Home অনুবাদ বেন ওকরি > ঠাকুরের থানে যা সব ঘটেছিল >> ছোটগল্প >>> বিকাশ গণ চৌধুরী অনূদিত

বেন ওকরি > ঠাকুরের থানে যা সব ঘটেছিল >> ছোটগল্প >>> বিকাশ গণ চৌধুরী অনূদিত

প্রকাশঃ December 13, 2017

বেন ওকরি > ঠাকুরের থানে যা সব ঘটেছিল >> ছোটগল্প >>> বিকাশ গণ চৌধুরী অনূদিত
0
0

বেন ওকরি > ঠাকুরের থানে যা সব ঘটেছিল >> ছোটগল্প >>> বিকাশ গণ চৌধুরী অনূদিত

বেন ওকরি : জন্ম ১৯৫৯, নাইজেরিয়ার কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সেই The Famished Road– এর বিখ্যাত লেখক, আমাদের খুব চেনা নাম। যাদের কাছে ইনি নতুন, তাদের বলি, আফ্রিকার উত্তর-আধুনিক এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক লেখালেখির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। এই ভাষাশিল্পী লেখেন ইংরেজিতে। বেনের যখন দু’বছর বয়স তখন উচ্চশিক্ষার জন্য তার বাবা সপরিবারে লন্ডনে চলে যান , ১৯৬৮-তে জীবিকার জন্য ফিরে আসেন লাগোসে; বেনের প্রথম স্কুলে যাওয়া লন্ডনে, তারপর লাগোসে। লাগোসেই শুরু হয় তাঁর নিজস্ব শিকড়ের পরিচয়, গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, আর এই সংস্কৃতিক মিশেলই ভবিষ্যতে বেনের রচনায় প্রাণসঞ্চার করতে থাকে- এই গল্পটি ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্পের বই Incidents at the Shrine থেকে নেওয়া।

[প্রকাশিতব্য পাণ্ডুলিপি থেকে]

 

ঠাকুরের থানে যা সব ঘটেছিল

 

