Home অনুবাদ বেন ওকরি > ক্ষুধার্ত পথ >> অনূদিত উপন্যাস >>> অনুবাদ ও ভূমিকা : অদিতি ফাল্গুনী

বেন ওকরি > ক্ষুধার্ত পথ >> অনূদিত উপন্যাস >>> অনুবাদ ও ভূমিকা : অদিতি ফাল্গুনী

প্রকাশঃ August 10, 2017

বেন ওকরি > ক্ষুধার্ত পথ >> অনূদিত উপন্যাস >>> অনুবাদ ও ভূমিকা : অদিতি ফাল্গুনী
0
0

বেন ওকরি > ক্ষুধার্ত পথ

ভূমিকা

বেন ওকরি। তাঁর জন্ম ১৯৫৯ সালের ১৫ মার্চ। বিখ্যাত এই নাইজেরীয় কবি এবং ঔপন্যাসিককে প্রায়ই তুলনা করা হয় লাতিন আমেরিকার গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এবং ব্রিটিশ-ভারতীয় ঔপন্যাসিক সালমান রুশদির সাথে।

উরহোবো গোত্রের মানুষ বেন ওকরির পিতা সিলভার ওকরি ছিলেন উরহোবো এবং মা গ্রেস ওকরি ছিলেন আধা-ইগবো গোত্রীয়। ওকরির বয়স যখন দুইও হয়নি, তখনি তাঁর বাবা লন্ডন গেছিলেন আইন পাঠের জন্য। ওকরির শৈশব তাই কাটে লন্ডনে। ১৯৬৮ সালে নাইজেরিয়ায় তাঁর পিতা সপরিবারে ফিরে গেলে নয় বছরের ওকরি নাইজেরীয় গৃহযুদ্ধ এবং নাইজেরীয় লোকসংস্কৃতির মুখোমুখি হন যা পরে তাঁকে গল্প-উপন্যাস লিখতে অনুপ্রাণিত করে।

চৌদ্দ বছর বয়সে ওকরি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা পাঠের আবেদন করলে অল্প বয়স বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনুমতি প্রদানে অস্বীকৃতি জানায়। তবে, পদার্থবিদ্যা পাঠের অনুমতি না পেলেও এই সময়েই তাঁর ভেতর কবিতার জন্য আকুতি দেখা দেয় আর তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। একই সময়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা বিষয়ে তিনি প্রবন্ধও লেখা শুরু করেন। কিন্তু প্রকাশক পেতে ব্যর্থ হন। এরপর ওকরি এসব প্রবন্ধের বিষয়আশয় নিয়ে ছোটগল্প লিখতে শুরু করলেন যার কিছু কিছু লেখা মেয়েদের জার্নাল এবং সান্ধ্য কাগজগুলোয় ছাপা হলো। ওকরি দাবি করেন যে তাঁর লেখা শুরুর দিকের এসব গল্পে সরকারের সমালোচনা থাকায় তাঁর নাম একটি হত্যা তালিকায় আসে এবং তখন দেশ থেকে পলায়ন তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে।

১৯৭৮ সালে ইংল্যান্ডে গিয়ে ওকরি এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যপাঠ শুরু করেন। কিছুদিন পরেই এসেক্সে নাইজেরীয় সরকারের যে বৃত্তি নিয়ে গেছিলেন, তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আক্ষরিক অর্থে অনিকেত জীবন শুরু হয় তাঁর। পার্কেও রাতে ঘুমিয়েছেন। জীবনের এই পর্বকে তাঁর কথাসাহিত্যের জন্য ‘গুরুত্বপূর্ণ পর্ব’ বলে পরে তিনি অভিহিত করেন এইভাবে : ‘আমি সেসময় শুধু লিখতাম আর লিখতাম…যদি শেষমেশ কোন কিছু দানা বাঁধে (লেখার আগ্রহ)।’

