Home শ্রদ্ধাঞ্জলি ভূমেন্দ্র গুহ >> মুখ নাকি তেমন ফটোজিনিক ছিল না >>> স্মৃতিচারণ

ভূমেন্দ্র গুহ >> মুখ নাকি তেমন ফটোজিনিক ছিল না >>> স্মৃতিচারণ

প্রকাশঃ October 22, 2017

ভূমেন্দ্র গুহ >> মুখ নাকি তেমন ফটোজিনিক ছিল না >>> স্মৃতিচারণ
0
0

ভূমেন্দ্র গুহ >> মুখ নাকি তেমন ফটোজিনিক ছিল না >>> স্মৃতিচারণ

[সম্পাদকীয় নোট : জীবদ্দশায় জীবনানন্দকে দেখার এবং তাঁর রচনাবলিতে যাঁর একধরনের দুর্লভ অধিকার জন্মেছিল তিনি ভূমেন্দ্র গুহ। তখন তিনি মেডিকেল কলেজের ছাত্র। হাসপাতালে জীবনানন্দ যখন মৃত্যুশয্যায়, সেই দিনগুলিতেও ভূমেন্দ্র তাঁকে কাছ থেকে দেখেছিলেন। মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধের কাজেও যুক্ত ছিলেন। লাবণ্য দাশকে দেখেছিলেন একধরনের রহস্যজনক আচরণ করতে। সেইসব ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এই প্রবন্ধ, প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান।]

“আমি হতাশাগ্রস্তের মতো বলেছিলুম, না, তেমন নয়, শুধু তাঁরই কোনও একার ছবি? তিনি কথঞ্চিৎ অবজ্ঞার সুরেই প্রায় বলেছিলেন, মনে পড়ছে, আমার কাছে নেই অন্তত; তা ছাড়া ওই ছবি-টবি তোলানো-টোলানো নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথা কোনও দিন বিশেষ ছিল না। তোমাদের দাদা দেখতেও তো এমন কিছু রাজপুত্তুর ছিলেন না।”

জীবনানন্দর মৃত্যুর পরে পারিবারিক যে-একটা অনতিউচ্চারিত ভারি শোকের পরিমণ্ডল সৃষ্টি হয়েছিল, তা এক সময় ধীরে-ধীরে ফিকে স্বাভাবিক হয়ে এল, আর আমার মতো একজন বাইরের লোকের ত্রিকোণ পার্কের বাড়িতে আসা-যাওয়াটাও ক্রমে সয়ে এল। আমার যাওয়া-আসাটা প্রধানত দিদির, অর্থাৎ জীবনানন্দর ছোট বোন সুচরিতা দাশের, কারণে; আমি কালক্রমে তাঁর ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলুম, তিনি নানা রকমের ছোট-খাটো প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে আমাকে তাঁর মেজদা-মেজবৌদির বাড়িতে আসতে বলতেন, আর এও এক সময় স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল যে, আমার কাছেও অশোকানন্দ দাশ এবং নলিনী দাশ যথাক্রমে ‘মেজদা’ এবং ‘মেজবৌদি’ হয়ে উঠেছেন, এবং তাঁরাও আমাকে একরকম ভাবে পছন্দ করছেন। বসার ঘর পেরিয়ে ভিতরের ঘরে এখন যখন-তখন ঢুকে পড়ছি, তাঁদের খাওয়ার টেবিলেও সকালে-সন্ধেয় মাঝে-মধ্যে জুটে যাচ্ছি। আমার মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাটা তখন অনেকটা অপর শিবিরে প্রবিষ্ট করিয়ে দেওয়া শত্রুপক্ষের গুপ্তচরের মতো। ‘ময়ুখ’ পত্রিকার ‘জীবনানন্দ-স্মৃতি’ সংখ্যা যদি বড়-সড়ো করে বার করতেই হয়, এবং সেই প্রচেষ্টায় যদি মোটামুটি একটা মান্যতা ফলিয়ে তুলতে হয়, তাহলে জীবনানন্দর পরিবারের সক্রিয় সহায়তা দরকার পড়বে, তাতে আর সন্দেহ কী।

