Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ বব ডিলান / ‘আমার জীবনটা প্রায় খোলা বইয়ের মতো’

বব ডিলান / ‘আমার জীবনটা প্রায় খোলা বইয়ের মতো’

প্রকাশঃ November 7, 2016

বব ডিলান / ‘আমার জীবনটা প্রায় খোলা বইয়ের মতো’
0
2

আলাপ করতে চাও আমার সঙ্গে? বেশ তো, বলো। খবরের কাগজের বহু লোকই দেখি আমার সঙ্গে আলাপ করতে চায়, কিন্তু তারপর আর করে না। হয়তো কোনো কারণ আছে তার, সেটাই রহস্য, যদি তা সত্যি হয়,  তাহলে শেষ অব্দি আমাকেই শুরু করতে হয়। আমার ধারণা তাতে কাগজের বিক্রি বাড়ে। খবর মানে তো ব্যবসা। আমার সঙ্গে খবরের কাগজের ব্যক্তিগতভাবে কোনো যোগ নেই, ফলে তার সঙ্গে তাল মেলানোর কোনো চেষ্টা আমি করি না। রহস্যটহস্য নিয়ে ভাবলেও আমি নিজের কথা ভাবি না, ভাবি এই বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডের কথা। যেমন সূর্য ডুবে গেলে চাঁদ কেন ওঠে? শুঁয়োপোকা কেন প্রজাপতি হয়?

এতকাল আমি নির্জনে ছিলাম না। খবরের কাগজের লোকদের সঙ্গে এতকাল যে কথা বলিনি তার কিছু ব্যক্তিগত কারণ ছিল। নিজের সম্পর্কে কথা বলার চেয়ে সে-সবের গুরুত্ব নিশ্চয়ই অনেক বেশি। পারলে এখনও আমি চোখের আড়ালে থাকি। আমার জীবন নিয়ে অন্যেরা ভাববে, তার চেয়ে নিজের জীবন নিয়ে নিজে ভাবাটা নিশ্চয়ই অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যেমন ধরো, বাড়িঅলাকে বলতে হবে যে পানির কলটা যেন ঠিক করে দেয়। ছবি করার পয়সা দেবে এমন একটা লোক খুঁজে বার করতে হবে – এসব তো নিজেকেই করতে হয়, তাই না? পত্রিকায় এসব নিয়ে বলেটলে কী হবে? অন্যেরা এসব জানলে সমস্যা বাড়বে, তার জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত নই। আর তাছাড়া নিজের সম্পর্কে কথা বলতে আমার ভালো লাগে না। তবে যেসব বিষয় নিয়ে আমার সত্যি সত্যি কিছু বলবার আছে – যেমন বস্তি অঞ্চলের মাস্তান, পাপ আর মুক্তি, প্রবল লালসা, কিংবা খুনিরা অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে কেন, শিশুদের কোনো ভবিষ্যৎ নাই – এসব কথা লোকে ছাপতে চায় না। এদিকে যেসব প্রশ্নের উত্তর তারা ছাপতে চায় সেসব আবার আমার জানা নেই।

আমি নিজে বরং নিতে চাই তাদের সাক্ষাৎকার, বা বলতে চাই তাদের কথা, যারা আজ বেঁচে নেই। যেমন হাঙ্ক উইলিয়ামস, আপোলোনিয়র, বাইবেলের জোসেফ, মেরিলিন মনরো, জন কেনেডি, মুহম্মদ, যিশুর শিস্য পল, হয়তো উইলকেস বুথ কিংবা গোগোল। আমি তাদের সাক্ষাৎকার নিতে চাই যাদের ঘিরে ঘনিয়ে ওঠা রহস্যের সমাধান হয়নি। কল্পনা ছাড়া যাদের নিয়ে আমরা ভাবতে পারি না। জীবিত লোকদের মধ্যে কার কথা বলব? কাস্ত্রো? গর্বাচেভ, রেগন, হিলসাইড স্ট্রাংলার্স? এরা কী কিছু বলবে তোমাকে? দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী লোকটির নিয়তি কী, তা জানার আগ্রহ নেই আমার। আমি জানি কী তাদের পুরস্কার। কারো কাজ যদি আমার ভালো লাগে তাহলে আমি সেটা ঠিক সেই অবস্থাতেই রেখে দিই। কেউ যদি কিছু করে থাকে, সেটা কীভাবে করলো, এটা জেনে আর কী হবে! তার দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি খবরই পাওয়া যাবে শুধু। ‘মাছ খাও না কেন? – ব্যাপারটা এরকম আর কী। আমি যা খুঁজে বেড়াই – এর মধ্যে তার উত্তর নেই।

