Home গদ্যসমগ্র ভ্রমণ মঈনুস সুলতান > মাউন্ট রেঁনেয়ারে সাপওয়ালা নারীর সাক্ষাৎ >> অভিযান

মঈনুস সুলতান > মাউন্ট রেঁনেয়ারে সাপওয়ালা নারীর সাক্ষাৎ >> অভিযান

প্রকাশঃ June 12, 2018

মঈনুস সুলতান > মাউন্ট রেঁনেয়ারে সাপওয়ালা নারীর সাক্ষাৎ >> অভিযান
0
0

মঈনুস সুলতান > মাউন্ট রেঁনেয়ারে সাপওয়ালা নারীর সাক্ষাৎ >> অভিযান

 

“মৌতাত বেশ জমে উঠতেই তিনি গালায় সাপ জড়িয়ে খুব মৃদু স্বরে বাজাতে শুরু করেন মারাক্কাস। ক্যাম্প-ফায়ারের আগুন নিভে আসছে। মারাক্কাসে তাল দিতে দিতে কি কারণে তিনি কাকে যেন অভিশাপ দিয়ে হু হু করে কাঁদেন। আমরা কি করবো ঠিক বুঝতে পারি না। ”

 

গতকাল থেকে আমি স্কারলেটের সাথে মাউন্ট রেঁনেয়ারের খানিকটা ঢালু রীজে হাইক করছি। ইউনিভারসিটি অব ম্যাসাচুসেটসের ক্যাম্পাসে কাকতালীয়ভাবে তার সাথে পরিচয় হয়েছে মাত্র দিন বিশেক আগে। সামান্য ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। মাউন্ট রেঁনেয়ারে যুগলে হাইক করার আইডিয়াটা আসলে তার। স্কারলেটের মতামত হচ্ছে- একত্রে কোন রকমের দ্বন্দ্ব-বিসংবাদে না জড়িয়ে যদি আমরা সপ্তাহখানেক হাইক করতে পারি, তাঁবুর সল্প পরিসরে বসবাস করতে পারি, তাহলে আমাদের বন্ধুত্ব নিবিড় হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আমি নিকট অতীতে সমতলের বনানীতে হাইক করলেও মাউন্ট রেঁনেয়ারের মতো পর্বতের হাই এলিভেশনে হাইক করার অভিজ্ঞতা আমার নেই। স্কারলেটের প্রস্তাব আমাকে রোমাঞ্চিত করে। রাজি হয়ে গতকাল থেকে আমি তার সাথে হাইক করছি। কিন্তু প্র্যাকটিসের অভাবে বিকালের দিকে অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়লে মাঝপথে স্কারলেট হাইকিংয়ে বিরতি ঘটায়। মাউন্ট রেঁনেয়ারের হাইকিং ট্রেইলে যেখানে সেখানে তাঁবু খাটানোর নিয়ম বিরুদ্ধ। এর জন্য আছে ডেজিগনেটেড এলাকা। কিন্ত গতকাল এক টানা ঘণ্টা কয়েক হাইকিং করার পর আমার ক্লান্তি এমন প্রবল ছিলো যে তাঁবু খাটানোর ডেজিগনেটেড এরিয়াতে যাওয়ার মতো শারীরিক শক্তি অবশিষ্ট ছিলো না। তো অবশেষে রিস্ক নিয়ে একটু জংলা জায়গায় ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে আমরা বেআইনিভাবে তাঁবু টাঙাই। তারপর খাওয়া দাওয়ার জন্য চুলা জ্বালা বা ক্যাম্প-ফায়ারের কোন বন্দোবস্ত না করেই সটান ঘুমিয়ে পড়ি।

