Home কবিতা ফারহানা রহমান / পাণ্ডুলিপির কবিতাগুচ্ছ ও কবিকথন

ফারহানা রহমান / পাণ্ডুলিপির কবিতাগুচ্ছ ও কবিকথন

প্রকাশঃ February 27, 2017

ফারহানা রহমান / পাণ্ডুলিপির কবিতাগুচ্ছ ও কবিকথন
0
0

ফারহানা রহমান / পাণ্ডুলিপির কবিতাগুচ্ছ ও কবিকথন

শূন্য আকাশ

যতদূরে আকাশের আলো দেখা যায়

হেঁটে গেছি সাগরের শয্যার কাছে

হৃদয়ের গায়ে যে উল্কি খোঁদাই করা ছিল

আগুনের ঝর্ণা সুরের লহরে

যা কিছু গোপন ছিল

কষ্টের বিস্মিত তীব্রতার মতো

একই সঙ্গে ঘৃণ্য এবং পবিত্র – একটা ট্যাবু

বৈকল্য জাগায় মনে । থাক !

তা দৃষ্টিসীমার বাইরেই থাক !

কালো গাউন পরে থাকবো আমি

কিছু রক্তাক্ত গোলাপ  গুঁজে দিও খোঁপায়

কিছু না হোক অন্তত

উরন্ত ছাই ভরে দিও একটি গবলেটে !

আরও একবার ,

মাত্র একবার

কিছু সাদা পায়রা উড়িয়ে দিও ঐ শূন্য আকাশে !

 

প্রাচীর

নুনের শিশির ভরা চোখ দুটোকে

রাতের গভীরতম হাহাকারও আলাদা করে চিনতে পারেনি কখনো

অনিশ্চয়তার ক্রান্তিকাল এভাবেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিলো ক্রমশ

তবু আমি তোমাকে বলিনি, –

গাছের শিকড়েও জমে ছিল কতটা সূর্যাস্তের বর্ণালী আভা

তুমি বুঝতে চাওনি আমার নীল নিঃসঙ্গতা, না বলা চিঠির ভাষা

ছায়ার মতো স্তব্ধ রাতে জেগে ওঠা

বিষণ্ণ বাতাসে অচেনা দ্বীপে ভেসে যাওয়া

কিছুই তোমাকে ছুঁয়ে যায়নি,

 

শুধু হ্রেষার শিস তুলেছিল যে বসন্তের বাতাস

তাকে আড়াল করে রেখেছো সাদা বরফের বিচ্ছিন্ন প্রাচীরে ।

 

স্বপ্নচারী

 

জলরাশি ছাড়ালেই সামনে আফ্রিকার বিষণ্ণ উপকূল

আন্দালুসিয়ার সোনালি বালুকাবেলা

নীল জামদানী আকাশের ক্যানভাসে নাক্ষত্রিক উপাচার

লাবণ্য ছড়ায়, ধু ধু প্রান্তর

রূপসী পানির ধারা শব্দস্রোতের মতো উজ্জ্বল,

বড় চেনা মনে হয় । যুগ যুগ ধরে পাথর ভেঙে চলে

নেশাতুর এক ধূসর শ্রমিক।

 

নিরুত্তাপ নদীর বুক চিরে নিবিড় বিচ্ছেদ তুলেছে যে পাহাড়,

তারই গা থেকে খুলে নেয় একটি একটি করে পাথর

এমারাল্ড, এমারাল্ড পেতে হবে তাকে !

ক্যালেন্ডারের শেষের তারিখের মতো নৈঃশব্দ্যে ঢেকে আছে

শেষ পাথরটি, পৃথিবীর সুন্দরতম এমারাল্ড ।

বহুবছরের রাগ-ক্ষোভ-ক্ষুধা, মেঘকালো আঁধার জমেছে

শ্রমিকের নিস্তরঙ্গ মনে

দৃষ্টি সীমানার বহুদূরে পাথরটি ছুড়ে মারে সে

হেঁটে যায় অজানার পথে।

 

জীবনের শুরুতেই মানুষ জেনে যায় তার লক্ষ্য তবু হাল ছেড়ে দেয় সে।

 

 

বেদনাপুরাণ

 

