Home আফ্রিকা অমনিবাস ফজল হাসান > আফ্রিকার সাহিত্যের চার উজ্জ্বল নক্ষত্র >> প্রবন্ধ

ফজল হাসান > আফ্রিকার সাহিত্যের চার উজ্জ্বল নক্ষত্র >> প্রবন্ধ

প্রকাশঃ August 29, 2017

ফজল হাসান > আফ্রিকার সাহিত্যের চার উজ্জ্বল নক্ষত্র >> প্রবন্ধ
0
0

[সম্পাদকীয় নোট : প্রিয় পাঠক,  ্ইতিপূর্বে তীরন্দাজের আফ্রিকা অমনিবাসে আফ্রিকার ছোটগল্প এবং কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এবার আমরা প্রকাশ করবো কিছু গদ্য, যে-গদ্যগুলিতে আফ্রিকার সাহিত্যের বিশেষ বিশেষ দিকের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। আজ প্রকাশিত হল এই ধারার প্রথম প্রবন্ধ। এরপর এই ধরনের আরও বেশকিছু প্রবন্ধ পর পর আমরা প্রকাশ করবো।]

ফজল হাসান > আফ্রিকার সাহিত্যের চার উজ্জ্বল নক্ষত্র >> প্রবন্ধ

সূচনা

আফ্রিকা – একক একটি দেশ নয়, বরং মহাদেশ এবং এই মহাদেশের চৌহদ্দির মধ্যে শুয়ে আছে বৈচিত্র্যময় ও প্রাচুর্যে সুষমামন্ডিত চুয়ান্নটি স্বাধীন রাষ্ট্র। আয়তন এবং জনসংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাদেশ (অবশ্য এশিয়া প্রথম), যা পৃথিবীর সমগ্র ভূখন্ডের এক-পঞ্চমাংশ জায়গা জুড়ে আছে। আফ্রিকার জনসংখ্যা (২০১৬ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী) একশ বিশ কোটি, যা প্রায় বিশ্বের সমস্ত জনমানবের ষোল শতাংশ। এই বিশাল জায়গা এবং বিপুল জনমানুষ থাকার পরেও দূর্ভাগ্যক্রমে ক্ষুধা, দারিদ্র, অশিক্ষা, উপনিবেশ শাসন ও শোষণ এবং গৃহযুদ্ধের মতো নেতিবাচক বিষয়গুলো পুরো আফ্রিকা মহাদেশকে অনেক পেছনে ঠেলে দিয়েছে। তবে আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্য বা বিভাজন একমাত্র কারণ নয়। দেশগুলোর মধ্যে বসবাস করে বহু জনগোষ্ঠী, যাদের ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। গায়ের রঙের দিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায় আফ্রিকা মহাদেশে চার ধরনের লোকের বসতি, যেমন কৃষ্ণাঙ্গ (কালো), অশ্বেতাঙ্গ (কালার্ড), ভারতীয় ও শেতাঙ্গ। এছাড়া প্রত্যেক বর্ণের মধ্যে আছে নানাধরনের দেশগত, গোষ্ঠীগত, শিল্প-সংস্কৃতি ও ভাষাগত বৈচিত্র। একসময় বাইরের দুনিয়ার কাছে আফ্রিকার যে পরিচয় ছিল, তার পুরোটাই জুড়ে ছিল ভৌগলিক বিষয়আশয়, যেমন ধূ ধূ মরুভূমি, অরণ্য, জন্তু-জানোয়ার এবং সমুদ্রের নীল জলরাশি। সেই সময় মানুষজন ছিল উহ্য। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আফ্রিকার লোকজনের, বিশেষ করে তাদের সাহিত্য, শিল্পকলা, সঙ্গীত, নাটক, থয়েটার, পরিচয় ঘটে বাইরের মানুষের সঙ্গে।

একথা সত্যি যে, অন্ধকার আফ্রিকার আকাশে এখনো রূপালি চাঁদ ওঠে, ভরা জোৎস্নায় ভেসে যায় চরাচর, ভূখন্ডে আছে রুক্ষ সাহারা মরুভূমি, অমাবশ্যা ও পূর্ণিমায় নদীর শরীরে খেলা করে জোয়ার-ভাটা, ঋতু পরিবর্তনের সুবাদে ঊষর জমিনে ফসলের শিস দোল খায়, এমনকি জরাজীর্ণ মানুষের জীবনে প্রেম-ভালোবাসা আসে এবং রক্তকণায় মিশে থাকে স্নেহ-মায়া-মমতার মতো কোমল অনুভূতি। এসব সনাতন নেতিবাচক এবং ইতিবাচক বিষয়গুলো নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় বারবার উঠে এসেছে অনিবার্য বিশ্বস্ততায় এবং প্রকাশিত হয়েছে ছোটগল্প, উপন্যাস, কবিতা, সঙ্গীত এবং নাটক-থিয়েটারে। আফ্রিকার বিভিন্ন প্রাচীন ভাষায়, যেমন আফ্রিকান, জুলু, সোহাইলি, চেওয়া এবং ইউোবা, স্বল্প পরিমানে সাহিত্য রচিত হলেও উপনিবেশিক শাসনকালে আফ্রিকার অনেক দেশের সাহিত্যিকেরা ইংরেজি, ফরাসি, পর্তুগীজ, ওলন্দাজ কিংবা আরবী ভাষায় অতীতে সাহিত্য রচনা করেছেন এবং এখনো করছেন। তবে একথা হলফ করে বলা যায় যে, বিশ্বের সাহিত্য অঙ্গণে নিজেদের আসন পাকাপোক্ত করা চারজন নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিকের সুবাদে আজ গর্ব করতে পারে পুরো আফ্রিকা।

এই প্রবন্ধে আফ্রিকা মহাদেশের চারজন নোবেল বিজয়ী লেখকের ব্যক্তিজীবন, সাহিত্য ভাবনা এবং সংক্ষিপ্ত আকারে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের আলোচনা করা হয়েছে। নোবেল বিজয়ী লেখকরা হলেন নাইজেরিয়ার ওলে সয়িঙ্কা, মিশরের নাগিব মাহফুজ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার নাডিন গর্ডিমার ও জে এম কোয়েৎজি।

ওলে সোয়িঙ্কা

ব্যক্তিজীবন এবং সাহিত্যকর্ম

আফ্রিকার অন্ধকার আকাশের গায়ে যে প্রজ্জ্বলিত নক্ষত্র বিশ্বসাহিত্য ভুবনে রোশনাই ছড়িয়েছিলেন, তিনি আফ্রিকা মহাদেশের প্রথম নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক, কবি এবং নাট্যকার নাইজেরিয়ার ওলে সয়িঙ্কা। তাঁর সম্পর্কে নোবেল কমিটির মন্তব্য ছিল ‘যিনি সহজাত কাব্যিক প্রকাশ ভঙ্গির সঙ্গে সাংস্কৃতিক দৃষ্টিবোধ মিশিয়ে বিদ্যমান সময়কে তুলে ধরতে পারঙ্গম।’ এছাড়া তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিতে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ হাওয়াই-এর উপাচার্য স্বনামধন্য সাহিত্য সমালোচক এবং প্রাবন্ধিক অধ্যাপক রীড ওয়ে ড্যাসেনব্রক বলেছেন, “এটাই হলো প্রথম নোবেল পুরস্কার যা একজন আফ্রিকার লেখককে, কিংবা এমন একজন লেখককে দেওয়া হয়েছে যিনি প্রাক্তন বৃটিশ সাম্রাজ্য থেকে আবির্ভূত হয়ে ইংরেজিতে ‘নয়া সাহিত্য’ রচনা করেছেন।”