মাথায় কিছু একটা পড়বে এই জন্য অ্যান্ডারসন অপেক্ষা করছিল। ওর উদ্বেগ এত বেশি ছিল যে কয়েক বছরের মধ্যে এই প্রথম ও কাজে যেতে দেরী করল। আর কপাল এমনই, ওর বিভাগীয় প্রধান সেদিনই আগে থেকে কিছু না বলে-কয়েই সেদিন পরিদর্শনের দিন ঠিক করেছিল।মিউজিয়ামে পৌঁছেই ও দেখল যে যেখানে ওর লোহার চেয়ারটা থাকে সেখানে ওটা নেই। আর কাজের জন্য অন্তহীন ছোটাছুটির পর যে ছোট টুলটার ওপর পা রেখে বিশ্রাম নিত সেটাও নেই। ওর বার্তাবাহকের কাজের পোশাকটাও হুক থেকে কে যেন খুলে নিয়েছে। বড় অফিসে যেতে একজন কেরানি ওকে বলল যে ওর চাকরিটা গেছে আর ওর বড়বাবুকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অ্যান্ডারসন প্রতিবাদ করতে শুরু করতেই ঐ কেরানিবাবু উঠে ওকে ধাক্কা মেরে অফিসের বাইরে বার করে দিল।
উদ্দেশ্যহীনভাবে ও পুরাকীর্তি বিভাগের বারান্দা দিয়ে হাঁটতে থাকে। মিউজিয়ামের দর্শকদের পাশ দিয়ে টলতে টলতে এগোতে থাকল। জবা আর বুগেনভেলিয়ার বাগানে ঘুরে বেড়ালো। মিউজিয়ামের বাগানে রাখা পূর্বপুরুষদের হাতে তৈরি পাথরের জিনিষপত্রগুলো ফিরেও দেখে না। তারপর বাড়ির দিকে ফেরে, নানান জিনিসে বিভ্রান্ত মাথা কাজ করছে না, খালি মনে হচ্ছে অনেকগুলো আঙুল তার দিকে তোলা। জীবনেও দেখেনি এমন সব রাস্তা দিয়ে অ্যান্ডারসন হাঁটতে লাগল, আর কিছুক্ষণের জন্য ওর বাড়ির হাতাটাই মনে করতে পারল না।
বাড়ি ফিরে ওর খেয়াল হল ও কাঁপছে। ওর খিদে পেয়েছে। আজ সকালেও কিছু খায়নি আর খাবার রাখার আলমারিটাতেও কিছু নেই। চাকরি খোয়ানোর ব্যাপারটা নিয়ে না ভেবে আর থাকতে পারছিল না। কখনও মনে হচ্ছিল ওর বড়বাবুই তার দূরসম্পর্কের আত্মীয়কে ওর চাকরিটা দেবার জন্য মতলবটা করেছে। মনে হল, এই জন্যই বড়বাবু ছোটখাট ছুতোনাতায় ওকে সবসময় গালাগালি করত। সাত বছর এই শহরে থাকার পর আজ ওর নিজেকে ক্ষমতাহীন মনে হতে লাগল কারণ ও সমাজের কোন গুরুত্বপূর্ণ অংশের কেউ নয়, আর ওর কোন প্রভাবশালী আত্মীয়-স্বজনও নেই। সারাটা বিকেল ও পৃথিবীতে নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়ল আর নিজের মৃত বাবা-মাকে স্বপ্নে দেখল।
তেতো মন নিয়ে ওর ঘুমটা ভাঙল। বিকেল প্রায় শেষ, সারাদিন কিছুই খায়নি। বিছানা ছেড়ে উঠে স্টুয়ের জন্য একটু গরুর মাংস আর নাড়িভুঁড়ি কিনতে বাজারে গেল। গাড়ির ঘড়ঘড় আর বিক্রেতাদের চিৎকার চেঁচামেচির মধ্যে দিয়ে ও হড়কে যেতে লাগল। একটা পাঁঠার মাংসের দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। পাঁঠাগুলো দোকানের নিচে একটা খোঁয়ারে দাঁড়িয়ে আছে। পাঁঠাগুলোকে পেরিয়ে যাবার পর অ্যান্ডারসনের একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল, মনে হল পাঁঠাগুলো একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছে। দাঁড়িয়ে পাঁঠাগুলোর দিকে চাইতেই ওগুলো কেমন ভয় পেয়ে গেল। পা ঠুকে পেছনের দিকে সরে যেতে লাগল। অ্যান্ডারসন দ্রুত হাঁটা লাগাল যতক্ষণ না মাংসের দোকানের সামনে পৌঁছয়।
চারপাশে দুর্গন্ধময় বাতাস আর মাছি। শরীরটা খারাপ করতে লাগল। মেঝেতে নাড়িভুঁড়ি আর হাড়ের স্তূপ। নাড়িভূরি দরাদরি করার সময় একটা এলোমেলো আর্তনাদ শুনতে পেল যেটা জেনারেটার আর ভিডিও বক্রির দোকানের দিক থেকে আসছে। দোকানদার সবে নাড়িভুঁরিগুলো কেটে পাটার ওপর নামিয়েছে, আর ওর দাম শুনে ওকে অন্য দোকান দেখতে বলছে, ঠিক তখুনি বিস্ফোরণে আগুন ছড়িয়ে পড়ল। সমস্ত দোকানে আগুন। আর্তনাদ করতে থাকা মানুষের ঢল অ্যান্ডারসনের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। ও দেখতে পেল তাদের পেছনে ধেয়ে আসছে আগুন আর কালো ধোঁয়া। সেই ঢল ওর কাছে আসার আগেই ও দৌড় দিল।
ওর চারিদিকে শুধুই কলরব। বাতাসে শুকনো তালপাতার মচমচ করে পুড়ে যাবার শব্দ। অ্যান্ডারসন মাথা নুইয়ে একটা দোকানের খোলা চালার নীচ দিয়ে বেরিয়ে গেল, লাফ দিয়ে পেরিয়ে গেল মাছওয়ালার কিলবিলে ইলমাছে ভরা গামলা, তারপর ধপ্‌ করে এক ডাঁই গেড়ি -গুগলির ওপর পড়ে গেল। হাচর-পাচর করে উঠে জ্যোতিষী আর তাবিজ-কবচওয়ালাদের পাশ
কাটিয়ে দৌড় দিল। এভাবে নক্সাদার ফিতেওয়ালাদের দোকানের বাঁশে আটকে গিয়ে পরিষ্কার বুঝতে পারল যে আগুন ওর ঘাড়ে এসে পড়েছে কারণ নিজেকে বাঁচাবার কোন ক্ষমতাই ওর নেই। কিছুক্ষণের মধ্যে চতুর্দিকে আগুন। হঠাৎ ওই ধোঁয়ার মধ্যে অ্যান্ডারসন শুনতে পেল কে যেন ওর নাম ধরে ডাকছে। কোন একটা বিশেষ নাম নয়, সাধারণ একটা নাম, যে নাম শহরে খুব সহজেই পাওয়া যায় – অ্যান্ডারসন; অন্য নামগুলোও ও শুনতে পাচ্ছিল, এমনকি যেগুলো ভুলে গিয়েছিল : জেরেমিয়া, ওফিএগবু, জাঁতি, আজ্জি। এতো অবাক হয়ে গিয়েছিল যে যখন ছিটকে নিরাপদে বাইরের রাস্তায় এসে পড়ল ও জানতেই পারল না যে বেরোবার সময় জং ধরা দুটো পেরেকে লেগে ওর থাই থেকে কী পরিমাণ রক্ত ঝড়ছে। বাড়িতে পৌঁছবার পরেও রক্ত পড়ছিল। রক্ত পড়া বন্ধ হলে ওর মনে হল বাইরে থেকে কোন একটা শক্তি ওর মধ্যে ঢুকে পড়েছে, আর একটা অসুস্থতা ওর সারা শরীরে ছেয়ে গেল।
ওর এতো শরীর খারাপ হ’ল যে গত এক বছরে বহু কষ্ট করে ঘাম ঝরিয়ে যে পয়সাটা বাঁচিয়েছিল সেটা সবটাই স্থানীয় হাতুড়ে ডাক্তারদের পকেটে গেল। ওরা ক্ষতটায় ব্যান্ডেজ বেঁধে, বাঁকা সিরিঞ্জ দিয়ে টিটেনাস দিয়ে দিল। বেঁটে বেঁটে বোতলে করে ওষুধের বড়ি দিল। তাতে অ্যান্ডারসন কোন মতে হামাগুড়িঁ দিয়ে ঘর থেকে পায়খানা, আর পায়খানা থেকে ঘরে আসতে পারছিল, যদিও দিনের আলো দেখলে ভয় পেতো। তারপর, তিনদিন অসুস্থ থাকার পর, মুখে যখন বাসি ফিটকারির স্বাদ, ও নিজেকে আয়নায় এক ঝলক দেখতে পেল। দেখল একটা অস্থিচর্মসার অচেনা লোকের মুখ। আরও দুদিন পর যখন মনে হল যথেষ্ট সুস্থ হয়ে গিয়েছে, তখন বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে দেশে, গাঁয়ের বাড়ির দিকে পা বাড়াল।

