Home ছোটগল্প বিতস্তা ঘোষাল > আমার আমি >> ছোটগল্প

বিতস্তা ঘোষাল > আমার আমি >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ February 21, 2018

বিতস্তা ঘোষাল > আমার আমি >> ছোটগল্প
0
0

বিতস্তা ঘোষাল > আমার আমি >> ছোটগল্প

 

ভিড়ের ভেতরে দাঁড়িয়েছিল অরূপ। সাধারণত সে ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে চলে। এটা তার স্বভাব। অথচ আজকাল এত ভিড় যে তা এড়িয়ে চলা  মুশকিল। পুরো শহরটাই মনে হয় যেন ভিড়ের পদ্মপাতার ওপর ভাসছে। ক্রমাগত নড়ে চলেছে অগুনতি মাথার মানুষ। ছুটে চলেছে মানুষের চালিত গাড়ি। অথচ অরূপের ভেতরে ছেলেবেলা থেকেই নির্জনতা তার দাঁত বসিয়ে রেখেছে। সে-দাঁতের কামড় বড় গভীর। বাইরে থেকে অবশ্য এ-কামড় চোখে দেখা যায় না। যে এর ভুক্তভোগী সেই শুধু জানে। এতো লোকজন, এতো অস্থিরতা সে একদম পছন্দ  না। তার মনের গভীরে সর্বদাই কে যেন এক উদাসী বাউলের গান গেয়ে চলেছে। এর জন্যে আত্মীয়স্বজন এমনকি নিজের স্ত্রীর কাছ থেকেও সে কথা  শুনে চলেছে প্রতিদিন। দশজন মানুষের ভেতরে নিজের স্বামীটিকে কে না খুব বড় করে দেখতে চায়। কিন্তু মায়ার কপাল খারাপ। এমন মানুষের সাথে তার ভাগ্যের গাঁটছড়া বাঁধা হয়েছে, যে কেবলি নির্জনতা খোঁজে। কোনোরকমে অফিসের কাজটুকু শেষ হলেই সে বাড়ি এসে কিছুক্ষণ নীরবে টেলিভিশন দেখে নিজের ঘরে গিয়ে বই নিয়ে বসে। খাবার টেবিলেও তার কোনো হুঁ-হাঁ নেই। রান্না ভালো না খারাপ, কড়া না হালকা, মিষ্টি না ঝাল –কোনো প্রতিক্রিয়াই নেই তার।
এরকম একজন স্বামীকে ক’জন মেয়ে ভালোবাসতে পারে দীর্ঘদিন, যেখানে সুখী সংসারও জীবনের একঘেয়েমির হাত এড়াতে মাঝে মাঝে বিদ্রোহ করে বসে?
এভাবে পাঁচ মাথার মোড়ে তার দাঁড়িয়ে থাকার কথা নয়। কিন্তু আজ তার অফিসের গাড়ি নেই। গাড়ি সার্ভিসিং-এ গেছে। তার বদলে অন্য কোনো গাড়ির ব্যবস্থা করা যায়নি। তাই মেট্রো থেকে নেমে ক্যাব বা বাস- ই ভরসা। কিন্তু  অফিস ছুটির মুখে, কোনো গাড়িতেই সে ঠিকমতো উঠতে পারছে না।  এমন যানজট যার হাত থেকে নিস্তার পাওয়া খুব কঠিন। গাড়ি,বাস ট্রাম… সব মিলে এক জগাখিচুড়ি অবস্থা। পাঁচটা রাস্তাতেই অজস্র মানুষের ভিড় ।যেন মেলা বসেছে । আর গরম কী! রাস্তা ফুঁড়ে  পিচের ফালি উঠে আসছে এখনো। দুপুরের গনগনে সূর্য রাস্তাটাকে এমন ক্ষিপ্ত করে দিয়ে গেছে যে, তার রেশ  রাস্তা থেকে মিলিয়ে যায়নি। পাঁচ মাথার মোড়ের ঘোড়াটা- যেন লাল হয়ে গনগন করছে তাপে। এই অবস্থায় অরূপ রাস্তাই বা কীভাবে পার হবে? এমন যদি হতো, সে এই টুকু  পথ  উড়ে পার হয়ে চলে যেতে পারত ওই ঘোড়াটার পিঠের সওয়ারি হয়ে, কিন্তু সেটা সম্ভব না। যেমন সম্ভব না মায়ার কথার হুল ফোটানো প্রবণতার হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া। কাল রাতেও মায়া তার বুকে ধাক্কা মেরে চেঁচিয়ে উঠে বলেছে, তুমি পুরুষ নাকি? আমার তো সন্দেহ হয়।

