Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ অণুগল্প বারিষওয়ালা > অণুগল্প >> চিত্রালী ভট্টাচার্য

বারিষওয়ালা > অণুগল্প >> চিত্রালী ভট্টাচার্য

প্রকাশঃ June 23, 2017

বারিষওয়ালা > অণুগল্প >> চিত্রালী ভট্টাচার্য
0
0

একটা বহুমাত্রিক জীবন যাপনের জন্য এ শহর আর্দশ– অন্তত নীলের তাই অভিমত।  আয়তাকার কাচের স্বচ্ছ একোরিয়ামে যেমন রঙীন মাছেরা নিশ্চিন্তে খেলে বেড়ায়, এ শহর তেমনই তার নাগরিকদের জন্য আপাত র্নিলিপ্ত কিন্তু নিরাপদ একটা পরিষেবা দিতে তৎপর। কাচের ভঙ্গুরতা নিয়ে এখানে কেউ লেশমাত্র শঙ্কিত নয় বরং ব্যস্ত থাকে বুদবুদে। ওঠে- নামে, মেতে থাকে বাজারু সুখে, যেন এক সরলরৈখিক সমাধান। ভাললাগে নীলের। এরমধ্যে সেও বেঁচে থাকে তার নিজস্বতায়। একা কিন্তু একাকিত্বের বোধহীন ব্যস্ততায়। মাঝে-মাঝে বিষন্ন ঈগল আসে, ছোঁ মেরে নিয়ে যায় অর্জিত সুখ কিন্তু তাতে ও বিশেষ বিকারগ্রস্ত হয় না। অভ্যেস একটা বড় বিকল্প তা বহু কষ্টে জেনেছে নীল, সেভাবেই একদিন রপ্ত হয়ে গেছে সব। অনেকে আড়ালে তাকে আয়রনম্যান বলে, জানে নীল, ভ্রুক্ষেপ করে না ।

তবে ইদানিং কিছু কিছু সমস্যা খুব বিব্রত করছে। আবেগহীনতা থেকে জন্ম নিচ্ছে অতীতকে ভুলে যাওয়ার এক অদ্ভুত প্রবণতা। আজকাল কিচ্ছু মনে পড়ে না নীলের, কিচ্ছু না। যেন সে এক রুক্ষ বাস্তব যার কোনো ছেলেবেলা নেই, কৈশোর নেই, বয়ঃসন্ধি নেই। মাঝে-মাঝে এ বোধ অসহ্য মনে হয় তখন ও অস্থির হয়ে বেড়িয়ে পড়ে এদিক-ওদিক ।

আজ তেমনি একটা অসহ্য মুর্হূতকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য নীল ঝিলের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়াল। হঠাৎ একটা গান। খুব চেনা! গানের প্রতিটা কথা যেন আগেও বহুবার শুনেছে।  বাতাসে অনুরণিত হতে হতে সে গান তার প্রতিটা শব্দ সমেত যেন সোজা পাঁজরে এসে ধাক্কা মারছে। কে গাইছে? নীল দূরের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল লেকের ধারের বেঞ্চে বসে একজন  খুব নিচুস্বরে গাইছে—আওয়ারা হু, ইয়্যা গর্দিশ মে হু / আসমান কা তারা হু…

লোকটাকে চেনে নীল। কি যেন নাম? ও হ্যাঁ, ব্রিজ। পুরো নামটা জানা নেই, হয়ত ব্রজমোহন-টোহন ছিল, কেটে-ছেঁটে এখন ব্রিজ। গলার স্বরে কী যেন একটা আছে, শুনলে অদ্ভুত একটা ধূসরতা গ্রাস করে। লোকটা সম্পর্কে বিস্তর গসিপ আছে বাজারে। হঠাত্‌ একদিন কোথা থেকে এসে এখানে বাস করতে শুরু করেছে। এসব লোকেরা বরাবরই সন্দেহের তালিকায় থাকে। সে সব গসিপ আর গান, এ দুয়ে মিলে বরাবরই লোকটা নীলের কৌতুহলের কেন্দ্রে। আজ সুযোগ বুঝে সে কৌতুহলটুকু মেটাতেই এগিয়ে এসে বসে ওর পাশে, শরীর এলিয়ে দিয়ে শুনতে থাকে ওর গান।

