Home আত্মজীবনী ফরিদ কবির / আমার গল্প : র্পব ২

ফরিদ কবির / আমার গল্প : র্পব ২

প্রকাশঃ December 9, 2016

ফরিদ কবির / আমার গল্প : র্পব ২
0
4

ঠিকানা আমার

বাংলাদেশে আমিই সম্ভবত একমাত্র লোক যার কোনো ঠিকানা নাই। কেউ যদি জিজ্ঞেশ করেন, আপনার বাড়ি কোথায়- তার সঠিক জবাব দেয়া আমার জন্য একটু কঠিনই। আমার আসলেই কোনো বাড়িঘর নাই। বাড়ি তো বাড়ি, বাংলাদেশের কোথাও আমার এক ফোঁটা জায়গা-জমিও নাই। দেশের বাড়ি বলতে যা বোঝায় তেমন কিছুও আমার নাই।

আমার যে কোনো স্থায়ী ঠিকানা নাই এ নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা ছিলো না। কোনো সমস্যাও ছিলো না। কিন্তু একবার সমস্যায় পড়লাম! পাসপোর্টের ফরমে স্থায়ী ঠিকানা লিখতে হয়। আমি আমার ভাড়া বাসার ঠিকানাই দিলাম!

ভেরিফিকেশন করতে আসা পুলিশ  জিজ্ঞেস করলো, এটা কি আপনার নিজের বাড়ি?

আমি বললাম, ‘না’।

পুলিশ বললো, ‘তাহলে তো এটাকে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন না! আপনি এখানে গ্রামের বাড়ির ঠিকানা দিতে পারেন।’

‘দেশের বাড়ি বলতে যা বোঝায় তেমন কিছু আমার নেই! মানে, দেশের বাড়িতে আমাদের কেউ নেই। ওখানে আমাকে কেউ চেনে না!’

পুলিশ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো! সে একেবারেই হতবাক! কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বললো, ‘স্থায়ী একটা ঠিকানা তো আপনাকে দিতে হবে। তা না হলে তো পাসপোর্ট পাবেন না।’

স্থায়ী ঠিকানার ঘরে আমি কী লিখবো?

৮/২ জিন্দাবাহার সেকেন্ড লেন।

আমার যখন জ্ঞান হয়, তখন আমি নিজেকে এই বাড়িতেই আবিষ্কার করেছিলাম! দেড় রুমের একটা বাসার এক রুমে আমরা থাকতাম! ওপরে ছিলো টিনের ছাদ! আর ছিলো টানা বারান্দা। বারান্দার সামনে এক চিলতে উঠান। উঠানটি ছিলো কাঁচা। উঠানের অপর পাশে ছিলো একটা ছোট স্নানঘর আর তার পাশে তার চাইতে ছোট একটা টয়লেট। স্নানঘরে বা টয়লেটে কোনো পানির ব্যবস্থা ছিলো না। টয়লেট থেকে বদনা এনে বাথরুমে রাখা বালতি থেকে পানি নিয়ে টয়লেটে যেতে হতো। টয়লেটটা ছিলো নোংরার নোংরা। সেখানে শত শত তেলাপোকা কিলবিল করতো। হাগু করার সময় দু একটা শরীরেও উঠে যেতো!

বাসায় একটা বাথরুম অবশ্য ছিলো। বাথরুম মানে গোসলখানা। শুধু মেয়েরা সেখানে গোসল করতো। আমরা, মানে, আমার বাবা আর আমার ছোটভাই শরিফ রাস্তার কলে গিয়ে গোসল সারতাম! ঘরের বারান্দায় কেরোসিনের স্টোভে আমাদের রান্না হতো। এর পর ঘরে মাদুর বিছিয়ে আমরা খেতাম। খুব গরমের দিনে বারান্দায়। শরিফ আমার বছর চারেকের ছোট। অস্পষ্ট মনে পড়ে, আমার আরও দুটো ভাই জন্মেছিলো। একদিন আম্মাকে জিজ্ঞেশ করেছিলাম, ‘আমগো কি আরও ভাই আছিলো?’

