Home অনুবাদ প্রেমিকা লুই আন্দ্রে সালোমেকে লেখা রিলকের তিনটি চিঠি > অনুবাদ : রেশমী নন্দী

প্রেমিকা লুই আন্দ্রে সালোমেকে লেখা রিলকের তিনটি চিঠি > অনুবাদ : রেশমী নন্দী

প্রকাশঃ June 20, 2017

প্রেমিকা লুই আন্দ্রে সালোমেকে লেখা  রিলকের তিনটি চিঠি > অনুবাদ : রেশমী নন্দী
0
0

নীৎশে, ফ্রয়েড, রিলকে- এরকম অনেক পুরুষই ছিলেন তার রূপে মুগ্ধ, মেধার দ্বারা বশীভূত। বিয়ে করেছিলেন যাকে তার সঙ্গে কখনও থাকেননি। রিলকের বিয়ের প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু রিলকের সঙ্গে আজীবন বন্ধুতা রক্ষা করে গেছেন। পরস্পরের মধ্যে অনেক চিঠির আদান-প্রদান হয়েছে। সালোমেকে লেখা এরকম কয়েকটি অনূদিত চিঠি প্রকাশিত হলো তীরন্দাজ ঈদ সংখ্যায়।

প্রেমিকা লুই আন্দ্রে সালোমেকে লেখা

রিলকের তিনটি চিঠি

অনুবাদ : রেশমী নন্দী

[১]

লুই আন্দ্রে সালোমে

সেন্ট পিটাসবুর্গ, ১৯০০

শনিবার সকাল

তোমার চিঠি পেয়েছি, অমূল্য এ চিঠি যার প্রতিটি শব্দ আমার ভালো লাগছে, যা আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে ঢেউয়ের মতো, এত তীব্র আর উত্তাল, বাগান দিয়ে ঘিরে রেখেছে আমাকে, স্বর্গ রচনা করছে আমার জন্য, যার জন্য আমি বলতে পারছি, সুখের সাথে জানাতে পারছি শেষ চিঠিটা নিয়ে আমার বোকার মতো লড়াইয়ের কথা : যে আমি তোমাকে চাইছি, জানাতে পারছি যে তোমার কোন খবর না পেয়ে কেমন ডুবে ছিলাম নামহীন হতাশায়, বিশেষ করে অমন অপ্রত্যাশিত আর তাড়াহুড়া করে তোমাকে বিদায় জানানোর পর যখন এ কঠিন শহরের প্রায় শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশে দূর থেকে কোন অবস্থাতেই তুমি আমার সাথে কথা বলতে পারবে না।  তাই  বিচ্ছিন্নতা থেকে, অনভ্যস্ত আর অভিজ্ঞতার বাইরের অসহনীয় একাকিত্ব থেকে  শেষের ঐ বাজে চিঠিটার জন্ম যেখানে কেবলই পাওয়া যাবে  ব্যতিব্যস্ততা, হতবিহ্বলতা আর বিভ্রান্তি, যেগুলো তোমার মতো একজন মানুষ যার চারপাশ নতুন পরিস্থিতিতেও তক্ষুনি সৌন্দ্যর্যাবেষ্টিত হয়ে ওঠে, তার কাছে নিশ্চিতভাবে অপরিচিত।

এখন আমার মেনে নিতে পারছি না যে তোমাকে ঘিরে থাকা অসাধারণ গানে যেখানে তুমি আবারো খুঁজে পেয়েছো শিশুদের স্বর, সেখানে আমার স্বর তোমার কাছে অদ্ভুত শোনাবে, একেবারে মামুলী মনে হবে, ওইসব পবিত্র শব্দমালা আর নৈঃশব্দ্যগাথা তোমার দিনগুলোর কাছে পৃথিবীর সমস্ত স্বর এমন। তাই না? ভয় হচ্ছে এটা আসলেই তাই। কি করবো আমি? আমি কি অন্য চিঠিটার সাথে এ চিঠিটাও ভাসিয়ে দেবো? এ চিঠিতে তোমার কথা বাজছে, অন্যটা তোমার চলে যাওয়ার উপর যার কিছুই আমি জানতাম না  আর এখন আমাকে জানানো হচ্ছে যে আমার কোন অধিকার নেই এর অস্তিত্বে … কিন্তু আছে, তাই না?

