Home অনুবাদ ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো / প্লেট নদীর তীরে রবীন্দ্রনাথ 

ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো / প্লেট নদীর তীরে রবীন্দ্রনাথ 

প্রকাশঃ May 7, 2017

ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো / প্লেট নদীর তীরে রবীন্দ্রনাথ 
0
1

১৯২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শুনলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বুয়োনেস এয়ার্স হয়ে পেরু যাবেন। সেই থেকেই কবির জন্যে কি অধীর আমাদের প্রতীক্ষা। আমরা যারা জিদ-এর ফরাসী অনুবাদে, ইয়েটস–এর ভূমিকা সংবলিত তাঁর নিজের অনুবাদে ও হুয়ান র‌্যামন হিমেনেথ-এর স্ত্রী জেনোবিয়া ক্যাম্প্রুবি-র স্প্যানিশ ভাষার অনুবাদে তাঁর কবিতা পড়েছি তাদের কাছে সে বৎসরের সেটা একটা মস্তবড় ব্যাপার। আমার জীবনে ত সেটি মহত্তম ঘটনাবলীর একটি।

তখন ‌‘লা নেসিঁয়’ পত্রিকায় কয়েকটি প্রবন্ধ লিখে সবে আমি সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছি। ওই পত্রিকায় আমি প্রথম যে তিনটি প্রবন্ধ পাঠাই তার বিষয়গুলি উল্লেখ করবার মত। প্রবন্ধ তিনটির বিষয় হল ‘দান্তে’ ‘রাস্কিন’ ও ‘মহাত্মা গান্ধী’। ১৯২৪ সালের মার্চ মাসে সেগুলি প্রকাশিত হয়। চতুর্থ প্রবন্ধটির নাম ঠিক হয়েছিল ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা পাঠের আনন্দ’। রবীন্দ্রনাথকে সৎসঙ্গেই আলোচনা করবার ব্যবস্থা হয়েছিল। তাঁর সঙ্গীদের একজন তাঁর স্বদেশবাসী। একজন ইতালীয় কবি, একজন ইংরেজ প্রবন্ধকার ও আমার পূজনীয় যে ভারতবাসীর যে যথাযোগ্য বিশেষণ আমি খুঁজে পাই না- এই তিনজনকেই আমার আলোচনার বিষয় করা থেকে আমার সাহিত্যিক ক্ষমতার দৌঁড় না হোক মনের ঝোঁক কোনদিকে তা অন্তত বোঝা গেছে।

সান ইসিদ্রোতে সেবার মধুর উষ্ণ বসন্ত অবতীর্ণ হয়েছিল। সেই সঙ্গে গোলাপ ফুলের আশ্চর্য ছড়াছড়ি। সারা সকাল সমস্ত জানালা খুলে দিয়ে আমি সেই গোলাপ ফুলের গন্ধ উপভোগ করতাম আর রবীন্দ্রনাথ পড়তাম। তাঁর কথা ভাবতাম, তাঁকে চিঠি লিখতাম আর তাঁর প্রতীক্ষা করতাম। তখনকার সেই পড়া লেখা ভাবা আর অপেক্ষা করার ফলই পরে ‘লা নেসিঁয়’তে প্রকাশিত হযেছে। তাঁর জন্যে সেই পথ চেয়ে থাকার দিনে একবারও ভাবতে পারিনি যে কবি সান ইসিদ্রোর শৈলবাসে একদিন আমার অতিথি হবেন। বুয়োনেস এয়ার্স-এ স্বল্পকালের অবস্থানের মধ্যে তাঁর ভক্তদের সঙ্গে দেখা করবার তিনি সময় পাবেন এ আশা করার সাহসও হয়নি। আমি অবশ্য ভক্তদেরই একজন।

‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা পাঠের আনন্দ’ প্রবন্ধটি আমি আবার পড়েছি। এ প্রবন্ধের নাম ‌‘রবীন্দ্রনাথের জন্যে প্রতীক্ষাও’ দেওয়া যেত। ‘টেস্টিমোনিয়স’ নামে পরে প্রকাশিত আমার রচনা সংগ্রহে এ প্রবন্ধটি আমি দিইনি, কারণ রবীন্দ্রনাথকে পৃথকভাবে একটি বই উৎসর্গ করার বাসনা আমার ছিল।

উল্লিখিত প্রবন্ধটিতে ফরাসী লেখক প্রুস্ত ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে তুলনামূলক একটা আলোচনার চেষ্টা ছিল। একদিকে পাশ্চাত্য জগতের অস্থির যন্ত্রণার একজন প্রতীক, আর একদিকে এক বাঙালী মনীষী যিনি শুধু প্রাচ্যের প্রতিভূ নয়, পূর্ব ও পশ্চিমের সেতুবন্ধনের সূচনাস্বরূপ।

