Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ বানানা ইয়োশিমতো > রান্নাঘর >> উপন্যাস >>> অনুবাদ রাবেয়া রব্বানী

বানানা ইয়োশিমতো > রান্নাঘর >> উপন্যাস >>> অনুবাদ রাবেয়া রব্বানী

প্রকাশঃ June 24, 2017

বানানা ইয়োশিমতো > রান্নাঘর >> উপন্যাস >>> অনুবাদ রাবেয়া রব্বানী
0
0

প্রথম পর্ব > রান্নাঘর

এই পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হচ্ছে রান্নাঘর। রান্নাঘর হলেই হল।  সেটা কোথায় বা দেখতে কেমন তা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই। যদিও কোন মতে রান্না করতে পারলেই আমার চলে যায় তবে গোছগাছ ও ব্যবস্থাপত্র কিছুটা সুবিধাজনক হলে মন্দ হয় না। সেটাও তেমন বেশি কিছু না, শুকনো-দাগহীন বেশ কয়েকটি বাসন মোছার কাপড় থাকবে আর ঝকঝকে সাদা টালিতে থাকবে আলোর প্রতিফলন।

কিন্তু মন খারাপের সময়ে একেবারে অবিশ্বাস্য-রকম নোংরা রান্নাঘর ভালবাসি আমি। যেখানে মেঝে ভর্তি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শাকসবজির পাশেই হয়ত পড়ে থাকতে দেখা যাবে মাঝখান কালো হয়ে যাওয়া চপ্পল। সেক্ষেত্রে রান্নাঘরটা বড় হলে ভালো হয়। চাইলেই উঁচু তাকের উপর রুপালী ধাতব দেয়ালে হেলান দিয়ে শুয়ে থাকতে পারব। আর থাকবে পুরো শীতকালের জন্য খাদ্য মজুত রাখা একটি বিশাল রেফ্রিজারেটর। আমি যখন তেল চিটচিটে গ্যাস স্টোভ এবং জং ধরা ছুড়ি থেকে চোখ সরিয়ে জানালার বাইরে তাকাব, সেখানে কিছু নিঃসঙ্গ তারা ফুটে থাকতে দেখা যাবে।

আর তখন কেবল রান্নাঘরটাই আমার একমাত্র সঙ্গ হয়ে উঠবে। একা থাকার চেয়ে কিছুটা হলেও ভালো নয় কি সেটা?

যখন মৃত্যু চিন্তায় জর্জরিত হয়ে যাই, প্রায়ই ভাবি, আমি যেন আমার শেষ নিঃশ্বাসটা রান্নাঘরেই ত্যাগ করতে পারি। মৃত্যুটা নিঃসঙ্গ শীতলতায় কিংবা একান্ত কারও উষ্ণতায় যেভাবেই হোক না কেন আমার ধারণা আমি তখন তার দিকে নির্ভয়ে তাকিয়ে থাকতে পারব। যদি জায়গাটা রান্নাঘর হয় আমার মনে হবে এর চেয়ে শান্তির মৃত্যু আর কি হতে পারে।

তানাবে পরিবার আমাকে গ্রহণ করবার আগে আমি প্রতি রাতে রান্নাঘরেই তো শুয়েছি। দাদী মারা যাবার পর তো প্রথম প্রথম ঘুমুতে পারিনি। এক ভোরে আমি আমার শোবার ঘর থেকে ছিটকে বেড়িয়ে পড়ি, কিছুতেই শান্তি পাই নি। শেষমেশ ঘুমানোর মতো কেবল একটি জায়গাই পাই,  জায়গাটা রেফ্রিজারেটরের পাশে।

আমার নাম মিকাগে শাকুরাই। ছোট বেলাতেই আমি আমার বাবা-মা দুজনকে হারিয়ে ফেলি। এরপর আমার দাদা আমাকে বড় করে তোলেন। আমি যখন জুনিয়র হাইস্কুলে পড়ি তখন তিনিও মারা যান। আর তারপর থেকে ছিলাম কেবল আমি আর আমার দাদী।

যখন আমার দাদীও মারা যায়, আমি হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি। এক এক করে আমার পরিবারের সবাই সংখ্যায় কমে কেবল আমি পর্যন্ত থেমে যাই। একেবারে একা হয়ে পড়ি। সেসময় আমার চোখের সামনে সবকিছু মিথ্যা মায়া মনে হয়। যে এপার্টমেন্টে আমি বেড়ে উঠেছি সেখানে সময় আগের মতোই বয়ে চললেও আমার কাছে তখন জীবনটা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মতো স্থির, সর্বত্র মহাশূন্যের কালো শূন্যতা।

দাদীর শেষকৃত্যর তিন দিন পরও আমার কাছে সবকিছু ধাঁধার মতো লাগতে।কষ্টে পাথর হয়ে যাই, কাঁদতে পারি না। শীতল তন্দ্রায় এপাশ ওপাশ করে উজ্জ্বল রান্নাঘরের ভয়াবহ নিস্তব্ধতায় আমি আমার তপ্তপোষ টেনে নেই।লিনাসের মতো কম্বল মুড়ি দিয়ে আমি ঘুমাই তখন। ফ্রিজের গুঞ্জনটা কেবল সঙ্গ দেয়, একাকীত্ব কমায়।সেই লম্বা রাতগুলোতে ফ্রিজের সেই গুঞ্জনেই শান্তি নেমে আসে, তারপর আসে সকাল।

কিন্তু আমি বরাবর তারা ভরা রাতের আকাশের নিচে শুতে চেয়েছি।

সকালের আলোতে জাগতে চেয়েছি।

কিন্তু তা সম্ভব হয় নি। উদাসীনতায় ডুবে যাওয়া ছাড়া কিছুই সম্ভব হয় না তখন।

যাই হোক! ওভাবে আর কতদিনই বা থাকতে পারতাম। কী বিচিত্র আমাদের বাস্তবতা!

আমার দাদী যে অর্থ কড়ি রেখে গেছেন তা আমার কাছে যথেষ্টই মনে হয়। কিন্তু এপার্টমেন্টটা অবশ্যই একজন মানুষের জন্য অনেক বড় ও ব্যয়বহুল। অন্য একটা এপার্টমেন্ট খোঁজা ছাড়া আর কোন গতি ছিল না তখন। বেশ কয়েকটি বিকল্প নিয়ে ভাবি কিন্তু সুবিধার দিক দিয়ে যখন জায়গাগুলো একইরকম অবস্থান জানান দেয় তখন খেই হারিয়ে ফেলি। এছাড়া ভয়ও পাই এই ভেবে যে, বাড়ি বদলাতে অনেক সময় ও শ্রম ব্যয় হয় সাথে ঝক্কিও কম যায়না।

সেরকম একটা ঝামেলার জন্য আমার কোন শক্তি ছিল না। রাত দিন রান্নাঘরে শুয়ে থেকে থেকে আমার হাত-পায়ের জোড়ায় জোড়ায় ব্যথা হয়ে যায়। যেখানে নিজেকে টেনে তুলে জায়গায় জায়গায় ধন্না দেয়া,  জিনিস পত্র সরানো,  একটা ল্যান ফোণের লাইন নেয়া এসব করা উচিত সেখানে এসব না করে আমি বরং হতাশায় শুয়ে বসে ঘুমিয়ে কাটাই। ঠিক তখন একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটে। ঈশ্বর যেন এক সন্ধ্যায় একজনকে পাঠায় আমাকে ডেকে নিতে। হ্যা, আমার সব মনে আছে।

ডিঙ, ডং।

হঠাৎ দরজার কলিংবেল বেজে ওঠে।

বসন্তের মেঘাচ্ছন্ন সন্ধ্যাবেলা। আমি পুরনো ম্যাগাজিনের এপার্টমেন্টের বিজ্ঞাপন তালিকায় অমনোযোগী চোখ বুলাচ্ছি। বাসা বদলানোর চিন্তায় শিউরে উঠছি বলে হয়ত আমি তখন ঘোরের মধ্যে আছি আর তাই দরজায় ঘণ্টির শব্দ শুনতেই সদ্য ঘুম ভাঙ্গা মানুষের মতো দৌড়ে গিয়ে দরজার ছিটকিনিটা খুলে দেই। ভাগ্য ভালো ডাকাত ছিল না,  সে ছিল ইউচি তানাবে।

ইউচি বয়সে আমার চেয়ে এক বছরের বড় এবং নিঃসন্দেহে চমৎকার একজন যুবক। দাদীর শেষকৃত্যর দিন সে আমাকে অনেক সাহায্য করে। যতদূর মনে পড়ে,  সে বলেছিল আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি সেও সেখানেই পড়ে। তবে আমি তখন পড়াশোনায় বিরতি নিয়েছি।

আমি তাকে বলি,

“সেদিনের জন্য অনেক ধন্যবাদ” ।

সে উত্তর দেয়,

“না ঠিক আছে। তুমি কি অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করেছ এখনো?”

“না এখনো তেমন ভাবে কিছুই করি নি।”

“আচ্ছা তাই।”

“ভেতরে এসে একটু চা খেয়ে যাও?”

সে দাঁত বের করে হেসে বলে,

“না আমি আসলে অন্য একটা কাজের জন্য যাচ্ছি তাই এখন তাড়া আছে। আমি এখানে তোমাকে একটি কথা বলতে এসেছি। আমি আর আমার মা চাচ্ছিলাম তুমি কিছুক্ষণের জন্য আমাদের বাসায় আসো।”

“হুম।”

“যদি অন্য কোন কাজ না থাকে আজ সন্ধ্যা সাতটার দিকে চলে আসছ না কেন? এখানে ঠিকানা লিখা আছে।”

কাগজের স্লিপটা নিয়ে আমি শুকনো গলায় বলি, “আচ্ছা”।

“ঠিক আছে তাহলে আমি ও আমার মা তোমার জন্য অপেক্ষা করব।”

তার হাসি এত উজ্জ্বল ছিল যে মনে হয়,  সে তার চোখের তারা দিয়ে ছবি তোলার জন্য আমাকে বড় করে দেখছে। আমি চোখ ফেরাতে পারিনি। যেন কোন শুভ আত্মা আমার নাম ধরে ডাকছে।

আমি বলি, “ঠিক আছে।আমি যাব।”

আমার নিজের কণ্ঠস্বরটা নিজের কাছেই বেহায়া মেয়ের মতো প্রগলভ শোনায়। তবে তার ব্যবহার এমন চমৎকার ছিল যে তাকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। এমনিতে আমার চোখের সামনে তখন কুহকের মতো কালো হতাশার ছায়া ভেসে বেড়াতো। সেই কালো ছায়ার মধ্যে দিয়েও আমি আমার দিকে থেকে তার দিক পর্যন্ত একটি সোজা রাস্তা দেখতে পাই। যে রাস্তা সাদা আলোয় উদ্ভাসিত। হ্যা ঠিক এমন একটা আমেজই সে তৈরি করে সেদিন।

সে “ঠিক আছে পরে দেখা হবে” বলে হেসে চলে যায়।

আমার দাদীর শেষকৃত্যর আগে আমি তাকে তেমনিভাবে চিনতাম না। কিন্তু যেদিন ইউচি তানাবেকে ভালোভাবে কাছ থেকে দেখি,  অবাক হয়ে ভাবি, সে কি আমার দাদীর প্রেমিক ছিল নাকি! ধুপ জ্বালানোর সময় তার হাত কাঁপে।কান্নাকাটির ফলে চোখেও ছিল ফোলা। বেদিতে দাদীর ছবিটা দেখতে পেয়ে সে তার কান্না থামাতে পারে নি,  বৃষ্টির মতো অঝোর ধারার ঝরে সেই কান্না। আমি যখন প্রথম তাকে দেখি আমি ভাবি, এই ছেলেটা যেই হোক না কেন আমার নিজের দাদীর জন্য তারও কম দুঃখ নয়। তাকে আমার মতোই দুঃখী দেখায়।

