Home চলচ্চিত্র ফাহমিদুল হক / কতদূর বাজিমাৎ করলো আয়নাবাজি

ফাহমিদুল হক / কতদূর বাজিমাৎ করলো আয়নাবাজি

প্রকাশঃ January 4, 2017

ফাহমিদুল হক / কতদূর বাজিমাৎ করলো আয়নাবাজি
0
0

ফাহমিদুল হক / কতদূর বাজিমাৎ করলো আয়নাবাজি

আয়নাবাজি ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। ‘রূপবান’ (১৯৬৫), ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ (১৯৮৯) ও ‘মনপুরা’র (২০০৯) পর ‘আয়নাবাজি’ (২০১৬) সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র হিসেবে ইতোমধ্যেই ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। চারটি চলচ্চিত্রের মধ্যে তিনটিই লোকজ বা গ্রামীণ কাহিনি, কেবল আয়নাবাজি ঢাকা শহরের কাহিনি। শহরের কাহিনী হিসেবে আয়নাবাজির এই প্রতিনিধিত্ব যথাযথই হয়েছে, কারণ আবহমান গ্রামীণ বাংলার পাশাপাশি গত কয়েক দশক ধরেই সম্প্রসারণশীল শহুরে বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বাংলাদেশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে রয়েছে। কিন্তু শিল্পমাধ্যমগুলোয় শহুরে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত চিত্রায়ণ খুব কমই দেখা যেত।

রূপবান ও বেদের মেয়ে জোসনা নির্মাণ করেছিলেন যথাক্রমে সালাহউদ্দিন ও তোজাম্মেল হক বকুল যারা বাংলাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্র কারখানার প্রতিনিধি। কিন্তু মনপুরা ও আয়নাবাজির পরিচালক ঠিক চলচ্চিত্র কারখানার ভেতরের লোক নন, তাদের স্বাধীনধারার নির্মাতা বলতে হবে। আয়নাবাজির মধ্য দিয়ে এই ইঙ্গিতও সম্ভবত চূড়ান্ত হয়েছে যে – বাংলাদেশের চলচ্চিত্র কারখানায় সাম্প্রতিক সময়ে মেধাশূন্যতা চলছে, আর নানান অর্জনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন ধারার নির্মাতারাই বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্রের অবয়ব নির্মাণের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন।

আয়নাবাজি ক্রাইম থ্রিলার ধরনের চলচ্চিত্র। যুবক শারাফাত করিম আয়না নানান সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীর বদলী হিসেবে জেল খেটে অর্থ উপার্জন করে। ক্যান্সারাক্রান্ত মায়ের চিকিৎসার জন্য প্রচুর অর্থ প্রয়োজন তাই সে এই পেশায় জড়িয়ে পড়ে কারণ এর মাধ্যমে একসাথে অনেক অর্থ পাওয়া যায়। কিন্তু একবার জেল থেকে মুক্তি দীর্ঘসূত্রিতায় পড়ে যায়, ফিরে এসে দেখে তার মা মারা গেছে। মার মৃত্যু আয়নাকে বিপর্যস্ত করে, কিছুটা বিকারগ্রস্ত করে, ফোনে মৃত মার সাথে কথা বলে, অন্যের কাছে কুষ্টিয়াতে থাকা মার গল্প বলে মনস্তাত্ত্বিক কমপ্লেক্সে ভোগা আয়না মাকে বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু মাকে সত্যি সত্যি বাঁচানোর জন্য যে পেশা সে শুরু করেছিল, তা মার মৃত্যুর পরও চালিয়ে যায়। যাত্রা অভিনেত্রী মার কাছ থেকে শেখা অভিনয়ের বরাতে সে সহজেই অন্যের চরিত্রে ঢুকে পড়ে এবং এভাবে সাজাপ্রাপ্ত আসামীর অভিনয় করাটা তার জন্য সহজ হয়ে ওঠে। সে সেই সাজাপ্রাপ্তর সঙ্গে দেখা করে, কথা বলে এবং তার কিছু ম্যানারিজম রপ্ত করে এবং এভাবে সে অন্যের জীবন যাপন করতে থাকে জেলে। অন্যের চরিত্রে অভিনয় করাটা সে উপভোগও করে। তার অবশ্য অন্য একটা কাজ রয়েছে, বাচ্চাদের অভিনয় শেখানোর একটা ছোট স্কুল চালায় সে। আর জেলে থাকাকালীন তার অনুপস্থিতিকে সে আড়াল করে কল্পিত অন্য একটি পেশার কথা বলে – বিদেশের জাহাজে সে পাচকের কাজ করে।

