Home শ্রদ্ধাঞ্জলি ফিরোজ বেগম > একাদশীর চাঁদ >> জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য

ফিরোজ বেগম > একাদশীর চাঁদ >> জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য

প্রকাশঃ July 28, 2018

ফিরোজ বেগম > একাদশীর চাঁদ >> জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য
0
0

ফিরোজ বেগম > একাদশীর চাঁদ >> জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য

 

ফিরোজা বেগমকে প্রশ্ন করলাম, অনেকে বলেন, আপনি নাকি নজরুলের সুর যথাযথ অনুসরণ করেন না, এ সম্পর্কে কী বলবেন?’ উত্তরে বললেন, ‘দেখুন এ অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন। কারণ, যুগের পরিবর্তনে মেজাজ বদলায়। আর স্বরলিপি কখনো ওস্তাদের কাজ করে না। আমি স্বরলিপি মেনেই নজরুলের গান গাই, তবে গায়িকা তো আর স্বরলিপি জীবন্ত করার যন্ত্র নন, তাঁর নিজেরও কিছুটা দেবার আছে। আমি একজন গায়িকা হিসেবে সেইটুকুই দেবার চেষ্টা করি। পুরনো দিনে ছিল কাজের চাতুর্য, এখন তার বদলে এসেছে এক্সপ্রেশনের যুগ। সেই এক্সপ্রেশনের জন্যই আমার গান হয়তো একটু ভিন্ন মনে হয়।’

 

সংগ্রহ ও ভূমিকা >> মাসুদুজ্জামান

ঢাকা থেকে প্রকাশিত ষাটের দশকের ‘ঝিনুক’ নামের একটা সিনে-সাংস্কৃতিক পত্রিকায় এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল। যিনি এই সাক্ষাৎকারভিত্তিক রিপোর্টটি লিখেছিলেন তাতে তাঁর নাম ছিল না। কিন্তু এই সাক্ষাৎকারটিতে এমন কিছু তথ্য আছে যা এই গুণী শিল্পীকে বুঝতে ও জানতে সাহায্য করে। আজ ২৮ জুলাই, ফিরোজা বেগমের জন্মদিন। তাঁর জন্মদিনে তীরন্দাজের শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে  রিপোর্টটি আমরা কোনো সম্পাদনা না করে এখানে হুবহু প্রকাশ করলাম।

 

ফিরোজা বেগম >> সাক্ষাৎকার

 

