Home গদ্যসমগ্র ভ্রমণ মঈনুস সুলতান > ওল্ডর‌্যাগ পাহাড় ও খনিজ খোঁজা হাইকার >> ভ্রমণ

মঈনুস সুলতান > ওল্ডর‌্যাগ পাহাড় ও খনিজ খোঁজা হাইকার >> ভ্রমণ

প্রকাশঃ November 16, 2017

মঈনুস সুলতান > ওল্ডর‌্যাগ পাহাড় ও খনিজ খোঁজা হাইকার >> ভ্রমণ
0
0

মঈনুস সুলতান > ওল্ডর‌্যাগ পাহাড় ও খনিজ খোঁজা হাইকার >> ভ্রমণ

“বুক রিভিউ পড়ে আমি এটা জানি যে, কাককুজ নেস্ট বইতে লেখক কেন কেইসি এই রাইমটাও ব্যবহার করেছেন। কিন্তু ছড়াটির নিচে লিপিস্টিকে জোড়া ঠোঁটের ছাপ দেখে একটু খটকাও লাগে। মনে হয়, ছেলেটিকে আরেকটু জানার সুযোগ এসেছিলো, তা হারিয়ে গেলো সারা জীবনের মতো। মনে হয় না আর কখনো তার সাথে দেখা হবে।”

ওল্ডর‌্যাগ মাউন্টেনের চূড়ায় যেন ছড়িয়ে আছে এক ধরনের সহজাত সম্মোহন। গল্পে অজগর সাপের সম্মোহনী দৃষ্টির কথা শুনেছি। তার সামনে থেকে খরগোশ সহজে ছুটে পালাতে পারে না। আমিও অদৃশ্য মায়ায় জড়িয়ে শশকের মতো বসে আছি সামিট রকের পাষাণ চাতালে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার মেহনতী হাইকে মিনিট তিরিশেক আগে আমি উঠে এসেছি ওল্ডর‌্যাগ মাউন্টেনের শীর্ষে। সামিট তেমন উঁচু না, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৩,২৯১ ফিট উচ্চতায় এ ছোটখাট পর্বতের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের ব্লুরীজ পার্বত্য অঞ্চলে। গতকাল রাতে এ পাহাড়ের নিচে ফার্নে ছাওয়া ঘন বনানীতে আমি তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটিয়েছি। এতে একটি সুবিধা হয়েছে যে, খুব ভোরবেলা সুরুয উঠার পরপরই আমি ব্যাকপ্যাক কাঁধে নিয়ে হাইকিং শুরু করতে পেরেছি। পর্যটনের বইপুস্তকে ওল্ডর‌্যাগ মাউন্টেনকে বলা হয়- ‘পপুলার হাইকিং ডেসটিনেশন।’ এখানকার একাধিক ট্রেইলের পুরা সার্কিট কাভার করতে হলে অতিক্রম করতে হয় প্রায় নয় মাইল সড়ক। আমি পর্বতের ঠিক নিচে তাঁবু খাটিয়েছি বলে শর্টকাটে মাত্র মাইল পাঁচেক হেঁটে উঠে পড়েছি সামিটে। ওল্ডর‌্যাগ পাহাড়টি তৈরি হয়েছে অজস্র বিশাল বিশাল বোল্ডারের সমবায়ে। আমাকে আজ পাড়ি দিতে হয়েছে গ্রানাইট পাথরের মস্ত সব গোলাকার ফর্মেশন।

