Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ বস্টন এমএফএ > চিত্রকলা/ভ্রমণ >> ইফতেখারুল ইসলাম

বস্টন এমএফএ > চিত্রকলা/ভ্রমণ >> ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশঃ June 29, 2017

বস্টন এমএফএ > চিত্রকলা/ভ্রমণ >> ইফতেখারুল ইসলাম
0
0

বস্টন  এমএফএ 

এক

আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে নিউ ইয়র্কের আর্ট মিউজিয়াম মেট আর মোমা আমেরিকার সবচেয়ে বিখ্যাত, বড় এবং দর্শনীয় সংগ্রহ। মেট অর্থাৎ মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট সবচেয়ে বড় হলেও দ্বিতীয় বড় সংগ্রহ কিন্তু মোমা বা মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট নয়। আসলে  আমেরিকার শীর্ষ দশের দুই থেকে পাঁচ পর্যন্ত অবস্থান অন্য কয়েকটি মিউজিয়ামের। সেগুলোর মধ্যে আছে ফিলাডেলফিয়া মিউজিয়াম অব আর্ট, আর্ট ইনস্টিটিউট অব শিকাগো, ন্যাশনাল গ্যালারি অব আর্ট, ওয়াশিংটন ডিসি আর মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস, বস্টন। এদের প্রত্যেকের আলাদা বৈশিষ্ট্য এবং বিশেষ পরিচিতি আছে। যার যার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সংগ্রহ নিয়ে যোগ্য ও সুদক্ষ কিউরেটরের তত্বাবধানে এরা দর্শক আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। এ ছাড়া নিয়মিত আয়োজন করা হয় বিশেষ প্রদর্শনী। কিন্তু আমেরিকা এবং বাইরের সারা পৃথিবী থেকে আসা দর্শকদের পছন্দ বিবেচনা করে প্রত্যেকেই ইউরোপীয়, বিশেষত ফরাসি চিত্রকলার একটা বড় বিভাগ রাখতে চেষ্টা করে |

এ ধরনের চিত্রকলার ব্যাপারে বেশি আগ্রহ থাকায় আমি নিজেও মেট আর মোমা এই দুটি মিউজিয়ামের ইউরোপীয় বিভাগগুলো মোটামুটি ভালোভাবে দেখে নিয়েছি। সেটা অনেক বছর আগের কথা। তখন থেকেই লক্ষ করি, ইমপ্রেশনিজম-এর ব্যাপারে আমেরিকান শিল্প-অনুরাগী ও দর্শকদের আগ্রহ যেমন বেশি, পড়াশোনা ও প্রস্তুতিও তেমনি যথেষ্ট। ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের মধ্যে ক্লদ মোনে আমেরিকার শিল্প-অনুরাগীদের কাছে যুগ যুগ ধরে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। সে কারণেই মেট এবং মোমার বাইরেও বড় মিউজিয়ামগুলোতে মোনে এবং তাঁর সমসাময়িক শিল্পীদের ছবির খুব ভালো সংগ্রহ আছে।

শিকাগো আর বস্টনের মিউজিয়ামে এ ধরনের ছবির ভালো সংগ্রহ আছে সে-কথা আমাকে জানায় আমার ছেলে। সে দীর্ঘদিন ধরে ম্যাসাচুসেটস-এ থাকে। যাই হোক, শিকাগোতে আমার যাওয়াই হয়নি। কিন্তু নানা কাজে বস্টন যাওয়া হয়। কাজ না থাকলে কেমব্রিজে, হার্ভার্ড স্কোয়ারে হেঁটে বেড়াই, হার্ভার্ড বুক স্টোরে যাই। ওই শহরে মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস ঠিক কোনখানে সেটাই জানা হয়নি আগে। কারণ তখন আমি প্যারিসের ছোট-বড় নানা মিউজিয়ামে ফরাসি চিত্রকলায় নিজেকে নিমজ্জিত রাখতে পারতাম। তাই অন্য কোনো শহরে গেলে সেখানকার শিল্প-সংগ্রহ খুঁজে দেখার প্রয়োজন বোধ করিনি। অবশেষে বস্টন এমএফএ-তে যাবার সুযোগ ঘটল গত বছর।

আমাদের ছেলে ইফরাদ থাকে ম্যাসাচুসেটস-এর উস্টারে। সেখান থেকে এক ঘণ্টায় বস্টন আসা যায়। আমি যে-কোনো দিন ট্রেনে একা চলে আসতে পারি। আর ছুটির দিন হলে আমার ছেলেও সঙ্গে আসবে। এই বয়সের ছেলে-মেয়ে শিল্পকলায় আগ্রহী হলে সেটাকে  উৎসাহ দিতে হয়। কিন্তু যে রোববারে আমরা বস্টন যাব তার আগের শুক্র-শনিবারে সে অন্যত্র যাবে গান শুনতে। কনসার্ট উপলক্ষ্যে দুই রাত সে থাকবে নিউ হ্যাম্পশায়ারের কনকর্ড শহরে। আমি যদি ওর সঙ্গে যাই তাহলে রোববার সকালে কনকর্ড থেকে রওয়ানা হয়ে বস্টনের মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস দেখতে নিয়ে যাবে। সেখান থেকে দিনের শেষে ফিরব উস্টার-এ, ওর বাড়িতে। এতে আমার রাজি না হবার কোনো কারণ নেই |

