Home কবিতা পিয়াস মজিদ >> স্বনির্বাচিত ১০টি কবিতা
0

পিয়াস মজিদ >> স্বনির্বাচিত ১০টি কবিতা

প্রকাশঃ December 20, 2017

পিয়াস মজিদ >> স্বনির্বাচিত ১০টি কবিতা
0
0

পিয়াস মজিদ >> স্বনির্বাচিত ১০টি কবিতা

 

[সম্পাদকীয় নোট :  ২১ ডিসেম্বর কবি পিয়াস মজিদের জন্মদিন। ইতিমধ্য্য প্রেমের কবিতার একটি কাব্যগ্রন্থসহ তাঁর সাতটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। কবিতায় নিজের স্বর ও বলবার ভঙ্গির কারণে তিনি সমকালের, বিশেষ করে গত দুই দশকের কবিতাপাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। জন্মদিন উপলক্ষে পিয়াস মজিদকে তীরন্দাজ টিমের পক্ষ থেকে শুভকামনা জানাই।]

 

স্বপ্নরেখা

 

ঘুমন্ত হাড়ের ভেতর বেজে ওঠো
হারমোনিয়াম;
আঁকাবাঁকা সুরের ঢলে তোমাকে দেখেছি
আঁধার-নিকষেও ছায়াশীল।
পাশেই শত শত মৃত্যুভ্রূণ
পদতলে যে আর্তমাধুরী বিছিয়ে গেল
তার আন্তঃঅভিঘাতে
আজ ঐ সার্বভৌম কৃষ্ণকাননে দেখি
গোলাপের রক্তিম ন্যারেশন।
ক্রমে সমুদ্রও শুকিয়ে আসে;
কেবল আমার নির্জন কান্নার কল্লে¬াল
খরাপ্লুত মরশুমে
তোমাকে করে তোলে
বিপুল তরঙ্গরঞ্জিত।
অচিত্রকল্প

অন্ধকার অতঃপর;
বিগত নক্ষত্রের কারুকর্ম ছায়া ফেলে
পাথরের প্রপাতে,
বনভূমির শায়িত সবুজ বৃষ্টিতে শুমার হয়
সব শিলীভূত স্বপ্নের
এই ধূসর ক্যানভাসে কেবল মৃত্যুরই রঞ্জক।
ভুখা আকাশের মালিকানা নিয়ে
পাতালে-জলে যুদ্ধ বাঁধে খাদ্য ও খাদকের।

ইতিহাসের পাতায় বসে একটা ইঁদুর ভাবে :
কোন কানাগলি থেকে আলো এসে না তার
ভোজ্য-দৃশ্যটা গিলে খায়!

 

হিরণ্য

 

নিরঞ্জন আমি;
অবগাহনের গোলাপছন্দে
ভেসে যেতে যাই লেলিহান সান্ধ্যপ্রবাহে।
জন্ম থেকে একটা কালো পিয়ানোর
কান্নারেখা অনুসরণ করে
আবিষ্কার করেছি
জগতের যাবতীয় হর্ষসিন্ধু
নিসর্গের নোটে এইসব কিছু নেই,
কেবল সন্ধ্যার শ্বাসমূলে ঝুলে থাকা
আসন্ন রাত্রির গর্ভ ও কঙ্কাল
যুগপৎ আমার নাম ধরে ডাকে।
অন্ধ হতে হতে বুঝি প্রলয় কতটা শোভাময়!
নৃবেদনার দুয়ারে এমত সুরভিক্ষা শেষে
রাজপথে দেখি
মিছিল এখনও শুরুই হয়নি।

 

পূর্ণিমাপট

 

শারদসন্ধ্যার ভিত্তিপ্রস্তর শেষে
চলেছি ঐ অমাচাঁদনিঘাটে
রাত্রির ভেতর যেখানে
সহস্র তারার সংস্থান;
এর মধ্য থেকে জীবনের যত
একক ও যৌথ নির্জ্ঞান
ছেঁকে নিয়ে বুঝি
অগ্নিগিরির ভাঁপ পেয়ে
নদীনৃত্যকলা এত রত্নাবতী!
পাশে বনভূমির হরিৎ তন্ত্রীতে
বহমান মৃত্যুনীলমণি
ট্র্যাজিকমিক আবহের সুর তুলে
ক্রমশ উজ্জ্বল করে চিতার বৈভব।
পাখিপরিবাহী এই দিগন্তের তুলি
রৌদ্রমেঘবৃষ্টি পেরিয়ে দেখে
সামনে ধু ধু চন্দ্রাস্তের আঁতুড়ঘর।
পরাজ্যামিতি