চলচ্চিত্র শুরু হয় কুদ্দুস নামের এক মন্দ লোকের কাহিনী দিয়ে যার সাজা হয়েছে এক নারীকে নির্যাতনের করার কারণে। অভিযুক্ত কুদ্দুস জেলের বাইরে থাকে এবং আয়না জেলের ভেতরে যায়। এই ঘটনাটি নিয়ে রিপোর্ট করতে গিয়ে গিয়ে ধর্ষণের শিকার মেয়েটির কাছ থেকে ক্রাইম রিপোর্টার সাবের জানতে পারে যে কুদ্দুস জেলে নেই, সে নিজে এসে মেয়েটিকে দেখা দিয়ে গেছে। চলচ্চিত্রে দেখা যায় আয়না কুদ্দুস ছাড়াও হত্যার দায়ে অভিযুক্ত এক অটিস্টিক তরুণের এবং এক রাজনীতিবিদ নিজাম সাঈদ চৌধুরীর বদলী হিসেবে জেল খাটছে। শেষের কাজটি আয়না করতে চায় নি, কারণ পাড়ায় নতুন আসা এক পরিবারের মেয়ে হৃদির সঙ্গে তার প্রণয় হয় এবং আয়না জীবনকে নতুনভাবে দেখতে চায়। কিন্তু রাজনীতিবিদ নিজামের গুণ্ডারা আয়নাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এই কাজটি করতে গিয়ে পরিকল্পনার বাইরে একটি ঘটনা ঘটে, রাজনীতিবিদের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। আয়নার জীবনের করুণ সমাপ্তির পরিস্থিতি তৈরি হয়। সাবের পুরো অনুসন্ধান শেষ করে তার পত্রিকায় ছাপতে চায়, অন্তত একজন নিরপরাধ মানুষ যে ফাঁসির সম্মুখীন হয়েছে, তা সবাইকে জানাতে চায়। কিন্তু পত্রিকার সম্পাদক এই কাহিনি ছাপলে চাকরি চলে যাবে, এই অজুহাতে সাবেরকে নিবৃত্ত করেন। তবে কনডেম সেলে আটকা আয়না প্রহরী লাবুকে পরস্পরের ভূমিকা বদলে অভিনয় করতে প্রভাবিত করতে সমর্থ হয়, লাবুর বেশে আয়না জেল থেকে পালিয়ে আসে। আসামী পালানোর খবরে চারিদিকে তোলপাড় হলে, পুলিশ প্রকৃত আসামী রাজনীতিবিদ নিজামকে গ্রেফতারের তোড়জোড় করতে থাকে। চলচ্চিত্রের শেষে দেখা যায় আয়না আর হৃদি একত্রে তাদের শিক্ষার্থীদের মঞ্চের পারফরমেন্স দেখছে।