জীবনানন্দর লেখাপত্রের পাণ্ডুলিপিগুলি, এমন-কী তাঁর অধ্যয়নের বইপত্রও, যে কয়েকটি কালো রঙের আয়তাকার নাতিবৃহৎ ট্রাঙ্কের ভিতর জমা থাকত, তা জানতুম; সেই ট্রাঙ্কগুলির কোনও একটা খুলে ক্বচিৎ-কদাচিৎ যখন তিনি আমার চোখের উপরেই পাণ্ডুলিপির এক্সারসাইজ বুকের খাতা বার করে লেখা কপি করে দিতেন, তখন যে নিদারুণ ঔৎসুক্য ও উৎকণ্ঠায় ভুগতে হত, তাতে ট্রাঙ্কগুলিকে ভীষণ জটিল জাদুবাক্স বলে মনে হতে থাকত। সেই জাদুবাক্সগুলির ভিতর থেকে কিছু-না-কিছু অপ্রকাশিত লেখা তো বার করে আনতেই হবে ‘ময়ুখ’-এর বিশেষ সংখ্যাটির জন্য। সে তো আর মেজদা-মেজবৌদির বদান্যতা ছাড়া হয়ে উঠবে না, বিশেষত আমাদের কাগজটি যখন একেবারেই অজ্ঞাতকুলশীল। জীবনানন্দপত্নী লাবণ্য দাশ, তাঁর কন্যা মঞ্জুশ্ৰী দাশ—এঁরা আমার বেশ পরিচিত হয়ে উঠলেন, খোলা মনেই নানা কথা বলতেন-বলাতেন, ব্যক্তিগত ভাল-থাকা খারাপ-থাকা নিয়ে খোঁজ-খবর নিতেন এবং খাওয়ার টেবিলেও মাঝে-মধ্যে একসঙ্গে বসতেন। কিন্তু তাঁরা যে জীবনানন্দর অপ্রকাশিত বা প্রকাশিত লেখাটেখা নিয়ে বিশেষ উৎসাহিত বা চিন্তাগ্রস্ত, তেমন আমার মনে হত না; তাঁরা যে ট্রাঙ্কগুলি বইবার ভার অশোকানন্দর উপরেই নির্ভেজাল ন্যস্ত করে দিয়েছেন; লাবণ্য দাশ নিজর সংজ্ঞানুযায়ী সার্থকতা-অসার্থকতার সমস্যা নিয়ে নিমগ্ন থাকতে বেশি ভালবাসতেন; মঞ্জুশ্ৰী, আমার আবছা মনে হত, তাঁর নিজস্ব হার্দ্য সম্পর্কাদির রূপ-অরূপের সংকটমোচনের বিষয়ে তৎকালে বিশেষ ভাবে ব্যতিব্যস্ত ছিলেন–জীবনানন্দর মৃত্যুর পরে বছর ঘুরতে-না-ঘুরতেই তিনি বিবাহিত হন। সেই জাদুবাক্সগুলি ছোঁওয়ার, এমন-কী ডালা খুলে ফেলে তাদের পেটের ভিতরে হাত রাখবার, অবিশ্বাস্য অধিকার নিতান্ত অপ্রত্যাশিত ভাবেই একদিন আমার জুটে গেল, এবং সেই প্ৰায় সহ্যাতিরিক্ত মানসিক চাপ ও উদ্বেগ আমাকে বেশ কয়েক মাস মাতিয়ে রাখল। ‘ময়ুখ’-এর ডেরায় প্রলম্বিত আড্ডার আসরে আর আগের মতো আমাকে হেলাফেলার হয়ে থাকতে হল না, চাই-বা-না-চাই, কথায়-বার্তায় একটু-আধটু স্বাভিমান ও আভিজাত্যের সুর ফুটে উঠতে থাকলই, ভাবখানা : এখুনি দারুণ একখানা ম্যাজিক দেখিয়ে দিতে পারি, জানেন! যার যে-কোনও বাক্যালাপাই আমরা বেশ সমীহ করে গ্রহণ করতুম, সেই মেহাকর বলত, ভূমেন, আপনি যে একখানা কাণ্ড ঘটিয়ে তুলেছেন না!

ব্যাপারটা ঘটেছিল এই রকম ভাবে। জীবনানন্দর পারলৌকিক ক্রিয়াকর্মের অনুষ্ঠানের দিন যতই ঘনিয়ে আসতে লাগল, একটা ছোটো-খাটো অসুবিধের বিষয়ও তত অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে লাগল তাঁর পরিজনদের কাছে। অনুষ্ঠানটি না হয় ত্রিকোণ পার্কের বাড়ির বাঁ পাশের এবং পিছনের ফাঁকা জায়গায় হতে পারবে, সাময়িক ছাউনি গড়ে তোলার মতো জায়গা সেখানে রয়েছে, কিন্তু অনুষ্ঠানে তো জীবনানন্দর একখানা ভদ্রমতো আবক্ষ ছবির দরকার পড়বে, তার কী হবে? তাঁর পছন্দমতো কোনও ছবি, বিস্মিত হবার মতো ব্যাপারই বটে, তখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। একদিন মেজদার কাছে, নিতান্ত আলগা ভাবেই, কথাটা শোনা গেল। তিনি বললেন, ভূমেন, তুমি একটা কাজ করো তো, সময় মতো দাদার ট্রাঙ্কগুলিতে খুঁজে দেখো, তাঁর কোনও লুকিয়ে-রাখা ছবিটবি কাগজপত্রের মধ্যে পেয়ে যাও কিনা। দাদা তো পারতপক্ষে ছবি তুলতে দিতেন না, তাহলেও কোনও-কোনও সময়ে তো তাঁকে নিয়ে ছবি তোলা হয়েছিল।

আমি যেন আকাশ থেকে পড়লুম, সে কী, তাঁর কোনও ছবি নেই? তা হতে পারে না কি? আর কারু কাছে না থাকুক, বড়ো বৌদি বা দিদির কাছে নিশ্চয়ই আছে। দিদি নিজেই এত ছবি তোলেন।