ওলে সয়িঙ্কার পুরো নাম আকিনওয়ান্দ ওলুওলে বাবাতুন্দে সয়িঙ্কা। তাঁর জন্ম নাইজেরিয়ার ইবাদান শহরের নিকটবর্তী আবেওকাতায়, ১৩ জুলাই ১৯৩৪। শৈশবে তিনি নিজের শহরে এবং ইবাদানে পড়াশুনা করে ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অফ লীডস্ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স ডিগ্রি অর্জণ করেন। পরবর্তীতে নাইজেরিয়ার লাগোস এবং আইফে বিশ্ববিদ্যালয়ে সমকালীন সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। এছাড়া তিনি ইংল্যান্ড এবং মার্কিন মুলুকের বিভিন্ন বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। তুলনামূলক সাহিত্যে তাঁর পান্ডিত্য ছিল অপরিসীম।

সাহিত্য জীবনের বাইরে রাজনীতির সঙ্গে ওলে সয়িঙ্কার ছিল গভীর সম্পৃত্ততা। তাই বিভিন্ন সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন প্রতিবাদী এবং সোচ্চার, এমনকি জিম্বাবুয়ের মুগাবী সরকারের কট্টর সমালোচক। গৃহযুদ্ধের সময়ে শান্তি ভঙ্গ করার অপরাধে তিনি ১৯৬৭ সালে আটক হন এবং দীর্ঘ বাইশ মাস কারাবন্দি ছিলেন। বলা হয়, ‘আফ্রিকার রাজনীতিতে নেলসন ম্যান্ডেলা যেমন, ঠিক তেমনই আফ্রিকার সাহিত্যে ওলে সয়িঙ্কা।’ যাহোক, বিশ্বজুড়ে অসংখ্য পাঠকের জন্য সুখবর ছিল যে, তিনি কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে পুনরায় লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে ওলে সয়িঙ্কা তিনবার বিয়ে করেন। তবে প্রথম দু’জন স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে। এরা ছিলেন বৃটিশ নারী লেখক বারবারা ডিক্সন এবং স্বদেশী গ্রন্থগারিক ওলেইদে আইডোয়ু। তিনি ১৯৫৮ সালে বারবারার সঙ্গে পরিনয় সূত্রে আবদ্ধ হন এবং ১৯৬৩ সালে ওলেইদের পাণি গ্রহণ করেন। তৃতীয় স্ত্রী ফোলাকে ডোহার্টিকে বিয়ে করেন ১৯৬৯ সালে। তিনি ২০১৪ সালে পোস্ট্রেট ক্যান্সারের কথা প্রকাশ করেন এবং দশ মাস চিকিৎসার পরে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

ইংল্যান্ডে থাকাকালীন সময়ে ওলে সয়িঙ্কা লন্ডনের ‘রয়্যাল কোর্ট থিয়েটার’-এর নাট্যশিল্পী ছিলেন। সেই সময়ে তিনি একাধিক নাটক রচনা করেন, যেমন ‘দ্য সোয়াম্প ডুয়েলার্স’ এবং ‘দ্য লায়ন অ্যান্ড দ্য জুয়েল’ (হালকা কমেডী), যা ইবাদানে মঞ্চায়িত হয় এবং পরে গ্রন্থ হিসাবে প্রকাশিত হয়। স্বদেশে ফিরে এসে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার মাঝে তিনি ১৯৬০ সালে ‘নাইনটিন-সিক্সটি মাস্কস্’ এবং ১৯৬৪ সালে ‘ওরিস্যুন থিয়েটার কোম্পানী’ গঠন করেন। তিনি অসখ্য নাটক রচনা করেন। তবে ১৯৬০ সালে প্রকাশিত ‘এ ডান্স অফ দ্য ফরেষ্টস্’ নাটকের জন্য রাজনীতিবিদ এবং নিকটতম বুদ্ধিজীবি বন্ধু-বান্ধবের সমালোচনা তাঁকে রীতিমত কোনঠাসা করেছিল। এই নাটকের বিষয়বস্তু ছিল কৃষ্ণ আফ্রিকানদের নির্বুদ্ধিতা এবং তিনি এমন ভাবে রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রতারণার ঘটনা তুলে ধরেছেন যেন সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেনতা জাগ্রত হয়। কলা-কৌশল (স্টাইল)-এর দিক থেকে নাটকটি ছিল জটিল, যেখানে নির্দিষ্ট আদিবাসী গোষ্ঠীর চিয়ারত অনুষ্ঠানের সঙ্গে ইউরোপের আধুনিকতাকে মেশানো হয়েছে। একদিকে সমাজের মাঝে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দূর্নীতি প্রকাশের জন্য সরকার এবং অন্যদিকে বামপন্থীদের অভিযোগ ছিল যে নাটকে তিনি বিজাতীয় কলা-কৌশল ব্যবহার করে দেশীয় সংস্কৃতিকে হেয় করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘মাই ফাদার’স্ বার্ডেন’ (১৯৬০ সালে নাইজেরিয়ার টেলিভিশনে প্রচারিত হয়), ‘দ্য ডিটেইনি’ (লন্ডন রেডিওতে প্রচারিত হয়), ‘দ্য রোড’ (১৯৬৫ সালে লন্ডনের রয়্যাল থিয়েটারে অনুষ্ঠিত ‘কমনওয়েল্ আর্টস্ ফেষ্টিভ্যাল’-এ মঞ্চায়িত হয়) এবং ‘কনজি’স্ হার্ভেষ্ট’ (সেনেগালের রাজধানী ডাকারে ১৯৬৪ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড ফেষ্টিভ্যাল অফ নিগ্রও আর্টস’- মঞ্চায়িত হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে একই শিরোনামে সিনেমা নির্মীত হয়) অন্যতম। উল্লেখ্য, ‘দ্য রোড’ নাটক ‘গ্রান্ড প্রি’ পুরস্কার লাভ করে।

কবি হিসাবে ওলে সয়িঙ্কার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। কারাগারে বন্দি অবস্থায় তিনি বেশ কিছু কবিতা লেখেন, যা ‘ইদানে অ্যান্ড আদার ষ্টোরিজ’ (১৯৬৭) এবং ‘পোয়েস্ ফ্রম প্রিজন’ (১৯৬৯) কাব্যগ্রন্থে স্থান পেয়েছে। ‘ওগুন অ্যাবিবিম্যান’ (১৯৭৬), ‘মেন্ডেলা’স আর্থ অ্যান্ড আদার পোয়েমস্’ (১৯৮৮) এবং ‘সমরখন্দ অ্যান্ড আদার মার্কেট আই হ্যাভ নৌন’ (২০০২) তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। বলা হয়, তাঁর কবিতা এবং নাটকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে।

