Home আত্মজীবনী ফরিদ কবির / আমার গল্প [৩]

ফরিদ কবির / আমার গল্প [৩]

প্রকাশঃ December 15, 2016

ফরিদ কবির / আমার গল্প [৩]
0
1

আমাদের বেশিরভাগ আত্মীয়স্বজন জিন্দাবাহারেই থাকতো। যেমন- জ্যোৎস্না খালাম্মা। আরেকজন লাট্টু মামা। এরা সবাই আম্মার চাচাতো ভাই-বোন। শুরুতে জ্যোৎস্না খালাম্মাদের আড়াইতলা বাড়িতে দুই স্ত্রী আর চার ছেলে-মেয়েকে নিয়ে থাকতেন লাট্টু মামা। বড় মামীর ঘরে এক ছেলে আর এক মেয়ে- ফকির আর শাহজাদী। ছোট মামীরও এক ছেলে, এক মেয়ে- কবির আর নূরজাদী। তবে, নূরজাদী ছোট মামীর গর্ভজাত ছিলো না। ছোট মামীর কোনো মেয়ে সন্তান না হওয়ায় তিনি তার দেবর, মানে, বাবুমামার একটি মেয়েকে পালক নিয়েছিলেন। বাবুমামাও দুটি বিয়ে করেছিলেন। তারা থাকতেন চানখারপুলে। বাবুমামার বড় স্ত্রীর ঘরে এক মেয়ে ও এক ছেলের পরে পরপর আরো দুটি মেয়ে সন্তান হয়। এরপর বাবু মামার বড় বউ আবারও সন্তানসম্ভবা হলে ছোটমামী তার দেবরের কাছে আবদার করেন, এবারেও মেয়ে সন্তান হলে তিনি তাকে ‘পালক’ নিতে চান। বাবুমামাও আশ্বাস দেন, যদি মেয়ে হয় তবে তিনি তাকে পালক দিয়ে দেবেন। ছোটমামীর, মানে লাট্টু মামার ছোট বউয়ের কপাল ভালো, বাবুমামার বড় বউয়ের ঘরে আবারও মেয়ে সন্তানই হয়েছিলো। সেই মেয়েকে ছোটমামী দত্তক নেন। তিনি ওর নাম রেখেছিলেন নূরজাদী।

লাট্টু মামা ছিলেন বেশ ডাকসাইটে টাইপের। দরাজ দিল। তার ছিলো ইলেকট্রিক্যাল সামগ্রীর ব্যবসা। ওয়াইজঘাটে মুন সিনেমা হলের পাশে ছিলো তার বিশাল দোকান- ডীন ইলেকট্রিক কোম্পানি। সেখানে আমার বাবা ছাড়াও চাকরি করতেন সোনামামা, কাইয়ুম মামাসহ আরো অনেকে। কাইয়ুম মামা ছিলেন লাট্টু মামার শ্যালক। একই বাড়িতে দুই বউ নিয়ে প্রায় সুখের সংসার করতে আমি কেবল লাট্টু মামাকেই দেখেছি! এই দুই মামীকে আমরা ডাকতাম আম্মাজি। বড় মামীকে বড় আম্মাজি, ছোট মামীকে ছোট আম্মাজি। বড় আম্মাজিদের দেশের বাড়ি ছিলো চৌদ্দগ্রাম। ছোট আম্মাজি কলতাবাজারের। ফকির ভাই, কবির, শাহজাদী আর নূরজাদীকে নিয়ে সংসার বেশ সুখেরই ছিলো লাট্টু মামার। ফকির ভাইকে তিনি প্রথমে একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ফকির ভাই ছিলো ভয়ানক দুষ্টু প্রকৃতির। পড়াশোনা একদমই করতে চাইতেন না। মহল্লার বখাটেদের সঙ্গে ছিলো তার খাতির। প্রচুর সিনেমা দেখতেন। আমরা তখন সিনেমা বলতাম না। বলতাম ‘ফিলিম’। তিনি ছিলো ফিলিমের পোকা। একটু বড় হয়ে ফকির ভাই হোন্ডা কেনার বায়না ধরলেন। ফকির ভাই আর কবির সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছিলো। ওরা যা চাইতো, তাই পেতো। ছোটবেলায় আমরা যখন বছরে রোজার ঈদের সময় একটামাত্র জামা পেতাম, তখনই ওরা অনেক রঙের জামা পেতো। এমনকি সুট-টাই পরতো।
আমরাও ওদের মতো সুট-টাই চাইলে আম্মা বলতেন, তর বাপ তো ফকিরা, একটা বালা সাট দিবার পারে না, আবার সুট!
’৭২ কি ’৭৩ সালেই, ফকির ভাই যখন স্কুলের ছাত্র, লাট্টু মামা তাকে একটা মটর সাইকেল কিনে দিলেন। দেখে আমাদের চোখ চড়কগাছ! লাল রঙের সেই মটর সাইকেলের গায়ে লেখা ‘সুজুকি’। ‘সুজুকি মিয়া’কে তখন মনে হচ্ছিলো কোনো রূপকথার পঙ্খীরাজ! ফকির ভাই এমনিতেই দেখতে ফর্সা, সুজুকির ওপরে বসলে তাকে মনে হতো রূপকথার রাজপুত্র!
তার কয়েক বছরের ছোট সৎভাই কবির ছিলো সে তুলনায় শান্ত। ফকির ভাই ছিলেন আমার চেয়ে বছর তিনেকের বড়, আর কবির বছর দুয়েকের ছোট। বাবু মামার ছেলে লালু ছিলো আমার বছর খানেকের ছোট। এরাই ছিলো আমার ছেলেবেলার সাথি।

