Home আত্মজীবনী ফরিদ কবির / আমার গল্প [৪]

ফরিদ কবির / আমার গল্প [৪]

প্রকাশঃ December 22, 2016

ফরিদ কবির / আমার গল্প [৪]
0
1

জিন্দাবাহার সেকেন্ড লেন

জিন্দাবাহার সেকেন্ড লেনে সাদুল্লাহ ওরফে সহিদ মিয়ার সংসার যে খুব সুখের ছিলো, তা না। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চাকরি। সামান্য বেতন। দুজনের সংসার চালানোই তার জন্য কষ্টকর। সেখানে পর পর চার চারটি সন্তানের জন্ম তাকে কিছুটা বিধ্বস্তই করে দেয়।
আমি ছিলাম মা-বাবার প্রথম সন্তান। পরে, আরও দুটি ছেলে সন্তানের জন্ম হলেও তারা অল্প বয়সেই মারা যায়। চার নম্বরে আসে শরিফ।
শুরু থেকেই দেখে আসছি আমাদের বেশ টানাটানিরই সংসার। সাদুল্লাহ, ওরফে সহিদ মিয়া, যাকে আমি আব্বুজি ডাকতাম, তিনি প্রতি মাসে বেতনের টাকা আম্মার হাতেই তুলে দিতেন। তুলে দিতেন মানে, দিতে বাধ্য হতেন। আম্মা সম্ভবত এরকমই নিয়ম করে দিয়েছিলেন। আব্বুজি পরে খুবই বেকায়দায় পড়তেন। তার নেশা বলতে ছিলো পান আর সিগারেট খাওয়া। সিজর্স সিগারেট খেতেন। দাম তেমন বেশি না। কিন্তু এই টাকা আসবে কোত্থেকে! তিনি ফের আম্মার কাছেই হাত পাততেন। আম্মা একবার-দুবার দিলেও তিনবারের সময়ই বেঁকে বসতেন।
বলতেন, সংসারই চলে না, তুমি বারবার সিগারেটের পসা চাইলে তো আমি দিবার পারমু না। তুমি অন্যভাবে এই পসা জোগাড়ের ধান্দা করো!
আব্বুজি জানতেন না, অন্য কীভাবে তিনি ওই ‘পসা’ জোগাড় করবেন!
ছুটির দিন আব্বুজি বাসায়ই কাটাতেন। কোথাও তেমন যেতেন না। আমি যখন কিছুটা বুঝতে শিখেছি, তখন থেকে আমিও চাইতাম না আব্বুজি বাসার বাইরে যান। গেলেই একটা না একটা কাণ্ড করতেন! বাসার বাইরে যাওয়া মানে, সকালে নাস্তা করে গলির মোড়ের চা-দোকানটাতে তিনি চা খেতেন আর, আড্ডা দিতেন। তারপর দুপুরে বা রাতে বলা নেই কওয়া নেই, কাউকে না কাউকে সঙ্গে নিয়ে ফিরতেন। আর আম্মাকে বলতেন, মিনু, খানা দেও।
এমন দিকদারিতে আম্মা খুবই বিরক্ত হতেন। হওয়াই স্বাভাবিক।
আম্মা তাকে ফিসফিস করে বলতেন, গরে কি পোলাও-গোস্ত রাইন্দা রাখছো যে তুমি লোকজন লয়া আইছ?
আব্বুজি নির্বিকারভাবে বলতেন, আচ্ছা, যা আছে তাই দেও।
আম্মা রাগে গরগর করতেন। তারপর যা আছে তাই বেড়ে দিতেন।
কখনো কখনো আব্বুজি দু-তিন জন লোক নিয়েও বাসায় ফিরতেন। আর, আম্মাকে বলতেন, মিনু খানা লাগাও। আব্বুজির সাথে যারা আসতেন, তাদের বেশিরভাগই দরিদ্র শ্রেণীর লোক। চায়ের দোকানে হয়তো আলাপ হয়েছে। খাওয়ার পয়সা নাই। তিনি হয়তো বলতেন, চলো ভাই, আমার বাড়িতে যা আছে ভাগযোগ কইরা খায়া লমুনে।
আব্বুজি বিনা নোটিশে বাসায় কাউকে নিয়ে ঢুকলেই আম্মা ভয়ানক ক্ষেপে যেতেন। ঘর থেকে আব্বুজিকে বাইরে ডেকে নিয়ে বলতেন, তুমি কি নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান! দুইজনের সংসারে তুমি তিনজন মানু লয়া ঢুকছ কোন আক্কেলে!