প্রতিমা-শিল্পী

অ্যান্ডারসন অনেকদিন বাড়ি যায় নি। লরি-ড্রাইভার ওকে ওদের গ্রামের মুখে নামিয়ে দিতে ও প্রথমেই লক্ষ করল গরমের তীব্রতা আর পচা সব্জির পূঁতিগন্ধ। গ্রামে যাবার নোংরা রাস্তাটা ধরল। একদল কুকুর কিছুক্ষণ ওর পিছেপিছে গিয়ে আর গেল না। চারিদিকে বন থেকে ভেসে আসা গরুর শিংয়ের শিঙা আর ঢাকের আওয়াজ। ঘাসজমির ধারে ধারে ও দেখতে পেল পোকায় খাওয়া সব মুখোশ।
ঘেমে নেয়ে যাবার পর ও সেই ওবেচে গাছটা পেল যেখানে গত যুদ্ধের সময় সৈন্যরা চর সন্দেহে একজন মহিলাকে গুলি করে মেরেছিল। গ্রামের সীমানা শুরু হয় যেই কুয়োঁটা থেকে সেটার পাশ দিয়ে যাবার সময় ওর মনে হলো তিনটে আবছা আবয়ব ওর পিছনে ছুটে আসছে। তাদের চোখগুলো ভাঁটার মতো জ্বলছে, আর ওর নাম ধরে ডাকছে।
‘অ্যান্ডারসন, ওফিএগবু !’
ও ঘুরে দৌড় দিল। ওরাও লাফিয়ে ওর পেছনে ছুটতে লাগল।
‘অ্যান্ডারসন, ওফিএগবু !’
ভয়ে ও এমন দৌড় লাগিয়েছিল যে ওর প্যাঁটরা খুলে পরে গেল। জামাকাপড়, ওষুধ, আর বাড়ির লোকদের দেবার জন্য মাঝারি মাপের সব উপহার, যেগুলো অন্তত বলে দেবে যে ও খুব একটা ছোটখাটো লোক নয়, সেইসব জিনিস ওর পেছনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রইল। ঐ বাক্সের আশা ছেড়ে, পিছনের দিকে না তাকিয়েই ও গতি বাড়িয়ে ছুটতে লাগল।একটা ধূলোর ঘূর্ণী ওর দিকে আসতে লাগল। ধূলো থেকে বেরিয়ে ও ওদের গ্রাম দেখতে পেল।
তখন সূর্য ডোবেডোবে। অ্যান্ডারসন নিরাপদে গ্রামে পৌঁছন অবধি দৌড়তেই থাকল যতক্ষণ না গ্রামের খাজনা আদায়ের অফিসের সামনে এসে পৌঁছল যেখানে একটা সাইনবোর্ডে লেখা আছে : মেসার্স আবাস অ্যান্ড কোং, অনুজ্ঞাপ্রাপ্ত কর আদায়কারী। অফিসের বাইরে একটা ঝুলে যাওয়া বেতের চেয়ারে একটা লোক বসে ছিল। রাস্তার দিকে লক্ষ্যহীন ভাবে চেয়ে লোকটা ধীরে ধীরে নাক ডাকছিল। হাঁপাতে হাঁপাতে অ্যান্ডারসন সেখানে এসে দাঁড়াল। ও ওর কাকার বাড়ি যাবার রাস্তাটা জানতে চাইছিল, কিন্তু ঐ খাজনা আদায়ের অফিসের ওই কর্তার ঘুম ভাঙাতে চাইছিল না।
ও ঠিক বুঝতে পারল না লোকটার কখন ঘুম ভাঙল, লোকটা হঠৎ ওকে জিজ্ঞাসা করল : ‘তুমি কেন পাগলের মতো দৌড়ে আমাদের গ্রামের মধ্যে ঢুকলে ?’
অ্যান্ডারসনের কোন কথা যোগাল না। ও ঘামতে লাগল।
‘ঐভাবে দৌড়ে আমাদের গ্রামের মধ্যে ঢুকে তুমি আমার চোখদুটোকে কষ্ট দিয়েছ।’
অ্যান্ডারসন ওর মুখটা মুছল। বুঝতে পারছিল না কী করবে। মাপ চাইতে যাবে তখনই দেখে যে লোকটা ওর দিকে একবার চেয়ে আবার চোখ খুলে ঘুমতে গেল। ও বুঝে পেল না কী করবে। খুব পিপাসা পেয়েছে। মুখ থেকে টপটপ করে ঘাম ঝরছে, ভবঘুরের মতো গ্রামের মধ্যে দিয়ে চলতে থাকল।
ওর বাইরে থাকার সময় সবকিছু কেমন পালটে গেছে। ধুলো লেগে বাড়ী ঘরদোরের নিজস্ব রং হারিয়ে গেছে। ঘরদোরগুলো যেখানে থাকার কথা তার থেকে কয়েক গজ পিছিয়ে গেছে। ও যেরকম মনে করতে পারে তার থেকে কোণাকুণিভাবে রাস্তাগুলো চলে গেছে। মনে হলো এমন একটা জায়গায় এসে পড়েছে যে জায়গাটা সম্বন্ধে ও কখনও কিছু জানত না।
ক্লান্ত, অবসন্ন অ্যান্ডারসন বাজারের বাইরে একটা বেঞ্চিতে গিয়ে বসল। রাস্তার ধারটা পিঁপড়েতে ভর্তি। গরমে, ঘামে ওর ঘুম পাচ্ছিল। ওর পেছনে বাজারটায় কেউ নেই, কিন্তু ওটার অনেক ভিতর থেকে ও তর্কাতর্কি আর কেত্তনের আওয়াজ পাচ্ছিল। ওর কানে আসছিল পৃথিবীর অপর প্রান্ত থেকে আসা অজানা সব দেশের ভাষা আর কন্ঠস্বর। এইসব ভাবতে ভাবতেই ঐ বেঞ্চিটার অপর ঘুমিয়ে পড়ল আর স্বপ্ন দেখতে লাগল। পিঁপড়েরা তাকে কাঁধে করে গ্রামের মধ্যে দিয়ে নিয়ে চলেছে। জেগে উঠে দেখল ও রয়েছে ঐ খাজনা আদায়ের অফিসের ভিতর,আর ওর পা চুলকোচ্ছে।
যে লোকটাকে ও শেষবার বেতের চেয়ারটায় ঘুমতে দেখেছিল সে এখন খাজনা আদায়ের খিড়কির পেছনে বসে দেশী মদে কিছু ভেষজ ওষধি মেশাচ্ছে। ওখানে গাঁট্টাগোট্টা চেহারার চওড়া কপাল আর কাঠখোট্টা মুখের আরেকটা লোককে দেখল।
অ্যান্ডারসনের দিকে চেয়ে সেই লোকটা বলল : ‘তোমার কি যথেষ্ট ঘুম হয়েছে?’
অ্যান্ডারসন মাথা নাড়ল। খাজনা আদায়ের খিড়কির পিছনে বসে থাকা লোকটা ভেষজে ভর্তি একটা গেলাস নিয়ে এল।
অ্যান্ডারসনের গলায় ওটা জোর করে ঢেলে দিতে দিতে বলল : ‘তাড়াতাড়ি এটা খেয়ে নাও।’
এক ঢোকে অ্যান্ডারসন ওটার বেশিটাই খেয়ে ফেলল। ভয়ানক তেতো, মুখে যেন পিত্তি উঠে আসছিল।
‘গিলে ফেল।’
অ্যান্ডারসন গিলে ফেলল। মাথাটা যেন একটু পরিষ্কার হ’ল, পায়ের চুলকানিটাও আর নেই।
যে লোকটা ওকে পাচনটা গিলিয়েছিল বলল : ‘বেশ’। তারপর অন্য লোকটিকে দেখিয়ে বলল : ‘তোমার কাকা। আমাদের প্রতিমা-শিল্পী। তুমি কি ওনাকে চিনতে পারছ না?’
অ্যান্ডারসন প্রতিমা-শিল্পীর মুখের দিকে তাকাল। আলো সরে গেছে। মুখটা যেন চেনাচেনা। কাকাকে চেনার জন্য আগে ওকে প্রতিমা-শিল্পীর ভয়ঙ্কর কঠিন মুখের আদল থেকে সাতটা বছর বাদ দিতে হবে।