একুশ বছর বয়সে প্রথম উপন্যাস ‘ফুল ও ছায়া’  প্রকাশের সাথে সাথেই সাহিত্যিক সাফল্য পান। এরপর তিনি কিছুদিন পশ্চিম আফ্রিকা নামে একটি পত্রিকায় ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৬ সাল অব্দি কবিতা-সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন এবং ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সাল নাগাদ বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস-এ নিয়মিত প্রদায়কের কাজ করেন।  ১৯৮৬ সাল থেকে তিনি নটিং হিলে প্রকাশক বন্ধু মার্গারেট বাসবির কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া একটি ফ্ল্যাটে থাকা শুরু করেন : ‘আমি আমার সাথে দ্য ফ্যামিশড রোড-এর পান্ডুলিপি নিয়ে আসি এবং এই ফ্ল্যাটে সেটা পুনর্লিখন শুরু করি…এখানেই আমার লেখায় কিছু বদল আসতে থাকে। এক ধরনের স্বচ্ছতা অর্জন করি আমি। আমার কণ্ঠস্বরে একজন লেখক হিসেবে যে সুরটি আমি  চাইছিলাম- তা যেন এতদিন পর প্রথম এল…এই ফ্ল্যাটে থাকতেই আমি সেই ছোটগল্পগুলো লিখি যা পরে স্টারস অফ দ্য নিউ কার্ফিউ-এ প্রকাশিত হয়।’

১৯৯১ সালে ওকরির জীবনের তখন পর্য়ন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ- দ্য ফ্যামিশড রোড বুকার প্রাইজ পাওয়ার সাথে সাথে লেখক হিসেবে তাঁর স্থায়ীত্ব অর্জিত হয়। এখনও অব্দি তিনিই সবচেয়ে কম বয়সে বুকারজয়ী লেখক হয়ে আছেন।

দ্য ফ্যামিশড রোড বা `ক্ষুধার্ত পথ’-এর মূল চরিত্র অ্যাজারো নামে এক ‘স্পিরিট-চাইল্ড’ বা `আত্মা-শিশু’, যে বাস করে এক অনামা নাইজেরীয় শহরে। উপন্যাসের শুরুতে এক অদ্ভুত ঘোরলাগা বিবরণ পাঠ করে অনেক সমালোচক একে `ম্যাজিক রিয়ালিজম’ বললেও লেখক ওকরি এই তকমা একদম পছন্দ করেন না। বরং `সনাতনী আফ্রিকান ধর্মীয় বাস্তবতাবাদ’-ই একে বলা সঙ্গত হবে বলে তিনি মনে করেন। `আত্মা-শিশু’ কারা? ওকরির এই উপন্যাস পাঠ করে জানা যাচ্ছে যে অদ্ভুতভাবে ভারতের মতই আফ্রিকাতেও জন্মান্তরের ধারণা প্রচলিত ছিল বা আছে। `আত্মা-শিশু’ হচ্ছে যারা বারবার এই পৃথিবীতে জন্ম নেয়। আত্মা-পৃথিবী বা স্পিরিট-ওয়ার্ল্ড থেকে তারা আসে। কিন্ত পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা, অত্যাচার ও বৈষম্য দেখে তারা বেশিদিন বাঁচতে চায় না। স্বেচ্ছামৃত্যুর ক্ষমতা আছে তাদের। তাই দ্রুতই তারা পৃথিবী ত্যাগ করে চলে যেতে চায় আর যায়। কিন্ত আত্মা- পৃথিবীতে ফিরে গিয়েও ফেলে-আসা পৃথিবীতে নানা সম্পর্কের বন্ধনে যারা ছিল- সেই বাবা-মা-ভাই-বোন-বন্ধু-প্রেমাস্পদের কথাও তারা ভুলতে পারেনা। কখনো কখনো তারা এতবার জন্মায় বা এমনকি একই বাবা-মা’র ঘরেও এত বার জন্মায় যে কখনো কখনো মানুষ তাদের চিনে ফেলে। তাদের দেহে থাকে এক বিশেষ জন্মদাগ।`আবিকু’ বা ‘স্পিরিট চাইল্ডে’র দেহের এই দাগ দেখে চিনে ফেললে মানুষ মা-বাবারা কাতর হয়। সন্তান যেন দ্রুত পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে না চায়, তাই মা-বাবারা নানা পূজার আয়োজন করেন, দেবতার উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য দেন, সন্তানকে বোঝান বেঁচে থাকার মহিমা। অ্যাজারো নামের আবিকু বারবার পৃথিবীতে আসতে-যেতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং খানিকটা এক কালশিটে চেহারার নারীর মুখের প্রতি সমবেদনা থেকে একবার পৃথিবীতে বেশিদিন থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে জন্মায়। যে নারীটির প্রতি তার এই সমবেদনা, তার গর্ভেই জন্ম নেয় সে।  তবে এই যে এ্যাজারো পৃথিবীতে বেশিদিন থেকে যেতে চায়, তাতে আত্মা-পৃথিবীতে তার খেলার সাথিরা ক্ষুব্ধ হয়। এ যে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ! তারা বারবার তাকে মানুষের পৃথিবী থেকে আত্মা-পৃথিবীতে ফিরিয়ে নেবার চেষ্টা করে। তবে এই জন্মে মা-বাবার প্রতি ভালবাসা থেকে সে রয়ে যায় পৃথিবীতে।