কাল রাত্তিরে তার শরীরটা ভালো ছিল না। মনও বিনা কারণেই ছিল মলিন। এরকম তার আজকাল মাঝে মাঝে হয়। এটা কী বয়সের লক্ষণ নাকি মনের রোগ সে জানে না। বয়স তার পয়ঁত্রিশ চলছে। সেই হিসাবে এমন কী আর বয়স। মায়া তার চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট। তার শরীরের ক্ষিধে অনেক বেশি। একটা বাচ্চা হয়েছে, তবু তার পরও তার শরীরের ক্ষিধের কোনো কমতি নেই। এটা একজন মেয়ের জন্যে ভালো  না খারাপ, তা অরূপ জানে না।

তবে সে  আজকাল মায়াকে ভয় পায়। বিশেষ করে রাতের বেলা তার সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমোতে তার ভয় লাগে। কেন এই ভয়? সে জানে না। অথচ মায়া যেদিন তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে সে গোপনে মৈথুন করে একা-একাই । তখন তার ভয় লাগে না, পুলকের কোনো কমতি হয় না! তবে কি সে সমকামী? কথাটা ভেবে মাঝে মাঝে তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।

শুধু গাড়ির ভিড় না, মানুষের ভিড়ই বা কম কী? একটা মানুষজট বেঁধে গেছে এর মধ্যেই। কে কাকে ধাক্কা দিয়ে আগে
রাস্তা পার হবে সেই মকশো চলছে। এরই ভেতরে ভিখিরি, পাগলা, ফেরিওলা, চা-বিক্রেতা,কাগজওয়ালা তাদের রমারম ব্যবসা শুরু করেছে। গরমে, ঘামে, চিৎকার, গালাগালিতে নরক গুলজার। মনে হচ্ছে শহরের কোনো রথী-মহারথী এই মুহূর্তে পার হবে রাস্তা। তার জন্যে তৈরি করা হয়েছে নিরাপদ এবং নির্বিঘ্ন এক সড়কপথ। তিনি চলে গেলেই আবার সবকিছু সবেগে নড়েচড়ে উঠে সপ্রাণ ও সচল হয়ে উঠবে।
এমনই একমুহূর্তে  ভিড়ের ভেতর থেকে সাদা জামা প্যান্ট পরা একজন মধ্যবয়সী মানুষ হঠাৎ দুহাতে ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলো অরূপের কাছে। এতো কাছে যে, তার নাকের গরম নিশ্বাস এসে পড়ল অরূপেরর ঘাড়ে। ঘাড়টা যেন জ্বলে গেল তার। লোকটার সঙ্গ এড়াতে সে সরে যাওয়ার আগেই লোকটা তার খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফ নেড়ে চোখ পাকিয়ে তার চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বলে উঠল, আপনি কে?  খুব বিরক্তি লাগল অরূপের। এটা কী ধরনের প্রশ্ন? তার ওপর লোকটাকে সে চেনে না, জানে না। কিন্তু মুখ থেকে কোনো বাক্য বের করার আগেই যেন লোকটা ভোজবাজির মতন মিলিয়ে গেল তার চোখের সামনে থেকে। খুব সম্ভব সে ভিড় ঠেলে ঢুকে গেল আরো ভেতরে।
অবাক হয়ে, কিছুটা বা স্তম্ভিত হয়ে সে দাঁড়িয়ে থাকল রাস্তায়। হঠাৎ করে বাক্‌রোধ হলো তার। নড়চড়াও বন্ধ হলো। অন্যদের চলন্ত গতি থেকে যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল সে। যেন তার চোখের সামনে দিয়ে গাড়ি চলে যাচ্ছে। আর সে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে  তাকিয়ে দেখছে তার চলে যাওয়া। অথচ একটু আগেই সে নিজেই এই গাড়ির একজন যাত্রী ছিল। বাজে একটা অনুভূতি হতে লাগল তার ভেতরে।
সময়টা তখন সন্ধ্যের মুখে। অনেকেই ঘরমুখো। কেউ বা কোনো না কোনো কাজে যাচ্ছে। পথ তো মানুষের জীবনে দিকনির্দেশনার কাজ করে সকলের অলক্ষে, অরূপ ভাবল। সেইমতো তার দিকনির্দেশনাও ঠিক ছিল, কারণ সে জানত সে বাড়ি যাচ্ছে। সেই বাড়ি যেখানে আছে তার স্ত্রী মায়া। আছে তার দেড় বছরের মেয়ে ডোনা।  বিয়ের আগে মায়াকে চোখে দেখেনি সে। তবে তার ফটো দেখেছিল। সেই ফটো দেখে তার মনের ভেতরে এক ধরনের গা-শিরশির আনন্দও হয়েছিল।