বেশ দেরি করে ভাঙে ঘুম। ভারি অলস লাগে। সাথে সাথে তাঁবু গুটিয়ে পিঠে ব্যাকপ্যাকের বোঝা চাপিয়ে হাইকিং করতে আমাদের করোরই ইচ্ছা হয় না। তার উপর শিশিরে ভিজে আছে তাবৎ টেন্ট। রোদ মাত্র উঠেছে, তাই তাঁবু শুকানোর জন্যও একটু সময় দিতে হয়। আমরা তাঁবু ভেঙে তা মেলে দেই রোদে। ভাগ্যিস রেঞ্জারার্স স্টেশন থেকে বোতলে করে পানি নিয়ে এসেছি। খুব হিসাব করে তার অর্ধেকটা আমরা খরচ করি টুথ ব্রাশে। না, আমার নড়তে চড়তে ইচ্ছা হয় না একেবারে, তাই বসে থাকি বিপুল নির্জনতার ভেতর খানিক দূরের শিশিরে রোদ-ছোঁয়া বনানীর দিকে চেয়ে। স্কারলেট ব্যাকপ্যাক গোছগাছে তৎপর হয়ে ওঠে। তারপর খানিক হেঁটে গিয়ে ঝোঁপ থেকে তুলে নিয়ে আসে বেশকিছু ব্লুবেরী। গেল রাতে আমাদের খাওয়াদাওয়া হয়নি একেবারে। তাই সে গাছের আড়ালে বাতাস বাঁচিয়ে বসে ছোট্ট স্পিরিট-স্টোভ জ্বালাতে। যাতে বাতাস ভালো করে আটকানো যায় এ জন্য আমি তার পাশে ব্যাকপ্যাকগুলো রক্ষাবুহ্যের মতো সাজাই। রসদ হিসাবে সাথে করে ময়দার মিক্সও এনেছে। তা দিয়ে সে ময়ানে ব্লুবেরী মিশিয়ে ফ্রাইপ্যানে প্যানকেইক ভাজে। তারপর এলুমিনিয়াম ফয়েলে করে ঝলসে নেয় বড়সড় দু’টি মিষ্টি আলু। আঙুল দিয়ে খুঁটেখুঁটে আলু খেয়ে জিন্সের পিছনে হাত মোছে সে। অতঃপর আমরা ভাগ করে চিনি-দুধ ছাড়া এক পেয়ালা তিক্ত কফি পান করি।

বেলা হয়ে যাচ্ছে। রেঞ্জাররা হয়তো ঘোড়ায় চড়ে এখুনি বেরুবে টহলে। মাউন্ট রেঁনেয়ারের পার্কে যেখানে সেখানে তাঁবু ফেলার নিয়ম নেই। কাল সন্ধ্যায়- বিশেষভাবে আমি বেজায় ক্লান্ত ছিলাম বলে এখানে আঘাটায় টেন্ট ফেলে রাত কাটিয়েছি। আজ ধরা খেয়ে আমরা ঝামেলায় পড়তে চাই না। সুতরাং ভাঁজ করে দ্রুত তাঁবু গুটাই। এদিকে কোন ডাস্টবিন নেই, তাই স্কারলেট সব ট্র্যাশ আবর্জনা জড়ো করে ব্যাকপ্যাকে পুরে। হাঁটতে হাঁটতে আমরা কথা বলি। হার্ডকোর হাইকাররা এখানে দিনে নয় থেকে দশ মাইল হাইক করতে পারে। আমি প্রথমবারের মতো হাই এলিবেশনে হাইক করছি। আমার পথ চলায় এখনো গতি আসেনি। স্কারলেট ঘুরে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘লেটস্ টেক ইট ইজি ফর আ ডে।’ আমরা রাজি হই যে, আজকের দিনে কত মাইল অতিক্রম করবো- এরকম কোন টার্গেট ঠিক না করে যে দিকে খুশি একটু ইচ্ছা মতো হাঁটাহাঁটি করি।