আব্বুজি ততোধিক ফিসফিস করে বলতেন, মিনু, আস্তে কও। অরা হুনলে বেজার অইবো।

ছুটির দিনে আব্বুজি বাড়ির বাইরে যেতে চাইলেই আম্মা রেগে যেতেন। বলতেন, বাড়িতেই বয়া থাকো। তোমার তো আক্কেল কম। ফিরার সময় তো আবার ফকিন্নি-ঝকিন্নি সব দইরা লয়া আইবা।
একটা সময় এমন ছিলো যে আব্বুজি বাড়ির বাইরে যেতেই পারতেন না। তখন অজুহাত খুঁজতেন। কখনো কখনো বলতেন, মিনু আমার তো বাইরে ইট্টু যাইতে অইবো। গরে তো পান নাইক্কা।

সত্যিকার অর্থে ঘরে সময় কাটানোর মতো কিছু আমাদের বাড়িতে ছিলোই না। না কোনো রেডিও, না অন্য কিছু। বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকায় সন্ধ্যার পরেই বাড়িটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে যেতো। ঘরে একটা হারিকেন জ্বালানো হতো। রাতে রান্নার সময় সেই হারিকেনটাই বারান্দায় ঝুলিয়ে দেয়া হতো। আব্বুজি তখন একটা মোড়া পেতে বারান্দায় বসে থাকতেন।

শরিফ একটু বড় হলে আম্মা একদিন বললেন, শরিফরেও হাম্মাদিয়ায় ভর্তি করায়া দেও। আব্বুজি বললেন, আচ্ছা, ঠিকাছে।
কিন্তু শরিফকে তিনি ভর্তি করালেন ফকির মোহাম্মদ ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে! ফিরে এসে বললেন, মিনু, ফকির মোহাম্মদ স্কুলটা কিন্তু বালাই। শরিফরে ওইখানেই ভর্তি করায়া দিলাম। তিনি আম্মার দেয়া ভর্তি ফি’র টাকা তাকে ফেরত দিয়ে দিলেন। আব্বুজি ভেবেছিলেন, টাকাটা বাঁচিয়ে দেয়ায় আম্মা খুবই খুশি হয়ে যাবেন। কিন্তু ঘটলো উল্টোটা!
আম্মা ক্ষেপে গিয়ে বললেন, তোমার কি দেমাগ খরাব অইছে। তুমি আমার পোলাটারে ফকিন্নি গো স্কুলে বর্তি করাইছ কেলা। তোমার মান-ইজ্জত না থাকবার পারে, আমার তো আছে।
আম্মাকে খুশি না হয়ে উল্টো ক্ষেপে যেতে দেখে আব্বুজি হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেন।