আমার জন্য কিছু একটা কি বলবে? বলবে যে এরপরও সবকিছুই তুমি যেমন লিখেছো তেমনই; কোন কাঠবিড়ালী এর জন্য মারা যায়নি আর কোনকিছুই, কিছুই এর চাপে কালো হয়ে যায় নি বা ছায়া হয়ে রয়ে যায় নি পেছনে।

তুমি তো জানোই, তোমাকে প্রায়ই আমার কাঠবিড়ালীগুলোর গল্প বলতাম, ছোটবেলায় ইতালিতে যেগুলো আমি পোষ মানিয়েছিলাম। এদের জন্য আমি  লম্বা, অনেক লম্বা একটা চেইন কিনেছিলাম যাতে তাদের স্বাধীনতা গাছের উচুঁ আগায় গিয়ে শেষ হয়। ওদের অস্তিত্বের উপর ক্ষমতা আছে বলেই জোর খাটানো নিশ্চিতভাবেই ঠিক না ( যখন তারা বড় হয়ে গেছে আর আমাকে তাদের দরকার নেই), কিন্তু তাদেরও অল্পস্বল্প ইচ্ছা ছিল আমার সাথে থাকার যে জন্য তারাও প্রায়ই আমার পিছনে ঘুরতো, তাই একসময় আমার মনে হলো তারা হয়তো শৃঙ্খলিত থাকতেই চায়।

ওরা কতটা তোমার অভাববোধ করবে, খুদে সোনারা! তোমাকে ছাড়া একা জঙ্গলে আর জগতে বিচরণ করার মতো  যথেষ্ট বড় হবে কি ওরা? রনগাকের ফার গাছের ওপর ওদের শৈশব মাঝে মাঝে ওদের কাছে ধরা দেবে আর লাফ দেয়ার ঝাঁকুনিতে আন্দোলিত গাছের শাখা ওদের তোমার কথা ভাবাবে। এবং যদিও তারা কেবলমাত্র তিনটি ছানা কাঠবিড়ালী, যাদের ছোটছোট চোখে তোমার জন্য কোন জায়গা নেই, তবু ওদের মধ্যে কোথাও একটা অনেক বড় কিছু আছে যাতে তুমি ওদের প্রাণতুল্য হয়ে উঠতে পারো। প্রিয় আমার।

তাড়াতাড়ি ফিরে এসো, ওদের ছাড়া মাত্রই ফিরে এসো। ওদের পথ দেখিয়ে দাও জঙ্গলের, স্বকন্ঠে ওদের বলো কত সুন্দর এটা আর তাতেই তারা হয়ে উঠবে সবচেয়ে সুখী কাঠবিড়ালী আর অরণ্যটি হয়ে উঠবে সবচেয়ে সুন্দর ।

দয়া করে রবিবারের মধ্যেই এখানে আসো! তুমি বিশ্বাস করতে পারবে না পিটাসবুর্গে দিন কত দীর্ঘ। এদের মধ্যে বেশিরভাগ দিনই কিছু হয়না। জীবন এখানে ক্রমচলমান , যেখানে প্রত্যেক গন্তব্যই ভোগান্তির। একজন হাঁটছে, হাঁটছেই, চলছে, চলছেই আর যেখানে কেউ পৌঁছাচ্ছে তখন প্রথম অভিব্যক্তিই হচ্ছে তার নিজের শ্রান্তি। এর সাথে আরো একটু যোগ করে বললে, মানুষ প্রায় সবসময় কোন কারণ ছাড়াই তাদের জীবনের দীর্ঘতম ভ্রমণ করে। সে যাই হোক, আমি ইতিমধ্যেই এতটুকু জেনেছি যে আমাদের এখনও সুন্দর অনেক কিছু দেখার বাকি আছে তুমি ফিরে এলে। যে কোন অবস্থাতেই দুসপ্তাহে আমি যা কিছু ভেবেছি সবকিছুর সমাপ্তি ঘটবে: যখন তুমি ফিরে আসবে…