আয়নাবাজি জনপ্রিয় হয়েছে, আয়নাবাজি জনপ্রিয় হতে চেয়েছেও। লম্পট ব্যবসায়ী কিংবা কুটিল রাজনীতিবিদ অর্থের জোরে অপরাধ করে যেতেই থাকে এবং মাতৃপ্রেমী ও গরিব আয়নার মতো সাধারণ যুবকদের ব্যবহার করে তারা অপরাধ থেকে উৎরে যেতে থাকে – এরকম কিছু সামাজিক বাস্তবতা কায়ক্লেশে চলচ্চিত্রে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। নয়তো একরকম বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্র আয়নাবাজি। জ্যঁর হিসেবে ক্রাইম থ্রিলারকে বেছে নেয়া, কমিক দৃশ্য ও সংলাপ, প্রলম্বিত প্রেমের সিকোয়েন্স, ফর্মুলার মতো করে গানের ব্যবহার, এমনকি যৌনতার ব্যবহার (কুদ্দুসের সংলাপে পুরুষাঙ্গকে বাঘ ও নারীদেহকে কচি হরিণের মাংস হিসেবে তুলনা কিংবা বারের দৃশ্যে নারীর দেহাবয়বকে স্লো মোশনে ধারণ) – এসবই বিনোদনের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত। প্রশ্ন তোলা যেতে পারে চলচ্চিত্রের মতো ব্যয়বহুল মাধ্যমে কমিটমেন্টবিহীন বিনোদনধর্মিতা কতটুকু গ্রহণীয় হতে পারে? অন্তত অমিতাভ রেজা চৌধুরীর মতো নির্মাতা যিনি টেলিভিশনে ‘হাওয়াঘর’-এর মতো শৈল্পিক টেলিছবি নির্মাণ করেছেন, তিনি যদি চলচ্চিত্রে এসে ফর্মুলায় নিজেকে সঁপে দেন, তবে তা আমাদের চিন্তিত করে তোলে। টেলিভিশনের বিভিন্ন কাজে আশাজাগানিয়া মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও অনিমেষ আইচের প্রথম চলচ্চিত্রের (ব্যাচেলর/জিরো ডিগ্রি) ক্ষেত্রেও এমন ঘটেছিল। ফারুকী যেমন তার শেষ তিনটি চলচ্চিত্রে (থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার, টেলিভিশন, পিঁপড়াবিদ্যা) প্রতিশ্রুতি রক্ষার স্বাক্ষর রেখেছেন, অমিতাভ রেজারাও পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলোতে তাই করবেন, এই আশাবাদ এই সুবাদে ব্যক্ত করে রাখতে চাই। আমাদের এটাও বিবেচনায় আছে যে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র কারখানা এখনও প্রাণহীন হয়ে ধুঁকছে এবং প্রেক্ষাগৃহবিমুখ দর্শকের পাতে এমন খাদ্য সম্ভবত তুলে দেয়া দরকার যা আকর্ষণীয় ও মসলাদার। নয়তো কোটি টাকার বিনিয়োগ ক্ষতির মুখ দেখবে। আয়নাবাজি সেই জায়গায় সফল। আয়নাবাজির সফলতার আরেকটি কারণ হলো এর বিপণন কৌশল। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিপণন সংস্থা গ্রে-র লোকজন এই চলচ্চিত্রের প্রযোজনায় যুক্ত, ফলে চলচ্চিত্রটির ব্যাপারে একটা হাইপ তৈরি করা গেছে। কিছুটা উদ্ভট গল্পকে দর্শককে বিশ্বাস করিয়ে তোলা পরিচালকের কৃতিত্ব, তাই অন্যান্য নির্মাতার জন্য আয়নাবাজি একটি শিক্ষণীয় প্রকল্প। নতুন বাস্তবতায় চলচ্চিত্রের বিপণন কীভাবে করতে হয়, তার শিক্ষাও অন্যরা এখান থেকে নিতে পারেন।