মেজদা বললেন, তেমন কোনও ছবি পেলাম না তো।

দিদির একটা পুরোনো রঙ-চটে-যাওয়া বাক্স-ক্যামেরা ছিল। তিনি ছবি তুলতে খুব পারদর্শী ছিলেন, এ-কথা বলা যাবে না, তবে যত্রতত্র যার-তার ছবি তুলতে তিনি ভালবাসতেন। এই ভূমেন, তুমি এই বুড়ো নিমগাছটায় হেলান দিয়ে দাঁড়াও তো, তোমার একটা ছবি তুলি। তুমি আঙুলের ফাঁকে সিগারেট নিয়ে বেশ ভারিক্কি চালে রোদের দিকে মুখ করে বসো তো, ভাবী বড় ডাক্তারের ছবিটা তুলে রাখি। দেখেছ, মশারির ভিতরে ঢুকে পড়ে বেড়ালটা কেমন গভীর মেজাজে ঘুমোতে লেগেছে, ওর একটা ছবি তো তুলে রাখতেই হয়। ওঁর কেমন একটা বিশ্বাসী ধারণা ছিল যে, উনি যা নিজের চোখে দেখছেন, ক্যামেরার চোখও ঠিক তাই তাই দেখবে। ক্যামেরার অবশ্য তাঁর বিশ্বাসের বশংবাদ থাকবার তেমন কোনও বাধ্যবাধকতা ছিল না।

তবু দিদি জীবনানন্দর ছবি তুলবার চাড় বোধ করেননি, তা হতেই পারে না। তাঁকে গিয়ে ধরলুম, তোমার কাছে জীবনানন্দর কোনও ছবি নেই, তা কি সম্ভবপর? তুমি কখনওই তাঁর ছবি তোলনি? যার-তার ছবি যখন-তখন তুলে বেড়াচ্ছা!

দিদি বলেছিলেন, দাদা ছবি তুলতে দেবেন, তবেই হয়েছে। একে তো তাঁর মুখ নাকি তেমন ফটোজিনিক ছিল না, তার ওপর আবার হালকা টাক পড়তে শুরু করেছে, তিনি ছবি তুলতে দেন কখনও!

দিদির কাছে যে লাল-হয়ে-ওঠা তবু একখানা ছবি উদ্ধার করা গেল, তা সগুম্ফ, প্রথম যৌবনের, এবং জায়গায়-জায়গায় কীটদষ্ট। কোনও কাজের নয়।

বড় বৌদির কাছেও ছবি পাওয়া গেল না। তাঁর মন্তব্যটা এতটা হতাশাব্যঞ্জক নয় অবশ্য। বিয়ের সময় তো তোলা হয়েছিলই, জোড়ে, কিন্তু তা তো একজনের শ্রাদ্ধে ঠিক মানাবে না। আরও যে-সব গ্রুপ-ছবি কখনও-কখনও তোলা হয়েছে, সে-সব থেকে পোট্রেট তৈরি করার মতো অংশ কেটে বাঁধিয়ে নেওয়া যাবে না তো।

আমি হতাশাগ্রস্তের মতো বলেছিলুম, না, তেমন নয়, শুধু তাঁরই কোনও একার ছবি? তিনি কথঞ্চিৎ অবজ্ঞার সুরেই প্রায় বলেছিলেন, মনে পড়ছে, আমার কাছে নেই অন্তত; তা ছাড়া ওই ছবি-টবি তোলানো-টোলানো নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথা কোনও দিন বিশেষ ছিল না। তোমাদের দাদা দেখতেও তো এমন কিছু রাজপুত্তুর ছিলেন না।

সুতরাং আমাকে তাঁর কালো বাক্সের গুপ্ত কাগজপত্রের প্রত্নখননে অগত্যা ব্যাপৃত হতে হল এবং রাতারাতি আমি বন্ধুদের চোখে একজন কেউকেটা হয়ে উঠলুম।

দুটো ছবি আবিষ্কৃত হল একটা হলুদ রঙের মোটা কাগজের খামের ভিতর অন্যান্য কাগজপত্রের চিঠিপত্রের সঙ্গে : একটি, চাপা-ঠোঁটের হাসি মুখ, শুধু ঊর্ধ্বাঙ্গের, কোনও একজন অজ্ঞাতনামা অনুরক্ত পাঠককে লেখা একটা দীর্ঘ চিঠির সঙ্গে জেমসক্লিপ দিয়ে আটা (ছবিটি এবং চিঠিখনি—দু’টোই ‘ময়ুখ’-এর তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরের পর-পর প্রকাশিত দুটি সংখ্যায় মুদ্রিত হয়েছিল।), এবং আরেকটি, অশোকানন্দর কর্মস্থলে যখন বেড়াতে গিয়েছিলেন, তখনকার। জীবনানন্দর নিজের ছবি তোলা বিষয়ে জোরালো এবং ধারাবাহিক অনীহার যে-সব গল্প তাঁর ভাই-বোনের কাছে শুনেছি, তার প্রেক্ষিতে বলতেই হয় যে, দিল্লির ছবিটি তাঁর একগুচ্ছ আত্মীয়স্বজনের জোরাজুরিতে নিশ্চয় তোলা, কিন্তু তাঁর কোনও একজন অনুরক্ত পাঠককে যে-ছবিটি তিনি পাঠাতে চেয়েও পাঠাননি, সেটি কি স্টুডিয়োতে গিয়ে নিজে থেকে তোলানো, নিজের পছন্দ-অপছন্দের সঙ্গে এক রকম লড়াই করে শেষ পর্যন্ত তাঁর ধীমান পাঠকটির একান্ত দাবির কাছে আত্মসমর্পণ করে? জানা যাবে