বুধ থেকে বৃহষ্পতিবারের চাঁদের আলোও আমি ভালবাসি। অনেক আগে সেন্ট আইজ্যাকের গির্জা পার হয়ে আমার প্রিয় নেভাতে নদী গিয়েছিলাম, যেখানে শহর সরলতম আর সর্বশ্রেষ্ঠ। সেখানে আমিও বেশ অপ্রত্যাশিতভাবেই পেয়েছিলাম প্রশান্তি, সুখ আর গভীরতা, তোমার চিঠি পাওয়ার পর থেকে যেমন পাচ্ছি।  আমি খুব তাড়াহুড়া করে তোমাকে এই কথাগুলো পাঠাচ্ছি যাতে সোমবার তুমি কিছু একটা পাঠাতে পারো এ চিঠির উত্তরে (তুমি  নিশ্চয় তোমার ভাইকে দিয়ে দুএকটা শব্দ পাঠাবে? কয়েকটা মাত্র শব্দ পাঠাও, আমি সবটুকু বুঝে নেবো!) একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো : তুমি কি সুখী? আমি সুখী, সব বিরক্ত পরেও, মৌলিকভাবে, পূর্ণ বিশ্বাসে, অদম্যভাবে সুখী। এর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।  তাড়াতাড়ি এসো!…

[২]

লুই আন্দ্রে সালোমে,

ভর্পসভেইদা, ব্রেমেন

আগস্ট  ১, ১৯০৩

ইদানিং এখানে গ্রীষ্ম সামান্যই টের পাওয়া যাচ্ছে আর এমন অশান্ত হয়ে উঠেছে যে আমরা ভাবছি, আগস্ট শেষের আগেই এখান থেকে চলে যাবো। প্রথমে লাইপজিগে বাবার সাথে পুনর্মিলনী আর তারপর যাবো মিউনিখ, ভেনিস আর ফ্লোরেন্স হয়ে রোমে যেখানে আমার স্ত্রী ( রঁদ্যার ইচ্ছানুযায়ী) আগামী বছর পর্যন্ত কাজ করবে। আমিও থাকবো রোমে এক দুমাস  কারণ আমি নিজেও খুব অধীর হয়ে আছি প্রাচীন নিদর্শন দেখতে যার সম্পর্কে আমি এখনো কিছুই জানি না, বিশেষ করে এগুলোর ছোটছোট বিষয়ে লুকোনো রয়েছে অপার সৌন্দর্য। সেগুলো আর রঁদ্যার গথিক কাজ, যেগুলোর গভীরে আমি ডুবে গেছি পরম ধৈর্য্যের সাথে, আমাকে যুক্ত করেছে এবং আমি অনুভব করছি যে প্যারিস আমাকে সেরা যা কিছু শিখিয়েছে ইতালীতে আমার এ স্বল্পাবাস তারই একটা স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা। কিন্তু রোমে আমি বেশিদিন থাকতে চাই না। কিছুদিন পর একা দূরে কোথাও একটা যাবো যেখানে শীতকাল জাঁকিয়ে আসে। কোথায় থাকবো, এখনো জানি না। টাস্কান যেহেতু আমার প্রিয় আমি নিশ্চয় সেখানে যেতে চাই, সেন্ট ফ্রান্সিস সেখানে গোপনে উন্মুক্ত করে রেখেছিল তার ভাস্বর দারিদ্র যেখানে সব প্রাণীর ঠাঁই হতো : সাবিয়াওকোতে বা অ্যাসিসিতে; তবে পাহাড়ী দেশ হওয়ায় সম্ভবত শীতকাল এখানে খুব বেশি খেপাটে। হয়তো আমাকে রোম থেকে দক্ষিণ দিকে যেতে হবে, হয়তো আমালফির কাছের ছোট শহর রাভেলোতে যাবো, নীল উপসাগরীয় প্রবাহের আনন্দময় উপকূলের কাছে। হয়তো সেখানে নির্জনতা আমার কাছে ধরা দেবে, সেই নীরবতা যা আমি আমার সমস্তটা দিয়ে কামনা করছি; শব্দহীনতায় তখন আমি  সবকিছুর সঙ্গ পাবো  আর আমার জন্য সবকিছু এত সাধারণ পরিবেশে রাখার জন্য কৃতজ্ঞ বোধ করবো…রঁদ্যার উপর লেখা আমার ছোট্ট বইটা যেটা তোমাকে আজ পাঠাচ্ছি সেটা তোমাকে আরো কিছু জানাবে; এটা একেবারেই ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্যারিসকে মহত্ত্বম প্রভাবের ছায়ায় থেকে প্রথমবার দেখার সাক্ষ্য, সহস্রগুণ ভয়ের মধ্যেও লুকিয়ে থাকা কিছু একটা আমি অনুভব করেছিলাম যেটা আমার কাছে পরে ধরা দিয়েছিল…,