বিয়ের আগের রাতে মা তাকে বলেছিলেন, মিষ্টি টুকটুকে বউ এনে দিলাম তোর হাতে,  বউয়ের যত্ন করিস বাবা।

আর ফুলশয্যার রাতে মায়া বলেছিল, আমার গায়ে বেশি হাত দেবেন না, গায়ে হাত দেওয়া আমি পছন্দ করিনা। কিন্ত তার পরেও সাহসী হয়ে স্ত্রীর শরীরে হাত রেখেছিল। তার শরীরের কুমারিত্ব ভেঙেছিল। তারপর কী যে হলো, তার যথাযথ ব্যাখ্যা তার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। যেন ঘুমন্ত- বাঘিনীকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলল সে। মায়া তার শরীরের দাবি নিয়ে হাজির হতে লাগল প্রতি রাতে। প্রথম প্রথম সে তাল রাখতে পেরেছিল। কিন্তু কিছুদিন ধরে পুরো ব্যাপারটা তার কাছে একটা ক্লান্তি এবং পুনরাবৃত্তির ঘটনায় রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। ভেবেছিল সন্তান হওয়ার পরে মায়ার ভেতরে হয়তো পরিবর্তন দেখা যাবে। কিন্তু তার কোনো নিশানা এখন অব্দি দেখা যাচ্ছে না। এটা তার জন্যে একটা ভাবার বিষয় হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। কিন্তু ভাবনাটা গোপন। এবং কিছুটা বা অপরাধবোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

আপনি কে? কথাটা তার বুকের ভেতরে যেন জোরে ধাক্কা দিয়ে গেল। তাই তো, অরূপ আসলেই কে? সে কি ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ পাশ করা, একটা বিদেশি ফার্মে চাকরি করতে ঢোকা মাঝারি গোছের একজন বিবাহিত অফিসার, যে নাকি এক সন্তানের জনক ও মোটামুটিভাবে সুখী একটি পরিবারের প্রতিভূ, নাকি তার আরো একটা পরিচয় আছে, যে-পরিচয় এইসব পরিচয়ের চেয়েও আরো বেশি দরকারি এবং মূল্যবান ও বিশেষ একটি সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত। অথবা সে-পরিচয় জটিল কোনো অঙ্কের মতো ধাঁধা সৃষ্টি করতে সামর্থ যা অস্তিত্বের নিগূঢ় কোনো কুহেলিকার জড় ধরে টান দেয়। অথবা সে-সৃষ্টির আদির এককোষী থেকে বহুকোষীর কোনো নিমজ্জিত সত্তা। বহু প্রাকৃতিক দরকষাকষি এবং ভাঙচুরের ফলে বর্তমানের এই রূপান্তর।
কথাগুলো এই পড়ন্ত বিকেলের অজস্র জ্বলে ওঠা নিয়নের আলোর মাঝে যেন পাথরের চাঙড় ভাঙতে লাগল তার মাথার ভেতরে।
রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল অরূপ। চারদিকে এতো উত্তেজনা। এতো লোকজন। এতো গাড়ি। এতো রকমের হত্যা এবং আত্মহত্যা। এতো রকমের মুখের মিছিল। গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদের এতো রকমের ঘাম এবং সেই ঘামের ভেতর থেকে এতো রকমের দুর্গন্ধ। রাস্তার ধারেই বিরাট এক ওষুধের দোকান  যেন বুক চিতিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে-থাকা অরূপেরর মজা দেখছে। অথচ সে এখন মজার ভেতরে নেই। এখন সে গভীর এক চিন্তায় ক্রমশ নিমগ্ন হয়ে যাচ্ছে।