আফ্রিকীয় পুরাণ-বিশ্বাসের কৌশল ব্যবহার করে ওকরির এই অনবদ্য মরমী উপন্যাসে বাস্তব জীবনের দুঃখ-সংঘর্ষের উপস্থিতি খুব কম নয়। তাঁর বাবা একজন শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন, যখন মা কিনা হকার হিসেবে ফুটপাথে এটা-সেটা বিক্রি করতেন। মাদাম কোটো নামে এক মহিলা হলেন অ্যাজারোদের শহরে একটি ছোট্ট পানশালার মালিক। তিনি অ্যাজারোকে তাঁর পানশালায় যেতে বলেন। মাদাম কোটোর মনে হয়েছিল যে অ্যাজারো কোন স্বাভাবিক শিশু নয় এবং সে তাঁর পানশালায় গেলে বেশি বেশি খদ্দের অর্থাৎ বেশি অর্থ-কড়ি পাওয়া যাবে। এদিকে অ্যাজারোর বাবার হঠাৎই একদিন মনে হয় যে মাল টানার চেয়ে মুষ্টিযুদ্ধ করলে তিনি বেশি টাকা আয় করতে পারবেন। আবার শহরে নির্বাচনের আগে দুই বিরোধী দল শহরবাসীকে ঘুষ দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা করতে থাকে- অনেকটা আমাদের দেশের মতই হাল আর কি!

এই উপন্যাসের মূল কয়েকটি চরিত্র হল :

অ্যাজারো– কাহিনির কথক এই শিশু একজন আবিকু বা আত্মা-শিশু। আত্মা-পৃথিবীর সাথে তার বন্ধন কোনদিনই ছিন্ন হয় না। নিউ টেস্টামেন্ট কিম্বা বাইবেলের `ল্যাজারাস’ শব্দটি থেকে তার নাম রাখা হয় অ্যাজারো।

অ্যাজারোর বাবা– একজন মুটে মজুর যিনি তার পরিবারের প্রতি খুবই দায়িত্বশীল। পরে তিনি মুষ্টিযোদ্ধা ও একদম শেষে একজন রাজনীতিবিদ হন। ছেলেকে ভালবাসলেও সে এক `আবিকু’ বলে মাঝে মাঝে তিনি অ্যাজারোর প্রতি ক্ষিপ্ত হন।

অ্যাজারোর মা কঠোর পরিশ্রমী এই নারী পরিবারের জন্য নিজের খাবারের অংশ থেকে সবকিছুই ছেড়ে দেন।`আবিকু’ সন্তান অ্যাজারোকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রাণপাত করেন তিনি।

মাদাম কোটো– একটি স্থানীয় পানশালার সত্বাধিকারী। অ্যাজারোকে তিনি পছন্দ করেন। ভাবেন এই `আবিকু’ শিশু তাঁকে সৌভাগ্য এনে দেবে। তবে নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর এমনও মনে হয় যে অ্যাজারো মন্দভাগ্যও সাথে আনে। কাহিনির অগ্রগতির সাথে দেখা যায় যে মাদাম কোটো দিন দিন সম্পদশালী হচ্ছেন এবং শহরে অভিজাত শ্রেণির রাজনৈতিক দলটির সাথে তিনি সংশ্লিষ্ট হচ্ছেন। ডাকিনীবিদ্যার দায়েও তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়। বিভিন্ন সময়ে অ্যাজারো এবং তাঁর পরিবারকে সাহায্য করলেও যৌবন ধরে রাখার জন্য একবার অ্যাজারোর রক্ত নেবার চেষ্টা করেন।

আলোকচিত্রী জেরেমিয়াহ– একজন তরুণ শিল্পী যিনি তাঁর গ্রামকে গোটা পৃথিবীর কাছে তুলে ধরতে চান এবং পৃথিবীকে আনতে চান তাঁর গ্রামের দরজায়। তাঁর কিছু আলোকচিত্র তিনি প্রকাশে সক্ষম হন। তবে আলোকচিত্র তোলার কাজ করতে গিয়ে তাঁকে অনেক ব্যক্তিগত ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়।