আজ তাঁর জন্মশতবার্ষিকীর শুভমুহূর্তে তাঁর কাছে আমার ঋণের কথা বলার প্রয়োজন আমি অনুভব করি, তাঁর জন্মভূমির মানুষ যাতে আমার কথা শুনতে পায়। তাঁর সঙ্গে আবার আলাপ করার এই সবচেয়ে ভালো উপায়। ১৯২৪ সালের সেই গোলাপের প্রাচুর্যে ভরা বসন্তে জীবনের মত যত ঘনিষ্ঠভাবে তাঁকে পেয়েছিলাম আজও তেমনি পাচ্ছি, কারণ ‘অসতো মা সৎ গময়ঃ’ তিনিই আমায় শিখিয়েছিলেন।

‘গীতাঞ্জলি’ আমার হাতে যখন প্রথম আসে তখন তা যুগল আশীর্বাদের মতই হয়ে উঠেছিল, কারণ তখন আমার জীবনে এমন একটি সংকটকাল চলছে যৌবনের কাছে যা উদ্দেশ্যহীন বলে মনে হয়। কোনো একজনের কাছে নিজের মন খুলে ধরবার প্রয়োজন আমি অনুভব করেছিলাম। একমাত্র ঈশ্বরকেই সেই একজন ভাবা যায়। কিন্তু ঈশ্বরে বিশ্বাস আমার ছিল না, অন্তত প্রতিহিংসাপরায়ণ সঙ্কীর্ণচিত্ত চিররুষ্ট সীমিত যে ঈশ্বরকে আরাধনা করতে আমায় বৃথাই শেখানো হয়েছিল সে ঈশ্বরে নয়। কিন্তু ঈশ্বরের প্রতি এই অবিশ্বাস আমার জীবনে ক্রমশ বেড়েই চলেছিল এবং সে সঙ্কটে অভাবের ভেতর দিয়েই একটা উপস্থিতির তীব্র অনুভূতি হয়ে উঠেছিল। সেই অনুভূতিই আমায় যেন বলেছে- একমাত্র আমার কাছেই তোমার হৃদয় তুমি উন্মুক্ত করতে পার। আমাকে ছাড়া দুঃসহ তোমার নিঃসঙ্গতা।

মনের এই অবস্থায় আমি ‘গীতাঞ্জলি’ খুলে ধরি :

বিধিবিধান বাঁধন ডোরে

ধরতে আসে, যাই যে সরে

তার লাগি যে শাস্তি নেবার

নেব মনের তোষে।

প্রেমের হাতে ধরা দেব

তাই রয়েছি বসে।

রবীন্দ্রনাথ এসব কবিতায় যে প্রেমের কথা বলেছেন তার দ্বারা আমি তখন জর্জরিত নই, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর এমন একজন, যাঁর কাছে সেই পার্থিব (আমার কাছে পবিত্র) প্রেমের কথাও বলা যায। মহৎ ক্যাথলিক লেখক Peguy  এই প্রেম সম্বন্ধেই বলেছেন যে এ প্রেম হল সেই আরেক প্রেমেরই ‘প্রতিমা ও সূচনা, কায়া ও সাধনা।’ সেই আর এক প্রেম, শিরাবাহী যে শোণিতের দুর্বহ ভারে আমরা মর্ত্যভূমিতে বদ্ধ সে ভার যার নেই। Peguy যার জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন আমি যেন সেই ব্যাধ-বিতাড়িত মৃগীর মত, লুকোবার জায়গা না পেয়ে সে ছুটে বেরিয়েছে। তাই রবীন্দ্রনাথের এই কবিতা পড়তে পড়তে আনন্দে কৃতজ্ঞতায় আমার চোখে জল এসেছিল। অত দূরের বাণীও আমার কাছে অপরিচিত মনে হয়নি।

সংসারেতে আর যাহারা আমায় ভালবাসে

তারা আমায় ধরে রাখে বেঁধে কঠিন পাশে।

তোমার প্রেম যে সবার পাশ্

তোমার প্রেম যে সবার বাড়া

তাই তোমার-ই নূতন ধারা-

বাঁধ নাকো লুকিয়ে থাক

ছেড়েই রাখ দাসে।

নিজের মনে আমি বলেছিলাম, – হে রবীন্দ্রনাথের দেবাদিদেব, তুমি কিছু থেকেই আমায় আড়াল করতে চাও না, যে অন্ধকারে তোমায় আমি রেখেছি, তাও তুমি গ্রাহ্য করো না। কি গভীর ভাবেই না আমায় তুমি চেনো। তুমি সেই গোপন দেবতা যিনি জানেন চিরদিন আমি তাঁর সন্ধানী। সেই করুণাময় ঈশ্বর, যিনি জানেন তাঁর কাছে আমার যাবার পথ স্বেচ্ছাধীন।

