Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ বেলাল চৌধুরী > গুন্টার গ্রাসের তিক্ত-মধুর নোবেল প্রাপ্তি >> প্রবন্ধ

বেলাল চৌধুরী > গুন্টার গ্রাসের তিক্ত-মধুর নোবেল প্রাপ্তি >> প্রবন্ধ

প্রকাশঃ May 18, 2018

বেলাল চৌধুরী > গুন্টার গ্রাসের তিক্ত-মধুর নোবেল প্রাপ্তি >> প্রবন্ধ
0
0

বেলাল চৌধুরী > গুন্টার গ্রাসের তিক্ত-মধুর নোবেল প্রাপ্তি >> প্রবন্ধ

 

[সম্পাদকীয় নোট : কবি বেলাল চৌধুরীর এই প্রবন্ধটি দিয়ে শুরু হলো গুন্টার গ্রাসের উপর তীরন্দাজ-এর বিশেষ আয়োজন। গুন্টার গ্রাসের সামগ্রিক পরিচয় পাঠকদের কাছে তুলে ধরাই হচ্ছে এই আয়োজনের লক্ষ্য। পাঠকরা যাতে গ্রাস সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা পেতে পারেন, সেজন্য তাঁর উপর দুটো প্রবন্ধ প্রকাশ করা হবে, সেই সঙ্গে প্রকাশিত হবে একটা দীর্ঘ সাক্ষাৎকার ও একগুচ্ছ কবিতা। প্রবন্ধ দুটি লিখেছেন কবি বেলাল চৌধুরী ও কবি গৌতম গুহ রায়, সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন মাইনুল ইসলাম মানিক আর কবিতাগুলি অনুবাদ করেছেন অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, হায়াৎ মামুদ, মাসুদুজ্জামান ও শেহাবুদ্দীন আহমেদ। একত্রে একদিনে পাঠকদের এতগুলি লেখা পড়তে অসুবিধা হবে বলে বিবেচনা করে আমরা কিছুটা বিরতি দিয়ে লেখাগুলি একে-একে প্রকাশ করবো। আয়োজনটি কেমন লাগলো আমাদেরকে জানাবার জন্য অনুরোধ থাকলো।]

“ঢাকায় তাঁকে বাঙালির স্বভাবসিদ্ধ সম্ভাব্য এই নোবেল পুরস্কার বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে গ্রাস উত্তরে বলেছিলেন, নোবেল পুরস্কার তার কাছে দু-বস্তা পচা আলুর বেশি কিছু নয়। কথাটা হয়তো মস্করা করেই বলেছিলেন। পুরস্কারপ্রাপ্তির খবরে দেখলাম গ্রাস বেশ সন্তুষ্টিই প্রকাশ করেছেন। নোবেল কমিটি গ্রাসকে পুরস্কৃত করার ব্যাপারে নাৎসিবাদ নব-নাৎসিবাদের উত্থানে গ্রাসের বলিষ্ঠ ভূমিকার কথা বলেছেন।”