পাশে অন্যকারুর উপস্থিতি টের পেয়েও লোকটা চোখ খোলে না, তন্ময় হয়ে গাইতে থাকে—আবাদ নহি, বরবাদ নহি, / হামসে কিসিকা প্যার নহি…

বিকেলের পড়ে আসা আলো তখন ঝিলের জলে তেরছা। এই প্রেক্ষাপটে ব্রিজের গান ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন করতে শুরু করে নীলকে, নীলও সতর্ক। কোনোরকম মায়াবী খেলায় ওর বিশ্বাস নেই, সে  নারী হোক বা গান। বুকপকেট থেকে সিগারেট বার করে ধরায় ও। ধোঁয়ায় উড়িয়ে দিতে চায় মায়া-মেঘ। বার বার। কিন্তু কী আশ্চর্য! ক্রমশ ঘন হয়ে উঠতে থাকে সে মেঘ। অতীতের  জলকণারা একে অপরের সঙ্গে মিশে একেবারে কেলেঙ্কারি! ওঃ, চোখ ভিজে ওঠে অকাল বৃষ্টিতে।

নিজের আচরণই অবিশ্বাস্য ঠেকে নিজেরই কাছে।

ঠিক সেই ক্রুসিয়াল মুহূর্তে ব্রিজ গান বদলায়- এ দৌলত ভি লে লো/ এ সোহরত ভি লে লো/ ভলে ছিন লো মুঝসে মেরি যবানি/ মগর মুঝকো লৌটা দো বচপন কা শাওন/ ও কাগজ কি  কস্তি ও বারিষ কা পানি…। আরে এসব গান তো ওর বাবা…! অমনি হুর হুর করে নীলের মনে  পড়তে থাকে ওর শিশুবেলা, কৈশোর, উন্মত্ত কাশ্মীরে ওদের পালিয়ে বেড়ানোর দিন, চোখের সামনে বোমের আঘাতে ঝলসে যাওয়া ওর মায়ের মুখ, ছোট্ট ভাইটাকে হারিয়ে ফেলা, বাবার হাত ধরে ত্রানশিবির। তারপর? তারপর? তারপরই তো মেঘে মেঘে আচ্ছন্ন সব। কিভাবে শুরু হল ওর বর্তমান শহুরে জীবন? এই শহরে ওর কিভাবে ঠাঁই হল! সেসব অদ্ভুত  রহস্যে ঢাকা। এখন কে ফিরিয়ে দেবে ওর বচপন কা শাওন? ও কাগজ কে কস্তি? ও বারিষ কা পানি? – এই প্রশ্নে আজ বহুদিন পর মনের মধ্যে জমে থাকা মেঘ বৃষ্টি হতে চাইছে, তাকে কি করে আটকাবে নীল!

কিন্তু কে এই লোকটা? ওর কি খুব চেনা কেউ! নাকি কোন দুরভিসন্ধি! নীল মুখ তুলে প্রশ্ন করে—কৌন হো তুম?

লোকটা মৃদু হাসে, উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে মুখ ঘুরিয়ে বলে– বারিষওয়ালা।

কথাটা বলতেই নীলের মনে পড়ে যায় লোকটার আসল পরিচয়। হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই লোকটাইতো! প্রতিটা অ্যাকসনের আগে যে বলতো—বারিষওয়ালা আ গয়া, আজ জমকর বর্যেগা। এটা ওর কোড ল্যাঙ্গুয়েজ। লোকটা এখানে কি করছে! সর্বনাশ তাহলে কি ও এই শহরেও!

নীল তাড়াতাড়ি পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে কল করে… হ্যালো,হ্যালো…লালবাজার…হ্যাঁ,…ইনফর্মার নীল বলছি স্যার… হ্যাঁ, হ্যাঁ স্যার…লোকটাকে ট্রেস করা গেছে…হ্যাঁ—হ্যাঁ…কোডনেম….বারিষওয়ালা স্যার…ইয়েস—ইয়েস—স্যার…বারিষ…বারিষ…বৃষ্টি…বৃষ্টি….হ্যাঁ স্যার…আমি এখন তিলজলার কাছাকাছি…ঠিক আছে…ও কে্‌…ও কে স্যার…।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close