অরূপ জানে, সে দেখতে ভালো না। কোনোরকমের চলনসই গোছের চেহারা তার। তাই তার কোনো বাল্যপ্রেমও নেই, যা নিয়ে সে নিভৃতে কখনো আপনমনে জাবর কাটতে পারে। সেই হিসেবে, সে একবারে বৈশিষ্টহীন যাচ্ছেতাই গোছের একজন মানুষ। তার কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। এমনকি তার কোনো দৃঢ় ধর্মীয় বিশ্বাসও নেই। কোনো মন্দির মসজিদ চার্চ তার আগ্রহের বিষয় নয়। সে যেন এ-সমাজের এক আগাছা হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। কখনো এদিক, কখনো বা ওদিক। তার বন্ধু-বান্ধব? সেদিকেও সে খুব বেশি অগ্রসর হতে পারেনি। সে জানে, অবশ্য তার কোনো বিশেষ বন্ধু নেই, এটা যেরকম সত্যি, তেমনি তার কোনো শত্রুও নেই, এটাও সেরকম সত্যি।
কিন্তু এখন? অরূপের মাথার ভেতরে সন্দেহ দোলা দিতে লাগল। নাগরদোলার মতো দোলা। উঠছে, নামছে। এই পৃথিবীতে কোন মানুষ শত্রুহীন? আর কোন মানুষই বা বন্ধুহীন? সব শীতলপাটির বুননের মতো একের সঙ্গে এক । ভাবতে ভাবতে সে রাস্তার একটি কোণে এসে দাঁড়িয়েছে। এখান থেকে সবকিছু দেখা যাচ্ছে। কিন্তু  বিশেষ কেউ নজর দিচ্ছে না। নজরে আনুক এটা সে তেমন চায়ও না। তাকে এখন খুব মনোযোগের সঙ্গে একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হচ্ছে, সেটা হলো, আপনি কে?
এই পৃথিবীর সবকিছু রহস্যময়। সবকিছু পর্দার আড়ালে ঢাকা। মানুষ, প্রকৃতি, সমাজ, সংসার সবকিছু একটা জালের আড়াল থেকে যেন কাজ করে যাচ্ছে। সবকিছু একটা ধূসরতার প্রতীক। নিজের বোধের ভেতরে যা কিছু সঞ্চারিত হয়, তার ভেতরেও এক ধরনের অস্পষ্টতা যেন ঘিরে ধরে আছে নিজেকে। অরূপের নিজের ব্যাপারেও যেন তাই। সে রোজ অফিসে যায়, কাজ করে, মানুষের সঙ্গে কথা বলে, ঘরে ফিরে যায়, স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করে, বাচ্চা কোলে নেয়, আদর করে, হাসে, ভাত খায়, ঘুমোয়। এতসব কাজ করে অথচ সবকিছুর ভেতরেই এতো রকম আর এতো ধরনের অস্পষ্টতা যা বলে শেষ করা যায় না। যেন একটা খোলসের ভেতরে থেকে রুটিনমাফিক এতোগুলো কাজ সে সম্পন্ন করে চলেছে সারাদিন। যেন সে আদতেই একটা কচ্ছপ। মানুষ কচ্ছপ। বাইরে তার খুঁড়ে তোলা অলঙ্ঘনীয় প্রাচীরের সীমানা, সেই সীমানা কেউ অতিক্রম করতে পারে না। মৃত্যু হয় মানুষের, কিন্তু সীমানা ডিঙোনো হয় না।

মানুষের জীবন কেন এমন? ভাবতে ভাবতে অরূপের বুকের ভেতরে মোচড় দিতে লাগল দুঃখ। একটা তাড়নার ভেতরে সে অস্থির হয়ে পায়চারি শুরু করল। তার শরীরের প্রতিটি খণ্ডে একটা কিছু ঢেউয়ের মতো উঠতে লাগল এবং নামতে লাগল। দুঃখ, এই দুঃখটা একটা বোধ, একটা করুণার ভেতর এই বোধের জন্ম এবং মৃত্যু। আপনমনে ভাবতে লাগল সে।
এখন  সে কী করবে? আপনি কে, এই প্রশ্নের উত্তর কে তাকে এনে দেবে? নাকি এটা কোনো প্রশ্নই নয়। এটা হলো শুধুই একটা মামুলি প্রশ্ন যার উত্তর কেউ শুনতে চায় না। উত্তর দিতেও চায় না কেউ, যেহেতু এর কোনো উত্তর নেই। বরং এ-প্রশ্নের বিপরীতে মানুষের চতুর্পার্শ্বে খুঁড়ে তুলেছে কেউ দেয়াল, যা অতিক্রম করা মানুষের সাধ্য নয়। রহস্যময় এক জীব হিসেবে, এই প্রকৃতির রহস্যময়তার ভেতরেই মানুষের জীবন প্রদীপ নিভে গিয়ে তাকে হতে হবে অনন্তকালের জীবাশ্ম। এর আর কোনো ব্যতিক্রম নেই। এই প্রশ্নের উত্তর না জেনেই তাকেও  চলে যেতে হবে দূরে, অনন্তের অভিমুখে। পার হতে হবে সেই দরিয়া যা পার হওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তি তার নেই। কারণ সে সাধারণ, খুবই সাধারণ একজন মানুষ। অলৌকিকতার চাদর গায়ে দিয়ে সে এ-পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেনি।