সামিটের পাষাণ চাতাল থেকে এই মুহূর্তে আমার নেমে যাওয়ার প্রয়োজন আছে। এখনই রিটার্ন হাইক শুরু না করলে, যদি বেলা ফুরিয়ে আসে, তখন আধো আলো আধো ছায়ায় তাঁবুতে ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। আকাশ থেকে মৃদু হাওয়ায় সামিট রকের দিকে ভেসে আসছে শুভ্র মেঘদল। আমার খুব কাছাকাছি চূড়ার গোলাকার তবে চেপ্টা মতো প্রকাণ্ড পাথর ছুঁয়ে নিলিমার প্রেক্ষাপটে মাদাগাসকারের মানচিত্রের মতো ভাসছে একখণ্ড মেঘ। এ মানচিত্রে যেন তরঙ্গ সংকুল সফেন সমুদ্রের কার্নিশে ইস্ট আফ্রিকার উপকুল পরিষ্কার দেখা যায়। আমি সামিট রক থেকে সাবধানে নিচে নামার জন্য উঠে পড়ি।

ছোটবেলা ছাদের উপর বাক্সে কবুতরের রোয়া-ওঠা তুলতুলে বাচ্চা দেখে কার্নিশ ধরে জানালার ফ্রেমে পা রাখার মতো খুব হুঁশিয়ার হয়ে পাথরের খাঁজে বুট চেপে নামতে শুরু করি। এ দিকে পাষাণের গতর ভিজে স্যাঁতসেতে হয়ে আছে। স্লাগ বলে এক ধরনের জলভরা লুকলুকে দেহের বড়সড় কীট তাদের মুখের দু’পাশের শুঁড় নাড়িয়ে ওঠানামা করছে রক ওয়ালে। আমার নেমে আসাতে সাদা তুলায় তৈরি মাদাগাসকারের মানচিত্র যেন ভেঙেচুরে ছত্রখান হয়ে যায়। মনে হয়, সমুদ্রে সুনামি জাতীয় জলোচ্ছাসে ডুবে যাচ্ছে বেশ কটি দ্বীপ।

মিনিট কয়েক হেঁটে আমি বেরিয়ে আসি মেঘে মেঘে আর্দ্র বাতাবরণ থেকে। মনে হয় সামনে চলার অফুরন্ত পথ, যাওয়ার গন্তব্য অনেক। পাহাড়ের এই চূড়ায় আর হয়তো কখনো ফেরা হবে না। ঘুরেফিরে তাকাই। অন্য প্রেক্ষিত থেকে দেখি, খানিক শারীরিক কসরতে সামিট রকের দিকে উঠে যাচ্ছে আরো দু’তিন জন মেহনতী হাইকার। ওদের মতো অ্যাডভেনচারপ্রিয় হতে যে বাসনা হয় না তা নয়, তবে হিম্মত করে উঠতে পারি না। যারা ম্যামথ আকৃতির বোল্ডার বেয়ে উঠছে, তাদের আছে রক ক্লাইম্বিংয়ের অভিজ্ঞতা, এরা সিজন্ড হাইকার, এদের সাথে পাল্লা দিতে গেলে পা ফসকে পড়ে কোমর ভাঙার সম্ভাবনাই বেশি। তাই চুপচাপ বসে থেকে দিগন্তে ভেসে যাওয়া মেঘ দেখি। ছত্রাক আকৃতির একটি ক্লাউড ফর্মেশনে মেঘের শুভ্রতায় জড়িয়ে আছে নীল আকাশে বেগুনি আলোর ছোঁয়া। আমি নিচের দিকে যাচ্ছি, তবে পথ সামান্য ঢালু বলে পরিশ্রম হয় খুবই কম। মেঘের অল্প নিচ দিয়ে হাঁটছি, তাই ঘন বনানীতে ডোরাকাটার বাঘের আলোছায়া নিশানার মতো সল্প ভেজিটেশনের বেগুনি, সবুজ ও মরচে রঙে খেলে যায় সোনালি সূর্যালোক। কিছু কিছু বিশাল ভারি সব পাথর সৈকতে পড়ে থাকা অনেকগুলো মৃত তিমি মাছের মতো ছড়িয়ে আছে। তার একটিতে বসে ঘণ্টা দুয়েক আগে হাইকিং ট্রেইলে দেখা বৌদ্ধ শ্রমণ যুগল। হাইকিং করে সামিটে ওঠার সময় তাদের আমি দূর থেকে মন্ত্র জপতে জপতে পাশাপাশি হাঁটতে দেখেছি। তারা তাদের গৈরিক উত্তরীয় খুলে ভাঁজ করে রেখেছেন পাথরে। দু’জনে পাশাপাশি বসে এখন ওয়াকম্যানে মিউজিক শুনছেন। কেবলমাত্র একটি ইয়ারফোনের দু’টি বোতাম শেয়ার করে দু’জনের দু’কানে গোঁজা। তাদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছা হয়। তাই দাঁড়িয়ে পড়ি। খুবই কাঁচা বয়সের এই সন্ন্যাসী- দু’জনের পরনে টিশার্ট। তাতে কম্বোডিয়ার আঙ্কর ওয়াটের ছাপচিত্র ছোট্ট করে আঁকা। তার নিচে মেয়েটির টিশার্টে মহাভারত ও ছেলেটির টিশ র্টে রামায়ণের ঘটনাবহুল নকশা। কম্বোডিয়ায় কাজ করতে যাওয়ার উৎসাহে এই অঞ্চল নিয়ে আমি কিছু কিছু তথ্য, চিত্র ও ডকুমেন্টারী ঘেঁটেছি। আঙ্কর ওয়াটের দীর্ঘ গ্যালারিতে ফ্রেস্কো করে আঁকা রামায়ণ ও মহাভারতের নকশা আমি শনাক্ত করি। তাদের সাথে কথা বলার ইচ্ছা আরো তীব্র হয়। কিন্তু সন্ন্যাসী যুগল চোখ মুদে গান শুনছেন। তারা এবার চোখ খুলে পরষ্পরের দিকে তাকিয়ে এমন মিষ্টি করে হাসেন যে মনে হয়- এরা আঙ্কর ওয়াটে হানিমুন করার কথা ভাবছেন। আমি হাত নেড়ে তাদের ওয়েভ করি। কিন্তু তারা আমার দিকে মনযোগ দেয়ার কোন প্রয়োজন বোধ করেন না।