ব্যাটম্যান আর রবিন ধরনের সানগ্লাশ দিয়ে জীবন শুরু করেছিলাম। এ ব্যাপারে কালো প্লাস্টিকের মুখোশযুক্ত মোটর সাইকেলের হেলমেটই অবশ্য সবচেয়ে ভালো, তাতে মাথার পেছন দিকটা দেখা যায় না। সানগ্লাশ কেনাটা তো সহজ, জুতো কেনাটাই ঝামেলার – এটা পরে দ্যাখো, ওটা পরে দ্যাখো – এইরকম আর কী। এমন একটা চশমা আমি খুঁজছি যা দেয়াল ভেদ করে যায়। সেটা সানগ্লাশ না অন্যকিছু, তাতে কী এসে যায়।

লোকে সব সময় আমার কাছে ১৯৬০-এর দশকের কথা জানতে চায়। আমি বলি, শোনেন, সেই সময় সম্পর্কে সত্যি সত্যি জানার আগ্রহ থাকলে নর্মান মেইলারের আর্মিজ অফ দ্য নাইট পড়ো, মার্শাল ম্যাকলুহান, কী আব্রাহাম মাশলো পড়ো। কত লোকেই তো লিখেছে ষাটের দশক নিয়ে। ভালোই তো লিখেছেন, সত্যি কথাই লিখেছেন। গায়করা তাদেরই একটা অংশ। আমি বরং অত কিছু বলতে-টলতে পারবো না বাপু। কিছু কিছু আমার মনে আছে, কিছু একদম ঝাপসা হয়ে গেছে। খুব চেষ্টা করলে হয়তো মনে পড়বে সামান্যই। অন্যেরা বরং সেসব দিনের কথা অনেক বিস্তৃতভাবে বলতে পারবে। গিনসবার্গ পারবে, কেরুয়াক পারবে। কেরুয়াক তো কিচ্ছু ভোলেনি।

মাইলস ডেভিস-ই হচ্ছে আমার কাছে পরম প্রশান্তির প্রতীকী মানুষ। দর্শকদের দিকে পেছন ফিরে ছোট-ছোট ক্লাবে ও কিছু বাজাচ্ছে দেখলে আজও আমার ভালো লাগবে। হঠাৎই হাতের যন্ত্রটা নামিয়ে রেখে মঞ্চ ছেড়ে চলে গেল, ব্যান্ড বেজেই চলেছে, ফিরে এসে শেষ দু-একটা নোট বাজিয়ে ছেড়ে দিল। আমি এমন দু-একবার করে দেখেছি, লোকে মনে করে আমি অসুস্থ।

আমার প্রথম পপ-হিরো জনি রে। ১৯৭৮-এর শেষ দিকে তাকে দেখেছিলাম। ক্লাবের লাউঞ্জে বাজাচ্ছিল। আমার ধারণা ও এখনও বেঁচে আছে। কী যে দারুণ ছিল ও। লোকে ভুলে গেল!

