Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ প্রেমে-অপ্রেমে জীবনানন্দ দাশ > লীনা দিলরুবা

প্রেমে-অপ্রেমে জীবনানন্দ দাশ > লীনা দিলরুবা

প্রকাশঃ June 21, 2017

প্রেমে-অপ্রেমে জীবনানন্দ দাশ >  লীনা দিলরুবা
0
0

প্রেমে-অপ্রেমে জীবনানন্দ দাশ >  লীনা দিলরুবা

[এক]

বেঁচে থেকে একটি করুণ, বেদনাবহ আর বিপর্যস্ত জীবন কাটিয়ে গিয়েছিলেন জীবনানন্দ দাশ। জীবনে প্রতিষ্ঠা পান নি। প্রেমের সফলতা মেলে নি। একটি সুস্থ আর সুস্থির জীবিকার সন্ধানে লিপ্ত দীর্ঘ সংগ্রামবহুল জীবনে পদে-পদে ছিল হতাশা। এক জীবনের ভঙ্গুর প্রেম, দেখা-না-দেখা অসফল মোহগ্রস্থ সম্পর্ক জড়ো করলে জীবনানন্দের প্রেমের ভুবনটা ছিল মূলত শুষ্ক। ব্যক্তিগত জীবনে যেসব প্রেম আরাধ্য ছিল সেগুলো অধরাই থেকে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠাতে বা প্রেমের ফলাফলে লাভালাভ গুনতে গিয়ে দেখেন সকলই শূন্য!  স্ত্রীর সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক ছিল তিক্ত।

অসফল হলেও তাঁর প্রেমের সম্পর্কগুলি নিয়ে লিখতে গেলে যে অবয়বের দেখা মেলে সেখানে ধূসরতা, রয়েছে একটি মস্তবড় গ্রে এরিয়া। অনেকটা আবছায়া আর অনুমান নির্ভর তথ্য হাতড়েই অগ্রসর হতে হয়। আচরণগতভাবে তিনি ছিলেন  অন্তর্মুখী। নিজেকে প্রকাশ করার যে স্বাভাবিক প্রবণতা সেটি তাঁর মধ্যে অনুপস্থিত ছিল। সামাজিক জীবনযাপন বলতে যেটি বোঝায় সেসব তাঁর জীবনে ছিল না বললেই চলে। জীবনানন্দের প্রেমজ বা হৃদয়ঘটিত বিষয়গুলিকে তাঁর জীবন-ছেনে উঠিয়ে আনার প্রয়াস এক দুঃসাধ্য গবেষণার বিষয়, এ-যেন প্রকৃতই খঁড়ের মাঝে সুঁচ খোঁজার উদ্যোগ। জীবনানন্দ’র প্রেম বা তাঁর জীবনে নারীদের আনাগোনা কেমন ছিল এই সাধ্যাতীত কিন্তু অসম্ভব নয় কাজটির এবং রহস্যের দ্বার উন্মোচন করতে চাই।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন সেই অমোঘ লাইন— ’কবিরে পাবে না তাহার জীবন চরিতে।’ রবীন্দ্রনাথের জীবন-চরিত পড়ে তাঁর জীবন তবু কিছুটা বুঝতে পারা যায় কিন্তু জীবনানন্দ যেহেতু কোনো আত্মজীবনী লিখে রেখে যান নি তাই তাঁর লেখা পড়ে অনেকটা অনুমাননির্ভর ধারণার মাধ্যমে তাঁর জীবন বুঝতে হয়। ভূমেন্দ্র গুহ’র বরাতে আমরা জেনেছি শেষ জীবনে তিনি অনেককে, বিশেষত সঞ্জয় ভট্টাচার্যকে বলেছেন—”একটু সুযোগ সুবিধে পেলেই, শরীর স্বাস্থ্য-পরিবেশ আর একটু স্বচ্ছন্দ্যকর হলেই, তিনি আত্মজীবনী লিখবেন।” এ কথা লিখে ভূমেন্দ্র গুহ ফোঁড়ন কাটার ছলে বলেন, ”যেন তাঁর কবিতায়-গল্পে-উপন্যাসে আত্মজৈবনিক লেখা লিখতে বাকি রেখেছেন কিছু!” (জীবনানন্দ’র লিটারারি নোটস/ভূমেন্দ্র গুহ/জন্মশতবর্ষে জীবনানন্দ/পৃষ্ঠা: ২৪৯-২৫০)। জীবনী না লিখলেও তিনি ডায়েরি লিখতেন। কেমন ছিল সেই ডায়েরি? এর নাম তিনি দিয়েছিলেন লিটারারি নোটস। এর গ্রন্থগত রূপ দিনলিপি নামে বেরিয়েছিল ভূমেন্দ্র গুহ’র উদ্ধার ও বিশ্লেষণে আর গৌতম মিত্রের সহযোগিতায়। জীবনানন্দর মৃত্যুর পর তাঁর ট্রাঙ্কে লুকিয়ে রাখা অজস্র পাণ্ডুলিপির সঙ্গে এসব উদ্ধার হয়েছিল। এরকম ৫৬টি খাতা পাওয়া যায়। খাতাগুলোর মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা ৪,২৭২, শব্দসংখ্যা প্রায় ৬,৬২,১৬০। ভূমেন্দ্র গুহ জানান— ” স্মরণ করা যেতে পারে যে, জীবনানন্দ দুটো সিরিজ এ লিখেছিলেন তাঁর ডায়েরি:  প্রথম বড়ো সিরিজটা দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী বছর গুলিতে—বিশ্বমন্দার আগে-পরে, বাংলা’র সশস্ত্র স্বাধীনতা-আন্দোলনের তুঙ্গ সময়ে; আর দ্বিতীয় ছোটো সিরিজটা দেশভাগের ও তাঁর উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়ার আগে-পরে।” ৫৬টি খাতা থেকে প্রকাশিত সেই চারখণ্ডের দিনলিপি তাঁর জীবন চরিত বুঝতেও পুরোপুরি সাহায্য করে না। ভূমেন্দ্র গুহ জানাচ্ছেন, ”ডায়েরিগুলোর লেখা ইংরেজিতে, শুধু মাঝে-মধ্যে অল্প-স্বল্প বাংলা’য়—হয়তো কোনও কথা বিশেষ জোর দিয়ে বলার জন্য, অথবা এমন ভাবে গ্রামীণ বাংলায় কথাটা বলেছেন যে, তার ইংরেজি অনুবাদ দুঃস্বাধ্য। ইংরেজিতে কেন? কেউ কেউ বলেছেন যে, তিনি চান নি তাঁর এই নিভৃত কথনের লেখাগুলি তাঁর অনবধানতাবশত কোনও ক্রমে কেউ দেখে ফেলে চট করে বুঝে ফেলুক। কেউ বলেছেন তিনি যে-রকম টেলিগ্রাফের মতো কোডেড ভাষায় লিখেছেন, তা ইংরেজিতেই আসে ভালো।” (জীবনানন্দ’র লিটারারি নোটস/ভূমেন্দ্র গুহ/জন্মশতবর্ষে জীবনানন্দ/পৃষ্ঠা: ২৪৯-২৫০)।

দিনলিপির প্রথম খণ্ডে ভূমেন্দ্র গুহ জানাচ্ছেন—

খ্রি. ১৯২৫ জুলাই মাসে মেময়রস সামার’ আখ্যায় ডায়েরি লিখতে শুরু করেছিলেন, এগোন নি। খ্রি. ১৯২৯ এপ্রিল থেকে নিয়মিত ডায়েরি লিখতে শুরু করেন; ধরনটা পালটে যায় : খ্রি. ১৯২৫’এর কয়েক পাতার ডায়েরিটা ছিল ঠাস-বুনোট নিবন্ধের মতন, মন খোলাসা ক’রে কথা বলা; খ্রি. ১৯২৯’এ এসে ধরনটা হয়ে যায় টেলিগ্রাফিক কোড’এর মতন, ঢের কথার আভাস একটা-দু’টো কথার গহ্বরে ঢুকিয়ে রাখা, যাতে প্রয়োজনের সময় খুঁড়ে তোলা যায়। বাইরের একটা মানুষ যখন এই একটা-দু’টো কথা পড়ে, কথাগুলি ঠিক-বেঠিক অনেক সম্ভাবনা মাথায় আসে।” (দিনলিপি প্রথম খণ্ড/ পৃষ্ঠা: ৫৪)।

জীবনানন্দের প্রেম বা প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে লিখতে বসে অনেকটা তাঁর কবিতা, গল্প, উপন্যাসের শরীরে ভ্রমণ করে, তাঁর কোডেড ভাষার ডায়েরি—দিনলিপি থেকে আর নানাজনের বরাতে শোনা কথাবার্তা মিলিয়ে যেটি দাঁড় করানো যায় সেটি স্পষ্ট কোনো চিত্র তুলে ধরবে এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। অনেকটা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা তথ্যের কণা জড়ো করে গড়িয়ে গড়িয়ে চলে কিছু একটা দাঁড় করাই এবার!