যে ট্রেইল কালকে সমাপ্ত করতে পারিনি, ঘণ্টাখানেক খুব রিলাক্স ভঙ্গিতে হেঁটে আমরা তার প্রান্তে চলে আসি। এখানে ব্যাকপ্যাক রেখে স্কারলেট একটি বড় পাথরের উপর বসে মেলে ধরে টপোগ্রাফিক ম্যাপ। সে স্পষ্টত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা, দূরত্ব, কোথায় পানীয় জলের ঝর্ণা আছে বা দিনের শেষে তাঁবু খাটানোর লোকেশনই বা কোন দিকে- এসব তথ্য খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছে। ট্রেইলের পাশেই একটি খাদ তার ঝোপঝাড় নিয়ে মিশে গেছে বেশ নিচু শূন্য গহ্বরে। খড়কুটা রঙের একঝাঁক পাখি এসে বসে ঝোঁপঝাড়ে। তাদের কাকলিতে যেন নির্জনতার আঁশে বোনা ঢেউটিনের চালে ঝরঝরিয়ে পড়ে বৃষ্টির ফোঁটা। পাখিগুলো অল্পসল্প উড়ে, তারপর পাখসাটে সবুজ পাতার বুনোট ছত্রখান করে দিয়ে হলুদ চঞ্চুতে খুঁটে খায় ব্লুবেরী। না, এ পাখিগুলোর নাম স্কারলেট জানে না। সে ব্যাকপ্যাক খুলিবিলি করে খোঁজে মাউন্ট রেঁনেয়ারে বার্ড ওয়াচিংয়ের বই। সাথে সামানাদি বিস্তর, তাই সহজে পাখি চেনার চিত্রিত বইটি পাওয়া যায় না। সে হাল ছেড়ে দিয়ে মন্তব্য করে, ‘সো, ইউ আর অ্যা বার্ডওয়াচার।’ ‘ইয়েস আই এনজয় ওয়াচিং বার্ডস্।’ আমার জবাবে স্কারলেটের চোখেমুখে খেলে যায় উৎসাহের ঝিলিক। সে আমার দিকে তাকিয়ে অভিব্যক্তিতে ইংগিতময়তা ফুটিয়ে তুলে বলে, ‘দেন প্রবেবলি উই কুড লিভ টুগেদার ফর অ্যা লঙ টাইম।’ পাখি পর্যবেক্ষণের সাথে দীর্ঘদিন একত্রে বসবাসের সম্পর্ক কি- তা জানতে চাইলে, সে হাঁটার উদ্যোগে ব্যাকপ্যাক কাঁধে তুলে নিয়ে বলে, ‘একই বিষয়ে আমাদের আগ্রহ থাকলে, একত্রে বাস করতে সুবিধা হয়। পারহেপ্স উই উড গো ফর বার্ড ওয়াচিং টুগেদার ওয়ান্স ইন এ হোয়াইল।’

এবারের ট্রেইলটি তুলনামূলকভাবে খাড়াই। হাঁটতে হাঁটতে তা যেন সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে উঠে যাচ্ছে আকাশের দিকে। আজকে তাড়া কম, তাই আমরা ধীরেসুস্থে পথ ভাঙি। ট্রেইল থেকে সামান্য দূরে ঝোঁপঝাড়ের পাশে ধূসর একটি বোল্ডারে হেলান দিয়ে বসে পানামা হ্যাট পরা এক মেয়ে হাইকার। তাকে বেজায় ক্লান্ত দেখায়। আমি হাঁটতে হাঁটতে তার দিকে তাকাচ্ছি দেখে, সে ঘাড় বাঁকিয়ে মৃদু হেসে হাত নাড়ে। আমি সহজে চোখ ফেরাতে পারি না। তার চোখে আমার দৃষ্টি লক হয়ে গেলে সে যেন নীরবে বলতে চায়, ‘ম্যান, হোয়াই অল দিস হারি, দাঁড়াও না ভাই এক দণ্ড।’ কিন্তু স্কারলেট সাথে আছে, তাই থেমে সুচারুভাবে ‘হাই’ বলতে স্বাচ্ছন্দবোধ করি না। আমাদের দু’পাশ হঠাৎ করে ছেয়ে যায় ঘন গাছপালায়। টানেলের মতো এ ট্রেইল থেকে উপরিতলে দেখা যায় মেঘ-ভাসা আকাশ। ঘণ্টা আড়াই বেহদ পরিশ্রমের পর আমরা চলে আসি প্লাটোর মতো সমতল প্রান্তরে। ঘামে ভিজে গেছে আমাদের শরীর। এ মাঠের এখানে ওখানে ফুটেছে বুনো লিলি। পথে পড়ে আছে আস্ত একটি গাছ। তার পাশে ব্যাকপ্যাক রেখে স্কারলেট বসে পড়ে গাছে। রোদ বেশ চড়েছে। গরমে তার চোখমুখ তাতিয়ে আছে। চারদিকে তাকিয়ে এখানে কেউ নেই দেখে সে খুলে ফেলে টিসার্ট।