বাড়িঅলা– বাড়িঅলা চরিত্রটিও শহরের অভিজাত রাজনৈতিক দলটির সমর্থক এবং অ্যাজারোর পরিবারের প্রতি নানা কারণে অসন্তষ্ট।

তীরন্দাজে-এর পাঠকদের জন্য উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদের কয়েক পৃষ্ঠা নিচে অনুবাদ করা হলো। আমাদের মনে হয়েছে, সংক্ষিপ্ত হলেও এই অংশটি অনেকটাই স্বয়ংম্পূর্ণ মনে হবে পাঠকদের।

প্রথম অধ্যায় 

শুরুতে ছিল একটি নদী। নদীটি পরে হয়ে গেল একটি পথ এবং পথটি তার শাখা-প্রশাখা মেললো গোটা বিশ্বে। আর যেহেতু এককালে পথটি ছিল নদী, সে ছিল সবসময়ই ক্ষুধার্ত।

শুরুর সেই দেশে আত্মারা মিলে যেত আজো যারা জন্মায়নি সেইসব অজাত ভ্রুণের সাথে। আমরা- সেই আত্মারা- নানা ধরনের চেহারা নিতে পারতাম। আমাদের ভেতরে অনেকেই ছিল পাখি। আমরা জানতাম না কোন সীমারেখা। সেখানে ছিল প্রচুর ভোজ, খেলাধূলা আর বিষাদ। শাশ্বতের সুন্দর সন্ত্রাসের ভয়ে আমরা প্রচুর ভোজন করেছি। মুক্ত ছিলাম বলে আমরা অনেক খেলেছি। আর আমরা প্রচুর শোকও করেছি, কেননা আমাদের ভেতর সবসময়ই কেউ না কেউ ছিল যে মাত্রই জীবিতদের পৃথিবী থেকে আমাদের ভেতর ফিরে এসেছে। জীবিতদের পৃথিবী থেকে সান্ত্বনা গ্রহণের অযোগ্য অবস্থায় তারা আসত- তাদের সত্যি কোনভাবেই সান্ত্বনা দেওয়া যেত না। কোনভাবেই তাদের শোক ভোলানো যেত না ফেলে আসা সব ভালবাসার জন্য, জীবনের অপূরণীয় সব যন্ত্রণার জন্য, পৃথিবীতে থাকতে যা কিছু তারা বোঝেনি তার জন্য এবং আমাদের যে ভুবন থেকে আত্মারা মানবদেহ নিয়ে পৃথিবীতে যায় সেখানে ফিরে আসার মাত্র কয়েকদিন আগে থেকে পৃথিবীতে মাত্রই তারা যেসব বিষয় বোঝা শুরু করেছিল সেসবের জন্য।

আমাদের ভেতর কেউই আর পুনর্জন্ম চাইত না- চাইত না ফিরে জন্মাতে। চাইত না নবজন্ম। যেহেতু আমরা অপছন্দ করতাম অস্তিত্বের যত কঠোরতা, অপূরিত যত আকাঙ্ক্ষা, পৃথিবীতে উৎকীর্ণ যত অবিচার, মৃত্যুর ঘটনা এবং মহাবিশ্বের সরল সৌন্দর্যের মাঝে জীবিতদের বিষ্ময়কর নির্লিপ্তি। মানুষের হৃদয়হীনতাকে আমরা ভয় পেতাম যাদের প্রায় সবাইই অন্ধ হয়ে জন্মায়, কেউ কেউ শুধু তাদের ভেতর কখনো কখনো দেখতে শেখে।