ফকির ভাইয়ের কল্যাণেই আমি প্রথম ‘ফিলিম’ দেখার সুযোগ পাই। তাও ‘ইংলিশ ফিলিম’! এর অনেক পরে আমি আরেকটা ‘ফিলিম’ দেখেছিলাম। আমার মা-খালাদের সঙ্গে। ‘আমীর সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরী’। আমার মনে আছে, লায়ন সিনেমা হলের ‘বকসে’ বসে ছবিটি দেখেছিলাম।

সেদিন ছিলো রোববার। ছুটির দিন। ফকির ভাই আমাদের বাসায় এলেন। আমি আমার ছোট রুমটার বিছানায় শুয়ে শুয়ে স্কুলের পড়া পড়ছিলাম। ফকির ভাই এসে বিছানার পাশে রাখা চেয়ারটায় বসেই বললেন, ‘আব্বে, ছুটির দিন কি করবার লাগছস’?
বললাম, ‘ দেখতাসেন না, পড়তাছি’।
শুনে ফকির ভাই বললেন, ‘ঠিকাসে, পড়, পড়’। তারপর একটু থেমে বললো, ‘লায়নে নতুন একটা ফিলিম আইছে। আমি যাইতাছি। তুই বি যাইবার পারস’।
কী ফিলিম? আমি জানতে চাইলাম।
হেব্বি একটা ইংলিশ ফিলিম লাগাইছে। হেব্বি মাইরপিট আছে। ল্যাস গো।
ফকির ভাই অনেক ইংরেজি ফিলিম দেখে ‘ল্যাস গো’ কথাটা শিখেছিলেন!
আমার কাছে ত পসা নাই। আমি বললাম।
তুই চাইরানা দে। বাকিটা আমি দিয়া দিমুনি। ফকির ভাই সমাধান দিলেন।