কোনখানে কোন মুহূর্তে ব্যাপারটি ঘটে যায় আমার স্পষ্ট মনে আছে। ফিকে ধূসর রেশমী আবরণে সজ্জিত একটি ঘর। শ্বেত মর্মরের একটি অগ্নিকুণ্ডের দেয়ালে আমি তখন হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।

সে বাড়িটি আর নেই। যাদের কাছে আমি ব্যথা পেয়েছি আর যাদের কাছে ব্যথা দিতে পারি বলে আশঙ্কা করেছি তারাও নেই কেউ। নেই সেই কবিও, পরম বন্ধুর পক্ষেও যা অসাধ্য সেই অশ্রুজলের আশীর্বাদ যিনি আমার জীবনে এনেছিলেন। আমার মনে যে সব ছবি শুধু স্মৃতিতে জেগে আছে, আমার সঙ্গেই সে সব অমোঘভাবে শূন্যতায় হারিয়ে যাবে, ইতিপূর্বে সব যেমন গেছে।

আমার চোখের জল যা ঝরিয়ে ছিল সেই ‘গীতাঞ্জলি’ কিন্তু থাকবে। রবীন্দ্রনাথ না তাঁর ঈশ্বরের কথা ভাবছিলাম ঠিক না বুঝেই আমি আবৃত্তি করেছিলাম-

যদি তোমার দেখা না পাই প্রভু

এবার এ জীবনে

তবে তোমায় আমি পাইনি যেন

সে কথা রয় মনে।

যেন ভুলে না যাই বেদনা পাই

শয়নে স্বপনে।

হে রবীন্দ্রনাথের দেবতা!- মনে মনে আমি ভেবেছিলাম,- এমন কেউ কি আছে, যে কোন না কোন ক্ষণে বিরহ বেদনার তীব্রতা অনুভব করেনি, এ বেদনার স্বরূপ সে বুঝুক বা না বুঝুক। মিলনের এই যে আকুতি, কি প্রাচ্যে কি প্রতীচ্যে, সর্বত্রই প্রেম বলেই  অভিহিত।

‘গীতাঞ্জলি’র একটি কবিতা এই সূত্রে উল্লেখ করছি-

হেরি অহরহ তোমারই বিরহ

ভূবনে ভূবনে রাজে হে।

কতরূপ ধরে কাননে ভূধরে

আকাশে সাগরে সাজে হে।

 

দুই

সেই আমার প্রথম রবীন্দ্রনাথ পড়া আর চোখের জল ফেলার দশ বছর বাদে ১৯২৪ সালের ৬ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ বুয়োনেস এয়ার্স-এ আসেন। রোমাঁ রোলাঁর বইয়ের মাধ্যমে গান্ধীর সঙ্গে, আর প্রত্যক্ষভাবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আমার সাক্ষাত পর পরই ঘটে। আমার জীবনের আরো অনেক কিছুর মত এই ঘটনাচক্রের মিল এমন বিস্ময়কর যে কোন বিচিত্র নক্সার মত এ জীবন আগেই পরিকল্পিত বলে আমার সন্দেহ হয়েছে।

স্বরাজ, অহিংসা, সত্যাগ্রহ, স্বদেশী প্রভৃতি শব্দের সঙ্গে কয়েকমাস ধরে আমি যখন পরিচিত তখনই সেই ‘মহান প্রহরী’ প্লেট নদীতে দেখা দিলেন। দেশপ্রেম দুজনেরই সমান তীব্র হলেও নবভারত নির্মাতা এই দুই মহাপুরুষের মধ্যে গরমিল যে কত আমি তখনই জানতাম। রবীন্দ্রনাথ পূর্ব ও পশ্চিমের সহযোগিতায় বিশ্বাসী। গান্ধী ইংরাজের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন একমাত্র আত্মরক্ষার অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা প্রয়োজন মনে করেছেন। ১৯২০ সালে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়েছে। সে আন্দোলন যখন চার বৎসর পার হয়েছে তখন রবীন্দ্রনাথ এখানে পদার্পণ করলেন। অসহযোগ আন্দোলনের কয়েকটি দিকের কথা ভেবে তিনি উদ্বিগ্ন। ‘নিজেকে আর সকলের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে কোন দেশের মুক্তি হতে পারে না। হয় সকলের সঙ্গে মুক্তি নয় অবলুপ্তি’- তিনি লিখেছিলেন। ভয় তাঁর গান্ধীকে নয়। গান্ধীকে শাশ্বত কালের একজন মহামানব বলে তিনি মনে করতেন। তাঁর ভয় ছিল সংকীর্ণ দল পাকান গোঁড়াদের। মহতের বাণী গড্ডালিকার কাছে পৌঁছবার পথে কিভাবে বিকৃত হয় জেনে তিনি শঙ্কিত হয়েছেন।