ও বলল : ‘কাকা, তুমি অনেক বদলে গেছ !’
‘ঠিকই বলেছ বাবা, তুমিও অনেক বদলে গেছ !’
‘তোমাকে দেখে খুব আনন্দ হচ্ছে।’
মৃদু হেসে অ্যান্ডারসনের কাকা দরজার দিকে গেলেন। আলোয় অ্যান্ডারসন দেখল ওনার বাঁ-হাতটা কোঁচকানো।
‘আমরা আশা করছিলাম তুমি আসবে।’
অ্যান্ডারসন ভেবে পাচ্ছিল না ও কী বলবে। ও দুজনকেই দেখে যাচ্ছিল। তারপর হঠাৎ ও আবাস মশাইকে চিনতে পারল, মনে পড়ল উনি ওকে গ্রামের ধারে নদীতে মাছ ধরতে নিয়ে যেতেন।
‘আরে, আবাস মশাই ! আপনি !’
‘আলবাৎ, আমি। তুমি আমাকে কে মনে করেছিলে ?’
অ্যান্ডারসন উঠে দাঁড়াল।
‘প্রণাম। আমায় মাপ করবেন, সবকিছু এত বদলে গেছে।’
অ্যান্ডারসনের কাকা শুভাকাঙ্খীর মতো ওর কাঁধে হাত রেখে বলল : ‘ঠিক আছে। এখন চলো।’
কাকার কথা শুনেও অ্যান্ডারসন দাঁড়িয়েই রইল। তারপর নিজের দুর্বল স্মৃতির জন্য মাপ চাইতে লাগল।আর ওনাদের জানাল যে গ্রামের সীমানায় কেউ ওকে তাড়া করেছিল।
‘উদ্ভট সব লোক। সাধারণ অপরাধীদের মতো ওরা আমায় তাড়া করেছিল।’
প্রতিমা-শিল্পী বলল : ‘চলো। এগোই। উদ্ভট কিছু নিয়ে আমারা আমাদের গ্রামে কোনো আলোচনা করি না। আমাদের এখানে কোন উদ্ভট জিনিস নেই। এখন চলো, এগোন যাক।’
আবাস মশাই বাইরে বেরিয়ে আবার সেই ঝোলা বেতের চেয়ারটায় গিয়ে বসলেন। প্রতিমা-শিল্পী অ্যান্ডারসনকে অফিসের বাইরে নিয়ে আসে।
তারা দুজনে শুকনো গরমের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে থাকে। বনের ভিতর থেকে পূজারীদের মন্ত্রের আওয়াজ ভেসে আসছিল। দূর থেকে ঝিমধরা বাতাসে ভেসে আসচ্ছিল ঢাক আর ঘন্টার শ্রতিকটু শব্দ।
‘গ্রামটা বদলে গেছে।’
প্রতিমা-শিল্পী চুপ।
‘এখানে কী হয়েছে ?’
একটু বিরক্ত হয়েই প্রতিমা-শিল্পী বলল : ‘প্রশ্ন কোরো না। আমাদের গ্রামে প্রশ্ন করার প্রয়োজনের আগেই আমরা তোমাকে উত্তর দিয়ে দেব।’
অ্যান্ডারসন চুপ করে রইল। গ্রামের পথে যেতে যেতে প্রতিমা-শিল্পীর দিকে তাকিয়েই রইল : প্রতিমা-শিল্পীর দিকে ও যতোই তাকায় ততই তাঁকে আরও আদিম আর দেবতাদের মতো লাগে। মনে হয় তিনি যেন মনুষ্যজাতির থেকে এক স্বাধীনতা লাভ করেছেন। তাঁকে দেখে মনে হয় যেন বা পাথরে কোঁদা, আর বন্য প্রকৃতির মধ্যে ফেলে রাখা এক প্রতিমা।
প্রতিমা-শিল্পী বলল : ‘তুমি যতো তাকিয়ে থাকবে, ততো কম দেখবে।’
কথাটা শুনে অ্যান্ডারসনের মনে হলো এটা একটা সংকেত। ওরা একটা রাস্তার মুখে এসে পড়ল। ওদের সামনে সব মসৃণ একশীলার খন্ড। মানুষের বিমূর্ত আবয়ব খোদাই করা, তাদের প্রজাতির শিশু থেকে অস্বাভাবিক বড় মানুষের আবয়বের এক একটা একখন্ড-শিলা। ওদের সামনে জ্বলন্ত সব মোমবাতি, আর নিবেদন করা নানান নৈবেদ্য। তাদের মধ্যে ছড়িয়ে আছে ইরোকো২ আর কাঠচাঁপার গাছ। ছড়িয়ে আছে ফুলে ফুলে ভরে থাকা লাল রঙে রাঙানো সব বাঁশের খুঁটি।
ওর কাকা বলল : ‘মূর্তিগুলো আদিতে ছিল দারুণ সব মুক্তো, নীলকান্তমণি, নীলা আর জাদুদর্পণ দিয়ে সাজানো, দেখলেও চোখ ধাঁধিয়ে যেত। কিন্তু সমুদ্র পেরিয়ে আসা ফ্যাকাশে লোকজনেরা এসে সেগুলো চুরি করে নিয়ে গেছে। স্বপ্নে আমার কানে ফিসফিসিয়ে বলা একথা আমি শুনেছি।’
অ্যান্ডারসন ওই অদ্ভুত সুন্দর সব একশিলাগুলোর দিকে তাকিয়ে ঠাউর করে বলল : ‘তোমার আর তোমার পুজো করা ঠাকুরের মধ্যে খুব মিল।’
সহসা ওর কাকা ওর হাতটা চেপে ধরল।
‘আমরা কোন মিল নিয়ে আমাদের গ্রামে কথা বলি না। শুনেছ কি ?’
মাথা নাড়ল অ্যান্ডারসন। ওর কাকা মুঠি আলগা করল। আবার ওরা চলতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর ওর কাকা বলল : ‘পৃথিবীটাই একটা ঠাকুরের থান আর ঠাকুরের থানটাই পৃথিবী। সবকিছুরই একটা কেন্দ্র আছে। যখন তুমি ছাইপাঁশ বকবে, নোংরা জিনিস তোমার মুখে উড়ে দিয়ে পড়বে।’
ওনেকগুলো বাড়িঘরের পাশ দিয়েওরা যাচ্ছিল। হঠাৎই প্রতিমা-শিল্পী লাফ দিয়ে এগিয়ে গেল। গোলাকার একটা মেটে ঘরের সদর দরজাটার সামনে এসে ওরা দাঁড়ায়। প্রতিমা-শিল্পী কুলুঙ্গির কাছে গিয়ে ওটার ভিতর থেকে এক টুকরো দেশি খড়ি, একটা গ্লাস আর এক বোতল ভেষজ ওষধি বার করল। সবগুলো মিশিয়ে একটা মন্ড তৈরি করে ও সেটা অ্যান্ডারসনের কপালে লেপে দিল। তারপর দরজার ওপরে একটা পেরেকে ঝোলা ঘন্টাটা তিন বার বাজাল।
কুঁড়ের ভিতর থেকে স্বর ভেসে এল।
প্রতিমা-শিল্পী সেই স্বরেদের উদ্দেশে বিভিন্ন নামের নানারকম স্তুতি আউড়ে গেল, তারপর আর্ত ‘ভূমিপুত্র’কে নিয়ে ভিতরে ঢোকার অনুমতি চাইল।
বহুস্বর জানতে চাইল ‘ভূমিপুত্র’ ভিতরে ঢোকার জন্য প্রস্তুত কিনা।
প্রতিমা-শিল্পী চুপ করে রইল।
সহসা ভিতর থেকে ঢাক, শিঙা, ঘন্টার বিশৃঙ্খল আওয়াজ ভেসে আসে। অ্যান্ডারসন অজ্ঞান হয়ে গেল।
প্রতিমা-শিল্পী তখন সেই বহুস্বরের উদ্দেশে বলে : ‘ ও ভিতরে ঢোকার জন্য তৈরি।’
ওরা বাইরে এসে দেখল অ্যান্ডারসন খুব হালকা।
ওরা ওকে দলা পাকিয়ে মঠের ভিতর নিয়ে গিয়ে জমাট বাঁধা পাম তেলের ওপর শুইয়ে দিল।