যদিও ওলে সয়িঙ্কা নাট্যকার, কবি এবং প্রাবন্ধিক হিসাবে আন্তর্জাতিক সাহিত্য পরিমন্ডলে সুপরিচিত, তবে তিনি মাত্র দু’টি উপন্যাস (‘দ্য ইন্টারপ্রিটারস্’ এবং ‘সিজন অফ অ্যানোমি’) এবং বেশ কিছু ছোটগল্প রচনা করেন। ‘দ্য ইন্টারপ্রিটারস্’ উপন্যাস প্রকশিত হয় ১৯৬৫ সালে এবং ‘সিজন অফ অ্যানোমি’ প্রকশিত হয় ১৯৭৩ সালে। ষাট দশকের উত্তর-স্বাধীনতা এবং প্রাক-গৃহযুদ্ধ সময়ের নাইজেরিয়ার, বিশেষ করে লাগোস শহরকে কেন্দ্র করে ‘দ্য ইন্টারপ্রিটারস্’ উপন্যাসের কাহিনী গড়ে উঠেছে। উপন্যাসে পাঁচটি প্রধান চরিত্র এবং এরা হলো পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের কারণিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সাংবাদিক, প্রকৌশলী (যিনি পরে ভাস্কর শিল্পী) এবং চিত্রশিল্পী। শৈশবে তারা স্কুলের বন্ধু ছিলেন। পরবর্তীতে তারা বিভিন্ন দেশে পড়াশুনা করে স্বদেশে ফিরে এসে মধ্যবিত্ত জীবনযাপন শুরু করেন।  বর্ণনা কৌশলের দিক থেকে উপন্যাসটি ভীষণ জটিল। কেননা লেখক হরহামেশা অতীত দিনের ঘটনা ব্যাবহার করেছেন। শুধু তাই নয়। তিনি অনেক ঘটনাই ভেঙেচুরে নতুন আদলে উপস্থাপন করেছেন। সত্যি বলতে কি, তিনি এই বর্ণনামূলক উপন্যাসে তথাকথিত বাঁধাধরা নিয়ম-নীতি ব্যবহার করে উত্তর-উপনিবেশকালের উপন্যাস হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। অনেক সমালোচক এই উপন্যাসকে ‘জটিল’ হিসাবে আখ্যায়িত করে। তাই অনেকে মনে করেন যে, উপন্যাসটি যতটুকু সমাদৃত হওয়ার কথা ছিল, তা কখনই হয়নি। তবে উপন্যাসটি ইংরেজিতে রচিত হলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

সাহিত্য জীবনের তুঙ্গে থাকাকালীন সময় ওলে সয়িঙ্কা দ্বিতীয় উপন্যাস ‘সিজন্ অফ অ্যানোমি’ রচনা করেন। তবে দূর্ভাগ্য যে, অনেকেই এই উপন্যাস স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। এদের মতে উপন্যাসটি লেখককে রীতিমত সুনামের তলানিতে নামিয়ে দিয়েছে। এছাড়া কেউ কেউ মনে করেন, ‘সিজন্ অফ অ্যানোমি’-র সঙ্গে প্রথম উপন্যাস ‘দ্য ইন্টারপ্রিটারস্’-র সাদৃশ্য রয়েছে। আবার অনেকে অভিযোগ করেন যে, উপন্যাসটি গভীর আবেগপূর্ণ ধর্মীয় গ্রন্থ যেখানে নীতিমূলক বিষয়আশয় স্থান পেয়েছে।

ওলে সয়িঙ্কার তিনটি ছোটগল্প সংকলন রয়েছে। এগুলো হলো: ‘এ টেইল অফ টু’ (১৯৫৮), ‘এবে’স স্যোর্ণ এনিমি’ (১৯৬০) এবং ‘মাদাম এটিনে’স্ এস্টাব্লিশমেন্ট’ (১৯৬০)। মাত্র উনিশ বছর বয়সে তিনি ছোটগল্প ‘কেফির জন্মদিনের উপহার’ রচনা করেন। এছাড়া তাঁর লেখালেখির বিশাল ঝুড়িতে বেশ কিছু আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ এবং প্রবন্ধের বই রয়েছে।

বিশ্বসাহিত্যে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য তাঁকে ১৯৮৬ সালে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য, ওলে সয়িঙ্কার নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ভাষণ, ‘দিজ পাস্ট মাষ্ট অ্যাড্রেস ইট’স্ প্রেজেন্ট’, ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী এবং মুক্তিকামী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাকে উৎসর্গকৃত। নোবেল পুরস্কার ছাড়াও তিনি একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জণ করেন। এগুলোর মধ্যে আমেরিকার ‘অ্যানিসফিল্ড-উলফ্ বুক অ্যাওয়ার্ড’ (১৯৮৩), ‘বেনসন মেডাল  ফ্রম রয়্যাল সোসাইটি অফ লিটারেচার’ (১৯৯০), ‘অ্যানিসফিল্ড-উলফ্ বুক অ্যাওয়ার্ড, লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট’ (২০১৩) এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল হিম্যানিষ্ট অ্যাওয়ার্ড’ (২০১৫) উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তিনি ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অফ লীডস্, আমেরিকার বিখ্যাত হার্ভার্ড এবং প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি থেকে ‘অনারারী ডক্টরেট’ ডিগ্রি লাভ করেন।

যদিও অনেক সময় ওলে সয়িঙ্কা আধুনিক পশ্চিম আফ্রিকা নিয়ে বিদ্রাপাত্বক ভঙ্গিতে লিখেছেন, কিন্তু একাগ্রতা, নিষ্ঠা, সৎ উদ্দেশ্য এবং বিশ্বাস তিনি নিপুন হাতে ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন লেখায়। বলা বাহূল্য, ওলে সয়িঙ্কার লেখায় ফুটে উঠেছে উপনিবেশবাদী আগ্রাসনের চিত্র, সমাজ পরিবর্তনের কাহিনী, বর্ণবৈষম্য, শোষন-বঞ্চনা এবং নির্যাতনের মতো ভয়াবহ বিষয়গুলো। এছাড়া পাশ্চাত্য শিক্ষায় সুশিক্ষিত ওলে সয়িঙ্কা ইংরেজি ভাষায় লেখালেখি করেন এবং উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো লেখার মধ্যে তাঁর শব্দ প্রয়োগের মুন্সিয়ানা।

নাগিব মাহফুজ

ব্যক্তিজীবন এবং সাহিত্যকর্ম   

‘যিনি অতি সূক্ষ্ম তারতম্যে ভরপুর লেখার মাধ্যমে, এখন যা বাস্তবে অত্যন্ত পরিস্কার এবং অস্পষ্টতা সহজেই অনুমেয়, যে আরব বিশ্বের বর্ণনামূলক লেখার অভিনব ধারা গড়ে তুলেছেন, তা সমগ্র মানব গোষ্ঠীর জন্য প্রজোয্য’ – এই ছিল আরবী ভাষায় প্রথম নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক মিশরের নাগিব মাহফুজ সম্পর্কে নোবেল কমিটির মন্তব্য। তিনি ১৯৮৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