অবশেষে এই দুটি ছবি নিয়ে আমাকেই যেতে হল কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের ডি. রতনের দোকানে। রতনের চাইতে আরও ভাল কোনও ছবি তোলার দোকান কলকাতায় তখন ছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু আমি গোলদিঘি পাড়ার এঁদো গলিতে থাকি, ওই দোকানটির সাইনবোর্ডটিই রাস্তায় চলাফেরা করার সময় সব চাইতে বেশি চোখে পড়ত। তাঁরা দিল্লির ছবি থেকে কেটে বার করে মেজে-ঘষে রিটাচ করে দু’টো ছবি তৈরি করে দিলেন, সেই ছবি দুটির একটি বড় করে বাঁধিয়ে যে-ফোটোটি হল, তা যাকে বলে এক্সক্লুসিভ, তা রয়ে গেল আমার কাছে; এবং ‘ময়ুখ’-এর ‘জীবনানন্দ-স্মৃতি সংখ্যা’র আগের হেমন্ত-সংখ্যায় প্রকাশিত হল। এই ছবি দুটিই এখন সাধারণ ভাবে জীবনানন্দবিষয়ক সর্ব প্রকাশনায় জড়িয়ে রয়েছে। বিসর্পিলতায় ঢুকে পড়ার ফলশ্রুতিতে এর পর ধারাবাহিক ভাবে যে বিচিত্র বিপুল রহস্যপুঞ্জ বিস্ফারিত হতে থাকবে, তা না বললেও চলে। জীবনানন্দর প্রকাশিত-এবং-অগ্রস্থিত অনেক লেখার কাটা-অংশ জড়ো করা ছিল একটি অফিস-ফাইলের ভিতরে, সেগুলির, এবং খুঁজে-পেতে বার করা আরও লেখার, যাদের কাটা-অংশ ছিল না—হদিশ বার করে দিদির সঙ্গে বসে অনেক দুপুরের পরিশ্রমে একটি তালিকা প্ৰস্তুত করা হল, এবং ‘ময়ুখ’-এ প্রকাশ করা হল। অশোকানন্দর সাক্ষাৎ অনুমোদনসাপেক্ষে জীবনানন্দর ‘কবিতার কথা’, ‘রূপসী বাংলা’ ও নতুন ‘ধূসর পাণ্ডুলিপির কপি তৈরি করা হল; বলতে গেলে প্রায় দিলীপকুমার গুপ্তর দূর সম্পাদনায় বইগুলি সিগনেট প্রেস থেকে বেরোল। ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ বোরোল অশোকানন্দর নিজের প্রতিষ্ঠান নিউস্ক্রিপ্ট থেকে; দিলীপকুমার এই বইটি এবং জীবনানন্দর গল্প-উপন্যাস প্রকাশ করতে উৎসাহী ছিলেন না। আমার কাজ ছিল প্রধানত ত্রিকোণ পার্ক-এলগিন রোড মাকুতে সুতো জড়িয়ে বেড়ানো, দিলীপকুমারের অনতিব্যক্ত ইচ্ছানুযায়ী কপি তৈরি করে দেওয়া, তাঁর লাল বা সবুজ হস্তাক্ষর শোভিত কপি দেখে-দেখে। কখনও কোনও বইয়ের প্রথম প্রুফটি দেখে দেওয়া, এবং শ্ৰী বিকাশ বাগচি, যিনি সিগনেট প্রেসের কর্মী ছিলেন এবং সমবয়সী বলে বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন, তিনি যে-বার্তা বা অনুজ্ঞা দিলীপকুমারের কাছ থেকে বহন করে আনতেন, তা যথাসাধ্য ফলিয়ে তোলা।

“তিনি সহসা ‘মাল্যবান’ যাতে তৎকালে প্রকাশিত হতে না পারে, সেই ব্যাপারে কঠোর অনড় হয়ে রইলেন। আমি জানতে চেয়েছিলুম, জীবনানন্দ কি তাঁর মৃত্যুর আগে বিশেষ করে শুধু এই বইটির জন্যই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে গেছেন? কবে এবং কী ভাবে? কেন? তিনি সরাসরি আমাকে কোনও আলোকাভাস না দিয়ে দিদিকে বলেছিলেন, জানলে খুকি, ভূমেন নিতান্তই ছেলেমানুষ, এ-সব ও বুঝতে পারবে না।”

প্রথম তিনটি গল্প বেরোল ‘অনুক্ত’ ত্রিমাসিক পত্রিকাতে : ‘গ্রাম ও শহরের গল্প’, ‘বিলাস’ ও ‘ছায়ানট’। যত দূর মনে পড়ছে, গল্পগুলির শিরোনাম জীবনানন্দরই নির্দিষ্ট। সাক্ষাৎ মতে প্রেমেন্দ্ৰ মিত্র বলেছিলেন, ওগুলোকে গল্প বলতে চান তো বলতে পারেন; সঞ্জয় কথঞ্চিৎ উৎসাহিত বোধ করেছিলেন বলে মনে পড়ছে। তা ছাড়াও, ভবিষ্যৎ ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কয়েকটি কবিতাও বেরিয়েছিল ‘অনুক্তে’।

