Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ অনূদিত ছোটগল্প ফেরারি > বড়গল্প >> অ্যালিস মানরো >>> অনুবাদ : জ্যাকি কবির

ফেরারি > বড়গল্প >> অ্যালিস মানরো >>> অনুবাদ : জ্যাকি কবির

প্রকাশঃ June 25, 2017

ফেরারি > বড়গল্প >> অ্যালিস মানরো >>> অনুবাদ : জ্যাকি কবির
0
0

ফেরারি

গাড়ীটি ছোট্ট টিলার বাঁকে উঠে আসার আগেই কার্লার কানে শব্দটি পৌঁছায়। তবে কি মিসেস জেমসন, মানে সিলভিয়া গ্রীষ্মের অবকাশ যাপন শেষ করে ফিরে এল? কার্লা ভাবে। কার্লা দাঁড়িয়ে ছিল তাদের খামারের ভিতরের দিকে, সেখানে সে এমনভাবে দাঁড়িয়ে ছিল যেন তাকে রাস্তা থেকে দেখা না যায়; মিসেস জেমসনকে আরো আধা মাইলের মতো রাস্তা পাড়ি দিতে হবে তার বাসায় পৌঁছানোর জন্য। কার্লা ও ক্লার্কের প্রতিবেশী সিলভিয়া।

 

যদি এই গাড়ীটা তাদের বাড়ীর কোন অতিথির হতো, তবে এতক্ষণে গাড়ীর গতি নিশ্চয়ই স্লথ হয়ে আসত। কেননা গাড়ীটি ওদের বাড়ীর গেটে ঢোকার জন্য মোড় নিতে গেলে থামত। হায় ঈশ্বর, এটা যেন না হয়, কার্লা মনে মনে প্রার্থনা করে।

কিন্তু এ তো মিসেস জেমসনই। মিসেস জেমিসন একবার কার্লার বাড়ীটির দিকে তাকিয়ে, গাড়ী চালনায় মনোনিবেশ করল, কারণ রাস্তাটি ছিল ছোট ছোট খানাখন্দে ভরা। যেহেতু সে কার্লাকে দেখতে পায়নি, তাই হাত তুলে অভিবাদন জানানোর প্রশ্নই ওঠে না। কার্লা মিসেস জেমসনের রোদে পোড়া অনাবৃত কাঁধ ও বাহুর একাংশ একনজর দেখতে পায়, তার চুলের রং ও কিছুটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে বলে কার্লার মনে হয়। আগে যাকে রূপালি মনে হতো, তা খানিকটা সাদার দিকে চলে গেছে বলে তার মনে হলো। সিলভিয়ার মুখাবয়ব দেখে মনে হলো, সে কঠিন রাস্তাটাকে কোনভাবেই বিহ্বল করার সুযোগ দিতে রাজি না। এটাকে সে উপভোগ করছে বলেও মনে হলো। মিসেস জেমসন একটি প্রশ্নবোধক চকিত দৃষ্টিতে কার্লাদের বাড়ীর দিকে তাকাতেই কার্লা দু-কদম পিছিয়ে গেল।

তবে কার্লার মনে হলো, ক্লার্ক তখনও জানে না যে মিসেস জেমসন ফিরে এসেছে। সে যদি তার কম্পিউটারে ব্যস্ত থাকে তবে সে জানালার দিকে পিঠ দিয়ে বসে আছে।

মিসেস জেমসন হয়তো আবার বের হবে। যেহেতু সে এয়ারপোর্ট থেকে ফিরছিল, হয়তো তার বাসায় কোন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্তর থাকবে না। তাই সে আবার কোন দোকানে যাবে চাল ডাল কেনার জন্য। তখন হয়তো সে ক্লার্কের চোখে পড়বে। সন্ধ্যার পর যখন তার বাড়ীর আলো ক্লার্কের চোখে পড়বে, তখন হয়তো সে বুঝবে যে বাড়ীতে কেউ আছে। কিন্তু এখন যেহেতু জুলাই মাস, তাই সূর্য ডুবতেও বেশ খানিকটা সময় লাগে। এমনও হতে পারে, সে এতটাই অবসন্ন যে হয়তো আলো জ্বালানোর প্রয়োজন বোধ না করেই ঘুমাতে গেল। আবার এমনও হতে পারে যে হয়তো ওদেরকে ফোন করল। হয়তো এখনই করবে।

এই গ্রীষ্মে শুধুই বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি আর বৃষ্টি; পানির ফোটা পড়ার শব্দে ঘুম ভাঙে। রাস্তাগুলো কাদায় টইটুম্বুর, লম্বা ঘাসের ডগাও ভিজে যায় পানিতে। যখন আকাশ পরিষ্কার থাকে তখনও গাছের পাতা চুইয়ে অনেক পানি ঝমঝম করে পড়ে। বাইরে বের হওয়ার সময় কার্লা প্রতিবারই মোটা রিসের উঁচু অস্ট্রেলিয়ান ফেল্ট টুপি পরে। আর সে তার মোটা বেনীটি শার্টের ভিতরে ঢুকিয়ে রাখে।

আজকে আর ট্রেইল রাইডের জন্য কেউই আসল না। যদিও কার্লা ও ক্লার্ক দু’জনে গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যেমন, ক্যাম্পের স্থান, ক্যাফে, টুরিস্ট অফিসের বাইরে যে বোর্ড থাকে তাতে এবং আরও অন্যান্য সম্ভাব্য জায়গা যেখানে মানুষের নজরে পড়বে সেইসব জায়গায় পোস্টার লাগিয়ে এসেছিল। কিছু শিক্ষানবীশ ঘোড়া চালক যারা এখানে ভর্তি তারাই কেবল অনুশীলনের জন্য আসে। এরা কিন্তু স্কুলের বাচ্চা যারা ছুটিতে আছে তারা নয়। কিংবা গ্রীষ্মের ক্যাম্প করতে আসা ছেলে-পেলেরাও নয়। গত গ্রীষ্মে এই ধরণের ছেলে-মেয়েরাই তাদেরকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। এবার যারা রেগুলার আসত তারাও অবকাশ যাপনে চলে গেছে। আবার অনেকে বৃষ্টির জন্যও নিরুৎসাহিত বোধ করে। যারা ক্লাস বাতিল করার জন্য শেষ মুহূর্তে ফোন করে তাদেরকে ক্লার্ক পারিশ্রমিক দিতে বাধ্য করে। কেউ কেউ এতে বিরক্ত হয়ে একেবারেই ক্লাস বন্ধ করে দেয়।

ওদের তিনটি ঘোড়া থেকে কিছুটা আয় হচ্ছে। সেই তিনটি ঘোড়াসহ আরও চারটি ঘোড়া তখন মাঠে চড়ে বেড়াচ্ছিল। তারা মাঠের ঘাস খুঁজে ফেরে, তাদের দেখে মনে হচ্ছিল যে তারা বৃষ্টি নিয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়। বৃষ্টি কিছুটা স্থিমিত হয়ে আসছিল যেমনটা প্রতিদিন দুপুরের দিকে হয়। বৃষ্টি থামা মানে মনের ভেতর আশা তৈরী হওয়া-এই বুঝি বৃষ্টি থেমে গেল। এমন সময় মেঘও পাতলা হয়ে আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করে, যদিও সূর্যের আলো দেখা দেয় না। তবুও চারিদিক স্বচ্ছ আলোয় ভরে যায় ঠিক অন্ধকার হয়ে আসার আগের মুহূর্তে, রাতের খাবারের ঠিক পূর্বে।

কার্লা খামারে বেশকিছু সময় অতিবাহিত করে বের হয়ে আসল। এখানে সময় কাটাতে তার ভালই লাগে, প্রতিদিনের কাজকর্ম তাকে উৎফুল্ল রাখে। খামার ঘরের উঁচু চালের নীচে যে বিশাল শূন্যতা, ঘরের ভিতরের গন্ধটাও সে উপভোগ করে। এরপর সে ব্যায়ামাগারের রিং এর নীচের মাটি পরীক্ষা করতে যায়। পাঁচটার সময় যে ছাত্রটার আসার কথা, সে আসতেও পারে।

গত সপ্তাহে বৃষ্টিটা হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ার সাথে গাছপালার ভিতর দিয়ে আড়াআড়ি ভাবে মুষুলধারে পড়া শুরু করে। তবে লম্বা সময় ধরে বৃষ্টি পড়লে তা কখনই খুব জোরে পড়ে না বা বৃষ্টির সাথে দমকা হাওয়াও থাকে না। গত সপ্তাহের ঝড়ও কেবল পনের মিনিটের মত বয়ে ছিল। এর মধ্যেও গাছের ডাল, পাতা ভেঙে রাস্তায় পড়ে ছিল। পানির লাইনও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর রিঙের উপর যে প্লাস্টিকের ছাদ ছিল তার একপাশ ভেঙে পড়েছিল। ট্রাক্ট এর শেষ মাথায় পানি জমে একটা অগভীর খালের মত তৈরি হয়েছিল।ক্লার্ক অনেক রাত অব্দি মাটি কেটে সরু পথ তৈরি করেছিলো পানি যাওয়ার জন্য।

ছাদের ঐ ভাঙা অংশটুকু এখনও ঠিক করা হয়নি। ক্লার্ক একটা বেড়া তৈরী করে দিয়েছিল যেন ঘোড়াগুলো এদিকে না আসতে পারে। কার্লা নতুন করে ছোট একটা ট্রাক্ট এঁকে নিয়েছিল।

ঠিক এই মুহূর্তে ক্লার্ক ইন্টারনেট ঘেটে এমন একটা দোকান খুঁজছিল যেখান থেকে সে ছাদের প্লাস্টিক কিনতে পারে। সে এমন কোন একটা দোকানে চাচ্ছিল যেখান থেকে ওরা কম দামে প্লাস্টিকের ছাদ কিনতে পারবে। অথবা এমনও হতে পারে যে কেউ তাদের ব্যবহৃত প্লাস্টিকের টুকরা বিক্রি করতে আসল, এমন কোন কিছুর খবর হলেও চলবে। তবে ক্লার্ক হাই ও রবার্ট বাকলির দোকানে যেতে পারবে না। ও ওটার নাম দিয়েছে ডাকাতের  আস্তানা, কেননা ক্লার্ক ওদের সাথে মারমারি করেছে এবং ক্লার্কের কাছে ওদের অনেক টাকা পাওনা আছে।

শুধু ওরাই না ক্লার্কের আরো অনেক মানুষের সাথে গণ্ডগোল ছিল। এমন অনেক জায়গা ছিল যেখানে ক্লার্ক যেতে পারত না তাই সে ওখানে কার্লাকে যেতে বাধ্য করত। এর মধ্যে ওষুধের দোকানটাও ছিল। একদিন এক বৃদ্ধা ক্লার্ককে পেছনে ফেলে সামনে চলে গিয়েছিল, আসলে সে একটা জিনিস ভুলে ফেলে গিয়েছিল তাই সে সেটা নিতে এসেছিল। তার নাকি একেবারে লাইনের পিছনে দাঁড়ানো উচিত। ক্লার্ক এটা নিয়ে হইচই করাতে ক্যাশিয়ার তাকে বলে যে এই ভদ্রমহিলার হাপানি রোগ আছে। ক্লার্ক উত্তর দেয় : তাই নাকি? আমার নিজের কিন্তু অর্শ গেজ আছে। আমার সবসময়ই ওষুধ নিতে হয়। এরপর ম্যানেজারকে তলব করা হয়। সে এসে যা বলার নয় তাই বলে। বড় রাস্তার ধারে যে কফির দোকান রয়েছে সেখানে সকাল সাড়ে এগারটায় গিয়ে ক্লার্ক কমদামি নাস্তা চায়, যেটা বিজ্ঞাপনে দেয়া ছিল। কিন্তু দোকানটা সেটা দিতে চায় না কারণ সকাল গড়িয়ে তখন দুপুর। ফলে ক্লার্ক তার কফিভর্তি কাপ মেঝেতে ফেলে দেয়। ওরা বলে, একটা ছোট বাচ্চা কাছেই রয়েছে এবং গরম কফি তার গায়ে পরতে পারত। ক্লার্ক বলে, বাচ্চাটা প্রায় আধ মাইল দূরে রয়েছে। ক্লার্ক বলে যে ধরার কিছু ছিল না বলেই সে কাপটা তার হাত থেকে পরে গিয়েছে। দোকানের লোকজন বলে, ধরার কিছু চাইলেই তারা তা দিত। ক্লার্ক বলে, চাইতে হবে কেন?

“তুমি অল্পতেই রেগে যাও।” কার্লা বলে, “পুরুষ লোকেরা তো তাই করে।” কার্লা ভয়ে মিস্টার টাকারের সাথে ঝগড়ার কথা তুলল না। জয় টাকার হলো শহরের লাইব্রেরিয়ান যে তার ঘোড়া ওদের খোঁয়াড়ে রাখত। ঘোড়াটার নাম ছিল লিজি, যে নাকি খুবই বদমেজাজী ছিল। তার গায়ের রং ছিল বাদামী। আর জয় টাকার আদর করে ওকে ডাকত লিজি বরডেন নামে। কিন্তু গতকাল যখন ও গাড়ী নিয়ে বের হয়ে যাচ্ছিল তখন তার একটুও মুড ভাল ছিল না। ছাদ ঠিক না করায় তার ঘোড়ার ঠাণ্ডা লেগে গেছে বলে বলল। এটা বলে সে বের হয়ে গেল।

প্রকৃতপক্ষে লিজির তেমন কিছুই হয়নি। ক্লার্ক বরং তাকে ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করেছিল। জয় টাকারই রেগে গিয়ে বলে উঠেছিল যে এই জায়গাটা নোংরা এবং লিজির এর চেয়ে অনেক ভাল পরিবেশে থাকার কথা। তখন ক্লার্ক বলে ওঠে; “তোমার যেখানে ভাল লাগে সেখানেই তাকে নিয়ে যাও।” কিন্তু ক্লার্ক, যে নাকি এর আগে এই ঘোড়াটকে তার পোষ্য হিসাবে নিয়েছিল, এখন তার দিকে কোনরকম নজরই দিত না। লিজি এতে খুব মন খারাপ করল, ফলে সে খুব দুরন্তপনা দেখাতে লাগল। তাকে হাঁটতে নিয়ে যাওয়ার সময় সে লম্ফঝম্প দিতে লাগল। আবার তার ক্ষুর পরিষ্কার করার সময় সে ভীষণ ক্ষুদ্ধ হল। প্রতিদিন ক্ষুর পরিষ্কার না করলে ফাংগাস জন্মায়, সেই জন্য কার্লা সেগুলো সাফ করে দিত।

একদিন কার্লা হঠাৎ করে তার ছোট্ট সাদা ছাগলটাকে আর দেখতে পেল না। ওর নাম হলো ফ্লোরা, যে নকি সবসময় ঘোড়ার খোয়ারের আশেপাশে ঘুর ঘুর করতো। ফ্লোরা ওদের সাথে মাঠেও যেত। গত দু’দিন ধরে তার কোন চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল না। কার্লার ভয় হলো কোন বুনো কুকুর বা ভাল্লুক তাকে খেয়ে ফেলল কিনা।

গত দুই রাত ধরে কার্লা ফ্লোরাকে স্বপ্ন দেখেছে। প্রথম রাতে সে দেখেছিল যে ফ্লোরা লাল একটা আপেল মুখে করে তার বিছানা পর্যন্ত হেঁটে এসেছিল। কিন্তু গত রাতে কার্লা যে স্বপ্নটা দেখেছিল তাতে ফ্লোরা তাকে দেখে দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। কার্লার মনে হয়েছিল যে ফ্লোরা হয়তো পায়ে কিছুটা ব্যাথা পেয়েছিল। কার্লা ওর পিছু নেওয়াতে ফ্লোরা ওকে কোন এক যুদ্ধক্ষেত্রের কাঁটা তারের বেড়ার সামনে চলে গেল। তারপর সে, মানে ফ্লোরা তারের ফাঁক গলে অপর প্রান্তে চলে গেল। সে তার শরীরে ও পায়ে ব্যাথা পেলেও বাইন মাছের মত নড়েচড়ে উধাও হয়ে গেল। কার্লা যখন রিঙে আসে তখন সবগুলো ঘোড়াই সামনের বেড়ার কাছ ঘেঁসে দাঁড়ায়। তাদের দেখে খুবই শীতার্ত মনে হচ্ছিল যদিও তাদের গায়ে নিউজিল্যান্ড কাঁথা দেয়া ছিল। ঘোড়াগুলো এই ভেবে বেড়ার কাছ ঘেঁসে দাঁড়ায় যেন কার্লা ফেরার পথে তাদের দেখতে পায়। সে খুব সর্ন্তপনে ওদের সাথে কথা বলে। সে তাদের কাছে ক্ষমা চায় সাথে কোন খাবার নাই বলে। ওদের গলায়, নাকে হাত বুলিয়ে ও জিজ্ঞেস করে ওরা ফ্লোরার ব্যাপারে কিছু জানে কি না

গ্রেস ও জুপিটার চিহি চিহি করে ওঠে আর নাক দিয়ে কার্লার হাত ঘষতে থাকে যেন তারা নামটা চিনতে পেরেছে। কার্লার মনে হলো যেন তারা এটা নিয়েও বেশ উদ্ধিগ্ন। এরই মধ্যে লিজি মাথা দিয়ে গ্রেসকে সরিয়ে দিল আর কার্লার হাত সরে গেল। সে তার হাতে চিমটি কাটল, এ জন্য ওকে কার্লার বকুনি শুনতে হলো।