দুই

কনসার্ট যথাসময়ে শেষ হলো। রোববার সকালে আমাদের সামনে খুবই ব্যস্ত একটা দিন। অথচ যাত্রা শুরুর আগে ইফরাদ বলে, এই কনকর্ড থেকে অল্প কিছু দূরে কবি রবার্ট ফ্রস্টের ফার্মহাউস আছে। সেটা দেখতে যেতে চাও? নিশ্চয়ই যাবো। আবার কবে এদিকটায় আসা হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যাই।

এই কবি আমার কতো প্রিয় সেটা বড় বিষয় নয়। এই আমেরিকান কবির কবিতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার ছেলেবেলার বই পড়ার স্মৃতি। স্কুলে পড়ার সময় বড়ভাইদের সংগ্রহে দেখেছি শামসুর রাহমানের তিনটি কবিতার বই। প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে, নিরালোকে দিব্যরথ আর বিধ্বস্ত নীলিমা। আর ওই একই শেলফে একটা অনুবাদ কবিতার বই। রবার্ট ফ্রস্টের নির্বাচিত কবিতা। তাই এই কবির নাম শুনলেই আমার শামসুর রাহমানের কথা মনে পড়ে। চোখে ভেসে ওঠে তাঁর অনুবাদ বইটি |

বিদেশের বেশ কজন প্রধান কবির সঙ্গে বাংলা ভাষার পাঠকের পরিচয় করিয়ে দেন বাংলা কবিতার কোনো-না-কোনো প্রধান কবি ও অনুবাদক। এভাবেই আমরা বোদলেয়র এবং রিলকের কবিতা পড়েছি। বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে ও বিশ্লেষণে জেনেছি তাঁদের কবিকৃতির কথা। রবার্ট ফ্রস্ট যে একজন বড় কবি সেটা অল্প-বয়সে শামসুর রাহমানের অনুবাদ আর সেই অনুবাদ-গ্রন্থের ভূমিকা না পড়লে জানা হতো না আমার।

সর্বতোভাবে আমেরিকান একজন কবি হয়েও ফ্রস্ট কিন্তু প্রথম স্বীকৃতি পেয়েছিলেন বিদেশে। প্রথম দুটি বই বের হয় ইংল্যান্ড থেকে। পরবর্তীকালে আমেরিকার প্রধান কবি আর অন্যতম সম্মানিত নাগরিক হিসেবে মর্যাদা, স্বীকৃতি আর পুরস্কার সবকিছুই তিনি পেয়েছেন নিজদেশে। বছরের শ্রেষ্ঠতম কাব্যরচনার জন্য তাঁকে চারবার পুলিৎজার পুরস্কার দেওয়া হয়।

পশ্চিম উপকূলের ক্যালিফোর্নিয়াতে তাঁর জন্ম। তবে নিউ ইংল্যান্ডের একটি প্রাচীন পরিবারের সন্তান হিসেবে এই অঞ্চলটিকেই বেশি আপন করে নিয়েছিলেন এই কবি। নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলটিকে ফ্রস্ট ভালবাসতেন। এখানকার প্রকৃতি নিয়ে তিনি লিখেছেন বহু বিখ্যাত কবিতা। তাঁর কিছু প্রধান কাব্যগ্রন্থের নাম “দি নর্থ অব বস্টন”, “মাউন্টেন ইন্টারভ্যাল”, “নিউহ্যাম্পশায়ার”, “এ ফারদার রেঞ্জ”। এত বেশি আঞ্চলিক হওয়া সত্বেও সারা আমেরিকার মানুষ তাঁকে নিজেদের প্রিয় কবি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কারণ আসলে তাঁর কবিতা সর্বজনীন গুণে গুনান্বিত |

ফ্রস্টের খামার-বাড়িটি হলো ডেরি অঞ্চলের ভিতরে ১২২ রকিংহাম রোড – এই ঠিকানায়। এই সেই নিউ হ্যাম্পশায়ার যেখানে ফ্রস্ট তাঁর কবি-জীবন কাটিয়েছেন। রাজ্যটি খুব বড় নয়। তবে অসাধারণ সুন্দর এখানকার প্রকৃতি। চমত্কার রাস্তাঘাট। আমি নিজেই গাড়ি চালাতে চাই। জিপিএস-এর নির্দেশ অনুযায়ী মাত্র চল্লিশ মিনিটের পথ। রাস্তা একটাই, আর সেটা খুবই সরল। সুতরাং গন্তব্যে পৌঁছতে সময় লাগে না। নির্দিষ্ট জায়গাতে গাড়ি রেখে আমরা হেঁটে যাই |