এ-সবই ১৯৫-৫৬ থেকে ১৯৬১-৬২-র মধ্যবর্তী সময়ে বা তার কিছু আগে-পরে ঘটেছিল বলে এখন মনে পড়ছে। ১৯৬৬-৬৭-তে আমি জীবনানন্দর ‘সুতীৰ্থ’ নামের উপন্যাসটি কপি করেছিলুম, সম্ভবত ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হবার কারণে একটা তাড়া ছিল; এবং হয়তো তার ন’-দশ বছর আগে একবার এবং প্রায় সমসময়ে আর এক বার ‘মাল্যবান’ উপন্যাস। উপন্যাসগুলির মধ্যে কপি করার জন্য ‘মাল্যবান’কে প্রথম বেছে নেওয়ার পক্ষে কয়েকটি যুক্তি ছিল, এখন ভেবে দেখছি; প্রথমত, উপন্যাস চার-এর দশকের শেষ দিকে লেখা বলে জীবনানন্দর শেষ বয়সের স্পষ্ট গোটা-গোটা হস্তাক্ষরে পাণ্ডুলিপিটি তৈরি হয়েছিল, এবং প্রায় সংশোধনপ্রয়াস মুক্ত হওয়ার জন্য পাণ্ডুলিপিতে কাটাকুটি প্রায় ছিল না; তিন-এর দশকের গোড়ার দিকের টানা জড়ানো আবছা হাতের-লেখায় লেখা নয় বলে তুলনামূলক ভাবে কম পরিশ্রমে ‘মাল্যবান’ পড়ে ফেলা যেত। দ্বিতীয়ত, উপন্যাসটি মোটামুটি ভাবে ছোট মাপের ছিল, চারটি বাহাদুর মার্কা এক্সারসাইজ বুকে বদ্ধ, কপি করে ফেলতে কয়েক দিনের একটা ছুটির অবকাশ যথেষ্ট ছিল। তৃতীয়ত, মনে হয়েছিল যে, এই উপন্যাসটিতে জীবনানন্দ তাঁর শেষ সময়ের ঘরবাড়ির স্বজনপরিজন অন্নসংস্থানের ও মৌল জীবনধারণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে হলাহল সমৃদ্ধ সৃষ্টি ও ক্ষয়শীলতা নিয়ে একপ্রকার অকপট দূর সন্নিধানে নিজেকে উপস্থাপিত করেছেন। এই শেষের বিষয়টি স্বাভাবিক ভাবে জীবনযাপন-অনভিজ্ঞ পীড়নঅনুসন্ধিৎসু এবং জীবনানন্দর ব্যক্তিত্ব-আক্রান্ত একজন সদ্য-তরুণকে অত্যন্ত টেনেছিল।

‘মাল্যবান’ কপি করা হয়ে গেলে বই করে বার করার কথা উঠল। অশোকানন্দ এই প্ৰথম কবিজায়া লাবণ্য দাশকে দেখিয়ে নেওয়ার কথা বললেন; বললেন, বইটা যখন উপন্যাস এবং ‘মাল্যবান’, বৌদিকে বলে নিতে হবে, তুমি তাঁকে বইটা পড়াও; জিনিসটা তো আসলে তাঁরই দায়িত্বের আওতায় পড়ে।

লাবণ্য দাশ বইটি পড়লেন, এবং ছাপতে দিতে অসম্মতি প্রকাশ করলেন। কেন? না, জীবনানন্দর নির্দিষ্ট মানা আছে।

অশোকানন্দ নিস্তরঙ্গ থাকলেন, কিন্তু আমি ও দিদি নানাভাবে বলাবলি করে তাঁর মত পরিবর্তিত করার চেষ্টা করলুম। এবং শেষ পর্য়ন্ত ব্যর্থ হলুম। জীবনানন্দর মৃত্যুর পর এতগুলি বই তো বেরিয়ে গেল, তিনি তো কোনও দিন আলগা ভাবে হলেও কোনও উৎসাহ বা উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেননি; বস্তুতপক্ষে বেরিয়ে যাবার পরেও তো বিশেষভাবে জানতে পারিনি যে, বইগুলি কোনও-একটি অন্তত তাঁর আবেগ ও মনোযোগ আহ্বান করেছে। আমি বিস্ময়াহত হয়ে রইলুম যে, তিনি সহসা ‘মাল্যবান’ যাতে তৎকালে প্রকাশিত হতে না পারে, সেই ব্যাপারে কঠোর অনড় হয়ে রইলেন। আমি জানতে চেয়েছিলুম, জীবনানন্দ কি তাঁর মৃত্যুর আগে বিশেষ করে শুধু এই বইটির জন্যই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে গেছেন? কবে এবং কী ভাবে? কেন?

তিনি সরাসরি আমাকে কোনও আলোকাভাস না দিয়ে দিদিকে বলেছিলেন, জানলে খুকি, ভূমেন নিতান্তই ছেলেমানুষ, এ-সব ও বুঝতে পারবে না।

দিদি বিনম্র জানিয়েছিলেন, তিনিও বুঝতে পারছেন না।

ফলত, ‘মাল্যবান’ বই হয়ে প্রকাশিত হতে প্রায় আধ দশক দেরি হয়ে গেল। ১৯৭১-৭২-এ যখন নিউস্ক্রিপ্ট থেকে শেষ পর্যন্ত বেরোল, তখন জীবনানন্দর ‘মানা’ কী করে অন্তৰ্হিত হয়েছিল, তা আমার জানা নেই। অশোকানদের কাছ থেকে জানা যেতে পারত, কিন্তু ততদিনে আমি আমার ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার তাগিদে অন্য এক বিচ্ছিন্ন বলয়ে পিছলে গিয়েছি।