তিন বছর আগেও কার্লা কখনও চলন্ত ঘরে মানে ক্যারাভানে থাকাটাকে স্বাভাবিক মনে করেনি। সে ওগুলোকে ‘ঘর’ও বলত না। ওর বাবা মার মত ওর মনে হতো চলন্ত ঘর হচ্ছে মেকি ঘর। কিছু লোক ট্রেইলরে থাকে কিন্তু সব ট্রেইলরই একইরকম। এতে কোন বৈচিত্র নেই। যখন থেকে কার্লা এখানে থাকা শুরু করল, মানে যখন থেকে সে ক্লার্কের সাথে বসবাস করা শুরু করল, তখন থেকেই সে সবকিছুকে নতুন দৃষ্টিতে দেখা শুরু করে। তখন থেকেই সে “চলন্ত বাসা” কথাটা ব্যবহার করা শুরু করল আর লক্ষ্ করা শুরু করল অন্যরা কিভাবে এই ঘরগুলো সাজায়। কী ধরনের পর্দা লোকে ব্যবহার করে, কী রং দেয়, কী ধরনের আলগা বারান্দা বা ঘর লাগানো হয়। এবং সে নিজেও এই ধরনের জিনিস লাগানোর জন্য অস্থির হয়ে ওঠে।

ক্লার্ক ওর কথা মত কিছুদিন সবকিছু ঠিক করে দেয়। যেমন ও কতগুলো সিড়ি লাগিয়ে নেয়। এরপর অনেক দিন ধরে সেগুলোর জন্য রট আইরনের রেলিং খুঁজে বেরায়। যখন কার্লা বাথরুমের রং করার এবং পর্দা লাগানোর জন্য বা রান্না ঘরের রঙের জন্য খরচ করা শুরু করে তখনও সে কিছু বলে না। ও ভাল রং করতে জানত না, যেমন রং করার সময়ে যে কপাট খুলে নিতে হয় সেটাও সে জানত না। এবং পর্দার ভিতরে যে লাইনিং দিতে হয় সেটাও সে জানত না, ফলে তার পর্দার রং উঠে যাচ্ছিল।

কিন্তু যখন যে কার্পেট পাল্টানোর চিন্তা করল তখনই ক্লার্ক বাধ সাধল। সব ঘরেই একই কার্পেট ছিল যা কার্লা সব থেকে বেশি বদলাতে চেয়েছিল। কার্পেটগুলো ছিল ছোট ছোট খয়েরি রঙের বাক্সের মত টুকরার, প্রত্যেকটির মধ্যে ছিল গাঢ় খয়েরি রঙের পেঁচানো ডিজাইন করা। আপাতদৃষ্টিতে একটা বাক্স মনে হলেও ভাল করে দেখলে বোঝা যায় যে চারটা টুকরা নিয়ে একটা বড় চারকোণা বাক্স হয়। কার্লা একদিন অনেক সময় নিয়ে বাক্সগুলোকে দেখে এবং বুঝতে পারে যে আঁকাবাঁকা আলপনাগুলো চারটা বাক্স নিয়ে এক-একটা ডিজাইন।

বিশেষত যখন বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হয় বা ক্লার্কের মেজাজের জন্য ভেতরের আবহাওয়টা ভারী হয়ে থাকে এবং যখন ও কম্পিউটারের পর্দা ছাড়া আর কোন দিকেই তাকায় না, মুলত সেই সময়গুলোতেই কার্লা গভীর মনোযোগের সাথে এইসব লক্ষ্ করত। তবে এইসব সময়ে সবচেয়ে ভাল হয় কার্লা যদি ঘোড়ার খোঁয়াড়ে কোন কাজে ব্যস্ত হয়ে পরতো। ঘোড়াগুলো ওকে লক্ষই করে না যদি ওর মন খারাপ থাকে, কিন্তু ফ্লোরা যে নাকি বাঁধা থাকে না, সে এসে ঠিকই কার্লার গা ঘষে দেয়। ফ্লোরা এমনভাবে ওর হলদে সবুজ চোখ দিয়ে তাকায় যেটা ঠিক মায়াভরা নয় তবে বন্ধুত্বপূর্ণ।

ক্লার্ক যখন ফ্লোরাকে নিয়ে আসে তখন সে একটা ছোট্ট বাচ্চা ছিল। ক্লার্ক ঘোড়া বিক্রি করার জন্য একটা ফার্মে গিয়েছিল। ওখানকার বাসিন্দারা ফার্মের কঠিন জীবন থেকে বের হতে চাচ্ছিল। অন্তত তারা আর পশুপাখি পালন করতে চাচ্ছিল না। ঘোড়াগুলোকে তারা বিক্রি করে দিলেও ছাগলগুলোকে কোথাও পাঠাতে পারছিল না। এর আগেই ক্লার্ক শুনেছিল যে ছাগল কোন কোন ঘোড়ার খোঁয়াড়ে শান্তি আনতে পারে। তাই সে একটা ছাগল নিয়ে এই কথাটা পরখ করে দেখতে চেয়েছিল। ওরা ভেবেছিল হয়তো কোনদিন ও বাচ্চা জন্ম দেবে। কিন্তু ওর মা হওয়ার কোন চিহ্নই দেখা যাচ্ছিল না।

প্রথম দিকে ফ্লোরা ছিল ক্লার্কের পোষ্য। সে ওর পায়ে পায়ে সব জায়গায় ঘুরে বেড়াত আর ওর মনেযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করত। ছোটবেলা সে খুব চটপটে আর দুরন্ত ছিল। ক্লার্ক ও কার্লা দুজনই খুব মজা পেত ওকে দেখে কেননা তখন তাকে একটা একনিষ্ঠ প্রেমিকার মত মনে হতো। আস্তে আস্তে সে যখন বড় হতে লাগল তখন সে কার্লার সাথে বেশী অন্তরঙ্গ হতে লাগল। এইসময় তাকে একটু বেশি জ্ঞানী ও কম চঞ্চল এবং অনেক বেশী পরিপক্ক মনে হতে লাগল। আগে যেখানে ওকে অনেক বেশী ম্লান মনে হতো। ঘোড়াদেরকেও কার্লা অনেক আদর করত কিন্তু একটা নিয়মের মধ্যে রাখত খানিকটা যেন মায়ের মত। কিন্তু কার্লার সাথে ফ্লোরার বন্ধুত্বটা একেবারে ভিন্নরকমের ছিল। এখানে কেউ কাউকে বড় মনে করত না।

“এখনও কোন চিহ্ন নেই ফ্লোরার তাই না?” গুদাম ঘরের বুট পায়ে দিতে দিতে কার্লা জিজ্ঞেস করল। ক্লার্ক ছাগলের হারানো বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছিল ইন্টারনেটে।

“না এখন পর্যন্ত না।” ক্লার্ক অন্যমনস্কভাবে বলল। তার গলায় কোন বিরক্তির ভাব ছিল না। সে বলল “হয়তো ফ্লোরা তার নিজের জন্য একজন বিলিকে খুঁজতে গেছে।” এর আগেও সে এটা বলেছিল।

মিসেস জেমসন সম্পর্কে কোন কথাই সে বলল না। কার্লা চায়ের কেতলীটা চুলায় দিল। ক্লার্ক অভ্যাসগত ভাবে গুনগুন করে গান গাইছিল, যেটা সে কম্পিউটারের সামনে বসে প্রায়ই করে থাকে। মাঝে মাঝে সে ওটার সাথে কথাও বলে। “ঘোড়ার ডিম তুমি!” যেন সে কোন কথার উত্তর দিচ্ছে। অথবা সে হেসে উঠত, কিন্তু কি নিয়ে সে হাসল সেটা তার মনে থাকত না। খানিক পরে কার্লা যখন জিজ্ঞেস করে কি নিয়ে সে হাসছিল তখন আর সে কিছুতেই মনে করতে পারে না।

কার্লা জোরে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি চা খাবে?” সে অবাক হয়ে লক্ষ করে যে ক্লার্ক হেঁটে রান্না ঘরে চলে আসছে।

“তো?” ক্লার্ক বলে।

“কি?”

“তো সে ফোন করেছিল।”

“কে?”

“মহরানী সিলভিয়া। তিনি ফিরে এসেছেন।”

“আমি তো কোন গাড়ীর শব্দ শুনি নি।”

“আমি তো জানতে চাইনি তুমি শুনেছ কি না।”

“তো সে কি বলল ফোন করে?”

“সে তোমাকে কাল তার বাসায় গিয়ে একটু গোজগাছ করতে সাহায্য করতে বলল।”

“তুমি কি বললে?”

“আমি বললাম ঠিক আছে। কিন্তু তুমি ফোন করে ঠিক করে নাও।” কার্লা বলল, “আমি তার প্রয়োজন দেখি না। তুমি তো বলেছোই যে আমি যাব।” বলে সে চা ঢালতে লাগল। “ও যাওয়ার আগেই তো আমি সব পরিষ্কার করেছি, আমি বুঝি না এত তাড়াতাড়ি আর কি করার থাকতে পারে।

“এমনও তো হতে পারে যে কিছু গুন্ডা ঘরে ঢুকে তা নোংরা করে ফেলেছে। কিছুই বলা যায় না।”

“হুম তাই বলে ঠিক এক্ষুনি তাকে ফোন করতে যাচ্ছি না। এখন আমি চা খাব, তারপর আমি গোসল করব।”

“যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ততই ভাল।”

 

কার্লা ওর চা নিয়ে বাথরুমে গেল, ওখান থেকে সে জোরে চিৎকার করে বলল, “আমাদেরকে লন্ড্রিমেটে যেতে হবে। ধোয়া তোয়ালেতেই এখন পঁচা গন্ধ করছে।

“কার্লা প্রসঙ্গ পালটাবে না।”

ও বাথরুমে যাওয়ার পরও ক্লার্ক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। বলে,

“আমি কিন্তু এত সহজে তোমাকে ছেড়ে দিচ্ছি না কার্লা।”

ও ভয়ে থাকে, ভাবে হয়তো বাথরুম থেকে বের হয়েও ক্লার্ককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবে। কিন্তু ও যখন বের হয়ে আসে তখন ক্লার্ক তার কম্পিউটার টেবিলে বসে আছে। ও বাইরে যাওয়ার কাপড় পরে, ভাবে হয়তো যদি ওরা লন্ড্রিমেটে যায়, এককাপ কাফুচিনো খায় তবে হয়তো ওরা একটু অন্যভাবে কথা বলতে পারবে। হয়তো অন্যভাবে শুরু করতে পারবে, সেটা একটা সম্ভাবনা। সে ছোট-ছোট পা ফেলে বসার ঘরে এসে ক্লার্ককে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু ধরার সাথে সাথে সে তার ভুল বুঝতে পারে, তার চোখ জলে ভরে যায়, বোধহয় গোসলের গরম পানি ওর চোখের পানিকে উথলে দিয়েছে। সে ক্লার্কের উপর উপুড় হয়ে পড়ে, তার দমকে-দমকে কান্না আসে।

ক্লার্ক তার হাত কী-বোর্ড থেকে সরিয়ে ফেলে, কিন্তু স্থীর হয়ে বসে থাকে।

“আমার সাথে রাগ করো না।”

“আমি রাগ করিনি, কিন্তু তোমাকে আমি খুব অপছন্দ করি যখন তুমি এরকম কর।”

“তুমি রাগ করেছে বলেই আমি এইরকম করছি।”

“আমি কি রাগ করেছি, না করিনি তা তুমি বলো না। তুমি আমার দম বন্ধ করে ফেলছ। যাও রাতের খাবার তৈরী কর।”

কার্লা সেটাই করল। পাঁচটার সময় যে লোকটার আসার কথা সে আর আসবে না তা বোঝই গেল। আলু বের করে কাটার সময় তার চোখের পানি আর বাঁধ মানে না। চোখের পানির তোড়ে সে কি করছিল তা দেখতে পারছিল না। একটা পেপার ন্যাপকিন দিয়ে মুখ মুছে, আরেকটা ন্যাপকিন নিয়ে সে বৃষ্টির মধ্যে বের হয়ে গেল। ঘোড়ার খোঁয়াড়ে সে গেল না; কেননা ফ্লোরা ছাড়া ঐ জায়গাটা ওর কাছে অসহ্য লাগত। সে হেঁটে হেঁটে জঙ্গলের দিকের রাস্তাতে গেল। ঘোড়াগুলো অন্য মাঠে ছিল। ওরাও বেড়ার কাছে এসে দাঁড়িয়ে ওকে দেখতে লাগল। লিজি ছাড়া সবাই ওখানে ছিল। যে নাকি চিহি চিহি করতে লাগল এবং এটাও বুঝল যে কার্লার মনযোগ অন্য কোথাও ছিল।

ঘটনাটা শুরু হয়েছিল যখন তারা পত্রিকায় একটা শোক সংবাদ দেখেছিল। মিস্টার জেমসনের মৃত্যুসংবাদ। সিটি পত্রিকায় তার ছবিসহ খবরটা ছেপেছিল, আর রাতের সংবাদে টিভিতে তার ছবি আসে। আগের বছর পর্যন্ত ওরা জেমসন ফ্যামিলি সর্ম্পকে যা জানত তা ছিল- ওরা নিজেদের মত করে থাকতে ভালবাসে। মহিলাটি চল্লিশ মাইল দূরে একটা কলেজে উদ্ভিদবিদ্যা পড়ান এবং বেশির ভাগ সময়ই যাতায়াতে ব্যয় করেন আর ভদ্রলোক ছিলেন কবি।

সবাই তাদের সম্পর্কে এইটুকুই জানত। কিন্তু ভদ্রলোক অতিমাত্রাই কর্মচঞ্চল ও ব্যস্ত দিন কাটাত। সে তার স্ত্রীর তুলনায় প্রায় বিশ বছরের বড় হওয়ার পরও অত্যন্ত সুঠাম ছিল। সে তার নিজের বাড়ীর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অনেক উন্নতি সাধন করেছিল। কালভার্টগুলো পরিষ্কার করে তাদের দেয়ালে পাথর দিয়ে লাইন করে দিয়েছিল। সে তাদের খালি জায়গায় একটা সবজি বাগান করে তাতে বেড়া দিয়ে দিয়েছিল। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যাওয়ার একটা সরু পথও তৈরি করেছিল এবং বাড়ীর বিভিন্ন জিনিসের মেরামতের কাজ সে নিজেই করত।

বাসাটা ছিল অদ্ভুত তিনকোনা সাইজের, যেটা ভদ্রলোক নিজেই বানিয়েছিল কয়েক বছর আগে। তার কয়েকজন বন্ধু একটা পুরনো ফার্মহাউজকে বদলে বাসাটা তৈরী করেছিল। লোকেরা বলাবলি করত যে ঐ লোকগুলি ছিল হিপি, যদিও মিস্টার জেমসনের হিপি হওয়া মত বয়স ছিল না। ওর সম্পর্কে একটা গল্প চালু ছিল যে সে নাকি কোন এক জঙ্গলে মারিজুয়ানা ফলাত এবং সেগুলি বাজারে বিক্রি করে টাকাগুলো কাঁচের বোয়মে ভরে বাড়িটির চারপাশে পুতে রেখেছিল। ক্লার্ক এসব কথা শহরের লোকজনের কাছ থেকে শুনেছিল এবং সেগুলো তার কাছে গাঁজাখুরী গল্প বলে মনে হয়েছে।

“তাই যদি সত্যি হবে তাহলে অনেক আগেই কেউ না কেউ ওগুলো মাটি খুঁড়ে বের করে নিয়ে যেত। কেউ না কেউ তাকে দিয়ে বলাত, কোথায় সেগুলো লুকানো রয়েছে।”

জেমসনের শোকবার্তা পড়ার পর ক্লার্ক ও কার্লা প্রথম জানতে পারে যে সে তার মৃত্যুর পাঁচ বৎসর আগে বিশাল অংকের একটা পুরষ্কার পেয়েছিল। এটা ছিল একটা কবিতা লেখার জন্য পুরষ্কার। কেউ ওদের আগে এটা বলেনি। আসলে কবিতার জন্য পুরষ্কার পাওয়ার কথার চেয়ে মানুষ ড্রাগ বিক্রির টাকা বোয়মে ভরে রাখার কথা বেশী বিশ্বাস করে।

এর কিছুদিন পর ক্লার্ক বলে, আমরা কিন্তু ওকে দিয়ে পয়সা কামাতে পারতাম। যদিও কার্লা বুঝতে পারল সে কি বোঝতে চেয়েছিল তবুও সে সেটাকে ঠাট্টা হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছিল।

“অনেক দেরী হয়ে গেছে, মরে গেলে কি কেউ আর কাউকে পয়সা দিতে পারে?”

“সে পারে না কিন্তু তার স্ত্রী পারে।”

“সে তো এখন গ্রীসে গেছে।”

“গ্রীসে তো সে সারাজীবন থাকবে না।”

“সে তো জানত না।”

“আমি তো বলিনি যে সে জানত।”

“এর সর্ম্পকে তার কোন ধারণাই নেই।”

“সেটা আমরা ঠিক করে নেব।”

কার্লা বলে ওঠে, “না, না।”

ক্লার্ক যেন তার কথা শুনতেই পায় নি এমনভাবে কথা বলতে থাকল,

“আমরা বলতে পরি যে আমরা আইনের আশ্রয় নেব। মানুষ কত টাকা কামিয়েছে এইভাবে।”

“এটা তুমি কিভাবে করবে? একজন মৃত মানুষের বিরুদ্ধে কিভাবে তুমি আইনের আশ্রয় নেবে?

“আমি পত্রিকাতে ছাপিয়ে দিব বলে ভয় দেখাব। সে তো একজন নামকরা কবি। পত্র-পত্রিকাগুলো ঝাঁপিয়ে পড়বে এরকম খবর পেলে। আমরা শুধু মহিলাকে একটু ভয় দেখাব।”

“তুমি কেবল স্বপ্ন দেখছো।” কার্লা বলে, “দুষ্টামি করছ তাই না?”