প্রতিমা

জ্ঞান ফিরলে অ্যান্ডারসনের নাকে এল মোমবাতি, মিষ্টি আর ধূপের গন্ধ। ওর সামনে উজ্জ্বল দ্যুতির আসল দামী সব মণিমাণিক্য আর ঝকমকে কাচ দিয়ে সাজানো মূল প্রতিমা, এক অলীক যোদ্ধার এক একশিলার মূর্তি। সেই প্রতিমার পাদদেশ রাখা আছে শিকড়-বাকড়, কোলা-বাদাম আর পাখির পালক। অ্যান্ডারসন ঐ মূল প্রতিমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শুনতে পেল সেইসব স্বর যা কথা বলার সময় বলা হয় না, আর অনুভব করল তন্দ্রা তাকে গ্রাস করছে।
ধূপের নীল ধোঁয়ার মধ্যে মোমবাতিগুলো জ্বলছিল। পূজারিদের একটা ছোট্ট দল নেচে নেচে অ্যান্ডারসনের নাম করে দুলেদুলে গান গাইছিল। বাইরের বারান্দা থেকে ভেসে আসছিল দুঃখদুর্দশা দূর করার জন্য অন্যান্য ভক্তদের হৃদয় নিংড়ানো কান্নাভেজা দয়াপ্রার্থনা।
যারা কখনোই সেরে উঠবে না সেই অসুস্থ লোকদের মতো ছিল ওদের দয়া ভিক্ষা। অ্যান্ডারসনের মনে হলো প্রার্থনার এরকম আতিশয্য নিশ্চিতভাবেই একটা নিষ্ঠুর জগতের চাওয়া।
অ্যান্ডারসন শোয়া থেকে ওঠার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। মূল প্রতিমাটা যেন তার উদ্ভট মুখটা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। পূজারীরা তাকে ঘিরে আছে। গানে গানে তাঁর বন্দনা করছে। হঠাৎই প্রতিমা-শিল্পীর নির্দেশে পূজারীরা অ্যান্ডারসনের দিকে ছুটে এল। এসে তাদের অতগুলো হাত বাড়িয়ে দরদে গলে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু তাকে স্পর্শ করতেই অ্যান্ডারসন মৃগীরুগীর মতো আর্তনাদ করে উঠল। পূজারীরা তাদের নির্মম হাতের বেড়ে বেঁধে তাকে রাতের অন্ধকারে বাইরের বারান্দায় নিয়ে এল। তারপর বাইরের একশিলাগুলোর পাশ দিয়ে, নালার পাশ দিয়ে, শুকনো নদীর জলভরা ডোবাগুলোর পাশ দিয়ে তাকে নিয়ে চলল। ফুলে ফুলে ভরে থাকা কাঠচাঁপার গাছের নীচে এসে তাকে নামিয়ে রাখল।
তারপর তারা ধোঁয়ার ঝাপটা তুলে পিছোতে লাগল, আর শেষে অন্ধকারে এমনভাবে মিলিয়ে গেল যেন বা অন্ধকার ওদের দিয়েই গড়া।
অ্যান্ডারসন বনের মধ্যে ফিসফিসানি শুনতে পেল। শুনতে পেল গাছের ডাল থেকে কিছু পড়ে যাবার শব্দ। তারপর শুনল তার দিকে এগিয়ে আসা এক অনন্ত পদধ্বনি। কিছুক্ষণের মধ্যে ও দেখতে পেল আবাসমশাইকে, এক হাতে একটা বালতি, আরেক হাতে একটা বাতি নিয়ে আসছেন। এসে অ্যান্ডারসনের কাছে বালতিটা নামিয়ে রাখলেন।
‘এটা দিয়ে চান সেরে নাও’, এই বলে তিনি যে পথে এসেছিলেন সে পথেই ফিরে গেলেন।
অ্যান্ডারসন সেই বিশেষ জলে গা ধু্ল। গা ধোয়া শেষ হলে পূজারীরা এসে তাকে পরিস্কার জামাকাপড় দিল। তারপর তাকে আবার সেই থানে ফিরিয়ে নিয়ে গেল।
প্রতিমা-শিল্পী ওর জন্য অপেক্ষা করছিল। আশু প্রয়োজনের শশব্যস্ততায় তার নুলো হয়ে যাওয়া হাতটা এমন অস্থিরভাবে নড়ছিল যে মনে হচ্ছিল যেন ওটা তার কাজের দরকারি কোনো যন্ত্র। তিনি অ্যান্ডারসনের হাতটা খপ্‌ করে ধরে তাকে একটা কুঠুরিতে নিয়ে গেলেন।
সেখানে অ্যান্ডারসনকে একটা দরজার সামনে বসিয়ে দিলেন। দরজার নীচে ছিল পাম তেলে ভরা একটা গর্ত। প্রতিমা-শিল্পী চিৎকার করে একটা নির্দেশ দিলে একদল খিদমতগার অ্যান্ডারসনের কাছে এসে ওর মুখটা মাটিতে চেপে ধরল। ওকে ঠেলে সেই গর্তের দিকে নিয়ে গিয়ে ওর মুণ্ডু আর কাঁধ ঐ গর্তে ঠেসে ধরল।
যন্ত্রণা পেতে পেতে ও শুনল প্রতিমা-শিল্পীর গলা : ‘কী দেখতে পাচ্ছিস বল!’
অ্যান্ডারসন কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। যা পাচ্ছিল তা হল চুরচুর হয়ে যাওয়ার ব্যথা। তারপর দেখল বিশাল উঁচু একটা গাছ। গাছের গোড়ায় একটা দরজা। দেখল একটা নীল পর্দা। সেই পর্দা থেকে বেরিয়ে এল এক নারী। তার সারা গায়ে দেশি খড়ির আঁকিবুঁকি। কনুই অবধি হাতভরা চুড়ি। কোমর আর পেট পুঁতিতে ঢাকা।
‘একটি নারীকে দেখতে পাচ্ছি’, ও চিৎকার করে উঠল।
বহুস্বর জানতে চাইল : ‘তুমি কি তাকে চেন ?’
‘না।’
‘সে কি তোমাকে অনুসরণ করছে?’
‘আমি জানি না।’
