Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ অনূদিত কবিতা বিশ্বের ১৭ কবির নির্বাচিত অণুকবিতা > অনুবাদ : মুম রহমান

বিশ্বের ১৭ কবির নির্বাচিত অণুকবিতা > অনুবাদ : মুম রহমান

প্রকাশঃ June 29, 2017

বিশ্বের ১৭ কবির নির্বাচিত অণুকবিতা > অনুবাদ : মুম রহমান
0
0

বিশ্বের ১৭ কবির নির্বাচিত অণুকবিতা

কাতাল্লুস

ভালোবাসা-ঘৃণা

আমি ভালবাসি ও ঘৃণা করি, এবং কেন, তুমি হয়তো জিজ্ঞাস করবে। আমি জানি না : তবে আমি অনুভব করি আর আমি ছিন্নভিন্ন।

 

অবিচার : ননিয়াসের উপর

কেন, কাতাল্লুস? কেন মরার অপেক্ষা?

ননিয়াস , সেই টিউমার বসেছে বিচারকের আসনে,

ভ্যাটিনিয়াস  মিথ্যা শপথ করে বাণিজ্যদূতের তরে:

কেন, কাতাল্লুস? তবে কেন মৃত্যুর জন্য আর অপেক্ষা?

 

নারীর অবিশ্বস্ততা

আমার বালিকা বলিলো সে বরং বিবাহ করিবে অন্য কাউকে নয়

কেবল আমাকে,

এমনকি যদি জুপিটারও  তাকে প্রস্তাব দেয়।

সে বলিলো : কিন্তু একটি বালিকা কী বললো তার

ব্যাকুল প্রেমিককে,

তা লেখা থাকা উচিত বাতাসে এবং

প্রবাহমান জলে।

 

স্বামীটি : লিসবিয়ার প্রতি

লেসবিয়া খারাপ কথা বললো আমার সম্পর্কে তার স্বামীর মুখের উপর : সেই বেকুবের জন্যে এটা ছিলো সবচেয়ে বড় উল্লাস।

খচ্চর, তুমি কি দেখো নাই? যদি সে ভুলে যেতো আর নিরব থাকতো আমার ব্যাপারে

সেটাই ঠিক হতো, এখন যেহেতু সে খেদ প্রকাশ করে আর গালি দেয়,

সে কেবল মনেই রাখেনি, তবে তারচেয়ে গুরুত্ব ব্যাপার,

সে রেগে আছে, তারমানে, সে পুড়ছে, তাই এসব বলছে।

গাইয়াস ভ্যালেরিয়াস কাতাল্লুস রোমান প্রজাতন্ত্রের শেষ দিককার কবি। তার কবিতায় প্রাচীন রোমের জীবনযাত্রা, রোমের শাসন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে নারী প্রেমও উঠে এসেছে। লেসবিয়া নামের নারীর জন্যে তিনি একাধিক প্রেমের কবিতা লিখেছেন। কবিতার পাশাপাশি তিনি জুলিয়াস সিজার থেকে শুরু করে দমিসিয়ান পর্যন্ত ১২ জন সফল রোমান শাসকের জীবনীও লিখেছেন।

 কামিংস

১(টি

১(টি

পা

তা

রে

যা

চ্ছে)

এডয়ার্ড এস্টলিন কামিংস নিজের নাম লিখতেন ই. ই. কামিংস নামে। নামের অদ্যাক্ষরগুলো ছোট হাতের হতো। মার্কিণ কবি, লেখক, চিত্রকর, নাট্যকার প্রায় তিন হাজার কবিতা, দুইটি আত্মজীবনী, চারটি নাটক এবং অসংখ্য প্রবন্ধ লেখেছেন।

 

মার্গারেট অ্যাটুড

তুমি আমার মধ্যে ধরে যাও

তুমি আমার মধ্যে ধরে যাও

যেমন একটা বড়শি চোখের মধ্যে

একটা মাছ ধরার বড়শি

একটা খোলা চোখ

মার্গারেট এট্যুউড কানাডার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, কবি ও সম্পাদক। শুধু তাই নয়, বিশ্বের অন্যতম একজন বেস্টসেলার লেখিকাও তিনি। তিনি একই সঙ্গে চিত্রনাট্য, রেডিওনাট্য থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ, শিশুতোষ লেখাও লেখেন। প্রায় ৩০টি ভাষায় তার লেখা অনূদিত হয়েছে। তিনি ১৯৭২ সাল থেকে পূূর্ণকালীন লেখক হিসাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি কানাডার রাইটার্স ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট এবং কানাডার পেন ইন্টারন্যাশনালেরও প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

 

নেলি সাক্স

কে ডাকছে?