“না,” ক্লার্ক বলে, “আমি দুষ্টামি করছি না।”

কার্লা বলল যে সে আর এ ব্যাপারে কথা বলতে চায় না, ক্লার্ক বলে, ঠিক আছে।

কিন্তু তারা এ নিয়ে তারপরের দিন আবার কথা বলে। তারপরের দিনেও এবং তার পরের দিন আবার তারা এনিয়ে কথা বলে। মাঝে মাঝে ক্লার্ক ভাবে, এটা করা  সম্ভব না। হয়তো এটা একটা বেআইনী কাজ। সে হঠাৎ করে অতি উৎসাহ নিয়ে এ ব্যাপারে কথা বলতে বলতে থেমে যায়। কার্লা ঠিক বুঝতে পারে না সে এমন কেন করে। যদি বৃষ্টিটা কমে যেত, এটা যদি গরম কাল হতো, তাহলে সে হয়তো এ চিন্তাটাকে অনেক কাজের ভীড়ে হারিয়ে ফেলত। কিন্তু সেটা হয়নি এবং গত একমাস ধরে ক্লার্ক এমনভাবে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করেছে যাতে করে মনে হয়েছে যে এটা একটা বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। প্রশ্ন হলো তারা কত টাকা চাইবে। বেশী কম হলে ঐ মহিলা ভাবতে পারে যে ওরা গুলতানি মারছে। আবার খুব বেশী চাইলে উনি হয়তো অন্য কারো সাহায্য নিতে পারে অথবা সে নিজে জেদ করে বসে থাকতে পারে।

কার্লা এখন আর বলে না যে হয়তো ক্লার্ক নিছক মজার ছলে এটা করছে। বরং এখন সে ওকে বলে যে এই পরিকল্পনা কখনই বাস্তবায়িত হবে না। ও বলে, লোকে তো জানেই কবিরা এমনই হয়ে থাকে, সুতরাং টাকা পয়সা দিয়ে এটাকে ঢাকবার তো কোন প্রয়োজন নেই।

ক্লার্ক বলে, এটা কাজ করবে যদি ঠিকমত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করা যায়। ওর মতে কার্লা আগে মিসেস জেমিসসনের কাছে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়বে; এবং ঘটনার বিবরণ দেবে। ঠিক ওই সময়েই ক্লার্ক বাসায় ঢুকে পড়বে। যেন তাদের অবাক করে দেওয়ার জন্যে, এবং ঘটনাটা তখনই সে প্রথম জানবে। সে ভীষণ রেগে যাবে এবং সমস্ত দুনিয়াকে ঘটনাটা জানানোর কথা বলবে। মিসেস জেমসনই প্রথম টাকার কথা পাড়বে।

“তুমি ব্যথিত, অপমানিত এবং আমিও তোমার স্বামী হিসেবে ব্যথিত ও অপমানিত বোধ করব। এটা একটা অসম্মানের বিষয়। সে বার বার একইভাবে কার্লাকে এটা বলার চেষ্টা করে। কার্লা বার বার ক্লার্ককে এ থেকে অন্যদিকে ফেরানোর চেষ্টা করে কিন্তু ক্লার্ক অনড়।

বলে, “কথা দাও এটা তুমি করবে। কথা দাও।”

এটার কারণ ছিল যে কার্লা একবার ক্লার্ককে বলেছিল, “কখনও কখনও সে আমার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে।”

“ঐ বুড়ো?”

“মাঝে মাঝে সে তার রুমের ভেতরে আমাকে ডাকে।”

“হ্যাঁ।”

“যখন ওর স্ত্রী বাজারে যায় আর নার্সটাও কাছে থাকে না তখন।”

কার্লা ভাবে এটা ওর অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। এবং সে তাৎক্ষণিকভাবে তাতে খুশি।

“তো তুমি তখন কি কর? রুমের ভেতরে যাও?”

কার্লা লজ্জা পাওয়ার ভান করে।

“মাঝে মাঝে।”

“সে তোমাকে রুমের ভেতরে ডাকে, তারপর? কার্লা? বল! তারপর কি?”

“আমি ভেতরে যাই সে কি চায় তা দেখার জন্য।”

“তো সে কি চায়?”

এই কথোপকোথন চলে ফিসফিসিয়ে। যদিও তাদের ত্রিসিমানার মধ্যে কেউ ছিল না। কথা হচ্ছিল তাদের বিছানায় যেখানে কারো আসার প্রশ্নই ওঠে না। এটা ছিল একটা ঘুমানোর সময়ের গল্পের মত বিবরণযুক্ত এবং প্রতিবারই যাতে নতুন নতুন মাত্রা যোগ হয়। গল্পটা বলা হতো অনিচ্ছায়, লজ্জায় আর উচ্ছল হাসিতে। নোংরা, নোংরা! এটা শুধু যে একতরফা ছিল তা নয়। মেয়েটিও উদগ্রীব ছিল ঐ বুড়োকে আর নিজেকে উত্তেজিত করতে এবং খুশি করতে। সে এতটাই আত্মতৃপ্ত ছিল যে প্রতিবার এটা করত।

এই গল্পটা কার্লার মাথার এক অংশে ছিল সত্যি। সে ঐ বৃদ্ধটাকে বিছানার একটা অংশ উচু করে রাখতে দেখেছে। যদিও সে শয্যাশায়ী ছিল। কথা বলতে পারত না, কিন্তু ইশারায় সবই বুঝাতে পারত। তার জৈবিক তাড়না, মেয়েটাকে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়ে, আঙুল দিয়ে তাকে বিভিন্ন রকম শারীরিক কসরত ও ঘনিষ্ঠতা দেখিয়ে একটা জটিল পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিত। (ওর না বলাটা একটা জরুরি বিষয় ছিল কিন্তু অদ্ভুতভাবে ক্লার্কের কাছে এটা ছিল হতাশাব্যঞ্জক ব্যাপার।)

মাঝে মাঝেই তার মাথা থেকে একটা দৃশ্য সরিয়ে ফেলতে হতো। কারণ এই ছবিটা সবকিছু নষ্ট করে দিতে পারে। যে-হাসপাতালের ভাড়া করা বিছানায় পরে থাকা ঐ ভগ্ন শরীর, যা নাকি থাকত কাঁথায় মোড়ানো, ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় যে দেহ প্রতিদিন একটু একটু করে শুকাতে থাকে, সেই শরীরটার প্রতি দৃষ্টি পড়ত। দু-একবার যখন মিসেস জেমসন বা নার্স যে নাকি কিছু সময়ের জন্য ভুল করে দরজা খোলা রেখে দিত, তখনই শুধুমাত্র ও ঐ ঘরের ভেতরটা দেখতে পেত। এর চেয়ে কাছে থেকে সে কখনই মিস্টার জেমসনকে দেখেনি।

প্রকৃতপক্ষে সে খুব ভয় পেত জেমসনদের বাসায় যেতে। কিন্তু টাকাটা তার প্রয়োজন ছিল। মিসেস জেমসন, যাকে উদ্ভ্রান্ত আর ঘুমন্ত অবস্থায় হেঁটে বেড়াচ্ছেন বলে ওর মনে হতো, তার জন্য কার্লার খুব মায়া হতো। মাঝে মাঝেই সে হট্টগোল করে বোকার মত পরিবেশটাকে হালকা করতে চাইত। যেমনটা সে করত নতুন কোন ঘোড়ার সোয়ারি যখন প্রথম বার ঘোড়ার পিঠে বসার চেষ্টা করে সেইরকম। কার্লা এটা ক্লার্কের সাথেও করেছে, যখন সে বাজে মুডে থাকত। সেই চালাকিটা এখন আর কাজ করে না। তবে মিস্টার জেমসনের গল্পটা সে ঠিকই বিশ্বাস করাতে পেরেছে।

 

রাস্তার মধ্যে ছোট ছোট গর্তের পানি বা পানিতে ডোবা ঘাসকে কোনভাবেই পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না। পাশ কাটানো যায় না সেই সদ্য ফোটা গাজরের ফুলগুলোকেও। কিন্তু বাতাসটা বেশ উষ্ণ থাকায় কার্লার ঠাণ্ডা লাগে না।

 

তার পরনের কাপড় বৃষ্টির জল আর তার চোখের জলে ভিজে একাকার হয়ে একসময় থেমে আসে। ওর কাছে নাক মোছোর জন্য কিছুই ছিল না। কাগজের ন্যাপকিন তখন ভিজে জবজবে। সে ঝুকে গর্তের মধ্যে তার নাক ঝাড়ে।

 

কার্লা তার মাথা তুলে জোরে একটা লম্বা শিস দিল। এটাই ছিল তার ও ক্লার্কের ফ্লোরাকে ডাকার সংকেত। সে বারবার শিস দিল। একবার তার নাম ডাকল আবার শিস দিল। আবার নাম ডাকল ও শিস দিল।

 

ফ্লোরা উত্তর দিল না।

 

ব্যাপারটা কিছুটা শান্তিদায়ক ছিল। ফ্লোরাকে হারানোর বেদনা, কেননা সেটা একবারের জন্যেই ছিল। হয়তো সে আর কখনই ফ্লোরাকে খুঁজে পাবে না। তার থেকে ফ্লোরার ঘটনাটা অনেক ভাল ছিল। কিন্তু মিস্টার জেমসনের ব্যাপারে সে জাটিলতায় পড়েছিল। ক্লার্কের সাথে তার দুখী জীবনের লুকোচুরি সে দেখতে পেল। অন্তত ফ্লোরার চলে যাওয়াতে তার কোন হাত ছিল না।

 

সিলভিয়ার ঘরের জানালা খোলা আর চিন্তা করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিলনা। তাকে অবাক না করেই তার মন খারাপ করে দেয় এমন অনেক কিছুই সে উদ্বিগ্ন হয়ে চিন্তা করল। মনে মনে সে ভাবলো কখন সে কার্লাকে দেখতে পাবে। এর মধ্যেই অসুস্থতার সমস্ত জিনিসপত্র সরানো হয়ে গেছে। যে ঘরটা প্রথমে সিলভিয়া ও তার স্বামীর শোবার ঘর ছিল এবং পরে ওর মৃত্যুঘরে পরিণত হয়, সেটাকে পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে। ওটাকে দেখে এখন আর মনেই হবে না যে ওখানে কিছু ছিল। কার্লা এটা করতে সিলভিয়াকে সাহায্য করেছিল। ঐ পাগল পাগল দিনগুলো ছিল জেমসনকে সৎকার করা আর ওর গ্রীসে বেড়াতে যাওয়ার মাঝামাঝি একটা সময়। লিয়নের প্রত্যেকটা কাপড়, যা সে পরেছিল বা পরে নাই, তার বোনদের দেয়া উপহার, যেগুলো খোলাই হয়নি, সবকিছুই গাড়ীর পেছনের সিটে নিয়ে ন্যায্যমূলের দোকানে দেয়া হলো। ওর যত ওষুধ, দাড়ি কামানোর যন্ত্র, অব্যবহৃত জুসের কৌটা, যা নাকি তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, তিলের কার্টুন, যা মাত্র একবার খুলেছিল, লোশনের প্লাস্টিকের বোতল, যে লোশন তার পিঠে মাখতে হতো, যে ভেরার চামড়া যার উপর সে শুয়ে থাকত- এর সবকিছু প্লাস্টিক ব্যাগে ভরে ময়লার ডিপোতে ফেলা হয়। কার্লা এ নিয়ে কোন প্রশ্ন করে নি। সে একবারও বলেনি, “হয়তো এগুলি কারো কাজে আসবে।” অথবা সে দেখিয়ে দিয়ে বলে নি যে পুরো কার্টুনটাই ধরা হয় নি। সিলভিয়া যখন বলেছিল যে, আমার সব কাপড় শহরে না নিয়ে যেয়ে পুড়িয়ে ফেলা উচিত ছিল, তখনও সে অবাক না হওয়ার ভান করেছিল।

 

তারা চুলাটা পরিষ্কার করেছিল, আলমারীগুলো ঘষে পরিষ্কার করেছিল, দেয়াল, জানালাগুলো সব কাপড় দিয়ে মুছে পরিষ্কার করেছিল। একদিন সিলভিয়া তার সব শোকবার্তার চিঠিগুলো নিয়ে বসেছিল। সেখানে কোন কাগজের স্তূপ বা নোটবই ছিল না, বা কোন অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি। সে অনেকদিন আগেই সিলভিয়াকে জানিয়েছিল যে সবকিছু ফেলে দিয়েছে কোন রকম দুঃখবোধ ছাড়াই।

 

বাড়ীর দক্ষিণ দিকের ঢালু দেয়ালে বড় বড় জানালা ছিল। সিলভিয়া উপরে তাকালো, অবাক হয়ে তরল রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশ দেখল। কিংবা সে অবাক হয়ে কার্লার ছায়া দেখতে পেল। কার্লা দাঁড়িয়ে ছিল একটি মইয়ের উপরে, ওর অনাবৃত বাহু এবং তার কঠিন মুখাবয়ব, যার চারপাশে কোকড়া চুল দিয়ে বেনী গাঁথা যায় না, এসব দেখে সিলভিয়া অবাক হল। কার্লা জোরে জোরে পানি  ছিটিয়ে কাঁচ পরিষ্কার করছিল। যখন সে দেখল যে সিলভিয়া তাকে লক্ষ করছে, তখন সে থেমে গিয়ে হাত ছড়িয়ে দিয়ে এমন একটা ভাব করল যেন মনে হবে সে একটা স্থিরমূর্তি। সে হাত পা ছড়িয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। এটা দেখে দুজনেই হাসিতে ফেটে পড়ল। সিলভিয়ার মনে হলো যে সেই হাসিটা তার সমস্ত সত্তার ভিতরে দিয়ে বয়ে গেল, পানির ঝরণার ধারার মত। সে তার চিঠি পড়ার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল আর কার্লা জানালা পরিষ্কারের কাজে। সিলভিয়ার মনে হলো এই সমস্ত চিঠির ভাষা, হোক সেটা সত্য বা মেকী, সবকিছুকেই ভেড়ার চামড়ার বা বিস্কুটের পথেই পাঠাতে হবে। অর্থাৎ ডাস্টবিনে ফেলতে হবে।

যখন সে কার্লাকে নেমে আসতে শুনল, মানে বুটের শব্দ কাঠের মেঝের উপর শোনা গেল, তখন সে একটু লজ্জাই পেল। সে যেখানে বসেছিল সেখানেই মাথা নীচু করে বসে থাকল। কার্লা ঘরের ভেতর ঢুকে ওর পেছন দিয়ে রান্নাঘরে গেল বালতি ও কাপড় বেসিনের নীচে রাখার জন্য। কার্লা কখনই থামত না, সে কেবল একটা পাখির মতো উড়ে বেড়াত। কিন্তু তারপরও সে সিলভিয়ার আনত কপালে একটা চুমু দিয়ে গেল। তারপর সে শিস দিতে দিতে চলে গেল।

এরপর থেকে চুমুর কথাটা সিলভিয়ার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। এটা কোন বিশেষ কিছু ছিল না। শুধু মনে করিয়ে দেওয়া খুশি থাকো অথবা আমার কাজ প্রায় শেষ, এ ধরনের একটা অভিব্যক্তি। আবার এটা এও মনে করিয়ে দেয় যে ভাল বন্ধুরা অনেক কঠিন দুঃখের সময় একসাথে পার করে। অথবা এটা মনে হতে পারে যে সূর্য উঠে গেছে আর কার্লা তার ঘোড়াগুলোর কথা ভাবছে। তাকে সেখানে যেতে হবে। সেটা যাই হোক সিলভিয়া এটাকে একটা উজ্জ্বল প্রস্ফুটন বলে মনে করল। পাপড়িগুলো প্রচণ্ড তাপে ভেতর থেকে ছড়িয়ে পড়ল, ঠিক যেন মেনোপোজের হট ফ্লাশের মত।

 

মাঝে মাঝেই সে তার বোটানি ক্লাসে এক একটা তুখোর ছাত্রী পেত, যার চতুরতা, একাগ্রতা আর লজ্জাকর উন্নাসিকতা অথবা বোটানির প্রতি তার অগাধ ভালবাসা দেখে তার নিজের ছোটবেলার কথা মনে হতো। নানা ধরনের মেয়ে সাধারণত তাকে পুজনীয় মনে করত। এরা আবার তার সান্নিধ্য চাইত যেটা তারা কখনই কল্পনাও করতে পারত না। কিছুদিন যেতেই তাদের উপর সিলভিয়ার বিরক্তি ধরে যেতো। কার্লা আবার সেরকম ছিলনা। ওর যদি কারো সাথে মিল থাকত তবে তা ছিল সিলভিয়ার কিছু হাইস্কুলের বন্ধুর সাথে। তারা বুদ্ধিমতী ছিল, কিন্তু চতুর ছিল না। যারা চালাক ছিল, তারাও অতিরিক্ত চালাক ছিল না। এরা ছিল প্রকৃতিগতভাবে ক্রীড়াবিদ, কিন্তু তারা অনেক পরিশ্রমী ছিলনা। এরা অত্যন্ত উচ্ছল ছিল কিন্তু উশৃঙ্খল ছিল না। এরা ছিল স্বভাবতই হাসিখুশি ধরনের মানুষ।

 

“আমি যে ছোট্ট গ্রামটাতে থাকতাম, ওটা এতটাই ছোট্ট ছিল যে খুব কমই টুরিস্ট বাস সেখানে থামত, আমি আর আমার দুই বন্ধু মিলে আমরা ওখানে ছিলাম। এমন যদি হত যে বাসটা পথ হারিয়ে ফেলেছে, তখনই কেবল টুরিস্টরা বাস থেকে নেমে চারিদিকে ঘুরে দেখত এবং তারা অত্যন্ত অবাক হতো কেননা তারা কোন নামকরা জায়গায় আসেনি বলে। ওখানে কোন কিছু কেনারও ছিল না।”

সিলভিয়া গ্রীসের কথা বলছিল, কার্লা ওর থেকে কয়েক গজ দূরে বসে ছিল। বড় বড় হাত-পা-ওয়ালা, চোঁখ ধাঁধানো মেয়েটা শেষমেষ ওর ঘরে বসে ছিল অত্যন্ত অস্বস্তি নিয়ে। এই ঘরটাকে নিয়েই ওর যত চিন্তা, ওর ভাবনা। সিলভিয়া মৃদু হাসছিল, খানিক বাদে বাদে মাথা নাড়ছিল।

 