১৯৬৯-এ নতুন ভাবে শ্ৰী মানবেন্দ্ৰ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হল ‘মহাপৃথিবী’, সেই সিগনেট প্রেস থেকে। ‘মহাপৃথিবী’ সম্পর্কে জীবনানন্দর একটি বিশেষ দুর্বলতার ব্যাপার ছিল, আমি জানতুম; পরবর্তী কালে সেই দুর্বলতা নিবন্ধন তাঁর যে একটি গোপন করুণ ক্ষতস্থান প্রসূত হয়েছিল, তাও জানা ছিল; কিন্তু সে অন্য প্ৰসঙ্গ। পুনর্মুদ্রিত বইটি হাতে নিয়ে এবার আমার দুঃখিত হবার পালা; পূৰ্ব্বাশা-প্রকাশনালয় থেকে সঞ্জয় ভট্টাচার্য এবং সত্যপ্ৰসন্ন দত্ত বইটি প্রথম বার করেছিলেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সমসাময়িক কলকাতায় ছাপার কাগজের আকালের সময়ে হাতে-তৈরি কাগজে ছেপে, বস্তুতপক্ষে বইটির সম্পাদনাও করেছিলেন সঞ্জয় ভট্টাচাৰ্য, যিনি তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভাবে জীবনানন্দ-অনুরাগী থেকে গেছেন। সেই প্রথম সংস্করণের বইটি উৎসর্গ করা হয়েছিল যুগ্ম ভাবে প্রেমেন্দ্ৰ মিত্র এবং সঞ্জয় ভট্টাচাৰ্যকে, যাঁরা ‘নিরুক্ত’ কবিতা-পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে বরিশালবাসী জীবনানন্দকে একটা লেখার অসপত্ন একান্ত স্থান দিতে চেয়েছিলেন। নতুন সংস্করণ ‘মহাপৃথিবী’তে, দেখা গেল, উৎসর্গপত্র হয়ে গিয়েছে : শ্ৰীমতী মঞ্জুশ্ৰীকে—বাবার আশীর্বাদ। তখনও প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং সঞ্জয় ভট্টাচাৰ্য—উভয়েই বেঁচে আছেন, দ্বিতীয় জন অত্যন্ত দুৰ্ভাগ্যপীড়িত অবস্থায় অবশ্য; পূৰ্ব্বাশা প্রেস বেঁচে নেই, ধারে-দেনায় ব্যাঙ্কের নিয়মে দেউলিয়া হয়ে গেছেন তাঁরা, শরীর অশক্ত সঞ্জয় ভট্টাচাৰ্যর, দিনাতিপাত মানসিক হাসপাতাল, এবং বহিঃপৃথিবীর মধ্যে ভাগাভাগি করে। এ-রকমটা হতে পারল কী করে। সৌজন্যের সামান্য নির্দেশেও কি এটা কিঞ্চিৎ অশোভন বলে ঠেকবে না? মানবেন্দ্ৰ বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিনি না যদিও, তবু জানি তো, তিনি একজন নির্ভেজাল সজ্জন সংস্কৃতিপরায়ণ ব্যক্তি, এ-রকম একটা দুঃখজনক ব্যাপার তাঁর সম্পাদনায় কী করে ঘটে উঠল! প্রায় তৎক্ষণাৎ নতুন সংস্করণ ‘মহাপৃথিবী’র সঙ্গে আমার বিরূপতার সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল।

তত দিনে অবশ্য জীবনানন্দর পাণ্ডুলিপির সঙ্গে, বা আরও বিশদ ভাবে বলতে গেলে, তাঁর পরিবারের সঙ্গে, এমন-কী দিদির সঙ্গে, আমার যোগাযোগ ক্ষীণতর হতে-হতে অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমি তখন গ্রামবাংলায় নির্বাসিত, এবং নিজের ব্যবহারিক জীবনের জাঁতাকলের দাবির কাছে সমৰ্পিত ও প্রায় পরাভূত। জীবনানন্দ বিষয়ে কোথায় কী হচ্ছে-টচ্ছে, লাবণ্য দাশ বা মঞ্জুশ্ৰী দাশ তাঁর অপার্থিব সিদ্ধির সত্যমিথ্যার বিষয়ে কী রকম সহনশীল ও শুশ্রুষাপরায়ণ হয়ে উঠছেন, কোলাহলউন্মুখ পাঠককুলের কাছেই বা তিনি কী রকম প্রণিধানযোগ্য বিবেচিত হয়ে উঠছেন ক্রমশ, সে-সব বিষয়ে আমি নিরতিশয় অজ্ঞই ছিলুম বলা চলে। তবু বইমেলার উৎসব উদ্বেলতা বাঙালির নতুন আবিষ্কৃত সাহিত্যিক ফলনঋতু, এই শস্যভারাক্রান্ত ঋতুর অবদানেই বলতে হবে আমি সংগ্ৰহ করতে পারলুম ‘জীবনানন্দ সমগ্র’-এর প্রথম-প্রকাশিত খণ্ডগুলি এবং ‘রূপসী বাংলা—প্রকাশিত-অপ্রকাশিত’ বইটি। শ্ৰীযুক্ত দেবেশ রায়ের যোগ্য সম্পাদনায় ‘সমগ্র’ আমাকে আমার জীবনানন্দ-অসাড়তাজনিত ক্ষুদ্রতায় যথেষ্ট পীড়িত করেছে, এবং ‘প্রকাশিত-অপ্রকাশিত রূপসী বাংলা’ সরকারি ‘রূপসী বাংলা’র অনুদ্দিষ্ট সম্পাদকের যৎপরোনাস্তি অপরাধপ্রবণতা উদঘাটিত করে দিয়ে আমার নিজস্ব পরোক্ষ সহযোগিতা-নিবন্ধন পাপবোধে আমাকে আক্রান্ত করেছে। তবে আনন্দের উৎসমুখও কি তৎসঙ্গে অবারিত হয়ে যায়নি? গিয়েছে : জানতে পেরেছি যে, জীবনানন্দ আর আগের মতো নির্জন দ্বীপান্তরিত হয়ে নেই, তিনি এখন সর্বভূতে সঞ্চরণশীল হয়ে উঠছেন, তথাকথিত বিশুদ্ধতা এখন আর শুধু তাঁর একার সম্পত্তি হয়ে নেই, তাঁর নব্য অনুরাগীদের ভিতরেও তা সবিশেষ চারিয়ে গিয়েছে।

