Home গদ্যসমগ্র ভ্রমণ মঈনুস সুলতান > মাউন্ট রেনেয়ারে হাইকিংয়ের সূচনা >> হাইকিং/ভ্রমণ
0

মঈনুস সুলতান > মাউন্ট রেনেয়ারে হাইকিংয়ের সূচনা >> হাইকিং/ভ্রমণ

প্রকাশঃ September 30, 2018

মঈনুস সুলতান > মাউন্ট রেনেয়ারে হাইকিংয়ের সূচনা >> হাইকিং/ভ্রমণ
0
0

মঈনুস সুলতান > মাউন্ট রেনেয়ারে হাইকিংয়ের সূচনা >> হাইকিং/ভ্রমণ

 

শিশিরময় এক রূপালি সকালে আমরা মাউন্ট রেনেয়ার ন্যাশনেল পার্কের কাছাকাছি কল্কঙকার বা ভিনটেজ একটি লজজড় গোছের শেভ্রলে গাড়ি থেকে নামি। আমাদের সাথে বিস্তর মালসামান- তাঁবু, চুলা ও স্মোক করা আস্ত এক স্যামোন মাছ। না, আমাদের নেটিভ আমেরিকান বন্ধু ঈভিনিং স্টার – যাকে আমি শুকতারা নামে ডাকতে শুরু করেছি- তিনি আমাদের সঙ্গে মাউন্ট রেনেয়ারে দিন কয়েকের দীর্ঘ হাইকিংয়ে গাইড হিসাবে যাচ্ছেন না। তাকে সাথে নিতে হলে পারিশ্রমিক হিসাবে দিতে হয় তার নগদ সম্মানী। আমার ভ্রমণসঙ্গী স্কারলেট যেহেতু আগে বেশ কয়েকবার এ পর্বতে হাইক করেছে, সুতরাং শুকতারার সঙ্গ বা গাইডেন্স আমাদের জন্য ক্রিটিক্যাল না। তার উপর ফাইনানসিয়ালি পুরো হাইক ম্যানেজ করতে হলে হিসাব করে চলার ব্যাপার আছে। হাইকিংয়ের প্রস্তুতি হিসাবে প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল শহর থেকে খানিক দূরে মাউন্ট রেনেয়াঁর নামে তুষার ছাওয়া একটি পর্বতের ফুটহিলসে আমরা আসি। ওখানে পরিচয় হয় নেটিভ আমেরিকান নারী শুকতারার সঙ্গে। তার টিপি বা নেটিভ আমেরিকান কেতার একটি তাঁবু ভাড়া করে আমরা দিন চারেক কাটাই। তখনই তার সাথে সূত্রপাত হয় ঘনিষ্ঠতার। তো শুকতারা আমাদের নামিয়ে গুডবাই বলার সময় খুব খুশ-মেজাজে স্মোক করা একটি শুকনা স্যামোন মাছ উপহার দিয়ে আমাকে আলিঙ্গন করে বলেন, ‘কাম ব্যাক ডাউন ফ্রম দি মাউন্টেন সেইফ, এন্ড সে হ্যালো টু মি বিফোর ইউ গো ব্যাক টু ইয়োর হোম।’

পথ চলতে গিয়ে স্কারলেটের অস্থিরভাবে আশপাশের ঝোঁপঝাড় ছোঁয়া, ফুল শোঁকা ও পাথর কুড়ানোর প্রবণতা আছে। ইউনিভারসিটি অব ম্যাসাচুসেটসে নৃত্যশিল্পী হিসাবে পরিচিত এ নারীর সাথে আমি যুগলে হাইকিং করার জন্য জোট বেঁধেছি। আজকে কী কারণে জানি সে মানসিকভাবে আমার কাছাকাছি আসছে না। পাহাড়ি পথে অন্যমনস্কভাবে নীরবে হেঁটে যেতে যেতে সে কান্ট্রি ওয়েস্টার্ন মিউজিকের সুর ভাঁজছে। চাপা স্বরে গাইতে গাইতে সে ঝোঁপেঝাড়ে লেগে থাকা মাকড়শার জালের মতো শিশির ছুঁয়ে ঊর্ণনাভ ছত্রখান করে দিয়ে খামোকা তার দু’হাত ভিজিয়ে নেয়। সে কিছু বলছে না বটে, তবে আমি অনুভব করি, আজ আমাদের দেহমনে খেলা করছে কোন জংলা জায়গায় সরোবরের পাড়ে বনভোজনে যাওয়ার মতো চনমনে এনার্জি। হাইকিং ট্রেইলের স্টোর থেকে আমাদের কিনতে হবে- পর্বতে তাঁবু খাটিয়ে দিন কয়েক কাটিয়ে দেয়ার মতো প্রয়োজনীয় সাপ্লাই। স্কারলেট ভারি ব্যাকপ্যাক কাঁধে হাঁটতে হাঁটতে গুনগুনিয়ে এবার গাইছে জন ডেনভারের একটি জনপ্রিয় গানের কলি, ‘লেট দ্যা সান সাইন ইন..।’ দেখতে দেখতে আমরা চলে আসি গাছের কাটা গুঁড়ি দিয়ে তৈরি একটি লগ-কেবিনের সামনে। জঙ্গলের নির্জনে এই ছোট্ট কাঠের বাড়ির ছাদে অবলীলায় গজাচ্ছে ঘাস; আর তাতে কীট খুঁটে খাচ্ছে ক’টি রবিন পাখি।