“প্রথম দিকে আমিও একটু হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম, এত গরম ছিল ওখানে,” সিলভিয়া বলে। “কিন্তু এটা সত্যি যে ওখানে ঝলমলে আলো ছিল। অদ্ভুত! তারপর আমি দেখলাম যে সেখানে কি কি করা যায়। ওগুলো ছিল কয়েকটা ছোট ছোট কাজ, কিন্তু সেগুলো করে অনায়াসে দিন পার করা যায়। যেমন আধা মাইল হেঁটে গিয়ে তুমি তোমার নিজের জন্য তেল কিনতে পারো, আবার ঠিক তার উল্টো দিকে আরো আধা মাইল হেঁটে গিয়ে তুমি পাউরুটি অথবা ওয়াইন কিনতে পারো। এ-তো গেল সকাল বেলার কথা, দুপুরে কোন একটা গাছের নিচে তুমি দুপুরের খাওয়াটা সেরে নিতে পারো। তারপর যেটা হবে, ভীষণ গরম পড়ে যাবে, তোমাকে জানালা দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকতে হবে। প্রথম কয়েকদিন হয়তো তুমি বই পড়বে, তারপর থেকে সেটাও আর করা হবে না। তুমি চিন্তা করবে কেন পড়ব? পরে যখন তোমার ছায়াটা অনেক লম্বা হতে শুরু করবে তখন হয়তো তুমি বের হয়ে সাঁতার কাটতে যাবে।”

“ওহ।” হঠাৎ করে সে থেমে গিয়ে বলল, “আমি ভুলে গিয়েছিলাম।”

সে লাফ দিয়ে উঠে একটা উপহার, যেটা ওর জন্য এনেছে, সেটা নিয়ে আসে। গ্রীসে থাকার সময় থেকেই উপহারটার কথা তার মনে ছিল। তবে সেটা সে যেনতেন মুহূর্তে কার্লাকে দিতে চায়নি। একটা বিশেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিল, যে সমটা খুব স্বাভাবিকভাবে আসবে। তাই সে আগে থেকেই ভেবে রেখেছিল. যখন সে সাগরের কথা বলবে, তখন বলবে সাঁতার কাটার সময় আমার এটার কথা মনে পড়েছিল। কারণ, এটা একটা ঘোড়ার সঙ্গে যুক্ত একটা জিনিস, ঘোড়াটা পাওয়া গিয়েছিল সাগরের তলদেশে। এটা ব্রোঞ্জের তৈরি। মাটি খনন করে ওরা এটা তুলে এনেছিল। বলা হয়ে থাকে, এটা খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের তৈরী। এইরকম ভাবনা আর কি।

 

কার্লা যখন বাসার ভেতরে এসে কি করবে তা খুঁজে বেড়াচ্ছিল, তখন সিলভিয়া বলে, “ওহ্ দুই মিনিটের জন্য এখানে বস। এখন পর্যন্ত ফিরে আসার পর আমি কারো সাথে কোন কথা বলি নি। প্লিজ।” কার্লা চেয়ারের অগ্রভাগে পা ফাঁক করে বসে। ওর হাত দুটো থাকে দুই হাঁটুর মাঝখানে। ওকে দেখে মনে হয় ও খুব নিঃসঙ্গ। কিছুটা ঠাণ্ডাগলায় ভদ্রতার সাথে জিজ্ঞেস করে, “গ্রীসে কেমন কাটল?”

 

কার্লা তখন দাঁড়িয়ে; ঘোড়াটা টিসু পেপার দিয়ে মোড়ানো অবস্থায় তার হাতে ধরা। সব কাগজ এখনও সে ঘোড়ার উপর থেকে সরায়নি।

“এটা একটা রেসের ঘোড়ার প্রতিকৃতি,” সিলভিয়া বলে। “ঘোড়াটা এখন রেসের শেষ দিকে। দেখ, এর সওয়ারী, মানে ছেলেটা ঘোড়াটাকে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে দৌড়ানোর জন্য উৎসাহ দিচ্ছে।” ও বলল না যে ছেলেটাকে দেখে ওর কার্লার কথা মনে হয়েছে। যদিও সে ঠিক বুঝতে পারে নাই কেন সেটা হয়েছে। ছেলেটার বয়স দশ-বার বছর হবে। হয়তো যে হাতটা ঘোড়ার দড়িটা ধরেছিল, তার শৌর্য ও বীর্য দেখে, অথবা তার শিশুসুলভ কাপালের ভাঁজ দেখে কিংবা তার কাজের মধ্যে গত বসন্তে কার্লার জানালা পরিষ্কার করার সময় যে একাগ্রতা ছিল, তার আভাস দেখতে পেয়ে সিলভিয়ার এসব মনে হতে পারে। স্কার্টের নীচে তার সুঠাম অনাবৃত পা, চওড়া কাঁধ, তার শক্ত হাতে জানালা ধোয়ার কায়দা এবং সেখানে কাঠের মূর্তির মত চেহারা বানানো এবং সিলভিয়াকে হাসতে বাধ্য করাতে সে ওকে ঐ ঘোরসওয়ারের সাথে তুলনা করতে বাধ্য হয়।

“সেটা বোঝা যাচ্ছে।” কার্লা বলেই সবুজ ব্রোঞ্জ ঘোড়া ও তার সওয়ারীকে ভালভাবে নীরিক্ষণ করে। তারপর সে বলে, “অনেক ধন্যবাদ।”

সিলভিয়া বলে “স্বাগত, চল কফি খাই। কি বল? আমি এখনই বানালাম। গ্রীসের কফিটা খুবই কড়া ছিল। মানে, আমি যতটা কড়া খাই তার চেয়েও একটু বেশী কড়া। কিন্তু পাউরুটিটা ছিল স্বর্গীয়। পাকা ডুমুরগুলো ছিল অসাধারণ।

আরেকটু বস! প্লীজ! তুমি কিন্তু আমাকে থামাবে, যদি আমি বেশী বক বক করতে থাকি। এদিকের কি অবস্থা? কেমন আছ তোমরা সবাই?”

“সারাদিনই বৃষ্টি হচ্ছে এখানে।”

“তা তো দেখতেই পাচ্ছি।” সিলভিয়া রান্নাঘরের কোনা থেকে বলল, সেটা ছিল বড় ঘরটার একেবারে শেষ প্রান্তে। সে কফি ঢালছিল। সে মনে মনে ঠিক করল যে অন্য আরেকটা উপহার, যেটা ওর জন্য এনেছে, সেটার কথা কিছু বলবে না। ওটা কিনতে তার কোন পয়সা খরচ হয় নি। (কিন্তু ঘোড়াটাতে যত খরচ হয়েছে, তার কথা মেয়েটা হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না।) এটা একটা গোলাপি আভাযুক্ত সাদা পাথর, যা সে রাস্তার ধারে খুঁজে পেয়েছিল। ওর বন্ধু ম্যাগীকে সে বলেছিল, “এটা কার্লার জন্য। আমি জানি শুনতে বোকার মত লাগছে কিন্তু আমি চাই এই দেশের মাটির একটা অংশ ওর কাছে থেকে যাক।”

ম্যাগিকে সে কার্লার কথা আগেই বলেছিল। সুরাইয়াকেও। সুরাইয়া হলো ওর আরেক বন্ধু। সে ওদেরকে বলেছিল যে কেমন করে এই মেয়েটির উপস্থিতি তার কাছে অতি আনন্দের একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যেন একটা অদৃশ্য বাঁধন তাদের মধ্যে তৈরী হয়ে ছিল এবং সে তাকে গত বসন্তের ভয়ংকর দিনগুলোতে অনেক সান্ত্বনা দিয়েছিল।

“এটা হলো একটা তরুণ প্রাণের উপস্থিতি, আমাদের ঘরে একটা সজীব ও স্বাস্থ্যবান মানুষের উপস্থিতি।”

ম্যাগি ও সুরাইয়া এটা শুনে হেসেছিল, কিন্তু সিলভিয়া মনে মনে বিরক্ত হয়েছিল।

“সবসময়ই একটা মেয়ে থাকবেই।” অসল ভঙ্গিতে ভুরু তুলে সুরাইয়া বলল।

ম্যাগি বলল, “আমাদের সবারই একটা সময় কোন না কোন মেয়েকে পছন্দ হবেই।”

সিলভিয়ার ভীষণ রাগ হচ্ছিল “পছন্দ” কথাটা শুনে, কিন্তু সে সেটা প্রকাশ করে নি। বরং সে বলে ওঠে, “এটা হয়তো আমার আর লিয়নের কোন বাচ্চাকাচ্চা না থাকার জন্য হয়েছে। মায়ের ভালবাসাটা অন্য জায়গায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে।”

ওর বন্ধুরা ঠিক একই সময়ে ভিন্নভাবে একই কথা বলে ওঠে; যার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, যতই আপাতদৃষ্টিতে মনে হোক এটা বোকামী, তবে তা কিন্তু ভালবাসাই। কিন্তু যে মেয়েটাকে সিলভিয়া আজকে দেখছে সে কিন্তু সেই কার্লা নয়, যাকে মনে করে সে কথাগুলো বলছে। এই মেয়েটি মোটেই সেই স্থির, কর্মচঞ্চল, দয়ালু মেয়ে নয় যে গ্রীসে থাকাকালে তাকে সর্বক্ষণ সঙ্গ দিয়েছিল।

কার্লা তার উপহারের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ প্রকাশ করল না। বরং গম্ভীর ভাবে কফি শেষ করল।

“একটা জিনিস ওখানে ছিল সেটা তোমার খুব পছন্দ হতো।” সিলভিয়া  উৎফুল্লভাবে বলল, “ওখানকার ছাগলগুলো, ওরা প্রাপ্তবয়সেও অনেক ছোট ছিল। কিছু কিছুর গায়ে ছোট ছোট দাগ ছিল, আবার কিছু ছিল সাদা, সারা জায়গায় এরা এমনভাবে লাফিয়ে বেড়াচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল এরাই ওখানকার প্রেরণার উৎস।” এরপর সিলভিয়া অত্যন্ত মেকী একটা হাসি  দিল, মনে হলো যেন সে কোনভাবেই নিজেকে থামাতে পারছে না। “আমি একটুও অবাক হতাম না যদি দেখতাম যে ওদের শিঙের উপর ফুলের মালা পড়ানো হতো। তোমার ছোট ছাগলটার কি খবর? ওর নামটা ভুলে গেলাম।”

কার্লা বলে, “ফ্লোরা।”

“ফ্লোরা।”

“ও চলে গেছে।”

“চলে গেছে মানে? বিক্রি করে দিয়েছ?”

“সে হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে। আমরা জানি না কোথায়।”

“ওহ দুঃখিত। আমি খুবই দুঃখিত। কিন্তু এমনও তো হতে পারে যে সে হঠাৎ করে আবার চলে আসবে?” কোন উওর নেই। সিলভিয়া সরাসরি ওর দিকে তাকালো। এর আগ পর্যন্ত ও যেটা করতে পারে নাই। এবং দেখল যে ওর চোখ জলে ভরে গিয়েছে। ওর নাক মুখ লাল ও ফোলা। প্রকৃতপক্ষে ওর মুখটা ম্লান দেখাচ্ছিল। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল যে ও দুঃখ শোকে ভারাক্রান্ত । সিলভিয়ার দৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য সে কিছুই করল না। সে তার দাঁত দিয়ে ঠোঁটের উপর চাপ দিল এবং চোখ বন্ধ করে সামনে পিছনে দুলতে লাগল যেন কোন শব্দ ছাড়াই মাতম করতে পারে। এবং তারপরই সে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। ওকে অবাক করে দিয়ে সে চিৎকার করে কাঁদল এবং হা করে মুখ ভরে বাতাস নিল। তার গাল বেয়ে পানি পড়তে থাকল এবং নাক দিয়ে সর্দি পড়তে লাগল, কার্লা পাগলের মত তার নাক মোছার জন্যে কিছু খুঁজতে লাগল। সিলভিয়া দৌড়ে দিয়ে ক্লিনেক্সের বাক্স নিয়ে আসল।

 

“চিন্তা করো না। এই তো তুমি ঠিক আছ।” সে ভাবল হয়তো ওকে জড়িয়ে ধরলে ও ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সেটা করতে সে ইচ্ছুক ছিল না। এতে হয়তো সবকিছু উল্টা পাল্টাও হয়ে যেতে পারে। মেয়েটা হয়তো ভাবতে পারে যে সিলভিয়া এই কাজটা করতে মোটেও উৎসাহী ছিল না। ও হয়তো এটাও বুঝতে পারবে যে সে এই হট্টগোলে একেবারে অপ্রস্তুত হয়ে গেছে।

কার্লা কিছু একটা বলল এবং তার পুনরাবৃত্তি করল।

“খুবই খারাপ একটা বিষয়; খুবই খারাপ।”

“না এটা খারাপ না। আমাদের সবারই কোন না কোন সময় কাঁদতে হয়। ঠিক আছে; মন খারাপ করো না।”

“এটা খুবই খারাপ একটা বিষয়।”

ইতোমধ্যে সিলভিয়া উপলদ্ধি করল, প্রতিটি মুহূর্তে কার্লা যেভাবে ধীর গতিতে নিজেকে দুঃখের সাগরে নিমজ্জিত করছে, তাতে তাকে আর দশটা সাধারণ মেয়ে- যাদের সাথে বোটানি ক্লাসে সিলভিয়ার রোজ দেখা হয়- তাদের একজন বলে মনে হল। এসব মেয়ে ওর অফিসে এসে পরীক্ষার নম্বরের জন্য কান্নাকাটি করে। এরা সাধারণত সিলভিয়ার মন কখনই গলাতে পারে না। কখনও কখনও দেখা যেত, এই কান্নাকাটির বিষয়টা প্রেমঘটিত জটিলতা অথবা বাবা-মার সাথে সমস্যা অথবা কোন মেয়ের অন্তসত্ত্বা হওয়ার কারণে জটিলতা তৈরী হওয়া।

“তোমার ছাগলটার সমস্যা কি তোমার আসল সমস্যা?”

“না , না।”

“তুমি একটু পানি খাও।” সিলভিয়া বলল। ও অনেক সময় নিয়ে কল থেকে পানি নিল, তাতে করে সে চিন্তার সময় পেল- ও আর কি কি কার্লাকে বলতে পারে। ফিরে এসে দেখল কার্লা অনেকটাই নিজেকে সামলে নিয়েছে।

“দেখছো? এখন কি তুমি একটু ভাল বোধ করছ না?”

কার্লা বলল, “আমি আর এটা নিতে পারছি না”।

কি নিতে পারছে না ও?

“আমার স্বামীকে।”

“সে সবসময় আমার উপর রেগে থাকে।”

ও এমন একটা ভাব করে যে সে কার্লাকে ঘৃণা করে। তার এমন কিছুই ছিল না যেটা সে ঠিকমত করতে পারে। এমন কিছুই ও বলতে পারে না যা সঠিক। ওর সাথে থাকতে থাকতে কার্লা পাগল হয়ে যাচ্ছিল। মাঝে মধ্যে সে নিজেকে পাগলই ভাবত। আবার কোন কোন সময় ওর স্বামীকে ওর পাগল মনে হতো।

“ও কি তোমার গায়ে হাত তোলে, কার্লা?”

না সেটা সে কখনও করে নি। কিন্তু সে কার্লাকে ঘৃণা করে, ভীষণ অপছন্দ করে। কার্লাকে সে একেবারেই সহ্য করতে পারে না যদি কার্লা কোন কারণে কাঁদে। সে কার্লার কান্না থামাতে পারে না, কারণ সে কার্লার সাথে রেগে থাকে। ও ঠিক বুঝে উঠতে পারে না ওর কি করা উচিৎ।

“কিন্তু তুমি তো ঠিকই জান তোমার কি করা উচিৎ।” সিলভিয়া বলে।

“কোথাও চলে যাওয়া? আমি অবশ্যই যেতাম যদি যেতে পারতাম।” কার্লা আবারও হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। “আমি যে-কোন কিছু করতে রাজি। আমি এখান থেকে চলে যেতেও পারি। কিন্তু আমি সেটা পারব না। আমার কাছে কোন টাকা-পয়সা নেই। আমার যাওয়ারও কোন জায়গা নেই।”

“ওহ্! চিন্তা করে দেখ, এটা কি আসলে সত্যি?” সিলভিয়া খুব ভালভাবে কার্লাকে বোঝানোর চেষ্টা করল, তোমার বাবা মা নেই? তুমি আমাকে বলেছিলে না তুমি কিংস্টনে বড় হয়েছো? ওখানে কি তোমার কেউ-ই নেই?”

 

কার্লার বাবা-মা বৃটিশ কলম্বিয়াতে চলে গেছে। ওরা ক্লার্ককে অনেক অপছন্দ করে। কার্লা বাঁচল কি মরল তাতে তাদের কিছু যায় আসে না।

“ভাই বোন?”

একটা ভাই আছে কার্লার থেকে নয় বছরের বড়। সে বিয়ে করে টরন্টোতে থাকে। সেও নির্বিকার। ক্লার্ককে খুবই অপছন্দ করে। ওর বউ একটা উন্নাসিক মহিলা।

“তুমি কি কখনও মেয়েদের আশ্রম সম্পর্কে চিন্তা করেছো?”

“ওরা কাউকে আশ্রয় দেয় না যতক্ষণ পর্যন্ত সে মার না খায়। তাছাড়া আমি ওখানে গেলে এটা জানাজানি হয়ে যাবে আর সেটা ব্যবসার জন্য খুবই ক্ষতিকর হবে।”

সিলভিয়া মৃদু হাসল।

“এখন কি এসব ভাবার সময়?”

তখন কার্লা হেসে উঠল, “আমি জানি,” সে বলল। “এটা নিছক আমার পাগলামি।”

“শোন,” সিলভিয়া বলল, “আমার কথা শোন, তোমার কাছে টাকা থাকলে তুমি চলে যেতে? কোথায় যেতে তুমি?”

আমি টরোন্টতে চলে যেতাম, খুব দ্রুত উত্তর দেয় কার্লা। “কিন্তু আমি আমার ভাইয়ের কাছে যেতাম না। আমি হয়তো কোন একটা মোটেল বা কোথাও থাকতাম। আমি ঘোড়ায় চড়া শেখানোর কোন একটা খোঁয়াড়ে কাজ নেওয়ার চেষ্টা করতাম।”

“তোমার মনে হয় তুমি তা করতে পারবে?”