অরূপ ভাবতে লাগল। এখন তার চারপাশে বয়ে চলেছে জীবন এবং আয়ু-হনন মৃত্যু, একইসঙ্গে হাত ধরাধরি করে। তারা তার চোখের সামনে এই মুহূর্তে নৃত্যময় আবার মুহূর্তে স্তব্ধ। সে অপেক্ষা করে উত্তর পাবার। প্রশ্নের জবাব তবু মেলে না। সে চুপ করে  দাঁড়িয়ে থাকে। প্রথমে সে দু’পায়ের ওপর দাঁড়ায়। তারপর একপায়ে। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্রমে নির্জন হয় রাস্তা। পা ব্যথা করে। তারপর আসে রাত। গুড়ি মেরে হেঁটে হেঁটে সেই রাত একসময় গভীর হয়। সুনসান হয়। গাড়িশূন্য, মানুষশূন্য হয়। কোলাহল মুখর দিনের রাস্তা রাতের এই আঁধারে যেন সব হারিয়ে রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে। পাঁচ রাস্তা যেন একইসঙ্গে সব হারিয়ে নিঃস্ব।
তখন ঘন কালো এবং নিকষ রাতের ভেতরে ভিন্ন এক ধরনের সুর শোনা যায়। সে-সুরের ইতিহাস অরূপ জানে না। কেউ তাকে তা বলেও নি। একটা বোধের ভেতরে তার উন্মীলন ঘটে, যেন এটা ঘটার জন্যেই সারাদিনের এতো কর্মকাণ্ড, এতো হইচই, এতো ঘোরপ্যাঁচ – এরকম মনে হয় তার।
এরপর তার চোখের সামনে ঘটে সেই অলৌকিক ঘটনা। রাতের অন্ধকারে পাচঁ মাথার মোড়ে লাফিয়ে নামে নেতাজীর ঘোড়া। এতোক্ষণ সে বেদীর ওপর মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল। এরকমই থাকে সে দিনের পর দিন। কিন্তু রাতের আঁধারে যে তার চেহারা পালটে যায়, এ-খবর অরূপের জানা ছিল না।  নেমে এসে সে দৌড়তে শুরু করে। কত দ্রুত ছুটছে, কি বিশাল তার সীমানা। যেন স্বর্গ থেকে নেমে  পৃথিবীর সীমানার দিকে ছুটছে।

অরূপের  চোখের সামনে অপূর্ব এক দ্যুতিময় ভঙ্গীতে সে দৌড়তে থাকে। মুহূর্তের ভেতরে  সবকিছু হয় যেন অবাস্তব আবার বাস্তবও। সবকিছু যেন স্বপ্ন আবার সত্যিও। চারপাশের বাড়িগুলোর খাঁজকাটা চমকানো নকশাবহুল জাফরি দিয়ে হু-হু করতে করতে ছুটে আসে বাতাস, তারাও আজ এই দৌড়ের অংশ। এরই ভেতরে অকস্মাৎ আকাশ থেকে নেমে আসে সাদা, স্নিগ্ধ ও সচল একটা আলো। বাতাসের ভেতরে ভেসে ভেসে নেচে নেচে আসে সেই আলো,  সেই আনন্দধারা-অভিমুখে ভেসে যেতে লাগে যুঁই, তার গন্ধের ভেতরেই জীবনের সার্থকতা। ভেসে যেতে লাগে দোলনচাঁপা, যেন তার শরীরের মাদকতার ভেতরেই জীবনের এক গভীর অনুভবের নকশিকাঁথা গায়ে মুড়ে শুয়ে আছে। এ কী, এসব কী? মনে মনে বলে ওঠে অরূপ। বলতে বলতেই যেন তার চোখ-মুখ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। বুকের ভেতরটা যেন আকাশের মতো বিস্তৃত হয়ে যায়। মাথার ভেতরে উড়তে লাগে রঙিন সব বেলুন। লাল, নীল, সবুজ। চোখের ভেতরে দোল খায় পৃথিবী। পরম সুখ এবং তৃপ্তিতে পরিবেশ ভুলে চিৎকার করে ওঠে অরূপ, তাহলে, এই হচ্ছি আমি। আমার আমি। অসংখ্য আমি আমি আমি …।
 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close