কে ডাকছে?

তোমার নিজের কণ্ঠস্বর!

কে দেয় জবাব?

মৃত্যু!

 

কী আশা আছে বন্ধুত্বের জন্যে

আমাদের ঘুমের ছাউনিতে?

কিছুই না সবটুকু!

কেন তবে কোন মোরগ ডাকে না?

 

আমি আমার গৃহঅধিকার চাইছি

আমি আমার গৃহের অধিকার চাইছি

এই মধ্যরাতের দেশের ভূগোল থেকে

যেখানে হাত প্রসারিত হয় ভালবাসায়

এই অক্ষাংশে ক্রুশবিদ্ধ হতে

মধ্য-গগনে

অপেক্ষায় –

 

মুঠোর আঘাত

একটি মুঠোর আঘাত আসে

কাঠগড়ার পেছন থেকে

কেউ একজন সেখানে শুয়ে আছে

¯্রফে পার-হয়ে যাওয়ার চেয়ে খারাপ কিছু আর নেই

কেউ থামে না

কিছুই বলার থাকে না

জুঁই তার ঘ্রাণ পাল্টায়নি তবু।

 

পাহাড়ের চূড়া

পাহাড়ের চূড়াগুলি

একে অপরকে চুমু খাবে

যখন মানুষেরা তাদের মৃত্যুর কুড়েঘর ছেড়ে চলে যাবে

এবং একে অপরকে মুকুট পরাবে

রঙধনু দিয়ে

সাতরঙা সান্ত্বনা

পৃথিবীর রক্তক্ষরণের –

ইহুদি, জার্মান কবি ও নাট্যকার নেলি সাক্স আর দশজন ইহুদির মতোই জার্মানী ত্যাগ করতে বাধ্য হন। সুইডেনের স্টকহোমে বসেই তিনি হিটলারের নাৎসীবাদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে যান। তার লেখায় ইহুদিদের নির্যাতন, বেদনা উঠে এসেছে। ১৯৬৬ সালে কবিতার জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান।

 

হুয়ান র‌্যামন হিমেনেথ

রাস্তা

ওরা ঘুমাচ্ছে, নীচে।

উপরে, জাগ্রত,

কাণ্ডারী আর আমি।

তিনি, দেখছেন কম্পাসের কাটা, অধিপতি

দেহকাণ্ডের, চাবিগুলো দেয়া আছে

তালাতেই। আমি, আমার চক্ষুদ্বয় দিয়ে

অসীমের পানে, পথ নির্দেশ করি

আত্মার উন্মুক্ত ভাণ্ডারের দিকে।

 

সঙ্গীত

সঙ্গীত

এক নগ্ন নারী

পাগলের মতো দৌঁড়াচ্ছে বিশুদ্ধ রাত্রিরে!

 

মরণ

সামান্য যেটুকু শক্তি তোমার ছিলো

সেটা তুমি শেষ দুটি হাসিতে খরচ করলে,

তুমি তখনও সে হাসি আমাকে দিলে। তারপর

তুমি নিবৃত্ত হলে।

তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গম্ভীর চিরতরে।

 

মৃত

তার ওজন ধ্রুব রয়ে গেলো:

ওজন যন্ত্রে একটি মূদ্রা শুধু গেলো।

 