শুনে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। আমি ইংলিশ ফিলিম কখনো দেখিনি। শুনেছি, ইংলিশ ফিলিমে অনেক মারপিট থাকে! একটু চুমাচুমিও নাকি দেখায়! আমার খুবই লোভ হলো। কিন্তু আমার যাওয়া হবে না। এক, আম্মা ফকির ভাইয়ের সঙ্গে আমাকে বেরোতে দেবেন না। দুই, আমার কাছে চাইর আনা তো দূরের কথা, একটা কানাকড়িও নাই।
আমি বইটা ভাঁজ করে পাশে রেখে বললাম, আপনে যান, আমার কাছে একটা ঘসা পয়সা বি নাই।
ফকির ভাই পকেটে হাত দিয়ে এক গাদা খুচরা পয়সা বের করে গুনতে শুরু করলেন। গোনা শেষ করে বললেন, যা, চল, আজকা তরে আমার পসা দিয়াই ফিলিম দেখামু।
তার বাবা, মানে লাট্টু মামা দরাজ দিলের হলেও ফকির ভাই একটু কঞ্জুস প্রকৃতিরই। সহজে কাউকে কিছু দেয়ার ছেলে তিনি নন। কিন্তু আজ হয়তো তিনি আমার সঙ্গ চাইছেন।
টাকার সমস্যাটা দূর হবার পর দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে জটিল সমস্যাটা সামনে এলো। ফকির ভাই সম্পর্কে আম্মার ধারণা খুব ভালো না। তার ধারণা, ফকির ভাইয়ের সঙ্গে মিশলে আমি খারাপ হয়ে যাবো! কাজেই তার সঙ্গে বেরোনো কঠিন হবে বলেই আমার মনে হচ্ছে।
কী বলে বাসা থেকে বেরোবো সেটাই ভাবছিলাম। ফকির ভাই বললেন, ভ্যাবলার মতোন বয়া রইছস কেলা, ল্যাস গো…।
আম্মারে কী কমু, চিন্তা করতাছি।
ফকির ভাই সম্পর্কে আম্মার কী ধারণা সেটা তো আর ফকির ভাই জানেন না। তিনি বললেন, ঠিকাসে, তুই খাড়া, আমিই মিনা ফুবুরে কয়া আইতাছি। আমি প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে ফকির ভাইকে আটকালাম, বললাম, আপনের যাওনের দরকার নাই। আপনে গলির মুখে গিয়া খাড়ান, আমি আম্মারে একটা কিছু কয়া আইবার লাগছি।
ফকির ভাই বেরোতে গেলে আমি জানতে চাইলাম, ফিলিম কয় গন্টার?
ফকির ভাই বিজ্ঞের ভঙ্গিতে বললো, ইংলিশ ফিলিম তো ইট্টু ছোট অয়। ধর সাত কি আট রিল অইবো…
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকলে ফকির ভাই বললো, ওহ হো, তুই ত আবার রিল মাইনি বুঝবি না। ধর দেড়-দুই গন্টা ত অইবই।
ফকির ভাই আমাকে ইশারা ভাষায় বোঝালেন, তিনি গলির মাথায় গিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করবেন। আমি যেন তাড়াতাড়ি আম্মাকে বলে গলির মাথায় গিয়ে তার সঙ্গে যোগ দেই।
আম্মা তখনও রান্না করছিলেন। আমি গিয়ে বললাম, আম্মা, আমি ইট্টু রহমান গো বাড়িত যাইতাছি। অর কাছে আমার জ্যামিতি বক্সটা রয়া গেছে।
আম্মা মাথা নাড়লেন।
আমি ভোঁ দৌড় দিলাম।
গলির মাথায় গিয়ে দেখি, ফকির ভাই ছটফট করছেন। আমাকে দেখেই বললেন, ধুর, তর লেইগা অনেক সিন আইজকা মিস অয়া যাইবো। চল শামসু গো বাড়ি দিয়া সটকাট মারি।
আমরা শামসুদের বাড়ির ভেতর দিয়ে অপর পাশের দরোজা দিয়ে এক মিনিটেরও কম সময়ে জিন্দাবাহার থেকে আওলাদ হোসেন লেনে পৌঁছালাম। সেখান থেকে লায়ন সিনেমা হলের কাছে পৌঁছাতে আমাদের আরও তিন-চার মিনিট লাগলো। গিয়ে দেখি শো আরম্ভ হয়ে গেছে। কাউন্টারে টিকিট নেই। আমি বললাম, হায় হায়, অখন কী অইবো?
ফকির ভাই বললেন, তুই খাড়া, তর ফকির বাই থাকতে তর নো চিন্তা ডু ফুরতি।
ফকির ভাই কোথায় চলে গেলেন। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিনেমার পোস্টার-ব্যানার দেখতে লাগলাম। এইভাবে কখনো সিনেমা হলে আসা হয়নি। সিনেমা হলে বিশাল বিশাল ব্যানার, তাতে লেখা- রোড টু সোয়াত। চলিতেছে। আমি কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়লাম। তবে যে ফকির ভাই বললো, ইংলিশ ফিলিম!
ফকির ভাই কিছুক্ষণ পরই ফিরলেন টিকিট নিয়ে। আমরা অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে ঢুকে পড়লাম। টিকিট-চেকার আমাদেরকে হলের একেবারেই সামনের সিটে বসিয়ে দিলো। পর্দায় তখন ফিল্ম চলছে। গভীর জঙ্গলে আটকেপড়া একদল লোকের জঙ্গল থেকে উদ্ধার পাওয়ার কাহিনি। জঙ্গলের আদিবাসীদের সঙ্গে লড়াই করে ফিরে আসার রুদ্ধশ্বাস কাহিনি!
আমি একেবারেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

