো

কবিতা মুখে দেয় নি,

তারা গোগ্রাসে গেলে

মনমাতানো সব ঘটনা।

দৈনন্দিন জীবন, সাধারণ মানুষ আর এটা-ওটা-সেটা—এরই বন্দনা । তাঁর এসব কবিতায় রুটি, কাঠ, টমেটো, জলহাওয়া, কাপড়াচোপড় আর প্রাকৃত বস্তু। জাহাজের খালাসী, রাজমিন্ত্রি, খনিমজুর, ছুতােরমিস্ত্রি কিংবা রুটির কারিগর। এই নিয়ে তার ‘পঞ্চভূতের স্তোত্র’।

নেরুদার কাছে কবিতা রচনা ছিল আর পাঁচটা সামাজিক কাজেরই মতন। কিন্তু শুধু তার মধ্যেই নিজেকে তিনি বেঁধে রাখেন নি। তাঁর দেখাশোনার জগৎকে এবং নিজের জীবনের টুকরো কথাগুলোকে তিনি সামনে ধ’রে রেখেছেন তাঁর কবিতায়। সেই সঙ্গে লোককথা আর অতিকথাকেও বাস্তবের গাঁটছড়ায় বেঁধেছেন।

১৯৫৫ সালে নেরুদা বিয়ে করেন মাতিলদে উরুতিয়াকে। বিয়ের আগে এবং পরে নেরুদা আবার নতুন ক’রে অজস্র প্রেমের কবিতা লেখেন। নেপলস থেকে ১৯৫২ সালে বেনামে বার হয় ‘কাপ্তানের কবিতাবলী’ (কবিতাগুলো যে নেরুদার লেখা তা প্ৰকাশ পায় ১৯৬২ সালে) এবং ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘প্ৰেমবিষয়ক সনেটশতক’।

পঞ্চাশোত্তর হওয়ার পর থেকেই নেরুদার কবিতা আবার নতুন বাঁক নেয়। এবার তাঁর কবিতায় আবার তীব্র হয়ে দেখা দেয় নিসর্গ, সমুদ্র আর কৃষ্ণদ্বীপে নির্মিত তাঁর নিজের বাড়ি। প্রকৃতির রহস্যের দিকে তিনি চোখ ফেরান পরম বিস্ময় নিয়ে। রাজনীতি আর ইতিহাস তখনও তাঁর কবিতায় রীতিমতভাবে উপস্থিত। কিন্তু সেখানেও তিনি বার বার ফিরে যান। সারাৎসারে, তার উৎসের দিকে। জীবনের শেষ বছরগুলোতে তাঁর চােখে থেকে থেকে ঝিলিক দেয় মৃত্যুর পারাবার। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত কবিতার বইয়ের নাম দেন ‘ভাটিয়ালি’। এইসব কবিতায় তিনি তাঁর জীবনের হিসেবনিকেশ করেন, দেশে দেশে ভ্ৰমণ, রাজনীতিতে অংশ নেওয়া এবং ব্যক্তিগত সুখদুঃখের কথা বলেন। এই সময়ে তাঁর একটি গীতিনাট্যও (‘হোয়াকিম মুরিয়ে তার মহিমা ও মৃত্যু’) বেরিয়েছিল। ১৯৭০ সালে মানব প্রগতির সৃষ্টিতত্ত্বের বিষয়ে নেরুদা অতিকথামূলক একটি কবিতা লেখেন। তার নাম, ‘জ্বাজল্যমান তরবারি’।

১৯৭০ সালে চিলির প্রেসিডেন্ট হলেন সালভাদর আলেন্দে। (চিলির কমিউনিস্ট পার্টি গোড়ায় প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হিসেবে নেরুদার নাম ঘোষণা করেছিল; কিন্তু কয়েকটি দল সম্মিলিতভাবে আলেন্দেকে মনোনয়ন করতে রাজি হলে কমিউনিস্ট পার্টি আলেন্দের সমর্থনে নিজেদের প্রার্থী প্রত্যাহার করে নেয়।) নেরুদা যে কী খুশী হলেন বলার নয়। এতদিন পর স্বদেশ চিলিতে তাঁর বহু আকাঙ্ক্ষিত সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হতে চলেছে।