আমার কণ্ঠ

গাও গাও, ও আমার কণ্ঠ,

যখন কিছু রয়ে গেছে

যা তুমি এখনও বলোনি।

তুমি এখনও কিছুই বলোনি তো।

হিস্পানি কবিতার শ্রেষ্ঠ একজন কবি হুয়ান র‌্যামহিমেনেথ গীতল, শৈল্পিক আর বিশুদ্ধ কবিতা রচনার চূড়ান্ত সাফল্য দেখিয়েছেন তিনি। তার রচিত ‘প্ল্যাতেরো ও আমি’ স্পেনে স্প্যানে পাঠ্যবই হিসাবে গণ্য। যৌবনে চিত্রকর হতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অন্য লেখক-কবিদের সংস্পর্শে এসে নিজেও পত্র-পত্রিকায় লেখা শুরু করেন। জীবনের নানা পর্যায়ে বিষাদ তাকে গ্রাস করে। একাধিকবার তাকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা হাসপাতালে থাকতে হয়। ১৯৫৬ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পান। তার তিনদিন পরেই প্রিয়তম স্ত্রী মারা যান। হিমেনেথ কোনদিন আর এ বিষাদ কাটিয়ে উঠতে পারেননি। স্ত্রী যেই হাসপাতালে মৃত্যুর বরণ করেছিলেন সেই হাসপাতালে ১৯৫৮ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

পাবলো নেরুদা

চূড়া

কোথাও কোন মহাশূন্য নাই বেদনার চেয়ে প্রশস্ত

কোথাও কোন মহাবিশ্ব নাই যা এমনই রক্তাক্ত।

 

এটা সহজ

ক্ষমতা হলো মৌন (গাছেরা আমাকে বললো)

অসামান্যতাও তাই (শিকড় বললো)

এবং বিশুদ্ধতাও তাই (শস্য বললো)।

কোনো গাছ কখনো বলেনি :

‘আমিই সবচেয়ে লম্বা!’

কোন শিকড় কখনো বলেনি :

‘আমি সবচেয়ে গভীর থেকে এসেছি!’

এবং রুটি কখনোই বলেনি :

‘রুটির চেয়ে ভালো আর কি আছে!’

শুধু স্পেনে নয়, সারা বিশ্বে পাবলো নেরুদা অন্যতম সেরা জনপ্রিয় কবি। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ভাষায় বলতে গেলে পাবলো নেরুদা হলেন ‘বিশ শতকের যে কোন ভাষার মধ্যেই মহত্তম কবি।’ চিলির এই কবির আসল নাম হলো নেফতালি রিকার্ডো রেইয়ে বাসোআলতো। তিনি তার দেশের আরেক কবি জ্যান নেরুদা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের নাম পাবলো নেরুদা রাখেন। মজার বিষয় হলো, জেন নেরুদা তেমন পরিচিত বা সফল কবি নন। অথচ পাবলো নেরুদা তরুণকালেই খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন। মাত্র বিশ বছর বয়সে লেখা তার কাব্যগ্রন্থ ‘ টোয়েন্টি লাভ পোয়েম এ- আ সঙ অব ডিজেপায়ার’ দারূণ জনপ্রিয়তা পায়। তিনি সব সময় সবুজ কালি দিয়ে লিখতেন, বলতেন এটা তাকে প্রেরণা দেয়। অন্যদিকে তার কবিতাও চির সবুজের আশা-প্রেরণা-ভালবাসা লক্ষ্যণীয়। ভালবাসার কবিতা, পরাবাস্তব কবিতা, ঐতিহাসিক কিংবা রাজনৈতিক কবিতা- সকল ক্ষেত্রেই তিনি অসংখ্য সফল কবিতার জন্ম দিয়েছেন। কবিতা লেখার পাশাপাশি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেছেন, কূটনৈতিক হিসাবেও কাজ করেছেন। দ্যা হাইট অব মাচুপিচু, ১০০ লাভ সনেট, দ্য বুক অব কোশ্চেন, দ্য ইয়েলো হার্ট, স্টোনস অব দ্য স্কাই, অন দ্য ব্লু শোর অব দ্য সাইলেন্স : পোয়েমস অব দ্য সী ইত্যাদি তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ।

 

জর্জ সেফেরিস

জুঁই

হোক সেটা সন্ধ্যা

কিংবা ভোরের প্রথম আলো

জুঁই রয়ে যায়

সদাই সাদা।

 