আমি কখনও টেলিভিশনে খেলা দেখি না। গত বছর ইংল্যান্ডে থাকার সময়ে উইম্বলডনে ম্যাকেনরোকে অবশ্য দেখলাম কনর্সকে কীভাবে হারালো। মঞ্চের পেছনে একটা টিভি ছিল, একটু আগেই পৌঁছে গিয়েছিলাম। কী আর করি, খুব মন দিয়ে খেলাটা দেখলাম।

ছোটবেলায় হকি খেলেছি, বেসবল বা বাস্কেটবল তত খেলিনি। ফুটবল তো ছুঁয়েই দেখিনি।

আমার জীবনে যত নারী এসেছে, তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব ভালো। সবাই আমার খুব ভালো বন্ধু।

কোনো মেয়েকে চিঠির আদলে লেখা নাথানিয়েল হথর্নের একটা বই পড়েছিলাম। খুবই ব্যক্তিগত লেখার ধরন, তাতে নিজেকে খুঁজে পাইনি। কিন্তু তিনি কী বলতে চান, সেটা বুঝেছিলাম। আমার গানে আমার অনেক কিছুই ঢুকে বসে আছে। কখনও নিজেকে বলি – না, না, এটা বদলাতে হবে। এত ব্যক্তিগত কথা রাখা চলবে না। আবার কখনও বলি – থাক না, কেউ ‍যদি এসব ঘেঁটে লোক হিসেবে আমি কেমন বুঝতে চায় তো বুঝুক। এটা তার ব্যাপার।

সবচেয়ে ভালো গান হচ্ছে সেই সমস্ত গান, যা তুমি লিখলেও সে-সম্পর্কে কিছুই জান না। এ যেন একধরনের মুক্তি। এমনটা আমি অবশ্য খুব একটা করি না। কারণ কল্পনা করা ছাড়া যেখানে আর কিছু করার নেই সেখানে নিজেকে আটকে ফেলার চেয়ে মনে হয় চারপাশে যা ঘটছে তা নিয়ে কাজ করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তুমি যদি এমন কিছু কল্পনা করতে পার, যা তোমার অভিজ্ঞতায় নেই, তাহলে প্রায়ই দেখা যাবে যে অন্য কেউ হয়তো সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেল আর তার সঙ্গে একাত্মতা বোধ করলো। অ্যালান পো’র দ্য টেল-টল বা দ্য পিট অ্যান্ড দ্য পেন্ডুলাম ইত্যাদি গল্পগুলো সম্পর্কে আমরা ভাবনাটা এমনই। তার জীবনে এসব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ আর কী ছিল? তিনি শ্রেফ চিলেকোঠার ঘরে বসে গল্পগুলো লিখেছেন আর লোকে মনে করেছে আরে, এ তো ভারি অদ্ভুত লোক। এটা যে পদ্ধতি হিসেবে খুব অপ্রাসঙ্গিক সেটা অবশ্য আমি মনে করি না। কিন্তু ওদিকে আবার হেরমান মেলভিলের মতো লেখকেরা আছেন, যারা সব তাদের অভিজ্ঞতা থেকে লেখেন। যেমন মবি ডিক বা কনফিডেন্স ম্যান। তবে তাতেও যে কল্পনার মিশেল নেই তা নয়। লেখালেখি নিয়ে যে আমার কিছু বলবার অধিকার আছে সেকথা ধরে নিলেও ঘটনা হচ্ছে, এ সম্পর্কে আমি বিশেষ তেমন কিছু জানি না। জানার কিছু আছে কিনা, তাও জানি না।

গান গাইতাম বলে প্রথমে গান দিয়েই লেখা শুরু করি। লিখতে শুরু করি কারণ চারপাশটা কেবলি বদলে যাচ্ছিল আর তা নিয়ে গানটান লেখার দরকার হয়ে পড়ছিল। গান গাই বলেই আমি লিখি। এসব গান অন্য কেউ লিখলে আমার আর লেখার দরকার হতো না। যাই হোক, কান টানলে মাথা আসে, তাই আমিও আমার গান লিখে যেতে থাকি। কিন্তু ব্যাপারটা অত সহজ নয়। এ জন্যে তো আমি নিজেকে তৈরি করিনি। নিজে লেখার আগে গান আমি অনেক গেয়েছি।