“আমি তো এরকম একটা খোঁয়াড়েই কাজ করতাম যখন ক্লার্কের সাথে আমার দেখা হয়। আমি এখন আগের থেকে অনেক বেশী অভিজ্ঞ। অনেক বেশী।”

“তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তুমি এসব নিয়ে অনেক ভেবেছ,” সিলভিয়া চিন্তা করে বলে। কার্লা বলে, “অবশ্যই, এসব আমি ভেবেছি।”

“তো তুমি কবে যেতে চাও, যদি পার?”

“আজকে, এই মুহূর্তে, এখনই।”

“যা তোমাকে আটকে রেখেছে তা হলো টাকা পয়সার অভাব, তাই তো?”

কার্লা গভীর নি:শ্বাস নিয়ে বলল, “সেটাই আমার বাধা।”

“ঠিক আছে।” সিলভিয়া বলল, “এখন আমার প্রস্তাবটা শোনো। আমার মনে হয়না তোমার কোন মোটেলে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। আমার মনে হয় তুমি বাস নিয়ে সোজা টরোন্ট গিয়ে আমার এক বন্ধুর সাথে থাক। ওর নাম হল রুথ স্টাইলস্। ওর অনেক বড় বাসা আছে, এবং ও একা থাকে। তাই তার অসুবিধা হবে না কেউ একজন তার কাছে গিয়ে থাকলে। তুমি ওর সাথে থাকতে পার যতদিন না তুমি কোন চাকরি পাও। আমি তোমাকে কিছু টাকা দিচ্ছি। টরেন্টোর আশেপাশে নিশ্চয়ই অনেক ঘোড়ার খোঁয়াড় থাকবে যারা ঘোড়া চড়ানো শেখায়।

“হ্যাঁ তা আছে।”

“তো তুমি কি করবে? আমি কি ফোন করে জেনে নেবো বাস কয়টায় ছাড়ে?” ক্লারা কাঁপছিল। ওর হাত পায়ের উপর ঘষছিল আর মাথা এদিক থেকে ওদিক নাড়াচ্ছিল। কার্লা বলে, “হ্যাঁ”।

“আমি এটা বিশ্বাস করতে পারছি না। কিন্তু আমি তোমার টাকা ফেরত দেব। মানে, অনেক ধন্যবাদ। আমি তোমার টাকা ফেরত দেব। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না আমি কি বলব।”

 

সিলভিয়া এরই মাঝে বাসডিপোতে ফোন করতে চলে গেছে।

“আমি সময়টা জেনে নেই,” সে বলল, শুনল এবং ফোনটা রেখে দিল।

“আমি জানি তুমি আমার টাকা ফেরত দেবে। কিন্তু তুমি রুথের ওখানে থাকতে রাজি আছ তো?”

“আমি ওকে জানিয়ে দিচ্ছি তুমি যাচ্ছ। আরেকটা সমস্যা দেখছি। তুমি তো এই কাপড়ে যেতে পারবে না,” সিলভিয়া কার্লার শর্টস ও টিশার্টের দিকে তাকিয়ে বললো।

“আমি বাসায় গিয়ে কিছু আনতে পারব না।”

কার্লা অস্থির হয়ে উঠল, “আমার অসুবিধা হবে না।”

“এয়ারকন্ডিশন বাস, তুমি তো জমে যাবে। আমার কিছু না কিছু আছে যা তুমি পড়তে পার। লম্বায় বোধ হয় আমরা কাছাকাছিই হবো, তাই না?”

“তুমি আমার চেয়ে দশগুণ চিকন।”

“আমি তো এমন ছিলাম না।”

শেষ পর্যন্ত একটা খয়েরী লিনেন কোট যেটা কখনই পড়া হয়নি, সিলভিয়া কেনার পরপরই বুঝতে পারে যে এই স্টাইলটা ভীষণ চোখে পড়ার মত যা তাকে কখনই মানাবে না। তার সাথে হালকা খয়েরী রঙের প্যান্ট ও ক্রীম রঙের সিল্ক শার্ট বেছে নেওয়া হল। কেডস পড়েই কার্লাকে থাকতে হলো, কেননা ওর জুতার মাপ সিলভিয়ার থেকে সাইজে বড়।

 

কার্লা গোসল করতে গেল, এর আগ পর্যন্ত এটা নিয়ে সে কোন মাথা ঘামায় নি। সিলভিয়া রুথকে ফোন করল। সে বলল যে ও রাতে একটা মিটিংয়ে যাবে কিন্তু চাবি উপরের তলার ভাড়াটিয়ার কাছে দিয়ে যাবে। কার্লার শুধু ওদের ঘরের বেল টিপতে হবে।

“ওর একটা ট্যাক্সি নিতে হবে বাস ডিপো থেকে। আমি ধরে নিচ্ছি সেটা তার জন্য কোন সমস্যা হবে না।” রুথ বলে।

সিলভিয়া হাসে। “ও তো খোড়া বা ল্যাংড়া না। সে শুধু একটা বাজে পরিস্থিতির শিকার।”

“ভাল। ও যখন এ থেকে বের হয়ে আসতে পারছে তাহলে সেটা অবশ্যই ভাল।”

কার্লা মোটেই ল্যাংড়া বা খোড়া নয়। সিলভিয়া মনে মনে ভাবল, যখন ওকে টেইলরের বানানো প্যান্ট ও লিনেন কোট পড়ে থাকতে দেখল। কত তাড়াতাড়ি একটা দুঃখ ভারাক্রান্ত মানুষ পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে একটি সুন্দর সুঠামদেহী মানুষে, শুধু কিছু পরিষ্কার জামা-কাপড় পড়েই।

বাসটা শহরে থামবে দুটা বিশ মিনিটে। সিলভিয়া দুপুরের খাবারের জন্য ডিম ওমলেট করল। টেবিলকে নীল রং টেবিল ক্লথ দিয়ে সাজাল, ক্রিস্টালের গ্লাস বের করল, একটা ওয়াইনের বোতলও বের করল।

“আমি আশা করি তোমার খিদে পেয়েছে,” সিলভিয়া কার্লাকে বলল যখন সে ধার-করা কাপড় পরে সতেজ হয়ে বাথরুম থেকে বের হলো। ওর হালকা দাগওয়ালা মুখের চামড়া তখন চক চক করছে। ওর চুলের রং ভেজা থাকায় আরও গাঢ় দেখাচ্ছিল। গোসল করার সময় ওর বেনিটা খুলে গিয়েছিল। ছোট ছোট কোঁকড়া চুলগুলোকে এখন সমানভাবে ওর মাথার সাথে লেপ্টে আছে। কার্লা বলল তার খিদে পেয়েছে। কিন্তু যখন সে কাঁটাচামচ দিয়ে ডিমের ওমলেট মুখে পুরে নিল তখন ওর হাতটা কেঁপে উঠল এবং কিছুতেই সে খাবার খেতে পারল না। “আমি ঠিক জানি না আমি এইভাবে কাঁপছি কেন? আমি খুবই আনন্দিত। আমি বুঝিনি যে এটা এত সহজ হবে।”

এই ঘটনাটা খুবই হঠাৎ করে ঘটে গেল। তাই হয়তো তোমার কাছে এটা সত্যি মনে হচ্ছে না।”

“একে আমার সত্যিই মনে হচ্ছে। সবকিছুই এখন সত্যি মনে হচ্ছে। এর আগেই বরং আমার মনে হয় আমি একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম।”

“আমার মনে হয় আমরা যখন কোনকিছু করার জন্য মনস্থির করে ফেলি তখন সেটা স্থির হয়েই যায়। এটাই হওয়া উচিৎ বলে আমি মনে করি।”

কার্লা মুখে একটু হাসি টেনে বলে, “যদি তোমার একটা বন্ধু থাকে। মানে যদি তোমার মত সত্যিকার একটা বন্ধু থাকে, তাহলেই।” সে তার ছুড়ি ও কাটাচামচ নামিয়ে রাখে এবং তার ওয়াইনের গ্লাসটা দুই হাত দিয়ে উঁচু করে ধরে এবং কিছুটা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলে, “আমি আমার এক সত্যিকার বন্ধুর উদ্দেশ্যে এই পানীয় উৎসর্গ করলাম।” সে অস্বস্তি নিয়ে বলে, আমার হয়তো এ থেকে এক চুমুকও খাওয়া উচিত না, কিন্তু আমি এটা পান করব।”একটা হাসিখুখির আবহ তৈরি করতেই সিলভিয়া বলে, “আমিও করব। কিন্তু সে একচুমুক মুখে দিয়েই সমস্ত পরিবেশটা নষ্ট করে ফেলে, “তুমি কি ক্লার্ককে ফোন করবে?” কার্লা বলে, “না।” “কি? ওকে তো জানতে হবে। অন্তত তাকে তো জানতে হবে তুমি কোথায় গেছ যখন সে তোমাকে বাসায় আশা করবে,” সিলভিয়া বলে। “ফোনে নয়,” কার্লা সচকিত হয়ে বলল, “আমি ফোন করতে পারব না। তুমি কি পারবে?” “না,” সিলভিয়া বলে।

“কি বোকার মত কথা বললাম। আমার এটা বলা উচিৎ হয় নি। আমার জন্য এই মুহূর্তে ঠিকভাবে চিন্তা করাও কঠিন। আমার যেটা করা উচিত সেট হলো একটা চিঠি মেইল বাক্সে ফেলে দেওয়া। কিন্তু আমি চাই না যে সে খুব তাড়াতাড়ি ওটা পাক। আমি ঐ পথ দিয়ে শহরের বাসও ধরার জন্য যেতে চাই না। আমরা পেছনের রাস্তা দিয়ে যাব। তাই আমি যদি লিখে চিঠিটা তোমাকে দেই, তুমি কি সেটা মেইল বক্সে ফেলে দিতে পারবে না? তুমি আমাকে নামিয়ে যখন ফেরত আসবে তখনই ওটা ফেলতে পারবে।”

সিলভিয়া রাজী হলো। এ ছাড়া আর কোন পথও ছিল না।

সে কলম ও কাগজ নিয়ে এল। আরেকটু ওয়াইন ঢেলে নিল। কার্লা কিছুক্ষণ ভেবে লিখল। “আমি চলে যাচ্ছি। পরে সব লিখে জানাব।”

চিঠিটা সিলভিয়া পড়ল যখন সে বাসডিপো থেকে ফিরে এল। বানান ভুল দেখে সে ভাবল, কার্লা নিশ্চয় এই বানানটা জানে, কিন্তু হয়তো তাড়াহুড়া করে এটা লিখেছিল বলে ভুল হয়েছে। কার্লা তখন ছিল দারুণ উত্তেজিত এবং তার কি করা উচিত, বুঝে উঠতে পারছিল না। সিলভিয়া হয়তো সেটা বুঝতে পেরেছিল। ওয়াইন পান করার পর কথাবার্তা অনেক বেশী হচ্ছিল। কিন্তু সেগুলো দুঃখের বা মনখারাপের কথা ছিল না। সে সেই ঘোড়ার খামারের কথা বলেছিল সেখানে সে কাজ করত; সেখানেই ক্লার্কের সাথে তার দেখা হয়, কার্লা বলেছিল। তখন তার বয়স মাত্র আঠার। সে কেবল হাইস্কুল পাস করে বেরিয়েছিল। ওর বাবা মা চাইতেন ও কলেজে যাক। সেও রাজি ছিল, কিন্তু শর্ত ছিল এই যে তাকে পশুর ডাক্তার হতে দিতে হবে। সে সারাজীবন চেয়েছে যে, পশুদের কাছে থাকবে, পশুদের সাথে কাজ করবে এবং একটা গ্রামে থাকবে।

 

ক্লার্কের মত ঘোড়ায় চড়া শেখানোর মতো ভালো শিক্ষক সে কখনও পায় নি। সব মেয়েই ওকে অনেক পছন্দ করত। অনেকে ঘোড়ায় চড়া শিখছিল শুধু ওর সান্নিধ্যে আসার জন্য। কার্লা এটা নিয়ে ওর সঙ্গে হাসিঠাট্টা করত। প্রথম দিকে ক্লার্ক কিছু না বললেও পরের দিকে ও বিরক্ত হতো। তখন সে সেটার জন্য ক্ষমা চেয়ে ওর ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা জানতে চায়। সে বলে তার এরকম একটা স্কুল করার পরিকল্পনা রয়েছে যেখানে সে ঘোড়ায় চড়া শেখাবে। একটা ঘোড়ার খোঁয়াড় থাকবে কোন একটা গ্রামে। একদিন কার্লা খোঁয়াড়ে এসে উপলব্ধি করে যে সে ক্লার্কের প্রেমে পড়েছে।

সে ভাবে, এটা হয়তো কেবল শারিরীক একটা আকর্ষণ ছিল।

শরতের শেষে যখন তার গুয়েলফের একটা কলেজে ভর্তি হবার কথা, তখন সে আর সেখানে যেতে চাইল না। সে বলল তার ঘোড়ায় চড়া শিখতে আরো এক বছর সময় লাগবে।

যদিও ক্লার্ক খুবই একটা চালাক ছেলে ছিল, সেও কলেজ শেষ করে নি। ওর পরিবারের সাথে যোগাযোগ একেবারে বন্ধ করে দিয়েছিল। ওর মতে পরিবার হলো রক্তে বিষের উপস্থিতির মত। ও একটা মানসিক হাসপাতালে কাজ করেছে, লেথব্রিজ আলবার্টা স্টেশনে একটা রেডিও জকির কাজও করেছে। থান্ডার বেতে নাপিতের দোকানে কাজ করেছে এবং সেনাবাহিনীর স্টোরেও কাজ করেছে। এসব কথা ক্লার্ক কার্লাকে বলেছে। ওকে সবাই জিপসি রোভার নামে ডাকত, এটা ছিল্ ঐ গানটা থেকে, যেটা ওর মা গাইত। যখন ও সারাক্ষণ এই গানটা গেয়ে বেড়াত তখন ওর মা ঠিকই বুঝতে পারছিল যে কিছু একটা ঘটতে চলেছে।

 

গতকাল সে একটা পালকের বিছানায় ঘুমিয়েছে।

সিল্কের একটা কম্বল গায়ে দিয়ে।

আজ রাতে সে ঘুমাবে অনেক,

মাটির উপর তার প্রেমিক জিপসি রোভারের পাশে।

 

ওর মা বলেছিল, এই লোক তোমার হৃদয়টাকে ভেঙে খানখান করবে, দেখ। কার্লার সৎ বাবা একজন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, যে বলেছিলো, ক্লার্ক একটা “লুজার”। এই যে, যেসব লোকেরা ভেসে বেড়ায়, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় তারাই লুজার। উনি এমনভাবে কথাগুলো বলতেন যে মনে হতো ক্লার্ক ছিল একটা পোকা, কাপড় ঝাড়লেই যে ঝরে পরে যাবে।

 

কার্লা শুনে বলেছিল, যারা ভেসে বেড়ায় তাদের কি এত টাকা জমানো থাকে যেটা দিয়ে একটা ফার্ম কেনা যায়, ক্লার্ক কিন্তু সেটা করেছে। তখন সৎ পিতার উওর ছিল, “আমি তোমার সাথে এ নিয়ে তর্ক করতে চাই না।” সে তো ওর আপন মেয়ে ছিল না। উনি এমনভাবে কথাটা বললেন যেন উনি ব্যবসার জন্য কোন কিছুর দরদাম করছেন।

শেষ পর্যন্ত কার্লার ক্লার্কের সাথেই পালিয়ে যেতে হলো। ওর বাবা মার ব্যবহার ওকে এটা করতে আরো উৎসাহিত করে তোলে।

“তুমি টরোন্টতে সেটেল করে কি তোমার বাবা মার সাথে যোগাযোগ করবে?” সিলভিয়া জিজ্ঞেস করে। কার্লা ভুরু তুলে নিঃস্বাস টেনে গাল ভিতরে ঢুকিয়ে ‘ও’-র মত ঠোট বানিয়ে বলল, “নাহ”।

সে একটু মাতালও হয়েছিল।

বাড়ী ফিরে সিলভিয়া চিঠিটা বাক্সে ফেলে, টেবিলের প্লেট-গ্লাসগুলো ধুয়ে ফেলল। ডিম ভাজার কড়াইটা ধুয়ে চকচকে করে ফেলল। নীল ন্যাপকিন  আর টেবিল ক্লথ ধোয়ার ঝুড়িতে ফেলে দিল। তারপর জানালা খুলে দিল। এটা সে কেন করল বুঝে উঠতে না পেরে বিরক্ত হল এবং একটু দুঃখবোধও তার হচ্ছিল। ও মেয়েটার গোসলের জন্য বাথরুমে একটা নতুন আপেল-গন্ধ সাবান রেখেছিল। এখনও তার ঘ্রাণ ঘরময় বিরাজ করছে। গাড়িতেও সেই গন্ধটা ছিল।

বৃষ্টি কিছুটা থেমে আসছিল। সে স্থির থাকতে পারছিল না। হাঁটতে বের হল সেই পথে যে-পথটা লিয়ন তৈরি করেছিল। যে জায়গাটায় কিছু পাথর জমা করে রেখেছিল সেগুলো প্রায় ধুয়ে গেছে। প্রতিবসন্তে তারা হাঁটতে বের হতো। বুনো অর্কিড খুঁজে বেড়াতো। লিওন তাকে সব বুনো ফুলের নাম শিখিয়েছিল। সবই তার মনেও থাকত শুধু একট্রিলিয়াম ছাড়া। ওকে লিয়ন ডাকত ডরোথি ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলে।

 

গত বসন্তে সে বাইরে গিয়ে লিয়নের জন্য একগুচ্ছ ডগস ভায়েলেট ফুল তুলে এনেছিল। সেগুলো দেখে সে এমনভাবে তাকালো যে মনে হলো সে ওগুলো একেবারেই পছন্দ করেনি এবং তখন তাকে বিমর্ষ দেখাচ্ছিল।