আমি একা একা হেঁটে খানিক নিচের দিকে নামি। এদিকে আরো কিছু পাথরের উপর দাঁড়িয়ে গুলতানি করছে জনা কয়েক হাইকার। আমি দাঁড়িয়ে পড়ে তাদের দিকে হাত নাড়লে তারা ওয়েভ ব্যাক করে। ‘গাইজ, হেভিং ফান’, বলে আমি আমি খেজুরে আলাপ জমাতে চাই। ‘ও ইয়া, হ্যাভ অ্যা নাইস ওয়াক’, বলে তাদের একজন আলাপকে দায়ের কোপ দিয়ে ডাল কাটার মতো সমাপ্ত করে দেয়। আমার নিঃসঙ্গতা বাড়তে থাকে। তবে চলার পথ সহসা বর্ণাঢ্য হয়ে ওঠে। এদিকের পাথুরে জমিনে গজিয়েছে নরোম সবুজ ঘাস। তা ছাপিয়ে টিলার ঢালে বেড়ে ওঠা থোকা থোকা পার্পল বর্ণের ফুল ছড়াচ্ছে ভেষজ সৌরভ। এসব ফুলের ছবি আমি আগে দেখেছি, তবে এদের প্রজাতি জেমসটন না লেভেন্ডার ঠিক ধরতে পারি না। এদিকে বিস্তর প্রজাপতি। ইস্টার্ন টাইগার বলে হলুদে ডোরাকাটা প্রজাপতিদের একটু-আধটু উড়তে দেখা গেলেও প্রতিটি বেগুণি ফুলের গুচ্ছে বসে থাকা একটি বা দু’টি এডমিরাল বলে লালচে রঙের জমকালো প্রজাপতিদের বেজায় সিরিয়াস দেখায়। আমার চলাচলে যেন বিরক্ত হয়ে ফুল থেকে সরে তারা অন্য ফুলে বসে বটে। তবে তাদের কোরকে হুল ফোটানো এমনই জরুরি যে, অজানা এক হাইকারের পদসঞ্চালনে অযথা উড়ে বেড়াতে উদ্যোগী হয় না।