খুবই সাধারণ একটা উঁচু দোতলা বাড়ি। তার গা ঘেঁষে আর একটা বাড়ি। সাদা রঙের উঁচু দোতলা খামার বাড়িটি টিপিক্যাল। ১৮৮০-এর দশকে নিউ ইংল্যান্ডের সবখানে এরকম খামার বাড়ি দেখা যেত। সেই নকশা আজও অপরিবর্তিত আছে। এই বাড়িতে কবি সপরিবারে বাস করেছেন ১৯০০ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত। তাঁর এক ছেলে আর দুই মেয়ের জন্ম এখানেই। এখানে থাকাকালে অনেক বিখ্যাত কবিতা তিনি লিখেছেন। এমনকি পরবর্তীকালের বহু কবিতাতেও এই বাড়ি আর এখানকার প্রকৃতির স্পর্শ আছে। ডেরি-অঞ্চলে কাটানো বছরগুলোর প্রভাব আছে তাঁর কোনো কোনো কবিতায়। সবচেয়ে বড় কথা কবি হিসেবে ফ্রস্টের স্বতন্ত্র সত্তা, নিজস্ব ভাষা আর কন্ঠস্বর তৈরি হয়েছে এই বছরগুলোতে। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে এই বাড়িতে আসার প্রথম বছরটিতে অন্য অনেক কবিতার সঙ্গে লেখা হয়েছিল ‘মাই নভেম্বর গেস্ট’। এই কবিতাটি ফ্রস্টের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এ বয়েজ উইল’- এ অন্তর্ভুক্ত। আর এই কবিতাগুলো সম্পর্কে শামসুর রাহমান লিখেছিলেন “এই গ্রন্থের কবিতাবলীর উৎন একটি উদ্বেল, তরুণ হৃদয় |” তাঁর মতে এদের কোনো কালাকাল নেই।

মূল দরজা দিয়ে বাড়িতে ঢুকলেই দেখা যায় এক পাশের দেয়ালে ঝোলানো রবার্ট ফ্রস্টের পরিণত বয়সের কয়েকটি ছবি। সেই সঙ্গে এই বাড়ি আর এই অঞ্চলের নানারকম স্মারক। সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে একটা ছোট্ট ডাকটিকেটের বিশালাকার প্রিন্ট। “রবার্ট ফ্রস্ট আমেরিকান কবি” ছবির সঙ্গে এই পরিচয় লিখে তৈরি করা ১০ সেন্ট দামের ডাকটিকেটটি। সাদা-কালো স্ট্যাম্প। সরল-সহজ, কিন্তু অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটা ডিজাইন।

দেওয়ালে প্রদর্শিত ছবির নিচে টেবিলের ওপর নতুন ও পুরনো মিলে বেশ কিছু বই আছে। আছে অল্প কিছু ছবি আর সুভেনির। কিছুক্ষণ পরপর গাইডের সহায়তায় সারা বাড়ি ঘুরিয়ে দেখানোর ব্যবস্থা আছে। বাড়ির বাইরে খালি মাঠ আর পাশের বিস্তীর্ণ বনভূমিতে ঘুরে বেড়ানোর জন্য কতগুলো ট্রেইল বা হাঁটা-পথ নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। আর আছে এই কর্তৃপক্ষের তত্বাবধানে আয়োজন করা নানারকম অনুষ্ঠান। মাঝে-মধ্যে ফ্রস্টের কবিতা পড়ার আয়োজন যেমন থাকে তেমনি থাকে সমকালীন কবিদের সম্মিলন, কবিতা-পাঠ, ইত্যাদি।

এ ঘরেরই একটু ভেতরের দিকে দর্শনার্থীদের বসার জায়গা আর তাদের সামনে একটা বড় স্ক্রিনের টেলিভিশন। কিছুক্ষণ পর পর রবার্ট ফ্রস্ট এবং এই ফার্ম হাউস নিয়ে তৈরি করা একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চিত্র দেখানো হয়। একটা শো শেষ হতেই আমরা বসে যাই পরের শো দেখার জন্য। রবার্ট ফ্রস্টকে দেখি। দেখি এই খামার-বাড়ির মাঠে, বাগানে, বনভূমিতে কবি হাঁটছেন। এরপর কবির এক কন্যাকে দেখি। অন্য বেশ কজন শ্রোতাকে ফ্রস্টের কবিতা পড়ে শোনাচ্ছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই এই প্রামাণ্যচিত্র থেকে আমার মন সরে যায় অন্যদিকে। আমি কোনো তুলনা মনে আনতে চাইনি। তারপরেও মনে পড়ে আমাদের প্রধানতম কবি শামসুর রহমানকে। মনে মনে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই, আমার মতো বহু বালককে সমকালীন বাংলা কবিতার দিকে আকৃষ্ট করার জন্য। আর রবার্ট ফ্রস্টের কবিতার সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য। শামসুর রাহমানের স্মরণে এরকম কোনো বাড়ি নেই। তাই আমরা আমাদের হৃদয়ে তৈরি করে রাখি প্রিয় কবির জন্য একটা আলাদা ঘর।