স্কুল থেকে বেরুনোর আগে আমি কোন দিন কবিতাও লিখিনি। আঠারো বছর বয়সে আমি গিনসবার্গ, গ্যারি স্নাইডার, ফিলিপ হালেন, ফ্রাঙ্ক ওহারা এদের আবিষ্কার করি। তারপর র‌্যাঁবো, ফ্রাঁসোয়া ভিয়েঁ এইসব ফরাসি কবির লেখা পড়তে আর তাদের কবিতা সুর দিয়ে গাইতে শুরু করি। তখন লোকগানের একটা হুজুক চলছিল। কত যে জ্যাজ ক্লাব ছিল তার ইয়ত্তা নাই। দুয়ের মধ্যে একটা যোগাযোগও ছিল, কবিরা সেখানে কবিতা পড়তো। আর কাগজে ছাপা কবিতার চেয়ে জ্যাজ ব্যান্ডের সঙ্গে কবিদের আবৃত্তির প্রভাব বরং আমার গানে বেশি পড়েছে।

আমার গানের ‘তুমি’ অনেক সময়ে আসলে ‘আমি’ই, যে নিজের সঙ্গে কথা বলছে। অন্য সময়ে আমি হয়তো আর কারু সঙ্গে কথা বলছি। কোনো গানে আমি যদি নিজের সঙ্গে কথা বলতে থাকি তাহলে সেটা থামিয়ে কখনই বলতে যাব না যে, হ্যাঁ, এবার আমি তোমার সঙ্গে কথা বলবো। কে কোন জন, সে তোমাকেই বুঝে নিতে হবে, বাপু। অনেক সময়ে আবার ‘তুমি’ কথা বলছে ‘তোমার’ সঙ্গে। আমি ‘আমার সঙ্গে আমি’র মতোই বদলে গেছি কখনও কখনও। এটা এই আমি হতে পারে আবার সেই আমিও হতে পারে, যে আমাকে সৃষ্টি করেছে। অথবা তা হয়তো অন্য কেউ যে বলছে যে সে ‘আমি’ই। এই মুহূর্তে আমি যখন ‘আমি’ বলছি, তখন আমি জানি না যে আমি কার সম্পর্কে এসব বলছি।

আমি যত দিন গান গাইবো বা রেকর্ড করবো, ততদিন ঠিক সেই সময়ে চারপাশে যা ঘটবে, তার সঙ্গে আমার সংযোগ থাকবে। আমি পিট সিগার নই, যদিও মাঝে মাঝে দু-তিন হাজার লোককে গান গেয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছি। কিন্তু পিটের মতো কোনো দিনই করতে পারিনি। পিট এ ব্যাপারে মাস্টার। বিরাট জনতাকে শুধু গান গেয়ে সে এগিয়ে নিয়ে গেছে তাই নয়, তার গানের ভাষাই আলাদা। জনতার কাছে তার আবেদন অপরিসীম, অনেকটা প্রায় স্ট্রিঙের মতো। এই গানগুলোরও যে একটা গুরুত্ব রয়েছে, ভূমিকা আছে – এটা যার পিটের গান শুনেছে, বুঝতে পারে। নিজেদের অনুভব করতে পারে। টিয়ার্স ফর ফিয়ার্স যখন দেখেছি, মনে হয়েছে যেন একটা ফুটবল খেলা দেখছি। ট্রাইব্যাল মেডিসিন ম্যানের মতোই সেখানে পিটের ভূমিকা। কথাটা ইতিবাচক অর্থেই বলছি আমি। রক অ্যান রোল পারফর্মারদের সম্পর্কে একথা কিন্তু বলা যাবে না, অন্য লোকের কল্পনা নিয়ে কাজ করতেই তারা বেশি ব্যস্ত।

নিউপোর্ট ফোক ফেস্টিভালে বহু লোকের সামনে সেবারই আমি প্রথমবারের মতো ইলেকট্রিক গিটার বাজাই। এর আগেই কিন্তু আমার ব্রিংগিং ইট অল ব্যাক হোম বেরিয়ে গিয়েছিল, আর সেটা বেশ জনপ্রিয়ও হয়েছিল। তবু লোকে কেন যে সামনা-সামনি গাইলে সেটা নিতে পারলো না, তার কারণ তখন আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। আজেবাজে কিছু করলে তো লোকে বেশ মেনে নেয়, তাহলে স্বাভাবিক কিছু করলে লোকে অমন দাঙ্গাহাঙ্গামা করে কেন? তো লোকে যা-ই করুক, আমার কাছে তার কোনো গুরুত্ব নাই।