সরলতা…

আমি কিছুই চাই না কেবল সরল কথা বলতে চাই, তার পক্ষপাত পেতে চাই। কারণ আমরা গানগুলো এতো বেশি বাদ্য দিয়ে ভরে ফেলেছি যে তারা ক্রমশ ডুবে যাচ্ছে।

জর্জ সেফেরিস (ইংরেজিতে ইয়ারোস্লাভ সেইফার্ট লেখা হয়) নোবেল বিজয়ী চেকোস্লাভাকিয়ান কবি ও গদ্যকার। মূলত কবিতায় নতুনত্ব, তীব্রতা এবং গভীর উদ্ভাবনী শক্তির জন্য তিনি ১৯৮৪ সালে নোবেল পুরস্কার পান। চেক সাহিত্যে তিনিই একমাত্র নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক।

 

বব ডিলান

ক্লান্ত ঘোড়া

সূর্যের মাঝে সকল ক্লান্ত ঘোড়া

আমি কী করে চলবো তাদের ছাড়া?

হুম।

 

স্বর্গের দরজায় কড়া নাড়া

আম্মা আমার এই ব্যাজখানা খুলে নাও

আমি একে আর কাজে লাগাতে পারবো না

চারিদিক আঁধার হয়ে আসে,

আমার দৃষ্টিতে অনেক আঁধার

আমার মনে হয় আমি স্বর্গের দরজায় কড়া নাড়ছি

ঠক ঠক কড়া নাড়ি স্বর্গের দরজায় ॥

আম্মার আমার বন্দুকখানা মাটিতে ফেলে দাও

আমি ওদেরকে আর গুলি করতে পারছি না

সেই দীর্ঘ কালো মেঘ নেমে আসছে

আমার মনে হয় আমি স্বর্গের দরজায় কড়া নাড়ছি

ঠক ঠক কড়া নাড়ি স্বর্গের দরজায় ॥

 

উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়াম

শুধু এইটুকু বলার আছে

আমি খেয়ে ফেলেছি

পামগুলো

যেগুলো ছিলো

বরফের বাক্সে

 

এবং যেগুলোকে

তুমি রেখেছিলে হয়তো

বাঁচিয়ে

নাস্তার জন্য

 

আমাকে ক্ষমা কোরো

ওগুলো খুব সুস্বাদু ছিলো

খুব মিষ্টি

আর খুব ঠাণ্ডা

 

লাইনগুলি

পাতারা ধূসর সবুজ,

ভাঙা কাচ, উজ্জ্বল সবুজ।

 

দেয়ালগুলির মাঝখানে

 

পেছনে দেয়ালের

দিকে

 

যেখানে হাসপাতাল

কিচ্ছু নেই

 

মিথ্যাই জন্মাবে

অঙ্গার

 

যার মধ্যে চকচক করে

ভাঙা

 

টুকরো গুলো সবুজ

বোতলের

 

বিবাহ

এতো আলাদা, এই লোক

এবং এই নারী :

একটা প্রবাহ বয়ে যায়

একটা মাঠে।

আধুনিক এবংইমেজিস্ট মার্কিন কবি উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়াম কবিতার পাশাপাশি চিত্রকলাকেও গুরুত্ব সহকারে চর্চা করেছেন। তার কবিতায় চিত্রকলার প্রভাব পাওয়া যায়। তিনি কবিতার জন্য পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছেন, ইউনাইটেড স্ট্যাটস পোয়েট লরিয়েট সম্মানও পেয়েছেন।

 

জয়েস কিলমার

গাছ

আমার ধারণা যে আমি কখনোই দেখিনি

একটি কবিতা গাছের মতো সুন্দরি।

একটি গাছের ক্ষুধার্ত মুখ প্রস্তুত সদাই

মাটির মধুর বক্ষের পানে থাকে তাই;

একটি গাছ সারাদিন তাকিয়ে থাকে ঈশ্বরের পানে,

আর তার প্রসারিত পত্রময় ডানা জানে প্রার্থনার মানে;

একটি গাছ হয়তো পরেছে গ্রীস্মের পোশাক

তবু তার চুলে চড়ুইয়ের বাসা থাক;

তার হৃদয়ের কাছে তুষার হেলান দিয়ে আছে;