তখন মুখ রূমালে মুছে সে বলে,

“আচ্ছা আমাকে কিছু সাহায্য করতে দাও”।

তারপর সে আমাকে অনেক সাহায্য করে।

“ইউচি তানাবে”- এখন আমি ঠিকঠাক মনে করতে পারিনা তাকে নিয়ে আমার দাদী কত কি বলতেন। তবে জেনেছি দাদীর প্রিয় ফুলের দোকানে সে কাজ করে। অনেকবার দাদীর মুখে হয়ত শুনেছি, “কি চমৎকার একটা কর্মী আছে দোকানটায়…” “তানাবে পরিবারের ছেলেটা…” “আজ, আবার…”। দাদী কাটা ফুল পছন্দ করতেন। কারণ একটা সময় আমাদের রান্নাঘরের কোন কিছুই তাজা ভাব হারাত না। প্রতি সপ্তাহে তিনি কয়েকবার দোকানটায় যেতেন ফুলের জন্য। সেটা ভাবার চেষ্টা করতে আমার একটা দৃশ্য ঝাপসা ঝাপসা মনে পড়ে আর তা হল,  ইউচি বিশাল একটা গাছের টব নিয়ে আমার দাদীর পিছু পিছু হাঁটছে।

বড়সড় শরীরের সুদর্শন পুরুষ ইউচি। তার ব্যাপারে খুব বেশি না জানলেও আমি হয়ত তাকে ফুলের দোকানে খুব পরিশ্রম করতে দেখেছি। তার চোখে মুখে উদাসীনতার ছাপ স্পষ্ট দেখতে পেয়েছি। তার ব্যাবহার আর অভিব্যক্তি যত চমৎকারই হোক না কেন তাকে দেখেই মনে হয়েছে, সে একজন নিঃসঙ্গ মানুষ। তবে এটা সত্যি আমাদের তেমন জানাশোনা ছিল না।

সেই ঘোলাটে বসন্তের রাতে বৃষ্টি হয়। আমি যখন ঠিকানাটা হাতে নিয়ে হেঁটে যাই তখন শুভ্র উষ্ণ বৃষ্টিতে মোড়ানো ছিল মহল্লাটা। আমার এপার্টমেন্ট ও তানাবেদের এপার্টমেন্টের মাঝখানে ছিল চুয়াও পার্ক। সেটা পার করার সময় রাতের ভেজা সবুজের গন্ধে আমি আপ্লুত হই। ঝকঝকে ভেজা রাস্তায়  হেঁটে যাই যা রংধনুর রঙে ঝলমল করছিল।

সত্য বলতে আমি সেখানে যাই তারা আমাকে ডেকেছে বলে। এর পিছনে তাদের কি ইচ্ছা না উদ্দেশ্য ছিল তা আমার জানা ছিল না। আমি তাদের বহুতল এপার্টমেন্ট ভবনের দিকে তাকিয়ে থাকি। তাদের এপার্টমেন্টটা ছিল দশ তলায়। রাতের পটভূমিতে তা বেশ সুন্দর দেখায়।

লিফট থেকে নেমে হলে হেঁটে যাওয়ার সময় নিজের পায়ের শব্দই নিজে সচকিত হই। আমি দরজার বেল বাজানোর পর ইউচি আকস্মিকভাবে তা খুলে দেয়।

“ভেতরে আসো।”

“ধন্যবাদ।”

আমি ভিতরে প্রবেশ করি। ঘরটি আসলেই বেশ অদ্ভুত ছিল।

আমি আমার স্বভাবসুলভ প্রথমেই রান্নাঘরের খোঁজ করি কিন্তু আমার দৃষ্টি ঘুরতে ঘুরতে বসার ঘরের অদ্ভুত আকৃতির সোফায় ধরাস করে নিপতিত হয়। বিশাল রান্নাঘরের তাক-পাত্র এবং হাড়ি-পাতিলের পটভূমিতে একটি টেবিল হীন,  মাদুর হীণ, ধূসর পশমি কাপড়ে ঢাকা সোফা। একেবারে গতানুগতিক নকশার বাইরে। একটি পুরো পরিবার একসাথে বসে টেলিভিশন দেখতে পারবে এতটা বড় সেটা। সেটা আসলেই একটা চমৎকার সোফা।

বিশাল জানালার বাইরে ছোট ছাদ বারান্দায় গামলা,  টব এবং সকল ধরনের পাত্রে গাছ পালার ঝোপ। চারপাশে তাকিয়ে দেখি পুরো বাড়িটা ফুলে সাজানো, সব জায়গায় ফুলদানীতে বসন্তের ফুল শোভা পাচ্ছে।

“আমার মা বলেছে সে তাড়াতাড়িই ফিরে আসবে তুমি চাইলে চারপাশ ঘুরে দেখতে পারো। আমি কি তোমাকে ঘুরে দেখাবো? কিংবা এক কাজ কর যেকোনো একটা ঘর বেছে নাও তাতে আমি বুঝতে পারবো তুমি কোন ধরণের মানুষ।”

চা বানাতে বানাতে ইউচি কথাগুলো বলে। আমি আরামদায়ক নরম সোফায় গিয়ে বসে জিজ্ঞেস করি,

“কি রকম?”

সে খুব সহজভাবে হেসে বলে, “মানে কোন বাসার মানুষের রুচি সম্পর্কে তুমি কি জানতে চাও তা বোঝা যাবে। অনেকেই বলে কোন বাসার মানুষ সম্পর্কে ভালো ধারনা পাওয়া যায় তার টয়লেট থেকে।”

আমি বলি, “আমি রান্নাঘর দেখতে চাই।”

“আচ্ছা তাই? এই যে এখানে রান্নাঘর। যেমন খুশি ঘুরে দেখো।”

সে যখন চা বানায় আমি বাসাটা ঘুরে দেখি। সবকিছুই খুঁটিয়ে দেখি। কাঠের মেঝে থেকে ইউচির চপ্পল পর্যন্ত। একটি আদর্শ রান্নাঘরে যা যা লাগে তার সবকিছু দিয়েই সাজানো গোছানো সেটা। একটি ভাজার জন্য কড়াই এবং একটি চমৎকার জার্মানি সবজির খোসা ছাড়ানোর যন্ত্রও দেখি সেখানে। সেটা এমন একটা যন্ত্র যা দিয়ে সবচেয়ে অলস দাদীমাও কোন কিছুর খোসা ছাড়াতে উৎসাহী হয়ে উঠবেন।

একটি ছোট উজ্জ্বল বাতিতে আলোকিত রান্নাঘরটিতে সকল ধরনের থালা-বাটি উলটো করে রাখা, পরিচ্ছন্ন জ্বলজ্বলে গ্লাসগুলো। খুব গোছগাছ না করে না রাখা হলেও প্রতিটি জিনিস যে খুব মান সম্মত তা স্পষ্ট বোঝা যায়। অনেক কিছু ছিল যেগুলো বিশেষ কাজে ব্যবহৃত হয়, যেমন চীনা মাটির বাটি, গ্রাটিনের বাটি, বিশাল আকৃতির পাত্র, দুটো বিয়ারের মগ। কেন যেন সব কিছু মিলে ভালো লাগা তৈরি হয়। ইউচির অনুমতি নিয়ে আমি রেফ্রিজারেটরও খুলি। সেখানেও সব কিছু প্রয়োজনমাফিক সাজানো। কোন বাসী বা বাড়তি কোন কিছুই নেই।

চারপাশ ঘুরে আমি অনুচ্চস্বরে মাথা নেড়ে সন্তুষ্টির সম্মতি দেই,

হুমমমমম, হুমমমম।

খুব ভালো রান্নাঘর সেটা। প্রথম দেখাতেই তার প্রেমে পড়ে যাই আমি।

আমি ফিরে গিয়ে সোফায় বসতে গরম চা নিয়ে আসে ইউচি।

সাধারণত আমি যখন কোন বাড়িতে গিয়ে অল্প পরিচিত মানুষের মুখোমুখি বসি, তখন কেমন অদ্ভুত একটা নিঃসঙ্গতা আমাকে ঘিরে ধরে। আমি তখন ছাদ বারান্দায় জানালার গ্লাসে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পাই। রাতের পরিদৃশ্যে কালো বিষণ্ণতা ছড়িয়ে আছে চারপাশে, এমন মনে হয়। এই পৃথিবীর কারও সাথেই আমার কোন রক্তের সম্পর্ক নেই। আমি কোথায় যাব, কি করব তাতে কারও কিছু যায় আসে না- এই ভাবনায় কেমন বিহ্বল লাগে।

হঠাৎ মনে হয় পৃথিবী অনেক বড়, মহাশূন্য অনেক কালো। অসীম একাকীত্বের কী অসীম মোহমায়া! প্রথম বারের মতো আমি যেন সেই একাকীত্বকে আমার হাত দিয়ে ছুঁই, চোখ দিয়ে দেখি। এক চোখ অন্ধ ব্যক্তির মতো আমি পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকি।

আমি ইউচিকে জিজ্ঞেস করি,

“তুমি আমাকে এখানে ডেকেছ কেন?”

আমার দিকে তাকিয়ে ইউচি নরম স্বরে বলে,

“আমাদের ধারণা তুমি ইদানীং খুব খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছ। তোমার দাদী আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ ছিলেন। এবং এই বাসার দিকে তাকিয়ে দেখো,  আমাদের কতগুলো ঘর আছে। তুমি বাসা বদলাচ্ছ তাই না?”

“হ্যা তা বদলাচ্ছি। বাড়িওয়ালা অবশ্য আমাকে একটু বাড়তি সময় দিয়েছেন।”

খুব স্বাভাবিক ভাবেই সে বলে,

“তাহলে আমাদের বাসায় চলে আসছ না কেন?”

সে একেবারে যথার্থ স্বরে কথাটা বলে। শীতল ভাবেও না অতিমাত্রায় আদ্র আবেগ দিয়েও না। তাই তাকে আমার আপন মনে হয়, কান্নার বাহানা খুঁজে পেয়ে আমার হৃদয় ককিয়ে ওঠে। ঠিক তখন দরজায় চাবি ঘুরিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে একজন সুন্দরী মহিলা প্রবেশ করে।

আমি আশ্চর্যরকম মুগ্ধ হয়ে যাই। যদিও তাকে যুবতি মনে হয় নি কিন্তু তিনি সত্যিকারের সুন্দরী। তার নাটকীয় সাজপোশাক আর জামা দেখে মনে হয় সেগুলো দিনের কাজের সাথে যায় না। আমি বুঝতে পারি তার কাজ রাতের বেলা।

ইউচি আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়, “এই হচ্ছে মিকাগে শাকুরাই।”

কিছুটা হাঁপিয়ে উঠেও সে হাসিমুখে ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠে আমাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কেমন আছো? আমি ইউচির মা। আমার নাম এরিকো।”

এটা তার মা! বোবা হয়ে যাই। আমি ভদ্রমহিলার মুখ থেকে চোখ ফেরাতে পারি নি। রেশমের মতো পেলব চুল কাঁধ পর্যন্ত ছড়িয়ে ,সরু চোখের গভীর জ্যোতি, আকা ঠোঁট আর টিকালো নাক সবকিছু তাকে যে উজ্জ্বল্য দিয়েছে তাতে তাকে প্রাণশক্তিতে ভরপুর লাগে। তাকে ঠিক মানুষের মতো লাগে নি। আমি তার মতো আর কাউকে কখনো দেখিনি।

আমি তার ধাতব প্রশ্নটা “তুমি কেমন আছ” এর দিকে মনোযোগ দিয়ে শেষে হেসে উত্তর দেই।

“তুমি এখানে আসায় আমরা খুব খুশী হয়েছি।”

এই কথাটা বলে সে ইউচির দিকে ঘুরে বলে, “আমি দুঃখিত ইউচি আজ সময় দিতে পারব না। টয়লেটে যাওয়ার নাম করে বেড়িয়েছি কেবল এই কথাটা বলতে। সকালে আমার অনেক সময় আছে। আশা করি মিকাগে রাতে থেকে যাবে।”

লাল জামার প্রান্ত উড়িয়ে সে দরজার কাছে চলে যায়,  তার তাড়া ছিল।

ইউচি বলে,

“দাঁড়াও।আমি তোমাকে পৌঁছে দিচ্ছি।”

আমি বলি,

“আপনাদের ঝামেলায় ফেললাম।”

“আরে না। কে জানতো ক্লাব আজ রাতে এত ব্যস্ত থাকবে। আমারই তোমাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। সকালে দেখা হবে কেমন?”