জ্যোৎস্না খালাম্মার দুই মেয়ে। নূরজাহান আর নার্গিস। ছেলেবেলায় নিজের বাড়ি ছাড়া এই একটি বাড়িতেই আমার নিয়মিত যাতায়াত ছিলো। নূরজাহান আপা আর নার্গিস আপা দুজনেই আমাকে বেশ আদর করতেন। এখনো করেন। এর একটা বড় কারণ হয়তো, আমার খালাতো-মামাতো ভাইগুলো ছেলেবেলায় ছিলো বেজায় দুষ্টু। আমি ছিলাম সে তুলনায় একেবারেই গোবেচারা। শান্ত প্রকৃতির। লেখাপড়ায় কিছুটা ভালো বলেও হয়তো।
জ্যোৎস্না খালাম্মা, লাট্টু মামা, বাবু মামা- এরা সবাই আম্মার চাচাতো ভাই-বোন হলেও তাদের এবং তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গেই আমাদের মেলামেশা ছিলো বেশি।

আমার নিজের একটাই মামা ও একটা খালা। তারা গ্রামে থাকেন। গ্রাম বলতে কেরানিগঞ্জের আইন্তা। আইন্তা ছোট্ট একটা গ্রাম। বুড়িগঙ্গার ওপারেই। আমার নানা-নানি আর আমার মামা- হুমায়ুন ও খালা সাহিদা আইন্তাতেই থাকেন। আইন্তার ভূঁইয়া বাড়ি। ছেলেবেলায় এই ভূঁইয়াবাড়ি ছিলো আমার খুবই প্রিয় একটা জায়গা। এখানে আমার সঙ্গি-সাথীও ছিলো বেশি। আমার নানারা পাঁচ ভাই। তাদের টাইটেল ভূঁইয়া। ভূঁইয়া বাড়ির ঠিক উল্টোদিকে ছিলো মিয়া বাড়ি। মিয়া বাড়ির ভেতরেও ভূঁইয়াদের একটা জমি ছিলো। সেখানে কেউ থাকতো না। সে অংশটা ছিলো গাছ-গাছালিতে ভর্তি! পাশে একটা পুকুরও ছিলো। আমি নানা বাড়ি গেলে আমার কাজিনদের সঙ্গে সে বাড়িতে বেড়াতে যেতাম। আর, গাছ থেকে আম-তেঁতুল বা পেয়ারা পেড়ে আনতাম।

ঢাকায় আমার সঙ্গি-সাথী ছিলো খুবই কম। কারণ মহল্লার কারোর সাথেই আম্মা আমাকে মিশতে দিতেন না। আমি বড় হচ্ছিলাম আমার পাশের বাড়ির নূরন নাহার, বেবি আর শায়লার সাথে। আর আমার তিন মামাতো ভাইয়ের সাথে। স্কুলে গিয়ে আমি অবশ্য আরো কিছু সঙ্গি-সাথী পেলাম।
১৯৬৭ সালে আমি হাম্মাদিয়া হাই স্কুলে ভর্তি হলাম। আব্বুজি আমাকে স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আমাকে সরাসরি ক্লাস টু-তে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি আমার জন্মদিন লিখলেন ২২ জানুয়ারি ১৯৫৯। এতোদিন আমি জানতাম আমার নাম ফরিদ। সবাই আমাকে এ নামেই ডাকতো। স্কুলে গিয়েই আমি প্রথম জানতে পারলাম আমার আসল নাম মো. খবিরউদ্দিন! নামটা আমার খুবই অপছন্দ হলো।
এই নামটা যে আমাকে সমস্যায় ফেলতে পারে স্কুলে ভর্তি হবার সময় তখন মনে হয়নি। প্রথম দিন ক্লাসে রোল কল হবার পর ক্লাসের অনেকে জানতে পারলো আমার নাম খবিরউদ্দিন। ফোর্থ পিরিওডের পর লাঞ্চ ব্রেকের সময় আমারই ক্লাসের কয়েকটা ছেলে আমাকে ঘিরে ধরলো। এদের একজন জিজ্ঞেশ করলো- হালার জানা, তর খবিসুদ্দি নামটা কেঠায় রাখছে?
আমি বললাম, খবিস না, আমার নাম খবিরউদ্দিন।
আব্বে হালায়, খবিস আর খবির এক কথাই!
শুনে আমার খুব মন খারাপ হয়ে গেলো।

[চলবে…]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. খুব ভাল লাগছে পড়তে।কিন্তু মনটা পড়ে রয়েছে সেই প্রথম পর্বের ট্রেনে !

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close