কাহিনির উদ্ভটত্বের কথা ইতোমধ্যেই বলা হয়ে গেছে, এবার সেদিকে আলোকপাত করতে হয়। যোগ করে বলা যায়, চিত্রনাট্যেও আছে অসঙ্গতি। ধরা যাক, কুদ্দুসের বদলে আয়না জেল খাটছে। কুদ্দুস স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। পুলিশ এই খবর জানে না, কিন্তু কুদ্দুস পাবলিক প্লেসে ঘুরে বেড়াচ্ছে, বারে-ছাদে পার্টি করছে। ধর্ষিত মেয়েটির কাছে এসে দেখা দিয়ে উপহাস করছে। তার এই জীবনযাপন কারও নজরে আসবে না? চলমান মামলায় এই বিষয়টি তুলবে না ভিকটিমের আইনজীবী? নিজাম সাঈদ চৌধুরী এপিসোডের ক্ষেত্রেও ঝামেলা আছে। হত্যা মামলার আসামি তিনি বাইরে থাকবেন, আয়না থাকবে জেলের ভেতরে, সেসময়টায় তিনি পার্শবর্তী দেশে থাকবেন। মামলায় নিরপরাধ প্রমাণ হলে তিনি আবার দৃশ্যপটে আসবেন। কিন্তু রায়ে তার মৃত্যুদণ্ড হয়, তার সোর্স দিয়ে তিনি মৃত্যুদণ্ড ঠেকাতে পারেন না এমনকি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাকে ঝুলিয়ে দিতেও পারেন না। শেষে দেখা যায় তিনি ফোনে কাউকে বলছেন, ‘তাহলে দাও ফাঁসি দিয়ে দাও’ বা এরকম কিছু। পরে স্বাভাবিকভাবে বিলিয়ার্ড খেলতে থাকেন তিনি। যদি ধরেও নেই যে তিনি ভারতে আছেন, কিন্তু ভেতরের নকল নিজামের ফাঁসি হলে বাইরের প্রকৃত নিজামের আর অস্তিত্ব থাকে না। সেক্ষেত্রে তাকে প্রতিবেশি দেশেই চিরকাল বাস করতে হবে, তার এতদিনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার, স্বাভাবিক জীবনযাপন সবই বাতিল হয়ে যাবে। এক অর্থে নকল নিজামের ফাঁসি মানে আসল নিজামেরও মৃত্যু। কিন্তু ফাঁসির বিষয়টি চূড়ান্ত বোঝার পরেও তার মধ্যে কোনো ভাবান্তর লক্ষ করা যায় না। অন্যদিকে নকল নিজাম বেরিয়ে আসলে, তৎপর পুলিশ এটা ধরে নেয় যে আসল নিজাম পালিয়েছে। নিজামের সাঙ্গপাঙ্গকে মেরেধরে পুলিশ জানতে পারে যে, নিজাম দেশেই কোনো এক গলির কোনো এক বাড়িতে আছে। এভাবে নিজামের এপিসোডটি গোলমেলে হয়ে ওঠে। মোট কথা, আসামীর বদলির ফলে আসল অপরাধীর চলাফেরা সীমিত হয়ে পড়তেই হবে, অন্তত যতদিন না মামলার রায় তার পক্ষে আসছে, ততদিন পর্যন্ত। কিন্তু চলচ্চিত্রে তেমনটি দেখা যায় না। আবার আসল নকলের বদলির যে তিনটি দৃশ্য বা কায়দা দেখানো হয়েছে তাও খুব বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।

তারপরও আয়নাবাজি দর্শককে টেনে রাখে তার অন্যান্য গুণের কারণে। রাশেদ জামানের কুশলী ক্যামেরা দর্শককে মুগ্ধ করে এবং ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের থ্রিলিং আবহসঙ্গীত দর্শককে দীপিত করে। বাস্তবতার ঘাটতি খুঁটিনাটি ডিটেইল দিয়ে পূরণ করে দর্শকের কাছে ‘মেক-বিলিভ’ আকারে হাজির করা হয়েছে। যেমন কুদ্দুসের বদলের বিষয়টি – যেভাবে আয়না কুদ্দুসের ম্যানারিজমগুলো রপ্ত করে, যেভাবে মেক-আপ উপকরণগুলো সরবরাহ করা হয় এবং যেভাবে পুলিশ ভ্যান ও প্রাইভেট কার থেকে কুদ্দুস ও আয়না নামে ও অদল-বদলের ঘটনাটি ঘটে। দুয়েকটি ক্ষেত্রে অবশ্য পরিচালক ভুল এড়াতে পারেন নি। যেমন, একটি দুর্দান্ত ডিটেইল হলো প্রতিবার জেল থেকে ফেরার পর আয়নার গোসলের দৃশ্য দেখানো হয়। রূপকটিকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় – জীবনের ক্লেদাক্ত অংশটি ভুলে আয়না পরিশুদ্ধ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরে, বা এর মধ্যে রূপান্তরিতে চরিত্রটি আয়নায় ফিরে আসে। কিন্তু অটিস্টিক তরুণের বদলির পর গোসলের সময় দেখা যায় আয়নার চুলের দৈর্ঘ্য অন্য সময়ের মতোই স্বাভাবিক। অথচ তরুণটি সবসময় ছোট চুলে থাকে। জেলেও তার সেরকমই থাকার কথা বা তাকে যতক্ষণ জেলে দেখানো হয়েছে, তাকে ছোট চুলেই দেখা যায়। ফলে হয় তাকে গোসলের সময় ছোট চুলে দেখানো উচিত ছিল অথবা জেলের মধ্যে চুল বড় হয়ে যাবার একটা রেফারেন্স থাকা উচিত ছিল।