সে তার হাই হিলে শব্দ তুলে দৌড়ে বেড়িয়ে যায়। ইউচি আমাকে বলে, “এখানে অপেক্ষা কর। টিভি দেখো বা অন্য কিছু করো।”

তারপর আমাকে একা ফেলে সেও তার মায়ের পিছু বেড়িয়ে যায়।

আমি নিশ্চিত ছিলাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলে এরিকোর শরীরে বয়সের ছাপ পাওয়া যাবে। যেমন কাকের মতো পায়ের পাতা কিংবা দাঁতের সৌন্দর্য একবারে ঠিকঠাক হবে না। শরীরের কিছু অংশ একেবারে খাঁটি সাধারণ মানুষের মতো পাওয়া যাবে কিন্তু তারপরও সে দারুণ আকর্ষণীয়া। তাকে দেখে আবার তার সঙ্গ পাওয়ার লোভ জাগে। তার চলে যাওয়ার পরও একটি উষ্ণ আলো আমার হৃদয়ে জ্বল জ্বল করে। একেই হয়তো আমেজ বলা হয়। হেলেন কেলার যখন প্রথম পানি কি তা বুঝতে পেরেছিল তখন তার যেমন লেগেছিল। আমার কাছেও আমেজ শব্দটার মানে প্রতিভাত হয় তখন বেশ ভালোভাবেই। বাড়িয়ে বলছি না আসলেই সেই সাক্ষাৎটা আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

গাড়ির চাবি হাতে নিয়ে শব্দ করতে করতে ইউচি ফিরে আসে। জুতো খুলতে খুলতে বলে, “মা যদি দশ মিনিটের জন্যও বের হয়, ডাকাডাকি পড়ে যায়।”

সোফায় বসে আমি বলি, “হুম।না জানিয়ে বের হলে তো এমনই হবে।”

“আচ্ছা মিকাগে, আমার মাকে দেখে তোমার কি কিছুটা ভয় লেগেছে?”

আমি তাকে খোলাখুলি বলে দিই, “হ্যা। আমি তার মতো সুন্দরী আর দেখিনি।”

ইউচি আমার ঠিক পাশে বসে বলে, “হ্যা কিন্তু তার চেহারায় প্লাস্টিক সার্জারি করা।”

আমি অবাক হয়ে বলি, “তাইতো বলি তোমার চেহারার কোন কিছুর সাথে তার কোন মিল নেই কেন?”

“সেটাই শেষ নয়। আন্দাজ করো তো? জানো, সে একজন পুরুষ।”

সে মজা করে নি। সেটা একটু বেশি হয়ে যায় আমার জন্য। আমি তার প্রশস্ত চোখের নীরবতা দেখি।আমি আশা করি সে হয়ত পর মুহূর্তেই বলবে,  মজা করছি। সেই সুগঠিত আঙ্গুল! সেই ব্যক্তিত্ব! যেভাবে এরিকো নিজেকে প্রকাশ করছিল… আমি নিঃশ্বাস চেপে তার সুন্দর মুখটার কথা মনে করতে চাই। কিন্তু ইউচি যেন তাতে আরও মজা পায়।

আমি মুখ ঝুলিয়ে বলি, “ঠিক আছে কিন্তু তুমি সারাক্ষণ বলছিলে আমার মা এটা করেছে,  আমার মা ওটা করেছে”।

“হ্যাঁ তুমি কি দেখতে এমন কাউকে বাবা বলতে পারবে?” সে শান্তভাবে প্রশ্নটা করে।

যুক্তি ঠিক।আমার মনে হয় সে সঠিক উত্তর দিয়েছে।

“আর এরিকো নামের ব্যাখ্যা কি?”

“আসলে তার নাম ইউজি।”

মনে হচ্ছিল আমার চোখের সামনে সব কিছুই ধোঁয়াটে এবং তখন আমি পুরো গল্পটা শুনতে তৈরি হই।

“অনেক আগে এরিকো যখন পুরুষ ছিল তখন সে আমার মাকে বিয়ে করেছিল।”

“বল কি। আমি কল্পনা করতে পারছি না তখন সে দেখতে কেমন ছিল।”

“আমার মায়ের কথা মনে নেই। আমি যখন ছোট ছিলাম তখনই সে মারা গিয়েছিল। আমার কাছে তার একটা ছবি আছে দেখতে চাও?”

আমি জায়গা থেকে না নড়েই মাথা নেড়ে সম্মতি দেই, “হ্যাঁ।”

সে তার ব্যাগ মেঝেতে টেনে টেনে এনে এবং তার মানিব্যাগ থেকে একটা পুরনো ছবি বের করে আমাকে দেখায়।

ছবিতে ইউচির আসল মায়ের যে মুখ সেটা বিশেষত্বহীন। ছোট চুল, ছোট চোখ এবং ছোট নাক। দেখে মনে হয়েছে কম বয়সে বুড়িয়ে যাওয়া একজন মহিলা। আমি যখন কিছুই বলিলি তখন ইউচি বলে উঠে, “তাকে অদ্ভুত দেখায় তাই না?”

আমি অস্বস্তি নিয়ে হাসি।

“এরিকো যখন ছোট আমার মায়ের পরিবার তাকে দত্তক নিয়েছিল। কারণটা আমি জানি না। তারা একসাথে বেড়ে উঠেছিল। পুরুষ হিসাবেও তিনি দেখতে সুদর্শন ছিলেন এবং যতদূর বোঝা যায় বাহ্যিক ভাবে সে মেয়েমহলে বেশ জনপ্রিয় ছিল। সে কেন এমন অদ্ভুত দেখতে মহিলাকে বিয়ে করেছিল জানিনা।”

তারপর ছবির দিকে তাকিয়ে বলে,

“সে নিশ্চয়ই আমার মায়ের খুব কাছের ছিল। এতটা কাছের যে তাকে লালন পালনের ঋণ শোধ করতে চেয়েছে। সে আমার নানা-নানীর সাথে বেঈমানি করতে পারেনি।”

“আমার আসল মায়ের মৃত্যুর পর এরিকো তার চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমাকে কাছে টেনে নিয়েছিল এবং নিজেকে জিজ্ঞেস করেছিল সে তখন কি করতে চায়। তার সিদ্ধান্ত ছিল একজন নারী হয়ে যাওয়া। কারণ সে জানতো সে যা নয় তা হয়ে থাকতে সে কখনোই পছন্দ করে নি। সে আমাকে বলেছে মেয়ে হয়ে যাবার আগে সে খুব লাজুক ছিল। কারণ নিজের মনের বিরুদ্ধে কিছু করতে তার ভালো লাগত না। সে তার মুখ থেকে শুরু করে সব কিছু বদলে ফেলে এবং যে টাকা রয়ে যায় তা দিয়ে সে এই নাইট ক্লাবটা  কেনে। সে আমাকে একজন একা নারী হয়ে বড় করে তুলেছে।”

সে হাসে। কী অসাধারণ জীবনকাহিনি! আমি তাদের বিশ্বাস করি কিনা করি কিংবা তারা হয়তো আরও কিছু লুকিয়ে রাখে কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যতই তাদের ব্যাপারে জানি ততই তাদের ব্যাপারে কোন কিছু ধারনা করা, অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের রান্নাঘরকে আমি বিশ্বাস করি। যদিও মনে হয় তাদের যেমন দেখায় তারা তেমন না,  নিজের সম্পর্কে যা বলছে তার ভিতরে অন্য কিছু লুকিয়ে আছে তবু তাদের হাসি গৌতম বুদ্ধের মতো লাগে আমার কাছে। আমার তা ভালো লাগে।

“আমি এখান থেকে সকালে চলে যাব তাই নিজের যা লাগে নিয়ে নিও।”

ঘুম ঘুম চোখের ইউচি হাত ভর্তি কম্বল, বালিশ এবং পাজামা এনে দিয়ে কথাটা বলে।আমাকে দেখিয়ে দেয় কিভাবে গোসলের জন্য পানির ব্যবস্থা করে নিতে হবে এবং তোয়ালেটা কোথায় আছে।

এমন একটা চমৎকার জীবনকাহিনি শুনে আমি তখন কিছুই ভাবতে পারি না। আমি ইউচির সাথে একটি ভিডিও দেখি। আমরা ফুলের দোকান ও আমার দাদীর বিষয় নিয়ে আড্ডা দেই এবং দ্রুত সময় কেটে যায়। সোফাটা ছিল খুব আরামদায়ক, খুব বড়, নরম এবং গভীর। আমার মনে হয় আমি একবার যখন সেখানে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছি আর কখনোই সেখান থেকে নিজেকে টেনে তুলতে পারব না।

কিছুক্ষণ পর আমি বলি  “তোমার মা এটা কিনেছে তাই না? আমি বাজি ধরে বলতে পারি। তিনি যখন প্রথম ফার্নিচারের দোকানে গিয়ে এই সোফায় বসেছিলেন তার এটা বাধ্য হয়েই কিনতে হয়েছে। সেখানে সেই মুহূর্তেই সে এটা কিনেছে।”

“হ্যা ঠিক ধরেছ। তার মাথায় যখন যা আসে সে তখনই তা করে। তুমি জান? আমি কেবল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখি।”

“মজা করো না।”

“ঠিক আছে কিছু সময়ের জন্য সোফাটা তোমার। এটাই তোমার বিছানা। আমরা এর চমৎকার ব্যব্যহারের জন্য আনন্দিত।”

“তাই। আসলেই এখানে ঘুমানো আমার জন্য সবচেয়ে ভালো হবে।”

আমি সহজভাবে বলি।

কোনরকম দ্বিধা ছাড়াই সে বলে,

“অবশ্যই।”

“আমি কৃতজ্ঞ।”

কিভাবে আমি নিজের বাড়ির মতো আরাম বোধ করতে পারি তার কিছু নির্দেশনা দিয়ে সে আমাকে শুভরাত বলে তার কামরায় যায় শুতে।

আমারও ঘুম পায়।

অন্যের বাড়িতে গোসল করতে করতে আমি নিজেকে নিয়ে ভাবি আর আমার সকল অবসাদ গরম পানির নিচে ধুয়ে পরিষ্কার করে নেই। ইউচির ধার দেয়া জামা-পাজাম পরে খালি পায়ে আমি বসার ঘরে যাই। আমি আর একবার রান্নাঘরটা দেখতে যাই। সেটা আসলেই বেশ ভালো একটা রান্নাঘর।

তারপর আমি সোফায় হামলে পড়ি যেটা সেদিনের জন্য আমার বিছানা ছিল। তারপর বাতি নিভিয়ে দেই। কমে যাওয়া আলোয় আমি দশ তলার জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখি। দেখি গাছগুলো নরম শ্বাস ফেলছে,আরাম করছে। তারপর বৃষ্টি থেমে আবহাওয়া আর্দ্রতায় পরিশুদ্ধ ও পরিপূর্ণ হয়ে যায়। রাত জ্বলজ্বল করে।

কম্বলে নিজেকে মুড়িয়ে আমি ভাবি, কি হাস্যকর ব্যাপার, এখানেও আমি রান্নাঘরের পাশেই ঘুমচ্ছি! হাসি পায় নিজের কথা ভেবে। কিন্তু সেসময় আমি একা ছিলাম না। হয়ত আমি তেমন কিছুর জন্য অপেক্ষা করেছি। হয়ত আমি তেমন একটা বিছানার জন্য অপেক্ষা করেছি যা আমাকে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য অতীত এবং ভবিষ্যতের সকল চিন্তা থেকে দূরে রাখবে। কারও সাথে একি বিছানায় শুয়ে আমি দুখীই হতাম বরং কারও সঙ্গ আমার বিষণ্ণতা আরও বাড়িয়ে তুলত। কিন্তু সেখানে একটা রান্নাঘর, কিছু গাছ , পাশের কামরাতেই কেউ একজন ঘুমিয়ে, একেবারে শান্ত ছিল চারপাশ। হ্যাঁ। সেটা ছিল সেরা কিছু। জায়গাটা ছিল সেরা।

আমি শান্তিতে ঘুমাই।

 

পানির শব্দে আমার ঘুম ভাঙে।

ঝলমলে সকাল। আমি টলতে টলতে রান্নাঘরে গিয়ে দাঁড়াই। মিস্টার এরিকো তখন আমার পিছন দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে। আগের রাতের পোশাকের সাথে তখনকার পোশাকের কোন মিল লেই। কিন্তু সে যখন হেসে পিছন ফিরে আমাকে শুভ সকাল বলে তার মুখটা মারাত্মক রকম সজীব লাগে। আমিও বলি, “শুভ সকাল।”

সে রেফ্রিজারেটর খুলে ভেতরে উঁকি দিয়ে ভ্রূ কুঁচকে বলে,

“জানো সকালে আমি সবসময় ক্ষুধার্ত থাকি আমার যদি ঘুম পায় তবুও আমি ক্ষুধার্ত থাকি। কিন্তু বাসায় খাবারের কিছু নেই। বাইরে থেকে আনতে বলি।তুমি কি পছন্দ কর?”