যে কিনা গভীরভাবে বাঁচে বৃষ্টির আঁচে।

কবিতা তৈরি হয় আমার মতো বোকাদের দ্বারা

কিন্তু একটি গাছ তৈরি হতে পারে না ঈশ্বরকে ছাড়া।

 

ইস্টার

বাতাস একটা প্রজাপতির মতো

নীল ঝালরের ডানা সহ।

সুখি পৃথিবী আকাশের দিকে তাকায়

আর গান গায়।

অণু কবিতার বিবেচনায় জয়েস কিলমার-এর ‘ট্রি’ আকারে একটু বড়। কিন্তু বিশ্বব্যাপী এই একটি ছোটকবিতার জন্য কিলমার ব্যাপক আলোচিত। ১৯১৪ সালে ‘ট্র্রি’স এ- আদার কালেকসন’ গ্রন্থে এটি প্রথম ছাপা হয়। কিলমারের কবিতায় প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি রোমান ক্যাথলিক ধর্মীয় বোধও কাজ করে। একাধারে সাংবাদিক, সমালোচক, শিক্ষক, সম্পাদক জয়েস কিলমারের অধিক কাজের সঙ্গে আমরা পরিচিত নই। কিন্তু তার কিছু কিছু কবিতা ঘুরে ফিরে বিশ্বের প্রায় সকল কাব্যসংকলনেই ঠাঁই পায়।

 

কার্ল স্যান্ডবার্গ

কুয়াশা

কুয়াশা এলো

ছোট্ট বিড়ালের পায়ে

 

সে বসে তাকিয়ে আছে

বন্দর আর শহরের উপর দিয়ে

নিরব নিতম্ব ঠেকিয়ে

আর তারপর চলে গেলো।

 

ঘূর্ণিপাক

বাতাসে এক ঘুর্ণিপাক যেখানে তোমার মাথা ছিলো একদা,

এখানে।

তুমি এই গাছের নিচ দেয়ে হেঁটেছিলে, চাঁদের সাথে কথা বলেছিলে আমার জন্য

আমি হয়তো একদম এখানে দাঁড়িয়ে থাকি এবং বিশ্বাস করি তুমি বেঁচে আছো।

 

তিনটি ভায়োলিন

তিনটি ভায়োলিন তাদের অন্তর দিয়ে চেষ্টা করছে।

ম্যাকডোয়ালের ‘বুনো গোলাপের’ সুর বাজাতে।

এবং বুনো গোলাপের সময়

এবং বুনো গোলাপের পাতা

এবং বুনো গোলাপের শিশির-বিদ্ধ চোখগুলো

বাতাসের মধ্যে গাইছে তিনটি ভায়োলিন।

তোমার মতো কেউ একজন ছিলো ম্যাকডোলের হৃদয়ে

তোমার মতো কেউ একজন আছে তিনটি ভায়োলিনে।

 

ধোঁয়া

আমি একটা চেয়ারে বসি আর খবরের কাগজ পড়ি।

লক্ষ লক্ষ মানুষ যুদ্ধে গেছে, একর জুড়ে তাদের কবর, বন্দুক আর জাহাজ ভেঙে গেছে, নগরগুলো পুড়ে গেছে, গ্রামগুলো  ধোঁয়ায় উড়ে গেছে,  এবং শিশুরা যেখানে গরুগুলো মরেছে কর্কশ বারবিকিউয়ের মধ্যে বিলীন হয়েছে আঙুলের আংটির মতো ধোঁয়া দখিনা বাতাসে।

আমি একটা চেয়ারে বসি আর খবরের কাগজ পড়ি।

আমেরিকান কবি, লেখক ও সম্পাদক কার্ল স্যান্ডবার্গ তিনবার পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছেন। দুবার কবিতার জন্য এবং একবার আব্রাহম লিঙ্কনের জীবনী লেখার জন্য। তার সময়ের অন্যতম সাহিত্য প্রতিভা হিসাবে তিনি গণ্য হতেন। শিকাগো পোয়েম, কর্নহাস্কার, স্মোক এ- স্টিল তার উল্লেখযোগ্য। ১৯৬৭ সালে তার মৃত্যুতে তৎতকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিনডন বি জনসন বলেছিলেন, ‘তিনিই ছিলেন আমেরিকা।’