নিৰ্বাচনের অব্যবহিত পরেই নেরুদাকে কৃষ্ণদ্বীপে তাঁর শান্তির নীড় ছাড়তে হল। পারীতে তাকে চিলির রাষ্ট্রদূত ক’রে পাঠানো হল। পারীতে থাকার সময়ই ১৯৭১ সালে নেরুদা নোবেল পুরস্কার পেলেন।

১৯৭২ সালে বার হল তার ‘ফরাসী কবিতা চতুষ্টয়’ এবং তারপর ‘নিষ্ফল ভূগোল’। নোবেল পুরস্কার হাতে পাওয়ার অল্প কিছুকাল পরেই নেরুদা অবসর নিয়ে ফিরে গেলেন কৃষ্ণদ্বীপে তাঁর জীবনসন্ধ্যার নীড়ে। তার আগেই তাকে আক্রমণ করেছে কালব্যাধি। কিন্তু চিলিতে তখন ঘোর অশান্তি। দেশী বিদেশী প্রতিক্রিয়াশীল কুচক্রীরা চিলিকে তখন গৃহযুদ্ধের কিনারায় এনে ফেলেছে।

১৯৭৩ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে নেরুদা তাঁর বহুদিনের বন্ধু এবং জীবনীকার মার্গারিতা আগির‌্যেকে  বলেন, “চিলির পক্ষে এ এক হৃদয়বিদারক সময়। আমার পড়ার ঘরে এসে তা চড়াও হয়েছে, এই মহা সংগ্রামে যোগ দেওয়া ছাড়া আজ আর কোনো উপায় নেই।”

এই সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বললেন, “ভিয়েতনামেরই দশা, শুধু বোমা আর গোলাগুলি ফাটার শব্দ নেই। এই যা৷…নইলে চিলির বিরুদ্ধে ঘরে বাইরে সম্ভবপর সব অস্ত্ৰই প্রয়োগ করা হচ্ছে। আমরা আজ ঠিক এই মুহূর্তে এক অঘোষিত যুদ্ধে লিপ্ত।”

নেরুদা যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন ১১ই সেপ্টেম্বর প্রথমে নৌবাহিনী, তারপর সেনাবাহিনী বিদ্রোহ করল। আক্রান্ত লা মোনেদা প্রাসাদে বীরের মৃত্যুবরণ করলেন প্রেসিডেন্ট আলেন্দে। তার বারোদিন পরে ২৩শে মারা গেলেন পাবলো নেরুদা। তাঁর শবযাত্রাই হল চিলির নতুন জঙ্গী শাসনের বিরুদ্ধে দেশবাসীর প্রথম বিক্ষোভ মিছিল। তার জবাবে ভাড়া করা গুণ্ডার দল নেরুদার সান্তিয়াগোর বাড়ির দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাঁর বই আর কাগজপত্র নষ্ট করে।

মৃত্যুশয্যাতেও নেরুদার কলম কখনও থামে নি। কবিতায় তিনি শত্রুর বিরুদ্ধে সমানে ছুঁড়েছেন মর্মঘাতী বাণ।

শেষ নিশ্বাস ফেলার আগেও তিনি লিখে গেছেন স্মরণীয় কবিতা :

আর আজ হৃত অরণ্যের গভীরে

তার কানে আসে শত্রুর আওয়াজ, সে তখন পালায়

দলছুট হয়ে নয়, আদতে নিজের কাছ থেকে

সেই অন্তহীন কথোপকথন থেকে

সমস্তক্ষণ আমাদের সঙ্গে থাকা ঐকতান থেকে

আর জীবনের অভিপ্ৰায় থেকে।

যেহেতু এই একবার, যেহেতু শুধু একবার, যেহেতু

একটি একস্বর শব্দ অথবা নৈঃশব্দ্যের একটি বিরতি

অথবা একটি তরঙ্গের অনবরুদ্ধ কলরব

আমাকে দাঁড় করিয়ে দেয় সত্যের মুখোমুখি

সেখানে খোলসা করার আর কিছু থাকে না,

বাড়তি বলারও কিছু থাকে না; সেই সবকিছু

রুদ্ধ ছিল অরণ্যদ্বার।

সূর্য প্রদক্ষিণ করে পত্রাবলীকে উন্মীলিত করে

শ্বেত ফলের মত আবির্ভূত হয় চাঁদ

আর মানুষ তার নিয়তির কাছে নতশির হয়৷

[সুভাষ মুখোপাধ্যায় অনূদিত নির্বাচিত পাবলো নেরুদা গ্রন্থ থেকে সংকলিত]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close