আবার যাত্রা শুরু। এখান থেকে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই বস্টনের হান্টিংটন এভিনিউতে মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টসে |

তিন

এত বড় একটা দেশ। কিন্তু আমেরিকার বেশির ভাগ বড় শহরে দোকান-পাট ছাড়া অন্য জায়গায় পার্কিং খুঁজে পাওয়া আর গাড়ি পার্ক করা অতি কঠিন একটা কাজ। বস্টনের কেন্দ্রস্থলে বেশ কিছুক্ষণ খোঁজার পর মিউজিয়ামের কাছাকাছি একটা রাস্তার ওপরে পার্কিংয়ের জায়গা পাওয়া গেল| রোববার বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিন হলে কতদূরে গাড়ি রাখতে হতো কে জানে!

মিউজিয়ামে প্রবেশের জন্য টিকেটের দাম জনপ্রতি পঁচিশ ডলার। ইউরোপ আর আমেরিকার যে-কোনো মিউজিয়ামের টিকেটই আমার কাছে একটু বেশি দাম মনে হয়। তাই কোনো মিউজিয়ামের সংগ্রহ দেখার ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহ না থাকলে আর হাতে পর্যাপ্ত সময় না থাকলে টিকেট কেনার অর্থ হয় না। তবে এখানে একটা সুবিধে হলো এদের টিকেটে ওই দিন ছাড়াও পরবর্তী দশদিনের মধ্যে যে-কোনদিন আর একবার এই মিউজিয়ামে ঢোকা যাবে।

মিউজিয়ামের ফ্লোর প্ল্যান দেখে স্থির করে নিতে হয় আমরা কোন কোন বিভাগ দেখতে চাই। কোন পথে এগুলে কম ঘুরে বেশি দেখা সম্ভব। এমএফএ একটা বিশাল সংগ্রহ। আমেরিকার সবচেয়ে বড় মিউজিয়ামগুলোর মধ্যে এটা অন্যতম। সাড়ে চার লক্ষের বেশি শিল্পকর্ম আছে তাদের সংগ্রহে। বছরে দশ লক্ষের বেশি দর্শনার্থী এখানে আসেন। নিজস্ব ছবি দিয়ে সাজানো গ্যালারির নিয়মিত প্রদর্শনী ছাড়াও ছোট বড় নানা রকম বিশেষ প্রদর্শনী চলতে থাকে।

আমরা ছবি দেখার জন্য দুটি বিষয় বেছে নিই। এক, আধুনিক আমেরিকান চিত্রকলা আর দুই, উনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় চিত্রকলা, বিশেষ করে ‘ইমপ্রেশনিজম এন্ড বিয়ন্ড’ এই শিরোনামে সাজানো প্রদর্শনী।

O'Keeffe_Georgia_Ram's_Head
র‌্যাম’স হেড, ও’কীফ

যে সময়টাতে আমরা ওখানে গেছি তখন মাত্র শুরু হয়েছে জর্জিয়া ও’কীফ, আর্থার ডাভ, ও চার্লস শিলারের ছবি আর জ্যাকসন পোলক ও পিকাসোর ছবির বিশেষ প্রদর্শনী। “মেকিং মডার্ন” এই শিরোনামে চলছে প্রদর্শনীটি। ও’কীফ আধুনিক আমেরিকান চিত্রকলার প্রধান শিল্পী হিসেবে খুবই সমাদৃত ও বিখ্যাত| আমেরিকায় তাঁর যতো খ্যাতি সারা পৃথিবীতে কিন্তু ততটা নয়। তাহলে পিকাসোর মতো বিশ্ব-নন্দিত শিল্পীর পাশাপাশি তাঁকে উপস্থাপনা করা হচ্ছে কেন ? পিকাসো ও পোলক এই দুই শিল্পীর সময়কাল প্রায় এক। তার চেয়ে বড় কথা শিল্পভাবনা এবং প্রথাবিরোধী কাজের ক্ষেত্রে এঁদের সকলের মধ্যেই কিছু মিল আছে। আছে কিছু ব্যবধানও। ভালোভাবে ছবিগুলো দেখলে সেটা বোঝা যায়। আধুনিক চিত্রকলার বিখ্যাত শিল্পীদের বেশ কিছু ছবি একত্র করে যে তুলনামূলক প্রদর্শনীটি আয়োজন করা হয়েছে তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আছে।