 

ডি. এইচ. লরেন্স

আত্ম-করুণা

আমি কখনোই একটা বন্য কিছু দেখি নাই

তার-নিজের জন্যে দুঃখিত।

গাছের ডাল একটা ছোট্ট পাখি পড়ে যাবে শীতল মৃত্যুতে

কখনোই নিজের-জন্যে দুঃখিত অনুভব না-করেই।

ডেভিড হার্বাট লরেন্স ডিএইচ লরেন্স নামেই অধিক পরিচিত। ইংরেজ এই কবি, উপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক তার লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার এবং সন্সএ- লাভার্স উপন্যাসদ্বয়ের জন্যে আলোচিত, বিতর্কিতও। তার লেখাতে আধুনিকায়ন ও শিল্পায়ন কীভাবে মানবিকতায় প্রভাব ফেলেছে তা উঠে এসেছে। যৌনতা, মানসিক সুস্থতা, কামনা, সততা তার লেখার মূল বিষয়াদি। বিতর্কিত লেখালেখির জন্যে জীবনের শেষ পর্যায়ে তাকে নির্বাসনে থাকতে হয়েছে। ই এম ফর্স্টারের মতো লেখক তাকে, ‘আমাদের প্রজন্মের মহত্তম উপন্যাসিক’ অভিধা দিলেও মৃত্যুকালেও তাকে অনেকে নেহাতই একজন অশ্লীল লেখক মনে করতেন।

 

এজরা পাউন্ড

একটি বালিকা

গাছটি আমার হাতে ঢুকে গেছে,

আমার বাহু বেয়ে গড়াচ্ছে রস,

গাছটি বেড়েছে আমারই স্তনে –

নিম্নাভিমুখী,

শাখারা আমার বাইরে গজিয়েছে, বাহুর মতোই।

 

তুমি গাছ,

তুমি শ্যাওলা,

তার উপরের হাওয়ার তুমি ভায়োলেট।

একটি শিশু – এতো উঁচুতে – তুমি আছো,

এবং এই সবকিছুই জগতের কাছে ঝকমারি।

 

মেট্রোর স্টেশনে

ভিড়ের মধ্যে এইসব মুখের আবির্ভাব;

ভেজা কালো বৃক্ষশাখায় পুষ্পদল।

এজরা ওয়েস্টন লুমিস পাউন্ড সবার কাছে এজরা পাউন্ড নামেই পরিচিত। আধুনিক মার্কিন কাব্য ও সমালোচনা জগতে তিনি সুপরিচিত। বিংশ শতাব্দীর সাহিত্যে আধুনিকতাবাদ ও চিত্রবাদ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত তিনি। মূলত চীনা ও জাপানীদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তারা কম কথায় অধিক স্বচ্ছ ও স্বচ্ছল চিত্রময়তা তুলে ধরতেন। রিপোস্টেস, হিউ সেলেন মালবেরি, দ্য ক্যান্টস তার অন্যতম সেরা কাজ বলে বিবেচিত।

 

ল্যাংস্টন হিউজ

স্বপ্ন-স্থগিত

একটা মুলতবি হওয়া স্বপ্নের কী হয়?

 

ওটা কি শুকিয়ে যায়

সূর্যের মধ্যে কিসমিসের মতো?

 

কিংবা একটা ঘায়ের মতো পচে যায় –

এবং তারপর বিস্তৃত হয়?

 

এটা কি পোড়া মাংসের মতো গন্ধ ছড়ায়?

অথবা আবরণ সৃষ্ঠি করে এবং চিনির উপর –

মিষ্টির সিরাপের মতো?

 

হয়তোবা পড়ে যায়

একটা ভারী বোঝার মতো।

 

অথবা এটা বিস্ফোরিত হয়?