‘সে কি মৃত ?’
‘আমি জানি না।’
‘সে কি মৃত?’
‘না।’
ঘণ্টার টুংটাং শব্দের উল্লাস।
‘ও কী করছে ?’
গাছের কাছে এসে ও দরজা খুলছে।এক নির্মম মানসিক যন্ত্রণায় বিদ্ধ হল অ্যান্ডারসন। সেই নারী দ্বিতীয় একটা দরজা খুলল, তারপর চেষ্টা করল তৃতীয় একটা দরজা খোলার, কিন্তু ওটা খুলল না। ও আবার চেষ্টা করল, আর যখন ও ওটা ভেঙে অ্যান্ডারসনের পথ তৈরি করতে যাবে – অ্যান্ডারসন জ্ঞান হারাল।
#
পরে, তারা ওকে যথেষ্ট পরিমাণে খেতে দিল। তারপর ও গ্রামের ভিতর ঘুরে বেড়াবার আর আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি যাবার স্বাধীনতা পেল। পরদিন তারা প্রতিমা-শিল্পীকে ওকে আনতে পাঠাল। খিদমদগারেরা ওকে একটা গরুর চামড়ায় তৈরি মাদুরে বসতে দিয়ে ওর মাথা কামিয়ে দিল। ওর চারদিকে লাল আর সবুজ মোমবাতি জ্বালিয়ে ওরা গান গাইতে শুরু করল। এরপর প্রতিমা-শিল্পী ওর শরীরের ভিতরের সব অপবিত্র জিনিস বার করার জন্য এগিয়ে গিয়ে অ্যান্ডারসনের কাঁধে ভেষজ রস ঘসতে লাগল। তারপর কাঁধের মাংসে কামড় দিয়ে একটা ছোট জংধরা তালা বের করে এনে থুঁতিয়ে ওটাকে একটা এনামেলের বাটিতে ফেলে দিল। এরপর তালাটাকে পরীক্ষা করেও দেখল। মুখটা পরিস্কার করে আবার অ্যান্ডারসনের কাঁধে কামড় বসাল আর একটা বাঁকানো সূঁচ বার করে আনল। এভাবে একটা ভাঙা গ্লাস, একটা বাঁকা পেরেক, একটা কড়ি আর একটা ছোট চাবি বার করে থামল। চাবিটা দিয়ে তালাটা খোলা যাবে কিনা এ নিয়ে একচোট তর্ক-বিতর্ক হল, কিন্তু তালা খোলা গেল না।
এসব করে প্রতিমা-শিল্পী সেই বাটিটা নিয়ে সেই জিনিসগুলোকে নাড়িয়ে কর্কশ শব্দ তুলে বলল : ‘এই সব জিনিস কোথা থেকে এল ? কে ওগুলো তোমার ভেতর পাঠাল?’
অ্যান্ডারসন কিছুই বলতে পারল না।
প্রতিমা-শিল্পী একটা ক্ষুর দিয়ে অ্যান্ডারসনের হাতের চামড়া হালকা করে কেটে দিতে দিতে ওইসব ক্ষতমুখে প্রতিষেধক ভেষজ ঘসতে লাগল। তারপর হাত ধুয়ে সেই কুঠুরিটায় গেল। তারপর একটা বটুয়া হাতে ফিরে এসে বটুয়াটা অ্যান্ডারসনকে দিয়ে ওটা কিভাবে ব্যবহার করতে হবে সে বিষয়ে ছোট করে নির্দেশ দিয়ে দিল।
তারপর বলল : ‘তুমি কাল শহরে ফিরে যাবে। তোমার কাজের জায়গায় যাবে, গিয়ে ওখানে তোমার যা পাওনা সেটা নিয়ে অন্য কাজের চেষ্টা করবে। তোমার কোন সমস্যাই হবে না। বুঝলে ?’
অ্যান্ডারসন মাথা নাড়ল।
‘আর শোন, একদিন হাতে চোট পেয়ে আমি গভীর বনের ভিতরে গিয়েছিলাম। একটা কারখানায় কাজ করার সময় চোটটা পাই। তিন দিন আমি বনের মধ্যে থেকে আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে প্রার্থনা করছিলাম। তখন আমি শুধু শাক-পাতা আর মাছ খেয়ে থাকতাম। চতুর্থ দিনে আমি ভুলেই গেলাম যে আমি কোথা থেকে এসেছি। পুরনো সবকিছু ভুলে গেলাম, সবকিছুই আমার নতুন মনে হলো। পঞ্চম দিনে আমি ঐ প্রতিমাগুলো খুঁজে পেলাম। বড় বড় গাছ আর লম্বা লম্বা ঘাসের আড়ালে ওগুলো লুকোনো ছিল। চারিদিকে ছিল সাপ আর কচ্ছপ। আমার ব্যথা চলে গেল। যখন বাড়ি ফিরে এসে আমি গ্রামের বয়স্কদের কী দেখেছি বললাম তারা কেউ তা বিশ্বাস করল না। প্রতিমাগুলো নিয়ে গ্রামে অনেকদিন কথা হতে থাকল কিন্তু কেউই আসলে ওগুলো দেখে নি। সেকারণেই ওরা আমাকে প্রতিমা-শিল্পী বানাল।’
একটু থেমে ও আবার শুরু করল।
‘প্রত্যেক বছর, এই সময় নাগাদ, পৃথিবীর সমস্ত আত্মারা আমাদের এই গ্রামে এসে জড়ো হয়। তারা বাজারে জড় হয়ে পৃথিবীর যাবতীয় ব্যাপার নিয়ে গরমাগরম আলোচনা করে। কখনও কখনও তারা বাইরে রাখা প্রতিমাগুলোর চারধারেও জড়ো হয়। কোনও কোনও সন্ধ্যায় ইরোকো গাছটার চারদিকে রক্তবেগুনি রঙের ধোঁয়াশা দেখা যায়। রাতে আমরা পৃথিবীর সবরকম ভাষা, সবরকম দর্শনের কথা শুনতে পাই। তুমি মাঝে মাঝেই গ্রামে আসবে। এটা সেই জায়গা যেখান থেকে তুমি ক্ষমতা আহরণ করতে পারবে। শুনেছ ?’ অ্যান্ডারসন মাথা নাড়ল। ও ওর প্রায় কোন কথাই শোনেনি। ও শুধু এনামেলের বাটিটার দিকে তাকিয়ে ছিল।
প্রতিমাখেকোরা