বেশির ভাগ মিউজিয়ামে ছবি তোলার ব্যাপারে বিধিনিষেধ থাকে। আগে এসব বিধি আরো ব্যাপক ছিল। সেলফোনে ক্যামেরার বিস্তারের কারণে আজকাল নিয়ম একটু শিথিল। তবে ফ্ল্যাশ ছাড়া ছবি তুলতে হয়। এই মিউজিয়ামে সেলফোনে ফ্ল্যাশ ছাড়া ছবি তোলায় কোনো বাধা নেই। কিন্তু তখনও পর্যন্ত আমার সেলফোন হলো ব্ল্যাকবেরি। প্রথমে আমার অফিসের নীতি অনুযায়ী এবং পরের কয়েক বছর স্থিতি-জড়তা জাতীয় নানা কারণে ব্ল্যাকবেরি ব্যবহার করেছি। জিনিসটা এমনিতে ভালো কিন্তু এর ক্যামেরা খুবই দুর্বল। আর ফ্ল্যাশ ছাড়া ঘরের ভিতরকার ছবি এমন অন্ধকার হয় যে যাঁদের ছবিই তুলি তাঁরা ছবি দেখে ক্রুদ্ধ হন। মিউজিয়ামের ছবি যেহেতু রাগ করতে পারে না আমি সেই ব্ল্যাকবেরিতেই কিছু কিছু ছবি তুলেছি। ছবি ভালো হয়নি। পরে দেশে ফিরেই বদলে ফেলেছি আমার সেলফোন। কিন্তু এই লেখার সঙ্গে ওরকম কিছু ঝাপসা ছবি দেওয়া ছাড়া আমার উপায় নেই।

এই মিউজিয়ামে ও’কীফের কয়েকটি বিখ্যাত ও বড় ছবি আছে। সেগুলো আঁকার সময়কাল এবং পটভূমি বুঝতে অসুবিধে হয় না। কারণ এর মাত্র এক সপ্তাহ আগে আমি নিউ মেক্সিকোর সান্টাফে শহরে ও’কীফ মিউজিয়াম দেখে এসেছি। সত্যি বলতে কিছুদিন আগেও জর্জিয়া ও’কীফ সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল খুবই সীমিত। বড় করে আঁকা নানা ধরনের ফুলের ছবি আর পরবর্তী জীবনে আঁকা এবস্ট্রাক্ট ধরনের চিত্রকলা। এরকম সব ছবির জন্য খ্যাত এই শিল্পীকে কেন আমেরিকার আধুনিক চিত্রকলার পথিকৃত বলা হয় সেটা অস্পষ্ট ছিল। তেমন বিস্তারিত কিছু জানা ছিল না তাঁর কাজের পরিধি বিষয়ে। কেন তাঁর ‘জিমসন উইড’ নামের ছবিটি ২০১৪ সালে ৪৪ মিলিয়ন ডলার বা সাড়ে তিনশ কোটি টাকায় বিক্রি হলো? কেন এই মহিলাকে আমেরিকার আধুনিক চিত্রকলায় এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয় আর কেন তাঁর আর পিকাসোর শিল্পকর্ম পাশাপাশি রেখে বিশেষ প্রদর্শনী আয়োজন করে আমেরিকার বিখ্যাত কোনো কোনো মিউজিয়াম?

জর্জিয়া ও’কীফ (১৮৮৭-১৯৮৬) আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী শিল্পীদের অন্যতম। ফুল, নিউ ইয়র্কের নগরদৃশ্য আর নিউ মেক্সিকোর প্রকৃতির ছবি তিনি এঁকেছেন। আবার তিনিই শুরু করেছেন বিমূর্ততার সম্পূর্ণ নতুন ধরনের প্রয়োগ। নাটকীয়ভাবে আধুনিক কম্পোজিশন ব্যবহার আর প্রকৃতির সৌন্দর্যকে নিজের ছবিতে তুলে আনার জন্য তাঁর ছিল বিশেষ ধরনের সৌন্দর্যবোধ। এইসব গুণাবলীর অনন্য সমন্বয়ের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ও সমাদৃত। বস্টন মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস-এ তাঁর অনেকগুলো বিখ্যাত ছবি স্থান পেয়েছে। ডিয়ার স্কাল ছবিটি তার অন্যতম। এছাড়া বিভিন্ন প্রাণীর মাথার খুলি আর ফুলের সমন্বয়ে কয়েকটি অদ্ভুত কম্পোজিশন আছে তাঁর।

ও’কীফের জীবনের প্রথম চিত্রকলার প্রদর্শনীটি হয় ১৯১৬ সালে নিউ ইয়র্কের আলফ্রেড স্টিগলিত্স-এর আভা-গার্দ গ্যালারিতে। স্টিগলিত্স-এর সহায়তায় তিনি ১৯১৮ সালে নিউ ইয়র্কে এসে বাস করতে শুরু করেন। এ সময়, বিশেষ করে পুরো বিশের দশক জুড়ে তিনি নিউ ইয়র্কের স্কাই স্ক্র্যপার বা উঁচু ভবন আর বিশ্ব-প্রকৃতির বিমূর্ত রূপ নিজের ছবিতে তুলে ধরেন। এই বিমূর্তায়নের রীতি ও ভঙ্গিটি তাঁর নিজস্ব।