‘নজরুলগীতি লোকে ভুলে গেছে- ভুলে যাচ্ছে, একথা স্বীকার করতেই হবে। এর জন্য এখুনি কিছু করা দরকার। কিছু লোকের এগিয়ে আসার দরকার।’ বললেন ফিরোজা বেগম।
ফিরোজা বেগম?
হ্যাঁ নজরুলের ‘একাদশীর চাঁদ’ যাঁর কণ্ঠে নতুন রূপ পেয়ে নতুন করে বাঙালির চিত্ত হরণ করছে, সেই ফিরোজা বেগম এখন ঢাকায় আছেন। কলকাতা থেকে কিছুদিন আগে এসেছেন। এখানেই স্থায়ীভাবে বাস করার, কাজ করার ইচ্ছে নিয়ে আসা।
একদিন ছিল যখন নজরুলগীতি এ দেশের আকাশ বাতাস মুখর করে রাখত। কবি আবুল হোসেনের ভাষায় তখন এ দেশের প্রতিটি জেলা আর প্রতিটি মানুষ নজরুলের পায়ে পায়ে ঘুরতো। তারপরে এক সময়ে নজরুলগীতি চর্চায় ভাঁটা পড়ে যায়। নজরুল যান নীরব হয়ে। যাঁদের কণ্ঠে ছিল নজরুলের গান তাঁরা একে একে কালের শাসনে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেলেন।
নজরুলগীতিকে আবার যাঁরা ফিরিয়ে আনলেন, আবার যাঁরা নজরুলগীতিকে বাঙালির আনন্দের অংশ করে তুললেন তাঁদের মধ্যে ফিরোজা বেগমের দান অনেকখানি। বলতে গেলে তিনি প্রায় একক।
আর কি আশ্চর্য তাঁর কন্ঠ! যেন নজরুলের গান একমাত্র তাঁর কণ্ঠেই ইন্দ্রজাল হয়ে ওঠে।
এই কণ্ঠ অনেক দিনের সাধনা, অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের ফলশ্রুতি।
জন্ম ফরিদপুরে। তখনো দেশ স্বাধীন হয়নি। আট বছর বয়সে কলকাতা বেতার কেন্দ্রে ‘শিশু মহলে’ গান গেয়ে সবাইকে চমকে দেন। চিত্ত রায়ের সুর ও পরিচালনায় বারো বছর বয়সে প্রথম রেকর্ড বেরোয় ফিরোজা বেগমের। দুটো ইসলামি গানের রেকর্ড।
সেই সময়ে কলকাতা বেতারে নিয়মিত গান গাইতেন ফিরোজা বেগম। এবং এই গানের মাধ্যমে এতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন যে, সে সময়ে একবার তাঁকে এ মাসের শ্রেষ্ঠ শিল্পী বলেও ঘোষণা করা হয়।
উচ্চাঙ্গ সংগীত বিশেষ করে ঠুমরী শিখছিলেন তখন খ্যাতনামা সুরকার কমল দাসগুপ্তের কাছে। এঁর সঙ্গেই পরবর্তীকালে তাঁর বিয়ে হয়। কমল বাবু ছিলেন নজরুলের অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং নজরুলের অনেক (ফিরোজা বেগমের মতে তিন শতাধিক) গানের সুর দিয়েছেন তিনি।
স্বামী কমল দাসগুপ্তের মাধ্যমেই নজরুলগীতির সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ পরিচয় ঘটে।
ফিরোজা বেগম বলেন, ‘প্রথম যখন নজরুলের গান শুনি, কথাগুলো ভারী অদ্ভুত লেগেছিল। যেমন মমতাজ, মমতাজ বা মোর প্রিয়া হবে এসো রানী। বলতে পারেন সেই থেকে নজরুলগীতি শেখার দিকে আমার মন ঝুঁকে পড়ে।’
শুধু কমলবাবুই নন, চিত্ত রায়, গিরীন চক্রবর্তী, আব্বাসউদ্দীন এঁদের কাছে গান শিখতে থাকেন তিনি। ১৯৫৪ সালে কমলবাবুর পরিচালনায় তাঁর দ্বিতীয় রেকর্ড বেরোয়। এবং সেই সময় থেকে তিনি এইচএমভি ও কলম্বিয়ার নিয়মিত শিল্পী হয়ে যান। গাইতেন বাংলা ও উর্দু গীত, গজল, নাত, আধুনিক গান।
১৯৪৮ সালে ফিরোজা বেগম চলে এলেন ঢাকায়। ১৯৪৯ সালে তিনি ও তালাত মাহমুদ অতিথি শিল্পী হিসেবে ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে পরপর তিনদিন গান পরিবেশন করেন। তাঁকে ও তালাত মাহমুদকে দিয়েই সেদিন ঢাকা বেতারের শর্টওয়েভ-এর উদ্বোধন করা হয়েছিল।
এইসব টুকিটাকি তথ্য, অতীত দিনের টুকরো কথা ফিরোজা বেগম অত্যন্ত নিচু গলায় ভাঙা ভাঙা বাক্যে বলে যাচ্ছিলেন। সেই কণ্ঠ মাঝে মধ্যে হঠাৎ উচ্চগ্রামে উঠছিল আবার ধীর মন্থর হয়ে যাচ্ছিল। ফিরোজা বেগমের আলাপচারী অনেকদিন মনে রাখবার মতো।