ঘুম ভাঙার পর বাসনাসিক্ত হয় রাত

ভোরের শিশিরে ম্লান হয় কোন এক জ্যোৎস্না

জলের প্রহরায় আঁটকে থাকে তার জলজ শরীর

প্রভাতের আলোয় দ্বিখণ্ডিত ঘোরের আবেশ

স্বচ্ছ জলের পিপেতে আজন্ম ডুবে আছে

মিথের পাপ ও পুণ্য –

রৌদ্রখরস্রোতের রুক্ষতায়

অসমাপ্ত সম্পর্কের মতো গভীর আলিঙ্গন অনুরাগে

অষ্টপ্রহর সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং

প্রেম প্রেম খেলা

অদ্ভুত মোহিত অভিনয়

 

প্রতিটি দিন মৃত্যু গাঁথা হয় রঙচটা দেয়ালে

বেদনাপুরাণ লেখা হয় শিলালিপির গায়ে ।

 

বন্ধুতা

 

হৃদয় রেণুতে মাখামাখি করে

মৌচাকে মধুময় চাক বাঁধে,

উলের গোলার মতো জড়ানো নিঃসঙ্গতা দিয়ে

সোজা উলটো বুনে বুনে

স্মৃতিকাতর একটি শাল বোনার নাম বন্ধুতা

 

প্রহসন 

 

সমুদ্রের পাড়ে নুড়ির উপর বসে আমি মৃতদের সাথে কানে কানে কথা বলি

দূরে কোথাও নৈঃশব্দ্যে হারিয়ে গেছে মানুষের পদধ্বনি

পাতার শিশিরে টলমল মৃত প্রেমিক যুগল

উদ্ভ্রান্তের মতো ঝাউবনে কানামাছি খেলে নতুন ও পুরাতন মৃত দম্পতি

মেঘের কৃষ্ণফেনিল আকাশ! অস্থির বাজপাখির চোখে বিভ্রান্তির অনল

কালের অতলে আলো-ছায়ায় নাচছে স্বপ্ন অবিরত, মৃত্যুর চূড়ায়

চুইয়ে পড়ে মৃত ইশারার যত প্রহসন

 

স্বপ্নজাল

 

আমি তো এঁকেছি – প্রচ্ছদে শুধু তোমারই মুখচ্ছবি

আমি তো লিখেছি – বইয়ের পাতায় দূর বনভূমি

আমি তো বলেছি – দিনান্তের স্রোতে মৌনতারই ভাষা

আমি তো দেখেছি – জল ছলকানো অনাব্য কত নদী

আমি তো গেয়েছি –  নির্দোষ সুরে বাউলের সরলতা

আমি তো বুনেছি – নীরব হাতে মিথ্যে স্বপ্নজাল;

আমি তো চেয়েছি – তোমার কাছে মুগ্ধ সমতট

তোমার ললাটে আঁকা ছিলো ক্ষুব্ধ পারাবত!

আমার চোখে জমে ছিলো অনন্য বিস্ময়

তোমার চোখে দেখেছিলাম শ্লথ ছায়ার ভয়।

 

কবিকথন : তীরন্দাজের প্রশ্নের উত্তরে ফারহানা রহমান

প্রশ্ন : কতদিন ধরে কবিতা/গল্প/গদ্য লিখছেন আপনি?

ফারহানা রহমান : ২০১৫ থেকে অর্থাৎ দুবছর হলো কবিতা লিখছি। সত্যি বোলতে কী কখনো ভাবিনি যে কবিতা লিখবো। তবে প্রায় ৩০/৩২ বছর আগে স্কুলে পড়ার সময় ক্লাস সেভেনে প্রথম আমি গল্প লেখা শুরু করি। এমনকি বাস্তব ঘটনা নিয়ে একটি উপন্যাসও লিখে ফেলেছিলাম। ডাইরিতে লিখেছিলাম সেগুলো এখনো রয়ে গেছে। এখন তো আর আমি গল্প লিখিনা তবে কিছু কিছু গদ্য লিখি সময় পেলে।

প্রশ্ন : এটা কি আপনার প্রথম বই? প্রথম বই না হলে এর আগের বইগুলির নাম বলুন। এবারের বইটার নাম কি?