নাগিব মাহফুজের জন্ম মিশরের রজাধানী কায়রোর এক মধ্যবিত্ত পরিবারে, ১১ ডিসেম্বর ১৯১১। তিনি ছিলেন বাবা-মার সাত সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ট। বাবা ছিলেন সরকারী চাকুরে। তাঁর পরিবার ছিল ধর্মপ্রাণ মুসলমান। তাই শৈশব থেকেই তিনি ধর্মীয় কড়া শাসন এবং নিয়মকানুনের মধ্যে বড় হন। তবে শৈশবে মা তাঁকে বিভিন্ন দর্শণীয় স্থানে, যেমন জাদুঘর এবং পিরামিড, নিয়ে যেতেন। মাত্র সাত বছর বয়সের সময় ১৯১৯ সালের মিশরের অভ্যুথ্থান তাঁর কঁচি মনে দারুণ প্রভাব ফেলে।

মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে নাগিব মাহফুজ ১৯৩০ সালে কায়রো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন এবং ১৯৩৪ সালে দর্শণে গ্রাজুয়েশন সমাপ্ত করেন। যদিও মাত্র সতের বছর বয়সে তিনি লেখিলেখির জগতে প্রবেশ করেন, কিন্তু মাষ্টার্সে পড়ার সময় পুরোপুরি লেখক হওয়ার জন্য এক বছর পরেই ক্ষান্ত দেন। সেই সময় তিনি সাংবাদিকতার পাশাপাশি ছোটগল্প লেখা শুরু করেন। একসময় তিনি সরকারী চাকুরীতে যোগদান করেন এবং ১৯৭১ সালে অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন।

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সমালোচকদের মতে আরবী কথাসাহিত্যে স্বীকৃত জনক নাগিব মাহফুজের গদ্যের ভাষার মূল বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর চিন্তা-চেতনার সুস্পষ্ট প্রকাশ। তাঁর সাহিত্য কর্মের বিষয়বস্তু সমাজতন্ত্র থেকে শুরু করে ঈশ্বরের অস্তিত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়া তিনি বিভিন্ন লেখায় পশ্চিমা সংস্কৃতির আলোকে দেশীয় সংস্কৃতির উত্তরোত্তর উন্নতির কথা তুলে ধরেছেন। ছোটবেলা থেকে ভিনদেশের সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন এবং পশ্চিমা দেশের রহস্য গল্প, রাশিয়ার ক্লাসিক গ্রন্থ ও বিশ্বখ্যাত লেখকের, যেমন মার্সেল প্রাউষ্ট, ফ্রাঞ্জ কাফকা এবং জেমস জয়েস, লেখা পড়েন। তাঁর প্রায় প্রতিটি লেখাই কায়রোর জনবসতিপূর্ণ মধ্যবিত্ত পরিবার ঘিরে, যেখানে লোকজন আধুনিকতা এবং পাশ্চাত্যের মন-মানসিকতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রামে লিপ্ত।

দীর্ঘ সত্তর বছরের সাহিত্য জীবনে তিনি চৌত্রিশটি উপন্যাস, তিন শ’ পঞ্চাশেরও বেশি ছোটগল্প, বেশ অনেকগুলো চিত্রনাট্য এবং পাঁচটি নাটক রচনা করেন। ‘গডস্ ওয়ার্ল্ড’ (১৯৬২), ‘দ্য টাইম অ্যান্ড দ্য প্লেস, অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ (১৯৯১) এবং ‘দ্য সেভেনথ্ হ্যাভেন’ (২০০৫) ইংরেজিতে অনূদিত তাঁর ছোটগল্প সংকলন। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘মকারি অফ দ্য ফেইট’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৯ সালে এবং ১৯৫২ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত বিপ্লবের আগে তিনি আরো দশটি উপন্যাস রচনা করেন। তিনি সম্ভবত ‘কায়রো ট্রিলজি’-র জন্য দেশ-বিদেশের পাঠকের কাছে সুপরিচিত। তিন খন্ডের এই বিশাল আকারের এপিকধর্মী উপন্যাসের নাম হলো ‘প্যালেস ওয়াক’ (১৯৫৬), ‘প্যালেস অফ ডিজায়্যার্’ (১৯৫৭) এবং ‘সুগার স্ট্রীট’ (১৯৫৭)। এই উপন্যাস তিনটির নামকরণ করা হয়েছে কায়রোর পুরোনো এলাকা আল-জামিনিয়ার তিনটি সড়কের নাম অনুযায়ী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৫২ সালের সামরিক অভ্যুথ্থান, যা রাজা ফারুককে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, পর্যন্ত কায়রোর আলাদা পরিবারের তিন প্রজন্মের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। একত্রে এই ত্রয়ী উপন্যাসকে অনেকে আরব বিশ্বের ‘ওয়ার অ্যান্ড পীস’-এর সঙ্গে তুলনা করে। ‘কায়রো ট্রিলজি’ প্রকাশের পর নাগিব মাহফুজ লেখালেখি থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন। তার প্রধান কারণ ছিল তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি গামাল আব্দুল নাসের এবং তার সরকারের প্রতি বিরাগ ভাজন ছিলেন। তবে নাসের যখন সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন, তখন থেকে তিনি নিজের মত পরির্তন করেন। যাহোক, ১৯৫৯ সালে তিনি পুনরায় সাহিত্য জগতে ফিরে আসেন এবং দ্বিগুন উদ্যোমে লেখা শুরু করেন। এই সময়ে তিনি প্রচুর সংখ্যক উপন্যাস, ছোটগল্প, আত্মজীবনী, প্রবন্ধ এবং চিত্রনাট্য রচনা করেন।

ষাটের দশকের গোড়ার দিকে নাগিব মাহফুজ ধর্ম থেকে মানবিকতার বিচ্যুতি নিয়ে সাহিত্য রচনার প্রতি জোর দেন। ‘দ্য থীফ অ্যান্ড দ্য ডগস্’ (১৯৬১) উপন্যাসের মূল বিষয় কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া একজন চোরের কাহিনী। যারা তাকে কারাগারে পাঠিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সে ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই সময়ের প্রকাশিত অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘অ্যট্যাম ক্যোএইল্’ (১৯৬২),‘অ্যাড্রিফ অন দ্য নাইল’ (১৯৬৬) এবং একাধিক ছোটগল্প সংকলন। উল্লেখ্য, ‘অ্যাড্রিফ অন্ দ্য নাইল্’ (১৯৬৬) তাঁর বহুল পঠিত উপন্যাসের মধ্যে অন্যতম। এই উপন্যাসে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গামাল আব্দুল নাসেরের সময় মিশরের অধঃপতনের সমালোচনা করা হয়েছে। তাই নাসেরের সমর্থকদের উস্কানি এড়ানোর জন্য পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত উপন্যাসটি নিষিদ্ধ করেছিলেন। যাহোক, এই উপন্যাসের কাহিনীর উপর ভিত্তি করে আনোয়ার সাদাতের আমলে সিনেমা তৈরি করা হয়। এছাড়া ষাট এবং সত্তর দশকে তিনি স্বগতোক্তি ভিত্তিক উপন্যাস লেখায় উৎকর্ষতা লাভ করেন। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় ‘মিরামার’ (১৯৬৭) উপন্যাস। এই উপন্যাসে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পঞ্চাশ দশকের বিদ্রোহের জটিল কাঠামো ব্যবহার করেছেন এবং বর্ণনামূলক একাধিক আত্মকথনের মাধ্যমে কাহিনী তুলে ধরেছেন।