আমাদের রাজা ছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তি যিনি মাঝে মাঝে বেশ বড় একটি বেড়ালের দেহে হাজির হতেন। তাঁর ছিল লাল দাড়ি এবং সবুজাভ নীলার মত চোখ। অসংখ্যবার তিনি জন্মেছেন এবং সকল ভুবনেই তিনি ছিলেন এক কিংবদন্তী, তাঁকে সবাই শত নামে চিনত। এটা কখনোই কোন বিষয় ছিল না যে কোন্ কোন পরিস্থিতিতে তিনি জন্মেছেন। সবসময়ই সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ধাঁচের জীবন তিনি যাপন করেছেন। জীবনের আয়ুর সেই মহৎ, অদৃশ্য বইটা যে-কেউই চাইলে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখতে পারেন এবং ভালভাবে সেই আয়ুর খাতা পরখ করলে সবাই বুঝবেন যে আমাদের রাজার নথিবদ্ধ ও অনথিবদ্ধ বয়সসমূহ বোঝা যাবে- বোঝা যাবে কি প্রবল প্রতিভায় তিনি বারবার পৃথিবীতে জন্মেছেন। কখনো পুরুষ হিসেবে, কখনো নারী হিসেবে- বারবার তিনি জন্মেছেন। এবং প্রতিটি জন্মেই অতুলনীয় নানা অর্জন ছিল তাঁর। তবে বারবার ভিন্ন ভিন্ন রূপে তাঁর এই প্রতিটি জন্মের ভেতর সদৃশ কোন কিছু যদি থেকে থাকে, সেটা সম্ভবত তাঁর রূপান্তরের জন্য প্রেম, প্রেমকে বৃহত্তর সত্যে পরিবর্তন করার আকুতি।

আমাদের আত্মার সহচরদের সাথে (যাদের সাথে আমাদের কিনা ছিল বিশেষ সম্বন্ধ) আমরা অধিকাংশ সময়ই খুব সুখে কাটাতাম। যেহেতু আমরা ভাসতাম পান্না-বর্ণ অনুরাগের বাতাসে। আমরা খেলতাম বনদেবতা এবং পরীদের সাথে, সুন্দর যত সত্তার সাথে। আমাদের ভেতর সবসময়ই থাকত কোমল ভবিষ্যদ্বগণনাকারীণী, শুভ যত আত্মা এবং পূর্বসূরীদের প্রশান্ত উপস্থিতি। আমাদের স্নান করাতেন তারা তাদের ঔজ্জ্বল্যের রংধনুতে। জন্মানোর সময় বাচ্চারা কেন কাঁদে তার তো আসলেই নানা কারণ আছে- প্রধান একটি কারণ হলো আমাদের পরিপূর্ণ স্বপ্নের জগৎ থেকে হঠাৎ বিচ্ছিন্নতা যে স্বপ্নের ভুবন কিনা গোটাটাই আনন্দ দিয়ে গড়া, যেখানে কোন যন্ত্রণা নেই বা থাকে না।

আমরা যত বেশি সুখী হতাম, তত বেশি করে আরেকটি পুনর্জন্মের নিকটবর্তী হতাম। আরেকটি পুনর্জন্মের নিকটবর্তী হওয়ার সাথে সাথে আমরা চুক্তি করতাম যে পৃথিবীতে জন্ম নেবার পর প্রথম সুযোগেই আমরা আবার আত্মার পৃথিবীতে ফিরে যাব। আত্মা-পৃথিবীর বিশাল পুষ্পোদ্যান এবং সেই ভুবনের চন্দ্রালোকিত সৌন্দর্যের নিচে দাঁড়িয়ে আমরা এমন প্রতিজ্ঞা করতাম। আত্মা-পৃথিবীর আমরা যারা এমন শপথ নিতাম, তাদেরই জীবিত মানুষদের পৃথিবীতে বলা হত `আবিকু’, আত্মা-শিশু। পৃথিবীর সব মানুষ অবশ্য আমাদের চিনতে পারত না। আমরা ছিলাম সেই সব শিশু যারা ক্রমাগত জীবিত মানুষদের পৃথিবী আর আত্মা-পৃথিবীর ভেতর আসা-যাওয়া করতাম। স্বেচ্ছামৃত্যুর ক্ষমতা ছিল আমাদের। আত্মা-পৃথিবীর আদিগন্ত বিস্তীর্ণ ফুলক্ষেতে দাঁড়িয়ে মানুষের পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে দ্রুতই আবার ফিরে আসার শপথ আমাদের উপর বলবৎ থাকত।

আমাদের ভেতর যারা জীবিত মানুষদের পৃথিবীতে জন্মে দ্রুতই আত্মা-পৃথিবীতে ফিরে যাবার চুক্তি ভেঙে ফেলে পৃথিবীতেই থেকে যেতে চাইত, তারা প্রায়ই নানা বিভ্রম আর আত্মা-পৃথিবীর সাথিদের দ্বারা তাড়িত হত। শুধুমাত্র না-জন্মানো শিশুদের আত্মা-পৃথিবীতে ফিরবার পরেই তারা আবার শান্তি খুঁজে পেত- সেই ঝর্ণাভূমি, যেখানে তাদের ভালবাসার সাথিরা তাদের জন্য নিঃশব্দে অপেক্ষা করেছিল।