আমাদের বেজায় ক্ষিদা পেয়েছে। বিফ জার্কি বলে খটখটে শুকনা মাংস চিবাই। তারপর সানড্রাইড্ টমেটো ও আপেল খেয়ে স্কারলেট সটান শুয়ে পড়ে কাটা গাছের উপর। বোতলের পানি শেষ হয়েছে অনেক আগে। আমি উশখুশ করলে সে একটি লজেন্স আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে পাশে গাছে-ফোটা লিলি কাছে টেনে নিয়ে শোঁকে বুনোফুলের গন্ধ। আমিও গাছে হেলান দিয়ে বসি। আকাশে চক্রাকারে উড়ছে ক’টি চিল। দু’চোখ মুদে আছে স্কারলেট। শিক খুলে ফেলার পর নেতিয়ে পড়া জোড়া তাঁবুর মতো তার উদ্ভিন্ন স্তন যুগলের উপর পড়ে আছে টিসার্ট। সে এবার চোখ খুলে আমাকে দেখে হাই তুলে বলে, ‘ডোন্ট গেট এনি ইন্টারেস্টিং আইডিয়া নাও। উই হ্যাভ মাইলস্ টু গো।’

আমরা আবার মার্চ করি। এদিকে নির্জনতা গাঢ় হয়ে জমছে। পথের পাশে ছড়ানো ধূসর কিছু বোল্ডার ছাড়া কোথাও তেমন কিছু দেখি না। মাঝে মাঝে শুভ্র চামরের মতো ফুটে থাকা বিচিত্র একটি ধবধবে সাদা ফুল ল্যান্ডস্কেপে নিয়ে আসে অনুপম বৈচিত্র। হঠাৎ করে পুকুরে আধলা ইট পড়ার মতো আকাশ থেকে ঘাসে খল্লাৎ শব্দে ল্যান্ড করে বড়বড় একটি পাখি। খেচরটিকে পোষা মুরগির মতো দেখায়। পাখিটি স্কারলেটের চেনা। তাই সে দাঁড়িয়ে পড়ে বলে, ‘দিস বার্ড ইজ কল্ড স্কাই গ্রাউস।’ নিজের নাম শুনতে পেয়ে পাখিটি যেন খুশি হয়ে ডেকে ওঠে- পক.. কক.. কক.. রক। তাড়া করে ঘণ্টাখানেক ধুমধাড়াক্কা মার্চে চলে আসি কেমন যেন ষড়ভূজের আকারের এক পুকুরের পাড়ে। বাতাস বয়ে যাওয়া জলের দিকে তাকিয়ে আমাদের জান তর হয়ে যায়। পাড়ের দীর্ঘ ঘাসে ব্যাকপ্যাক রেখে নগ্ন স্নানে মেতেছে এক হাইকার দম্পতি। তাদের প্রাইভেসি দিতে আমরা ঘুরে সরে আসি পুকুরের অন্য পাড়ে।

এখানে দূরের ঝর্ণা থেকে বয়ে আসা জলের ধারা স্পষ্ট দেখা যায়। বুট খুলে আমরা পানিতে পা ধুয়ে নেই। গলায় সবুজ পালকঅলা এক জোড়া বেলেহাঁস ভেসে যায় ঝর্ণার দিকে। পানিতে পা ডুবিয়ে আমার আরো অনেকক্ষণ বসে থাকতে ইচ্ছা হয়। স্কারলেট ওয়াটার বটল ভরে নিয়ে চোখেমুখে পানি ছিটিয়ে আমাকে টেনে তোলে, ‘প্লিজ, ওয়াক এনাদার মাইল অর টু, তাঁবু খাটানোর মতো জায়গা যে খুঁজে বের করতে হয়।’

