Home চলচ্চিত্র ফাল্গুনী তানিয়া > হালদা : নদী ও নারীর কথকতা >> চলচ্চিত্র

ফাল্গুনী তানিয়া > হালদা : নদী ও নারীর কথকতা >> চলচ্চিত্র

প্রকাশঃ December 16, 2017

ফাল্গুনী তানিয়া > হালদা : নদী ও নারীর কথকতা >> চলচ্চিত্র
0
0

ফাল্গুনী তানিয়া > হালদা : নদী ও নারীর কথকতা >> চলচ্চিত্র

 

“নিখুঁতভাবে নির্মিত এই সিনেমাটিতে কিছু প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে। তাই ব্যক্তিস্বার্থে যে হালদাকে জাহিদ হাসান নিষ্ফলা করে ফেলছে সেই জাহিদ হাসান নিজেই এক অনুর্বর পুরুষ বা জমি। কিন্তু নারী হাসু অর্থাৎ নুসরাত ইমরোজ তিশা কেন ফসলহীন হয়ে রইবে। হালদার মা-মাছের মতো তার অন্তরেও তীব্র আর্তনাদ- ভালোবাসার ঘর পায়নি কিন্তু ভেবেছিল নিজের সন্তান দিয়ে সে ঘর ভরে তুলবে। বাজা নারীর অপবাদ থেকে বের হয়ে এসেছে হাসু ওরফে তিশা, কিন্তু নিজের স্বামীর কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থেকেছে এই সন্তানের পিতৃপরিচয় নিয়ে। মা-মাছ মারা পাপ, কিন্তু গর্ভবতী হাসু স্বামীর শারীরিক প্রহার থেকে নিষ্কৃতি পায় না। তাকে রক্ষা করে তার শ্বাশুড়ি। এক নারীর গর্ভ রক্ষা করতে এগিয়ে আসে অন্য নারী, কারণ বংশরক্ষা।”