আমি দাঁড়িয়ে বলি,

“আমাকে কিছু বানাতে দিবেন?”

“সত্যি? তুমি কি চোখে ঘুম নিয়ে ছুড়ি ধরতে পারবে?”

“কোন সমস্যা নেই।”

পুরো এপার্টমেন্ট জুড়ে আলোর খেলা চলছিল। যেন সূর্যের আলোর তৈরি একটা ঘর। আমি আকাশের মনোরম ও অসীম নীল রঙের দিকে তাকিয়ে দেখি। অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্যটা।

রান্নাঘরে থাকতে পারার আনন্দ, ঘুম ও শরীরের অস্বস্তি সব ছাপিয়ে যায়। মাথা পরিষ্কার হয়ে যায় এবং হঠাৎ মনে পড়ে তিনি একজন পুরুষ ছিলেন। আমি তার দিকে ফিরে তাকাই। আলোর ঝলকের মতো ডিজ্যাবু উঁকি দেয়।

বাড়িটাতে বুনো ঝোপের একধরনের গন্ধ পাই। সেই ভারী বৃষ্টির পর ধোয়া মোছা সকালে আমি নস্টালজিয়ায় ভুগি। দেখি, ইউচির মা একটি বালিশ টেনে নিয়ে বসার ঘরের ময়লা মেঝেতে জড়সড় হয়ে টিভি দেখছে।

***    ***    ***

এরিকো খাবার কাছে টেনে নেয়। পদ তেমন বেশি কিছু ছিল না।সালাদ, ডিম আর জাউ ভাত। তবে খায় তৃপ্তি সহকারে।

দুপুরবেলা দালানের নিজস্ব বাগান থেকে ছেলেমেয়েদের হুটোপুটির শব্দ ভেসে আসে। জানালার কাছের গাছগুলো সূর্যের আলোতে মুড়ে হাল্কা সবুজ রঙে জ্বলজ্বল করে। তারপর নেমে আসে,  উষ্ণ অলস বিকেল।

সেদিন সকালের ওমন দৃশ্যের কথা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। ওভাবে সদ্যপরিচিত কারও সাথে নাস্তা করাটা খুবই অদ্ভুত ব্যাপার। আমরা যেখানে নাস্তা করি যেখানে সব কিছু সরাসরি মেঝেতে নিয়ে রাখা হয়। কোন টেবিল নেই। প্রতিটি পেয়ালায় সূর্যরশ্মি জ্বলজ্বল করে। আমাদের শীতল সবুজ চা প্রতিফলিত হয় মেঝেতে।

হঠাৎ এরিকো আমার মুখের দিকে ভালোভাবে তাকিয়ে বলে,

“ইউচি এর আগে আমাকে বলেছিল তোমাকে দেখলে তার ওউফির কথা মনে পড়ে। আমাদের একটা কুকুর ছিল তার নাম ওউফি। এবং জানো ব্যাপারটা আসলেই ঠিক।”

“তার নাম ওউফি ছিল?”

“হ্যা ওউফি।”

“আচ্ছা।”

“তোমারও ঠিক সেরকমই সুন্দর চুল ও সুন্দর চোখ। কাল যখন আমি তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম আমি হেসে ভেঙ্গে পড়া থেকে নিজেকে সামলেছিলাম। তুমি আসলেই তার মতো দেখতে।”

“এটা কি ঠিক? বিশ্বাস হচ্ছে না আমি দেখতে একটা কুকুরের মতো।”

কিন্তু ভাবছিলাম ওউফি কুকুর না হয়ে যদি সেইন্ট বার্নাড হতো সেটা বরং আরও মারাত্মক হতো।

“ওউফি যখন মারা গিয়েছিল আমি ইউচিকে কিছু খাওয়াতে পারি নি। এক দানা ভাতও না। এ কারণেই ইউচি তোমাকে অনেক আপন ভাবে। আমি বাজী রেখে বলতে পারি ব্যাপারটা রোমান্টিক।”

ইউচির মা হেসে নুয়ে পড়ে।

“ঠিক আছে।”

আমি বলি, “ইউচি বলে তোমার দাদী অনেক উদার মানুষ ছিলেন।”

“দাদী ওকে খুবই পছন্দ করত।”

“তুমি জানো আমি ছেলেটাকে বড় করার সময় বেশি সময় দিতে পারিনি। তাই আমার ভয় হয় সেই ফাটল গলে অন্য কিছু প্রবেশ করেছে।”

“ফাটল গলে?”

আমি হাসি।

“হ্যাঁ সত্যি।”

মাসুলভ হাসি হেসে সে বলে,

“আবেগের ব্যাপারে সে দ্বিধান্বিত এবং সে মানুষের কাছ থেকে অদ্ভুত রকম দূরত্ব রেখে চলে। আমি জানি আমি কিছু ঠিক করি নি। কিন্তু আমি চাইতাম আমি তার ভেতর থেকে ভালো বাচ্চাটাকে বের করে আনি। এবং আমি সে বিষয়েই জোর দিয়েছি বেশি এবং তুমি জানো সে একজন ভালো বাচ্চা।”

“আমি জানি।”

সে মুখ উজ্জ্বল করে বলে,

“তুমিও একটা ভালো বাচ্চা।”

বুঝতে পারি এরিকোর যে একটা চমৎকার আবেশ আছে সেটাই তাকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তার প্রতি আমার যেরকম মুগ্ধতা তা তার ছেলে বা স্ত্রী কেউই কমাতে পারেনি। আমি নিশ্চিত হই এই বৈশিষ্ট্যই হয়ত তাকে বরফ শীতল একাকীত্বের দিকে ঠেলে দেয়।

শসা চিবোতে চিবোতে সে বলে, “তুমি জানো অনেক লোক যা বলে আসলে তারা মনে মনে তা লালন করে না। কিন্তু আমি এ ব্যাপারে সাবধানী। আমি আসলেই চাই তুমি এখানে থাকো যতদিন তোমার খুশি। তুমি একটা ভালো মেয়ে এবং তোমাকে এখানে পেয়ে আমি সত্যি খুব খুশি হয়েছি। আমি বুঝি কষ্টটা কেমন যখন যাওয়ার কোন জায়গা থাকে না। দয়া করে আমার সাথে থাকো এবং কোন কিছু নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না। ঠিক আছে?”

সে আমার চোখে গভীর ভাবে তাকিয়ে সমবেদনায় কথাগুলো বলে।

“হ্যাঁ আমি স্বাভাবিক ভাবেই ভাড়া আর বাকী খরচগুলো দিব। কিন্তু হ্যা যে পর্যন্ত আমি অন্য কোন থাকার জায়গা না খুঁজে নিতে পারব আমি থাকব। আপনাদের এই উদারতার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।”

কথাগুলো বলার সময় আমার বুক কান্নায় ফেটে যায়।

সে হেসে হেসে বলে, “অবশ্যই অবশ্যই। এসব নিয়ে ভেবো না। কিন্তু ভাড়ার বদলে শুধুমাত্র এই জাউ ভাতটা রেঁধে দিও। তোমারটা ইউচির চেয়ে বেশ ভালো হয়।”

বয়স্ক মানুষের সাথে থাকা মানে স্নায়ুর উপর একপ্রকার চাপে রাখা। তারা যতই স্বাস্থ্যবান থাকুক না কেন দুশ্চিন্তা একটা থাকেই। আসলে আমি যখন আমার দাদীর সাথে থাকতাম এটা আলাদাভাবে খেয়াল করিনি। কিন্তু সত্য বলতে আমি সব সময় একটাই ভয় পেতাম, ‘দাদী মারা যাবে।’

আমি যখন বাড়ি ফিরতাম আমার দাদী জাপানি নকশায় সাজানো কামরাটায় আসতো এবং এসে তিনি বলতেন, “স্বাগতম।” আমি যদি দেরী করে ফিরতাম সবসময় তার জন্য মিষ্টি কিছু নিয়ে যেতাম। তিনি খুব আধুনিক মানুষ ছিলেন। আমি যখন বলতাম বাড়িতে ফিরতে দেরী হবে সে আমার উপর চড়াও হতো না। বিছানায় যাওয়ার আগে আমরা দুজন অল্প কিছু সময় একসাথে কাটাতাম। মাঝে মাঝে কফি বা গ্রিন টি পান করতাম,  কেক খেতাম,  না হয় টিভি দেখতাম।

আমার দাদীর কামরাটা আমার ছোটবেলা থেকে একি রকম দেখতে ছিল। সেখানে আমরা একে অপরের সাথে হাল্কা আলোচনায় মেতে উঠতাম। হয়ত কথা বলতাম টিভি তারকাদের নিয়ে কিংবা সেদিন যা যা ঘটেছে তা নিয়ে। মনে হয় তিনি সেসময় আমাকে ইউচি সম্পর্কেও বলতেন। যত আন্তরিক ভালোবাসাই আমি পেতাম না কেন যত আনন্দে আমি মাতোয়ারা হতাম না কেন আমার অন্তরে সব সময় একটা কথাই বাজত যে আমি আমার পরিবারের আর একজন জীবিত সদস্যকে নিয়ে আছি। সে খালি স্থান কখনোই পূরণ হয় না। যত আনন্দেই সেই শিশু আর বয়স্কা একসাথে থাকুক না কেন মৃতের মতো শীতল একাকীত্ব ঘরের এক কোণে নিয়ে গিয়ে হাঁপানি তুলে, কাঁপুনি দেয়। যদিও আমাকে এব্যাপারে আগে কেউ কিছু বলেনি তবুও আমি খুব কম বয়সে এটা অনুভব করেছি। আমার মনে হয় ইউচিও তেমন করেই ভুগেছে।

আমি তখন এটা অনুভব করেছি যে, আমরা প্রত্যেকে একেবারে অন্ধকার এবং নিঃসঙ্গ রাস্তায় হাটি।রাস্তাটা আলোকিত করার একমাত্র উপায় কি তবে আমরা নিজেরাই নই? যদিও আমি আদর ভালোবাসায় বড় হয়েছি আমি সবসময় নিঃসঙ্গই ছিলাম।

কোন একদিন আদতেই সবাই অদৃশ্য হয়ে যাবে, সময়ের কালো গহ্বরে হারিয়ে যাবে’ আমার সত্তার মূলে এই জ্ঞান বপন করে আমি সবসময় জীবনযাপন করেছি। আর হয়ত এই কারণে ইউচির আচরণ আমার কাছে এত স্বাভাবিক লাগে এবং এজন্যই আমি তাদের সাথে থাকতে ছুটে যাই।

 

মে মাস পর্যন্ত অলস থাকার অনুমতি দিলাম নিজেকে। আমি যেন স্বর্গে ছিলাম। তখনও আমি পার্টটাইম চাকরি করি। সেখান থেকে ফিরে এসে আমি ইউচিদের বাসা পরিষ্কার করি। টিভি দেখি,  কেক বানাই। আমি ঠিক ঘরের বৌয়ের মতো থাকি। আস্তে আস্তে অল্প অল্প করে আমার হৃদয়ে আলো এসে উঁকি দেয়। আমি শিহরিত হই।

ইউচির কলেজ আর চাকরি ছিল, এরিকোর রাতের কাজ ছিল, তাই আমরা তিনজন কখনোই একসাথে বাড়িতে থাকিনি। প্রথম প্রথম আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আমি বসার ঘরে শুয়ে অভ্যস্ত ছিলাম না। আমি লাগাতার তানাবেদের বাসা এবং আমার পুরনো বাসায় প্রয়োজনের জিনিস আনতে যাওয়া আসা করি। কিন্তু দ্রুত আমি অভ্যস্ত হয়ে যাই।

তানাবেদের সোফাটা তাদের রান্নাঘরের মতোই পছন্দ করি। আমি তাতে শোয়ার ইচ্ছা নিয়েই যাই। গাছদের শান্ত শ্বাস-প্রশ্বাস শুনতে শুনতে, পর্দার আড়াল থেকে রাতের দৃশ্য দেখতে দেখতে আমি বাচ্চার মতোই ঘুমাই। আমি এর চেয়ে বেশি কিছু চাই নি। আমি খুশি ছিলাম।

আমি সবসময় এরকমই। পিঠ দেয়ালে না ঠেকলে নড়ি না। সেসময় একইরকম ঘটনা ঘটেছিল। অমন মুশকিলে ভোগার পর অমন একটা উষ্ণ বিছানায় নিজেকে সমর্পণ করতে পেরে আমি ঈশ্বরদের ধন্যবাদ দেই। তারা থাকুক কি না থাকুক।

 

একদিন আমি আমার পুরনো এপার্টমেন্টে শেষ কিছু জিনিস পত্রের দেখভাল করতে যাই। কিন্তু দরজা খুলে আমি কেঁপে উঠি। মনে হয় একটি অপরিচিত বাড়িতে গিয়েছি। শীতল এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন চারপাশ, কোন সাড়া শব্দ নেই।সবকিছুই আমার পরিচিত কিন্তু মনে হয় তারা আমার আপন না।আমি সাবধানে পা টিপে টিপে ঘরে প্রবেশ করি যেন আমার অনুমতি লাগবে ঢুকতে।

আমার দাদীর মৃত্যুর সাথে সাথে সেই এপার্টমেন্টে সময়ও থেমে যায়। সেই বাস্তবতা তখনও বর্তমান। তা বদলাতে আমার কিছুই করার নেই।সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে ফিরে আসা ছাড়া একটা কাজই করতে পারি আর তা হল কোন একটা কিছুতে সুর তোলা। তাই আমি ফ্রিজটা মাজা ঘষা করতে শুরু করি।

ঠিক তারপরই ল্যান্ড ফোনটা বেজে ওঠে।

কে হতে পারে জেনেই আমি ফোন ওঠাই। সেটা ছিল ছতেরো। আমার পুরনো প্রেমিক। দাদীর অসুস্থতা যখন বেড়ে গিয়েছিল আমাদের ছাড়াছাড়ি তখনই হয়।

“হ্যালো, মিকাগে?”