লগ-কেবিনের কিচেন কাম সিটিংরুমের পুরোটা জুড়ে হাইকিং ট্রেইলের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র- তথা শুকনা খাবার, কম্পাস, দিয়াশলাই, টর্চলাইট, সুইস আর্মি নাইফ, ফার্স্ট এইড কিটের জন্য ওষুধ-বিসুদ ইত্যাদির দোকান সাজানো। এখন থেকে ডেইলি রেটে ভাড়া পাওয়া যায় তাঁবু, বরফ কাটার কুঠার, ব্যাকপ্যাক ইত্যাদি। এক সময়ের পর্বতারোহী জিন উইলিয়ামস লগ-কেবিনেই বাস করেন। আমাদের পেয়ে তিনি হুইল চেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে স্কারলেটের দিকে এগিয়ে এসে, ‘হিয়ার কামস মাই হেভেনলি ড্যান্সার’ বলে দু’হাত বাড়িয়ে দিলে সে ঝুঁকে কোমর বাঁকিয়ে তাকে আলিঙ্গন করে। জিন আমার দিকে তাকিয়ে ‘সো টুডে ইউ আর উইথ অ্যান একজটিক বয়ফ্রেন্ড ফ্রম হোয়ার…?’ বললে স্কারলেট আমাকে ‘বাংলাদেশের’ বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। তাতে ‘হাউ কুল, লাভলি’ বলে জিন অ্যাশট্রেতে আধপোড়া সিগ্রেট গুঁজে কাউন্টারের কাছে হুইল চেয়ার চালিয়ে গিয়ে এটলাসের মস্ত এক পুরানো বই খুলে আমার স্বদেশ খোঁজেন। আমি বঙ্গভূমি মানচিত্রে পিনডাউন করতে তাকে সাহায্য করলে তিনি স্বগতোক্তি করেন, ‘ও-কে, ইট ওয়াজ ফর্মারলি কল্ড ইস্ট পাকিস্তান। আই নো হোয়ার সুন্দরবনস্ ইজ।’ তারপর তিনি, ‘নাউ হোয়াটস্ আপ মাই হেভেনলি ড্যান্সার?’ বলে আবার স্কারলেটের দিকে ফিরলে, সে স্বর্গের অপ্সরির মতো এক মোহন ফিমিনিন জেসচারে উবু হয়ে জিনের জুলফিতে হাত বুলিয়ে দেয়। তিনি এই সুযোগে স্কারলেটের ক্ষীণ কোমর জড়িয়ে ধরে নাভির কাছাকাছি তার মাথাটি রাখেন।