আম্মা বলেছিলেন, ‘একটা না, তর আর শরিফের মাঝখানে আরও দুই ভাই হইছিলো। একটা জন্মের পরপরই মইরা গেছে। তারপর হইছে ফারুক। ছয় মাস বাঁচছিলো। অর উপরের ঠোঁটটা কাটা আছিলো।’

 

যে বাসায় আমরা থাকি, তাতে দুটো রুম। এক রুমে আমরা, আর আরেক রুমে ছিলো অন্য ভাড়াটে। আমরা চারজন। পাশের রুমেও চারজন। শেফালি, খোকন আর ওদের বাবা-মা। শেফালির বাবা ছিলো একজন কাঠমিস্ত্রি। কয়েক বছর পরে এ বাসায় আরও একটা রুম তৈরি করা হয়। এ রুমটাতে নিঃসন্তান এক দম্পতি থাকতেন। মানিকগঞ্জে ওদের বাড়ি। কয়েক মাস পরে হঠাৎ ওরা চলে গেলে আসমানি খালা এসে ওঠেন সেই ঘরে। আসমানি খালা আমার মায়ের মামাতো বোন। কিছুদিন পর আসমানি খালা আর খালু চলে গেলে সোনা মামা আর মামী এসে ওঠেন। সোনা মামা আমার এক খালুর ভগ্নিপতি। সেই সূত্রে আমরা তাকে মামা ডাকি। সোনা মামার এক ছেলে এক মেয়ে। রফিক আর বেবি। ওরা দুজনেই আমার ছোট। বেবি ছিলো খুবই শান্তশিষ্ট। আর রফিক ঠিক তার উল্টো। সে ছিলো ভয়ানক চঞ্চল আর দুষ্টু প্রকৃতির। তার দুষ্টুমিতে মামা-মামী তো বটেই, পুরো মহল্লাই প্রায় অস্থির থাকতো।

জিন্দাবাহারের এই বাড়িটাতে শেফালিরা বেশিদিন ছিলো না। শেফালি ছিলো আমার চেয়ে সামান্য ছোট। ওর সঙ্গে ভাব জমে ওঠার আগেই ওরা এ বাসা ছেড়ে চলে যায়।

আমাদের ঘরে কোনো আলমারি ছিলো না। আম্মা শেফালির বাবাকে দিয়ে আমাদের ঘরের জন্য কড়ই কাঠের একটা আলমারি বানিয়ে নিয়েছিলেন। সেটা আজও আছে। শেফালিরা চলে যাওয়ার পর হালিমা খালা এসে ওই রুমে ওঠেন।

হালিমা খালাকে বেশ ঝগড়াটে বলেই মনে হতো। তার সঙ্গে ঝগড়া লাগেনি এমন কেউ নেই! হালিমা খালার ছোট মেয়ে নিনা আমার চেয়ে বছর দুয়েকের বড়। নিনা ফর্সা ও দেখতে সুন্দর ছিলো। এলাকার অনেক ছেলেই ওর প্রতি দুর্বল ছিলো।

 

দুটো বাড়ির মাঝখানে একটা সরু গলি দিয়ে আমাদের বাসায় ঢুকতে হতো। তবে চিপা এই গলিটা আমাদের খুবই প্রিয় একটা জায়গা। আমরা খেলাধুলা করতাম এই গলিটাতেই। খেলাধুলা বলতে ‘রান্না-রান্না’, ‘কুতকুত’, আর ‘বিরিং খোলা’।  বিরিং মানে মার্বেল। নানা বর্ণের এসব মার্বেল ছিলো খুবই আকর্ষণীয়। বেশির ভাগই ছিলো সবুজ আর নীলে মেশানো। রান্না-রান্না আর কুতকুত খেলাটা ছিলো একেবারেই মেয়েদের খেলা। আমি খেলতাম, কারণ আমাদের পাশের বাড়ির নুরন নাহার, বেবি, শায়লা- এরা আমাকে তাদের সঙ্গে খেলার জন্য পীড়াপিড়ি করতো। এদের সঙ্গে কীভাবে আমার ভাব জমে উঠেছিলো তা আজ আমার মনে পড়ে না। আরও একজনের সঙ্গে আমার বেশ ভাব জমে ওঠে। সেটা সাহিদা আপা। নিনা আর নুরন আমার চেয়ে বয়সে বড় হলেও আমি ওদের নাম ধরেই ডাকতাম। কিন্তু সাহিদাকে আমি সাহিদা আপা বলতাম। সাহিদা আপা ছিলেন খুব সুন্দর একটা মেয়ে! আর বেশ সুন্দর করে কথা বলতেন। প্রায় প্রমিত ভাষায়। পরে জেনেছিলাম, তিনি কবিতাও লেখেন। আর রেডিওতে অনুরোধের আসরে গান শোনানোর জন্য অনুরোধ পাঠিয়ে চিঠি লেখেন। একদিন আমাকে বললেন, ফরিদ, আয় শোন, তোকে একটা গান শোনাবো। আমার অনুরোধে বাজবে। কী গান জানিস?