অ্যান্ডারসন ওর শরীরের শুদ্ধিকরণের পর যে অনুষ্ঠান চলছিল তখন খুব কম খেয়েছিল। সমস্ত নাচ-গান, শিঙা ফোঁকা, টুং-টাং ঘন্টার আওয়াজ শেষ হবার পর তারা অ্যান্ডারসনকে মূল-প্রতিমাটার সামনে নিয়ে গিয়ে শোয়াল। আর তখনই ও বাবার জন্মে শোনেনি এমন জোরালো বজ্রগম্ভীর স্বরে ঠাকুরের থান কেঁপে উঠল।
‘অ্যান্ডারসন ! ওফিএগবু ! তুমি একজন ক্ষুদ্র মানুষ। তুমি তোমার ভবিষ্যৎ থেকে পালাতে পারো না। তোমাকে ছাড়া সরকারের অস্তিত্ব নেই । পৃথিবীর সমস্ত বির্পযয়ের দায় তোমার ওপর বর্তাবে আর তোমার নাম জড়িয়ে থাকবে। এটাই তোমার ক্ষমতা ।’ পুরোহিতরা ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে আনন্দে কাঁদতে থাকল।
#
অ্যান্ডারসন মূল-প্রতিমাটার সামনে রাতটা কাটাল। স্বপ্ন দেখল ও খিদের চোটে মরে যাচ্ছে আর ওর খাওয়ার মতো পৃথিবীতে কোথাও কিছু অবশিষ্ট নেই। যখন ও মূল-প্রতিমাটা খাচ্ছিল তখন ওটার মিষ্টতায় অবাক হয়ে গেল। আরও অবাক হল এই দেখে যে প্রতিমাটা আপনাআপনিই আবার সম্পূর্ণ হয়ে উঠল।
সকালবেলায় দেখা গেল অ্যান্ডারসনের পেট বিনা ওজনের কিছুতে ফুলে ঢাউস হয়ে আছে। ওর ফেরার কিছুক্ষণ আগে প্রতিমা-শিল্পী ওর কাছে এসে ওকে ঠাকুরের থানে কিছু দান করতে বলল। দান করার পর প্রতিমা-শিল্পী ওকে আশীর্বাদ দিল। পুরোহিতরা ওর জন্য প্রার্থনা করল আর ওর নিয়তির জন্য গান গাইল।
বাড়ি ফেরার জন্য অ্যান্ডারসনের কাছে যথেষ্ট পয়সা ছিল। ফেরার জন্য প্রস্তুত হতেই অ্যান্ডারসন অনুভব করল ওর ওপর একটা নতুন ভার বর্তাচ্ছে। কাকাকে সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে ও গ্রামের পথ ধরে পা বাড়াল।
খাজনা আদায়ের অফিসের সামনে একটু দাঁড়াল। আবাসমশাই তার সেই ঝোলা বেতের চেয়ারটায়, তার চোখদুটো দুটো আলাদা দিকে তাকিয়ে আছে। অ্যান্ডারসন নিশ্চিত হতে পারল না যে আবাসমশাই ঘুমিয়ে আছেন কি না। ও বলল : ‘আমি চললাম।’
‘আমাদের ক্ষুদার মধ্যে রেখে তুমি সত্যি সত্যি যাচ্ছ ?’
‘আমি যেখানে যাচ্ছি ক্ষুদা সেখানেই।’
আবাসমশাই হেসে বললেন : ‘তোমার হৃদয়টা শুদ্ধ রেখো। সাহস রেখো। দুঃখ-ক্লেশ আমাদের মারতে পারবে না। আর ভালোভাবে যেও।’
‘ধন্যবাদ।’
মাথা নেড়েই আবাস মসাই আবার নাক ডাকতে লাগলেন।অ্যান্ডারসন মোড়ের দিকে হাঁটা লাগাল।
গ্রামের প্রচন্ড গরমের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে অ্যান্ডারসনের নিজেকে একটা বুড়োলোক বলে মনে হতে লাগল।ওর মনে হল ওর মুখের চামড়া শক্ত হয়ে গেছে। রাবার চাষের বাগান, তার সীমানা পেরিয়ে যখন ও মোড়ের দিকটায় যাবে ঠিক তখনই সেই জ্বলন্ত চোখের আবছা আবয়বগুলো ওর ঘাড়ে পড়ল।ও ওর শক্ত হাত-পা দিয়ে চাবুকের মতো মেরে, লড়াই করে তাদের সরিয়ে দিল। ওরা খুব সহজেই ওকে টুকরো টুকরো করে ফেলতে পারতো, কারণ ওদের হিংস্রতা ছিল ওর থেকে বেশি। এমন একটা সময় হয়েছিল যখন ওর মনে হচ্ছিল ও নিজেকে মৃত দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু ওরা হঠাৎই থেমে গেল আর ওর দিকে চেয়ে রইল। তারপর থাবা চালাল, যদিও কোনো একভাবে ও ওদের স্বজাতি হয়ে উঠেছিল। যখন ওরা সেই গরম ধোঁয়াশায় মিলিয়ে গেল, অ্যান্ডারসন একটা নতুন সহজ-সরল জীবনের স্বাদ অনুভব করল, আর ওর চলাও বহাল রইল।