বড় আকারের অসংখ্য ক্যানভাসে বিভিন্ন ধরনের ফুলের ছবি এঁকে তিনি বিখ্যাত হয়েছেন। কিন্তু তিনি তাঁর স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছেন। তাঁর সময়ের অন্যান্য আমেরিকান শিল্পীর সঙ্গে মিলিতভাবে চেষ্টা করেছেন চিত্রকলায় আমেরিকান বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টায় দায়বদ্ধ থাকতে। ইউরোপের আধুনিক চিত্রকলার বিভিন্ন উপাদান ও উদাহরণ থেকে সম্পূর্ণ পৃথকভাবে চেনা যায় এরকম একটা আমেরিকান আধুনিকতাবাদ নির্মাণ করতে চেয়েছেন তিনি। পুরনো রীতি-পদ্ধতি আর প্রচলিত ঐতিহ্যকে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করে নিরীক্ষাধর্মী শৈলী আর নতুন ধরনের শিল্পসামগ্রী ব্যবহারের মাধ্যমে আগের তুলনায় আরো প্রত্যক্ষ নন্দন-তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছিলেন ওই সময়ের  আধুনিক শিল্পীরা। ও’কীফের জন্য এই কাজের অর্থ হলো, চিত্রকলার শিক্ষায় যে জ্ঞান তিনি আয়ত্ব করেছিলেন প্রথমেই তা বিসর্জন দেওয়া। তার বদলে নিজের দৃষ্টি-অভিজ্ঞতাকে সরাসরি পরিশুদ্ধ করে করে নিজস্ব রঙ এবং আঙ্গিক দিয়ে তাকে প্রকাশ করা। এমনভাবে তা প্রকাশ করা যেন সেটা নিছক দৃষ্টি-নন্দন না হয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি ভাব প্রকাশ করে |

১৯২৯ সাল থেকে পরের দুই দশক ধরে প্রতি বছরের একটা উল্লেখযোগ্য সময় ও’কীফ নিউ মেক্সিকো রাজ্যে ছবি এঁকে কাটিয়েছেন। এরপর ১৯৪৯ সালে তিনি সেখানে স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করেন। সেখানেই তিনি আয়ত্ব করেন একটা নতুন দক্ষতা এবং বিমূর্ত কম্পোজিশনের শিল্প-কৌশল| এই কৌশলে তিনি প্রকৃতিকে ভেঙে-চুরে কিছু সুচিহ্নিত আকৃতি ও রঙ দিয়ে তাকে পুনরায় সৃজন করেন। এমনভাবে সেখানকার প্রকৃতিকে বিমূর্ত আকারে পুনর্সৃজন করেন যে তাঁর সেই কালপর্বের ছবি দীর্ঘদিন ধরে খাঁটি আমেরিকান পরিচয়-চিহ্ন হিসেবে গন্য হতে থাকে।

জর্জিয়া ও’কীফ নিজের মতো করে তাঁর জীবন তৈরি করেছেন। প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করেছেন আঙ্গিক বদলানোর এবং বিমূর্তরীতির ছবির উপকরণ। অন্য শিল্পীরা যে-সীমাকে অলংঘ্য মনে করতেন সেই সীমারেখা ভেঙে অথবা অতিক্রম করে তিনি অবলীলায় এগিয়েছেন। স্বাধীনভাবে তিনি এমন এক জীবন তৈরি করেছেন যা অন্য কারো মতো নয়। সম্পূর্ণ নিজের মতো এবং বিশিষ্ট |

বস্টন আসার আগে সান্টাফের মিউজিয়ামে কিছুটা সময় কাটানোর ফলে আমার কাছে স্পষ্ট হয়  ও’কীফের জীবন, কাজের পদ্ধতি, আর আমেরিকান আধুনিকতাবাদে শিল্পীর অবস্থান ও অবদান। তাঁর উত্থান-পর্বের পূর্ণাঙ্গ কাহিনীটি কৌতুহল জাগানোর মতো। যৌবনে ছবি আঁকার পাশাপাশি আলোকচিত্রের মডেল হিসেবে তাঁর কাজ তাঁকে দ্রুত খ্যাতি এনে দেয়। কিছু কিছু খোলামেলা এবং আবেদনময় ছবির কারণে মডেল হিসেবে তাঁর খ্যাতি বাড়ে একটি বিশেষ দিকে। সেই বিশেষ ইমেজ বা পরিচিতির বন্ধনে জড়িয়ে যান তিনি। এ সময়ে তাঁর প্রথম পর্যায়ের আঁকা ফুলের ক্লোজ-আপ ছবির মধ্যে যৌনতার স্পষ্ট চিহ্ন আছে বলে ব্যাপক আলোচনা হয়। সেই অভিযোগ তিনি যতই অস্বীকার করুন, শিল্প-সমালোচক আর সাধারণ শিল্প-দর্শকের কাছে ও’কীফ সেই যৌনতার প্রতীক হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে পড়েন।