হালদা দেখে বের হচ্ছি, একজন দর্শকের মন্তব্য, দেখছেন মেয়ে মানুষের অবস্থা! মেয়ে মানুষ কী করে। মেয়ে মানুষ সভ্যতা টিকিয়ে রাখে।
তৌকির আহমেদ যখন বলেন, বাংলাদেশের কোনো ছবিতে তিনি ড্রয়িং রুম দেখতে চান না তখন তাঁর উদ্দেশ্যটি তিনি সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের একমাত্র মৎস প্রজননকেন্দ্রিক নদী হালদাকে তাঁর চলচ্চিত্রের উপজীব্য করেছেন। এই নদী বছরে ৮০০ কোটি টাকার উপরে মৎস উৎপাদন করে। ৬৫ লক্ষ মানুষের পানি সরবরাহ করে এই নদী। এই ৬৫ লক্ষ মানুষের জীবন আর জীবিকা হালদা নদীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই হালদা সিনেমাটিতে তৎসংশ্লিষ্ট জনজীবনের যে আর্তনাদ তা প্রতিটি দর্শককে ছুঁয়ে যাবে। এই চলচ্চিত্রের সবাই অভিনয়ে পারদর্শী। তবে সহজভাবে চট্টগ্রামের কঠিন বুলি আওড়ানো নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। পরিচালকসহ প্রতিটি অভিনেতার কঠিন পরিশ্রমের ফসল হালদা।
পরিচালক হালদা নদীকে বাঁচাতে চেয়েছেন পরিবেশের অস্বাস্থ্যকর দিকগুলো থেকে। এই দিকগুলো হলো ইটভাটার কালো ধোঁয়া ও কলকারখানার দূষিত বর্জ্য যা হালদা নদীর উপর প্রভাব ফেলছে। নদী মাছের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, মা-মাছ পর্যাপ্ত ডিম দিতে পারছে না। অর্থাৎ মা-মাছ ক্রমশ নিস্ফলা হয়ে পড়ছে। খুব স্বাভাবিকভাবে হালদাকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে তাদের পেশা থেকে। তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে অদ্বৈত মল্লবর্মণ জেলে সম্প্রদায়ের দুঃখের পিছনে প্রাকৃতিক কারণ দেখিয়েছিলেন কিন্তু হালদা নদীর দুঃখের প্রতিটি দিক মনুষ্যসৃষ্ট।
নিখুঁতভাবে নির্মিত এই সিনেমাটিতে কিছু প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে। তাই ব্যক্তিস্বার্থে যে হালদাকে জাহিদ হাসান নিষ্ফলা করে ফেলছে সেই জাহিদ হাসান নিজেই এক অনুর্বর পুরুষ। কিন্তু নারী হাসু অর্থাৎ নুসরাত ইমরোজ তিশা কেন সন্তানহীন হয়ে ফসলহীন থাকবে? হালদার মা-মাছের মতো তার অন্তরেও তীব্র আর্তনাদ- ভালোবাসার ঘর পায়নি কিন্তু ভেবেছিল নিজের সন্তান দিয়ে সে ঘর ভরে তুলবে। বাজা নারীর অপবাদ থেকে বের হয়ে এসেছে হাসু ওরফে তিশা, কিন্তু নিজের স্বামীর কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থেকেছে এই সন্তানের পিতৃপরিচয় নিয়ে। মা-মাছ মারা পাপ, কিন্তু গর্ভবতী হাসু স্বামীর শারীরিক প্রহার থেকে নিষ্কৃতি পায় না। তাকে রক্ষা করে তার শ্বাশুড়ি। এক নারীর গর্ভ রক্ষা করতে এগিয়ে আসে অন্য নারী, কারণ বংশরক্ষা।
আরেক নারীর প্রতিহিংসাও দেখি আমরা। ১৭ বছরের বিবাহিত জীবনে জাহিদ হাসানের প্রথম স্ত্রী মা হতে পারেনি। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই সংসারের কর্তৃত্বের লড়াইয়ে রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু সব লড়াইয়ের ঊর্ধ্বে তৃষার লড়াই, নিজের সন্তানকে টিকিয়ে রাখার লড়াই। সেখানে মা-মাছ আর মা তৃষা যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বদির সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া, সতীন ও গৃহ পরিচারিকাকে বিদায় করা এমনকি নিজের স্বামীকে হত্যা করা- সবই মূলত যে-কোন মূল্যে তার সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার তৃষ্ণা। কারণ একটিই। স্বামী কিংবা সতীনের প্রশ্নে হাসু দৃঢ় কণ্ঠে বলেছে, এই সন্তান তার নিজের। নদী আর নারী এভাবেই এক হয়ে যায়, হাসু গর্ভে সন্তান ধারণ করে মা-মাছ ধারণ করে ডিম, মা-মাছ তার প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ পায় না, হাসুও না, তবু তারা সংগ্রাম করে। পাশে কেউ না থাকলেও সেই সংগ্রামকে অনিবার্য ধারাবাহিকতায় এগিয়ে নিতে হয়। কারণ হাসু সুরত বানুর মতো কারো বৌ, কারো বৌমা, কারো মা হতে চায় না, সে হাসু একজন নারী যে সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখে, ধারণ করে, লালন করে।
তৌকির আহমেদ সিনেমা জগতে আমাদের প্রত্যাশা আরো বাড়িয়ে দিলেন এই ছবির মধ্য দিয়ে আরেকবার। একটি স্বপ্ন বার বার ফিরে আসে, মা-মাছ মারার স্বপ্ন। যার সঙ্গে হালদা নদী সংশ্লিষ্ট নিজস্ব সাংস্কৃতিক বোধ জড়িত। মা-মাছ তাদের জীবন ও জীবীকার উৎস। তবু অভাবের তাড়নায় এই মা মাছ তারা হত্যা করে। পদ্মা নদীর মাঝির কুবের আর হালদার হাসুর বাবা কিংবা নিরঞ্জন মূলত পেটের ক্ষুধার দাসত্ব করে। মাথা উঁচু করে বাঁচার স্বপ্ন তবু থাকে। কন্যা জামাতার ৫ হাজার টাকা না নিয়ে জমি বিক্রি করে কিংবা গাছ কেটে ট্রলার বানিয়ে সাগর পাড়ি দেবার চিন্তা মূলত সেই সংগ্রামের পরম্পরা, যেখানে ব্যক্তি ক্ষুধার কাছে পরাজিত কিন্তু আত্মসম্মান বিকিয়ে দিতে রাজি নয়।
দৃশ্য চিত্রায়নে ভোর আর গোধূলীলগন মুগ্ধতা এনে দিয়েছে বারবার। কয়েকটি সংলাপ মনের মধ্যে গেঁথে যাবে প্রতিটি দর্শকের-
“বড়লোকেরা গরীব ঘর থেকে বউ আনে ক্যান জানো? বউ রূপে হবে রূপবতী আর কাজে হবে দাসীবাদী।”
“সুরত বানু, আমার নাম সুরত বানু, সুরত বানু বলে ডাকো একবার।”
“পানির এক নাম জীবন, পানির আর এক নাম মরণ।”
“সাগর ফেলে আসলে সাগরের কথা মনে পড়ে, নদী ফেলে আসলে নদীর কথা মনে পড়ে, আর মানুষ…”
পুরো সিনেমাটিতে মোশাররফ করিম ওরফে বদির সংলাপ খুব কম কিন্তু অনুভূতি আর আবেগগুলোকে মুখের ও শরীরের প্রতিটি রেখায় এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি যা এককথায় অতুলনীয় ও অনির্বচনীয়। পরিচালককে অসংখ্য ধন্যবাদ বৃষ্টির দৃশ্যগুলোর জন্য। মনে হয়েছে তিনি বৃষ্টির জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা করেছেন। কয়েকটি ক্ষেত্রে সরাসরি দৃশ্যগুলো না দেখিয়ে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে- যেমন হাসুর উপর শারীরিক নির্যাতন, বদিকে প্রহার করা কিংবা শেষ দৃশ্যের খুনটি উৎকৃষ্ট সিনেমাটোগ্রাফীর নিদর্শন। বাংলা চলচ্চিত্র কুশলী নির্মাতার হাতে আরো বেশি দর্শকনন্দিত হবে এটাই চাওয়া। তৌকির সেই আশা আরও বাড়িয়ে দিলেন। এই মেধাবী মুভিটার জন্য তার কাজ বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাকে অভিনন্দিত করি আর যারা ছবিটি দেখেননি তারা দেখে আসুন। বোধ আর শিল্পের চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে মুভিটিতে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close