কণ্ঠস্বরটি আমাকে পুরনো স্মৃতিতে ভাসিয়ে দিয়, কাঁদিয়ে দিয়।

আমি আনন্দে চিৎকার করে বলি, “অনেক দিন দেখা হয় না।”

“হ্যাঁ। ঠিক আছে। তুমি ক্লাসে আসো না বলে আমি আমি দুশ্চিন্তা করছিলাম কিছু হয়েছে কিনা তাই একে ওকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম তোমার দাদী মারা গিয়েছেন। আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি শুনে।খুবই খারাপ হয়েছে ব্যাপারটা।”

“হ্যাঁ, আমি খুব ব্যস্ত ছিলাম।”

“তুমি কি এখন আসতে পারবে?”

“অবশ্যই।”

কোথায় দেখা করব দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি জানলার দিকে তাকাই। বাইরের আকাশের ধুসর রঙ নিস্তেজ হতে থাকে। বাতাস নিদারুণ শক্তিতে মেঘদের তাড়িয়ে বেড়ায়। এই পৃথিবীতে কোথাও কোন বিষণ্ণতা নেই, কোথাও না।

 

ছতেরো পার্ক পছন্দ করত।

সবুজ জায়গা, উন্মুক্ত জায়গা, বাইরের কোন স্থান-এইসব সে ভালবাসত। কলেজেও প্রায়ই তাকে পাওয়া যেত বাগানের মধ্যখানে খেলার জায়গার পাশের কোন বেঞ্চিতে। তাই যদি ছতেরোকে কেউ খুঁজতে চাইত তবে তাকে কলেজের সবুজ চত্বরে যেতে হত। সে গাছদের নিয়ে কোন একটা কিছু করার পরিকল্পনা করতো। অজানা কারণে আমার এমন মানুষজনের সাথে যোগাযোগ হয় যারা সবাই গাছ নিয়ে কিছু একটা করে।

আমার হাসিখুশি দিনগুলোতে আমি আর ছতেরো দুজন কলেজের প্রেমিক-যুগলের আদর্শ ছবি ছিলাম। সবুজের প্রতি তার এই অস্বাভাবিক টান দেখে আমরা সবসময় বাইরে কোথাও বসতাম এমনকি শীতকালের মাঝামাঝি সময়েও। কিন্তু আমার প্রায়ই দেরী হয়ে যেত বলে আমরা দুজনই কিছুটা ছাড় দিয়ে দেখা করার স্থান বদলে নিতাম। শেষমেশ আমরা পার্কের কোনার হাস্যকর রকম বড় ক্যাফেটেরিয়ায় বসতাম।

তাই সেদিনও সেরকমটাই হয়। ছতেরো পার্কের কাছের কফি শপের পাশের একটা আসনে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে বসে আছে।মেঘাচ্ছন্ন আকাশের পটভূমিতে গাছেরা বাতাসে কাপছে আর আমি আসা যাওয়া করতে থাকা পরিচারিকাদের ফাঁক গলে তার দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজি। সে তখন আমাকে দেখে হাসে।

আমি তার মুখোমুখি বসি এবং বলি, “মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে।”

“নাহ মনে হচ্ছে আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।”

“হাস্যকর তাই না? আমাদের এতদিন দেখা হয় নি আর আমরা কথা বলছি আবহাওয়া নিয়ে।”

তার হাসি আমাকে সহজ করে।আমি ভাবি, যার সাথে সহজ সম্পর্ক তার সাথে এমন একটা বিকেলে চা খাওয়া চমৎকার একটা ব্যাপার।আমি জানি সে ঘুমের মধ্যে কতবার এপাশ ওপাশ করে, কফিতে কি পরিমাণ চিনি ও দুধ নেয়। আমি জানি যখন সে তার অবাধ্য চুল শুকানোর যন্ত্র দিয়ে আঁচড়াতে যায় তখন আয়নায় তাকে কেমন দেখায়। তারপর আমি ভাবি, আমার যদি এখনো তার সাথে সম্পর্ক থাকতো তাহলে হয়তো আমি আফসোস করতে বসতাম কেন একটু আগে রেফ্রিজেরাটর ঘষতে গিয়ে ডান হাতের নেল পলিশটা নষ্ট করলাম।

এমন হাল্কা আড্ডার মধ্যে হঠাৎ মনে পড়ে গেছে এমন ভাব করে সে প্রসঙ্গ পালটায়, “শুনলাম তুমি তানাবেদের সাথে থাকছ?”

চমকে যাই। এতটাই অবাক হই যে আমি আমার পেয়ালা একদিকে উলটে পিরিচে চা ফেলে দেই। সে আরও বলে, “কলেজে এই নিয়েই এখন আলোচনা হয়। বলো না আবার যে তুমি তা জানো না।”

তাকে দুখী দেখালেও সে তখনও হাসছিল। আমি বলেছিলাম, “আমি কেবল এটা জানতাম না যে তুমি জানো। তো তাতে কি হয়েছে?”

“তানাবের প্রেমিকা। নাহ! হয়ত বলা উচিত সাবেক প্রেমিকা, তানাবেকে চড় মেরেছে। তাও ক্যাফেটেরিয়াতে।”

“কি?  সেটা কি আমার জন্য?”

“মনে হচ্ছে সেটাই। আর তোমরা দুজনই বেশ খুশি তাতে। আমি তেমনটাই শুনেছি।”

“তাই নাকি?  আমি প্রথম শুনলাম এমন কিছু।”

“কিন্তু তুমি তাদের সাথে থাকছ। তাই নয় কি?”

“তার মাও সেখানে থাকে।” (যদিও মা শব্দটা একেবারে ঠিক না)

“কি! এই লোকটার কথা আর বল না।”

ছতেরো চেঁচিয়ে কথাটা বলে। একসময় তার সাবলীল অকপট কথার জন্য তাকে আমি পছন্দ করতাম। কিন্তু তখন সেই আচরণ আমার কাছে আপত্তিকর লাগে। আমার অসহ্য লাগে।

সে বলে, “তানাবে ছেলেটাও শুনেছি অনেক অদ্ভুত।”

“আমি জানতাম না। আমি খুব কমই তাকে দেখি এবং আমরা তেমন কথাও বলি না। তারা আমাকে একটা পোষা কুকুরের মতোই দেখে। এমন না যে তারা আমাকে বিশেষ পছন্দ করে বা অন্য কিছু। তাই আমি তাদের সম্পর্কে তেমন কিছু জানিনা এবং ওর প্রেমিকার ঘটনা সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই।”

ছতেরো বলে, “আসলে আমি প্রায়ই বুঝতে পারি না তুমি কাকে পছন্দ কর কাকে ভালোবাসো বা কাকে ভালোবাসো না। যেভাবেই হোক মনে হচ্ছে ব্যাপারটা তোমার জন্য ভালো কিছুই হবে। আর কদিন থাকবে তুমি সেখানে?”

“আমি জানি না।”

সে হেসে বলে, “আচ্ছা তুমি এখনো ভালোভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারো নি।”

“আমি চেষ্টা করছি।”

বাড়ি ফেরার সময় আমরা পার্ক দিয়ে হাঁটি। গাছের ফাঁক দিয়ে তানাবেদের দালানটা ভালো রকম দেখা যায়।

আমি আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বলি, “ওখানেই আমি থাকি।”

ছতেরো হেসে বলে, “বাহ একেবারে পার্কের পাশে। আমি যদি এখানে থাকতাম প্রতিদিন সকাল পাঁচটায় উঠে এখানে চলে আসতাম।”

সে খুব লম্বা।আমাকে সবসময় তার দিকে মুখে তুলে তাকিয়ে কথা বলতে হয়।তার মুখের দিকে চেয়ে ভাবি, আমি যদি তার সাথে থাকতাম তাহলে হয়তো সে চুল ধরে টেনে আমাকে একটা এপার্টমেন্ট ঠিক করাতো, এবং আমাকে লাথি-গুঁতো দিয়ে কলেজে পাঠাতো। আমি তার এই কঠোরটাকে ভালবাসতাম। আমি এর জন্য পাগল ছিলাম। কিন্তু পাশাপাশি আমি এর সাথে সহাবস্থানও করতে পারতাম না। নিজেকে ঘৃণা করতাম, সেই পুরনো দিনগুলোতে।

বড় পরিবারের ছোট ছেলে সে। তারপরও অনেক কিছু গায়ে না মেখে সে তার উজ্জ্বল মুখ সেখান থেকে উঁচু করতো আর সে মুখ আমাকে টানত। কিন্তু ঠিক তখন আমার যা দরকার ছিল তা হল, তানাবে পরিবারের অদ্ভুত হাসি-খুশি পরিবেশ,  তাদের প্রশান্তি। আমি এ ব্যাপারটা আর তাকে ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন বোধ করিনি। সেটা বিশেষভাবে জরুরী মনে হয় নি আমার এবং আমি বুঝতে পারি, ছতেরোকে বুঝানো অনেকটা অসম্ভব। যখনি ছতেরোর সাথে একত্র হতাম এরকম কিছুই হতো, আমি নিজের ব্যক্তিগত সত্তার জন্য খুব দুঃখী বোধ করতাম।

আমি বলি, “ঠিক আছে। বিদায়।”

কিন্তু আমার হৃদয়ের ভেতর থেকে আমার চোখ তাকে জিজ্ঞেস করে,

“অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার আগে একটা কথা বল,  আমার জন্য তোমার মনে এখনো কি কিছু বাকী আছে?”

আমার মনে মনে বলা প্রশ্নটার উত্তর তার চোখে স্পষ্টই ছিল। কিন্তু সে হেসে মুখে বলেছিল, “ভালো থেকো বাচ্চা।”

আমি বলি, “ঠিক আছে।”

তারপর হাত নেড়ে আমরা যে যার পথে চলে যাই। অনুভূতিগুলো কোন অসীমে দূরত্বে হারিয়ে যায়।

 

সেই সন্ধ্যায় আমি একটা ভিডিও দেখি আর দরজা খুলে দাঁড়ায়  ইউচি। তার হাতে একটা বড় বাক্স। আমি জিজ্ঞেস করি,

“তুমি এসময় বাড়িতে?”

ইউচি হেসে প্রচার করে, “আমি একটি ওয়ার্ড প্রসেসর কিনেছি।”

আমি ততদিনে তা বুঝে গিয়েছি এরা অদ্ভুত কিছু নতুন জিনিস কেনাকাটা করে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স জিনিস।

“বাহ।”

“তুমি যা চাও তাই টাইপ করতে পারবে।”

“হ্যাঁ ভাবতে হবে।”

আমি ভাবি তাকে দিয়ে কিছু গানের লিরিক টাইপ করানোর কথা। তখন সে বলে, “আচ্ছা বলতো। তোমার কি ঠিকানা বদলের কার্ড বানানো উচিত না?”