আমাদের ভেতর পৃথিবীতে যারা বিচিত্র সব ঘটনার বিবরণে প্রলুব্ধ হয়ে দীর্ঘদিন রয়ে যেত, তারা সুন্দর এবং নিয়তিতাড়িত চোখে জীবনের ভেতর দিয়ে যেত। নিজেদের ভেতর তারা বহন করে চলতো এক মধুর তবে বিষাদঘন পুরাণের সঙ্গীত। আমাদের মুখগহ্বরসমূহ উচ্চারণ করত অস্ফুট যত ভবিষ্যদ্বাণী। ভবিষ্যতের নানা চিত্রকল্পে আমাদের মন অধিকৃত থাকত।  আমরা সেই অদ্ভুত শিশুর দল যারা পৃথিবীতে জন্ম নিলেও আমাদের আত্মার অর্ধেক পড়ে থাকত আত্মা-পৃথিবীতে।

জন্মের পরপরই আমাদের প্রায়ই চেনা যেত এবং আমাদের শরীরে খুঁজে পাওয়া যেত ক্ষুরের কাটা দাগ। যখন আমরা একই বাবা-মা’র ঘরে আবার জন্মাতাম, তখনো যদি আগের জন্মের কাটা দাগ নতুন শরীরে পুনরায় দেখা যেত, তখন আমাদের সবাই সহজে চিনে নিত- ‘আত্মা-শিশু’ হিসেবে আমাদের সহজেই সনাক্ত করা যেত। এরপরই গোটা পৃথিবী আমাদের চারপাশে ঘোরাবে নিয়তির এক বিচিত্র জাল। আমাদের ভেতর যারা শৈশবেই মারা যেত, তারা নতুন করে জীবিত মানুষের পৃথিবীতে আসার আগে বিগত জন্মের শরীরের দাগ মুছে ফেলার চেষ্টা করত, চেষ্টা করত শরীরে নানা সৌন্দর্য দাগ তৈরির বা ক্ষুরের কাটা দাগকে বিবর্ণ করে ফেলতে। যদি আমরা বিগত মানবজন্মের সময়কার দেহের দাগ মুছে ফেলতে না পারতাম, তবে জন্মের সাথে সাথে শরীরে বিগত জন্মের দাগ দেখে সবাই আমাদের চিনে ফেলত। আতঙ্কের চীৎকার এবং মায়েদের কান্নার শব্দে আমাদের সবাই চিনে নিত।

এই যে জন্মের পর পৃথিবীতে আমরা বেশিদিন থাকতে চাইতাম না, এতে করে আমাদের মায়েরা খুব কষ্ট পেত। প্রতিবার আমাদের পৃথিবীতে আসা ও আত্মা-পৃথিবীতে ফেরার সময় আমাদের পৃথিবীর মায়েদের যন্ত্রণা বেড়ে যেত। আমাদের মায়েদের যন্ত্রণা আমাদের কাঁধে তুলে দিত সত্তার এক বাড়তি বোঝা যা আমাদের পুনর্জন্মের চক্রকে দ্রুততর করত। প্রতিবার নতুন জন্ম নেওয়া তাই আমাদের জন্যও ছিল এক নিদারুণ যন্ত্রণা, কাঁচা পৃথিবীর অভিঘাত সওয়া। আত্মা-পৃথিবীতেও আমাদের কেউ পছন্দ করত না আর জীবিত মানুষদের ভেতরও আমাদের সবাই সনাক্ত করে ফেলত- আর এজন্যই পৃথিবীতে আমাদের বেশিদিন থাকতে না চাওয়াটা ভুবনের সব ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করত।