[৩]

লুই আন্দ্রে সালোমে,

উবারনাউলান্ড, ব্রেমেন

আগস্ট ৮, ১৯০৩

যেদিন প্রথম রঁদ্যার কাছে আসি এবং ম্যুডনে  দুপুরের খাবার খাই তার সাথে, অনেক লোক ছিল যাদের সাথে পরিচয় নেই, একই টেবিলে অনেক অপরিচিত মানুষ, তখনই আমি বুঝেছিলাম যে তাঁর ঘর তাঁর জন্য কিছুই না,  সম্ভবত নগন্য প্রয়োজনের অনুষঙ্গ, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে বা ঘুমোতে মাথার উপর ছাদ; তিনি এর কোন যত্নও নেন না, তাঁর একাকীত্ব ও প্রশান্তভাবের উপরও এর কোন প্রভাব নেই। তাঁর ভেতরে তিনি বয়ে বেড়াতেন অন্ধকার, আচ্ছ্বাদন আর ঘরের প্রশান্তি আর তিনি নিজেই এর উপর হয়েছেন আকাশ, কাছে দূরে একে ঘিরে হয়েছেন অরণ্য, সারাক্ষণই এর পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে জলের ধারা। ওহ, নিজের মধ্যে ডুবে থাকা এই বৃদ্ধ কি একা…যেন হেমন্তে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাণরসে পূর্ণ বয়োঃবৃদ্ধ এক গাছ! তিনি একজন গভীর মানুষ, হৃদয় খুঁড়ে তৈরি করেছেন এক গভীর স্থান আর এর স্পন্দন ধ্বনির উৎপত্তি যেন কোন দূর পাহাড়ে। তাঁর ভাবনাগুলো কেবল ভাসা ভাসা নয়, তাঁর নিজের মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে নিবিড়ভাবে মাধুরীসিক্ত করে তুলেছে তাঁখে। অনেকটা কাঠকোট্টা হয়ে গেছেন তিনি, অদরকারী বিষয়গুলোর ব্যাপারে খুব রূঢ়, তিনি এমনভাবে মানুষের মধ্যে দাঁড়ান যেন মনে হয় গাছের বুড়ো বাকল জড়িয়ে আছেন। কিন্তু যা কিছু তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ সেখানে তিনি নিজেকে একেবারে উন্মুক্ত করে দেন। তাঁকে ছুঁয়ে যায় এমন কোন বস্তু, মানুষ বা প্রাণীর কাছে তিনি নিজেকে খুলে দেন পুরোপুরি। এসব ক্ষেত্রে তিনি একজন ছাত্র, শিক্ষানবিশ, দর্শক, সৌন্দর্য্যের অনুসারী, যেগুলো অন্যমনষ্ক ও বেদরদীদের ক্ষেত্রে সাধারণত ঘুমের ঘোরে পার হয়ে যায়। সেখানে তিনি অতন্দ্রচিত্ত যার কাছ থেকে কিছুই এড়াতে পারে না,  এমন ধৈর্য্যশীল তিনি যে সময়ের হিসাব কষেন না, চিন্তা করেন না পরবর্তী অর্জনের। তিনি কেবল যে কোন একটা কিছুর দিকে তাকান এবং একে এমনভাবে দৃষ্টি দিয়ে ঘিরে রাখেন যেন একটা পৃথিবী যেখানে সবকিছু ঘটছে; তিনি যখন একটা হাত বানালেন, সেটা তখন শূণ্যে একা, আশেপাশে আর কিছু নেই; ছ’দিনে ঈশ্বর কেবল একটা হাত বানালেন, একে পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিলেন আর স্বর্গ আনত এর উপর; কাজ শেষে বিশ্রাম নিলেন এর উপরই। এটা হয়ে উঠলো গর্ব করার মত একটা বস্তু, একটি হাত।