চলতে চলতে আমরা আবার প্রান্তর ছেড়ে এসে পড়ি ঝোঁপঝাড়ের ভেতর। কোথায় যেন সবুজের শ্যামলিমা কেটে বয়ে যাচ্ছে ঝর্ণাধারা। আমরা যেতে যেতে কেবলই তার ঝিরিঝিরি শব্দ শুনি। বেলা পড়ে আসে। ঝোপঝাড় উবে গিয়ে আবার অপেনিংয়ের প্রান্তে ফুটে উঠে মেঘভাসা দিগন্ত। আমাদের উপর দিয়ে খুব নিচু ফ্লাইটে উড়ে যায় কালচে ধূসরে সবুজাভ গলার জোড়া বেলেহাঁস। তাদের ঠোঁট থেকে ঝুলছে ছোট্ট রূপালি দু’টি মাছ।

টিলার মতো উঁচু জায়গায় উঠে স্কারলেট ম্যাপ ঘাটে। তারপর বাইনোকুলারে খোলা প্রান্তর পরীক্ষা করে ক্যাম্পিং-লটের তালাশে। দূরে দিগন্তের কাছাকাছি একটি টেন্ট দেখা যায়। ওদিকে যেতে যেতে গোধূলির নরোম আলোয় ভরে ওঠে খোলা মাঠ। হাঁটতে হাঁটতে শরীরের হাড়গোড় ও পাঁজরের কড়িবরগা যেন মড়মড় করে ওঠে। তারপরও কোন দিকে না তাকিয়ে হেঁটে যেতে হয় বেশ কিছুক্ষণ।

খানিক সমতলে তাঁবু খাটিয়ে মারকুটে চেহারার এক মহিলা শুকনা ডালপালা সংগ্রহ করে ক্যাম্প-ফায়ার করার উদ্যোগ নিচ্ছেন। আমাদের দেখতে পেয়ে তিনি দূরের গাছপালার দিকে চেয়ে জনান্তিকে বলেন, ‘ওয়েলকাম, ট্রেইল নেইবার।’ ব্যাকপ্যাক মাটিতে রেখে আমরা একটু দম নেই। তারপর স্কারলেট তাঁবু খাটানোতে হাত লাগায়। খুঁটির গায়ে ব্যাকপ্যাক রেখে তাতে হেলান দিয়ে আমরা একটু জিরাই।

রীতিমতো ঝিমিয়ে পড়েছিলাম আমরা। নেইবারের ডাকে ধড়মড় করে জেগে উঠি। তিনি ডিনারের দাওয়াত করলে আমরা একটু অবাক হয়ে চোখ কচলে আগুনের পাশে তার সাথে যোগ দেই। এসব পার্বত্য জায়গায় সন্ধ্যা হয় বেশ দেরি করে। আকাশে এখনো অঢেল আলো। আগে ঠিক খেয়াল করিনি- আমাদের সামনে ক’টি কনিফারের চিরসবুজ গাছের ফ্রেমে ধ্রুপদী পটে আঁকা নিসর্গ চিত্রের মতো ভাসছে মাউন্ট রেঁনেয়ারের শুভ্র হিমবাহ; তার উপর গাঢ় হয়ে জমেছে মেঘ; আর তাতে লেপ্টে আছে গোধূলির মায়াবী রঙ।

সান্ধ্য মেঘের বর্ণঢ্যতার দিকে চেয়ে নেইবার নির্লিপ্ত জবানে কথা বলেন। সাত দিনের হাইক করার সাপ্লাই নিয়ে ট্রেইলে বেরিয়ে ছিলেন তিনি। তিন দিন পর শরীরে জুত পাচ্ছেন না বলে ফিরে যাচ্ছেন। সাথে প্রচুর খাবার। রোস্ট করা ফ্রোজেন মুরগি আগুনে ঝলসাতে ঝলসাতে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললে আমি তার শরীরের দিকে তাকাই। ঘোটকীর মতো টগবগে দেহে রোগশোকের কোন বালাই নেই। ঠিক বুঝতে পারি না তার জরা কোথায়? কি নিয়ে তার কমপ্লেইন।