আমি পায়ে চলার সম্পূর্ণ নির্জন ট্রেইল ধরে হন হন করে হাঁটি। এসে পড়ি অর্ধচন্দ্রাকৃতির এক ছোট্ট প্রান্তরে। এখন আমি আর ঠিক একা না। আমার পাশ দিয়ে ব্যাকপ্যাকে প্রচুর মালসামান নিয়ে সামনে হেঁটে যায় অল্প বয়সী সুদর্শন এক হাইকার। কেন জানি ফিরে তাকালে দেখি, সে-ও ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে দেখছে। ‘হেই ম্যান’, বলে আমি তাকে গ্রীট করলে সে সম্পূর্ণ ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে,‘ইউ গট এনি সিগ্রেটস্ ম্যান?’ আমি জবাব দেই,‘ ওয়েল, নো, বাট আই হ্যাভ সাম ট্যবাকো, ইফ ইউ ওয়ান্ট।’ আমার এ প্রস্তাবে খানিক কসরতে ব্যাকপ্যাক নামিয়ে মাটিতে রাখতে রাখতে সে বলে, ‘ডার্ন, আই ডোন্ট হ্যাভ অ্যা পাইপ টু স্মোক ট্যবাকো।’ আমি তাকে আশ্বস্ত করে বলি, ‘কোন অসুবিধা নেই। ডোন্ট ওয়ারি, আই হ্যাভ রোলিং পেপারস্।’ আমরা একটি পাথরের উপর বসলে আমি ব্যাকপ্যাক থেকে বের করি হাফ এন্ড হাফ ট্যবাকোর পাউচ। সে তা তুলে শুঁকতে শুঁকতে বলে, ‘দিস ইজ ওয়ান্ডারফুল ম্যান, এ তামাকের সৌরভ খুব সুন্দর।’ সে রলিং পেপার দিয়ে হাফ এন্ড হাফ ট্যবাকো পেঁচিয়ে সিগ্রেট বানাতে শুরু করলে আমি তাকে দেখি। সোনালি খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা নীল চোখের এই যুবককে ভাস্করের হাতে গড়া গ্রীক দেবতাদের মূর্তির মতো দেখায়।