এই রকম ভাবেই আমার জীবনানন্দ-অনুভব আবর্তিত হচ্ছিল, যে-সময়ে সাহিত্যপাঠ এবং পূজাসংখ্যাপাঠ আমার কাছে সমার্থক হয়ে উঠেছে—বাৎসরিক একটি যজ্ঞানুষ্ঠান, যা পুজোর সময়ের চোদ্দ দিনের ছুটিতেই সেরে ফেলতে হয়। ফলত, জীবনানন্দ-বিষয়ে আমার সেই প্রথম যৌবনের উৎকণ্ঠা প্রায় ঝিমিয়ে পড়েছিল বলতে হবে।

ব্যাপারটা ঘেঁটে গেল এই কিছুদিন আগে। এতটাই যে, জীবনানন্দর ছবির গল্পটা, যা এতক্ষণ ধরে বললুম, তা স্মৃতির অন্ধকার প্রকোষ্ঠে হঠাৎ নড়ে-চড়ে উঠল। শ্ৰীযুক্ত মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি আমাকে যেতে হয়েছিল নিজেরই কোনও বিশেষ প্রয়োজনের তাগিদে। উৎকৃষ্ট আতিথেয়তার গুণে তিনি তো আমাকে পেড়ে ফেললেন, এতটাই যে, সৌজন্যবশত তিনি আমার সম্বন্ধে তাঁর ধারণাপ্রসূত প্রসঙ্গগুলি বিষয়ে যে-কথাই তুললেন, তাতে আমাকে মোটামুটি সততার সঙ্গে অংশ নিতে হল। তিনি জীবনানন্দর শেষ দিনগুলির কথা তুললেন, এবং আমিও তাতে না জড়িয়ে গিয়ে পারলুম না। আমরা বেশ খোলামেলা কথা বলাবলি করতে লাগলুম। হঠাৎ নতুন সংস্করণ ‘মহাপৃথিবী’র উৎসর্গ-বদলের কথাটা আমার মনে পড়ে গেল, এবং বিষয়টা মনের ভিতরে এক রকমের বেগ সঞ্চয় করতে লাগল, কিন্তু তাঁর কাছে বিষয়টা পাড়তে আমাকে বেশ সঙ্কোচ বোধ করতে হল। তবু যখন করব না করব না করেও প্রসঙ্গটা তুলেই ফেললুম, তখন মানবেন্দ্রবাবুকে খুব দুঃখিত দেখাল। আমি তাঁর একটা গোপন অসহায়তার দুঃখ ছুতে পারলুম যেন। তাঁর তো সেই অল্প বয়েসে করার কিছু ছিল না, তাঁকে ‘মহাপৃথিবী’র উৎসর্গপত্রের পরিবর্তন মেনে নিতে হয়েছিল গভীর অনিচ্ছায়, নির্ভেজাল অপরাধবোধে ক্লিষ্ট হয়ে।

“কবি জায়ার সঙ্গে সম্প্রতি জীবনানন্দর প্রতি রাত্রেই দেখাসাক্ষাৎ হচ্ছে, বিস্তৃত কথোপকথন হচ্ছে, এবং এই রাত্রিকালীন কথোপকথনের সময় পরলোকগত কবি তাঁর ‘মাল্যবান’-এর প্রকাশোপযোগিতা সম্বন্ধে সন্দেহ প্ৰকাশ করেছেন, এবং প্রকাশনার বিপক্ষে অগ্রিম অভিমত জ্ঞাপন করেছেন। এর পর শ্ৰী শঙ্খ ঘোষ আর কী করেন, জীবনানন্দর রচনাসমগ্র সম্পাদনার গুরুদায়িত্ব অধিকতর গুরুভার হয়ে পড়ায় তখনকার মতো তিনি তা গ্ৰহণ না করাই বিধেয় মনে করেন।”