হঠাৎ করে খেয়াল হয়, জড়ো করা লাকড়ির পাশে কুণ্ডুলি পাকিয়ে শুয়ে আছে বড়সড় একটি সাপ। আমি আর্তনাদ করে দাঁড়িয়ে পড়লে তিনি হাত ধরে আমাকে শান্ত হতে বলেন। না, সাপটি তার পোষা, নির্বিষ এ প্রাণীকে তিনি তিনবছর আগে শিশুবস্থায় আমাজনের জঙ্গল থেকে জোগাড় করেছেন। তারপর থেকে সে তার সাথেই আছে। মহিলা সাপকে আদর করে তার কোলে তুলে নিলে আমরা একটু দূরে সরে বসি। স্কারলেট আমতা আমতা করে বলে, ‘মাউন্ট রেঁনেয়ারের ন্যাশনেল পার্কে পোষা কোন প্রাণী নিয়ে আসা নিসিদ্ধ না?’ মহিলা বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘আমি তো একবারে একা মানুষ, ত্রিসংসারে আমার আছেই বা কে? কার কাছে এ নির্বিষ প্রাণীকে রেখে আসবো?’

ঝলসানো চিকেনের সাথে আমরা ক্যানে রাখা গ্রীন বিন খাই। সাথে খাবার পানি নেই বলে সাপ-পোষা নারী দুঃখ প্রকাশ করেন। শরীরে কুলায়নি বলে যেতে পারেননি ট্রেইল থেকে বেশ দূরের ঝর্ণায়। স্কারলেট আমাদের তাঁবু থেকে নিয়ে আসে পুকুর থেকে ক্যারি করে আনা একবোতল জল। পানি পান করেই তিনি বের করেন স্ফটিকের ঝলমলে পাইপ। তাতে গ্রাস্ পুরে আগুন দিতে দিতে বলেন, ‘সারাদিনে সামান্য একটু পানি পেয়ে খুব আনন্দ পেলাম। লেটস্ সেলিব্রেট দিস মোমেন্ট।’ আমরাও তার সাথে ধুমপানে শরীক হই। তো তিনি আবার সন্ধ্যার আঁধারে বিলীয়মান হিমবাহের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘কথা ছিলো সাতদিন পর এক বন্ধু গাড়ি নিয়ে এসে আমাকে পিক করবে রেঞ্জার্স স্টেশনের কাছ থেকে। আগে আগেই পাহাড় থেকে নেমে যাচ্ছি, তাই কেউ আমাকে লিফ্ট দেবে না। হয়তো কোন হাইকারের গাড়িতে হিচ্ হাইক করে সিয়াটল অব্দি যেতে পারবো। তারপর আমাকে গ্রে-হাউন্ড বাসের টিকেট কিনে যেতে হবে অরিগান। সাথে ক্যাশ একেবারেই নেই।’ বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্কারলেটের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘তোমরা কি আমার কাছ থেকে কিছু গ্রাস কিনবে? বাসের টিকিট কেনার জন্য আমার যে কিছু ক্যাশ টাকার দরকার।’

স্যান্ডুইচের প্যাকেট ভর্তি কিছু গ্রাস বা মারিজুয়ানা আমরা বেশ দাম দিয়ে কিনি। তিনি আবার পাইপ সাজান। মৌতাত বেশ জমে উঠতেই তিনি গালায় সাপ জড়িয়ে খুব মৃদু স্বরে বাজাতে শুরু করেন মারাক্কাস। ক্যাম্প-ফায়ারের আগুন নিভে আসছে। মারাক্কাসে তাল দিতে দিতে কি কারণে তিনি কাকে যেন অভিশাপ দিয়ে হু হু করে কাঁদেন। আমরা কি করবো ঠিক বুঝতে পারি না। দেখতে দেখতে হিমবাহের মেঘভাসা আঁধারের উপর নক্ষত্রের ঝলমলে শরীর নিয়ে উঠে আসে কালপুরুষ।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close