 

এই ভোর থেকে খানিকটা এগিয়ে
আমি ও আমার সান্ধ্য-প্যারাডাইম
অকূল পড়ে থাকে।
তোমার স্নায়ুর অবরোহে
দেখেছি গোলাপ-
রুধিরে নিকষিত।
যখন পাদ্রিশিবপুরের ঘণ্টাগুচ্ছ
মহিমা মুলতবি রেখে
ঘুমের নীরবে চলে;
মরুভূমির জলাচ্ছন্ন হৃদয় উপচে
ওঠে ডাঙায় ডাঙায়।
এমন সমুদ্রসন্ধ্যায়
হাঁটতে গিয়ে বুঝি
জীবন কতটা বহ্নিবাহুময়!

অন্ধকার জয়ন্তী

 

সাতসন্ধ্যার অস্থি পেরিয়ে রাতপরি তুমি।
তারাস্তম্ভের নিচে চাপা পড়ে আমি অপূর্ব শহিদ
কত ঝরাপাতা মঞ্জিলে স্মৃতিকে উদ্বাস্তু করে
মৃতমালঞ্চে উদ্যাপিত হয়েছি
নক্ষত্রপুষ্পের নিঃসঙ্গ জয়ন্তী।
নেপথ্যে ঘনীভূত দেবছায়ার
হ্যাংওভার কাটাতে কাটাতে
ঘুম ফোটায় তার
ঘরানা-বাহিরানা।
মেঘের পর মেঘ জমে
আঁধার করে সিটি- লাইট আসে;
অতঃপর প্লাবনভূমির বংশলতিকায়
আশ্চর্য এই খরা-মুঞ্জরণ আমার।
ঝরা পাতার সিংহাসন

 

ঝরে পড়া প্রেমের মতোই
তুমি মালঞ্চে চির-চৈত্রশীল।
ঘাতকের নিষ্ঠায়
রচনা করে তোলো
সহস্র রূপমৃত্যুর মঞ্জুষা-ফাঁদ।
মরচে পড়া আলোর ঝলকানি
তামাদি করে বেছে নিই
জীবনের সেইসব অন্ধকার নন্দন!
আর যত ফেরারি পুষ্পে ছিল
ফেলে আসা ফাল্গুনরাত্রির
সবুজ কন্সট্রাকশন।
হৃদয়ের বসন্তবনে গুঞ্জরিত
মরা পাতার দল
ফাঁপা ফসলের চেয়েও
জাগায় বেশি আনন্দধ্বনি।

অনন্ত অনাঘ্রাতার দিকে
রিক্তের এই চৈত্রযাত্রা
চলছে, চলবেই।
স্বপ্নমৃত্যুপ্রসারণ

 

এই গ্রীষ্মেও
মুষলধারে কাঁদছে আকাশ;
কান্নাপ্রণালি
কোনো ঋতু মানে না।
দিগন্তপাতালে
রন্ধনশালার বিস্তার তার।
এর মাঝে আমি এক
ঋজুরেখ নক্ষত্রবাদি,
এই ক্রন্দনসিম্ফনির
কারুকাঠামো ভেদ করে
শুক-স্বাতী-অরুন্ধতীর
হৃৎমহলে যাই;
দেখে আসি
এক একটি নক্ষত্রের
নির্মাণশেষে
তোমার চোখের জল
কত যুগের
বর্ষা হয়ে
ঝুলে থাকে
অনন্ত
অন্তহীনে!
নির্নন্দন

 