পরবর্তীকালে তাই নিজেকেই আবার শুরু করতে হয় সেই খণ্ডিত পরিচিতি থেকে বেরিয়ে এসে নিজের শিল্পীসত্তার পরিপূর্ণ বিকাশের দীর্ঘ সংগ্রাম। এই পথ চলায় তিনি সফল হয়েছেন। শিল্পের মধ্যে নিমগ্ন থেকে একজন শিল্পীর স্বাধীন বিকাশের জন্যই ছিল তাঁর সংগ্রাম। সেই সংগ্রামটিও তাঁর আমেরিকান ব্যক্তিত্বের নির্ভুল পরিচয় বহন করে।

চার

যতই আমেরিকান আধুনিক শিল্পীদের ছবি দেখি, আমার এখনো বেশি আগ্রহ ইউরোপীয় চিত্রকলায়। বস্টন এমএফএ-তে আমার জন্য সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সেটাই। এদের ওয়েবসাইটে নিজেদের সংগ্রহ সম্পর্কে যে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া হয় তাতে ইউরোপীয় চিত্রকলার সংগ্রহ নিয়ে বেশ গর্ব আছে। সেই পরিচিতির আবার একটা ছোট্ট অংশ হলো ঊনবিংশ শতাব্দীর ফরাসি চিত্রকলা নিয়ে। সেখানে বলা হয়েছে ক্লদ মোনের (১৮৪০-১৯২৬) সাইত্রিশটি ছবি নিয়ে মিউজিয়ামের এই বিভাগটি অনায়াসে দাবি করতে পারে যে ফ্রান্সের বাইরে শিল্পীর বৃহত্তম সংগ্রহের একটি আছে এখানেই।

মোনের চিত্রকর্মের এই বিশাল সংগ্রহটি একদিনে গড়ে ওঠেনি। বস্টন এমএফএ মোনের প্রথম ছবিটি সংগ্রহ করে ১৯০৬ সালে। ১৯১১ সালে তারাই প্রথম আমেরিকাতে ক্লদ মোনের পূর্নাঙ্গ মনোগ্রাফিক প্রদর্শনীর আয়োজন করে। পরবর্তী একশ বছর ধরে বহু চেষ্টায় তিলে তিলে এই সংগ্রহ বড় করে তোলা হয়েছে। এখানকার ৩৭টি ছবিতে ছোট পরিসরে হলেও পাওয়া যায় মোনের জীবন ও কর্মের পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন। বিভাগীয় প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে তাঁর প্রধান কয়েকটি বৈশিষ্ট্যকে সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে খোলা জায়গাতে আঁকা প্রকৃতি-দৃশ্য যেমন আছে, তেমনি আছে শিল্পীর ওপর জাপানি শিল্পশৈলী ও রীতিপদ্ধতির প্রভাব বোঝার জন্য কিছু নির্বাচিত ছবি। আর আছে তাঁর অবিস্মরণীয় সব সিরিজ ছবির কিছু কিছু উদাহরণ। খড়ের স্তূপ, জলপদ্ম, ইত্যাদির বহুল পরিচিত ছবি।

ক্লদ মোনের পাশাপাশি এখানে ইমপ্রেশনিজমের উত্থান ও পালাবদলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অন্য সব শিল্পীর ছবি স্থান পেয়েছে। আছে এদুয়ার মানে, পিয়ের-অগুস্ত রেনোয়া, পল সেজান, পল গগ্যা ও ভ্যান গগের ছবি। আছে এডগার দেগার ছোট্ট একটি ভাস্কর্য। তাঁর অতি বিখ্যাত নাচের মেয়েদের ছবি ও ভাস্কর্য, মেয়েটির পা-বাড়ানোর ভঙ্গি আর মুখের আদলটি দূর থেকে দেখেই চেনা যায়। পল গগ্যার কয়েকটি বড় মাপের বিখ্যাত ছবি আছে। আছে পল সেজানের আঁকা অসাধারণ কয়েকটি স্থিরজীবন। যে আপেলের ছবি এঁকে তিনি সারা পৃথিবীকে চমকে দিতে চেয়েছিলেন সেই আপেল এখানেও দেখতে পাই। মুগ্ধ হয়ে দেখি ছোট আকারের বিস্ময়-জাগানো ছবিগুলো। স্থিরজীবন বা স্টিল লাইফকে চিত্রকলার খুবই প্রাথমিক স্তরের একটা ধরন বলে মনে করা হয়। সেই ধরনের ছবিতে যেভাবে এই শিল্পী আলো ও আয়তা বা স্পেইসকে বিশ্বস্ততার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন তা বিস্ময়কর লাগে। সেজান নিজে এক জায়গায় বলেছিলেন, প্রকৃতি থেকে ছবি আঁকা মানে ওই বিষয়বস্তুটির হুবহু অনুকৃতি বা কপি করা নয়। এটা আসলে একজনের অনুভূতিকে ছবিতে ধারণ করা।

এরকম প্রত্যেকটি ছবি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করা যায়। কিন্তু সেই লেখায় আমার মুগ্ধতার অনুভূতি সঞ্চারিত করতে পারি না। অথচ পল সেজান চিত্রকলায় তাঁর অনুভূতিকেই সঞ্চারিত করেছেন কত সহজ আর সাবলীলভাবে।