সত্তর দশকেই [গত শতকের] সাহিত্যের জন্য নোবেল বিজয়ী গুন্টার গ্রাস তিনবার ভারতে আসেন। তখন তিনি এসেছিলেন প্রাচ্যদর্শনে। সেবার ভারতের বেশ কটি বড় শহর ঘুরলেও প্রথম দর্শনেই সমস্ত বৈপরীত্য নিয়েই কলকাতা যে তাঁকে মুগ্ধ করেছিল, তার প্রমাণ এই সময় প্রকাশিত তাঁর বৃহদায়তন উপন্যাস ‘দি ফ্লাউন্ডার’। ফ্লাউন্ডারে তিনি গদ্য পদ্য এবং কবিতা একইসঙ্গে ব্যবহার করেন। অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে ‘ডগ ইয়ার’, ‘ক্যাট অ্যান্ড মাউজ’ এবং ইউরোপীয় কবিতা সংকলনের কবিতাগুলো দিয়েই আমার প্রথম গুন্টার গ্রাস পাঠের শুরু। প্রথম পাঠে তাঁর গদ্য আমাকে সেভাবে না টানলেও কবিতাগুলো বেশ ভালই লেগেছিল, যার ফলে কলকাতার জার্মান কালচারাল ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে সেই ষাটের দশকের শেষ ভাগে আয়োজিত এক জার্মান কাব্যপাঠ অনুষ্ঠানে আমি বেছে নিয়েছিলাম গুন্টার গ্রাসের পাঁচটি কবিতার তর্জমা। এরপর হাতে আসে সম্ভবত পেঙ্গুইন প্রকাশিত গুন্টার গ্রাসের দুটি কাব্য সংকলন। কবিতা নিয়ে মেতে থাকার ফলে তাঁর উপন্যাস বিষয়ে তেমন নজর দেয়ার অবকাশ হয়নি। এর প্রধান কারণ বোধহয় মাঝে কিছুকাল গ্রাস নাটক নিয়েও মজেছিলেন। ‘টিন ড্রাম’ বিষয়ে শুনে থাকলেও কেন জানিনা পড়া হয়ে ওঠেনি। তবে কাগজে কাগজে তাঁর ঘোরতর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কথা পড়েছি, দেখেছি। ব্যস, ওইটুকুই।

সত্তরের শুরুতে তো আমরা নিজেরাই দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। সুতরাং সে সময় সাহিত্য-শিল্পের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখার প্রশ্নই ওঠে না। গ্রাস যখন প্রথম কলকাতায় আসেন তখন আমি স্বদেশে ফিরে এসেছি। কেননা ততদিনে আমাদের দেশ স্বাধীন হয়ে গিয়েছে। আমরা তখন ক্রান্তিকাল অতিক্রমের পথে। গ্রাসের ভারত ভ্রমণ প্রসঙ্গ কাগজপত্রে দেখে থাকলেও খুব একটা আগ্রহবোধ করিনি। শঙ্খ ঘোষের এক লেখায় গুন্টার গ্রাস প্রসঙ্গ দেখেছিলাম যদ্দুর মনে পড়ে।

এককালের মেধাবী ছাত্র আমাদের বন্ধু মাহবুব হোসেন খানের পড়ুয়া হিসেবে বেশ নামডাক রয়েছে। বিশ্বসাহিত্যের এমন বিশিষ্ট পাঠক খুব কমই দেখা যায়। মাহবুব হোসেন খানের সৌজন্যেই বলা যায় ‘দি ফ্লাউন্ডার’ বইটি পড়ার বিরল সৌভাগ্য হয়ে যায় আমার। মাহবুব বিদেশ থেকে কিনে নিয়ে এসেছিল বইটি। ফ্লাউন্ডার পড়ে আমি গুন্টার গ্রাসের একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে যাই। অভিনব আঙ্গিক, ব্যক্তিগত লিখন-ভঙ্গিমা, চরিত্র-চিত্রন, গদ্য-পদ্য মিলিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা স্বাদের ফ্লাউন্ডার অতি সহজেই আমার মন কেড়ে নেয়।