স্মোক করতে করতে আমরা ব্লুরীজে হাইকিং করার অভিজ্ঞতা নিয়ে টুকটাক কথা বলি। তীব্র নীল চোখে সে আমার দিকে তাকিয়ে একটু সুখদুঃখের কথা বলে। শুনতে শুনতে মনে হয়, তার মন যেন এখানে নেই। আর তার চোখ দু’টি মনে হয়, দেখছে অন্য কোন শহরের কোন নির্জন বাড়ির অত্যন্ত ম্লান পরিবেশে ঘটে যাওয়া কোন নেতিবাচক দৃশ্য। ‘হোয়াটস্ আপ ম্যান, ফিলিং টায়ার্ড ফ্রম হাইকিং?’ বলে আমি আলোচনাকে পার্সনেলাইজড্ করতে চাই। সে যেন স্রোতজলে ভেসে যেতে যেতে নদীতীরে মাটি ঝুরে বেরিয়ে পড়া শিকড় খপ করে ধরে বলে, ‘উইল ইউ হাইক উইথ মি ম্যান?’ আমি তৎক্ষনাত তার প্রস্তাব কবুল না করে বলি, ‘এতো ভারি ব্যাকপ্যাক নিয়ে কোন দিকে হাইক করছো তুমি? কি ঘটনা?’ সে ফিসফিস করে বলে, ‘আমি কর্কট রাশির জাতক। সকালে হাইক শুরু করার সময় খেয়াল করে হরস্কোপ পড়েছি। সূর্যের এখন যে অবস্থান, আরো আড়াই ঘণ্টা পর মকরে এসে ছায়া ফেলবে বুধ গ্রহ। ঠিক তখনই একটু খোঁড়াখুঁড়ি করলে পাওয়া যাবে খনিজ দ্রব্য।’ তার কথা শুনে ‘আর ইউ অ্যা মাইনার?’ আমি জানতে চাই। সে জবাব দেয়, ‘নট রিয়েলি, এখনো পুরোমাত্রায় মাইনার হয়ে উঠতে পারিনি। গেল সামারে আমি টিটান পাহাড়ের একটি ঝোরাতে প্যানিং করেছি, চালুনি দিয়ে দিনের পর দিন নদীর বালুকা ও নুড়িপাথর ছেঁকেছি কিন্তু গোল্ড পাইনি। তারপর পুরো সেমিস্টার আমার কুফা কেটেছে। এই যে কোনো কাজকর্ম করছি না, এ জন্য কী বলবো… মাই মাদার হেইটস্ মি। আমার গার্লফ্রেন্ডও আমাকে ছেড়ে গেছে। শি থিংকস্ আই অ্যাম জাস্ট অ্যা লুজার। আই ক্যান্ট টেইক ইট এনি মোর ম্যান।’ আমি এবার জানতে চাই, ‘হোয়াই ইট ইজ ইমপরট্যান্ট টু ফাইন্ড গোল্ড? খুঁড়ে খনিজ কিছু না পেলে চলে না তোমার?’ এ প্রশ্নের রেসপন্সে সে বলে, ‘আমার সাইক্রিয়াটিস্ট বলছে আমার ফোকাস দরকার, কোন কিছুতে একটু সাকসেস আসলেই ফিরে আসবে কনফিডেন্স। আই হোপ আই উইল ফাইন্ড সাম মিনারেলস্। সফলভাবে কোন খনিজ দ্রব্য উত্তলন করতে পারলে, চাপ চাপ মাটি ও পাথরের চাঙড়ের তলায় কিছু একটা খুঁড়ে পেলে, তা হেল্প করবে আমার জীবনের দিক নির্দেশনা পেতে।’

একটু থেমে রোল করা সিগ্রেট পুরোটা ফুঁকে সে আবার বলে, ‘সাইক্রিয়াটিস্ট আমাকে সিমবেলটা নামে একধরনের ট্যাবলেট দিয়েছে। এটা খেলেই আমার দুঃস্বপ্ন হয়। আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু গো থ্রু নাইটমেয়ারস্। আমার ব্যাকপ্যাকে খোঁড়াখুঁড়ির সব ধরনের ইক্যুপমেন্ট আছে। বেশি ডিপে যেতে হবে না। ‘আই অ্যাম শিওর আই উইল গোনা গেট সাম কপার টুডে, মে বি সাম সিলভার এজ ওয়েল।’ সে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে আবার জানতে চায়, ‘আর ইউ গোনা কাম উইথ মি? একটু হেল্প করলে মাটির নিচ থেকে যা উঠবে, কপার বা সিলভার হোয়াটয়েভার, খনিজদ্রব্য আমরা ফিফটি ফিফটি ভাগ করে নেবো।’