আমি মাথা নাড়লাম,  না।

‘সাগরের নীল থেকে মিষ্টি কিছু হাওয়া এনে…’। শোন। আমার নামও বলবে।

তিনি রেডিও ছাড়লেন। আমি রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছি।

রেডিওতে অনুরোধের আসর শুরু হলো। ঘোষক বলছেন, শুরু হলো স্রোতাদের অনুরোধের আসর। প্রথমে যে গানটির জন্য অনুরোধ করেছেন সেটি হচ্ছে, ‘পিঞ্জর খুলে দিয়েছি। গেয়েছেন বশির আহমেদ। গানটি শুনতে চেয়েছেন বরিশাল থেকে ইনা, মিনা, রিতা, বগুড়া থেকে শেলি মিলি চন্দনা, ঢাকা থেকে রহিম, করিম, আলী ও শাহনেওয়াজ।’

গান শুরু হলো। শাহিদা আপার নাম নেই! তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি বিষণœ হয়ে গেছেন। বশির আহমেদের গান শেষ হলে আরেকটা গান শুরু হলো। কিন্তু সাহিদা আপার নাম নাই! তার মন খুব খারাপ হয়ে গেলো। যাই হোক অনুষ্ঠানের একেবারে শেষে ঘোষক সাহিদা আপার নাম হঠাৎ উচ্চারণ করলে আমি একেবারেই অভিভূত হয়ে গেলাম। তারপর সাহিদা আপার গানটাও রেডিওতে বেজে উঠলো। সাহিদা আপার দিকে তাকিয়ে দেখি তার চোখ খুশিতে চকচক করছে!

জিন্দাবাহার এলাকায় তার মতো সুন্দর করে কেউ কথা বলতে পারতো না। খুব সুন্দর বাংলায় কথা বলতেন। আমরা সবাই বলতাম ঢাকাইয়া ভাষায়। কারও কারও সঙ্গে উর্দু ভাষায়ও কথা বলতে হতো। উর্দুভাষীরা আমাদের সঙ্গে কখনো বাংলায় কথা বলতো না। আমাদেরকেই উর্দু বলতে বাধ্য করতো। যেমন, ফামা আর কারি। ওদের সঙ্গে আমরা উর্দুতেই কথা বলতাম। ওদের বাড়িতে আমাদের পরিবারের বেশ যাতায়াত ছিলো। ওদের বাড়ি ছিলো আমাদের বাসার দু’-তিনটা বাড়ির পরেই।

ওরা পাঁচ ভাইবোন। তিন বোনই ছিলো অত্যন্ত রূপসী। শাবানা বড়, পিলু মেঝো, আর রানি ছোট। পিলু ছিলো খুবই ফুটফুটে! অসম্ভব সুন্দর আর মায়াবতী একটা মেয়ে। ওকে দেখলেই আমার ওর গালটা টিপে দিতে ইচ্ছে করতো। কিন্তু আমি ভয় পেতাম। যদি ও নালিশ করে দেয়! তাহলে আম্মা আমাকে আস্ত রাখবে না। ওরা এসেছিলো পাকিস্তানের শিয়ালকোট থেকে।

 

আরেকটা বাড়িতে আমাদের যাতায়াত ছিলো। সেটা শামসুদের বাড়ি। শামসু আমার চেয়ে এক ক্লাস ওপরে পড়লেও আমাদের ভালো বন্ধুত্ব ছিলো। শামসুর বাবা-চাচা-ফুফুরাও উর্দু ভাষায় কথা বলতো। ওদের পূর্বপুরুষরা এসেছিলো ভারতের পাটনা থেকে।  তবে, শামসুর মা ছিলো বাঙালি। ওদের বাড়িতে বিশাল সাইজের কয়েকটা পাটনাইয়া ছাগল ছিলো। শামসুদের বাড়িতে আমার আরও একটা কারণে যাওয়া পড়তো, ওদের বাড়ির পেছনের দরোজা দিয়ে আওলাদ হোসেন লেনে যাওয়া যেতো। আমি শর্টকাটে এই বাড়ির ভেতর দিয়ে আওলাদ হোসেন লেনে যেতাম। আওলাদ হোসেন লেনে থাকতো আমার সহপাঠী আলী মোহাম্মদ। তাছাড়া, এ বাড়ির ওপর দিয়ে শর্টকাটে আমি লায়ন সিনেমা হলে যেতে পারতাম।

[চলবে…]

 

 

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(4)

  1. ভাল লেগেছে,তবে প্রথম পর্বের লেশমাত্র তো এখানে নেই।তৃতীয় পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

  2. আমি জেনো লেখকের ঠিক পাশে বসেই তার জীবন কাহিনী শুনছিলাম। ফরিদ বব্ধু আমি সম্মোহিত।

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close