নদীর যেমন জোয়ার-ভাটা আছে, বছরের আছে ঋতু, তেমনই নাগিব মাহফুজের জীবনেও ছিল সুসময় এবং অসময়, ছিল বিশ্ব জুড়ে সুখ্যাতি এবং সমালোচনার তুমুল ঝড়-তুফান। বলা হয়, ‘দ্য চিলড্রেন অফ দ্য গ্যালেওয়াবে’ (১৯৫৯), যা ‘চিলড্রেন অফ দ্য অ্যালে’ নামেও পরিচিত, নাগিব মাহফুজের বহুল পঠিত উপন্যাস। এই উপন্যাসে তিনি কাল্পনিক প্রেক্ষাপটে তিনটি প্রধান ধর্মকে (ইহুদী, খৃীষ্টান এবং ইসলাম) উনিশ শতকের বিশ্বাস এবং বাস্তবতার নিরিখে তুলে ধরেছেন। তবে পরিতাপের বিষয় যে, এই উপন্যাসের জন্য তিনি একাধিক মৃত্যুর হুমকি পেয়েছিলেন। যদিও নিরাপত্তার জন্য পুলিশ তাঁকে পাহাড়া দিয়েছিল, কিন্তু কঠিন পাহাড়ার মাঝেও ১৯৯৪ সালে কায়রোর নিজের বাড়ির সামনে একজন চরমপন্থী তাঁর ঘাড়ে ছুরিকাঘাত করেছিল। তিনি ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান, তবে তাঁর ঘাড়ের ডান পাশের শিরা-উপশিরা নষ্ট হয়ে যায়। তারপর থেকে তিনি স্বাভাবিক ভাবে নিয়মিত লিখতে পারতেন না। সেই সময় থেকে তাঁর লেখায় ভাটা পড়ে এবং মৃত্যু অবধি তা বহাল ছিল।

নাগিব মাহফুজ ২০০৬ সালের জুলাইয়ে পড়ে গিয়ে মাথায় ভীষণ ব্যথা পান এবং সেই ব্যথা নিয়ে তিনি পরের মাসের ৩০ তারিখে কায়রোর এক হাসপাতালে পরলোক গমন করেন। পরদিন তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় এবং পুরো সামরিক কায়দায় কায়রোতে সমাধিস্থ করা হয়।

‘আমি দু’টি আলাদা সভ্যতার মানসপুত্র। ইতিহাসের একটা সময়ে এসে এই দুই সভ্যতা মিলে তৈরি করেছে সুখি জীবন। একটি হলো সাত হাজার বছরের পুরনো ফেরাউনের আমলের সভ্যতা এবং অন্যটি এক হাজার চার শ’ বছরের পুরনো ইসলামিক সভ্যতা’ – এমন কথা নাগিব মাহফুজ ছাড়া আর কে-ইবা বলতে পারে ?

নাডিন গর্ডিমার

ব্যক্তিজীবন এবং সাহিত্যকর্ম

বর্ণবাদ বিরোধী কন্ঠস্বর, মানবতার প্রতীক এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কথাসাহিত্যিক নাডিন গর্ডিমার। সাহিত্য কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ১৯৯১ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। নোবেল কমিটি তাঁকে একজন মহাকাব্যিক উপন্যাস রচয়িতা হিসেবে আখ্যায়িত করে উল্লেখ করেছে, ‘তাঁর মহৎ সাহিত্যকর্ম – আলফ্রেড নোবেলের কথায় – সমগ্র মানব জাতীর জন্য অত্যন্ত উপকারী।’

নাডিন গর্ডিমারের জন্ম ১৯২৩ সালের ২০ নভেম্বর, দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রান্সভালের স্প্রিংস নামক শহরের মধ্যবিত্ত এক পরিবারে। তাঁর পিতা ছিলেন লাৎভিয়া থেকে অভিবাসিত ইহুদী এবং মাতা ছিলেন লন্ডনের ইহুদী। শৈশবে তিনি কনভেন্ট স্কুলে এবং পরবর্তীতে উইটওয়াটারস্ট্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন।

নাডিন গর্ডিমার মাত্র নয় বছর বয়সে লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন এবং পনের বছর বয়সে তাঁর লেখা ছোটগল্প জোহানেসবার্গের এক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। তবে প্রথম ছোটগল্প সংকলন ‘দ্য সফট্ ভয়েস অফ দ্য সার্পেন্ট’ প্রকাশিত হয় দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৯৫২ সালে এবং ১৯৫৩ সালে যুক্তরাজ্যে প্রথম উপন্যাস ‘দ্য লাইং ডেজ’ প্রকাশিত হয়। তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘দ্য লেইট বুর্জোয়া ওয়ার্ল্ড’ (১৯৬৬) এবং ‘দ্য কনজারভেশানিষ্ট’ (১৯৭৪)। মাসিক বাংলা ম্যাগাজিন ‘কালি ও কলম’-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে নাডিন গর্ডিমার এবং তাঁর লেখা সম্পর্কে লেখক সরকার মাসুদ বলেছেন, ‘গরডিমারের লেখার বিশেষত্ব হচ্ছে, তিনি ক্ষোভাত্বক বিষয় নিয়ে লিখেছেন কিন্তু ক্ষোভ প্রকাশ করেননি। কোনোরকম তিক্ততাও নেই। যেন সৃষ্টিকর্তার মতো নির্লিপ্ত-নির্বিকার এক প্রত্যক্ষদর্শী তিনি। যেন তিনি বলতে চান, জীবন এমনই। …. অনাচারক্লিষ্ট মানুষের প্রতি তাঁর সহানুভূতি গভীর। ঘটনার চেয়ে ভাবনা তাঁর গল্প-উপন্যাসে বেশি গূরুত্বপূর্ণ। …. তিনি লেখায় সংঘর্ষের বর্ণনা দেন না, এমনকি ক্ষুদ্ধ মনের অবস্থাও সরাসরি প্রকাশ করেন না। তিনি বরং কৌশলে প্রতিবাদের বিষয়টি তুলে ধরেন। সেজন্যে প্রতীকের আশ্রয় নেন। আর এ সবকিছুকেই তিনি উপস্থাপিত করেন গভীর মমতার সঙ্গে।’