না, আমি তাঁবু খাটিয়েছি অন্য দিকে, জায়গাটা এখান থেকে একটু দূরেও। তাই, ঠাণ্ডা মাথায় বলি, ‘স্যরি ম্যান, আই ক্যান্ট রিয়েলি জয়েন ইউ। ইউ হ্যাভ টু ডিগ কপার অর সিলভার অল বাই ইয়োরসেল্ফ।’ আমার জবাব শুনে তার এক্সপ্রেশনে যেন প্রেমে প্রত্যাখাত হয়েছে- এই ধরনের বেদনা ফুটে ওঠে। সে উঠে হাইক শুরু করতে গিয়ে বলে, ‘ওয়ান মোর থিং, ইউ ওয়ানা বার্টার ইয়োর লাভলি হাফ এন্ড হাফ ট্যবাকো?’ প্রস্তাব শুনে আমি দ্রুত চিন্তা করি। আমার তাঁবুতে আরেক প্যাকেট হাফ এন্ড হাফ ট্যবাকো আছে। ছেলেটিকে বিমুখ করতে ইচ্ছা হয় না। সুতরাং বলি, ‘লেটস্ সি, বিনিময়ে তুমি কি দিচ্ছো?’ সে ধীরে-সুস্থে ব্যাকপ্যাক নামিয়ে তা থেকে বের করে মস্ত ভারী একখণ্ড পাথর। ‘ইয়োর ট্যবাকো ইজ লাভলি, এন্ড লুক, আই নো সামথিং আবাউট মাইনিং। গতকালই আমি ব্লুরীজের এই এলাকা থেকে এই গ্রীন স্টোনটি খুঁড়ে বের করেছি।’ আমি সবুজাভ ভারি পাথরের চাকলার দিকে তাকিয়ে বলি, ‘হোয়াট ইজ দিস স্টোন একচুয়ালি?’ সে আমাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলে, ‘জাস্ট বিলিভ মি, কেটে পালিশ করলে এটা থেকে বের হয়ে আসবে সেমিস্পেশাস গ্রীন স্টোন। জেমস্টোনের যে কোন প্রদর্শনীতে তুমি তা পয়ত্রিশ থেকে ষাট ডলারে বিক্রি করতে পারবে।’ ‘আর ইউ শিওর দিস ইজ অ্যা সেমি স্পেশাস জেমস্টোন?’ বলে আমি সংশয় দেখালে সে এবার কনফিডেন্টলি বলে, ‘এই পাহাড়ের লাভা ফ্লো পাঁচশত সত্তর মিলিওন বছরের পুরানো। তা থেকে সৃষ্টি হয়েছে যে বেসাল্ট পাথরের, তীব্র তাপ ও প্রেসারে তার কিছু অংশ রূপান্তরিত হয়েছে মূলত সবুজ রঙের মহার্ঘ পাথরে।’ পাথর খণ্ডটি ভারি, ক্যারি করতে অসুবিধা হবে বলে আমি তা বিনিময়ে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে বলি, ‘ইফ ইউ রিয়েলি লাইক দ্যা হাফ এন্ড হাফ ট্যবাকো, জাস্ট টেইক ইট। বিনিময়ে আমাকে সবুজ পাথর বা এ ধরনের কিছু দিতে হবে না।’

আমার প্রস্তাবে ছেলেটি একটু অপমানিত হয়ে বলে, ‘নো, আই অ্যাম নট গোনা টেইক ইয়োর ট্যবাকো উইথআউট গিভিং ইউ সামথিং ইন একচেইঞ্জ। বার্টার বা বিনিময়ের এটা নিয়ম না। দেখি আমার ব্যাকপ্যাকে আর কি কি আছে? কিছু না কিছু একটা তোমার অবশ্যই পছন্দ হবে।’ বেশ খোঁজাখুঁজিতে সে এবার একটি বই বের করে জিজ্ঞেস করে, ‘ডু ইউ রিড? বিট জেনারেশনের বইপত্রে তোমার ইন্টারেস্ট আছে কি?’ আমি বেশ এক্সাইটেড হয়ে তার হাত থেকে ‘ওয়ান ফ্লু অভার দি কাককুজ নেস্ট’ বইটি নেই। কবি এলেন গিনর্সবার্গদের সমসাময়িক কেন কেইসির লেখা এ বিতর্কিত বইটির অনেক নাম শুনেছি, কিন্তু পড়ার কখনো সুযোগ আসেনি। তাই বলি, ‘চমৎকার এ বইটির বিনিময়ে শুধু ট্যবাকোই না, তোমাকে তো আরো কিছু দেয়া দরকার।’ ‘নো, নট নেসেসারিলি’, বলে সে ব্যাকপ্যাক তুলে যেতে গিয়ে আবার বলে, ‘প্লিজ রিড দিস বুক কেয়ারফুলি। আমাকে তো চেনাজানার সুযোগ পেলে না, এ বইটি পড়লেই বুঝতে পারবে… হু আই অ্যাম, এন্ড হাউ আই অ্যাম সাফারিং।’