তথাকথিত সম্পর্ক নিয়ে আমি সাধারণত লিখি না। মিথ্যে ভনিতার উপর কোনো সম্পর্ক দাঁড়িয়ে থাকলে আমি তাতে নেই, বাপু। এর মানে অবশ্য এই নয় যে তেমন কোনো সম্পর্ক আমার হয়নি। হয়েছে তো অবশ্যই, তবে বেশি দূর আমি তা টেনে নিয়ে যাইনি। আমার জীবনটা প্রায় খোলা বইয়ের মতো। নিকটজনদের সঙ্গে তো আমি মিশতেই চাই, কিন্তু তারাই তা চায় না।

আমি জানি, আমার অধিকাংশ গানে আমি কার সম্পর্কে বলছি আর কাদের উদ্দেশ্য করে গাইছি। ১৯৭৮-এর পর থেকে একথা আরও সত্যি হয়ে উঠেছে। আটাত্তরের আগের লোকজনেরা আর নেই, হারিয়ে গেছে। প্রকাশ্যে সেসব গান আর গাইতে চাই না। সেখানে এমন কিছু ব্যাপার আছে, সময়ের ব্যাপার জড়িয়ে্ আছে, যার সঙ্গে এখন আর তেমন ঘনিষ্ঠতা বোধ করি না। ডিজায়ার অ্যালবামের গানগুলোর কথাই ধরো – কী কুয়াশায় ভরা। আটাত্তরের পর থেকে সব চরিত্রই ভীষণভাবে বাস্তব আর তারা আজও বেঁচে। যাদের মধ্যে মহত্ত্বের কিছুটা আঁচ পাই, তাদের নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করে, তাদের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা খুঁজে পেলে ভালো লাগে।

ভিডিও ব্যাপারটাও আমার কাছে ভারি বেখাপ্পা লাগে। ডেভ স্টুয়ার্টের সঙ্গে শেষ যেটা করেছি, সেটা ঠিক আছে হয়তো, কিন্তু অন্যগুলো? জানি না আমাকে যা করতে বলা হয়েছে শ্রেফ তাই করে গেছি। ওসব নিয়ে আমি আর মাথা ঘামাই না। রেকর্ড বের করতে হলে ওটাই তোমাকে করতে হবে, অন্য কোন উপায় নেই। কিন্তু কথা হচ্ছে তারপরও তোমাকে প্রকাশ্য মঞ্চে গাইতে হবে, ভিডিওর আড়ালে লুকিয়ে থাকলে চলবে না। ভিডিওর মাতামাতিটা কমে এলে লোকে আবার খেয়াল করে দেখে যে কে প্রকাশ্যে অনুষ্ঠান করে আর কে করে না।

আমার ক্ষেত্রে আবার সেন্সরশীপ কিসের? ওপরের দিকের জনা চল্লিশেক শিল্পীরা এটা নিয়ে ভাবুক। যাদের রেকর্ড হিট করছে, এসব তাদের ব্যাপার। আমার আর সেসব এখন নেই। আমি তো আজকাল সেই পুরানো গানই নতুন করে লিখছি, যেমনটা আমার এখন মনে হয়, যেভাবে মনে হয়। ওই সব হিট রেকর্ড আমি কিনতে যাই না কখনও, ভালোও লাগে না। তো, এখন তুমি রেডিওর এক্স-রেটেড না আর-রেটেড শিল্পী, কী গান শুনছো, তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা কেন হবে। যদিও এসব যা চলছে, ভালো হচ্ছে না, আমি এর বিরুদ্ধে।