বিষয়বস্তু এবং সময় অনুযায়ী নাডিন গর্ডিমারের সাহিত্যকে মোটামুটি ভাবে দুটি আলাদা ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন, ষাট ও সত্তর দশকের বিভিন্ন লেখায় তিনি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের বিষয় তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে নব্বই দশকের উপন্যাসে স্থান পেয়েছে স্বাধীন মাতৃভূমির ইতিবাচক বিষয়। দীর্ঘ সাহিত্য জীবনে তিনি তিরিশটিরও অধিক গ্রন্থ রচনা করেন। এগুলোর মধ্যে ‘এ ওয়ার্ল্ড অফ স্ট্রেঞ্জারস্’ (১৯৫৮), ‘বার্গার্স্ ডটার’ (১৯৭৯), ‘জুলাই’স্ পিপল’ (১৯৮১), ‘মাই সান’স্ স্টোরী’ (১৯৯০), ‘হাউজ গান’ (১৯৯৮), ‘দ্য পিকআপ’ (২০০২) এবং ‘নো টাইম লাইক দ্য প্রেজেন্ট’ (২০১২) তাঁর জনপ্রিয় এবং সফল উপন্যাস। বর্ণবাদকেন্দ্রিক ও বর্ণবাদ পরবর্তী সময়ের সমস্যা এবং শঙ্কাই তাঁর সাহিত্যের উপজীব্য বিষয়। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ এবং হাসি-কান্নাও তাঁর লেখায় স্থান পেয়েছে। তবে ২০০৫ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘গেট এ লাইফ’-এ তিনি পরিবেশ বিষয়ক বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। ‘জাম্প অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’, ‘লুট অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ এবং ‘বিটোভেন ওয়াজ ওয়ান-সিক্সটিন ব্ল্যাক’ তাঁর উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প সংকলন। তাঁর অনেক ছোটগল্প এবং উপন্যাস বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ‘দ্য কনজারভেশানিষ্ট’ উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৭৪ সালে ‘ম্যান বুকার’ পুরস্কার অর্জণ করেন। বলা হয়, তিনি সমাজের সুবিধা ভোগীদের জায়গায় থেকে সাহিত্য রচনা করেছেন। জীবনের শেষ দিকে এইচআইভি/এডেইসের একজন সোচ্চার প্রচারক হিসাবে কাজ করেন। বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি ২০১৪ সালের ১৩ জুলাই জোহানেসবার্গের নিজ বাসভবনে ঘুমন্ত অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

নাডিন গর্ডিমার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি রাজনীতির মানুষ নন। তবে তৎকালীন সময়ে নিষিদ্ধ ‘আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস’-এ, সংক্ষেপে ‘এএনসি’, তিনি যোগদান করেন। একথা সত্যি যে, তাঁর বিভিন্ন লেখায় মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে রাজনীতির প্রভাব উঠে এসেছে। শৈশবের একাকীত্বই তাঁকে মানুষ নিয়ে চিন্তা-ভাবনার আপন জগত তৈরি করে দিয়েছে। তাঁর দৃষ্টিতে লেখালেখি কোন রাজনৈতিক কার্যক্রম নয়। কেননা রাজনীতি হচ্ছে দূষিত, অথচ লেখালেখি হচ্ছে শিল্পকলা। শিল্পকলা অবশ্যই দূষিত রাজনীতি থেকে আলাদা রাখা উচিত। শেতাঙ্গ আফ্রিকান হিসাবে নিজেকে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করলেও তিনি কৃষ্ণাঙ্গ আন্দোলন সমর্থন করতেন এবং এজন্য বর্ণবাদী সরকারের হাতে বারবার নিষিদ্ধ হয়েছে তাঁর সাহিত্যকর্ম। ‘এ ওয়ার্ল্ড অফ স্ট্রেঞ্জারস্’ উপন্যাস দীর্ঘ বারো বছর নিষিদ্ধ ছিল। এছাড়া ‘বার্গার্স্ ডটার’ এবং ‘জুলাই’স্ পিপল’ উপন্যাস দুটি অল্প সময়ের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। প্রথমে ‘বার্গার্স্ ডটার’ এক মাসের জন্য এবং পরবর্তীতে এক তরফা দেশদ্রোহিতার অজুহাতে আরো ছয় মাসের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। অন্যদিকে ‘জুলাই’স্ পিপল’ উপন্যাস বর্ণবাদী সরকারের সময়, এমনকি পরবর্তী সরকারের সময়েও সেন্সরশীপের রোষাণলে পড়ে। এই উপন্যাস সম্পর্কে বলা হয় ‘গভীর ভাবে বর্ণবাদ-বিদ্বেষী এবং উসকানিমূলক’। এহেন মন্তব্য বা অপবাদকে নাডিন গর্ডিমার অত্যন্ত গূরুত্বপূর্ণ ভাবে নিয়েছিলেন এবং প্রতিবাদ করেছিলেন।

‘ম্যান বুকার’ পুরস্কার বিজয়ী উপন্যাস ‘দ্য কনজারভেশানিষ্ট’-এ নাডিন গর্ডিমার ‘জুলু’ সম্প্রদায়ের সংস্কৃতিকে আবিস্কার করার চেষ্টা করেছেন। এই উপন্যাসে ‘এন্টিহিরো’ মেহরিনের দৃষ্টিতে একজন ধনকুব শেতাঙ্গ শিল্পপতির কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে প্রতীকের ভেতর দিয়ে লেখিকা প্রতিবাদকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন। বিষয়গত দিক থেকে এই উপন্যাস ১৮৮৩ সালে প্রকাশিত অলিভ স্ক্রেইনার (১৮৫৫-১৯২০)-এর ‘দ্য ষ্টোরি অফ অ্যান আফ্রিকান ফার্ম’ এবং ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত জে এম কোয়েৎজির (জন্ম ১৯৪০) ‘ইন দ্য হার্ট অফ দ্য কান্ট্রি’ উপন্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে। যাহোক, সুইডিশ লেখক পার এরিক ভাষ্টবার্গ (জন্ম ১৯৩৩) এই উপন্যাসকে বর্ণনা করেছেন, ‘নিবীড় এবং সবচেয়ে কাব্যিক উপন্যাস।’

‘বার্গার্স্ ডটার’ উপন্যাসে নাডিন গর্ডিমার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে শহীদ পিতার সঙ্গে একজন নারীর সম্পর্কের কাহিনী তুলে ধরেছেন। সেই নারীও রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল। বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়ে রচিত হলেও ‘বার্গার্স্ ডটার’ উপন্যাসের ব্যাপ্তি আরো সুদূর প্রসারী। এই উপন্যাসে বিভিন্ন বিষয় উথ্থাপন করা হয়েছে, যেমন বস্তুজগতের ওপরে মনোজগতের আধিপত্য, চঞ্চলতার ওপর স্থবিরতা এবং মৃত্যুর ওপর জীবনের প্রাধান্য।

নাডিন গর্ডিমার ‘জুলাই’স্ পিপল’ উপন্যাসে দক্ষিণ আফ্রিকার রক্তাক্ত বিদ্রোহকে কল্পনা করেছেন, যেখানে অশেতাঙ্গদের বিদ্রোহের ভয়ে শেতাঙ্গরা জড়োসড়ো এবং অহরহ খুন হচ্ছে, তখন শিক্ষিত এক শেতাঙ্গ দম্পতি জীবনের ভয়ে তাদের প্রাক্তন কৃষ্ণাঙ্গ ভৃত্যের আশ্রয়ে লুকিয়ে থাকে। হিংসাত্বক পরিবেশ, হিংস্রতা এবং ঘৃণার মতো বিরূপ পরিবেশ মানুষ নিজেকে কিভাবে মানিয়ে নিতে পারে, সেই কাহিনী নিপুন হাতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই উপন্যাসে। সমালোচকদের মতে, এই উপন্যাস ‘আজ পর্যন্ত যত রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে মহান সাহিত্য রচিত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম।’