কার্লার ছবি ওর মনে ভাসতে লাগল। ওর বাসে চড়া, ওর দিকে হাত নাড়ানো, ওকে ধন্যবাদ জানানো, পুরোটাই যথেষ্ট আন্তরিকতার সাথে করা ছিল, কিন্তু সিলভিয়ার কাছে ব্যাপারটা যে শুধুই করার জন্য করা বলে মনে হলো।

বাড়ীতে ফিরে সাড়ে ছয়টার দিকে ও রুথকে ফোন দিল এটা জানাতে যে কার্লা তখনও টরন্টোতে পৌছায় নি। আনসারিং মেশিনে রুথের গলা শোনা গেল। সিলভিয়া বলল, রুথ! ঐ মেয়েটার ব্যাপারে বলছি। আশা করছি মেয়েটি শেষমেষ তোমার আবার বিরক্তি উদ্রেক না করে। ওকে দেখলে বুঝতে পারবে যে ও শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে। বয়সের দোষ বোধহয়। আমাকে জানিও, কেমন! ঘুমাতে যাওয়ার আগে সে আবার ফোন করল। আবারও মেশিনের উত্তর। সে বলল, আবার সিলভিয়া বলছি, দেখলাম সব ঠিক আছে কি না। এই বলে সে ফোন রেখে দিল। এটা ছিল নয়টা থেকে দশটার মধ্যে। এখনও বাইরে আলো রয়ে গেছে। রুথ হয়তো এখনও বাইরে আর কার্লা একটা অপরিচিত বাসায়, নিশ্চয়ই ফোন ধরবে না। রুথের বাসার উপরের তলার ভাড়াটিয়ার নাম মনে করার চেষ্টা করল সিলভিয়া। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারল না। ওরা নিশ্চয় এখনও ঘুমিয়ে পড়েনি। ওদেরকে ফোন করা মানে ও এ ব্যাপারটা নিয়ে অনেক বেশী মাথা ঘামাচ্ছে বলে মনে হতে পারে।

 

বিছানায় শুয়েও ওর অস্থিরতা কমে না। তাই সে কাঁথাটা নিয়ে বাইরের ঘরে সোফার উপর গিয়ে শুয়ে থাকল। এটাই তার থাকার জায়গা ছিল লিয়নের জীবনের শেষ তিন মাস। সে ভাবে যে ওখানেও তার ঘুম আসবে না। এখানে জানালায় কোন পর্দাও নাই এবং আকাশ দেখে ও বুঝতে পারল যে চাঁদ উঠেছে। কিন্তু সেটা দেখা যাচ্ছিল না।

 

তারপর তার মনে হলো একটা বাসে চড়ে বসে আছে। ওটা কি গ্রীস? বাসে অনেক লোকজন আছে যাদেরকে ও চেনে না। তারপর বাসটার ইঞ্জিনের একটা ভয়ঙ্কর শব্দ হচ্ছিল। খটখট আওয়াজে ওর ঘুম ভাংলো সদর দরজার ঘটঘটানি শুনে।

কার্লা নাকি?

 

কার্লা তার মাথ নীচু করে রাখে যতক্ষণ বাসটা শহর ছেড়ে না যায়। যদিও কাচগুলো রঙিন ছিল, বাইরে থেকে কারুর তাকে দেখতে পাওয়ার কথা না। কিন্তু সে বাইরের কিছু দেখতে চাচ্ছিল না। যদি ক্লার্ককে দেখে ফেলে। কোন এক দোকান থেকে বের হতে কিংবা রাস্তা পার হওয়ার সময়। ওতো পুরোপুরি অজ্ঞ। কার্লার ওকে ছেড়ে চলে যাওয়ার ব্যাপারটা তো অন্য দশটা দুপুরের মতই সাধারণ না। ও হয়তো ভাবছে এই দুপুরটা হলো ওর মতলব হাসিল করার শুরুর দুপুর। ক্লার্ক নিশ্চয়ই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে জানার জন্য কার্লা কতদূর যেতে পেরেছে ওদের প্ল্যান নিয়ে।

 

শহরের বাইরে এসে কার্লা মাথা তোলে, জোরে বুকভরে নিঃশ্বাস নেয়। চারপাশের মাঠ দেখে, রঙিন কাচের মধ্য দিয়ে সেগুলিকে বেগুনি রঙের মনে হয়। মিসেস জেমিসনের উপস্থিতি তাকে অনেক স্বস্তি দিয়েছিল। মিসেস জেমিসনের মানসিক শক্তি কার্লার ওখান থেকে বের হয়ে আসাটাকে একদম একটা অতি সাধারণ ব্যাপার করে তুলেছে। ওর এটাও মনে হয়েছিল যে কার্লার চলে আসাটা কার্লার মতো মেয়ের জন্যই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত কাজ হবে। কার্লা তখন অদ্ভুত একটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে নিজের জীবনের সুখ-দুঃখের কথা হাসিকান্না ও ঠাট্টার সাথে অবলীলায় বলে যেতে পেরেছে। এ কারণেই মিসেস জেমিসনের মনে তার জন্য মায়ার উদ্রেক হয়। ফলে, সিলভিয়া ঠিক যেভাবে কার্লাকে দেখতে চেয়েছে, সেভাবেই সে চলেছে। ওর মনে হয়েছে যে ও খুব সহজেই সিলভিয়াকে হতাশ করতে পারে, কেননা সে খুবই সংবেদনশীল ও কড়া প্রকৃতির মানুষ।

অবশ্য যদি ওর কাছাকাছি খুব বেশী দিন থাকা না হয়।

 

সূর্য জ্বলজ্বল করছে, বেশ খানিকক্ষণ ধরেই করছে। যখন ওরা দুপুরের খাবার খাচ্ছিল তখন ওয়াইনের গ্লাসগুলো রোদের আলোতে জ্বলে উঠেছিল। বাতাসে রাস্তার দুধারের ঘাসগুলো আর বুনো ফুলের ভেজা ডালগুলো নড়ছিল। গ্রীষ্মের মেঘগুলো- যেগুলো থেকে বৃষ্টি হয়, আকাশের পরিবেশটাই বদলে দিচ্ছিল। বৃষ্টিকে ঝেড়ে ফেলে জুলাইয়ের নতুন উজ্জ্বলতায় নিজেকে সাজাচ্ছিল। ওর বাস ওকে নিয়ে যখন এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন ও গতকালের যে আবহাওয়া ছিল তার কোন চিহ্নও দেখতে পেল না। যেমন গর্তে জমা পানি বা উড়ে যাওয়া কোন ডাল বা নেতানো ভূট্টার গাছ; ওর মনে হলো ও এটা ক্লার্ককে বলবে, ওরা একটা ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে জায়গা বেছে নিয়েছে তাদের ব্যবসার জন্য, তাই হয়তো তারা লাভ করতে পারছে না; অন্য কোন শুকনা জায়গায় গেলে হয়তো ওরা ভালই করত।

 

এখনও তো সেটা করা যায়, না কি?

তারপরই ওর মনে হলো, ও ক্লার্ককে কিছুই বলবে না। আর কখনই না। ক্লার্কের কোন কিছুতেই আর কখনও সে কিচ্ছু বলবে না। এমনকি ক্লার্কের বা গ্রেস অথবা মাইক কিংবা জুনিপার, ব্ল্যাক বেরি, লিজি বরডেনের কিছু হলে ওর কিছু যাবে আসবে না। যদি কখনও ফ্লোরা ফিরে আসে, সে সেটা জানতেও পারবে না।

 

এই নিয়ে দুবার ও পরিচিত সবকিছু পিছনে ফেলে অজানায় পাড়ি দিতে থাকে। প্রথমবার ওটা ছিল বিটলস্-এর সেই পুরোনো গানের মত,  সে একটা ছোট চিঠি টেবিলে রেখে ভোর পাঁচটার সময় বাড়ী ছেড়ে চলে যায়। ক্লার্ক চার্চের গাড়ী পার্কিংয়ের জায়গায় ওর জন্য অপেক্ষা করছিল। ও এই গানটাই গুনগুন করে গেয়ে চলছিল, যখন ওরা ঘটঘট করে চলে যাচ্ছিল। ও বাড়ী ছেড়ে চলে যাচ্ছে, বাই বাই। ওর মনে পড়ল সূর্য ওদের পিছনে উঠেছিল, সে ক্লার্কের দিকে তাকিয়ে ছিল, ও তখন গাড়ী চালাচ্ছিল। ওর শক্ত লোমস বাহু অনাবৃত ছিল। কার্লা ট্রাকের ভেতরের গন্ধটা পাচ্ছিল। একটা অদ্ভুত গন্ধ, যার মধ্যে গাড়ীর তেল, লোহার সামগ্রী আর ঘোড়ার খোঁয়াড়ের গন্ধ মিলে-মিশে ছিল। শরতের ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে এসে গাড়ীর চটা-ওঠা গায়ে লাগছিল। এটা এমন একটা বাহন যাতে তার বাড়ীর কেউ কখনও চড়েনি। তারা যে এলাকায় থাকত সেখানে এরকম বাহন খুব কমই দেখা যেত।

 

ক্লার্ক সেদিন রাস্তার গাড়ীর ভীরের দিকে নজর রাখছিল। তারা হাইওয়ে ৪০১-এ পৌছে গিয়েছিল। সেদিন ওর গাড়ী নিয়ে তার উদ্বিগ্ন থাকা, তার কাটা কাটা কথার উত্তর, ছোট হয়ে আসা চোখ, কার্লার ছোট ছোট খুশিতে ওর বিরক্তি প্রকাশ, সবকিছুই ওর ভীষণ রোমাঞ্চকর মনে হয়েছিল। যেমন তার এলোমেলো জীবনধারা কার্লাকে রোমাঞ্চিত করেছিল। ঠিক তেমনি ওর একা একা থাকা, ও যেভাবে ঘোড়াগুলোর সাথে নরম সুরে কথা বলত তাতে ক্লার্ককে ওর ভবিষ্যত জীবনের কারিগর বলে মনে হতো। নিজেকে ওর ক্লার্কের কাছে বন্দী বলে মনে হতো, এবং ওর নিজেকে ক্লার্কের কাছে সম্পূর্ণ সমর্পন করাকে ও সঠিক আর যথার্থ বলে মনে করেছে।

 

“তুমি জান না তুমি কি পিছনে ফেলে যাচ্ছ,” কার্লার মা ওকে লিখেছিল। একটাই চিঠি ওর মার কাছ থেকে এসেছিল। ও সেটার উত্তর দেয়নি। কিন্তু সেদিন ভোর বেলার শরীর কাঁপানো মূহূর্তে ও ঠিকই বুঝেছিল যে ও কি পিছনে ফেলে যাচ্ছিল। যদিও সে খুব আবছাভাবে দেখছিল তার ভবিষ্যত। সে ঘৃণা করত তার বাবা-মাকে, তাদের বাসাটাকে, পিছনের উঠানকে, ওদের ছবির এ্যালবামগুলো ওদের অবকাশ কাটানো, ওদের রান্না করা, ওদের সাজঘর, ওদের ঘরের আলমারি এবং ওদের বাগানে পানি ছিটানোর ঝরনা। ছোট চিঠিটাতে ও ‘সত্যি’ কথাটা লিখেছিল।

 

“আমি সবসময় একটা সত্যিকার জীবন চেয়েছি। আমি জানি এটা তোমাদের বোঝার কথা না।”

 

বাসটা এখন থেমে আছে, প্রথম শহরে যেটা একটা গ্যাস স্টেশন। এখানে ক্লার্ক আগে প্রায়ই কম দামে গ্যাস কেনার জন্য আসত। তখন তাদের পৃথিবীতে শুধু কয়েকটা শহরেরই অস্তিত্ব ছিল। ওরা তখন টুরিস্টদের মত ভাব করত এবং বিভিন্ন কম দামি বারে বসে তাদের তৈরি সুরা চেখে দেখত। পিগস ফীট, সোযারক্রোট, পটেটো প্যানকেক বিয়ার। তারা গান গাইতে গাইতে বাড়ী ফিরত পাগল ‘হিলবিলিস’দের মত।

 

কিছুদিন যেতে না যেতেই এইসব বাইরে যাওয়াকে শুধু পয়সা আর সময় নষ্ট করা বলে মনে হতে লাগল। তারা যেটা করছিল সেটা ছিল মানুষ জীবনের গূঢ়তত্ত্ব বুঝে ওঠার আগে যা করে, তাই।

 

এখন সে কাঁদেছে। বুঝে ওঠার আগেই তার চোখ জলে ভিজে গেল। সে টরোন্টর কথা ভাবতে শুরু করল। সে প্রথমে গিয়ে কি করবে তার কথা। ট্যাক্সি চড়ে যে ঘরটায় সে উঠবে, যেটা সে কখনই চোখে দেখেনি। যে নতুন খাট- যেখানে তাকে একা ঘুমোতে যেতে হবে। কাল থেকে ঘোড়ায় চড়া শেখানোর স্কুলের খোঁজ করতে কোন একটা বইয়ের দিকে ওকে তাকিয়ে থাকতে হবে, এবং তারপর সেইসব জায়গায় যেতে হবে যেখানে তার ইন্টারভিউ হবে। সে ঠিক মানতে পারছিল না, টিউবে চড়ে, ট্টামে চড়ে তাকে কোথাও যেতে হবে, নতুন নতুন ঘোড়ার যত্ন নিতে হবে। নতুন নতুন লোকের সাথে কথা বলতে হবে যাদের কেউই ক্লার্ক নয়।

এটা এমন একটা নতুন জীবন, এমন একটা নতুন জায়গা, যেটা শুধুমাত্র একটা বিশেষ কারণে করা হয়েছে, তা হলো সেখানে যেন ক্লার্কের উপস্থিতি না থাকে।

 

সবচেয়ে অদ্ভুত ও ভয়ানক জিনিস যেটা ওর কাছে পরিষ্কার হয়ে আসছিল সেটা হলো, সে যেদিকে আগাচ্ছে সেখানে তার কোন অস্তিত্ব থাকবে না। সে হয়তো হেঁটে বেড়াবে, কথাও বলবে, আরো অনেক কিছু করবে, কিন্তু সে ঠিক সেখানে বিরাজ করবে না। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এসব কিছু, এই যে সে বাসে চড়ে বাড়ী ছেড়ে যাচ্ছে এটা কিন্তু সে করছে নিজেকে আবিষ্কার করার জন্যই। মিসেস জেমিসনের মতে এবং সে নিজেও আত্মতৃপ্তির সঙ্গে বলবে যে সে “নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজেই নিচ্ছে।” কেউ তার ঘাড়ের উপর দাঁড়িয়ে নেই বা কারো মেজাজ খারাপ দেখে তার মুড খারাপ হয়ে যাবে, এমন হওয়ার কোন আশঙ্কা নেই।

কিন্তু তাহলে সে কি নিয়ে চিন্তা করবে? সে কিভাবে জানবে যে সে বেঁচে আছে? এই যে কার্লা ক্লার্কের কাছ থেকে পালিয়ে যেতে চাচ্ছে, সে কিন্তু ঠিকই তার জায়গা নিয়ে ওর জীবনে বিরাজমান। কিন্তু যখন ওর দৌড়ানোর পালা শেষ হবে যাবে, যখন সে স্থির হয়ে একজায়গায় দাঁড়াবে, তখন কি দিয়ে, কাকে দিয়ে সে ওর শূন্যস্থান পূরণ করবে? কেই-বা ওর জন্য একটা কঠিন প্রশ্ন হয়ে ওর সামনে দাঁড়াবে?

এতক্ষণে ও নিজেকে সামলে কান্না থামাল। কিন্তু ও থর থর করে কাঁপছিল। ওর অবস্থা খুবই করুণ দেখাচ্ছিল, এবং দাঁড়ানোর প্রয়োজন বোধ করে নিজেকে স্থির করার জন্য। “নিজেকে সামলে নাও,” ক্লার্ক একবার ওকে বলেছিল ওর ঘরের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়। কার্লা গুটিসুটি মেরে ওখানে বসে ছিল এবং চেষ্টা করছিল যেন কান্না চলে না আসে। এখনও তার তাই করতে হবে।

ওর বাস আরেকটা শহরে থামল। যেখান থেকে সে বাসে উঠেছিল সেখান থেকে এটা তৃতীয় শহর। তার মানে হলো, সে খেয়াল না করেই দ্বিতীয় শহরটা ফেলে চলে এসেছে। হয়তো বাসটা থেমেছিল। ড্রাইভার নিশ্চয়ই শহরটার নামটাও ঘোষণা করেছে। ভয়ের চোটে সে কিছুই শোনেনি বা দেখেনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা টরন্টোতে যাওয়ার হাইওয়েতে উঠে যাবে, ও তখন হারিয়ে যাবে।

সে হারিয়ে যাবে। কি লাভ হবে একটা ট্যাক্সিতে চড়ে নতুন একটা ঠিকানায় গিয়ে? সকালে উঠে দাঁত মেজে, মুখ ধুয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে কেন সে নতুন একটা চাকরি নেবে? কি লাভ হবে খাওয়া দাওয়া করে? আর পাবলিক বাহন চড়ে এখানে-ওখানে গিয়ে?