সবকিছুকে এভাবে দেখা এবং জীবনযাপন করা তাঁর ক্ষেত্রে এতটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে কারণ পরিশ্রম কর তিনি এটা অর্জন করেছেন: যখন তিনি তাঁর কাজের জন্য অসম্ভব সরল ও মূল বিষয়ের সাথে সম্পর্কহীন কিছু বেছে নেন, তখন তিনি নাম না থাকা নিয়ে পৃথিবীর দোদুল্যমানতার মুখোমুখি দাঁড়ান  সততার সাথে, সমতার সাথে। যেহেতু সবকিছুর মধ্যে কিছু খুঁজে পাওয়ার ক্ষমতা তাঁর আছে, তিনি নিজেই সুযোগ করে নেন কিছু বানানোর; সেজন্যই সেটা হয়ে উঠে তাঁর অসাধারণ শিল্প। এখন কোন কিছুই তাঁকে বিভ্রান্ত করতে পারে না, কারণ তিনি জানেন, যে কোন কিছুর বাহ্যিক উচুঁ নিচু আবরণেও থাকে চলন, তিনি বাহ্যিক আবরণ ও এর নানা রূপ যথাযথ ও স্পষ্টভাবেই দেখতে পান। সেজন্যই কোন কিছু যেটা কাজের মডেল হিসেবে তিনি ব্যবহার করেন, সেটা নিয়ে তাঁর কোন অনিশ্চয়তা নেই:  শূণ্যতায় হাজারো ছোট ছোট উপাদান জায়গা করে নিতে পারে আর তাঁর কাজ,   যখন তিনি এ থেকে কোন শিল্প তৈরি করছেন,  আরো অন্তরঙ্গ করে, আরো জোরালো ভাবে, আগের চেয়ে হাজার গুণ ভালো করে তোলা যাতে কোন কিছুই আর একে নাড়াতে না পারে। যে কোন বস্তু নির্দিষ্ট, কোন শিল্প বস্তু নিশ্চয় আরো বেশি নির্দিষ্ট; সবধরনের সম্ভাবনামুক্ত, যেখানে অপসারিত হয়েছে দুর্বোধ্যতা, সময়ের ঘেরাটোপ থেকে একে উঠিয়ে বসানো হয়েছে নির্ধারিত স্থানে, যা পেয়েছে স্থায়ীত্ব, অনন্তের সম্ভাবনা। মডেলের ধারণা রূপ নেয় শিল্পে। সেজন্যেই অপ্রকাশযোগ্য একে অন্যের দিকে এই এগিয়ে যাওয়া, প্রকৃতি থেকে বিচ্ছুরিত সবকিছুই ইচ্ছার এক প্রশান্ত আর ক্রমবর্ধমান প্রকাশ।  এখানে ভুল হতবুদ্ধিকর যা শিল্পকে তুলে ধরে সবচেয়ে স্বেচ্ছাচারী  ও নিরর্থক পেশা হিসেবে;  এটা সবচেয়ে নিরহঙ্কার পেশা এবং পুরোপুরি নিয়মের উপরেই প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু স্রষ্টা এবং শিল্পবস্তু ভুলে ভরা আর শক্তিমান কাউকে উঠে দাঁড়াতে হবে এর বিরুদ্ধে;  তাঁকে হতে হবে একজন কর্মঠ মানুষ যিনি কথা বলেন না, কাজ করে যান নিরলসভাবে। তার শিল্প উপলব্ধ হবে সবচেয়ে আগে (এটা সঙ্গীতের ঠিক উল্টো যা প্রত্যেকদিনের আপাত সত্যকে বদলে আরো অবাস্তবভাবে প্রকাশ করে, খুব সহজভাবে। যে কারণে শিল্প থেকে আলাদা, সংক্ষিপ্ত, বেরিয়ে পড়ার এই প্রলোভনের সুহৃদ অনেক, অনেক শ্রোতা, সমর্থক, অনেকেই যারা মুক্ত নন আর মজা পেতে চান, যারা নিজেদের আরো বাড়িয়ে তুলতে চান না, কেবল বাইরে থেকে আনন্দ আহরণ করতে চান), দরিদ্র আর নীচু ঘরে জন্ম নেয়া রঁদ্যা যে কারো চেয়ে অনেক ভালোভাবে দেখেছেন মানুষ, প্রাণী আর বস্তুর সৌন্দর্য যা জড়িয়ে আছে সম্পর্ক আর সময়ের সাথে। সবযুগে যৌবন মুহূর্তে আসে যায় কিন্তু স্থায়ী হয় না। তাঁর কাছে যা অপরিহার্য,  প্রয়োজনীয়, ভালো, কেবল তারই আভাস তাঁকে ভাবায় : সৌন্দর্যের আভাস।  তিনি চান এটা হয়ে উঠুক, তিনি দেখেন তাঁর কাজ এমন কিছুতে মানায় (কারণ বস্তুই টিকে থাকে) যা কম ভীতিকর, বেশি প্রশান্তি আর শ্বাশ্বত জগতে খাপ খাওয়াতে পারে। নিজের অজান্তেই তিনি তাঁর কাজে মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা প্রয়োগ করেন যাতে তা বিকশিত হয় সুসংবদ্ধভাবে ও বেঁচে থাকতে পারে। এর মধ্যে অনেক আগেই তিনি ‘কিছু না’-কে আকারে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন; কিছুতেই তিনি পিছপা হননি তবে যা-কিছু হয়ে উঠেছে তাতে শ্বাশ্বত অস্তিত্বের কাছাকাছি কিছুর প্রবণতা রয়েছে। আর এখন এই বৈশিষ্ট্য এতটা প্রবল হয়ে উঠেছে তাঁর মধ্যে যে, যে কেউ অনায়াসে বলে দিতে পারবে তার কাজের স্বরূপ নিয়ে তিনি উদাসীন : যতটা তিনি এদের অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারেন, এদের বাস্তবতা, অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি, পূর্ণতা আর উদারতা, এদের স্বাধীনতা; এদের অবস্থান পৃথিবীতে নয়, পৃথিবীকে ঘিরে।