সে চলে গেলে তার ব্যবহার করা সাফারিং শব্দটি প্লাস্টিকের ফুলে ঠোকর খাওয়া প্রজাপতির মতো আমার হৃৎপিণ্ডে ঘুরপাক করে। মনে হয়, অল্প বয়সী এই হাইকার সম্পর্কে আমি তার দিনযাপনের কিছু একটা ঠিক বুঝতে পারিনি। তার বিষন্ন মুখ মনে ভাসে। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত ‘ওয়ান ফ্লু অভার দি কাককুজ নেস্ট’ বইটি সম্পর্কে হিপি সার্কেল ও বোহেমিয়ানদের আড্ডায় এতো শুনেছি যে- সাইক্রিয়াটিস্ট হাসপাতালের প্রেক্ষাপটে ব্রমডেন বলে হাফ নেটিভ আমেরিকান এক মানসিক রুগির চরিত্রকে চেনা মনে হয়। বইটি এভাবে হাতে এসে যাওয়াতে মনে হয়, যেন ব্রমডেনের সাথে দেখা হয়ে গেলো হাইকিং ট্রেইলে সহসা। আমি তার পৃষ্ঠা ওল্টাতেই বুকমার্কার হিসাবে রাখা একটি কার্ড বেরিয়ে আসে। তাতে লেখা একটি রাইম বা ছড়া, ‘ওয়ান ফ্লিউ ইস্ট, ওয়ান ফ্লিউ ওয়েস্ট, এন্ড ওয়ান ফ্লিউ অভার দি কাককুজ্ নেস্ট।’ বুক রিভিউ পড়ে আমি এটা জানি যে, কাককুজ নেস্ট বইতে লেখক কেন কেইসি এই রাইমটাও ব্যবহার করেছেন। কিন্তু ছড়াটির নিচে লিপিস্টিকে জোড়া ঠোঁটের ছাপ দেখে একটু খটকাও লাগে। মনে হয়, ছেলেটিকে আরেকটু জানার সুযোগ এসেছিলো, তা হারিয়ে গেলো সারা জীবনের মতো। মনে হয় না আর কখনো তার সাথে দেখা হবে।

আমি খানিক খিন্ন মনে হেঁটে চলি ট্রেইলে। ওল্ডর‌্যাগ মাউন্টেন থেকে চলে যাচ্ছি বেশ দূরে। তাই দাঁড়িয়ে ফিরে তাকাই। দিগন্তে গ্রানাইট পাথরের ধূসর পাহাড়, তার রীজে ঝলমল করছে সবুজ গাছপালা ও উঁচু এলিভেশনে জন্মানো লতাগুল্ম। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে, মাত্র ঘণ্টা দুয়েক আগে আমি এই পাহাড়ের সামিটে বসে তাকিয়ে ছিলাম, শুভ্র মেঘে তৈরি মাশরুম আকৃতির দিকে। আস্তে আস্তে আবার হাইক শুরু করি। তাকিয়ে দেখি- পাহাড়ের নিচের লেয়ারের একটি জনহীন ট্রেইল ধরে হেঁটে যাচ্ছে, আমার সাথে বইয়ের বিনিময়ে ট্যবাকো নেয়া হাইকার তরুণটি। পথে তার পাশে কালো একটি ভালুককে নিরাসক্ত ভঙ্গিতে হাঁটতে দেখে মনে মনে শিউরে উঠি।

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close