ওর মনে হলো ওর পা যেন ওর শরীর থেকে অনেক দূরে। ওর অপরিচিত, কড়কড়ে প্যান্টের ভেতরে ওর হাঁটুতে হাজার টনের লোহার বল ভর করে আছে বলেও মনে হলো। ও যেন মাটিতে থুবড়ে-পড়া একটা রেসের ঘোড়া, যে আর কখনই ঘাড় উঁচু করে উঠে দাঁড়াতে পারবে না। কয়েকজন নতুন যাত্রী ও কিছু সামান তোলা হয়েছে এই স্টপেজ থেকে। এক মহিলা স্ট্রলারে বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে কারো দিকে হাত নাড়ছিল। বাস স্টপের পিছনের দালান, যেটাতে একটা ক্যাফে ছিল সেটা নড়ে উঠল। একটা ধোঁয়াশাপূর্ণ ইটের দেয়াল ও জানালার উপর দিয়ে এমনভাবে ভেসে গেল যেন সেগুলো পানিতে ডুবে যাবে। ওর জীবনের ভয়ংকর সময়ের কথা ভেবে কার্লা তার ভারী শরীর, লোহার হাত-পা নিয়ে এগিয়ে গেল। সে উষ্ঠা খেয়ে পড়ে গেল আর চিৎকার করে বলে উঠলো, “আমাকে নামিয়ে দাও।”

ড্রাইভার ব্রেক কষল এবং বিরক্ত হয়ে বলল “আপনি না টরন্টো যাবেন?” সবাই স্বাভাবিক ঔৎসুক্যপূর্ণ দৃষ্টিতে কার্লার দিকে তাকাল। কিন্তু কেউই ওর দুঃখটা বুঝতে পারল না। পারার কথাও না।

“আমার এখানে নামতে হবে।”

“গাড়ীর পেছনে একটা বাথরুম আছে।”

“না না, আমাকে নামতে হবে।”

“আমি কিন্তু দাঁড়াব না। আপনার কি নীচে কোন বাক্সপ্যাটরা আছে?”

“না। হ্যাঁ। না। কোন কিছু নেই?”

বাসের মধ্যে কে যেন বলে উঠল, “বন্ধ বাসে দম আটকে গেছে মহিলার।”

“আপনি কি অসুস্থ?” ড্রাইভার জিজ্ঞেস করে।

“না! না! আমি শুধু নেমে যেতে চাই।”

“ঠিক আছে। আমার কোন অসুবিধা নাই।”

 

“তুমি এসে আমাকে নিয়ে যাও প্লিজ।”

“আমি আসছি।”

 

সিলভিয়া দরজার তালা আটকাতে ভুলে গেছে। রাত অনেক হয়েছে, এখন তার দরজাটা লাগানো উচিত। কিন্তু সে দরজাটা খুলে বাইরে দেখল,

সেখানে কেউ ছিল না।

কিন্তু সিলভিয়া নিশ্চিত, কেউ একজন টোকা দিয়েছে। শব্দটা এসেছিল জানালার উপরের দেয়াল থেকে। ও বাতি জ্বালাল। কিছু দেখতে পেল না, তাই আবার বাতি বন্ধ করল। হয়তো কোন কাঠবেড়ালী ধাক্কা দিয়ে চলে গেছে। খাওয়ার ঘরের দুই জানালার মাঝখানে যে ফ্রেঞ্চ দরজা রয়েছে সেটাও খোলা ছিল। ওটা পুরোপুরি বন্ধও করা হয় নি, ও এক ইঞ্চি পরিমান ফাঁক রেখে দিয়েছিল বাতাস ঢোকার জন্য, এখন দেখল যে সেটাও খোলা। তাড়াতাড়ি ও একে একে সব বন্ধ করতে লাগল, এবং সঙ্গে সঙ্গেই কেউ একজন হাসা শুরু করল। শব্দটা এতই কাছে ছিল যে মনে হল তার ঘরের ভেতরেই কেউ হাসছে।

“এই যে আমি।” একটা পুরুষ গলার আওয়াজ, “আমি কি আপনাকে ভয় পাইয়ে দিলাম?” ও কাঁচের উপর গা ঘেঁসে দাড়িয়ে ছিল, ঠিক ওর পাশে।

“আমি ক্লার্ক। এই রাস্তার মাথায় থাকি।”

সিলভিয়া অবশ্যই ওকে ভেতরে যেতে বলবে না, কিন্তু ওর মুখের উপর দরজা বন্ধ করতেও ও পারছিল না। হয়তো ক্লার্ক ওকে হাত দিয়ে জাপটে ধরবে দরজা বন্ধ করার আগেই। সিলভিয়া বাতিও জ্বালাতে চাইল না, কারণ সে একটা লম্বা গেঞ্জি কাপড়ের জামা পরে ছিল। তার হয়তো একটা কাঁথা গায়ে দিয়ে বের হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এখন আর সেটার সময় নাই।

 

 

“তুমি কি কাপড় বদলাতে চাচ্ছিলে? আমার এই ব্যাগে ঠিক তোমার প্রয়োজনের কিছু জিনিসপত্তর আছে।” ওর হাতে একটা প্লাস্টিকের থলে ছিল। সেটা সে ধাক্কা দিয়ে ওর দিকে এগিয়ে দিল। কিন্তু ভেতরে ঢোকার কোন চেষ্টা করল না।

ভাঙা গলায় সিলভিয়া বলে, “কি”?

“খুলে দেখ ওতে কি আছে। ওতে কোন বোমা নেই। নাও ব্যাগটা নাও।”

সে ব্যাগটা হাতড়ে দেখল, কিন্তু ওটার দিকে তাকাল না। কিছু একটা ওতে ছিল যেটা নরম; পরক্ষণেই সে বোতামগুলো ছুঁয়ে দেখল। ওর জ্যাকেটের বোতাম, শার্টের সিল্কের কাপড়, আর যেটা কার্লা প্যান্টের উপর পরে ছিল।

“ভাবলাম তোমার জিনিসগুলো তোমাকে ফেরত দেয়া দরকার। ওগুলো তো তোমার? না কি?

 

সিলভিয়া তার চোয়াল শক্ত করল যাতে করে ওর দাঁতের কটকট শব্দ না শোনা যায়। ভয়ে ওর মুখ, গলা শুকিয়ে কাঠের মত হয়ে গেল।

“আমার মনে হলো, ওগুলো তোমারই হবে।” ও খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলল।

সিলভিয়ার নিজের জিহ্বাটাকে উলের তৈরী বলে মনে হলো। অনেক কষ্ট করে বলল, “কার্লা কোথায়?”

“মানে তুমি আমার স্ত্রী কার্লার কথা বলছ?” এবার ওর মুখাবয়ব সিলভিয়ার দৃষ্টিগোচর হলো। সে খুব মজা পাচ্ছিল বলে মনে হলো। “আমার স্ত্রী কার্লা তার ঘরে। সে তার বিছানায় ঘুমাচ্ছে। যেখানে তার থাকা উচিত।”

ও দেখতে একই সাথে বেশ সুন্দর ও বোকার মত ছিল। লম্বা, পেটানো শরীর, কিন্তু লোক দেখানো একটা কুঁজো ভাব ওর মধ্যে বিদ্যমান। ওর মধ্যে একটা নিপুণ চাতুর্য্য ও আত্মপ্রদর্শনের মধ্য দিয়ে ভয় উদ্রেক করার একটা ভাব। একগোছা চুল ওর কপালের উপর পরে থাকে। আর একটা গোঁফ, যেটা দেখলে ওকে খুব উন্নাসিক বলে মনে হয়। ওর চোখ দেখে ওকে আশাবাদী ও বিদ্রুপকারী দুটোই মনে হয়। ঠোঁটের কোনায় একটা স্মিত হাসি লেগেই থাকে, যেটা যখন-তখন রাগে পরিণত হতে পারে। ওকে অপছন্দ করার কথা সিলভিয়া লিয়নকে বলেছিল। সে উত্তর করেছিল, লোকটা অতি উৎসাহী ও বন্ধুসুলভ। এর কারণ ও নিজের ব্যাপারে একবারেই নিশ্চিত হতে পারে না।

ওর এই অনিশ্চিত থাকাটা কোনভাবেই ওকে নিরাপত্তা দিতে পারে না। “ও বেশ ক্লান্ত, ছোটখাট একটা দুঃসাহসিক অভিযানের পর,” ক্লার্ক বলে। “তোমার নিজের চেহারাটা একবার দেখা উচিত ছিল, যখন তোমার কাপড়গুলো আমি তোমাকে দেখালাম। তুমি কি ভেবেছিলে, আমি ওকে খুন করে ফেলেছি?”

“আমি একটু অবাক হয়েছিলাম।” সিলভিয়া বলে।

“আমি নিশ্চিত তুমি অবাক হয়েছিলে। তুমিই তো ওকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলে, তাই না!”

“আমি সাহায্য করেছিলাম,”- সিলভিয়া অনেক কষ্ট করে বলে, “কেননা আমি ভেবেছিলাম ও অনেক দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।”

“দুঃখ-দুর্দশা!” ক্লার্ক এমনভাবে শব্দ দুটো উচ্চারণ করল যেন শব্দ নিয়ে পরীক্ষা করছিল। “হয়তো! হয়তো ও ভীষণ দুদর্শায় ছিল তাই ও বাস থেকে লাফিয়ে নেমে আমাকে ফোন দিয়ে বলেছিল ওকে নিয়ে আসার জন্য। ও এত বেশি কাঁপছিল যে আমি বুঝতেই পারছিলাম না, ও কি বলতে চাচ্ছিল।

“ও ফিরে আসতে চেয়েছিল?”

“হ্যাঁ, ও ফিরে আসার জন্য ব্যকুল হয়ে গিয়েছিল। এতটাই ব্যকুল যে মনে হচ্ছিল ও মুর্ছা যাবে। কার্লা ভীষণ একটা আবেগপ্রবণ মানুষ। এই ভাল তো এই মন্দ। তবে আমার মনে হয় এসব তো আর তোমার জানার কথা না। ওকে তো তুমি আমার মত করে চেন না।”

“সে তো বেশ খুশি মনেই এখান থেকে গেল।”

“তাই নাকি? তোমার কথা তো আমাকে বিশ্বাস করতেই হবে। আমি তো এখানে তোমার সাথে তর্ক করার জন্য আসিনি।” সিলভিয়া কিছু বলল না।

“‘আমি শুধু একথা বলার জন্য এসেছি যে আমি আর আমার স্ত্রীর ব্যাপারে তোমার নাক গলানোটা একেবারে পছন্দ করছি না।”

“ও তো একটা মানুষ।” সিলভিয়া বলা ওঠে, যদিও সে জানত চুপ করে থাকাটাই তার জন্য শ্রেয় হতো। “তোমার স্ত্রী হওয়ার পরেও, সে একটা মানুষ।”

“ওহ্ বাবা। তাই নাকি? আমার স্ত্রী একটা মানুষ। খবরটা দেয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। কিন্তু আমার সাথে চালাকি করার ধৃষ্টতা দেখাবে না, সিলভিয়া।”

“আমি চালাকি করার চেষ্টা করছি না।”

“ভাল যে তুমি চালাকি করার চেষ্টা করছ না। আমি উত্তেজিত হতে চাই না। তবে আমার কয়েকটা কথা বলার আছে, আমি চাই না যে তুমি এরপর আমার বা আমার স্ত্রীর কোন ব্যাপারে কখনই নাক গলাও। আরেকটা কথা, ও কিন্তু তোমাকে সাহায্য করতে আর কখনও এখানে আসবে না। আমার মনে হয় সে আসতে চাইবেও না। তোমার সম্পর্কে ওর ধারণা খুব একটা ভালো বলেও আমার মনে হয় না। আমার কথা হলো, তোমার নিজের ঘর নিজেরই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে পারা উচিত। এখন কথাগুলো কি তোমার মাথায় ঢুকেছে?”

“খুব ভালোভাবেই ঢুকেছে।”

“ওহ্, আমিও তাই চাই।”

সিলভিয়া বলে, “হ্যাঁ, তাই তো।”

“আমি আরও কি চাই জান?”

“কি?”

“আমার মনে হয় আমার কাছে তোমার কিছু চাওয়ার আছে।”

“কি?”

“আমার মনে হয় আমার কাছে তোমার ক্ষমা চাওয়া উচিত।”

সিলভিয়া বলে, “ঠিক আছে। তোমার যদি তাই মনে হয়, আমি ক্ষমা চাচ্ছি।”

ও একটু নড়ে চড়ে দাঁড়ায়। ওর হাতটা বাড়িয়ে দেয়ার ফলে সিলভিয়া কুঁকড়ে যায় এবং চিৎকার করে ওঠে।

ক্লার্ক হাসে। দরজার চৌকাঠে হাত রেখে দাঁড়ায়, যাতে সিলভিয়া দরজা বন্ধ করতে না পারে।

“ওটা কি?”

“কোনটা কি,” ক্লার্ক বলে। ক্লার্ক ভাবে এটা হয়তো সিলভিয়ার কোন চালাকি হবে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই সে জানালার কাচে কিছু একটার প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। ক্লার্ক চট করে ঘুরে দাঁড়ায় এবং দেখার চেষ্টা করে।

ক্লার্কের বাসার অদূরে একটা খানাখন্দ মত জায়গা ছিল। বছরের এই সময়টাতে জায়গাটা কুয়াশায় ঢাকা থাকে। রোজকার মত আজও তাই আছে। কিন্তু এর মধ্যেও একটা জায়গায় খানিকটা পরিবর্তন লক্ষ করা গেল। একটা জায়গায় কুয়াশা একটু বেশী ঘন হয়ে একটা অবয়ব তৈরী করেছে। ধীরে ধীরে ওটা থেকে স্পষ্ট এবং উজ্জ্বলতর হয়ে একটা কিছু বের হয়ে এলো। প্রথমে ওটাকে একটা জীবন্ত ড্যান্ডিলিয়ন ফুলের মত মনে হলো। আস্তে আস্তে ক্রমশ সেটা একটা অপার্থিব জন্তুতে পরিণত হলো। শ্বেত সুনির্দিষ্ট ও বিশাল খানিকটা এক শিংওয়ালা দৈব-ঘোড়ার মত একটা জন্তু তাদের দিকে ধেয়ে আসছে।

 

(৯)

 

“জিসাস্ ক্রাইস্ট!’ অস্ফুট কণ্ঠে ক্লার্ক বলে ওঠে। ও সিলভিয়ার কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়ায়। এবার সিরভিয়া একটুও বিচলিত বোধ করে না। সে ভাবে ক্লার্ক হয় নিজেকে সামাল দিতে অথবা সিলভিয়াকে কোন কিছু থেকে বাঁচাতে এভাবে তাকে ধরে দাঁড়িয়েছে। ওদের দৃষ্টি পরিষ্কার হয়ে আসে, ওই কুয়াশার মধ্যে কী ঘটছে এবং একটা উজ্জ্বল আলো- পরে যেটা একটা গাড়ীর আলো বলে প্রতীয়মান হয়। গাড়ীটা পেছনের রাস্তা ধরে যাচ্ছিল। হয়তো ওটা থামার জন্য কোন জায়গা খুঁজছিল। ঐ আলো থেকে বেরিয়ে এল একটা সাদা ছাগল। ওটা নেচে নেচে বের হয়ে আসে। ছোট্ট, একটা ছাগল, কুকুরের থেকে একটু বড়।

ক্লার্ক সিলভিয়াকে ছেড়ে দিয়ে বলে, “তুমি কোথা থেকে উদয় হলে?”

সিলভিয়া বলে, “ওটা তোমার ছাগল? তাই না?”

“ফ্লোরা,” ও।

ছাগলটা ওদের কাছ থেকে কয়েক গজ দূরে থেমে যায়। মনে হলো, ও একটু লজ্জা পেয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে আছে।

“ফ্লোরা।” ক্লার্ক বলে, “তুমি কোথায় ছিলে এতদিন? ভীষণ ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে আমাদেরকে।”

ফ্লোরা ওর কাছে এসে পা ঘেঁসে দাঁড়ায়, কিন্তু ওর দিকে তাকায় না।

“গাধা কোথাকার! কোথা থেকে এলে তুমি?” একটু কাঁপা স্বরে বলে ক্লার্ক।

“ও হারিয়ে গিয়েছিল।” সিলভিয়া বলে।

“হ্যাঁ, ও হারিয়ে গিয়েছিল। আসলে আমরা ভাবিনি ওকে আর খুঁজে পাব।’

এবার ফ্লোরা মুখ তুলে তাকায়। চাঁদের আলোয় ওর মুখ চিকচিক করছে।

“আমাদেরকে ভীষণ ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে।”

ক্লার্ক বলে, “তুমি কি তোমার সঙ্গী খুঁজতে গিয়েছিলে? আমরা কিন্তু অনেক ভয় পেয়েছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম তুমি বোধ হয় অশরীরী কিছু।”

“কুয়াশার জন্যই ও রকম মনে হয়েছিল।” এবার সিলভিয়া দরজার বাইরে বের হয়ে আসল এবং সে মোটামুটি নিরাপদ মনে করল।

“হ্যাঁ।”

“তার উপর ঐ গাড়ীটির হেড লাইটের আলো পড়ে।”

“যেন একটা ভৌতিক আর্বিভাব।” বিষয়টা বুঝে উঠতে উঠতে ক্লার্ক বলল। কিছুটা আত্মতৃপ্ত বোধ করলো।

“হ্যাঁ।”

“এটা ভিনগ্রহের ছাগল! তাই না? তুমি হলে অন্য গ্রহের বাসিন্দা!” ফ্লোরাকে আদর করে বলে ক্লার্ক। কিন্তু যখনই সিলভিয়া তার যে হাতটা খালি ছিল সেটা দিয়ে ফ্লোরাকে আদর করতে যায়, তখনই ছাগলটা মাথা নীচু করে ফেলে। সে যেন প্রস্তুত হয় মার খাওয়ার জন্য।

“ছাগলের স্বভাব কিন্তু বোঝা যায় না,” ক্লার্ক বলে ওঠে। “আপাতদৃষ্টিতে ওদেরকে পোষ মানানো যায় বলে মনে হলেও তারা জংলী স্বভাবেরই রয়ে যায়। বিশেষত ওরা যখন বড় হয়।”

“ও কি বড় হয়ে গেছে? ওকে দেখে তো একদম ছোট্ট একটা ছাগল বলেই মনে হচ্ছে।”

“ওর যা বড় হওয়ার সেটা সে হয়ে গেছে।” ক্লার্ক বলে।

ক্লার্ক ও সিলভিয়া দুজনেই ছাগলটির দিকে তাকিয়ে রইল। দেখে মনে হলো যেন ওরা দুজনেই আরো কিছু কথা বলার জন্য অপেক্ষা করে আছে। মনে হলো ক্লার্ক ও সিলভিয়া এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে সেখান থেকে তারা না সামনে যেতে পারবে, না পিছনে। সিলভিয়ার মনে হলো, এই কারণে ক্লার্কের মুখাবয়বে সামান্য একটা দুঃখের রেখা দেখা দিল।

সে সেটা স্বীকার করেই বলল, “বেশ রাত হয়ে গেছে।”

“আমারও তাই মনে হয়।” সিলভিয়া এমনভাবে কথাটা বলে, মনে হয় যেন ক্লার্ক এখানে বেড়াতে এসেছিল।

“ঠিক আছে ফ্লোরা। চল বাড়ী যাই।”

“আমি কাজের জন্য লোক ঠিক করে নেব, যখন দরকার হবে।” সিলভিয়া হেসে উঠে বলে, “তোমার কাছ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করব।”

“বেশ, তবে এখন ভেতরে চলে যাও। তোমার ঠাণ্ডা লাগতে পারে। একসময় লোকে ভাবত যে, রাতের কুয়াশা ভীষণ বিপদজনক।”

“সেটা আমি অবশ্য কখনো শুনি নি।”

“শুভরাত্রি” সিলভিয়া বলে। “শুভরাত্রি, ফ্লোরা।”

ঠিক এরকম সময়েই সিলভিয়ার ঘরের ভেতরে টেলিফোনটা বেজে ওঠে।

“আমি ভেতরে যাই।”

ক্লার্ক হাত তুলে ঘুরে দাঁড়ায়। “শুভরাত্রি।”

রুথ ফোন করেছে। প্লানটা ওলট-পালট হয়ে গেছে।

ছোট ছাগলটার কথা ভেবে ওর ঘুম আসছিল না। ঘন কুয়াশার কুণ্ডলী থেকে ওর উদয় হওয়াটা অনেকটা যাদুর মত মনে হয়েছে ওর কাছে। কেন জানি ওর মনে হচ্ছিল লিয়ন কি এর সাথে জড়িত থাকতে পারে? ও যদি কবি হতো তবে হয়তো এসব নিয়ে একটা কবিতা লিখতে পারত। কিন্তু লিয়ন কখনও ওর পছন্দের কোন বিষয়কে তেমন গুরুত্ব দিত না।

কার্লা ক্লার্কের ঘরে ঢোকার শব্দ শুনতে পেল, যদিও সে ক্লার্কের যাওয়ার শব্দ শুনতে পায় নি।

কার্লা বললো সে গোয়ালঘরের সব কিছু দেখে তবেই ফিরে আসছে।

“একটু আগে একটা গাড়ি বড় রাস্তা দিয়ে গেল, আমি সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা দেখার জন্য বের হয়ে দেখে না-আসা পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছিলাম না।”

“সব কিছু ঠিকঠাক আছে?”