তখন পুরান ঢাকা জুড়েই আমার নানার পাঁচ ভাই ও তাদের ছেলেমেয়েরা থাকতো। কেউ জিন্দাবাহার, কেউ কলতাবাজার, কেউ বেগম বাজার। তারা সবাই নানা ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য করতো। হাতে তাদের কাঁচা পয়সা। আমার মায়ের প্রায় সব কাজিনেরই, মানে আমার প্রায় সব খালারই আম্মার তুলনায় ভালো বিয়ে হয়েছে! তাদের স্বামীরা ব্যবসা-বাণিজ্য করে। খালারা প্রতি মাসে নতুন নতুন সোনার গয়না কেনে, শাড়ি কেনে। ছেলেমেয়েদের ভালো ভালো স্কুলে পড়াতে পাঠায়। আমার বাবা সে তুলনায় হতদরিদ্র। তিনি একটা ইলেকটিক্যাল সামগ্রীর দোকানে খুবই ছোটখাট একটা চাকরি করেন। এ নিয়ে আম্মা মনে মনে কিছুটা হতাশ এবং ক্ষুব্ধ। আম্মা হয়তো মনে করতেন তার অনেক ভাল বিয়ে হতে পারতো। চাল-চুলাহীন একটা এতিম ছেলের কাছে তাকে গছিয়ে দেয়াটা হয়তো আম্মা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। হয়তো এসব কারণে তিনি সব সময়ই ক্ষুব্ধ থাকতেন। আমাদের আর্থিক অবস্থা যাই থাকুক, আম্মাকে কেউ ছোট ভাবুক সেটা তিনি চাইতেন না। আর এ কারণে, আত্মীয়-স্বজনের বিয়ে বা কোনো অনুষ্ঠানে আমার অন্য মামা-খালারা যে ধরনের উপঢৌকন দিতেন আম্মা প্রায় সেরকমই দেয়ার চেষ্টা করতেন। তিনি বুঝতে চাইতেন না যে আব্বুজির সেটা দেয়ার সামর্থ্য আদৌ আছে কি না! এ নিয়ে সব সময়ই ঝামেলা-ঝগড়া লেগে থাকতো। শরিফকে প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করানোর ফলে আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা আম্মাকে ‘ছোট নজরে’ দেখবেন এমন ধারণা থেকেই আম্মা এতে ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন।
আব্বুজি বললেন, আমার তো আর মায়না বাড়ে নাই। আমি ভাবলাম, আপাতত শরিফ এহেনেই পড়ুক। ওয়ানে উঠলে অরে ভি হাম্মাদিয়ায় দিয়া দিমুনি।
আম্মা রাগে গজগজ করতে থাকেন, আমি হইলাম পোড়া কপাইলা! আমি তুমারে উপরে উঠাইতে চাইলে কী অইবো। তুমার তো নজরটাই ফকিরা!
আব্বুজি জানেন, কথা বললেই কথা বাড়বে! তিনি চুপ করে রইলেন।
আব্বুজি আসলে বেশিরভাগ সময়ই চুপ করে থাকতেন। জীবনে আমি মাত্র দুবার আম্মার গায়ে হাত তুলতে দেখেছি। কী জানি কেন, আম্মা আর আব্বুজির মধ্যে ঝগড়া হলে আমি মনে মনে আব্বুুজিকে সমর্থন করতাম।
‘তোমার নজরটাই ফকিরা’- আম্মার মুখের এই সংলাপ আমাদেরকে প্রায় সারাজীবনই শুনতে হয়েছে। আব্বুজি এ ধরনের কথা শুনে মন খারাপ করে বসে থাকতেন। আমাদের তখন মনে হতো, আর যাই হোক এরপর তিনি এমন কাজ করবেন না যাতে আম্মা তাকে আবার এ ধরনের কথা বলেন। কিন্তু আব্বুজি পরের দিনই এটা ভুলে যেতেন।

আব্বুজি আসলে ছিলেন কিছুটা উদাসীন ধরনের। এমনিতে আম্মার কীসে রাগ বা অভিমান হবে তা নিয়ে তাকে খুব ভাবিত মনে হতো। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি এমন কাজ করে বসতেন যে আম্মা তাকে এ কথা শুনিয়ে দিতেন। আম্মা কোনো কিছু নিয়ে রাগ করে ফেললে আব্বুজি খুবই দুখি হয়ে যেতেন। একবার আম্মা রাগ করে না খেয়েই সারা রাত কাটিয়ে দিলেন। আব্বুজি তাকে অনেক মানানোর চেষ্টা করেও যখন ফেল মারলেন তখন নিজেও না খেয়ে শুয়ে পড়লেন।
আম্মার রাগ সহজে পড়তো না। কিন্তু আব্বুজি পরের দিনই আবার সাফ-সুতরো। আগের দিন যে অনেক হাঙ্গামা হয়েছে তাকে দেখে কেউ বুঝবেই না।