জিন উইলিয়ামস মানুষ হিসাবে খুবই সদালাপি ও ফুর্তিবাজ। চেইন স্মোকার তিনি। হুইল চেয়ারের হাতলে আটকানো অ্যাশট্রেতে উপচে পড়ছে আধপোড়া সিগ্রেটের বাটস্। পাশের গর্তে রাখা গ্লাসে টলটল করছে ব্র্যান্ডি। তিনি কাউন্টারের কাছে হুইল চেয়ার চালিয়ে গিয়ে শট-গ্লাসে ব্র্যান্ডি ঢেলে এক সাথে দু’টি সিগ্রেট জ্বালিয়ে গ্লাসসহ তা আমাদের হাতে তুলে দেন। পান করতে করতে তার সঙ্গে কথায়বার্তায় হাসিগল্পে রীতিমতো জমে ওঠে। কোমরে বোধ করি ফের হাত দেয়ার সুযোগ দিতে স্কারলেট জিন উইলিয়ামসের হুইল চেয়ারের হাতলের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। সে সিগ্রেটের ধোয়া রিং করে ছুঁড়ে তার চোখ জোড়া কল্পনামদির করে তুলে জিনের কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড আমাকে বলে। শৌখিন মাউন্টেনিয়ার জিন সওদাগরি ফার্মে ভালো চাকরি করতেন। মাউন্ট রেনেয়ারের সামিটের কাছাকাছি গ্লেসিয়ারে তীব্র তুষারপাতে সময় খুব খারাপ আবহাওয়ায় তিনি ক্লাইম্ব করতে যান। তখন কী এক অসাবধানতায় তার মারাত্মক এক্সিডেন্ট হলো। তাতে পড়ে গিয়ে পঙ্গু হয়ে যায় জিনের সম্পূর্ণ নিম্নাঙ্গ। স্কারলেট এবার কেবিনের দেয়াল, কাউন্টার ও রেফিজারেটরের ঢালায় লাগানো একটি আকর্ষণীয় মেয়ের রকমারি ভঙ্গির ছবি দেখিয়ে বলে- এই নারী ছিলো জিনের ফিঁয়াসে। এনগেজমেন্টের পর ঠিক হয়েছিলো তাদের বিয়ের দিনক্ষণ। দু’জনে মাউন্ট রেনেয়ারের লাগোয়া বনানী ভালোবাসতেন বলে জিন হনিমুন আর ভবিষ্যতে ভেকেশনের জন্য এই কেবিনও কিনেছিলেন। তারপর দুর্ঘটনায় পক্ষাঘাত হলে নিজের শরীরিক অক্ষমতার কথা ভেবে তিনি মেয়েটিকে অন্য পুরুষ খুঁজে নিতে উপদেশ দেন। তারপর থেকে জিন এই লগ-কেবিনে ঘর-বৈঠকী হালতে একাকী বাস করছেন। প্রয়োজন একটি পেশার, তাই তিনি বিক্রি করেন- হাইকিং করনেওয়ালাদের কাছে ট্রেইলের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।

আমরা তার কাছ থেকে কিনি দিন কয়েক তাঁবুতে চালিয়ে নেয়ার মতো শুকনা খাবার- কিসমিস, কাজু বাদাম, ড্রাইফ্র্রুটস্ প্রুন, আপেল, এপ্রিকট, বিফ স্ট্রোগোনাফ, জার্কি ও চিকেন আলাকিন। আমি যে ব্যাকপ্যাক ব্যবহার করছি তা কাঁধে চাপিয়ে এত মালমাত্তা নিয়ে পাহাড়ে চড়া যায় না, পায়ের জুতাও হাইকিংয়ের উপযোগী না। তাই ওখান থেকে ভামসাম্য রক্ষা করে ওজন সারা পিঠে ছড়িয়ে দেয়া যায় এরকম একটি ব্যাকপ্যাক ও হাইকিং বুট আমি ভাড়া করি। দাম দেয়ার সময় জিন মৃদু হেসে বলেন, ‘টেল মি ইফ ইউ আর অ্যা ফ্রেন্ড অর অ্যা ফো, দোস্তের জন্য এক দাম, আবার দুশমন হলে অন্য রেট।’ তার সাথে দোস্তি পাতাতে আমার কোন আপত্তি নেই জানালে তিনি জবাব দেন, ‘তাহলে তো তোমাকে ফিফটি পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট দিতে হয়।’ অবশেষে তাকে গুডবাই বলতে গেলে তিনি ‘প্লিজেন্ট হাইকিং’ উইশ করে বলেন, ‘টেক কেয়ার অব দিস হেভেনলি ড্যান্সার লাইক অ্যা রিয়েল ম্যান, ওরিভোয়াঁ।’