সেই থেকে গুন্টার গ্রাসের লেখা বিষয়ে আমার উৎসাহ দ্বিগুণ আকার ধারণ করে। মাহবুবের সৌজন্যেই পড়া হয়ে  গেল ‘মিটিং অ্যাট টেল গেট’। ততটা ভালো লাগলো না। তবে একেবারে বিস্ময়-বিমুগ্ধ হবার মতো বই যেটি- ‘টিন ড্রাম’- তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রবলভাবে যুদ্ধবিরোধী। যে বিধ্বংসী যুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে স্বয়ং লেখক নিজেই একজন। তাও আবার একেবারে বাল্যকাল থেকেই। ‘টিন ড্রাম’ পরে ছায়াছবি হিসেবেও দেখার সুযোগ হয়েছে। পরিচালক সোলোস্তরফ একেবারে শুরু থেকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ছবিটির পরতে পরতে নাৎসি নারকীয়তার বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভ, ঘৃণা, ধিক্কার, এসব শিল্পিতভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছেন যে, তার কোন তুলনা হয় না। ছবিটি ঢাকার জার্মান কালচারাল সেন্টারের সৌজন্যে গুন্টার গ্রাসের সঙ্গে বসে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল ঢাকার অনেকেরই। ছবিটি গ্লাসের অনুমোদন লাভ করেছিল। বিশেষ করে অস্কারের ভূমিকায় অভিনয়কারী বামন ছেলেটির প্রশংসায়। ১৯২৭ সালে ডানৎসিগে জন্মগ্রহণকারী গুন্টার গ্রাস প্রথম জীবনে এয়ারফোর্স অক্সিলারি সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে কাজ করেছেন। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কিছুদিন হাসপাতালে, কিছুদিন যুদ্ধবন্দী হিসেবে থাকার পর প্রথমে কৃষি খামার, পরে পটাশ খনিতে কাজ করার পর পাথর খোদাইয়ের শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করেন ১৯৪৭ পর্যন্ত। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৩ পর্যন্ত কবিতা লেখার সঙ্গে সঙ্গে ডাসেলডর্ফ ও বার্লিনে চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের পাঠ নেন। ১৯৫৫-তে প্রথম চিত্রপ্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘গ্রুপ্পে ৪৭’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে কর্মবহুল জীবনের শুরু। এই সময় তিনি প্যারিসে চলে গিয়ে প্রথম উপন্যাস রচনায় হাত দেন এবং নিয়মিত নাটক লিখতে শুরু করেন। ১৯৬০ সালে তিনি পশ্চিম জার্মানিতে ফিরে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নির্বাচনী প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা নেন এবং উইলি ব্রান্টের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে ওঠেন। এদিকে তাঁর প্রথম উপন্যাসই তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। তার নানাবিধ কর্মকাণ্ড, ভ্রমণ ও সম্মাননা প্রাপ্তির হিসেব দেওয়া এককথায় অসম্ভব। দীর্ঘ গদ্য রচনার ফাঁকে ফাঁকে তিনি গ্রাফিকের কাজে ও কবিতা লেখা চালিয়ে যেতে থাকেন। আবার তিনি ভারত ভ্রমণে এসেছিলেন সস্ত্রীক বেশকিছু সময় কাটিয়ে যাওয়ার জন্য। দিল্লি নয় বোম্বাই নয় এবারও তিনি বেছে নিয়েছিলেন সেই আদি অকৃত্রিম ভীড়ঠাসা, পরিবেশ দূষণে ভারাক্রান্ত ঘর্মাক্ত নোংরা জলে পরিপূর্ণ কলকাতাকে। প্রথমে কিছুদিন কলকাতার উপকণ্ঠে একজন সাধারণ নাগরিকের মতোই লোকাল ট্রেন, বাসে চেপে ঘোরাঘুরি করেছেন। এড়িয়ে চলছেন মিডিয়াকে। তা, সে আর কতদিন সম্ভব। অন্তত গুন্টার গ্রাসের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তারকা লেখকের পক্ষে।