কিন্তু লাবণ্য দাশ, উৎসর্গপত্রের এতাদৃশ অস্বাস্থ্যকর পরিবর্তনের জন্য সবিশেষ দৃঢ়তানিবদ্ধ হয়ে উঠতে পারলেন কী করে? তাঁকেও তো এর জন্য নিজের মতো করে এক রকমের আস্থার স্থিত-ভূমি আবিষ্কার করে নিতে হয়েছিল। আমার শ্ৰীযুক্ত শঙ্খ ঘোষের অভিজ্ঞতার কথাটি মনে পড়ল। এ-রকম অকারণ গ্লানিবোধের সমূহ সম্ভাবনা অবশ্য তিনি এড়িয়ে যেতে পেরেছিলেন। লাবণ্য দাশের জীবৎকালেই তাঁকে জীবনানন্দ-রচনাসমগ্র সম্পাদনা করার দায়িত্ব না-না করেও প্রায় নিয়ে ফেলতে হয়েছিল। প্রাথমিক বিচারে তাঁর স্বাভাবিক ভাবে মনে হয়েছিল যে, এই দুরূহ কাজে অশোকানন্দর সঙ্গে-সঙ্গে লাবণ্য দাশের অসঙ্কোচ সহযোগিতা তাঁর প্রয়োজন হবে, এবং তার জন্য অগ্রিম প্রার্থনা নিবেদন করে রাখা ভাল। কবিজায়া লাবণ্য দাশ তাঁকে আশীৰ্বাদ করেছিলেন, এবং সাগ্রহ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন; অশোকানন্দর হাত থেকে জীবনানন্দর পাণ্ডুলিপি সামলাবার দায় তখন অনেকটাই লাবণ্যের হাতে সরে গিয়েছিল। শ্ৰী শঙ্খ ঘোষ যদিও সারস্বত-সাধনার ক্ষেত্রে তখন যথেষ্ট সুস্থিত, তবু তিনি কবিজায়ার সহৃদয়তার অভিঘাতে আবেগাক্ৰান্ত হয়ে পড়েছিলেন, এবং জীবনানন্দর পাণ্ডুলিপিবদ্ধ রচনাগুলি, বিশেষত গদ্য রচনাগুলি, চাক্ষুষ করতে চেয়েছিলেন। তিনি এও জানিয়েছিলেন যে, ‘মাল্যবান’ নামের একটি উপন্যাস কপি করা আছে বলে তিনি আবছা ভাবে শুনেছেন, কপি করা আছে বলেই ওই উপন্যাসটি তিনি আগে দেখতে চান। কবিজায়া তৎক্ষণাৎ গাম্ভীৰ্যসুদূর হয়ে পড়েছিলেন, তাঁর কণ্ঠস্বর শীতলতানির্লিপ্ত হয়ে উঠেছিল, এবং কিয়ৎক্ষণ সময়ক্ষেপণের পরে তিনি জানিয়েছিলেন যে, ওই উপন্যাসটি দেখাও যাবে না, ছাপাও যাবে না। শ্ৰী শঙ্খ ঘোষ অনতিবিলম্বে সম্যক উপলব্ধি করেছিলেন যে, তাঁর সৎ আবেগোচ্ছাস অপ্রত্যাশিত ভাবে কোনও নিদারুণ আঘাটায় আছড়ে পড়েছে, তিনি নির্ঘাৎ কোনও অনাচরণীয় ভ্ৰম সঙ্ঘটিত করে ফেলেছেন তাঁর নিজের অজ্ঞাতে। তিনি অপ্ৰস্তুতের মতো সবিনয়ে না-দেখতে পাওয়ার কারণটা জানানো যায় কিনা জানতে চেয়েছিলেন, এবং যে-উত্তরটা পেয়েছিলেন তার সারমর্ম এ-রকম : কবি জায়ার সঙ্গে সম্প্রতি জীবনানন্দর প্রতি রাত্রেই দেখাসাক্ষাৎ হচ্ছে, বিস্তৃত কথোপকথন হচ্ছে, এবং এই রাত্রিকালীন কথোপকথনের সময় পরলোকগত কবি তাঁর ‘মাল্যবান’-এর প্রকাশোপযোগিতা সম্বন্ধে সন্দেহ প্ৰকাশ করেছেন, এবং প্রকাশনার বিপক্ষে অগ্রিম অভিমত জ্ঞাপন করেছেন।

এর পর শ্ৰী শঙ্খ ঘোষ আর কী করেন, জীবনানন্দর রচনাসমগ্র সম্পাদনার গুরুদায়িত্ব অধিকতর গুরুভার হয়ে পড়ায় তখনকার মতো তিনি তা গ্ৰহণ না করাই বিধেয় মনে করেন।

এখন আমি এই সত্য হৃদয়ঙ্গম করতে পারি যে, জীবিত জীবনানন্দর ছবি কবিজায়া লাবণ্য দাশকে বিশেষ টানত না, বিশেষত জীবনানন্দ যখন কোনও একজন বুজপুত্তুরের মতো ছিলেন না বা হয়ে উঠতে পারেনি, কিন্তু তা হলেও মৃত জীবনানন্দর ছায়া তাঁর সবিশেষ প্ৰীতি ভীতি এবং প্রেমের বিষয় হয়ে উঠেছিল; এই হয়ে ওঠাতে তাঁর নিজের দিক থেকে এক প্রকার প্রশ্রয়ও তিনি গঠন করে নিতে পেরেছিলেন। এবং তাঁর কথাই ঠিক, কুড়ি-একুশ বছরের সদ্য কৈশোর পেরোনো সেই-আমি যথার্থই ছেলেমানুষ ছিলুম।

*প্রবন্ধে উল্লেখিত ডি. রতন-এর দোকানে তৈরি জীবনানন্দের ছবিটি এখানে সংযুক্ত হল। ছবির পিছনে লেখা ছিল Bill no 5611

[সংকলিত]

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close