আবেগঘন নানা পূজা-উপাচার তর্পনের সময়, আমাদের বাবা-মায়েরা আমাদের বেঁচে থাকার স্বপক্ষে নানা যুক্তি শুনিয়ে উদ্বুদ্ধ করতে চাইত। বাবা-মায়েরা আরো চেষ্টা করতেন আমাদের মুখ খোলানোর- আমরা যেন তাদের বলি যে কোথায় আমরা লুকিয়ে রেখেছি আত্মা-পৃথিবীর চিহ্ন যা আমাদের যুক্ত রেখেছে সেই অন্য এক মায়া-ভুবনের সাথে। আমরা আমাদের বাবা-মায়েদের তর্পণকে কোন গুরুত্ব দিতাম না আর আমাদের আত্মা-পৃথিবীর চিহ্নকে কড়া গোপনীয়তার বিষয় হিসেবে পাহারা দিতাম। আর আমরা আমাদের মায়েদের প্রসব বেদনার নিরানন্দ, ব্যথাতুর মূহূর্তগুলোর বিষয়ে নির্লিপ্ত থাকতাম।

জীবিত মানুষের পৃথিবীতে জন্মেও তাড়াতাড়ি আত্মা-ভুবন তথা আমাদের আসল বাড়িতে ফেরা, নদীর পাশে এবং তৃণভূমিতে আর যাদু গুহাগুলোয় খেলা করার প্রত্যাশা থাকত আমাদের। সূর্যালোক এবং দামি পাথরগুলোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ধ্যান করার আর আত্মার শাশ্বত শিশিরকণায় সুখী হবার বাসনা ছিল আমাদের। পৃথিবীতে জন্ম নেবার অর্থই হলো যেন আত্মার অদ্ভুত নানা উপহারে ভারগ্রস্ত হওয়া, রহস্য ও নির্বাসনের এক অনির্বাণ বোধে আচ্ছন্ন থাকা। কাজেই আত্মা-শিশু হিসেবে আমার ভেতরেও ছিল এই ভারবোধ, এই আচ্ছন্নতা।

পৃথিবী ও আত্মা-পৃথিবীর ভেতরে যাওয়া-আসার পথে কতবার সেই ভয়ানক দরজা আমি পার হয়েছি? কতবার আমি জন্মেছি এবং অল্প বয়সেই মারা গেছি? এবং কতবারই না একই বাবা-মা’র ঘরে জন্মেছি? কোন ধারণা ছিল না। বেঁচে থাকার কি পরিমাণ ধূলা আমার ভেতর ছিল। কিন্তু এবার, আত্মা-পৃথিবী এবং বেঁচে থাকার অন্তর্গত পরিসরের ভেতরে কোন এক স্থানে, আমি থেকে যেতে চাইলাম। এর অর্থ হলো আত্মা-পৃথিবীতে ফেলে আসা আমার সঙ্গীদের সাথে আমার চুক্তি ভঙ্গ করা হলো। আমি তাদের বুদ্ধির দৌড়ে হারিয়েও দিলাম। কেন আমি পৃথিবীতে দীর্ঘ সময় থাকতে রাজি হলাম? এমন নয় যে আগের জন্মগুলোয় আমাকে আত্মা-শিশু হিসেবে চিনতে পেরে আমার বিগত জন্মের বাবা-মায়েরা নানা পূজা বা তর্পণাদি করেছেন কিম্বা সেই সব তর্পণে প্রচুর তেল, গাছ আলু বা খেজুর বাদাম পোড়ানো হয়েছে অথবা আমাকে তারা অনেক মিষ্টি কথায় তুষ্ট করেছেন বা বিশেষ চিকিৎসার সংক্ষিপ্ত নানা প্রতিশ্রুতি অথবা অতীতে বারবার অল্প বয়সেই মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিয়ে যে শোক আমি তাদের দিয়েছি সেসব কিছুর জন্য আমি এবার পৃথিবীতে বেশি দিন থাকছি। এমনো নয় যে আমাকে সবাই আত্মা-শিশু হিসেবে চিনে ফেলবে এমন ভয় থেকে এবার বেশিদিন পৃথিবীতে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার হাতের তালুতে একটি চিহ্ন ছাড়া মোটামুটি আর সব দিক থেকেই আমাকে যেন আত্মা-শিশু হিসেবে পৃথিবীর মানুষ চিনতে না পারে সে ব্যবস্থা সাফল্যের সাথেই গ্রহণ করতে পেরেছি। আসলে কী, বারবার পৃথিবীতে আসা-যাওয়ায় আমি বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। চিরদিনের মত আসা-যাওয়ার ভেতর থাকাটা রীতিমতো ভীতিকর। এমনো হতে পারে যে এবার হয়তো এই পৃথিবীটা আমি আস্বাদ করতে চাইছিলাম- এই পৃথিবীকে অনুভব করতে, এখানে দুঃখ-যন্ত্রণা পেতে, ভালবাসতে এবং এই পৃথিবীর প্রতি কোন মূল্যবান অবদান রাখতে এবং শাশ্বতের সেই ভাব-ব্যঞ্জনাটি পেতে চাইছিলাম। তবে মাঝে মাঝে মনে হয় যে কোন একটি নির্দিষ্ট মুখের জন্য আমি বোধকরি এবার থেকে যেতে চাইলাম। আমি সেই কালশিটে পড়া মুখের নারীটির জন্য দীর্ঘ সময় পৃথিবীতে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম যিনি এই জন্মে আমার মা হবেন।