নাডিন গর্ডিমারের পুরস্কার বিজয়ী আরেক উপন্যাস ‘দ্য পিকআপ’। এতে বিচ্ছিন্নতাবোধ, স্থানান্তর (ডিসপ্লেসমেন্ট) এবং অভিবাসন ছাড়াও সামাজিক শ্রেনীবিন্যাস, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, ধর্মীয় বিশ্বাসের মতো বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে। এছাড়া স্বাধীন দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনৈতিক জটিলতার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে।

‘অনেক কিছুতেই আমি পরাজিত, কিন্তু ভয় আমাকে কখনই কাবু করতে পারেনি’ – এমন উক্তি শুধু নাডিন গর্ডিমারের মতো একজন মানবতাবাদী বিশ্বখ্যাত লেখকের পক্ষেই বলা সম্ভব। নাডিন গর্ডিমারের উপদেশমূলক আরেকটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে এই অংশ শেষ করছি: ‘করুণা করে কিংবা সমবেদনা জানিয়ে কোন সরকারকেই ক্ষমতাচ্যুত করা যায় না। ক্ষমতাচ্যুত করতে হলে চাই অন্যরকম শক্ত কিছু।’

জে এম কোয়েৎজি

ব্যক্তিজীবন এবং সাহিত্যকর্ম   

নোবেল পুরস্কার বিজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত ঔপন্যাসিক, গল্পলেখক, প্রাবন্ধিক এবং অনুবাদক জে এম (জন ম্যাক্সওয়েল) কোয়েৎজি সম্পর্কে নোবেল কমিটির সারকথা ছিল এরকম: ‘যিনি আকস্মিক ভাবে বাইরের চরিত্রকে তুলে এনে তা অগণিত চিন্তা-চেতনার সঙ্গে মিশিয়ে চিত্রানুগ বর্ণনা করতে সক্ষম।’ এছাড়া ২০১৩ সালে জে এম কোয়েৎজিকে ‘ডেইলি ম্যাভেরিক’ পত্রিকার সিনিয়র লেখক রিচার্ড পপলাক তাঁকে বর্ণনা করেছেন, ‘বিনা তর্কে তিনি সবচেয়ে বিখ্যাত এবং সম্মানিত জীবন্ত ইংরেজি ভাষার লেখক।’ এছাড়াও অসংখ্য সনদপত্র তাঁর ঝুলিতে জমা পড়েছে।

জে এম কোয়েৎজি ১৯৪০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারী দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন খন্ডকালীন অ্যাটর্নী ও সরকারী চাকুরিজীবি এবং মা ছিলেন স্কুলের শিক্ষিকা। তিনি ক্যাপ টাউনের ক্যাথলিক স্কুলে পড়াশুনা করেন এবং ১৯৫৭ সালে ইউনিভার্সিটি অফ কেপটাউন-এ ভর্তি হন। ১৯৬০ সালে ইংরেজীতে অনার্সসহ ব্যাচেলার অফ আর্টস্ এবং ১৯৬১ সালে গণিতে অনার্সসহ ব্যাচেলার অফ আর্টস্ ডিগ্রী অর্জণ করেন। তিনি ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত লন্ডনের আইবিএম কোম্পানিতে কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসাবে কর্মরত ছিলেন এবং সেখানে থাকাকালীন সময় ইউনিভার্সিটি অফ কেপটাউন থেকে মাস্টার্স্ অফ আর্টস্ ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অস্টিনের ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস থেকে তিনি ইংরেজি, জার্মান ভাষা এবং ভাষাত্বত্তের উপর ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জণ করেন। তবে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করার আগেই তিনি স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্কে-এ ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষকতা শুরু করেন এবং সেখানে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত শিক্ষক ছিলেন। তখন তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের জন্য দরখাস্ত করেন। কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার সরাসরি অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকার জন্য তাঁর দরখাস্ত খারিজ করা হয় এবং আইন ভঙ্গের কারণে ১৯৭০ সালের মার্চে অন্যদের সঙ্গে তাঁকেও গ্রেফতার করা হয়। পরে ১৯৭১ সালে তাঁর বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ খারিজ করা হয়। স্বদেশে ফিরে এসে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ কেপটাউন-এ ইংরেজির অধ্যাপক নিযুক্ত হন। চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণের পর ২০০২ সালে তিনি অষ্ট্রেলিয়ার অভিবাসী হন এবং ২০০৬ সালে নাগরিকত্ব লাভ করেন। বর্তমানে দক্ষিণ অষ্ট্রেলিয়ার রাজধানী এডেলেইডে বসবাস করেন এবং ইউনিভার্সিটি অফ এডেলেইড-এর ইংরেজি বিভাগের অনারারী রিসার্চ ফেলো হিসাবে কর্মরত আছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত সাদামাটা। একজন বিশ্বনন্দিত লেখক হয়েও তিনি নিজেকে জনমানুষের সামনে প্রকাশ করতে চান না, বরং লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকাটাই তাঁর চিরচেনা স্বভাব। এ কারণে তিনি একবারও সশরীরে উপস্থিত থেকে ‘ম্যান বুকার’ পুরস্কার গ্রহণ করেননি।

ধন্যাঢ্য সাহিত্য জীবনে জে এম কোয়েৎজির বিভিন্ন রচনাবলীর মধ্যে রয়েছে উপন্যাস, ছোটগল্প, আত্মীবনীমূলক রচনা, সমালোচনা, অনুবাদ, কবিতা এবং চিত্রনাট্য। তিনি ১৯৬৯ সালে লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন এবং ১৯৭৪ সালে তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘ডাক্সল্যান্ডস্’ প্রকাশিত হয়। তবে দ্বিতীয় উপন্যাস ‘ইন দ্য হার্ট অফ দ্য কান্ট্রি’ (১৯৭৭) একযোগে ইংল্যান্ড এবং আমেরিকায় প্রকাশিত হওয়ার পরই তাঁর নাম আন্তর্জাতিক সাহিত্যাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া ‘বয়হুডঃ সীন্ ফ্রম দ্য প্রভিন্সিয়াল লাইফ’ (১৯৯৭) এবং ‘ইয়ুথঃ সীন্ ফ্রম দ্য প্রভিন্সিয়াল লাইফ ২’ (২০০২) তাঁর আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। তাঁর উপন্যাসের মধ্যে ‘ইফ অ্যান্ড টাইমস্ অফ মাইকেল কে’ (১৯৮৩), ‘ফো’ (১৯৮৬), ‘দ্য মাষ্টার অফ পিটার্সবার্গ’ (১৯৯৪), ‘ডিসগ্রেস’ (১৯৯৯), ‘ডায়েরী অফ এ ব্যাড ইয়ার’ (২০০৭) এবং ‘সামারটাইম’ (২০০৯) উল্লেখযোগ্য। এসব উপন্যাস ছাড়াও তিনি আফ্রিকান এবং ডাচ ভাষায় অনেক সাহিত্যকর্ম অনুবাদ করেছেন। তিনি ২০০৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। নোবেল পুরস্কার ছাড়াও জে এম কোয়েৎজি ‘দ্য লাইফ অ্যান্ড টাইমস্ অফ মাইকেল কে’ উপন্যাসের জন্য ১৯৮৩ সালে প্রথমবার এবং ‘ডিসগ্রেস’ উপন্যাসের জন্য ১৯৯৯ সালে দ্বিতীয়বার ‘ম্যান বুকার’ পুরস্কার লাভ করেন। উল্লেখ্য, কোয়েৎজি প্রথম লেখক, যিনি দু’বার ‘ম্যান বুকার’ পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর ঝুলিতে বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার রয়েছে। এসব পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে ‘জেরুজালেম প্রাইজ’, দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে সম্মানিত ‘সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি’ (সংক্ষেপে ‘সিএনএ’) সাহিত্য পুরস্কার (তিনবার), ‘প্রি ফ্যামিনা ই’ট্রেঞ্জার’ এবং ‘দ্য আইরিশ টাইমস্ ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ’। তাঁর লেখা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। সমালোচকদের মতে,তিনি এমনই একজন লেখক, যিনি গ্রন্থসমূহের মূল পাঠসংক্রান্ত আবেশকে পরিশোধিত করে হুবহু, বাস্তবিক গদ্য এবং চিন্তা-চেতনাকে সংক্ষিপ্ত করতে সিদ্ধহস্ত এবং যোগ্যতার গুণে পরিবারিক জীবনকে পত্যন্ত সহজ-সরল এবং সাবলীল ভাষায় প্রকাশ করতে পারঙ্গম। শব্দের এবং ভাষার নান্দনিকতা ছাড়াও তাঁর লেখায় চিন্তা-চেতনার ও বোধের প্রাচুর্যতা দেখতে পাওয়া যায়। তাঁর উপন্যাসের কল্প-কাহিনী এবং বাস্তবের সীমানা নির্ধারণ করা খুবই মুশকিল। তাই পাঠককে সবসময় সচেতন থাকতে হয়।