“তুমি কি বলছ?”

“আরে তুমি কতদিন এই বড় শহরে কোন ঠিকানা আর ফোন নাম্বার ছাড়া থাকবে?”

“কিন্তু ব্যাপারটায় ঝামেলা বাড়বে। আমি যখন আবার জায়গা পালটাবো আমার তখন আবার কাজটা করতে হবে।”

সে রেগে গিয়ে বলে, “ধুর কী সব বল!”

তারপর সে নরম ভাবে বলে, “আরে যা বলছি করতো দেখি।”

কিন্তু ছতেরো ওর প্রেমিকা সম্পর্কে যা যা বলেছিল তা তখনও আমার মাথায় কাজ করছে। আমি বলি,

“ঠিক আছে কিন্তু তোমার কি মনে হয় না আমার এখানে থাকাটা একটু আজব দেখায়। তোমার তো সমস্যা হতে পারে?”

আমার দিকে একটা রহস্যপূর্ণ চাউনি দিয়ে সে বলে, “কি যা তা বলছ?”

ভাবি, সে যদি আমার প্রেমিক হত তাহলে আমি তাকে একটা চড় দিতাম। আমার নির্ভরশীল অবস্থানকে একপাশে সরিয়ে একমুহূর্তের জন্য আমি তাকে ঘৃণা করি। এমন চালাকি সে কিভাবে করতে পারে।

 

 

আমি সম্প্রতি ঠিকানা বদলেছি। দয়া করে এই ঠিকানা ও ফোন নাম্বারে যোগাযোগ করুন।

মিকাগে শাকুরাই।

ফোন # ২৩৪১৫

এপার্টমেন্ট # ৪৫

ওয়ার্ড # ৩-২১-১

টোকিও

ইউচি আমাকে ঠিকানা লেখার উদাহরণের এরকম প্রতিরূপ দিয়ে বাকিগুলোর কপি তৈরি করে দেয়। আমার জানা উচিত ছিল এই লোকগুলো একটি ফটোকপি মেশিনও লুকিয়ে রেখেছে কোথায়। যাই হোক আমি তখন খামে ঠিকানা লেখা শুরু করি। ইউচি আমাকে সাহায্য করে। মনে হয় সে রাতে তার প্রচুর অতিরিক্ত সময়। কিন্তু আমি তাকে যেটুকু বুঝতে পেরেছি তাতে মনে হয়েছে, সে তো অলস সময় পছন্দ করে না।

আমাদের কলমের আঁচড়ের শব্দের সাথে বৃষ্টি পড়ার শব্দ মিলেমিশে সন্ধ্যার নির্মল নিস্তব্ধতা মুখর করে তোলে। বাইরে একটি উষ্ণ বাতাসের ঝাপটা গর্জন করে ওঠে। বসন্তের ঝড়। মনে হয় সেটা যেন ছাদ, বারান্দার রাতের দৃশ্য নাড়িয়ে দিচ্ছে। আমি বন্ধুদের নাম তালিকা ঘেঁটে ঘেঁটে স্মৃতি কাতর হয়ে পড়ি। কিভাবে যেন আমি ছতেরোর নামে কার্ড লিখতে ভুলে যাই। বাতাস শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আমরা গাছ ও টেলিফোন লাইনের তারের ঘরঘর শব্দ শুনতে পাই। আমি আমার চোখ বন্ধ করি। আমার কুনই টেবিলের উপর হেলান দেয়া থাকে হঠাৎ আমি চমকে উঠি,  আরে এই বাসায় এই টেবিল কোথা থেকে এলো! ইউচি এরিকো সম্পর্কে ঠিকই বলে, “তার মাথায় যখন যা আসে তাই করে জানো?  নিশ্চয়ই এটা কিনে এনেছে সে।”

ইউচি বলে, “ঘুমিয়ে পোড়ো না কিন্তু।”

“না। ঠিকানা বদলের কার্ড লিখতে আমার আসলেই ভালো লাগে।”

“আমারও ঠিকানা বদলের কার্ড বা কোথাও ঘুরতে গেলে পোস্টকার্ড লিখতে আসলেই ভালো লাগে।”

“হ্যাঁ কিন্তু,”

আমি আমার আগের প্রসঙ্গ টেনে আনি, “এই পোস্টকার্ড গুলো বাতাসে কথা ছড়াবে। তুমি কি আজ কলেজ ক্যাফেটেরিয়ায় এই ব্যাপারটা নিয়ে বিপদে পড় নি?”

“আচ্ছা তুমি তাহলে আজ এটাই শুনে এসেছ?”

সে তিক্তভাবে হাসে। তার হাসির নতুন মাত্রা দেখি তখন।

“ঠিক আছে যাই হোক এ ব্যাপারে খোলাখুলি বলাই কি ভালো না?  তুমি এমনিতেই আমার জন্য অনেক করেছো।”

“ফালতু কথা বাদ দাও তো। তোমার কি মনে হচ্ছে আমরা পোস্টকার্ড গেমস খেলছি।”

“সেটা আবার কি?”

“জানি না।”

আমরা দুজনই হাসি। এরপর যেমন করেই হোক সে প্রসঙ্গটা চাপা পড়ে যায়। এমনকি আমার মতো শামুক যে কিনা সবকিছু দেরীতে বোঝে সেই আমিও তার অস্বাভাবিকতা টের পাই। আমি যখন তার চোখের দিকে ভালো মতো তাকাই বুঝতে পারি,  সে খুব খুবই দুখী।

ছতেরো বলেছিল তার প্রেমিকা নাকি বলেছে,  একবছর তার সাথে থাকার পরও ইউচিকে সে একআনাও বোঝে না। এতে মেয়েটার খুবই খারাপ লাগে। মেয়েটার মতে,  ইউচি তার কালির কলমকে মেয়েদের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়।

যেহেতু আমি তখন ইউচির প্রেমে পড়িনি, তাই আমি তাকে খুব ভালোভাবেই বুঝি। একটি কালির কলমের গুরুত্ব ও গুনাগুণ ইউচির কাছে একরকম, তার প্রেমিকার কাছে অন্যরকম। পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছে যারা তাদের কালির কলম তাদের সত্ত্বার সমস্ত অংশ দিয়ে ভালোবাসে এবং এটা খুবই দুঃখের বিষয় আমরা কারও প্রেমে পড়লে তাকে ভালভাবে বুঝতে পারি না।

“কিছুই করার ছিল না। এমনটা এমনিতেই হতো।”

মাথা না উঁচিয়েই বলে ইউচি। সে হয়তো আমার নীরবতায় বিরক্ত হয়। সে বলে, “এতে তোমার কোন দোষ নেই।”

“ধন্যবাদ।”

“স্বাগতম।” সে হেসে বলে।

আমার মনে হয় আমি তাকে স্পর্শ করেছি। এক মাস একসাথে থাকার পর সেই একি জায়গায় একি ঘরে মনে হয় আমি তাকে প্রথমবারের মতো স্পর্শ করেছি। প্রেমে পড়ে কাহিনীর সেখানেই ইতি টানা যেত। এর আগে আমি যখন প্রেমে পড়েছি আমি নিজেকে সামলে নিয়েছি কিন্তু তার সাথে ভালোবাসাটা হয়তো অন্যরকম হতো। কিছুসময় ধরে আমরা যে ধরনের কথা বলেছি তা যেন মেঘলা আকাশের ফাঁক দিয়ে তারার ঝলকের মতো। সাধারণত এই ধরনের কথাবার্তার গন্তব্য ভালোবাসা। কিন্তু লিখতে লিখতে আমার মনে হয় আমাকে অবশ্যই সেখান থেকে বেরুতে হবে।

খুব বাজে ব্যাপার, আমার জন্য ইউচি এবং তার প্রেমিকার মধ্যে সমস্যা তৈরি হওয়া। ভাবি,  আমার যত কঠিন দিনই আসুক না কেন কিংবা একা থাকতে প্রস্তুত হতে হোক না কেন আমি একটা নিছক  ব্যাপার নিয়ে পাশা খেলতে পারি না। তখনই নিজেকে বলি,  “হ্যাঁ দ্রুত,  খুব দ্রুত এখান থেকে বেড়িয়ে যাব।”

যদিও এইসব ভাবতে ভাবতে ঠিকানা বদলের কার্ড লেখা অনেকটা স্ববিরোধী কাজ কিন্তু তবুও ভাবি আমাকে বের হতেই হবে।

 

ঠিক তখনি ঘটনা অন্য দিকে বাঁক নেয়। দরজা খুলে প্রবেশ করে এরিকো। তার হাতে কাগজের একটা বড় প্যাকেট। আমি তার দিকে অবাক হয়ে তাকাই।

কি হচ্ছে? ক্লাবে কি হচ্ছে আজ?

এরিকোর দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে ইউচি।

“আচ্ছা পড়ে বলছি কিন্তু আগে দেখো আমি কি এনেছি। একটি জুসার।”

কাগজের ব্যাগ থেকে একটা বড় বাক্স বের করে হেসে বলেছিল এরিকো। আমি ভাবি এই লোকগুলোর মাথা খারাপ।

এরিকো বলে, “আমি কেবল এটাই দিতে এসেছিলাম।”

ইউচি ইতিমধ্যে দড়ি কাটতে কাটতে বলে, “আমাকে বললে আমি নিচে গিয়ে নিয়ে আসতাম।”

“সমস্যা হয় নি। জিনিসটা তত ভারী না।”

অল্প সময়েই মোড়ক খুলে একটি চমৎকার জুসার বের করে। এটা দিয়ে যে কোনো ধরনের ফলের রস তৈরি করা যাবে। আনন্দে বলেছিল এরিকো,

“আমি শুনেছি তাজা ফলের রস ত্বক ভালো রাখে।”

ব্যবহারবিধি থেকে চোখ না উঠিয়েই চতুর উত্তর দেয় ইউচি, “তোমার এই বয়সে আর কাজে দেবে না।”

অস্বাভাবিক রকম সহজ ও নির্লিপ্ত কথাবার্তায় আমার মগজ চরকার মতো ঘুরে ওঠে। মনে হয় আমি বিইউচড টিভি সিরিজ দেখছি। এমন চরম অস্বাভাবিকতায় এমন সহজ থাকা যেখানে মানায়।

চেঁচিয়ে ওঠে এরিকো, “ওহ, যদি মিকাগে তার ঠিকানা বদলের কার্ড লিখে থাকে তাহলে দারুণ হয়। আমি তার জায়গা বদল উপলক্ষে জন্য একটি উপহার এনেছি।”

তারপর সে আর একটা প্যাকেট এগিয়ে দেয়। সেটা গোল গোল করে কাগজ দিয়ে প্যাঁচানো। আমি সেটা খুলে দেখি কলার চিত্রকর্ম করা একটা চমৎকার গ্লাস।

এরিকো বলে, “বেশি বেশি করে জুস খাবে ঠিক আছে?”