[দুই]

দিনলিপির তৃতীয় খণ্ডে ভূমেন্দ্র গুহ লিখেছেন—

”বিবাহ-পূর্ব এবং বিবাহিত—কোনও প্রেমই তাঁর সার্থক হয় নি, জীবনানন্দ যে-স্বভাবের মানুষ ছিলেন, তাতে তা হওয়া সম্ভবপরও ছিল না; ব্যর্থতার সুখভোগই, মনে হয়, জীবনানন্দ’র আরাধনার ধন ছিল।”  (পৃষ্ঠা: ১১৬৩/ দিনলিপি ৩য় খণ্ড)।”

জীবনানন্দের জীবনে প্রেমাকূল হবার মত পরিস্থিতি তৈরি করতে স্ত্রী ছাড়া তিনটি নারী চরিত্রের কথা জানা যায়, তাঁরা হলেন— মনিয়া, লীলাময়ী এবং শোভনা।

যে-সম্পর্কটি নিয়ে জীবনানন্দ বেশি ভুগেছেন সেই বি-ওয়াই বা শোভনার কথাই প্রথমে বলা যাক।

জীবনানন্দের কাকা অতুলানন্দ দাশ এবং সরযুবালা দাশ এর দ্বিতীয়া কন্যা শোভনা দাশ বিয়ের পর স্বামী সুহৃদ মজুমদারের সঙ্গে মিলিয়ে নাম ধারণ করেছিলেন শোভনা মজুমদার। অতুলানন্দের চার কন্যা—জ্যোৎস্না, শোভনা, কমলা আর নন্দিতা এবং একমাত্র ছেলে অজয়ানন্দ। শোভনার ডাকনাম ছিল বেবি। জন্মেছিলেন ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩ আগস্ট। জীবনানন্দর জন্ম ১৮৯৯ খ্রীস্টাব্দে, সে-হিসেবে তাঁদের দুজনার বয়সের পার্থক্য ছিল প্রায় চৌদ্দবছরের। শোভনার পরের বোনটি অর্থাৎ— কমলা দাশগুপ্তের ডাকনাম ছিল— বুলু, তিনি জীবনানন্দের একমাত্র ছোটবোন সুচরিতা দাশের অনেকটা বন্ধুর মত ছিলেন। সেই হিসেবে শোভনা বা বেবির সঙ্গে সুচরিতা বা খুকুর তেমন সখ্যতা ছিল না। খুকু এবং বুলু দুজন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছিলেন আর বেবি মানে শোভনা দাশ কলকাতার ডায়ানেশনে কলেজের পাঠ শেষ করেছিলেন। এর আগে ডিব্রুগড় গভর্নমেন্ট হাইস্কুল থেকে তিনি মেট্রিক পাশ করেন। বিশের দশকের মাঝামাঝিতে জীবনানন্দ চার-পাঁচ মাস শোভনাদের ডিব্রুগড়ের বাড়িতে থেকেছিলেন, তখন শোভনা ক্লাস এইট-নাইনে পড়তেন। সেই সময়েই শোভনার সঙ্গে চাচাতো ভাই মিলুর (জীবনানন্দর ডাকনাম) সুসম্পর্ক এবং হৃদয়ের সম্পর্র্ক গড়ে ওঠে। শোভনা জীবনানন্দকে মিলুদা বলে ডাকতেন।  এই চার-পাঁচমাসের নাতিদীর্ঘ সময়টায় ডিব্রুগড়ে জীবনানন্দর তেমন কিছু করার ছিল না, ঘরের ভেতর বসে অলস সময় কাটাতেন আর কবিতা লিখতেন তিনি, সেসব কবিতার পাঠক এবং শ্রোতা ছিলেন চাচাতো বোন শোভনা বা বেবি। কবিতাগুলি শোভনাকে পড়ে শোনাতেন কখনো কখনো দরজা বন্ধ করে। এইসব মুহূর্ত তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করতে সাহায্য করেছিল হয়ত যদিও শোভনার মা এই ঘনিষ্ঠতা আঁচ করে মেয়ের প্রতি সতর্ক ছিলেন বলে জানা যায়। ডিব্রুগড়ের পর আর সেভাবে শোভনার সঙ্গে জীবনানন্দর মেলামেশা হয় নি। ১৯২৭ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত জীবনানন্দ’র প্রথম কাব্যগ্রন্থটি শোভনাকেই উৎসর্গ করা হয়। সেই কবিতার বই— ’ঝরা পালক’ এর গ্রন্থোৎসর্গের পাতায় জীবনানন্দ শুধু একটি শব্দই লিখেছেন, সেটি হল— কল্যাণীয়াসু। বইটি ডাকে শোভনার কাছে পাঠিয়েছিলেন শোভনার মিলুদা। শোভনা সেই খবরটিকে অনেকদিন গোপন করে রেখেছিলেন পরিবার পরিজনের কাছ থেকে। মেট্রিক পরীক্ষার পর শোভনা কলকাতায় চলে আসেন, সেটি ১৯৩০-৩১ খ্রীষ্টাব্দে। সেখানে তিনি হোস্টেলে থাকতেন। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৫ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত জীবনানন্দ বেকার ছিলেন। শোভনার হোস্টেলে তিনি তখন মাঝে-মধ্যে আসতেন যদিও পরে শোভনা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে খুব বেশি উৎসাহিত ছিলেন না। জীবনানন্দ ঘন ঘন শোভনাকে চিঠি লিখতেন কিন্তু উত্তর মিলতো না।

দিনলিপির তৃতীয় খণ্ডে ভূমেন্দ্র গুহ লিখেছেন—

”এই প্রেমটারও-যে অসার্থকতা ছাড়া আর কোনও পরিণতি থাকতে পারত না, তা জীবনানন্দ বুঝতেন নিশ্চয়ই, তবু তিনি ঘটনাটাকে এড়িয়ে যেতে পারেন নি, বরং খুব বেশি ভাবে পাকে-পাকে জড়িয়ে পড়েছিলেন, এবং নিজেকে জড়িয়ে থাকতে দিয়েছিলেন হতাশায় ক্ষোভে ক্রোধে বিষণ্নতায় ও অবাস্তব ব্যর্থতাবোধে ভুগতে-ভুগতে, তাঁর বিয়ের (খ্রি.১৯৩০) পরেও গোটা কয়েক বছর, একতরফা ভাবে, যখন শোভনা খুবই স্বাভাবিক ভাবে নিজেকে বছর তিন-চারেকের অভিজ্ঞতার পরে সরিয়ে নিয়েছিলেন; তিনি খুব বাস্তবতা-সচেতন মহিলা ছিলেন, এবং বৈষয়িক ব্যাপারে উচ্চাকাক্সক্ষীও; জীবনানন্দ যে তা ছিলেন না, অন্তত সে-সময়ে, তা বোঝাই যায়, অতএব তাঁর ভোগান্তিটাও দুর্বিসহ ছিল। (পৃষ্ঠা: ১১৬২-১১৬৩, দিনলিপি ৩য় খণ্ড)।”

জীবনানন্দের সঙ্গে লাবণ্য দাশের বিয়ের অর্থাৎ ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের আগে লেখা ডায়েরিতে শোভনা দাশকে তিনি বি-ওয়াই আর এর পর থেকে অর্থাৎ ১৯৩১ খ্রীষ্টাব্দ থেকে শুধু ওয়াই বলে সম্বোধন করে লিখে গেছেন।

ডায়ানেশন কলেজ থেকে বি.এ পাশ করে শোভনা শিলং’এর লেডি কিং স্কুলে শিক্ষকতার চাকুরিতে জড়িয়ে পড়েন। বছর খানেক চাকরি করার পর বার্ড অ্যান্ড কোম্পানি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ইঞ্জিনিয়ার সুহৃদ মজুমদারকে বিয়ে করেন।

”জীবনানন্দ এবং ওয়াই বিশের দশকে বরিশাল’এ থেকেছেন, আবার তিরিশের দশকের প্রথম পাদে যখন কলকাতা’য় থাকছেন, তখন ওয়াই-যে জীবনানন্দ’র দিবস-রজনী নিদ্রা-জাগরণ মথিত ক’রে রেখেছিলেন, তার ভাষ্যে এই দিনলিপিতে পাওয়া যাবে…”। (পৃষ্ঠা: ১১৬৫, দিনলিপি ৩য় খণ্ড)।”

এখন দেখা যাক জীবনানন্দ শোভনাকে নিয়ে ডায়েরিতে যা লিখতেন তার কিছু নমুনা।

টেলিগ্রাফিক ভাষায় লেখা কোডেড নোটস দিয়ে তাঁর দিনলিপির তৃতীয় খণ্ডের ১২২৪ পৃষ্ঠায় লেখা আছে,

-I am dying, but she will live: to end her: she has been this & this to me: philosophy of life: finally ending her before another mood of renunciation etc. dawns.