আমাদের পড়াশোনা নিয়েও আব্বুজির যে খুব আগ্রহ কিছু ছিলো তা কখনো বোঝা যেতো না। আব্বুজির সঙ্গে হয়তো বাজারে যাচ্ছি। রাস্তায় কেউ হয়তো তাকে জিজ্ঞেস করলো, ভাইজান, আপনের পোলা নিহি?
আব্বুজি বলতেন, হ।
কুন কেলাসে পড়ে?
আব্বুজি বলতেন, কেলাস থিরিতে।
আমি পাশ থেকে সেটা সংশোধন করে দিয়ে বলতাম, আব্বুজি, আমি তো কেলাস ফোরে পড়ি! এই বছরই তো ফোরে উঠলাম!
আব্বুজি সঙ্গে সঙ্গে সেটা সংশোধন করে নিয়ে বলতেন, ওহ হো! বুইলা গেছি। হ হ কেলাস ফোরে। কেলাস ফোরেই তো!
এমন ঘটনা একবার না, অসংখ্যবার হয়েছে! আব্বুজি মনেই রাখতেন না আমরা কখন কোন ক্লাসে পড়ি! তিনি কোন দুনিয়ায় থাকতেন কে জানে!

স্কুলে যাবার সময় আম্মা বা আব্বুজি আমাকে কোনো পয়সা-কড়ি দিতেন না। আম্মা কিছুটা রাগী টাইপের বলে আমি কখনোই তার কাছে কিছু চাইতাম না। আর, আব্বুজির কাছে চাইলে তিনি দিতেন না।
বলতেন, তর আম্মার কাছ থেইকা লয়া যা।
আম্মা সামনে থাকলে বলতেন, মিনু, ফরিদরে একটা-দুইটা পসা দিয়া দেও না কেলা! পোলাটা খালি হাতে স্কুলে যায়।
শুনেই আম্মা মুখ ঝামটা দিতেন! বলতেন, তুমি কি আমারে কোচড় ভইরা টেকা-পসা দিয়া রাখছ নিহি যে দিমু!
আমি আম্মার দিকে তাকালে তিনি বলতেন, তুই আবার খাড়ায়া রইছস কেলে গা? স্কুলে টিফিন দেয় না?
আমি মিনমিন করে বলি, দেয়।
আম্মা বলেন, তাইলে আবার পসা চাস কেলে গা?
আমি চুপচাপ স্কুলে চলে যেতাম!
আম্মা কেন সব সময় রেগে থাকতেন তার কারণ আমি অনেকদিন পর্যন্ত বুঝতে পারিনি। বোঝার কথাও না।

স্কুলেই আমাদের টিফিন দেয়া হতো। তা সত্ত্বেও প্রায় সবাই স্কুলের বাইরের খাবার কিনে খেতো। স্কুলের গেটের সামনেই নানা ধরনের খাবার পাওয়া যেতো! চটপটি, ফুসকা, আইসক্রিম, ঝালমুড়িসহ আরো কতো কী! আমার এসব কেনার সঙ্গতি ছিলো না। আমি তাই অধিকাংশ সময়ই ক্লাসরুমের বাইরে যেতাম না। স্কুলের দেয়া টিফিন খেয়ে পরের ক্লাসের জন্য অপেক্ষা করতাম। টিফিনের জন্য অবশ্য বেতনের সঙ্গে অতিরিক্ত আড়াই টাকা নেয়া হতো। ফোর্থ পিরিওডের পর ক্লাসের ক্যাপ্টেন টিফিন বিতরণ করতো। আমাদের ক্লাসের ফার্স্টবয় ও ক্যাপ্টেন ছিলো আলী মোহাম্মদ। ক্লাস নাইন পর্যন্ত সে-ই ছিলো ক্যাপ্টেন!

আলী মোহাম্মদ সাইনু পাহলোয়ানের ছেলে। সাইনু পাহলোয়ানের মোরগ পোলাও সে সময় ছিলো বিখ্যাত। অনেকে বলতো, চক বাজারে সাইনু মিয়া মোরগ পোলাও রান্না করলে তার ঘ্রাণ জিন্দাবাহারেও পাওয়া যায়! আমি ছোটবেলাতে এটা বুঝে ফেলেছিলাম, এটা যতোই লোভনীয় হোক, সাইনু পাহলোয়ানের মোরগ পোলাও খাওয়ার সৌভাগ্য নিয়ে আমি জন্মাইনি!

[চলবে…]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. পড়াশুনার সুবাদে প্রায় এক যুগ পুরোনো ঢাকায় কাটিয়েছি।চকবাজার,বেগমবাজার আর জিন্দাবাহার খুব আপন লাগছে।আব্বুজির পক্ষে চলে গেছি নিজের অজান্তে।বেশ লাগছে পড়তে।

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close