রাজনীতিবিদ নিজামের চরিত্রটি স্খলিত বামপন্থী নেতার। তিনি গুণ্ডা পোষেণ, প্রয়োজনে মানুষ হত্যা করেন আবার আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে আয়নাকে ব্যবহার করে আইন-আদালতের ধরাছোঁয়ার ঊর্ধ্বে থাকতে চান। বামপন্থী অভিজ্ঞতা থাকার কারণেই তিনি মার্কস-লেনিন আওড়ান। কিন্তু একি করলেন চিত্রনাট্যকার গাওসুল আজম শাওন ও অনম বিশ্বাস? আয়নাকে ধরে আনার পরে তাকে বলতে শোনা গেল, রাজনীতির প্রয়োজনে হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছেন সবাই – হিটলার, মুসোলিনী ও লেনিন। হিটলার ও মুসোলিনীর সঙ্গে লেনিন কিভাবে যায়? প্রথম দু’জন ফ্যাসিস্ট নেতা, হত্যাকাণ্ড তাদের নেতৃত্বের ধরনের অন্তর্গত। এদের সঙ্গে মহান বিপ্লবী লেনিনকে কিভাবে উল্লেখ করেন কেউ, যতই তিনি পথভ্রষ্ট হননা কেন? স্ট্যালিনকে উল্লেখ করলে তাও মানা যেত! মার্কসীয় দ্বান্দ্বিকতার উল্লেখ করেও নিজাম অনিচ্ছুক আয়নাকে রাজি করানোর চেষ্টা করেন, যে প্রেমিকার কাছে যাবে, না প্রচুর অর্থ উপার্জনের উপায় হিসেবে নিজামের প্রস্তাবে রাজি হবে – আয়নার এই দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতিতে মার্কস কিভাবে প্রাসঙ্গিক তাও বোঝা গেল না।

এদেশের শিল্পপ্রয়াসী চলচ্চিত্রকাররা শহরে বাস করেন কিন্তু নির্মাণ করেন গ্রামের চলচ্চিত্র। কিন্তু প্রতিশ্রুতিবান চলচ্চিত্রকার অমিতাভ রেজা সেপথে হাঁটেন নি। যে ঢাকা আমরা এই চলচ্চিত্রে দেখি, তা আমাদের চেনা ঢাকা, কিন্তু এতদিন তা যেন অনাবিষ্কৃতই ছিল। ফলে দর্শকের তা ভালো লেগেছে, কিছুটা অচেনা ও অদ্ভূতুড়ে কাহিনি হলেও, পরিবেশের বিশ্বস্ত নির্মাণে চলচ্চিত্রটি দর্শক পছন্দ করে ফেলেছে। তবে এই চলচ্চিত্র শহরের গল্প বলতে চায়নি, যেমন বলা হয়েছে রুবাইয়াত হোসেনের ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ চলচ্চিত্রে। শহর এখানে চরিত্র হয়ে ওঠেনি, এখানে বরং ব্যক্তি আয়নার গল্পই মুখ্য। কিন্তু আয়না যেসব অঞ্চলে চলাফেরা করে, সেই পুরনো ঢাকাকে পরিচালক তুলে এনেছেন। এর মধ্যে রয়েছে আয়নার চিলেকোঠার হাওয়াঘর, পুরনো ঢাকার অপরিসর জনাকীর্ণ গলি-দোকানপাট, বুড়িগঙ্গা নদী এবং নদীতে ভাসমান বিচিত্র জলযান, লালবাগ কেল্লা ইত্যাদি অনেক কিছুই আয়নাবাজিতে উঠে এসেছে। আবার সাবের, কুদ্দুস এবং অন্যান্য চরিত্রের সূত্র ধরে শহরের অন্যান্য অংশও দেখা গেছে চলচ্চিত্রে – হাতির ঝিল, ফ্লাইওভার, রাস্তাঘাট, যানবাহন ইত্যাদি। অনেক ক্ষেত্রে চরিত্রের সংশ্লিষ্টতার বাইরেও শহরের নানান দৃশ্যপট যেমন বৃষ্টিভেজা রাজপথ বা নদীর দৃশ্য জুড়ে দেয়া হয়েছে। ঢাকার চলচ্চিত্রে ঢাকা অনুপস্থিত – এই অভিযোগ কিছুটা ঘোচাবে আয়নাবাজি।