বলা হয়, জে এম কোয়েৎজির সবচেয়ে নন্দিত এবং অন্যতম সফল উপন্যাস ‘ডিসগ্রেস’। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী সংগ্রামের পরবর্তী সময়ের ওপর ভিত্তি করে লেখা।উপন্যাস এবং এই উপন্যাসই তাঁকে দ্বিতীয়বার ‘ম্যান বুকার’ পুরস্কার এনে দেয়। উপন্যাসের মূল ঘটনা এরকম: স্ত্রী-পরিত্যাক্ত মধ্যবয়সী একজন ইংরেজ অধ্যাপক নিজের ছাত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। সহকর্মীরা ঘটনা জানতে পেয়ে ভেবেছিল যে, অধ্যাপক চাকুরি টিকিয়ে রাখার জন্য ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইবে। কিন্তু বাস্তবে অধ্যাপক তা না করে বরং চাকুরিতে ইস্তফা দিয়ে অবসর গ্রহণ করে এবং মেয়েটিকে নিয়ে দূরের একটা নির্জণ খামার বাড়িতে বসবাস করে। এছাড়াও তৃতীয় পুরুষে এবং বর্তমান কাল নিয়ে রচিত ‘ডিসগ্রেস’ উপন্যাসে তিনি একজন শেতাঙ্গ মহিলাকে তিনজন কৃষ্ণাঙ্গের ধর্ষণের কাহিনী তুলে ধরেছেন, যা প্রকাশের পর সমালোচনার মুখে পড়েন। যাহোক, এত কিছুর পরও ‘ডিসগ্রেস’ উপন্যাসের গূরুত্ব শুধু দক্ষিণ আফ্রিকায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর চাহিদা ছড়িয়ে পেছে সমগ্র বিশ্ব জুড়ে। লন্ডনের স্বনামধন্য সংবাদপত্র ‘দ্য অবজারভার’ এই উপন্যাসকে ১৯৮০ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত বৃটিশ, আয়রীশ এবং কমনওয়েলফ্ ভুক্ত দেশগুলোর লেখকদের রচিত উপন্যাসের মধ্যে ‘পঁচিশ বছরের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছে।

জে এম কোয়েৎজির ‘ডায়েরী অফ এ ব্যাড ইয়ার’ উপন্যাস একাকীত্ব জীবন, বন্ধুত্ব এবং সম্ভাব্য প্রেম নিয়ে রচিত।     অন্যদিকে ‘দ্য লাইফ অ্যান্ড টাইমস্ অফ মাইকেল কে’ উপন্যাসে তিনি গৃহযুদ্ধের কারণে একজন সাধারণ মালির কারগারের দুঃসহ বন্দিজীবন এবং কয়েদখানা থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টার করুণ কাহিনী তুলে ধরেছেন। অনেক সমালোচক এই উপন্যাসের মূল চরিত্র ‘মাইকেল কে’-র সঙ্গে ফ্রাঞ্জ কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’ উপন্যাসের অধিবক্তা ‘যোসেফ কে’র মিল খুঁজে পেয়েছেন। কেউ কেউ মনে করেন যে, ‘মাইকেল কে’-র ‘কে’ আসলে কাফকা, কেননা উপন্যাসে বারবার কাফকার প্রসঙ্গ এসেছে। যাহোক, এই উপন্যাসের জন্য তিনি ‘ম্যান বুকার’ পুরস্কার ছাড়াও বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ‘ইন দ্য হার্ট অফ দ্য কান্ট্রি’ এবং ‘ওয়েটিং ফর দ্য বারবারিয়ানস্’ উপন্যাসে তিনি উপনিবেশিকতার বিষয় উদ্ভাবন করেছেন। ‘বয়হুডঃ সীন্ ফ্রম দ্য প্রভিন্সিয়াল লাইফ’ আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসে তিনি কেপটাউনের শৈশব জীবন এবং ‘ইয়ুথঃ সীন্ ফ্রম দ্য প্রভিন্সিয়াল লাইফ ২’-তে ষাটের দশকের শুরুতে ইংল্যান্ডে থাকাকালীন সময়ের যুবক বয়সের স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন। এছাড়া ‘সামারটাইম’ তাঁর তৃতীয় আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। এই উপন্যাসে তিনি পাঁচজন আলাদা ব্যক্তির দৃষ্টিতে অধিবক্তার জীবনী বর্ণনা করেছেন।

শেষকথা

ইতিমধ্যে আফ্রিকার সাহিত্য-গগণে চার উজ্জ্বল নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটেছে। এসব নক্ষত্রের রোশনাই ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বসাহিত্যাঙ্গণে। তাঁদের সাহিত্য নন্দিত হয়েছে এবং পেয়েছে বিশ্ব জুড়ে পাঠকপ্রিয়তা। তবে এ কথা সত্যি যে, আফ্রিকার সমকালীন সাহিত্যে বেশ কয়েক প্রতিভাবান লেখকের আবির্ভাব ঘটেছে, যাদের পদচারণায় স্বদেশের ভূমি ছেড়ে ক্রমশ আন্তর্জাতিক সাহিত্য পরিমন্ডলে মুখরিত হয়ে উঠছে। তাই এটুকু আশা করা যায়, আগামি দিনেও আফ্রিকার আকাশে আরো উজ্জ্বল নক্ষত্র আবির্ভূত হবে এবং তাঁদের ঝলমলে আলো ছড়িয়ে পড়বে অন্যান্য দেশে। তাঁদের নান্দনিক লেখা পড়ে ঋদ্ধ হবে বিশ্বের অগণিত পাঠক। সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় আছি।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close