(This is a spider web, a frog in a serpent’s mouth)

-The pity is : these reflections, associations of ideas, images etc. etc. which are mine will never be hers.

ভূমেন্দ্র গুহ এই কথাগুলো উদ্ধার করে আমাদের জানিয়েছেন, ”এ দুটো আইটেম’এ যে বার্তাটি আছে, তা সম্ভবত জীবনানন্দ’র নিজের সে-সময়ের প্রেম-অভিজ্ঞতা জড়িয়ে, তাঁর ধূসর পাণ্ডুলিপি কবিতার বইটার কবিতাগুলিতে তা ছড়িয়ে আছে, বিশেষত ’নির্জন স্বাক্ষর, মাঠের গল্প, সহজ, কয়েকটি লাইন, পরষ্পর, বোধ ইত্যাদি কবিতাতে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে প্রায় সর্বত্র।”

কোডেড নোটস দিয়ে তাঁর দিনলিপির চতুর্থ খণ্ডের ১৮৮৮ পৃষ্ঠায় লেখা আছে, — Why I love her: all her commonness & coolness

এই কথাটির বিপরীতে ভূমেন্দ্র গুহ বলেন, ’জীবনানন্দ নিজেও তো এ-রকম একটা অবস্থাগুণ্যের ফাঁদে প’ড়ে গেছেন—বিওয়াই সাধারণ একটি মেয়ে, যদিও সুন্দরী এবং শীতল; তা সত্ত্বেও ’হোয়াই আই লাভ হার—’ কে বলতে পারে। বরিশাল’এর নিচু শ্রেণির খ্রিস্টান মেয়ে মনিকাও কি ঝটিতি এক বার উঁকি দিয়ে যান নি মাঝখান টায়?

প্রথম খণ্ডের ১১৮ পৃষ্ঠায় লেখা আছে, ”বি-ওয়াইর সঙ্গে জীবনানন্দ’র হার্দিক সম্পর্কটার বয়েস বছর দু’-একের বেশি নয়, এবং এখন প্রায় অতীতের সামগ্রী।”

সেই সময়ের অনুভূতি নিয়ে ধূসর পাণ্ডুলিপি (১৯৩৬ খ্রীষ্টাব্দ) এবং মহাপৃথিবীর (১৯৪৪ খ্রীষ্টাব্দ) কয়েকটি কবিতার কথা বলা যায় যেগুলো শোভনাকে নিয়ে লেখা হয়েছে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না, আবার বললেও খুব বেশি অবাস্তব মনে হয় না বা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

নির্জন স্বাক্ষর-কবিতার প্রথম লাইন—’তুমি ত জান না কিছু,—জানিলে,—আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ করে !’ আরেকটি কবিতার নাম — সহজ। এর প্রথম লাইন— ’আমার এ-গান কোনও দিন শুনিবে না তুমি এসে,—’। ধারণা করা যায় সহজ কবিতাটি নির্জন স্বাক্ষরের পর পর ধারাবাহিক ভাবনার নির্যাস ; অথবা উলটো-টি, সম্ভবত একই সময়ে তিনি যে ভাবনার অতলভুবনে নিমজ্জিত ছিলেন সেই ভাবনার জাল দুটো কবিতাকে এক সুরে বেঁধেছে। এর প্রথমদিকের  স্তবকজুড়ে একই কথার প্রতিধ্বনি, কবি বলছেন— আমি যে গান তোমার প্রতি নিবেদন করেছি সে গান তুমি কোনো দিন শুনবে না, আহ্বান ভেসে যাবে পথের বাতাসে। এমন হাহাকারময় ধ্বনি তাঁর অনেক কবিতায় আছে কিন্তু এই কবিতায় শেষে কয়েকটি অন্যরকম স্তবক আছে, যাকে আমরা গ্রাহ্য করতে পারি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে। লাইনগুলো এরকম—

যেইখানে বন

আদিম রাত্রির ঘ্রাণ

বুকে লয়ে অন্ধকার গাহিতেছে গান !—

তুমি সেইখানে !

নিঃসঙ্গ বুকের গানে

নিশীথের বাতাসের মতো

এক দিন এসেছিলে—

দিয়েছিলে এক রাত্রি দিতে পারে যত !

আমাদের অনুধাবনে এ সময় তিনি প্রেমের সমাধির উপর দাঁড়িয়ে বেদনাবহ দিন কাটাচ্ছিলেন। ”দিয়েছিলে এক রাত্রি দিতে পারে যত !” কাকে উদ্দেশ্য করে তিনি কথাগুলো লিখেছেন অনুমান করতে খুব বেশি কষ্ট হয় না।

ধূসর পাণ্ডুলিপির ১৩৩৩ কবিতাটিতে প্রেম-বিরহ কাতরতা আরও স্পষ্ট এবং পরিষ্কার। এখানে ’সহজ’ কবিতার চেয়ে অনেকখানি এগিয়ে মানসপ্রতিমার সঙ্গে গভীরতর সম্পর্কের দিকনির্দেশ করে।  এর প্রথম কয়েকটি স্তবক—

তোমার শরীর—

তাই নিয়ে এসেছিলে একবার—তারপর—মানুষের ভিড়

রাত্রি আর দিন

তোমারে নিয়েছে ডেকে কোন দিকে জানিনি তা—হয়েছে মলিন

চক্ষু এই; ছিঁড়ে ড়েছি—ফেঁড়ে গেছি—পৃথিবীর পথে হেঁটে হেঁটে

কত দিন রাত্রি গেছে কেটে !

কত দেহ এল—গেল—হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে

দিয়েছি ফিরায়ে সব—সমুদ্রের জলে দেহ ধুয়ে

নক্ষত্রের তলে

বসে আছি—সমুদ্রের জলে

দেহ ধুয়ে নিয়া

তুমি কি আসিবে প্রিয়া !

তোমার শরীর—

তাই নিয়ে এসেছিলে একবার—তারপর—মানুষের ভিড়

রাত্রি আর দিন

তোমারে নিয়েছে ডেকে কোনদিকে—ফলে গেছে কতবার,

ঝরে গেছে তৃণ !

কয়েকস্তবক পর লিখেছেন,

চলিতে চাহিয়াছিলে তুমি একদিন

আমার এ-পথে কারণ, তখন তুমি ছিলে বন্ধুহীন

আমি জানি, আমার নিকটে তুমি এসেছিলে তাই।

তারপর, কখন খুঁজিয়া পেলে কারে তুমি !— তাই আস নাই।

প্রেমিকার প্রস্থানের হাহাকার ধরা পড়েছে এ কবিতায়, কোনো আড়াল না রেখেই তিনি এখানে অনেকখানি প্রকাশিত হয়েছেন।

আরেকটি কবিতা—

এক বার নক্ষত্রের পানে চেয়ে—এক বার বেদনার পানে

অনেক কবিতা লিখে চ’লে গেল যুবকের দল;

পৃথিবীর পথে পথে সুন্দরীরা মূর্খ সসম্মানে

শুনিল আধেক কথা—এই সব বধির নিশ্চল

সোনার পিত্তল মূর্তি: তবু, আহা, ইহাদের কানে

অনেক ঐশ্বর্য ঢেলে চ’লে গেল যুবকের দল:

এক বার নক্ষত্রের পানে চেয়ে— এক বার বেদনার পানে।

(ইহাদের কানে/মহাপৃথিবী)

[তিন]