“যতটুকু দেখা গেল তাতে তো ঠিকঠাকই মনে হলো। তারপর ভাবলাম রাস্তায় যখন গেলামই তখন একটু দেখা করে আসা উচিত। তাই আমি কাপড়গুলো ফেরত নিয়ে গেলাম।”

কার্লা বিছানায় উঠে বসল।

“তুমি আবার ওকে ঘুম থেকে ওঠাও নি তো?”

“ও উঠে গিয়েছিল। আমরা কথাবার্তা বলেছি।”

“ওহ্।”

“তেমন কিছু না।”

“তুমি ঐসব কিছু তো ওকে বল নি। বলেছ?”

“না, আমি ওসব কিছু বলি নি?”

“ওগুলো কিন্তু আমার বানানো গল্প ছিল। সত্যি। বিশ্বাস কর। ওগুলো সব বানানো ছিল।”

“ঠিক আছে।”

“আমাকে তোমার বিশ্বাস করতেই হবে।”

“আমি তোমাকে বিশ্বাস করি।”

“আমি বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলেছি।”

“ঠিক আছে।”

ক্লার্ক বিছানায় উঠে যায়।

“তোমার পা ভীষণ ঠাণ্ডা। কার্লা বলে, “মনে হচ্ছে যেন ভেজা। ঘন শিশিরে ভেজা।”

“কাছে আস,” ক্লার্ক বলে। “যখন আমি তোমার চিরকুটটা পেলাম আমার মনে হলো আমার ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। নিজেকে শূন্য মনে হলো। সত্যি। তুমি যদি কখনও চলে যাও তবে আমার মনে হবে যে আমার ভেতরে কিছুই নেই।”

আলো ঝলমলে রোদ আরো কিছুদিন থাকল। রাস্তায়, দোকানে পোস্টঅফিসে লোকজনের মুখে একটাই কথা, শেষ পর্যন্ত গ্রীষ্মকাল এসেই গেল। মাঠের ঘাস, নেতিয়ে পড়া ফসলও মাথা তুলে দাঁড়াল। ছোট ছোট খানাখন্দগুলো শুকিয়ে গেল। কাদামাটি ধুলায় পরিণত হল। মৃদুমন্দ বাতাসে সকলেরই নতুন করে সবকিছু করার আগ্রহ জাগল। টেলিফোন বেজে উঠল। লোকে জানতে চাইল ঘোড়া চালানের কাজ সর্ম্পকে। গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্প যারা আগে যাদুঘর দেখানোর জন্য বুকিং বন্ধ রেখেছিল, তারা আবার এসব নিয়ে উৎসাহী হয়ে উঠল। ছোট্ট ছোট্ট ঘোড়াগুলো বেড়ার সাথে শরীর ঘষে ঘষে নেচে উঠল। এখন আর তাদের গায়ে মোটা কাঁথা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।

যে দিন কার্লা পালিয়ে গিয়েছিল, ক্লার্ক বেশ সস্তা দামের একটা ছাদের ঢাকনা পেয়েছিল। পরদিন সে ওই ঢাকনাটা ঠিক করতেই সময় ক্ষেপন করেছিল। ক্লার্ক দিনটাকে কার্লার ফেরারি হওয়ার দিন বলেই আখ্যায়িত করে।

কয়েক দিন ধরেই ওরা দ ‘জন মিলে ওদের সাধারণ দিনযাপন করছিল। কার্লা ও ক্লার্ক যদি মুখোমুখি হয় তবে কার্লা ওর কাঁধে আলতো একটা চুমু খায়, যা ওর ফিনফিনে পাতলা জামার আবরণ ভেদ করে চামড়ায় পৌঁছে যায়।

“এরপর যদি তুমি কখনও পালিয়ে যাও তবে আমি তোমাকে মজা দেখাব।”

“মজা দেখাবে?”

“ঠিক তাই।” ও এখন ভীষণ উৎফুল্ল। ঠিক যেমনটা ওকে কার্লা দেখেছিলে প্রথম দেখা হওয়ায় সময়-

চারদিক কল-কাকলীর শব্দে মুখর। লাল পাখাওয়ালা কালো পাখি, রবিন পাখি, এক জোড়া কবুতর- যারা গেয়ে ওঠে সেই ভোর বেলা। কাক, চিলের আধিক্য। এরা বোধ হয় লেকের ধার থেকে উড়ে আসে। একঝাঁক টাকি উড়ে আসে ওক গাছের মরা ডাল থেকে। এরা আসে প্রায় আধা মাইল দূর থেকে। ওদের বড় বড় ভেজা পালকগুলো শুকানোর জন্য প্রথমে ওরা শুধু ওখানে বসে থাথে। মাঝে মাঝে তাদের পাখাগুলা ঝেড়ে নেয়। পরের দিকে তারা চুপচাপ বসে থাকে। অনেক উঁচুতে উড়ে বেরিয়ে মাটিতে পড়ে যায়। ওদের দেখা যায় পত্রপুষ্পহীন গাছের শূন্য ডালে বসে থাকতে।

লিজির মালিক, জয় টাকার আবার এল। তাকে তামাটে দেখাচ্ছিল কিন্তু সে বন্ধুসুলভ আচরণ করল। সে বলল, বৃষ্টির যন্ত্রণায় অবকাশ যাপনের জন্য পাহাড়ে বেড়াতে চলে গিয়েছিল। এখন ফিরে এসেছে।

“তুমি ঠিক সময়ে এসেছ, এখন অত্যন্ত ভাল আবহাওয়া।”

“লিজিকে তো দেখে ভালই মনে হচ্ছে।” টাকার বলে। “কিন্তু ওর বন্ধুটা কই?” মানে ওই যে ছোট্ট ছাগলটা? মানে ফ্লোরা, ও কোথায়?

“ও চলে গেছে।”

“ওখানে অনেক ছাগল আছে। কী অদ্ভুত সুন্দর শিং ওদের।”

“আমিও শুনেছি।”

তিন-চার দিন ধরে ওরা অনেক ব্যস্ত ছিল যার কারণে চিঠির বাক্স খোলা হয় নি। এরপর যখন কার্লা ওটা খুলল, ফোনের বিল, একটা লিফলেট যেটাতে লোভ দেখানো হয়েছে যে একটা পত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক হলে সে এক মিলিয়ন ডলারের লটারি জিততে পারে। আর ছিল মিসেস জেমিসনের একখানা চিঠি।

 

আমার প্রিয় কার্লা,

আমি প্রায়ই আমাদের ছোটখাট রোমাঞ্চকর ঘটনার কথা ভেবে নিজের সাথেই কথা বলি। কথাগুলো যদিও তোমাকে উদ্দেশ্য করেই বলি। এটা ইদানিং এতটাই বেশী হচ্ছে যে আমার মনে হয় তোমার সাথেই আমার কথা হওয়া প্রয়োজন। এই মুহূর্তে সেটা একমাত্র চিঠির মাধ্যমেই বলা সম্ভব। ভয় নেই, আমি তোমার কাছ থেকে এর কোন উত্তর আশা করছি না।

সে আরো লিখে জানায়- সে খুবই দুঃখিত যে সে কার্লার ব্যক্তিজীবনে খুব নিবিড়ভাবে জড়িয়ে গেছে এবং সে মনে করেছে যে কার্লার মুক্তি ও তার সুখ- দুটোই এক জিনিস। সে শুধু কার্লার ভালই চেয়েছিল। এই ভালত্ব, সেটা কার্লা তার স্বামীর সাথে ভাল সম্পর্কের মধ্যেই পেয়ে যাবে। তবে সে আশা করে, কার্লার পালানোর সময় তার মনের উথাল-পাথাল ঝড় সম্পর্কে জানতে পারে এবং এর মধ্যে দিয়ে সে নিশ্চয়ই তার নিজের স্বামীর সত্যিকার চেহারা এবং ক্লার্কের প্রতি কার্লার ভালবাসা কেমন, সেটা অনুধাবন করতে পারছে। সে আরো বলে, কার্লা যদি ওর সাথে আর কখনও দেখা করতে না চায় তাতে তার মন খারাপ হবে না। এবং সে সত্যিই কার্লার প্রতি কৃতজ্ঞ এমন একটা সময়ে তাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য।

 

এসব কিছুর মধ্যে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনা ছিল ফ্লোরার পুনরাবির্ভাবের বিষয়টা। ওটা একটা দৈব ঘটনা ছিল। সে এতদিন কোথায় ছিল, আর কেনই বা ঠিক ঐ সময়টাকে বেছে নিল ফিরে আসার জন্য? তোমার স্বামী নিশ্চয়ই তোমাকে বলে থাকবে ঐ ঘটনাটা। আমরা আমাদের বারন্দার মতো জায়গাটায়  দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম। আমার মুখটা ছিল বাইরের দিকে। আমার মনে হলো কুয়াশার মধ্যে থেকে আমি একটা কিছু কুণ্ডলী পাকিয়ে বের হয়ে আসতে দেখলাম। কালো গভীর রাতের ভেতর থেকে সেটা বের হয়ে এলো। এটা অবশ্য মাটির উপর কুয়াশার উপস্থিতির কারণে এরকম মনে হয়েছিল। ওটা একটা ভয়ংকর দৃশ্য ছিল। আমি ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠেছিলাম। সত্যি বলতে, আমি আমার জীবনে কোনদিন এত অদ্ভুত ঘটনা দেখিনি। এটাকে আমার ভয়ই বলা উচিত। আমরা দুজনই পূর্ণবয়স্ক মানুষ এই দৃশ্যটা দেখে পাথরের মূর্তি হয়ে গিয়েছিলাম। আর এর মধ্যেই ফ্লোরা বেরিয়ে আসে।

 

এর নিশ্চয়ই কোন মহিমা আছে। তবে এটা ঠিক যে ফ্লোরা আর দশটা সাধারণ ছাগলের মত নিশ্চয়ই সঙ্গী খুঁজতে বেরিয়েছিল এবং তার তো বাচ্চা দেওয়ার সময়ও হয়ে এসেছে। একদিক থেকে ভাবলে ওর ফিরে আসার সঙ্গে আমাদের জীবনের কোন সম্পর্ক নেই। তারপরে ওর ঠিক ঐ সময়টাতে ফিরে আসায় তোমার স্বামী এবং আমি নিজে প্রচণ্ডভাবে উদ্বেল হয়েছি। যখন দু’জন ভিন্ন মানুষ, যারা একে অপরকে পছন্দ করে না, একইসাথে কোন কিছু দেখে অভিভূত কিংবা ভীত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যে একটা বন্ধন তৈরী হয়। এবং তারা নিজেদেরকে খুব কাছের বলে মনে করে। একে অপরের খুব কাছাকাছি চলে আসে। এটা হয়তো কোনভাবেই সম্ভব হতো না ঐ ঘটনা না ঘটলে। কেবল মানসিক কারণেই আমরা একে অপরের কাছাকাছি চলে এসেছিলাম বলে আমি মনে করি। আমরা প্রায় বন্ধুর মতই একে অপরকে বিদায় জানাই। ফ্লোরা সত্যিই আমাদের দুজনের মধ্যে দেবদূতের মতো আবির্ভুত হয়েছিল। হয়তো সে তোমার এবং তোমার স্বামীর জীবনেও একইভাবে আবির্ভুত হয়েছিল।

শুভেচ্ছান্তে,

সিলভিয়া জেমিসন।

 

চিঠিটা পড়েই কার্লা ওটাকে দুমরে-মুচরে ফেলে। পরে বেসিনের মধ্যে ওটা পোড়ায়। আগুন জেগে উঠলে সে পানির কলটা ছেড়ে দেয়। তারপর সে পোড়া ভেজা দলাটাকে তুলে টয়লেটে ফ্লাশ করে। কার্লা কিন্তু এই কাজটা প্রথমেই করতে পারত। এর পর সারাদিন তার ভীষণ ব্যস্ততায় কাটে। দুটো দলকে সে ট্রেইলে নিয়ে যায়। কিছু বাচ্চাদের শেখায়। কাউকে একা, আবার কয়েকটা দলকে। এরপরের দুদিনও তার একইভাবে কাটে। রাতে ক্লার্ক ওকে জড়িয়ে ধরে যদিও সে নিজেও ভীষণ শান্ত ছিল। শত ব্যস্ততার মধ্যেও কখনও রাগী বা পরিশ্রান্ত মনে হয় না নিজেকে। কার্লার কখনই ক্লার্কের সাথে মানিয়ে নিতে কোন অসুবিধা হয় না। কিন্তু ওর মনে হতে লাগল যেন ওর কলিজার মধ্যে কেউ একজন সূঁচ ফোটাচ্ছেেআর সে অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে নিঃশ্বাস নিলে হয়তো ব্যথাটা কমাতে পারবে বলে বিশ্বাস। কিন্তু কোনভাবেই সে এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেল না। কিছুক্ষণ পরপর তার জোরে নিঃশ্বাস নিতে হলো কিন্তু তারপরই আবার সে ব্যথাটা অনুভব করল।

সিলভিয়া কলেজ টাউনে একটা অ্যাপার্টমেন্ট কেনে, জায়গাটা ওর কলেজের কাছেই। কিন্তু সেটা বিক্রির কোন চিহ্ন দেখা যায় না। লিওন জেমিসন কোন একটা মরণোত্তর পুরস্কার পেয়েছে বলে পত্র-পত্রিকায় খবর বেরয়। যদিও কোনো টাকার পরিমান উল্লেখ ছিল না।

এরপর সোনালি, শুকনো পাতাঝরা দিন চলে এলো। এই মৌসুমটা ওদের জন্য আশা জাগানিয়া ও ব্যবসার জন্য সুখবর বয়ে আনে। ইতিমধ্যে কার্লা ছুরির ফলার ধারের মত ব্যথা বুকে নিয়ে বেঁচে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। ওটা আর অতটা যন্ত্রণাদায়কও ছিল না। প্রকৃতপক্ষে ব্যথাটা ওকে আর অবাক করে না। তার বদলে সে এখন বুকের ভেতর একটা চাঁপা ব্যথা সবসময় অনুভব করে। একটা প্রলোভন তার মধ্যে সবসময় কাজ করে।

চোখ তুললেই সে দেখতে পায়, বুঝতে পারে, তাকে কোথায় যেতে হবে। সে হয়তো দিনের কাজ শেষে, একা একটু হাঁটতে যেতে চায়।

হয়তো সেখানে যেতে চায়, যেখানে কতগুলো ময়লা কঙ্কাল পড়ে থাকতে দেখবে। যেখানে ছোট্ট খুলিটাতে তখনও কিছু চামড়া লেগে থাকবে, যে-খুলিটাকে একহাতে চায়ের কাপের মত করে ধরা যাবে, অন্য হাতে কার্লা ধরে থাকবে তার জ্ঞান, তার প্রজ্ঞা। আবার তা হয়তো নাও হতে পারে। হয়তো সেখানে কিছুই থাকবে না।

অন্য কোন ঘটনাও ঘটতে পারে। যেমন, সে হয়তো ফ্লোরাকে তাড়িয়ে দিতে পারে। ওকে ট্রাকের পেছনে বেঁধে দূরে কোথাও ছেড়ে দিয়ে আসতে পারে। এমনও হতে পারে, ওকে যে জায়গা থেকে ওরা এনেছিল সেখানেই ফেলে আসতে পারে; যেন ফ্লোরা তাদের আশেপাশে না থাকে, ওদের স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলার জন্য।

সে এখন স্বাধীন।

ওখানে যাওয়ার ইচ্ছাটাকে সে দমন করে, হ্যাঁ, বেশ কিছু দিন কার্লা ঐখানে যাওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখে।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close