ধ্বংসের ছন্দোবন্ধনে ছাওয়া
স্নায়ুবৃক্ষ আর আসন্ন অন্ত্যেষ্টি আমার।
রুঠা সত্যে ছিল আকীর্ণ এতকাল;
কৃষ্ণ সব স্বপ্নের স্থপতি
এখন গড়ে নক্ষত্রের রংরুট।
উষ্ণতম রক্তবাহের প্রাণপথে
যখন মুহূর্মুহু হেঁটে বেড়ায় জলদেবের কন্যা,
অন্ধকার আয়ুষ্কালে তার খান খান
নিরঞ্জন আলোর ইমারত যতো।
জ্যোৎস্নার এইমতো জ্যামিতিতে
সুনিকেত রাত্রি আজ অনন্ত জিপসি ব্যালাদ।
মহাসংগীত, তোমার শীর্ষসুরও ধারণ-অক্ষম
অগীতল জীবনের এমন অভূত রূপাভিঘাত
রক্তঋদ্ধ

 

চৈত্রশেষ
তবু ঝরা পাতার পটভূমি অপার।
সমুদ্রের ইন্দ্রিয়সমুচ্চয়
স্রোতের ভাঁজে ভাঁজে দেখায়
কত সুরম্য রক্তের নন্দন।
বাহারি অগ্নির মুঞ্জরণে
পুষ্পও প্রকরণ পাল্টায়।
আজ তাই নৃত্যভেলায় একচ্ছত্র
গোলাপের মিউজিক শুধু।
জীবন নামের এই রূপসি মঞ্জিলে
কঙ্কালেরও বয়স বাড়ে,
রাত্রির কৃষ্ণ কেশে চলে
জ্যোৎস্নার চিরুনি।
মৃত্যুপঞ্জির নির্জন কত কারুকাজে
নরক আছে বিভাশীল।
তোমার লিরিকের প্রবেশিকায় অনুত্তীর্ণ আমি;
রূপকথা-স্বর্ণকথার বিষণ্ন বাদ্যে
ক্রমশ গুম হয়ে যাই।
এভাবে সুন্দর-নিঠুরের গীতিময়তা
তারাশস্যের মতো অস্তিমান ফুটে থাকে
ভূমিহীন স্বপ্নক্ষেত্রে আমার।

 

পিয়াস মজিদ
জন্ম : ২১ ডিসেম্বর, ১৯৮৪, চট্টগ্রাম
শিক্ষা : স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর (ইতিহাস বিভাগ), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
পেশা : কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি
সম্পাদিত ছোটকাগজ : ভুবনডাঙা , আর্কেডিয়া
প্রকাশিত গ্রন্থ :
কবিতা : নাচপ্রতিমার লাশ (২০০৯, ২য় সংস্করণ ২০১৪)
মারবেল ফলের মওসুম (২০১১, ২য় সংস্করণ ২০১২)
গোধূলিগুচ্ছ (২০১৩)
কুয়াশা ক্যাফে (২০১৫, ২য় সংস্করণ ২০১৬)
নিঝুম মল্লার (২০১৬)
কবিকে নিয়ে কবিতা (২০১৬)
প্রেমের কবিতা (২০১৬)
গল্পগ্রন্থ : নগর ঢাকায় জনৈক জীবনানন্দ (২০১৬)
প্রবন্ধ/মুক্তগদ্য : করুণ মাল্যবান ও অন্যান্য প্রবন্ধ (২০১২, ২য় সংস্করণ ২০১৪)
কবিতাজীবনী (২০১৪)
কামু মার্কেস ইলিয়াস ও অন্যান্য (২০১৫)
এলোমেলো ভাবনাবৃন্দ (২০১৬)
সাক্ষাৎকার সংকলন : আলাপন অষ্টমী (২০১৫)
পুরস্কার : এইচএসবিসি-কালি ও কলম পুরস্কার ২০১২, আদম তরুণ কবি সম্মাননা, কলকাতা ২০১৫, সিটি-আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার, ২০১৬, শ্রীপুর সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার ২০১৬
অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড : তার ছোটগল্প অবলম্বনে আশুতোষ সুজন নির্মাণ করেছেন টেলিছবি নগর ঢাকায় জনৈক জীবনানন্দ। ২০১৫তে আমন্ত্রিত হয়ে অংশ নিয়েছেন চীনে অনুষ্ঠিত চীন-দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া সাহিত্য সম্মেলনে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close