যেহেতু কঠোর পরিশ্রম, নিরাসক্তি ও আরো ভালো ভালো কিছু তৈরি করার বিনয়ী ইচ্ছা থেকে তাঁর মহৎ কাজের উৎপত্তি, এখনো তাই তিনি অস্পৃষ্ট, উদ্দেশ্যহীন, নিমিত্তহীন, বয়ঃপ্রাপ্ত হয়েও সরলতম। মহৎ ভাবনা, অসামান্য মর্মার্থ এসবের কাছে তেমন করে পৌঁছায়, যেমন করে আইন পৌঁছায়  ভালোর কাছে, সম্পূর্ণতার কাছে; তিনি কিছু ডেকে আনেন না। তিনি চানও না; অধস্তনের দীনতায় তিনি পথ চলেন আর তৈরি করেন পৃথিবী, শত শত পৃথিবী। কিন্তু সব পৃথিবীই যেগুলো টিকে থাকে বাইরে ছড়িয়ে দেয় স্বর্গীয় আভা, দূরকে আন্দোলিত করে রাত। তিনি কোন কিছুই উদ্ভাবন করেন না, এটাই তাঁর কাজকে করে তোলে লক্ষণীয়ভাবে অকপট ও শুদ্ধ।ধারণার উপর ভিত্তি করে তিনি আগে থেকেই এক ঝাঁক আকৃতি বা এসব আকৃতির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেন না; (কারণ আইডিয়া এক, বলা চলে কিছুই না কিন্তু এর সাধনা অন্য বিষয়, এটাই সব)। তিনি খুব দ্রুত অনেক কিছু বানান, অনেক কিছু এবং এদের মধ্যেই গড়ে ওঠে এক নতুন ঐক্য যা তিনি নিজে তৈরি করেন বা বেড়ে উঠতে দেন আর সেজন্যই তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক হয়ে উঠে গভীর ও যৌক্তিক  কারণ ধারণা নয়, বস্তুগুলো নিজেরাই পরস্পরকে ধরে রাখে এবং এটা কেবল একজন কর্মীর কাছ থেকেই আসতে পারে আর যিনি এটা তৈরি করে তিনি খুব ঠান্ডা মাথায় অনুপ্রেরণাকে সরিয়ে রাখতে পারেন; কারণ এটা তাঁর কাছে আসে নি, এ রয়েছে তাঁর নিজের মধ্যেই, দিন রাত, দৃষ্টি দিলেই উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, হাতের চলনে সৃষ্টি হয় উষ্ণতা। এবং যত বেশি সৃষ্টি হয়, ততই বিশৃঙ্খলা তাঁর থেকে দূরে সরে যায়; কারণ তাঁর বাস্তবতার কাছে বিশৃঙ্খলা টিকতে পারে না। তাঁর কাজই তাঁকে নিরাপদ রাখে; তিনি এর মধ্যেই বাস করেন যেন অরণ্যে স্থান পেয়েছেন আর নিশ্চয় তিনি জীবনের অনেকটা সময় পার করেছেন যার ফলে তিনি নিজের জন্য এত বড় এক অরণ্য তৈরি করে নিতে পেরেছেন। তিনি যেখানে বাস করেন সেসব কিছুর মধ্যে যদি কেউ যায়, প্রতিদিন যেগুলো তিনি দেখেন এবং দিনকে ভরিয়ে তোলেন, তাহলে তার বাড়ি, একে ঘিরে শব্দ- সবকিছুই অনির্বচনীয় তুচ্ছ আর উটকো মনে হবে, মানুষের কাছে মনে হবে স্বপ্নে দেখছেন এসব, অদ্ভুত রকমের বিকৃত ও বিবর্ণ স্মৃতিতে পূর্ণ ভান্ডার। তাঁর প্রাত্যহিক জীবন ও এর সাথে যুক্ত মানুষ এমন শূন্য স্রোতধারায় অবস্থান করে যেখানে তিনি আর প্রবাহিত নন; কিন্তু এতে দুঃখ করার কিছু নেই; কারণ কাছেই তারা শুনতে পান প্রবল গর্জন আর দুহাত দিয়ে ভাগ করা যায় না এমন প্রবল স্রোতধারা…