জন্মের অনুষ্ঠান যখন শুরু হতে যাবে, তখন আত্মা-পৃথিবীর চৌরাস্তার মোড়ের সড়কগুলো ছিল মনোহর এবং চিত্ররূপময় নানা সত্তার উপস্থিতিতে উজ্জ্বল। আমাদের রাজা আমাদের নিয়ে গেলেন সাত পাহাড়ের শিখরদেশে। নিঃশব্দে তিনি আমাদের সাথে কথা বললেন দীর্ঘ সময় ধরে। তাঁর রহস্যপূর্ণ কথাগুলো আমাদের হৃদয়ে যেন আগুন ধরালো। তিনি বক্তৃতা ভালবাসতেন। তাঁর নীলার মত চোখ দু’টো ধিকি ধিকি জ্বলছিল। তিনি আমাকে বললেন :

‘তুমি একটি দুষ্টু ছেলে। কত বিপদ যে তুমি ডেকে আনবে। তোমার নিয়তির নদী খুঁজে পাবার আগ পর্যন্ত তোমাকে অনেক অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। তোমার এই জীবন হবে ধাঁধাঁয় পরিপূর্ণ। তোমাকে রক্ষা করা হবে এবং তুমি কোনদিনই একা হবে না।’

এরপর আমরা সবাই সেই বিশাল উপত্যকার নিচে গেলাম। এটা ছিল উৎসবের এক অবিস্মরণীয় দিন। আমাদের ভেতরের বিস্ময়কর নানা আত্মা সঙ্গীতের দেবতার উদ্দেশ্যে আমাদের ঘিরে ধরে নাচল, সোনালি সব মন্ত্রোচ্চারণ করল তারা এবং নীলকান্তমণি যত যাদুমন্ত্র আওড়ানো হলো যেন পৃথিবীতে যাওয়ার পথে পৃথিবী ও আত্মা-পৃথিবীর মধ্যকার পরিসরে আমাদের আত্মাসমূহ নিরাপদ থাকে, রক্ত ও মাটির সাথে আমাদের প্রথম সংস্পর্শের আগে আমাদের প্রস্তত করা হল। আমাদের প্রত্যেকেই উত্তরণের সেই পথ একা-একাই তৈরি করল। একাই আমাদের পার হতে হলো আত্মা-পৃথিবীর চৌরাস্তা- সয়ে নিতে হল যত অগ্নিশিখার দাহ এবং পাড়ি দিতে হল সমুদ্র, বিভ্রমের ভেতর অবতরণ করতে হল। নির্বাসন শুরু হয়েছে।

এসবই হলো সূচনার পুরাণাদি। এসবকিছুই হল সেইসব কাহিনি ও ভাবব্যঞ্জনা. যা যে-কোন সমৃদ্ধ ভূমির মানুষের ভেতরে বীজ আকারে সুপ্ত থাকে, যেসব ভূমির মানুষেরা আজো রহস্যে বিশ্বাস করে।

এমন নয় যে পৃথিবীতে বেশিদিন থাকতে চাওয়ার জন্য এবার আমি জন্মালাম। কিন্তু পৃথিবীতে আসা-যাওয়ার মধ্যবর্তী কালচক্রগুলোর ভেতরে একটা সময়চক্র শেষ পর্যন্ত আমার গলায় এঁটে বসে যায়। আমি হাসির জন্য প্রার্থনা করলাম, প্রার্থনা করলাম ক্ষুধাহীন একটি জীবনের জন্য। আমাকে উত্তর দেয়া হলো কূটাভাসে। এটা আজো একটি রহস্য যে আমি যখন জন্মেছিলাম তখন কান্নার বদলে কিভাবে আমি বরং হাসছিলাম।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close