আর সকলের মত রবীন্দ্রনাথও সুতো কাটুন আর বিদেশী পোশাক পুড়িয়ে ফেলুন। আজ এই আমাদের কর্তব্য- বলেছিলেন গান্ধী।

একদিকে মহাত্মা, আর একদিকে কবিগুরু। অনেকেই আমরা কার দিকে হেলব কাকে বেশি ভক্তি করব বুঝে উঠতে পারিনি।

গীতাঞ্জলির ভূমিকায় ইয়েটস লিখেছেন যে রবীন্দ্রনাথের কোনা স্বনামধন্য স্বদেশবাসী তাঁকে কোন সময়ে বলেছিলেন- আমাদের মধ্যে তিনিই প্রথম ঋষিপ্রতিম পুরুষ যিনি জীবনকে অস্বীকার করেন নি। তাঁর বাণী জীবন থেকেই উদ্বুদ্ধ। সেই জন্যেই তিনি আমাদের পরম প্রিয়।

শিল্প ও ঋষিকল্পতা সম্বন্ধে আগে যা বলেছি তার মানে এই নয় যে সত্তার পূর্ণতার কোন দাম রবীন্দ্রনাথের কাছে ছিল না বা তিনি তা অবহেলা করে শিল্পের পরম সৌষ্ঠবকেই বড় করে ধরেছেন। বরং কথাটা ঠিক তার উল্টো বলে আমি ভালো করেই জানি। আমি শুধু এইটুকুই বলতে চাই যে গান্ধীর কাছে সমস্ত ব্যাপারটা ছিল অনেক সরল, কারণ যতদূর জানি শিল্পী ও সাধকের যে নিদারুণ দ্বন্দ্ব রবীন্দ্রনাথকে পীড়িত করেছে গান্ধী তা কখনো অনুভব করেননি। রবীন্দ্রনাথের মত গান্ধী বহির্জগতের রূপ-রস সম্বন্ধে একান্ত সচেতন ছিলেন না। তিনি তাই তাঁর সমস্ত প্রেমের সঞ্চয় ইন্দ্রিয়াতীত সৌন্দর্যেই ঢেলে দিতে পেরেছিলেন। আমাদের এই শতাব্দীতে যে দুজন মহাপুরুষ সাধনার সর্বোচ্চ শিখরে পৌছেঁছেন তাঁদের সম্বন্ধে এই অন্তত আমার ব্যক্তিগত ধারণা।

যে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রবীন্দ্রনাথ সে সময় জর্জর ছিলেন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করার সময় যার আভাস আমি পেয়েছিলাম বলে মনে করি, এখান থেকে চলে যাওয়ার কিছুকাল পরে লিখিত তাঁর দুটি পত্রেও তার চিহ্ণ রয়েছে।

প্রথম চিঠিটি ১৯২৫-এর ১৩ জানুয়ারি Giulio Cesar জাহাজ থেকে লেখা। তিনি লিখছেন :