এবং আমি বিশ্বাস করি লুই‌ যে এটা নিশ্চয় তাই…ওহ লু, আমার কবিতাগুলোর মধ্যে সফলতম কবিতা আমার কাছে যে-কোন সম্পর্ক বা ভালোবাসার চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব; যেখানে আমি সৃষ্টি করি, সেখানেই আমি সত্য আর এই সত্য, এই অসামান্য সরলতা আর মাঝে মাঝে পাওয়া আনন্দ থেকেই আমার জীবনের শক্তি আহরণ করতে চাই। এমনকি যখন আমি রঁদ্যার কাছে যাই, তখনও আমি এটাই খুঁজি;  কারণ তাঁর অসংখ্য কাজ ও কাজের মডেলে আমি এর আভাস পেয়েছিলাম। এখন যেহেতু আমি তাঁর কাছ থেকে আসছি, আমি জানি যে আমি নিজেও অন্য যে কোন কিছুর চাইতে আমার কাজের বাস্তবতাই খুঁজে ফিরবো; ঐখানে আমার ঘর যেখানে আমার যে নারীকে প্রয়োজন সে আছে, শিশু  আছে যে বেড়ে উঠবে, বাঁচবে দীর্ঘকাল।  কিন্তু কিভাবে আমি আমার যাত্রা শুরু করবো- কোথায় শিল্পের জন্য নিবেদিত আমার নিজের কাজ, এর চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে দক্ষ হয়ে উঠার পথ? আমাকে আবার সবকিছু প্রথম থেকে শুরু করতে হবে, এতদিন যা করেছি সেগুলো কিছুই না, দরজার সামনে ঝাড়ু দেয়ার চেয়েও তুচ্ছ যেখানে পরের অতিথিই আবারও এঁকে যাবে পথের নিশানা। আমার মধ্যে শত-শতাব্দীর ধৈর্য্য আছে এবং থাকবে, যেন আমার সময় অনেক বেশি। সব বিচ্যুতি থেকে আমি নিজেকে কুড়িয়ে নেবো, যা কিছু আমার সেগুলো আমি আগলে রাখবো যাতে খুব তাড়াতাড়ি এদের প্রয়োগ না ঘটে। কিন্তু আমি আভাসে শুনতে পাচ্ছি স্বর, পদধ্বনি নিকটতর হচ্ছে, খুলে যাচ্ছে আমার দরজা… আর যখন আমি মানুষ খুঁজে বেরাচ্ছি, ওরা আমায় পরামর্শ দেয় না, আমি কি বলি তাও বোঝে না। বইয়ের ক্ষেত্রেও আমি একইরকম (খুব বেখাপ্পা) আর এরাও আমায় সাহায্য করে না যেন এগুলোও মানুষ…কেবল বস্তু কথা বলে আমার সাথে। রঁদ্যার কাজগুলো, গথিক ক্যাথিড্রেলের কাজ,  প্রাচীন বস্তু- যেগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ। এগুলো আমাকে প্রতিরূপের কাছে নিয়ে যায়; প্রাণবন্ত, সজীব পৃথিবীতে, সহজভাবে, বস্তুর কোন বিশেষ ব্যাখ্যা ছাড়াই। আমি নতুন কিছু দেখতে শুরু করি : এর মধ্যেই ফুলগুলো প্রায়ই অসীম হয়ে ধরা দিচ্ছে, প্রাণীদের কাছ থেকে সঞ্চারিত হচ্ছে অদ্ভুত শিহরণ। এমনকি মানুষের ক্ষেত্রেও আমার মাঝে মাঝে এমন অনুভব হয়, হাত জীবন্ত, মুখ কথা বলছে আর আমি আগের চেয়ে শান্ত হয়ে, পক্ষপাতহীনভাবে সবকিছু দেখছি।