এত এত জায়গা থাকতে আসলে কেন তিনি কলকাতা এসেছিলেন এমন প্রশ্নও উঠেছিল তাঁকে নিয়ে। কেউ কেউ বলেছিলেন, ফ্লাউন্ডারের পরবর্তী উপন্যাস ‘নিউ র‌্যাট’ উচ্চাকাঙ্ক্ষী লেখা হলেও পাঠকমহলে তেমন আদৃত বা সাড়া জাগাতে পারেনি বলে গ্রাস খানিকটা ভগ্ন মনেই কোথাও একটা আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। আর সে কারণেই হয়তো অসংখ্য মানুষ অধ্যুষিত অভাব-অনটনে জর্জরিত কলকাতাকেই তিনি পছন্দ করেছিলেন। সাধারণ মানুষের উষ্ণতা, শ্রম ও আলস্য কলকাতা ছাড়া আর কোথায়ই বা পাবেন। না হলে পর্তুগালের প্রত্যন্ত সীমায় এক পল্লীর নিভৃতে যেখানে বিদ্যুৎ পর্যন্ত যায়নি, সেখানে তার নিজের একটি বাড়ি থাকলেও সেখানে না গিয়ে তিনি প্রখর গ্রীষ্মমণ্ডলীয় গাঙ্গেয় উপত্যকায় অবস্থিত কলকাতাকে বেছে নেয়ার মধ্যে নিশ্চয়ই কোন কিন্তু রয়েছে। সেই কিন্তুটা গ্রাস-সমালোচকদের আরও বাড়তি ইন্ধন জুগিয়েছিল কলকাতা থেকে ফিরে গিয়ে কলকাতার অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা তাঁর অসামান্য স্কেচসমৃদ্ধ বই ‘জীব কাটো লজ্জ্বায়’ বেরোবার পর। বইটিতে কলকাতার চিত্রটি ছিল ভারি অনুজ্জ্বল আর সমালোচনামুখর। অবশ্য তার সবটাই যে অসত্য মনগড়া ছিল তাও বলা যাবে না। তবে বাঙালিরা যে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ এবং সহজেই পান থেকে চুন খসলে মহাভারতকেও অশুদ্ধ মনে করে, সেটা বোধহয় গ্রাস আগেভাগে অনুধাবন করতে পারেননি।

কলকাতায় থাকার এক ফাঁকে দিন কয়েকের জন্য তিনি ঢাকায়ও এসেছিলেন এবং কলকাতার তুলনায় ঢাকার আকাশ যে কত স্বচ্ছ আর নির্মল, ঢাকায় পা দিয়েই কথাটি বলেছিলেন। ঢাকায় তিনি তখন পর্যন্ত কলকাতায় নির্বাসিত কবি দাউদ হায়দারের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। পরবর্তীতে দাউদকে বিদেশ যাওয়ার বৈধ কাগজপত্র যোগাড় করে দেয়ার ব্যাপারেও নিমিত্ত হয়েছিলেন।

বহুদিন থেকেই সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ব্যাপারে তাঁর নাম বিবেচিত হয়ে আসছিল বলে খবর পাওয়া যাচ্ছিল। শোনা যায় সাতবারের মতো শর্ট লিস্টেও তাঁর নাম ছিল। কিন্তু পরে দেখা যায় প্রত্যেকবারই তাঁর নাম শেষমেষ বাদই থেকে যাচ্ছে। অবশেষে শতাব্দীর শেষে এসে যে তিনি পুরস্কারটি পেলেন, তা দেখে এবং শুনে ভালোই লাগছে। ঢাকায় তাঁকে বাঙালির স্বভাবসিদ্ধ সম্ভাব্য এই নোবেল পুরস্কার বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে গ্রাস উত্তরে বলেছিলেন, নোবেল পুরস্কার তার কাছে দু-বস্তা পচা আলুর বেশি কিছু নয়। কথাটা হয়তো মস্করা করেই বলেছিলেন। পুরস্কারপ্রাপ্তির খবরে দেখলাম গ্রাস বেশ সন্তুষ্টিই প্রকাশ করেছেন। নোবেল কমিটি গ্রাসকে পুরস্কৃত করার ব্যাপারে নাৎসিবাদ নব-নাৎসিবাদের উত্থানে গ্রাসের বলিষ্ঠ ভূমিকার কথা বলেছেন। আমাদের দেশেও স্বৈরাচারী উত্থানের সময় গুন্টার গ্রাসের সময়োচিত এই প্রাপ্তি আমাদেরও যে আশান্বিত করে তুলেছে, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

উৎস >> দৈনিক সংবাদ, ১৯৯৯

এই আয়োজনের পরবর্তী লেখাটা পড়ুন নিচের লিংকে : গুন্টার গ্রাসের কবিতাগুচ্ছ

গুন্টার গ্রাস > কবিতাগুচ্ছ >> অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত / হায়াৎ মামুদ / মাসুদুজ্জামান / শেহাবউদ্দীন আহমেদ অনূদিত

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close