বেবি বা শোভনা ছিলেন কাকাতো বোন অন্যদিকে লীলাময়ী ছিলেন জীবনানন্দের মামাতো বোন। জীবনানন্দের ঠাকুরদা কুসুমকুমারীর পিতা চন্দ্রনাথ দাস দুটি বিবাহ করেছিলেন। প্রথম স্ত্রী’র সংসারে তাঁর একপুত্র এবং তিনকন্যার জন্ম হয়, দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে কোনো সন্তান জন্মে নি। প্রথম সংসারের তিনকন্যার নাম— কুসুমকুমারী দাশ, সুকুমারী আর হেমন্তকুমারী। একমাত্র পুত্র প্রিয়নাথ। প্রিয়নাথ আর কিরণময়ীর সংসারে তিনকন্যা আর চারটিপুত্র ছিল। চারপুত্রের নাম— শৈলেন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ এবং সমরেন্দ্রনাথ। তিনকন্যার নাম—লীলাময়ী, জ্যোতির্ময়ী আর ইলা। জীবনানন্দের মামা প্রিয়নাথের বড়কন্যা এই লীলাময়ী বা খুন্তি ছিল জীবনানন্দের আরেক মানসপ্রতিমা।

দিনলিপির তৃতীয় খণ্ডে ভূমেন্দ্র গুহ লিখেছেন—

তাঁর ডায়েরি’তে লীলাময়ী বার-বার এসেছেন; মনে হয়, মনোভাবটা পরষ্পরের কাছে জ্ঞাত হলেও স্ফূট ছিল না। খুন্তি শেষ-পর্যন্ত শিক্ষকতা ক’রে জীবন নির্বাহ করেছিলেন। এই সন্দেহটার পক্ষে আপাতত দু’টো খবর আমাদের জানা আছে: যখন বি.এ ক্লাসে পড়ছেন জীবনানন্দ প্রেসিডেন্সি কলেজ’এ, দেখছি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার প্রকাশিতব্য এবং পরে প্রকাশিত ফল নিয়ে খুবই চিন্তিত তিনি, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরীক্ষার ফলাফলের গেজেট বেরিয়ে গেলে তা জোগাড় করতে খুবই হাঁকপাঁক করছেন, তাঁর মা’কে উদ্বিগ্ন সব চিঠিপত্তর লিখছেন; আবার, বিগত দশকের চারের দশকের একেবারে শেষের দিকের একটা নোটস’এর খাতায় দেখছি, খুন্তি এবং ওয়াই  (শোভনা) জীবনানন্দের ল্যান্সডাউন রোড’এর একতলার বাসাবাড়িতে এসে এক দিন বিকেলবেলা বেড়িয়ে যাচ্ছেন, পাশের ঘরে তাঁর স্ত্রী লাবণ্য’র সঙ্গে কথাবার্তা ব’লে যাচ্ছেন ঢের, কিন্তু এক বার উঁকি মেরেও দেখা করছেন না জীবনানন্দ’র সঙ্গে, আর জীবনানন্দ একা-ঘরে ব’সে একা-একা দুঃখ পাচ্ছেন, ডায়েরি’তে তাঁর ক্ষোভ-বিক্ষোভের কথাটা লিখেও রাখছেন। সে-যুগে লেখাপড়া-করা মেয়েদের স্বেচ্ছায় অনূঢা থাকাটা সামাজিক ভাবে খুব একটা সাধারণ ঘটনা ছিল না, কিন্তু খুন্তি তা ছিলেন; এখন আর জীবনানন্দ সে-জীবনানন্দ নেই, কবিতা লিখে একটু নাম-ধাম ক’রে ফেলে দূরবর্তী হয়ে পড়েছেন যেন, সে-অভিযোগটা খুন্তি’র ছিল। (দিনলিপি ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১১৬১-১১৬২)

প্রথম কবিতাগ্রন্থ ’ঝরা পালক’কে জীবনানন্দ বয়ে বেড়াতে চান নি। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থটি থেকে তিনি মাত্র তিনটি কবিতাকে পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যুর বছর— ১৯৫৪ খিষ্টাব্দে প্রকাশিত ’শ্রেষ্ঠ কবিতা’ গ্রন্থটিতে সন্নিবেশিত করেন। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ —ধূসর পাণ্ডুলিপির মুখবন্ধে তিনি লেখেন— ”আমার প্রথম কবিতা বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৪ সালে। কিন্তু সে বইখানা অনেকদিন হয় আমার চোখের আড়ালেও হারিয়ে গেছে : আমার মনে হয় সে তার প্রাপ্য মূল্য পেয়েছে।”

লীলার প্রতি তাঁর প্রেমজ কামানার অভিনিবেশ এই গ্রন্থটির কবিতার কোনো কোনো পঙক্তিতে খুঁজে নেবার প্রচেষ্টা নেয়া যায়।

কবিতার নাম —’যে কামনা নিয়ে’। প্রথম কয়েকটি স্তবক লক্ষ্য করি—

যে কামনা নিয়ে মধুমাছি ফেরে বুকে মোর সেই তৃষা !

খুঁজে মরি রূপ, ছায়াধূপ জুড়ি,

রঙের মাঝারে হেরি রঙডুরি !

পরাগের ঠোঁটে পরিমলগুঁড়ি,—

হারায়ে ফেলি গো দিশা !

কবিতার নাম—‘ছায়া প্রিয়া’—

দুপুর-রাতে ও কার আওয়াজ !

গান কে গাহে, গান না !

কপোত—বধূ ঘুমিয়ে আছে

নিঝুম ঝিঁঝিঁর বুকের কাছে;

অস্তচাঁদের আলোর তলে

এ কার তবে কান্না !

গান কে গাহে, গান না !

এর পরের কয়েকটি স্তবক—

এল আমার ছায়া-প্রিয়া,

কিশোরবেলার সই গো !

পুরের বধূ ঘুমিয়ে আছে

দুধের শিশুর বুকের কাছে;

মনের মধু—মনোরমা—

কই গো সে মোর—কই গো !

কিশোরবেলার সই গো!

এই কিশোরবেলার সই কী মনিয়া?  বরিশালের একটি সাধারণ খৃষ্টান পরিবারের মেয়ে।

দিনলিপির তৃতীয় খণ্ডে জীবনানন্দ’র কোডেড ডায়েরির লেখা – How loves died (poem):- আর না no more (poem) প্রসঙ্গে ভূমেন্দ্র গুহ জানিয়েছেন—

”কৈশোর-প্রেমটা মনিয়ার সাহচর্যে; কিন্তু, যে-কোনও কৈশোর-প্রেমের সচরাচর যে-পরিণতি ঘ’টে থাকে, তা এ-ক্ষেত্রেও ঘটেছিল; সম্ভাবনাহীন এই অস্ফূট প্রেম মনিয়া’র জলে ডুবে মারা যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে অথবা তা আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। গিয়েছিল, কিন্তু স্মৃতিতে থেকে গিয়েছিল: তিক্ততাবিহীন, সরল, অনাবিল, বিমর্ষতায়-ভরা; মনিয়া তাঁর কবিতায় একাধিক বার শ্লথ চরণে এসেছেন-গিয়েছেন, তাঁর পরিণত বয়েসের কবিতাতেও; জল-শায়িত নারীরা কী আর তাঁর কবিতায় সংখ্যায় কম !” (দিনলিপি ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১১৬১)।

[চার]

এসব বস্তুগত প্রেমের অনুসন্ধান তাঁর ডায়েরি কিংবা কবিতার সঙ্গে মিলিয়ে বা স্মৃতিকথার আলোকে দেখার যে-টুকু অবকাশ ছিল সেটি হয়ত এটুকুই বা আরেকটু সম্প্রসারিত হবে। তবে জীবনানন্দ’র হৃদয়দৌর্বল্য সীমাবব্ধ কিছু অনুসঙ্গে জড়িয়ে ছিল সেটি হয়ত বলা যাবে না। তাঁর কবিতার রাঙা রাজকন্যারা—শঙ্খমালা, চন্দ্রমালা, মানিকমালা, কাঞ্চনমালা, কঙ্কাবতী, অনুরাধা, রোহিনী কিংবা বনলতা সেন, অরুণিমা সান্যাল, শেফালিকা বোস, মৃণালিনী ঘোষাল, আকাশলীনা, সরোজিনী, সুরঞ্জনা, সুচেতনা, সুদর্শনা, শ্যামলী, সবিতা…কারা? এদের পরিচয় খুঁজতে গেলে অন্ধকারে দিক হাতড়ে খুঁজে পরে পথ ভুলে অন্যদিকে চলে যাবার সম্ভাবনা বা বিপদ রয়েছে, কারণ আগের অভিজ্ঞতায় বনলতা সেন-এর পরিচয় বিষয়ে আমরা অনেক লেখকের মধ্যে যে বিভ্রান্তি দেখেছি সেটি এই বিপদকে আরও উসকে দেবে। সেদিকে না অগ্রসর না হয়ে আমরা বরং দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় এর একটি বক্তব্যের দিকে দৃষ্টি দিতে পারি। দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়  রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রত্তোর সময়ে কবিদের—বিশেষ করে বুদ্ধদেব বসু,  জীবনানন্দ দাশ এবং সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতায় প্রেমের বস্তুগত আর বায়বীয় বোধ বা আত্মীক সম্পর্ক কীভাবে প্রভাবক ছিল তার দিক-নির্দেশক বক্তব্য পেশ করেছেন।