ইউচি মুখ সোজা করে বলে, “মনে হয় আমরা কলার জুস খেতে পারব।”

প্রায় কান্না কান্না কণ্ঠে আমি বলি, “বাহ।আমি অনেক খুশি।”

আমি যখন এখান থেকে চলে যাব তখন আমি এই গ্লাসটা নিয়ে যাব, আর আমি যদি চলেও যাই বার বার এসে আপনাকে জাউ-ভাত রান্না করে  দেব, মনে মনে কথাগুলো বললেও আমি তা মুখে বলতে পারি না।

এর পরের দিন আমাকে আগের এপার্টমেন্টের বাদ বাকি জিনিস সব খালি করতে যেতে হয়। শেষ পর্যন্ত আমি কাজটা শেষ করতে পারি। আমার নিজেকে খুব কুঁড়ে লাগে। দেখি, খালি কামড়াগুলো আলোয় মাখামাখি হয়ে আছে। একসময় সেটাকেই তো নিজের ঘর বলতাম।

অনেক সময় নেয়ার জন্য মাফ চাইতে বাড়িওয়ালার সাথে দেখা করতে যাই। ছোটবেলা থেকে যা আমরা প্রায়ই করতাম,  তার অফিসে বসে চা খাওয়া আর আড্ডা দেয়া। আমি গভীরভাবে ভাবি, তার বয়স তখন কত হবে। আমার দাদী যেভাবে সেখানে বসতেন আমি ঠিক সেইভাবে তার সাথে বসে বসে চা খাই, আবহাওয়া ও প্রতিবেশীদের নিয়ে আলাপ করি। অদ্ভুত লাগে, মনে হয় এখান থেকে চলে যাওয়ার ব্যাপারটা ঠিক হচ্ছে না।

অনিবার্য ঠিকানা বদল আমার অতীতকে পিছনে ফেলে দেয়। আমি হতবুদ্ধি হয়ে কুঁকড়ে যাই, জায়গাটা ছেড়ে দেয়ার প্রতিক্রিয়া যদিও দুর্বল ছিল কিন্তু জায়গাটা যে বদল করছিল সে যেন আমি নই। আমার জন্য সবকিছুই যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে।

তার কিছুদিন আগেও, সেই আলোয়-ধোয়া এপার্টমেন্টটিতে আমাদের জীবনের ঘ্রাণ ছিল। রান্নাঘরের জানালা, বন্ধুদের হাসিমুখ, কলেজের তাজা সবুজের পটভূমিতে ছতেরোর চেহারা, গভীর রাতে ফোন করলে আমার দাদীর কণ্ঠ, ঠাণ্ডা সকালের আমার উষ্ণ বিছানা, হলরুমে আমার দাদীর চপ্পলের শব্দ, পর্দার রং…তাতামি মাদুর…দেয়ালের ঘড়ি…

এসব, কোন কিছুই আর নেই তখন।

আমি যখন সেখান থেকে বের হই তখন প্রায় সন্ধ্যা।

মলিন গোধূলি নেমে আসে। বাতাস বইছে। হাল্কা শীতের অনুভূতি জাগে। বাতাসে আমার কোটের প্রান্ত উড়তে থাকে। বাসস্টপ থেকে আমি লম্বা ভবনগুলোর জানালাগুলো দেখি। সেগুলো থেকে হাল্কা নীল আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে, লোকজন সেই জানালার পিছনে যাওয়া আসা করছে। লিফটগুলো নামছে আর উঠছে। মনে হয়, সবকিছু সেই ঝলমলে নীরবতার আধো অন্ধকারে গলে যাচ্ছে।

আমার হাতে তখন শেষ কিছু মালামাল। যখন ভাবি যাক শেষ পর্যন্ত দুই জায়গার টানাহেঁচড়া থেকে তো রক্ষা পেয়েছি, তখন আমার শরীর অদ্ভুত রকম কেঁপে ওঠে, আমি কেঁদে ফেলি।

এক কোণায় যাত্রীতে বোঝাই বাস এসে থামে। আমি সেই ভিড়ের মধ্যে বাসের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে দেখি দূরের দালানগুলোর পিছনে অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশ হারিয়ে যাচ্ছে। যখন বাস চলতে শুরু করে আকাশে নতুন করে যাত্রাকরা চাঁদের দিকে আমার চোখ থমকে যায়।

প্রতিটা বাসস্টপে যখন বাস ঝাঁকুনি দিয়ে থামে, আমি রেগে যাই, বিরক্ত হই আর তাতেই বুঝতে পারি আমি কতটা ক্লান্ত। প্রতিটি বাসস্টপে থেমে আমি জানালা দিয়ে আকাশে ভেসে চলা বেলুনের তৈরি হাওয়াই যানটার দিকে তাকাই। বাতাসে ভেসে ভেসে সেটা আস্তে আস্তে এগোয়। এসব দেখতে  পেরে আমার খুশি লাগে। হাওয়াই যানটা ম্লান চাঁদের মতো আলো ছড়ায়। তার ছোট আলোগুলো জ্বলে আর নিভতে থাকে। আমার সামনে বসা এক বৃদ্ধা মহিলা তার নাতনীকে নিচু স্বরে বলে, “দেখো ইউকি, একটি হাওয়াই যান। কি সুন্দর!তাই না!”

সেই ছোট মেয়েটি যে চেহারা কালো করে রেখেছে তার মেজাজ মনে হয় খুব খারাপ। হয়ত ভিড় আর জ্যামের কারণে। সে রেগে বলে, “তাতে আমার কি? আর এটা মোটেও হাওয়াইযান না।”

বিরক্ত না হয়ে তার দাদী হেসে হেসে বলে, “হয়ত তোমার কথাই ঠিক।”

ইউকি ঘ্যান ঘ্যান করেই চলে, “এখনো কি পৌছাই নি?  আমার ঘুম পাচ্ছে।”

আমি মনে মনে বলি, এই যে মেয়ে! আমি নিজেও যখন ক্লান্ত হতাম এরকম ব্যবহার করতাম। কিন্তু একসময় অনুশোচনা করবে দাদীর সাথে এভাবে কথা বলছ বলে।

দাদীটা বলে, “চিন্তা করো না। আমরা দ্রুতই পৌঁছে যাব। আচ্ছা পেছনে তাকিয়ে দেখো ইউকি। তোমার মা ঘুমাচ্ছে। তুমি তো তাকে জাগাতে চাও না। তাই না?”

বাসের পিছনে তার মায়ের দিকে ঘুরে তাকিয়ে ইউকি শেষমেশ হেসে ফেলে। আমি ভাবছিলাম, কি চমৎকার দৃশ্য। তার দাদীর মায়াবী কথোপকথন শুনে আর ইউকির হঠাৎ হেসে ফেলায় আদুরে দেখানোটা আমার মনে হিংসা জাগায়। আমার মনে পড়ে, আমি আমার দাদিকে আর কখনো দেখতে পাবো না। কখনো না। আমি প্রথমে সেই শব্দগুলোর ভারী ভাবাবেগে তাড়িত হওয়ার পরোয়া করিনি কিংবা যে শূন্যতার অনুভূতি তারা চাপিয়ে দিয়েছিল তাতেও না। কিন্তু এরপরই শব্দগুলো আমাকে তাড়িত করে অবিস্মরণীয় তীব্রতায় ও সর্বশক্তিতে। আমি চাই শান্ত হয়েই সেসব ভাবতে। বাসের তালে তালে দুলে আমি সংকল্প করি যেভাবেই হোক দুরের হাওয়াই যানটা চোখে চোখে রাখব যতক্ষণ পারি। কিন্তু এরপর আমি আবিষ্কার করি চোখের পানি ভীষণরকম ভারী হয়ে আমার গাল বেয়ে আমার জামায় গড়িয়ে পড়ছে।

অবাক হয়ে ভাবি! পাগল হয়ে গেছি নাকি! ভয় হয় মাতালের মতো না পড়ে যাই। আমার শরীর যেন আমার কথা শুনতে চায় না। কিছু বোঝার আগেই অশ্রুর বন্যা বয়ে যায়। আবিষ্কার করি,  লজ্জায় লাল হয়ে আমি বাস থেকে নেমে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাসের চলে যাওয়া দেখছি।

এরপর কিছু না ভেবেচিন্তে একটা সরু গলিতে ঢুকি। নিজের ব্যাগে তালগোল পাকিয়ে ঝুঁকে পড়ে আমি ফোঁপাই। আমি আমার জীবনে কখনো এভাবে কাঁদিনি। উষ্ণ অশ্রুর বন্যা বয়ে যায়। আমার মনে পড়ে দাদী মরে যাওয়ার পর আমি ঠিকমতো কাঁদিনি। আমার মনে হয় জীবনে অনেক কিছুর জন্য কেঁদেছি কিন্তু একটা বিশেষ কিছুর জন্য আমি তো কাঁদিনি কখনো।

হঠাৎ উপরের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই একটি খোলা উজ্জ্বল জানালা দিয়ে সাদা বাষ্প বের হচ্ছে। শুনতে পাই ভেতর থেকে কাজের সুমধুর শব্দ ভেসে আসছে। স্যুপের বলকের শব্দ,  ছুড়ি, পাতিল এবং তাওয়াগুলো ঝনঝন করছে।

সেটা ছিল একটা রান্নাঘর।

ধাঁধায় পড়ে যাই, কিভাবে আমার এমন তীব্র হতাশা থেকে এমন চমৎকার ভালো লাগা শুরু হতে পারে। আমি দাঁড়িয়ে পড়ে আমার স্কার্টটা ঠিক করে তানাবেদের বাসার দিকে রওয়ানা হই আর ঈশ্বরদের অনুরোধ করি, “দয়া করে আমাকে বাঁচতে দিন।”

 

ফেরার পর আমি ইউচিকে ঘোষণা দেয়ার মতো বলি, “আমার ঘুম পাচ্ছে,” এবং বিছানায় চলে যাই। সেটা ছিল একটি বিস্ময়কর ক্লান্তিকর দিন। কিন্তু অনেক কান্নাকাটির পর হাল্কা হয়ে আমি সেদিন বাচ্চাদের মতো ঘুমাই। ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার আগে আমার মস্তিষ্কের কিছু জেগে থাকা অংশ দিয়ে ইউচিকে বলতে শুনি, “তুমি কি আসলেই ঘুমিয়ে পড়েছ?”

আমি মূলত একটি স্বপ্ন দেখি…

দেখি যে এপার্টমেন্টটা সেদিন ছেড়ে এসেছিলাম সেই এপার্টমেন্টের রান্নাঘরের কলের বেসিন পরিষ্কার করছি আমি। আমাকে স্মৃতিতাড়িত করছে সেই বাসার হলদে সবজে টালি। যখন সেখানে থাকতাম রঙটা আমার মোটেও পছন্দ হয় নি, কিন্তু বাসাটা ছেড়ে দেয়ার পর সেই টালিই আমার সবচেয়ে ভালোবাসার বস্তু হয়ে উঠেছে।

আমি খেয়াল করি,  রান্নাঘরের তাকগুলো এবং চাকাওয়ালা ট্রলিটা অকাজের হয়ে গেছে। তবে সবকিছু অনেক আগেই বাঁধা-ছাঁদা হয়ে গিয়েছে। তখন আমি খেয়াল করি, ইউচি একটি মপ দিয়ে মেঝে পরিষ্কার করছে। আমি হাফ ছাড়ি।

“আসো একটু জিরোই। আসো একটু চা খাই।”

আমার কণ্ঠ শূন্য ঘরে প্রতিধ্বনি তৈরি করে।

ইউচি চোখ তুলে বলে,  “অবশ্যই।”

ভাবি, অন্যের বাড়িতে এসে নিজ থেকে এমন পরিশ্রমের কাজ করা ইউচিকেই মানায়। আমি তাকে গ্লাসে করে চা এনে দেই। সে মেঝেতে একটা বালিশের উপর বসে বলে বলে, “তাহলে এটাই তোমার রান্নাঘর? খুব ভালো ছিল মনে হচ্ছে।”

আমি চা পানের অনুষ্ঠানের মতো একটি বাটি দুই হাত দিয়ে ধরে চা পান করি আর বলি, “হুম তেমনই ছিল।”

খেয়াল করে দেখি দেয়ালে ঘড়ি না কেবল ঘড়ির রেখাটা ছিল। আমি ইউচিকে জিজ্ঞেস করি, “কয়টা বাজে?”

ইউচি বলে, “মনে হচ্ছে মধ্যরাত।”

“কিভাবে বুঝলে?”

“বাইরে যেমন অন্ধকার, তেমন শান্ত।”

তারপর ইউচি বলে, “যে প্রসঙ্গে কথা বলছিলাম সে প্রসঙ্গে আসি। আচ্ছা তুমি কি আমাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে চাচ্ছ?  সত্যি বল?”