 

ন্যায়বিচার

ওই ন্যায়বিচার এক অন্ধ দেবী

এমন এক জিনিস যার কাছে কালোই হলো প্রজ্ঞা:

তার ব্যান্ডেজ ঢেকে রাখে দুটো পচনশীল ঘাকে

যা একদা হয়তো চোখ ছিলো।

 

শান্ত বালিকা

আমি তোমার সঙ্গে তুলনা করবো

তারাবিহীন একটি রাতের

সেটা তোমার চোখের জন্য নয়।

 

আমি তোমার সঙ্গে তুলনা করবো

স্বপ্নবিহীন একটা ঘুমের

সেটা তোমার গানের জন্য নয়।

 

স্বর্গ

স্বর্গ

হলো সেই জায়গা

সুখ যেখানে

সর্বত্রই।

জেমন মার্কার ল্যাংস্টন হিউজ একজন মার্কিন কবি, সমাজকর্মী, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার এবং কলামলেখক। ‘জ্যাজ পোয়েট্রি’ নামের নব্য কবিতা আন্দোলনের অন্যতম আবিষ্কারক তিনি। ‘হার্লেম রেঁনেসা’ নামে নিউ ইয়র্ক শহরের সাহিত্য আন্দোলনের নেতা তিনি। তিনি নিগ্রোদের সপক্ষে লিখেছেন। ‘নিগ্রোই হলো প্রথা’ এটা তার বিখ্যাত কথা। পরে তিনি লিখেছিলেন, ‘যখণ হার্লেমই ছিলো প্রথা।’

 

রবার্ট ফ্রস্ট

আগুন বরফ

কেউ বলে পথিবী শেষ হবে আগুনে

কেউ বলে বরফে।

 

যা থেকে আমি কামনার স্বাদ পেয়েছি

আমি সেই থেকে আগুনের পক্ষে রইবো।

 

কিন্তু আমাকে দ্বিতীয়বার শেষ হতে হয়,

আমার মনে হয় আমি যথেষ্ট ঘৃণার কথাই জানি

এটুকু বলার যে ধ্বংসের জন্য বরফও

যথেষ্ট মহৎ

এবং সেটা যথেষ্টই হবে।

 

চাষী

একটি লাঙল, তারা বলে, তুষারে হাল চাষ করে।

তারা এটাকে চাষ করা বোঝাতে পারে না, না Ñ

যতোক্ষণ না এই তিক্ততাকে উপহাস করে

এই পাথরকে কর্ষণ করে।

 

তুষারের আবক্ষ মূর্তি

একটি কাকের মতো

আমার উপর টলে পড়ে

তুষারের রেণু

একটি হেমলক গাছ থেকে

 

আমার হদয়কে দিয়েছে

একটি মনোভাবের পরিবর্তন

এবং কিছুটা অংশ রক্ষা করেছে

আমার শাসিত সেই দিনের।

 

বাগানে জোনাকি

এইখানে এলো সতিকারের তারারা উর্দ্ধ আকাশকে পরিপূর্ণ করতে,

আর এইখানে মর্তে সমকক্ষ হতে এলো পোকারা,

যদিও তারা কোনভাবেই কখনো তারার সমান আকৃতির নয়,

(এবং তারা কখনোই অন্দরে সত্যিকারের তারা ছিলো না)

এক সময় অনেকটাই তারার মতো শুরু করতে পারাটা অর্জন করে।

শুধুমাত্র, অবশ্যই, তারা পুরোটা টিকে থাকতে পারে না।

রবার্ট লি ফরেস্ট বিশ শতকের আমেরিকার অন্যতম আলোচিত ও শ্রদ্ধেয় কবি। আমেরিকার সাহিত্যজগতে তিনি একই সঙ্গে জনপ্রিয় এবং শৈল্পিক কবি হিসাবে একক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা পেয়েছেন।  তবে আমেরিকায় নয়, তিনি প্রথমে ব্রিটেনেই তার কবিতা ছাপেন। আমেরিকার গ্রামীন জীবন এবং চলিত ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। অন্যদিকে নতুন ইংলান্ডের বিশ শতকের গ্রাম জীবনের প্রেক্ষিতে জটিল সামাজিক ও মনস্তাত্তিক সম্পর্কও তুলে ধরেন। তিনি চারবার পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছেন। এতোবার পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়ার রেকর্ড আর কারো নেই।  তিনি একাধিকবার নোবেল মনোনয়ন পেলেও পুরস্কার পাননি। ১৯৬০ সালে তিনি কনগেশনাল গোল্ড মেডেল পান। পরের বছরই ভারমন্টের পয়েট লোরিয়েট খেতাব পান।