 

তিনি লিখেছেন—

কাজেই শেষ পর্যন্ত তাঁর আশ্রয় হচ্ছে—

…সঙ্ঘ নয়, শক্তি নয় কর্মীদের সুধীদের বিবর্ণতা নয়,

আরো আলো : মানুষের তরে এক মানুষীর গভীর হৃদয়। (অন্ধকার/বনলতা সেন)

অর্থাৎ প্রেম। ’ঝরা পালক’ থেকে শুরু করে একেবারে কবিজীবনের শেষ অবধি এই প্রেমই ছিল কবির ধ্রুবনক্ষত্র। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিতান্ত ’মুড-নির্ভর’ হওয়ায় এই প্রেমের অভিব্যক্তি ফিকে হয়ে গেছে; শুধু ’বনলতা সেন’ বা ’নগ্ন নির্জন হাত’ ইত্যাদি কবিতায় কল্পনার সৌকর্যে বক্তব্যহীনতা চাপা পড়ে গেছে মাত্র, আর প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এ-প্রেম হয়েছে স্মৃতিনির্ভর, ভবিষ্যতের প্রেরণায় উদ্দীপ্ত হতে পারে নি।

রবীন্দ্রনাথের কবিতায় এবং গানে আমরা প্রেমের বিচিত্র ব্যঞ্জনা প্রত্যক্ষ করেছি। অতীতের বিষাদের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে দেখেছি বর্তমানের বীরত্বময় সংকল্প, ভবিষ্যতের আশ্বাস; দেখেছি নারীর আত্মমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে পুরুষের সমকক্ষ হিসাবে প্রেমলাভের বাসনা; এবং প্রেম যে সমাজবাদী নারীপুরুষের সদা-পরিবর্তমান সম্পর্ক, এ উপলব্ধিও লক্ষ্য করেছি। রবীন্দ্রত্তোর তৎকালীন কবিদের মধ্যে বুদ্ধদেব বসু প্রেমের শারীরিক দিকটির কথা যথেষ্ট আবেগ-উত্তাপের সঙ্গে উপস্থিত করেছিলেন; আর এরই কিছুকাল পরে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত—যিনি ’মানসীর দিব্য-আবির্ভাব সে শুধু সম্ভব স্বপ্নে, জাগরণে আমরা দিব্য একাকী’ বলে জীবনানন্দের মতো প্রত্যক্ষের চেয়ে স্বপ্নের দিকে পক্ষপাত করেছিলেন—তিনিও, কখনও বিষাদ, কখনও হাহাকার দিয়ে প্রেমের জৈব-প্রেরণার কথাই কাব্যরূপায়িত করেছিলেন। জীবনানন্দের কবিতায় প্রেমের এই উচ্ছ্বলতা নেই, স্মৃতি নিয়ে ’হাহাকার’ও অনুপস্থিত। প্রেমকে তিনি গ্রহণ করেছেন এক প্রয়োজনীয় উপলব্ধির মতো, যা না হলে তাঁর মতে এই উৎকেন্দ্র জগতে বেঁচে থাকই কঠিন। বলা বাহুল্য, একজন কবির পক্ষে এ বোধ অত্যন্ত গৌরবের। কিন্তু নতুন নয়। ’শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে’র চন্ডীদাস থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত, যাঁরাই প্রেমের বিষয়ে কিছু বলেছেন তাঁরা প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে প্রেমের বিপুল প্রভাবের কথা মেনে নিয়েই লিখেছেন। এ যুগের কবির বিশেষ দায়িত্ব হচ্ছে, এ কালের সমাজ-বাস্তবের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে সেই প্রেমের উপলব্ধিকে কাব্যরূপায়িত করা। রবীন্দ্রনাথ তা পেরেছিলেন— তাঁর শেষের কবিতাগুলি (’মহুয়া’, ’পুনশ্চ’, ’চিত্রাঙ্গদা’র গান: ’আমি চিত্রাঙ্গদা, আমি রাজেন্দ্রনন্দিনী’) তার প্রমাণ। কিন্তু জীবনানন্দ তা পারেন নি। তাই তাঁর কবিতায় বনলতা সেন, সুরঞ্জনা, সবিতা, সুচেতনা বা মৃণালিনী ঘোষাল কি অরুণিমা সান্যাল, কাউকেই আমাদের সহযাত্রিণী বলে মনে হয় না—প্রেমের সামাজিক অস্তিত্বের চেয়ে বরং এক আত্মিক জগতের উপস্থিতি ঘোষণা করাই যেন তাদের লক্ষ্য বলে মনে হয়।” (জীবনানন্দ দাশ: উত্তরপর্ব: পৃষ্ঠা: ২৬১-২৬২ /দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়)।

এ-আলোকে জীবনানন্দ’র বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থের —‘সুচেতনা’ কবিতাটি নিয়ে এক ধরণের বিশ্লেষণ মূলক অর্থোদ্ধারের চেষ্টা করতে পারি। যদি সম্পূর্ণ কবিতাকে পঙক্তিতে-পঙক্তিতে বিভক্ত করে আলোচনা করা যায় তবে যেটি দাঁড়াতে পারে—

সুচেতনা, তুমি এক দূরতম দ্বীপ

বিকেলের নক্ষত্রের কাছে;

সেইখানে দারুচিনি-বনানীর ফাঁকে

নির্জনতা আছে।

এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা

সত্য; তবু শেষ সত্য নয়।

কলকাতা এক দিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে;

তবুও তোমার কাছে আমার হৃদয়।

সুচেতনা- এক নারীর নাম। কবি বলছেন, সুচেতনা, দূরতম দ্বীপের মতো, যেন দূরের এক নারী।  সে থাকে বিকেলের নক্ষত্রের কাছে, যেখানে বৃক্ষ রয়েছে, রয়েছে দারুচিনি গাছ, রয়েছে নির্জনতা। সুচেতনার এমন এক অবয়ব কল্পনা করিয়ে তিনি বলেন, পৃথিবীতে সত্য বলতে হয়তো কেবল মনে হবে রক্ত-যুদ্ধ এসব, কিন্তু এটাই শেষ নয়। আরও সত্য আছে। যেমন, কলকাতা, ম্যাড়ম্যাড়ে কলকাতাও একদিন সুন্দর হয়ে উঠবে। আরো সুন্দর আছে। যেমন সুচেতনা। ’তবুও তোমার কাছে আমার হৃদয়।’ সুচেতনা, সেই সুদূর দ্বীপের মতো দূরত্বে যে বসবাস করে, তার কাছেই নিজের হৃদয়টাকে দিয়ে রেখেছেন।  কোথা থেকে যেন ঝুপ করে পড়ার মতো এই লাইনটি। জীবনানন্দের কবিতায় এরকম আকস্মিক আক্রমণ অনুসরণীয়। কোথাকার বক্তব্য যেন কোথায় বসিয়ে দেন ! মনে হয় যেন, এসবের পরম্পরা কী? মনে হবে কী হল! এরকম কথা কেন এখানে? রহস্যময় কবি, তাঁকে বুঝতে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। যাহোক। পরের স্তবকে যাই।

আজকে অনেক রূঢ় রৌদ্রে ঘুরে প্রাণ

পৃথিবীর মানুষকে মানুষের মতো

ভালোবাসা দিতে গিয়ে তবু,

দেখেছি আমারই হাতে হয়তো নিহত

ভাই বোন বন্ধু পরিজন প’ড়ে আছে;

পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন;

মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।

জীবনানন্দ অনেক হাঁটতেন। তাঁর অনুজ অশোকানন্দ দাশ এক স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, দাদার ছিল হাঁটার নেশা। প্রায় ছোটবেলা থেকেই বরিশালের উপকণ্ঠে শ্মশানভূমির পাশ দিয়ে আমরা দু-জনে হেঁটেছি। অবাক হয়ে কখনো বা লাশকাটা ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখেছি। কখনও আরও দূরের পাল্লা, শহর ছাড়িয়ে গ্রামের পথে।” ’আট বছর আগের এক দিন’ কবিতায় তো আমরা সেই লাশকাটা ঘরের বর্ণনা দেখেছি। সেটা অন্যত্র। তাঁর হাঁটার কথা এজন্য বললাম, উপরের স্তবকগুলোর সঙ্গে সম্পর্কস্থাপন করার জন্য। তিনি এবার বলছেন, আজকে রূঢ় রৌদ্রে ঘুরেছেন তিনি, মানে রোদের মধ্যে হেঁটেছেন। তারপর বলছেন, তিনি পৃথিবীর মানুষকে মানুষ বিবেচনা করে ভালোবাসা দিতে গিয়ে দেখেন, ভালোবাসা বিনিময় নয়, এখানে একে অন্যের হাতে মারা পড়াই নিয়তি কেবল। মানুষের এহেন আচরণে পৃথিবী ভালো নেই। তার গভীর অসুখ। কিন্তু তবু মানুষ ঋণী পৃথিবীরই কাছে।

কেবলই জাহাজ এসে আমাদের বন্দরের রোদে

দেখেছি ফসল নিয়ে উপনীত হয়;

সেই শস্য অগণন মানুষের শব;

শব থেকে উৎসারিত স্বর্ণের বিস্ময়

আমাদের পিতা বুদ্ধ কনফুশিয়সের মতো আমাদেরও প্রাণ

মূক ক’রে রাখে; তবু চারি দিকে রক্তক্লান্ত কাজের আহ্বান।

’ধূসর জীবনানন্দ’ নামে কবি বিনয় মজুমদারের একটি চমৎকার বই রয়েছে। সেখানে তিনি জানান, একবার তিনি জাহাজের এক নাবিককে বলেছিলেন, ”তুমি কবি জীবনানন্দ দাশের খুব ভক্ত, এবং জীবনানন্দের কবিতাসংগ্রহ তোমার কাছে আছে, তুমি টাকা দিয়ে কিনেছ? এ কথা সত্য?

নাবিক জবাব দিল, ’কথা সত্য। কিন্তু আপনি জানলেন কী করে, বিনয়দা? বিনয় মজুমদার হেসে বললেন, নাবিকদের নিয়ে প্রচুর কবিতা লিখেছেন তিনি, মানে জীবনানন্দ। এই হেতু আমি টের পেলাম।” নাবিক শুনে গম্ভীর হয়ে উত্তর দেন, ”তা সত্য, আমাদের নিয়ে আর বিশেষ কেউ লিখেন নি।”

বন্দর-জাহাজ-নাবিক নিয়ে জীবনানন্দ অনেক লিখেছেন। এখানেও বন্দরের কথা, জাহাজের কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, জাহাজ ফসল নিয়ে পৌঁছেছে। তারপর কেমন বিভ্রান্ত করেন তিনি, ফসল নাকী মানুষের মৃত দেহ। সেই মৃতদেহ আবার স্বর্ণের বিস্ময়। কেন বললেন এ কথাটি! একটু তলিয়ে দেখি।

ব্যক্তিগত জীবনে সর্বক্ষণ দারিদ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন তিনি। তাই ফসল বা শস্য তার কাছে কাঙিক্ষত বা বহুমূল্য হবার কথা। জাহাজে করে যে ফসল পৌঁছুবার কথা তিনি এখানে প্রসঙ্গে টেনেছেন, সে তো ধনী শ্রেণীর কুক্ষিগত থাকবে-বলাই বাহুল্য, তাই কী তিনি বলেছেন, ফসল আসলে মানুষের মৃতদেহ, এগুলো স্বর্ণ, কিন্তু আসলে বিপন্ন বিস্ময়!

তারপর জীবনানন্দ চিনের কনফুশিয়াসের কথা শোনান আমাদের। সুচেতনার কাছে হৃদয় গচ্ছিত রাখার পংক্তিটির মত হঠাৎ করে মহান কনফুশিয়াসকে পিতা জ্ঞান করার বিষয় এখানে দেখতে পাই। কনফুশিয়াসের কথা আমরা জানি। তাঁর জীবনীর দিকে ছোট্ট করে একটু দৃষ্টিপাত করে আসি। কনফুশিয়াস মূলত নীতিবাদী দার্শনিক ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল শিক্ষার মূল ভিত্তি হচ্ছে নীতিজ্ঞান। জীবনানন্দ যে মতবাদের এবং যে দর্শনের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেছিলেন, সেটি তো এরকমই। অহিংসা, নির্লোভ, নিরহঙ্কার। কনফুশিয়াস বলেছিলেন, (১) প্রতিশোধ নিতে যাওয়ার আগে দুটি কবর খুঁড়ো, (২) সবকিছুরই রয়েছে সৌন্দর্য- খুব কম লোকই তা দেখতে পায়।  (৩) অজ্ঞতা হল মনের রাত্রি। যে রাত্রি চন্দ্রশূন্য, নক্ষত্রশূন্য। (৪) ভবিষ্যৎকে মুঠোয় নেওয়ার জন্য অতীতকে বিশ্লেষণ কর। পূর্বাপর বিবেচনা করে দেখলে খুব অচেনা ঠেকবে না, কেন জীবনানন্দ কনফুশিয়াসকে পিতা জ্ঞান করেছেন। এখানে তিনি বলেছেন, বৃদ্ধ পিতার মতো তাঁর-ও প্রাণ, সবার প্রাণ, নীরব হয়ে থাকে। কিন্তু নীরব হয়ে বসে থাকার-তো জো নেই, চারদিকে রক্তকান্ত কাজের আহ্বান।

সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে–এ-পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে;

সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ;

এ-বাতাস কী পরম সূর্যকরোজ্জ্বল;–

প্রায় তত দূর ভালো মানব-সমাজ

আমাদের মতো ক্লান্ত ক্লান্তিহীন নাবিকের হাতে

গ’ড়ে দেব, আজ নয় ঢের দূর অন্তিম প্রভাতে।

এবার তিনি আবার যার কাছে তাঁর হৃদয় জমা করেছেন তাঁর কাছেই ফেরত যান। এবং বলেন। এইযে উপরে এতসব ক্লান্তি, ক্ষয় নিয়ে কথা বলেছেন, পৃথিবীর ঘোরতর অসুখ বলেছেন তার পরও এই পথেই হাঁটতে হবে। এবং যত যাই হোক, এখানেই আলো জ্বলবে, আর, এ পথেই পৃথিবীর মুক্তি নিহিত আছে। তারপর তিনি ইতিবাচক কিছু দৃশ্যের জন্ম দেন।

বলেন, এসব এমনি এমনি তো হয়নি, কয়েক শতবছরের মনীষীরা এসব কাজ এগিয়ে দিয়েছে। বলেন, দেখো, এজন্য বাতাস কি সুন্দর সূর্যরঙিন। তাইতো মানব সমাজ ঠিক আছে, তাই তারা ভালো-ও। কি চমৎকার রূপকাশ্রয়ী লাইন। মনীষীরা কাজ করেছে বলে সূর্য আলোকজ্জ্বল এবং মানুষও তাই ভালো। এবার তিনি নিজেকে নাবিক ইঙ্গিত করছেন, তিনি বলছেন, সেইযে মনীষীদের কৃত কাজ তাঁর মতো ক্লান্ত এবং ক্লান্তিহীন নাবিকের হাতে পড়ে কেমন হতে পারে সেটা নিয়ে তিনি ভাবছেন এবং ভেবে মনে হচ্ছে, তিনিও ভালো কিছুই গড়ে দেবেন। তবে সেটা চট করে নয়। অনেক পরে হবে সেসব। অনেক দূরের কোনো সময়ে সেটা ঘটবে।

মাটি-পৃথিবীর টানে মানব-জন্মের ঘরে কখন এসেছি,

না এলেই ভালো হ’ত অনুভব ক’রে;

এসে যে-গভীরতর লাভ হল সে-সব বুঝেছি

শিশির শরীর ছুঁয়ে সমুজ্জ্বল ভোরে;