কিন্তু এখনো আমার মধ্যে শৃঙ্খলা নেই, কাজ করার, কাজ আদায় করে নেয়ার যার জন্য আমি এত বছর ধরে অপেক্ষা করছি। আমার কি ততটা জোর নেই? আমার ইচ্ছাশক্তি কি দুর্বল? আমার ভিতরের স্বপ্নই কি আমার কাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে? দিন চলে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে আমি শুনি জীবন বয়ে যাচ্ছে। এবং কিছুই হচ্ছে না, এখনো পর্যন্ত আমার কোন কিছুই সত্যিকারের নয়; আমি বারবার বিভক্ত হয়ে যাই, বয়ে যাই, অথচ খুব চাই একসাথে থাকতে, বেড়ে উঠতে। কারণ এটা সত্যি, তাই না লুই, এমনটাই হওয়ার কথা : আমাদের বয়ে চলা উচিৎ একই ধারায়, খালে ঢুকে কোন চারণভূমিতে গিয়ে শেষ হওয়া নয়? এটাই কি সত্য নয় যে পরষ্পরকে জড়িয়ে আমাদের উত্তাল হয়ে ওঠা উচিৎ? হয়তো যখন খুব বুড়ো হয়ে যাবো, একেবারে শেষে,  আমরা আত্নসমর্পণ করবো, নিজেদের ছড়িয়ে দেবো, কোন এক উপতক্যায় প্রি য়  লুই!

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close