আয়নাবাজি সফল হতে পারতো না চঞ্চল চৌধুরীর দুর্দান্ত অভিনয় ছাড়া। চঞ্চল চৌধুরী অন্যতম শীর্ষ জনপ্রিয় চলচ্চিত্র মনপুরারও অভিনেতা, সেখানে তিনি উৎরে গেছেন। কিন্তু আয়নাবাজি দেখতে দেখতে আমাদের মনে হয় তিনিই চলচ্চিত্রকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। আয়নার চরিত্র, বদলিসমূহের চরিত্র – সবমিলিয়ে ছয়টি চরিত্রে তাকে দেখা গেছে এবং ছয়টি চরিত্রেই তিনি আলাদা আলাদাভাবে বিশিষ্ট হয়েছেন। চঞ্চল চৌধুরী ও মোশাররফ করিম প্রায় একই সময়ে টেলিভিশন কারখানার নির্ভরযোগ্য ও জনপ্রিয় অভিনেতা হয়ে উঠেছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মোশাররফ করিমের দাপটে চঞ্চল চৌধুরী নিস্প্রভ ছিলেন। কিন্তু মনপুরার অভিনেতা ফিরে এলেন আয়নাবাজিতে, এবং কী দুর্দান্ত কামব্যাক! হৃদির চরিত্রে নতুন অভিনেত্রী নাবিলাও সাবলীল ছিলেন। তবে চরিত্র অনুযায়ী কাহিনিতে হৃদি ও সাবের দীর্ঘ সময় দখল করে রাখলেও প্লটে তাদের গুরুত্ব কমই। দীর্ঘ সময় ধরে সাবেররূপী পার্থ বড়ুয়া আয়নাকে অনুসরণ করে গেলেন, কিন্তু তার সাফল্যের অগ্রগতি ছিল একেবারেই সামান্য। তাকে যেভাবে এক ঘটনার পেছনে অগ্রগতিবিহীন লেগে থাকতে দেখা গেল, তাতে চরিত্রটির প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। আবার চলচ্চিত্রের শেষে গড়গড় করে হৃদিকে তিনিই বলে গেলেন আয়নার সব অজানা কাহিনি। হৃদির বাবার চরিত্রটিও গুরুত্বহীন, তার মৃত্যুও কাহিনীতে কিছু যোগ করে না। চিত্রনাট্যে এরকম কিছু জিনিস আছে যার কার্যকারণ প্রতিষ্ঠা পায় নি।

কিছু কিছু ডিটেইলের কাজ চমৎকার লাগে। যেমন আয়না ও হৃদির সম্পর্ক দানা বাঁধার এক পর্যায়ে তাদের দেখা হয় মহল্লার কাঁচাবাজারে, কেনাকাটা করতে গিয়ে… ব্যাকগ্রাউন্ডে শুনি ‘আলু-পেঁয়াজের কাব্য’ গান আর ভিস্যুয়ালে দেখি খাঁচায় বন্দি মুরগির ঝাঁপাঝাঁপি, সব্জির ওপর দোকানির পানির ছিটা, বাজারে-তোলা গোলাপি শাপলা ফুলকে ঘিরে হ্রস্ব ট্র্যাকিং শট, মাছের বাজারে সারিবদ্ধ ঢাকনাযুক্ত বালবের দুলুনি, হঠাৎ কবুতর ঝাঁকের ওড়াওড়ি আর আয়না-হৃদির দৃষ্টিবিনিময় ও কথোপকথন…। এরকম ছোটখাটো ডিটেইলে আয়নাবাজি সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে, চলচ্চিত্র হিসেবে।

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close