প্রায় সব সময়্ই আমি বিশেষ একধরনের নারীর প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেছি। কণ্ঠস্বরই সেখানে আসল। প্রথমে সেটাই আমি শুনি। বেড়ে ওঠার দিনগুলোকে ওই ধ্বনিই তো আমি শুনেছি, ওই ধ্বনি আজও আমাকে ডাকে। সব যখন মুছে যায়, শূন্য হয়ে যায়, তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টেপল্ সিঙ্গারসের গান শুনি। এ বুঝি মনে হয় গসপেল শোনার অভিজ্ঞতা। অথবা ধরো, ক্রিস্টালের রেকর্ডে ওই কণ্ঠ – দ্য হি কিসড্ মি, ক্লাউডি কিং, মেমফিস মিনি – এসবই শুনি আমি। ওই কণ্ঠে কী যে যাদু আছে। যখনই আমি শুনতে পাই আমি, হাতের সব কাজ সরিয়ে রেখে শুনি। শরীরের সঙ্গে কণ্ঠ না মিললেও শরীর তো শরীরই। কোনো মেয়ে কালা হতে পারে, বোবা হতে পারে, প্রতিবন্ধী বা অন্ধ হতে পারে, তবু তার আত্মা তো থাকে, আর থাকে সহমর্মিতা। আমার কাছে সেটাই আসল। আর কণ্ঠস্বর দিয়েই সেটা সবচেয়ে ভালো বোঝা যায়।

ফ্রয়েড আমি কোনো দিন পড়িনি। তিনি যা বলেছেন তার প্রতি কোনো আকর্ষণই বোধ করি না আমি। মনোবিশ্লেষণ, মনোসমীক্ষণ ইত্যাদি নিয়ে অনেক আজেবাজে বিষয় তিনি ছড়িয়েছেন। তার ওপর এ নিয়ে চলে ব্যবসা। মনোবিশ্লেষণ কাউকে সাহায্য করেছে বা করতে পারে, আমি তা বিশ্বাস করি না। এটা একটা বিরাট জোচ্চুরি। হাজার-হাজার ডলার এভাবে হাতবদল হয়ে যাচ্ছে, অনেকের পকেট ভারি হচ্ছে, যা এর চেয়ে অনেক ভালো কাজে ব্যবহার করা যেত। পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর বছর বয়সের আগে বহু লোকের বাবা-মা নিয়ে নানান সমস্যা থাকে। বাবা-মায়ের অনুভূতি বা আচ্ছন্নতা থেকে তারা বেরুতেই পারে না। আমার কিন্তু এ নিয়ে কোনো সমস্যা ছিল না। যেমন ধর লেননের ছিল – ‘মা, আমি তোমাকে পেয়েছি কিন্তু তুমি কোনোদিন আমাকে পাওনি’ – একথা আমি ভাবতেই পারি না। আমি জানি এ সমস্যা অনেকেরই আছে। এই পৃথিবীতে নিশ্চয়ই বহু অনাথ শিশু আছে, কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা সেরকম নয়। আমি আমার দাদির কাছে বড় হয়েছি। তিনি ছিলেন এক অসাধারণ মহিলা। আমি তাকে এত ভালোবাসতাম যে আজও তার অভাব বোধ করি।

পূর্বজন্মে আমি র‌্যাঁবো ছিলাম বলে প্যাটি স্মিথ যা রটিয়েছে তার ভুল-শুদ্ধ আমি কিছুই জানি না। হতে পারে প্যাটি হয়তো এত বিস্তৃতভাবে জানে, যা নিয়ে আমি সচেতন নই। ও হয়তো কোনো সূত্র পেয়েছে, যা আমার বোধগম্যতার বাইরে। বরং আমি একডজন মহিলাকে জানি যারা মনে করে যে তারা পূর্বজন্মে শেবার রানি ছিল। আগের জন্মের বেশকিছু নেপোলিয়নকেও আমি চিনি। অন্তত জনা দুয়েক জোয়ান অফ আর্ক আর একজন আইনস্টাইনকে চিনি আমি। মিনেসোটার হিবিংয়ে খুব বেশি ইহুদি ছিল না। যারা ছিল তাদের অধিকাংশের সঙ্গেই আমার সম্পর্ক ছিল। ইহুদিরা নানাভাবে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে – কেউ গোঁড়া, কেউ রক্ষণশীল, কেউ-বা সংস্কারপন্থী। স্বয়ং ঈশ্বর বুঝি তাদের ওইসব নামে ডাকেন। খ্রিস্টানরাও তাই – ব্যাপটিস্ট, অ্যাসেম্বলি অফ গড, মেথডিস্ট, ক্যালভিনিস্ট এইসব আর কী। একটা লোকের পরিচয় নিয়ে ঈশ্বরের কোনো মাথাব্যথা নাই। তুমি নিজে কী বললে, তাতে তার কী এসে যায়। আমি এর কোনো অর্থই বুঝি না – এই অহঙ্কারের। লোকে তো এমনভাবে কথা বলে, কাজ করে, বাঁচে, যেন মনে হয় কোনো দিন তারা মরবে না। কী এমন থেকে যাবে মৃত্যুর পর? কিচ্ছু না, একটা মুখোশ ছাড়া কিচ্ছু না।