আমি তার কথা কিছুই বুঝতে পারি না। কারণ এগুলো তার আগের কথার ধারাবাহিক কথা নয়।

“তুমি হয়ত ভাব আমিও এরিকোর মতো ঝোঁকের মাথায় চলি। কিন্তু তোমাকে আমার বাসায় আমন্ত্রণ আমি খুব ভেবে চিন্তেই করেছি। তোমার দাদী সবসময় তোমাকে নিয়ে ভাবতেন এবং খুব সম্ভবত আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে ওই ব্যাপারটা সেভাবে অনুভব করতে পারি। আমি জানি তুমি যখন সেরে উঠবে সব কাটিয়ে উঠতে পারবে, তখন তুমি যা করবে বুঝে-শুনেই করবে। কিন্তু এখন চলে যাওয়াটা ভুল হবে। আমি ছাড়া কেউ নেই যে তোমাকে কথাটা বলতে পারে। আমার মা এত কষ্ট করে যে টাকাপয়সা জমায়, তা কিসের জন্য?  এরকম সময়ের জন্যেই তো। কেবল জুসার কেনার জন্য না।”

সে হেসে আরও বলে, “দয়া করে আমাদের সাথে থাকো এবং কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করো না।”

সে আমার চোখে সোজাসুজি তাকিয়ে একপৃথিবী নিষ্ঠার সাথে কথাগুলো বলে এবং এমনভাবে বলে যেমন করে একজন খুনিকে তার দায় স্বীকার করানোর জন্য ছলচাতুরির আশ্রয় নিতে হয়। আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাই। সে বলে, “ঠিক আছে আমি মেঝেটা পরিষ্কার করে শেষ করি।”

আমি যখন চায়ের কাপ ও আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র ধুতে থাকি,  শুনতে পাই ইউচি গান গাইছে। তার কণ্ঠস্বর কলের পানির শব্দের সাথে মিশে যায়।

“চাঁদের ছায়াকে বিব্রত না করতে

আমি নৌকাটা নদীর কিনারে রেখে দিলাম।”

আমি বলি, “ওহ!গানটা আমি জানি। কি যেন নাম গানটার,  কে যেন গেয়েছে? আমার ভীষণ ভালো লাগে।”

ইউচি হেসে বলে, “উমম…মোমোকো সা কুচি। এটা তোমাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয় তাই না?”

আমি সিঙ্ক ঘষতে থাকি আর ইউচি মেঝে পরিষ্কার করে। আমরা এক সাথে গান গাই। মধ্যরাতে নিজেদের কণ্ঠ নিস্তব্ধ রান্নাঘরে শুনতে পেয়ে দারুণ ভালো লাগে।

অন্তরাটা গেয়ে আমি বলি, আমি আসলেই এই অংশটা বেশি ভালোবাসি,

“আমাদের দুজনের কিছু দূরে

একটা বাতিঘর আলো ছড়ায়,

ঘুরে ঘুরে যাওয়া আলোটা

যেন সূর্যের আলো গাছের পাতায়।”

আমাদের ফুসফুসের গোঁড়া থেকে প্রবল উদ্যম শ্বাস নিয়ে দ্বিতীয় স্তবকটি আমরা আবার গাই।

“আমাদের দুজনের কিছু দূরে

একটা বাতিঘর আলো ছড়ায়,

ঘুরে ঘুরে যাওয়া আলোটা

যেন সূর্যের আলো গাছের পাতায়।”

হঠাৎ আমি চিৎকার করে উঠি, “থামো, দাঁড়াও। আমরা পাশের ঘরে দাদীকে জাগিয়ে দিচ্ছিনা তো?”

আমি তখন ভাবি আমার কাজ শেষ। মনে হয় ইউচিও তাই ভাবছে। আচমকা ইউচি মেঝে ঘষা থামিয়ে আমার দিকে তাকায়, তার চোখে অস্থিরতা ছিল। অস্বস্তিতে আমি হাসতে চেষ্টা করি।

এরিকোর ক্লীবের মতো বড় করে তোলা ছেলেটাকে হঠাৎ সুপুরুষের মতো আচরণ করতে দেখা যায়। পরিচ্ছন্নতার কাজটি শেষ করার পর সে বলে, “মনে হচ্ছে পার্কের র‍্যামেন নুডলসের দোকানে থেমেছি, আমি খাবো।”

আমি হঠাৎ চমকে উঠি।

এটা সত্যি, আমি এত তাড়াতাড়ি ঘুমাই না। কিন্তু সেটাই একমাত্র কারণ নয়। অদ্ভুত স্বপ্নটার কথা ভাবতে ভাবতে আমি রান্নাঘরে পানি খেতে যাই। আমার হৃদয় ঠাণ্ডা হয়ে থাকে। এরিকো তখনও ফেরেনি, রাত দুটা বাজে। তখনও স্বপ্নের আবেশটা তাজা। স্টেইনলেস স্টিলের বেসিনে পানি পরার শব্দ শুনে চমকে যাই।  মনে হয় আমি তখনো সিংক ঘষা-মাজা করছি।

ভয়াবহ নীরব একটা রাত। মনে হয় আমি স্বর্গের চারপাশে ঘুরতে থাকা তারাদের শব্দ পাচ্ছি। আমার শুষ্ক হৃদয় পুরোটা পানি শুষে নেয়। আমার চপ্পলের উপর আমার খালি পা কাঁপতে থাকে।

“কি অবস্থা?”

পেছন থেকে ইউচি আমাকে চমকে দেয়।

“কি-কি?” আমি পেছন ফিরে বলি।

সে বলে, “আমার মাত্র ঘুম ভাঙলো ,মনে পড়ল আমি কিছু খাই নি। ভাবলাম র‍্যামেন নুডলস বানিয়ে খাই।”

আমার স্বপ্নে দেখতে যেমন ছিল তেমন না। বাস্তবে ইউচি ঘুম জড়ানো আধো আধো ভাবে কথা বলে। তার মুখ ঘুমে ফোলা। বুঝতে পারি সন্ধ্যার কান্না-কাটির কারণে আমার নিজের মুখও ফোলা। আমি বলি, “আমি তোমাকে বানিয়ে দিচ্ছি। আমার সোফায় বস।”

“তোমার সোফা! সেরেছে!”

সে সোফায় হোঁচট খেয়ে বসে। রান্নাঘরের আলোয় ছোট কামড়াটার অন্ধকার তার স্বরূপ হারায়। আমি ফ্রিজ খুলে সবজি বের করে কাটি। আমার সেই প্রিয় জায়গায় হঠাৎ ভাবি, র‍্যামেন! আহা, কী যে কাকতাল! পেছনে না ফিরেই আমি মজা করে বলি, “আমার স্বপ্নে তুমি র‍্যামেন খেতে চেয়েছিলে।”

এবার আমি তাকে বাকি স্বপ্নটাও বলি। কোন সাড়া পাওয়া যায় না। ঘুমিয়ে পড়ল কিনা আবার ঘুরে দেখতে তাকিয়ে দেখি, ইউচি আমার ঠিক পেছনে। আমি বলি, “আমার…আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।”

“তোমার রান্নাঘরের মেঝের রঙ কি হলদে সবুজ? আজব তো।”

“হ্যাঁ অদ্ভুত ছিল দেখতে। সেটা মুছে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।”

“এতক্ষণে আমার ঘুম ভেঙেছে পুরোপুরি।”

সহজ হতে কিছুটা সময় নেয়ার জন্য লজ্জিত কণ্ঠে বলেছিল ইউচি।

আমি বলেছিলাম, “কিন্তু আমি আসলেই তোমাকে চা বানিয়ে খাওয়াবো। কিন্তু কাপে না।”

“তুমি বানাবে? সাথে কিছু জুস হলে কেমন হয়, তুমি খাবে?”

“অবশ্যই।”

ইউচি ফ্রিজ থেকে কিছু আঙুর নিয়ে খুশিমনে বাক্স থেকে জুসারটা বের করে। রাতের নিস্তব্ধতার সাথে মেশিনটির বেমানান ঘরঘর শব্দের সাথে তাল রেখে আমি ফুটন্ত পানিতে নুডলস ছেড়ে দিই।

ততক্ষণ পর্যন্ত যা যা ঘটে তা ছিল একেবারে অসাধারণ কিছু। সত্যিই তাই, সেটা একইসাথে অলৌকিক এবং একইসাথে জগতের সবচেয়ে লৌকিক ঘটনা।

আমি আমার হৃদয়ে সেই অনুভূতিটা ধরে রাখি। সেটা নিয়ে তর্ক করার আর ইচ্ছা হয় না। পৃথিবীতে সব সময় এমনটাই হয়। বিভিন্ন রাতের, বিভিন্ন সকালের, বর্তমান মুহূর্তের অবিরাম পুনরাবৃত্তিই হয়ত স্বপ্ন হয়ে দেখা দেয়।

 

 

 

 

একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ এরিকো গতানুগতিক প্রসঙ্গের বাইরে বলে,

“একজন মহিলা হওয়া সহজ ব্যাপার না।”

আমি ম্যাগাজিন থেকে আমার নাক উঠাই,

“হুম।”

কাজে যাওয়ার আগে সুদর্শনা এরিকো গাছে পানি দেয় আর বলে,

“যেহেতু তোমার উপর আমার অগাধ বিশ্বাস তাই আমার মনে হয়েছে তোমাকে কিছু কথা বলা উচিত। ইউচিকে বড় করতে করতে আমি এসব শিখেছি। ঈশ্বর জানেন অনেক অনেক কঠিন সময় গিয়েছে। কেউ যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায় তবে তাকে আমি পরামর্শ দেই কারও ভরণ-পোষণ বাঁ খাদ্যের ব্যবস্থা করতে। এটা হতে পারে শিশু কিংবা বাড়ির গাছ।জানো? এই কাজ করার সময় তুমি বুঝতে পারবে তোমার সীমাবদ্ধতা।এবং ঠিক সেখানেই শিক্ষাটা শুরু হবে।”

ভজন গাওয়ার মতোই সে তার জীবনের দর্শন আমাকে শুনায়। আমি নড়েচড়ে বলি,

“জীবন অনেক কঠিন হয়ে যায়।”

“হ্যা। কিন্তু কোন মানুষ যদি তার জীবনে সত্যিকারের হতাশার মুখোমুখি না হয়। তাহলে তার বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করার যোগ্যতা অর্জন না করেই তার কেবল বয়স বাড়ে। বুঝতেই পারে না আসলে আনন্দ কি। আমি এ ব্যাপারে কৃতজ্ঞ।”

তার চুল তার কাঁধ জুড়ে দোল খায়। যখন বহুদিনের নানান সমস্যা মনকে অসুস্থ করে তোলে, যখন জীবনের আগত পথ এতই দুরারোহ মনে হয় যে,  সেদিকে তাকাতেও ভয় লাগে তখন কিছুই একজন মানুষকে উদ্ধার করতে পারে না, ভালোবাসাও না। তখনও পূর্ব দিক থেকে আগত গোধূলির আলোয় মুড়ে সে সেখানে আছে, তার সুতনু আশির্বাদ পুষ্ট হাতগুলো দিয়ে সে গাছে পানি দিচ্ছে। গোধূলির আলোয় সেই স্বচ্ছ জলধারাকে লাগে রংধনুর মতো। আমি বলি,

“আমার মনে হয় আমি বুঝি”।

“আমি তোমার সৎ হৃদয়কে ভালোবাসি, মিকাগে।  তোমাকে বড় করেছেন তোমার দাদী, তিনি নিশ্চয়ই একজন চমৎকার মানুষ ছিলেন।”

“হ্যাঁ তেমনই ছিলেন তিনি।”

আমি হেসে বলি।

আমার দিকে ফিরে এরিকো হেসে হেসে বলে,

“তুমি বেশ ভাগ্যবতী।”

ম্যাগাজিন থেকে মুখ ফিরিয়ে আমি ভাবি;  একদিন আমাকে এখান থেকে বের হয়ে যেতে হবে। হয়ত সেটা খুব কঠিন কিছু হবে তবুও আমাকে তা করতেই হবে। কোন একদিন আমি কি অন্য কোথায় থাকব এবং এখানে থাকার স্মৃতি মনে করে ভাবালুতায় ভুগবো? নাকি আমি কি আবার এই রান্নাঘরে ফিরে আসব? কিন্তু এই মূহুর্তে আমি এই শক্তিশালী মা এবং ভদ্র চোখের ছেলের সাথে আছি আর এটাই সব।

আমার বয়স বাড়ছে, আরও বাড়বে। নানান অভিজ্ঞতা হবে। আমি বার বার পাথরে টক্কর খাবো। বার বার আমি পরে যাবো, বার বার উঠে দাঁড়াবো। আমি হেরে যাবো না। আমি আমার সাহস হারাবো না।

 

 

 

রান্নাঘরের স্বপ্ন ,

আমার হৃদয়ের গহীনে, বাস্তবে অসংখ্য বার আমি সেই স্বপ্ন দেখে যাব কিংবা আমার ভ্রমণে, একাকীত্বে,  মানুষের ভিড়ে, অন্য কোন একজনের সাথে বা সকল জায়গাগুলো যেখানে যেখানে আমি থাকব। আমি জানি সেখানে আরও আরও অনেক স্বপ্ন দেখবো, দেখেই যাব।

 

(প্রথম পর্ব সমাপ্ত)

 

 

 

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close