দেখেছি যা হল হবে মানুষের যা হবার নয়

শ্বাশত রাত্রির বুকে সকলই অনন্ত সূর্যোদয়।

কবিতাটির অন্তিম মুহূর্ত উপস্থিত হয়েছে। এইযে, মিথ্যে, জরা, ক্লান্তি, অপ্রেম, ক্ষোভ, অসুস্থতা। এরপর কী? এক্ষণে জীবনানন্দ জন্মক্ষণে ফিরে যান। তিনি তাঁর মানব জন্মের স্মৃতির কাছে ফিরে যেতে আগ্রহী হন। বলেন, মাটি-পৃথিবীর টানে মানব-জন্মের ঘরে তিনি এসেছিলেন, এসেছিলেন, কিন্তু না এলেইতো ভালো হত, অনিচ্ছা নিয়েই আসলে তিনি জন্মেছিলেন। তবে ইচ্ছে না থাকলেও জন্মলাভ করে যে গভীরতর লাভ হল সেটি হল, যা হয়েছেন, আসলে তা হবার ছিল না।

শেষ লাইনটি হতাশার নয়। প্রচন্ড ইতিবাচক। অনিচ্ছার জন্মলাভের পর তাঁর উপলব্ধি, রাত যত গভীর কালোই হোক। রাতের পর দিনের আলো ফুটবেই। তাই রাতের আঁধার নয়, ভোরের সূর্যই শ্বাশত। এইটাই সত্য। রাত্রির আঁধার কেটে যাবে, দেখা দেবে অনন্ত সূর্যালোকিত ভোর।

কবিতায় জীবনানন্দ ক্রমাগত জটিল হয়েছেন। মহাপৃথিবী, বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থে ক্রমশ।  প্রেম-ঘোর নারীতে প্রেমে প্রবাহিত হয়ে অন্যত্র ঘুরে এসে ভিন্ন কোনো জগতে যেন থিতু হতে চায়। একদম আক্ষরিক অর্থে তাই কবিতাগুলি বিশ্লেষণ করলেও কোনোভাবেই উপসংহার টানা যায় না।

[পাঁচ]

প্রেমের দেহজ সত্যকে জীবনানন্দ অস্বীকার করেন নি। তাঁর গল্প-উপন্যাস আর কবিতায় প্রেমের দেহজ রূপ অনেকভাবে চিত্রময় হয়েছে।

প্রদ্যুম্ন মিত্র কিছু জিনিসকে অল্পকথায় তুলে ধরেছেন।

”লক্ষণীয়, জীবনানন্দের আধুনিক মন সনাতন দেশজরীতিতে প্রেমকে কামগন্ধহীন কোনও ’নিকষিত হেম’ প্রমাণে তিলমাত্র আগ্রহ দেখায়নি। দেহ এবং সম্ভোগের উল্লাসনুভূতি দুই-ই তাঁর প্রথম পর্যায়ের কাব্যে প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত। ’পিপাসার গান’— এরমত কবিতায় জীবনানন্দ কোনরকম সংশয়ের অবকাশ না রেখেই বলেন ’দেহের পীড়নে/সাধ মোর—চোখে ঠোঁটে চুলে/শুধু পীড়া—শুধু পীড়া।’ আবার, ’নারীর অধরে/চুলে চোখে—জুঁয়ের নিঃশ্বাসে/ঝুমকোলতার মত তার দেহ ফাঁসে’ একদিন কবি ’রক্তমাংসের স্পর্শসুখভরা’ পৃথিবীর ঘ্রাণের পসরা’ জেনেছেন। কিন্তু তখনকার মত রোমাণ্টিক ভাবনাদীপ্ত এই কবির চেতনা কোনও জৈব বাসনা কি দেহোল্লাসকেই প্রেমে বলে চিহ্নিত করেনি ; আরও পরিণতি ভাবনায় উচ্চারিত হয়েছেঃ ’দেহ ঝরে—তার আগে আমাদের ঝরে যায় মন’। এই ’মন’ই তাঁকে শিখিয়েছে জৈবতা-অতিরিক্ত সংবেদঃ ’এ জীবন ইহা যাহা, ইহা যাহা নয়’ ; এবং সেই বোধের নিরন্তর অনুভাবনাতেই তাঁর কাব্য আধুনিক।”

আবার তিনি কেবল দেহ সর্বস্ব হয়ে পড়েছিলেন কী? প্রদ্যুম্ন মিত্র লেখেন—

দেহসর্বস্ব দেহবাদিতা জীবনানন্দকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেনি বলেই ’ধূসর পাণ্ডুলিপি’ যুগে তাঁর কাব্যে শোনা যায় দেহকে স্বীকার করে নিয়ে উচ্চারিত বৈদেহী প্রার্থনাঃ ’সমুদ্রের জলে দেহ ধুয়ে নিয়া/ তুমি কি আসিবে প্রিয়া?” (জীবনানন্দের চেতনাজগৎ ঃ প্রেম/ প্রদ্যুম্ন মিত্র/ জীবনানন্দ : জীবন আর সৃষ্টি: সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত/ পৃষ্ঠা: ৫১৭)।

জীবনানন্দের জীবৎকালে তাঁর গল্প-উপন্যাসগুলো আলোর মুখ দেখে নি। বরং সেগুলোকে তিনি বাক্সবন্দি অবস্থায় গোপন করে রেখেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধার হয়ে একে একে সেগুলো প্রকাশ পেতে থাকে। ’আকাক্সক্ষা কামনার বিলাস’ গল্পে প্রেম প্রত্যাখ্যাত বা অসফল প্রেমের পরিণতিতে ব্যথিত যুবক প্রমথ আর তাঁর আকাক্সক্ষার নারী কল্যাণীর মুখে সংলাপ বসিয়ে জীবনানন্দ শরীরী সম্পর্কের অন্তস্থ ভাবনার বিষয়গুলি সামনে নিয়ে আসেন। গল্পের চরিত্র কল্যাণী যার সঙ্গে প্রেমিক প্রমথ’র এরকম সম্পর্ক ছিল— ”এই মেয়েটির মুখের প্রতিটি ভাব, চোখের দৃষ্টির মানে সে জানে, সাত-আট বছর ধরে একে কেঁটে-ছিঁড়ে, এর সম্বন্ধে আজ সম্পূর্ণ বিশেষজ্ঞতায় পৌঁছে গেছে সে।”

এরকম মনোভাব প্রকাশের পর প্রমথ কল্যাণীর সামনে বসে ভাবে—

”স্বামীর সম্ভাবনা নিয়ে যে-কেউ আসবে নির্বিবাদে তো কল্যাণী তাকে দিয়ে দেবে, হয়তো সে এ শরীরের প্রতি এক মুহূর্তেরও লোভ না করতেই; কিন্তু জীবনের ছ-সাতটা মূল্যবান বছরের দিন গুনে-গুনে যত আকাক্সক্ষা-কামনার বিলাস, কুহকের সূক্ষ¥তা (কল্যাণীর শরীরের দিকটাই যদি ধরা যায় শুধু), ওর জন্য জমিয়েছে প্রমথ, সমস্তই নিজের রক্তটাকে বৃদ্ধ করে ফেলেছে তার, যৌবনটাকে অকর্মণ্য, জীবনটাকে নিরর্থক, আত্মাকে দিয়ে অপচয় করাচ্ছে শুধু, মাকড়সার পেটের নরম রোমের রাশ দিয়ে কুড়িটাকে গেলাচ্ছে শুধু, যে কুড়িটা মৌমাছিকে পেত, ফড়িঙকে, প্রজাপতিকে, আলোকে, আকাশকে।

এই মেয়েটার সমস্ত মসৃণ সুন্দর শরীরটাকে কবে সে মাকড়সার পেটের চটচটে সুতোর গুটিপাকানো ডিম মাত্র মনে করতে পারবে—তেমনই দুর্বৃত্ত, অশ্লীল, কদর্য, বীভৎস।

এখনও যে এর মোহ, মোহই বা বলে কেন প্রমথ, ধর্মের মতো এর মাদকতা, দেবতার মতো পবিত্রতা, ভগবানের রাজ্যের মতো অনিবর্চনীয়তা তার, প্রমথকে কল্যাণীর দেহ ধর্মোন্মত্ত করে তুলেছে? ওর আত্মা কি ওর শরীরের চেয়েও পূজ্য? কে বলে, এই সুন্দরকে দেখেনি সে তাহলে ! এর মুখের ওপর, ভুরুর ওপর, ঠোঁটের ওপর প্রমথ তার চোখের দৃষ্টিকে আবেগপ্রবণ চুমোর মতো চেপে দিয়ে কতবার বলেছে প্রেম, সুন্দরের থেকে কল্যাণীর সুন্দরী শরীরই ওর আত্মা, ওর মন, ওর অনুপম মোহের সৌন্দর্য দিয়ে গড়া, ভগবান, তাই দিয়েই গড়া শুধু, বিধাতা, পৃথিবীর এই একমাত্র মেয়েমানুষকে এই রকম করে গড়ে ভালো করেছ তুমি।”(আকাক্সক্ষা কামনার বিলাস/ জীবনানন্দ দাশ ৫০টি গল্প: প্রতিক্ষণ, পৃষ্ঠা: ৬৬-৬৭)