টীকা
(১) ওবেচে : আফ্রিকা মহাদেশের একধরনের গাছ, বৈজ্ঞানিক নাম, Triplochiton scleroxylon, সাধারণ নাম – আবাচি; নাইজেরিয়ায় ‘ওবেচে’, ঘানায় ‘ওয়াওয়া’, ক্যামেরুনে ‘আয়ুস’ আর আইভরি কোস্টে ‘সাম্বা’ নামে পরিচিত, এই গাছের কাঠ থেকে খুব ভালো গিটার তৈরি হয়।
(২) ইরোকো : আফ্রিকা মহাদেশের একধরনের গাছ, বৈজ্ঞানিক নাম, Milicia excelsa, এই গাছ ৫০০ বছর অবধি বাঁচে;ইরুবা প্রজাতির লোকজনদের কাছে এই গাছ ‘ইরোকা’ নামে পরিচিত। ইরুবা এবং অন্যান্য অনেক আফ্রিকাবাসীদের বিশ্বাস এই গাছের কিছু আধিভৌতিক ব্যাপার আছে, তারা মনে করে এই গাছে ভূত / বিদেহী আত্মা বাস করে, আর কেউ যদি ঐ ‘ইরকো-মানুষ’-দের সামনাসামনি দেখে ফেলে তবে সে পাগল হয়ে খুব তাড়াতাড়ি মারা যায়।
(৩) কোলা-বাদাম : আফ্রিকার চিরহরিৎ বৃক্ষ ‘কোলা’ গাছের ফল। এই ফলের ভিতর প্রায় এক ডজন বাদামের মতো বীজ থাকে। এই বীজ চিবোলে প্রথমে একটু তেতো লাগলেও পরে মিষ্টি মিষ্টি লাগে, আর এতে ক্যাফিন থাকার কারণে এটা খেলে শরীরে ও মনে এক ধরণের চনমনে ভাব আসে। আফ্রিকার বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষত এই বীজ/বাদাম বিভিন্ন পুজো বা ধর্মীয় অনিষ্ঠানে এবং নামকরণ, শুভবিবাহ, পারলৌকিক ক্রিয়ায় পবিত্র নৈবেদ্য হিসেবে গণ্য হয়।এছাড়া এই ফল চার টুকরো করে কেটে, একটা কাঠের পাটার ওপর পাশার দান ফেলার মতো করে ফেলে প্রশিক্ষিত পুরোহিতরা ভবিষ্যৎ গণনাও করে। অতিথিকে সন্মান জানাতেও এই বীজ/ বাদাম খেতে দেওয়া হয়। তাছাড়া ওষুধ হিসেবেও এর বহুল ব্যবহার আছে। এটা চিবোলে রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়ে, মনঃসংযোগ বাড়ে, মাথা হালকা লাগে, অন্য ওষুধের কার্যকারিতা বেড়ে যায়; এছাড়া সংক্রমণ প্রতিষেধক, ওজন কমানোর সহায়ক এবং বুকে বসা সর্দির উপশমেও এই কোলা-বাদাম বিশেষ উপকারী।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close