ফারহানা রহমান : এটি আমার দ্বিতীয় বই। গতবছর অর্থাৎ ২০১৬ সালে আমার প্রথম বইটি বের হয়েছে। অবশ্য যৌথভাবে অন্য আরেকটি কবিতার বই বের হয়েছিলো অর্থাৎ গতবছর আমার দুটো কবিতার বই বের হয়েছিলো।  এবারের বইটির নাম “ অপেরার দিনলিপি”।

প্রশ্ন : আপনি তো এই সময়ের একজন কবি/গল্পকার/প্রাবন্ধিক। অনেকেই এখন ভালো লিখছেন। আপনার লেখালেখি তাদের তুলনায় কোন অর্থে আলাদা বলে আপনি মনে করেন – একটু ব্যাখ্যা করবেন কি?

ফারহানা রহমান : হ্যাঁ অনেকেই লিখছেন । আবার অনেকে সত্যি বেশ ভালোই লিখছেন। অনেকে ফিলোসফিক্যাল লেখা লিখছেন। তাদের লেখার মধ্যে জীবনবোধের গভীরতা খুঁজে পাই। আর সে লেখাগুলোই মনের মধ্যে দাগ কেটে যায়। তবে অনেকের লেখার ভিতর নানা শব্দের কোলাজ দেখতে পাই, অনেক চেষ্টা করেও অর্থ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে  পড়ে। তবে কোন-না-কোনভাবে তো প্রত্যেকের লেখাই আলাদা। দুজন আলাদা ব্যক্তি তো আর একই লেখা লিখতে পারেনা। আমি আমার মতো করে লিখি সে অর্থে তো আমার লেখা অন্যের থেকে আলাদা অবশ্যই। আমি জীবনকে যেভাবে দেখি বা যেভাবে অনুভব করি সেটাই লেখায় ফুটে ওঠে।

প্রশ্ন : আপনার নতুন বইয়ের বিষয়আশয় সম্পর্কে কিছু বলুন।

ফারহানা রহমান : আমার এই বইটির নাম হচ্ছে ‘অপেরার দিনলিপি’।  এখানে জীবনকেই আসলে অপেরার সাথে তুলনা করা হয়েছে। ওখানে যেমন প্রতিনিয়ত নানা ঘটনা ঘটে চলেছে। রয়েছে নানা শঙ্কা, বিষাদ। আমাদের জীবনও তো তাই। এই সময়ের যে বিষাদ আর শূন্যতা আমাদের ঘিরে আছে তারই প্রতিভাস হচ্ছে আমার কবিতা। আমার যাপিত জীবনের যে অনুভব সেটাই আমি মূলত কবিতায় লিখি।

প্রশ্ন : অনেকেই বলছেন, এখন প্রায় সবাই একই ধরনের কবিতা/গল্প লিখছেন। এ সম্পর্কে আপনার কী ধারণা – একটু বলুন।

ফারহানা রহমান : আসলে নির্দিষ্ট দশকের বা সময়ের একটি নিজস্ব সুর বা ধারা থাকে আর সেটা সব সময়ই ছিল। পঞ্চাশ বা ষাট দশকের কবিতার যে ধারা, দর্শন বা ট্রেন্ড যাই বলি না কেনো সেটা কিন্তু সত্তর দশকে বা স্বাধীনতার পরবর্তীতে বদলে গিয়েছিলো। প্রতিনিয়ত তো সমাজ বদলে চলেছে সেইসাথে বদলে যাচ্ছে মানুষের মানুষিক অবস্থা, তাদের জীবনবোধ, চাহিদা। তাই যারা যে সময়ের লেখক তাদের চিন্তা-চেতনার একটা প্রভাব লেখার মধ্যে পড়ে। তখন মনে হতে পারে তাদের লেখার ধরনও এক। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের যে চাহিদা বা প্রভাব থাকে সেটাই আসলে সে সময়কার লেখকদের লেখায় ফুটে ওঠে। তবে এরমাঝেও লেখার বিষয়ের পার্থক্য তো থাকেই আর থাকে ভাবনার আর জীবনবোধের পার্থক্য। আসলে কারো পক্ষেই একেবারে হুবহু অন্যের মতো করে লেখা তো সম্ভব নয়। সেখানে কিছুটা পার্থক্য থাকবেই।  সেই অর্থে আমার বইটাও হয়তো আদালা – পাঠকই দেখবেন সেটা।

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close