বড় আকারে কেউ কিছু করলে স্বদেশে সব সময় তা প্রত্যাখ্যাত হয় আর তা গৃহীত হয় অন্য কোথাও। একথা বুদ্ধের সম্পর্কেও বলা যায়। বুদ্ধ কে? না এক ভারতীয়। বৌদ্ধ কারা? ওরা চীনা, জাপানি, এশিয়ার অন্য এলাকার লোকেরা। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে তারাই সংখ্যাগুরু। একই কথা যিশু সম্পর্কেও বলা যায় – একই ব্যাপার ঘটেছে ইহুদিদের সম্পর্কেও। কাদের কাছে তাদের আবেদন? এই আবেদন তাদের কাছেই যারা বেহেশতে যেতে চায়। কিন্তু একদিন সত্যি কথাটা প্রকাশ হয়ে পড়বে, লোকে তার মধ্যে তৈরিও হয়ে যাবে, আর সবকিছু সেদিকেই যাচ্ছে। তুমি এসব কথা চেঁচিয়ে বলতে পার, কন্তিু তাতে কী এসে যায়। এ তো হবেই। শ্লাঘার ওপর শ্লাঘা, এ ছাড়া আর কী-ই বা বলতে পারি।

রাজনীতি আজ বদলে গেছে। পুরোপুরি বদলে গেছে। ১৯৬০-এর স্কুল থেকে যারা বের হতো তাদের রাজনীতি শেখাতেন যে অধ্যাপকেরা, তারা ছিলেন রাজনৈতিক ভাবুক-চিন্তক, আর এরকম মানুষ তখন পথে-ঘাটে ছড়িয়ে থাকতেন। আমি রাজনীতি যা শিখেছি, তার সবই শিখেছি এই রাজপথ থেকে। কারণ সেটা ছিল সামগ্রিক পরিবেশেরই একটা অংশ। এ আর এখন কোথায় পাওয়া যাবে? এখন সবাই নিজের নিজের জিনিস ফেরত চায়। কোনো ঐক্য নেই। এই পুয়ের্তেরিকান প্যারেড শুরু হলো তো সঙ্গে সঙ্গে জার্মান উইক, এই পোলিশ দিবস হলো তো ওই চলে এলো মেক্সিকান প্যারেড। সবাই নিজের নিজের পতাকা নাড়ছে, কোনো ঐক্য নেই তাদের মধ্যে। ১৯৬০-এও কোনো বিভাজন ছিল না। তখনকার সময় আর এখনকার সময়ের এই হলো পার্থক্য। সবাই নিজেদের লোক নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে, পড়বেই তো, উপায় কী? সবাই চারদিকে তাকিয়ে বুঝতে পেরেছে যে ভারসাম্য বলে আজ আর কিছু নেই।

সময় এখন প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে। আমি বরং এরই মাঝে আরেকটু ধীরে চলার চেষ্টা করে যাচ্ছি। কারণ সময় তো বদলে যাচ্ছে, বদলাচ্ছে খুব দ্রুত।

শিশুকালে শিশুর মতো কথা বলেছি, ভাবনাও ছিল শিশুর মতো। যখন বড় হলাম, ছেলেমানুষিটা ছেড়ে দিলাম।

সূত্র : Spin, Year 1, Vol. 8, 1985.

ভাষান্তর : মাসুদুজ্জামান

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(2)

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close