[ছয়]

প্রেমের সম্পর্ক বিবাহিত জীবনে কতটা তার সমুদয় নান্দনিকতা ধরে রাখে এটি প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়। বিয়েতে কী প্রেম মরে যায়? এই আলোচনায় হয়ত আমরা এ বিষয়ে উত্তর খুঁজতে প্রলুব্ধ হব না; আর জীবনানন্দ’র বিয়েতো প্রেমের ফসল ছিল না। ঢাকা ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরগৃহে ব্রাহ্ম-রীতি অনুযায়ী জীবনানন্দ দাশ এবং লাবণ্য দাশ যুগলের বিয়ে ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত হয়। বিয়ের উদ্যোক্তা ছিলেন কবির ‘মা। খুলনা জেলার সেনহাটি গ্রামের রোহিণীকুমার- সরযুবালা গুপ্ত’র মেজো মেয়ে লাবণ্য গুপ্ত বিয়ের পর দাশ টাইটেল গ্রহণ করেন, যিনি দেখতে খুবই সুশ্রী ছিলেন। ৯’মে শুক্লা চতুদর্শীর দিন অনুষ্ঠেয় এই বিবাহ-অনুষ্ঠানে বুদ্ধদেব বসু, অজিতকুমার দত্ত এবং তাঁদের বন্ধুরা বরযাত্রী হয়েছিলেন।

এই বিবাহিত সম্পর্কটি ক্রমশ তিক্ত হয়েছে। কী কারণে হয়েছে তার বিশদে আমরা যাব না, কিন্তু হয়েছে। জীবনানন্দের নানা লেখায়, পরিচিতদের জবানীতে এর প্রমাণ মেলে। মৌনমুখর কবি সম্পর্কের তিক্ততার চাপ বয়ে বেড়িয়েছেন; কখনো কখনো উগরে দিয়েছেন লেখায়। এর অনেকখানি দেখা মেলে মাল্যবান উপন্যাসে।

তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস নাম ‘মাল্যবান।’ জীবনানন্দ নিজে এটি প্রকাশ করেন নি। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৭০ সালে জীবনানন্দের স্ত্রী লাবণ্য দাশের প্রবল বাধার মুখে অনুরাগীদের মাধ্যমে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। লাবণ্য দাশ বইটি  প্রকাশ করতে চান নি, কারণ, সমালোচকরা বলেন, এতে উপন্যাসের নায়ক মাল্যবানের মুখ দিয়ে জীবনানন্দ তাঁর নিজের অসুখী সাংসারিক জীবনের কথা বলেছেন।

গল্পের নায়ক মাল্যবান আর তাঁর স্ত্রী’র নাম উৎপলা। মাল্যবান যাকে পলা নামে ডাকে। উৎপলা সুন্দরী, রাগী, ঝগড়ুটে, খরুচে এবং প্রায় উচ্ছন্নে যাওয়া একজন নারী। অন্যদিকে মাল্যবান গরীব, সাদাসিধে, শান্ত, মৌন এবং দেখতে অনাকর্ষণীয় পুরুষ। বাস্তবিক অর্থে মাল্যবান আর উৎপলার সঙ্গে লাবন্য আর জীবনানন্দ’র দেখাশোনা মিলে যায়। লাবণ্য দাশ দেখতে সুন্দরী ছিলেন। জীবনানন্দ দেখতে কেমন ছিলেন সেটি তাঁকে যারা দেখেছেন তাঁদের একজন শামসুর রাহমানের জবানীতে দেখা যাক—

”বলতে দ্বিধা নেই, জীবনানন্দ দাশকে দেখে আমি হতাশ হয়েছিলাম। দেখতে মোটেই কবির মতো নন তিনি। কালো, স্থ’লকায়; চেহারা বৈশিষ্ট্যবর্জিত। শুধু চোখে ছিলো একধরনের মায়া। আর হাসি ছিলো জোরালো এবং খাপছাড়া। যিনি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কিংবা বিষ্ণু দে’র মতো কান্তিমান নন, তিনি কী করে অমন রহস্যসমৃদ্ধ, আশ্চর্য রূপসী কবিতা লিখেছেন— এমন একটি প্রশ্ন আমাকে ক্ষণিকের জন্য বিচলিত করেছিলো।”(অসীমের সৈকতে/শামসুর রাহমান/ জীবনানন্দ: জীবন আর সৃষ্টি: সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত/পৃষ্ঠা: ১১৮)।

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, স্ত্রীটি সুন্দরী আর স্বামীর রূপ নেই আবার সাংসারিক সম্প্রীতি নেই এমন কল্পনায় তিনি তাঁর দাম্পত্যকেই দেখেছেন।

মানুষের আসল সমস্যাকে তুলে ধরতে এরকম উপন্যাসের প্রয়োজন আছে এরকমটা জীবনানন্দ জীবদ্দশায় বলে গেছেন।

মাল্যবান উপন্যাসের ছত্রে-ছত্রে জীবনানন্দের আভিজাত্যপূর্ণ ভাষার স্পর্শ পাওয়া যায়। স্ত্রী’র অবহেলায় নীচতলার স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে একা একা রাত্রিবাসের পরেও যখন স্ত্রীর বড় ভাই এর আগমণে মাল্যবানকে নিজ গৃহ থেকে এক প্রকার বহিষ্কৃত হয়ে মেসে গিয়ে দীর্ঘ সাত মাস সময় কাটিয়ে আসতে হয়; সেসব দেখলে সাংসারিক জীবন নামক বিষয়টাকে পাঠকেরও দুর্বিসহ মনে হবে। অন্যদিকে স্ত্রীর বন্ধুর আগমণে স্বামী মাল্যবান যখন নীচতলার একা ঘরে প্রায় নির্বাসিত হয়ে যান তখন যেন কবি জীবনানন্দ চুপ করে এসে হাজির হন। তখনকার লেখার ভাষা একদম বদলে যাওয়া। ওখানে সাংসারিক টানাপোড়েন নেই, নুনের অভাব, ভাতের অভাব নেই। ওখানে স্মৃতির মধ্যে, ভাবনার মধ্যে পৌষের শীতের রাত, গ্রামের ছোট নদী, কাক- কোকিল আসা-যাওয়া করে, তখন রূপসী বাংলার কবির জন্মদিনের রাতে একা অসহায় না ঘুমোনো শরীরটাকে বড় বেশি পরিচিত মনে হয়। কেউ তার জন্মদিন মনে রাখে নি। তার শরীরের বয়স বাড়ে কেবল…।

গ্রন্থপঞ্জি

(১)        জীবনানন্দ দাশের কবিতা মূলানুগ পাঠ- সম্পাদনা ভূমেন্দ্র গুহ, বেঙ্গল পাবলিকেশন্স লিমিটেড

(২)         মাল্যবান : মূলানুগ পাঠ: সম্পাদনা ভূমেন্দ্র গুহ, বেঙ্গল পাবলিকেশন্স লিমিটেড

(৩)       জীবনানন্দ দাশ : উত্তরপর্ব: দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, পুস্তক বিপণি

(৪) একটি নক্ষত্র আসে : অম্বুজ বসু, পুস্তক বিপণি

(৫) জীবনানন্দ : জীবন আর সৃষ্টি: সম্পাদক- সুব্রত রুদ্র, নাথ পাবলিশিং

(৬) জীবনানন্দ দাশ ৫০টি গল্প, প্রতিক্ষণ

(৭) জীবনানন্দ দাশ : প্রভাতকুমার দাস, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি

(৮) কবি জীবনানন্দ দাশ আদ্যন্ত সম্প্রসারণশীল চেতনা: মাহমুদ নাসির জাহাঙ্গীরি, একাডেমিক প্রেস এন্ড পাবলিশার্স লাইব্রেরী

(৯) ধূসর জীবনানন্দ : বিনয় মজুমদার- কবি

(১০) আলেখ্য : জীবনানন্দ: ভূমেন্দ্র গুহ,আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড

(১১) অনন্য জীবনানন্দ : ক্লিন্টন বি সিলি, প্রথমা

(১২) জীবনানন্দ ও তাঁর কাল: হরিশংকর জলদাস, অবসর

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close