 

পাওলালেমিনস্কি

একটা পাগলা কুত্তা

তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা উচিত

একটা পাথর কিংবা একটা লাঠি দিয়ে

আগুনের পুড়িয়ে কিংবা একটা লাথি দিয়ে

অথবা হয়তো সে খুব ভালভাবে পারবে

শুয়রের বাচ্চাটা

আমাদের পিকনিট নষ্ট করতে।

 

সমাধিলিপি

শরীরের জন্য সমাধিলিপি

 

এইখানে শুয়ে আছেন মহান কবি।

তিনি কিছুই লিখে রেখে যাননি।

এই নিরবতা, আমি ধারণা করি,

তার পূর্ণাঙ্গ রচনাবলী।

 

সমাধিলিপি

আত্মার জন্য সমাধিলিপি

 

এইখানে শুয়ে আছেন একজন শিল্পী

দূর্যোগের ওস্তাদ

জিয়ন্ত

শিল্পের প্রখরতায়

যা তার হৃদয়কে ধ্বংস করেছিলো

 

ঈশ্বর অনুগ্রহ করুন

তার ছদ্মবেশ সমূহকে।

 

জীবন

জীবন একটা গরু

তাকে তুমি নদীর ধারে রেখেছো

পিরানহাদের আকৃষ্ট করতে

যখন পশুপালক চলে যায়

 

মাধ্যম

সাদা

ম্যাগনোলিয়ার

মাধ্যমে

 

এই

সকালের

নীল

দেখে

লাল

ব্রাজিলে জন্ম নেয়া পাওলো লেমিনস্কি লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি। নতুন ধারার বিপ্লবী এই কবিতা নানা আকৃতির কবিতার পাশাপাশি হাইকু লিখেও জনপ্রিয় হন। কবিতার পাশাপাশি তিনি সাহিত্য সমালোচনা, জীবনী রচনা, অনুবাদের পাশাপাশি তিনি শিক্ষকতা করেছেন। বহুভাষাবিদ লেমিনস্কি ফরাসী, ইংরেজি, স্প্যানিশ, জাপানী, ল্যাটিন ও গ্রীক ভাষায় বিশেষ দক্ষ ছিলেন। জেমস জয়েস, স্যামুয়েল বেকেট, ইউকিও মিশিমা, মাৎসু বাশু প্রমুখের কাজ অনুবাদ করেছেন তিনি। অতিরিক্ত মদ্য আসক্ত প্রতিভাবান ভাষাবিদ, কবি, লেখক ও অনুবাদক পাওলো লেমিনস্কি মাত্র ৪৫ বছরের লিভার সিরোসিসে মারা যান।

 

অগডেন ন্যাশ

স্বামীর প্রতি একটি কথা

তোমার বিয়েকে টইটুম্বুর রাখতে

ভালবাসা সহ ভালবাসার পাত্রে

যখনই তুমি ভুল, মেনে নাও;

যখনই তুমি সঠিক, চুপ করে যাও।

 

সেলারি

সেলারি, কাঁচা

চোয়ালের উন্নতি ঘটায়

কিন্তু সেলারি, ঝোল

অতি দ্রুত চাবানো যায়।

 

উকুন

অ্যাডামেরও

ওটা ছিলো।

 

নোংরা দুনিয়ার প্রতিবিম্ব

বিশুদ্ধতা

হলো অস্পষ্টতা।

 

জেলিফিশ

কে আমার জেলিফিশ চায়?

আমি তো সেলিফিশ  নই।

ফ্রেডেরিক অগডেন ন্যাশ তার হাল্কা চালের কবিতার জন্যেই বিখ্যাত। পাঁচ শতাধিক অণুকবিতা আছে তার। ভিন্ন ধরনের ছন্দ আর প্রকাশভঙ্গির জন্যে তিনি বিখ্যাত। মার্কিন কাব্যজগত তথা ইংরেজি ভাষায় অন্যতম সেরা রসবোধ সম্পন্ন কবি তিনি।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close