তুমি দেখেছ অনেক সময় দেশের জন্য আমার মন কেমন করেছে। এই ব্যাকুলতা ভারতবর্ষের জন্যে ততটা নয়, যতটা সেই শাশ্বত সত্যস্বরূপের জন্যে যার মধ্যে আমার অন্তর মুক্তি পায়। আমার ব্যক্তিসত্তার ওপর যে কোন কারণে মনোযোগ যখন প্রগাঢ় হয়ে ওঠে এই সত্যস্বরূপ তখন সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন হযে যায়। সেই আমার সত্যকার আবাস, যেখানে আমার মধ্যে যা পরম তা প্রকাশের ডাক পরিবেশের মধ্যেই আমি পাই। কারণ তাতেই অমোঘভাবে আমায় বিশ্ববোধের গভীরতায় নিয়ে যায়। আমার মনের জন্যে এমন একটি নীড় একান্ত প্রয়োজন যেখানে আকাশের বাণী অবারিতভাবে বর্ষিত হতে পারে। আলোক ও মুক্তি ছাড়া আর কোন প্রলোভন সে আকাশের নেই। এই নীড় আকাশকে ঈর্ষা করে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হবার বিন্দুমাত্র উপক্রম করলেই আমার মন যাযাবর বিহঙ্গের মত সুদূর কোন উপকূলে যেতে চায়। আলোকের মধ্যে আমার যে মুক্তি তা কিছুক্ষণের জন্যেও ব্যহত হলেই আমার মনে হয় কুজ্ঝটিকায় আচ্ছন্ন প্রভাতের মত আমি যেন কোন ছদ্মবেশের বোঝা বইছি। নিজেকে আমি আর দেখতে পাই না, আর এই অস্বচ্ছ্তা দুঃস্বপ্নের মত তার দুর্বহ শূন্যতায় আমার শ্বাসরোধ করে দেয়। অনেকবার আমি তোমায় বলেছি যে আমার স্বাধীনতা ত্যাগ করবার স্বাধীনতা আমার নেই। কারণ এ স্বাধীনতার ওপর প্রথম দাবী আমার জীবনদেবতার তাঁর নিজের উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্যে। কখনো কখনো এই সত্যটুকু ভুলে গিয়ে আরামের বন্ধনে নিজেকে আমি আলস্যভরে বাঁধা পড়তে দিয়েছি। কিন্তু প্রতিবারই তার পরিণাম হয়েছে সর্বনাশা। রুদ্র এক দেবতা আমায় ভগ্ন প্রাচীরের পথে মুক্ত প্রান্তরে পঠিয়েছে…

বিশ্বাস করো আমার মধ্যে এমন একটি দাবী কাজ করে যা আমার নয়। মায়ের ওপর শিশুর দাবী ত ব্যক্তির দাবী শুধু নয়, সে দাবী বিশ্বমানবতার, পবিত্র তার উৎস। বিধাতার কোন বিশেষ অভিপ্রায় পূরণের জন্যে যারা আসে তারা ওই শিশুর মত। ভালবাসা ও আনুগত্য যদি তারা পায় ত নিজেদের উপভোগের জন্যে নয়, তার চেয়ে মহৎ কোন উদ্দেশ্যেই তা নিয়োজিত হওয়া উচিত। শুধু ভালোবাসাই নয়, আঘাত ও অপমান অবহেলা ও অস্বীকৃতি তাদের ধুলোয় গুঁড়িয়ে দেবার জন্য নয়, তাদের জীবনের শিখা আরও উজ্জ্বল করে তোলবার জন্যেই তারা পায়।

এ চিঠির একটি অর্থ আছে। চিঠি যখন রবীন্দ্রনাথ লেখেন তখন এবং তার অনেক আগে থেকেই তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং আমি আর এল. কে. এল্মহার্স্ট ডাক্তারের নির্দেশানুযায়ী তাকেঁ বিশ্রাম নেওয়াতে চেয়েছিলাম। তাকেঁ আরো কিছুদিন থেকে যাবার জন্যে আমি পীড়াপীড়ি করি। একসঙ্গে অনেক লোককে দর্শন দিযে তিনি যাতে নিজেকে অতিরিক্ত ক্লান্ত না করেন সে বিষয়েও আমি তাঁর ওপর জোর খাটিয়েছিলাম। তাঁর সম্বন্ধে এই উদ্বেগের দরুণই, রবীন্দ্রনাথকে আমি বেড়া দিয়ে রাখতে চাই বলে লোকে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল। যে কেউ তাঁর কাছে আসতে চায়, তাদের সকলের জন্য আমি দ্বার মুক্ত না করে রাখার জন্যে রবীন্দ্রনাথও অনুযোগ জানিয়েছিলেন কিন্তু তাঁর কথামত কাজ করে দিনের শেষে তাঁর অসীম ক্লান্তি দেখে আমি সত্যই অত্ত্যন্ত ভাবিত হয়ে উঠি। কি আমার তাহলে কর্তব্য?

[সংক্ষেপিত, চলবে]

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো’র লেখায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে পড়ে অনেক ভালো লাগছে! আজ প্রিয়কবির জন্মদিন। এ-দিনে তীরন্দাজের এমন সুনির্মল আয়োজন সত্যিই মুগ্ধ করার মতো! প্রিয়কবির স্মৃতির উদ্দেশে শুভ জন্মদিনের অফুরন্ত শুভেচ্ছা ও ভালবাসা। আর তীরন্দাজের জন্য অশেষ শুভ কামনা!

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close