ঢাকা বেতার থেকে নিয়মিত তাঁর গান শোনা যেত এই সময়ে। ১৯৫৫ সালে তিনি কলকাতায় আবার ফিরে যান। মাঝখানে ১৯৫৩ সালে ফিরোজা বেগমের প্রথম নজরুলগীতির রেকর্ড বের হয়। গানটি ছিল ‘কলঙ্ক আর জোৎস্নায় মেশা তুমি সুন্দর।’
কলকাতায় ফিরে গিয়ে তিনি নজরুলগীতিকে জনপ্রিয় করে তোলার দুরূহ ব্রত স্বামী কমল দাসগুপ্তের অনুপ্রেরণায় কাঁধে তুলে নিলেন।
১৯৬৩ সালে কলকাতায় প্রথম ব্যাপকভাবে নজরুল জন্মোৎসব করা হয়েছিল- আর তার পেছনে ফিরোজা বেগমের ছিল অক্লান্ত পরিশ্রম। মহাজাতি সদনে তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠান হয়। আঙুর বালা, ইন্দু বালা, কমলা ঝরিয়ার মতো পুরনো নজরুলগীতির গায়িকারা এই উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু সেদিন ফিরোজা বেগমের নাম শোনা গিয়েছিল সবার মুখে মুখে। কারণ, তিনি যে এই উৎসবের প্রোগ্রাম সেক্রেটারি ছিলেন তাই নয়, তিনি একের পর এক নজরুলগীতি গেয়ে বৃহত্তর শ্রোতার মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন।
ফিরোজা বেগমকে প্রশ্ন করলাম, অনেকে বলেন, আপনি নাকি নজরুলের সুর যথাযথ অনুসরণ করেন না, এ সম্পর্কে কী বলবেন?’
উত্তরে বললেন, ‘দেখুন এ অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন। কারণ, যুগের পরিবর্তনে মেজাজ বদলায়। আর স্বরলিপি কখনো ওস্তাদের কাজ করে না। আমি স্বরলিপি মেনেই নজরুলের গান গাই, তবে গায়িকা তো আর স্বরলিপি জীবন্ত করার যন্ত্র নন, তাঁর নিজেরও কিছুটা দেবার আছে। আমি একজন গায়িকা হিসেবে সেইটুকুই দেবার চেষ্টা করি। পুরনো দিনে ছিল কাজের চাতুর্য, এখন তার বদলে এসেছে এক্সপ্রেশনের যুগ। সেই এক্সপ্রেশনের জন্যই আমার গান হয়তো একটু ভিন্ন মনে হয়।’
একটু পরে ফিরোজা বেগম যোগ করলেন, ‘পুরানো ঢঙে গাইলে, আমি বলতে পারি, আপনারা পাঁচ মিনিটের বেশি গান শুনতে চাইবেন না। কেন? না, এই সময়টাই আলাদা। মনে রাখতে হবে; একেক কালে একেক শিল্পী একই গান একই স্বরলিপি ধরে গেয়েও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখেন, নতুন করে গানটিকে সৃষ্টি করেন।’
‘নজরুলগীতি জনপ্রিয় করা যায় কেমন করে?’
‘তার জন্যে প্রচুর অনুষ্ঠান করা দরকার। সবচেয়ে বড় দরকার নজরুলগীতির একটা স্কুলের। শুনে খুশি হবেন, ঢাকায় আমি একটি স্কুল শিগগিরই খুলছি, যেখানে নজরুলগীতি বিশেষভাবে শেখানো হবে।
‘আর কি করছেন?’
রেডিও-টেলিভিশনে গাইছি। একটা বই লিখছি ‘আমি যাদের দেখেছি’ এই নামে- স্মৃতিকথার মতো হবে বইটি। আর ইচ্ছে আছে, ছায়াছবিতে সুরকার হিসেবে কাজ করার।’
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, ফিরোজা বেগম প্রায় এক হাজার নজরুলগীতি জানেন ও তার প্রত্যেকটির স্বরলিপি তাঁর কাছে আছে। এর ভেতর থেকে একশ’ গানের স্বরলিপি তিনি বাংলা একাডেমিকে দিয়েছেন প্রকাশের জন্য।
ফিরোজা বেগমের ছোট ভাই আসাফউদ্দৌলাও একজন ভালো গায়ক। আসাফউদ্দৌলা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী হয়েও সঙ্গীত সাধনা অব্যাহত রেখেছেন্ তাঁর কণ্ঠে নজরুলের ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী’ আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close