এখানে সংগ্রহ ও প্রদর্শন করা মোনের ছবিগুলো খুবই প্রতিনিধিত্বশীল। জাপানি প্রভাবের শুরুর দিকটা যে-সব ছবি থেকে বোঝা যায় তার একটি হলো কামিল মোনের কিমোনো পড়া পোর্ট্রেট। ছবিটির সূক্ষ্ণ ও বিস্তারিত কারুকাজ খুবই অসাধারণ। কিন্তু রং, রেখা ও মুখাবয়বের এত স্পষ্ট ছবি মোনে পরবর্তীকালে কমই এঁকেছেন।  তাঁর প্রতিটি প্রধান বিষয় অথবা সিরিজ ছবির অতি উত্কৃষ্ট উদাহরণ এখানে পাওয়া যাবে। লিলিপন্ড আর ওয়াটারলিলি সিরিজের ছবিগুলো আকারে মার্মতা বা মোমাতে দেখা ছবিগুলোর তুলনায় ছোট তবে আলো-ছায়ার দিক থেকে একটু আলাদা ধরনের। লিলিপন্ডের ওপর জাপানি সাঁকোর ছবিটি বর্ণময় এবং উজ্জ্বল।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এই শিল্পীরা চিত্রকলার ক্ষেত্রে একটা পালাবদল ঘটিয়েছিলেন। তাঁদের সময়কালে সারা পৃথিবীর মানুষ সমাজজীবনে কতগুলো পরিবর্তন দেখেছে। দেখেছে নগরসমূহের মধ্যে শিল্পায়নের অনুপ্রবেশ, প্রভাব ও বিকাশ। সে-যুগের মানুষ কৃষির প্রাধান্য ও সামন্তযুগের অবসান প্রত্যক্ষ করেছে। মধ্যবিত্ত অথবা শ্রমজীবি যে-কোনো শ্রেণীর ভিতর থেকে নাগরিক জীবনের আনন্দ-উদ্বেলতায় যারা অংশ নিয়েছে তারা সকলেই ওই উনবিংশ শতাব্দিতে অবলোকন করেছে আধুনিক জগত ও জীবনের জন্ম। সফল উত্থান ও সংগ্রাম-চিহ্নিত ওই যুগের মধ্য দিয়ে যারা অগ্রসর হয়েছে তারা সবাই নিজেদেরকে আর একবার ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের আঁকা দৃশ্যপট ও প্রকৃতির ভিতরে প্রতিফলিত দেখতে পেয়ে আনন্দিত হয়েছে। তখনও তাদের মনে এমন কোনো প্রশ্ন উঁকি দেয়নি যে এই সব ছবি কোনো নতুন চিত্র-বিপ্লবের প্রতিনিধিত্ব করে কি-না। প্রকৃতপক্ষে তা নিশ্চিতভাবেই ছিল চিত্রকলার ক্ষেত্রে একটা নতুন বিপ্লবের সূচনা |

এমনও বলা হয় যে জনপ্রিয় ধারণা বা বিভ্রান্তি সত্ত্বেও প্রকৃতপক্ষে ইমপ্রেশনিজম ততটা নয় নতুন শিল্পরীতি, আলো-ছায়ার বিষয়ে একটি নতুন পন্থা অথবা সেজানের ভাষায় ফর্মের জ্যামিতিক ভাংচুর-বিষয়ে গভীর চিন্তা-প্রসূত ফলাফল, যতটা ছিল বিষয়ের নির্বাচন, একটি চেনা পৃথিবীর পুনর্নির্মাণ, এবং একটি যুগসত্যকে কোনো বিশেষ জোর বা প্রবণতার প্রভাব ছাড়াই ধারণ ও চিত্রায়ন করা। অথবা শুধু ইতিহাস ও একটি পৃথিবীকে সরলতম অনুপুন্খের মাধ্যমে অবলোকন ও ধারণ করা। আলোছায়ার গতিবিভঙ্গে তুলির ছোট ছোট টান দিয়ে ধারণ করা অপস্রিয়মান সময়ের ছবি।

যে-কোনো মিউজিয়ামে এ ধরনের ছবির সংগ্রহ পূর্ণ করে তোলা এবং তা সাজানোর সময় একটা জিনিসকে অনেক গুরুত্ব দিতে হয়। সেটা হলো, সেই সংগ্রহ দেখে ওই শিল্প-আন্দোলন ও বিপ্লব সম্পর্কে একটা পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যায় কি-না। চিত্রকলার কোনো নির্দিষ্ট কালপরিধির বৈশিষ্ট্য এবং যুগ পরিবর্তনের কোণ-মোড়-বাঁকগুলো ঠিকভাবে চেনা যায় কি-না। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রকলার সেই যুগান্তর অথবা পালাবদলের বিশেষ দিক এবং চিহ্নগুলো বস্টন এমএফএ-র সংগ্রহ দেখে ঠিকভাবে সনাক্ত করা যায়।

কভারের ছবিতে শিল্পী : লিলি পন্ড ছবির সামনে দাঁড়ানো

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close