মাউন্ট রেনেয়ারের প্রবেশপথে কাঠের সাদামাটা একটি তোরণ। আমরা হেঁটে যেতে যেতে ওখানে দাঁড়িয়ে ফলকে লেখা কিছু বেসিক তথ্য পড়ে নিই। এ পর্বতকে কাসকেইড রেঞ্জের ভেতরে সবচেয়ে জায়েন্ট আকৃতির স্ট্রাটো ভলকেনো হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তা স্ট্রাটো ভলকেনো ব্যাপারটা কি? স্কারলেটও ঠিক জানে না; তবে িই ধরনের আগ্নেয়গিরিকে কমপোজিট ভলকেনোও বলা হয়ে থাকে। চূড়ার দিকে আইসক্রিমের কৌণের মতো শেইপ, এবং ৮,০০০ ফিটের উপর উচ্চতায় বিশাল বাষ্পময় ক্রেইটার হচ্ছে এই ধরনের আগ্নেয়গিরির প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে আরো যে সব তথ্য পাওয়া যায় তা হলো- মাউন্ট রেনেয়ারে সর্বশেষ লাভা উদগিরণ হয় ১৮৯৪ সালে। গেল ২,৬০০ বৎসরে এতে অগ্নুৎপাত হয়েছে মোট বারো বার। সবচেয়ে বড় ধরনের ইরাপশন হয় ২২০ বৎসর আগে।

গাছপালার ছায়ায় ভারি ব্যাকপ্যাকের বোঝা সামলাতে সামলাতে আমরা এসে পৌঁছি রেঞ্জার্স স্টেশনে। এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘোঁট পাকাচ্ছে হাইকারদের দল। কারো ব্যাকপ্যাকের সাথে বাঁধা তাঁবু, স্পষ্টত এরা অভার-নাইট স্টে করবে। যাদের কোমরে ঝুলছে বরফ কাটার কুঠার ও দড়িদড়া-তারা হচ্ছে হার্ডকোর পর্বতারোহী, যাচ্ছে হিমবাহের দিকে ক্লাইম্ব করতে। ডে-হাইকাররা অনেকটা রিলাক্সড্, এরা মাত্র ঘণ্টা কয়েক হাইক করবে, এদের মধ্যে কোন কোন নারী রোদে দাঁড়িয়ে গতরে মর্দন করছে সানস্ক্রিন। তাদের পুরুষ সাথীরা বেইসবল ক্যাপে চোখ ঢেকে শরীর অষ্টবক্র করে ব্যায়ামের বিশেষ মুদ্রায় হাঁটতে যাওয়ার আগে মাসোলগুলো ওয়ার্মআপ করে নিচ্ছে। কারো সাথে একাধিক কাচ্চবাচ্চা- তরুণী মা তাদের চুইংগাম, চিপসের প্যাকেট ছিড়ে দিতে দিতে তুলে নিচ্ছে রেঞ্জার্স স্টেশনের দেয়ালে রাখা হাইকিং সংক্রান্ত তথ্যে ভরপুর ব্রশিয়র।

স্কারলেট স্টেশনের উইন্ডো থেকে কিনে পাহাড়ের টপোগ্রাফিক ও হাইকিং ম্যাপ, এবং আগামি সাতদিনের আবহাওয়ার ফরকাস্ট দেয়া চার্ট। সে ব্যাকপ্যাক নামিয়ে রেখে ঘাসের উপর মানচিত্র মেলে ধরে পরীক্ষা করে হাইকিং ট্রেইলগুলোর দূরত্ব। তারপর তাঁবুতে অভার-নাইট ক্যাম্পিং করার পার্মিশন নিতে আবার উইন্ডোতে ফিরে গেলে- আমি কয়েক কদম হেঁটে একটু দূরে দাঁড়িয়ে অন্য হাইকারদের তৎপরতা দেখি। আমার পাশে টগবগিয়ে এসে দাঁড়ায় কালো কেশরের চকোলেট-রাঙা একটি ঘোড়া। তা থেকে লাফিয়ে নামে আঠারো-উনিশ বছরের কাউগার্লদের মতো হ্যাট ও হাইবুট পরা এক যুবতী। তার কোমরের একপাশে ঝুলছে রিভলভার, এবং অন্যপাশে আটকানো ভারী সেলুলার ফোন। চোখে কালো কোল পরা নরোম-সরোম চেহারার বেজায় সুদর্শনা এ মেয়েটি যে পার্বত্য পার্কের রেঞ্জার তা মেনে নিতে দ্বিধা হয়। আমি তার দিকে তাকাচ্ছি বোধ করি তা বুঝতে পেরে সে হ্যাট খুলতে খুলতে আমার দিকে এগিয়ে এসে বলে, ‘হ্যালো, ইজ দিস ইয়োর ফার্স্ট হাইক টু মাউন্ট রেনেয়ার?’ আমি মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিতেই সে, ‘হাউ নাইস, ওয়েলকাম’ বলতে বলতে তার চুল থেকে একটি ক্লিপ খুলে তা দাঁতের ফাঁকে রাখলে- তার মাথা থেকে গড়িয়ে নামে সোনালি চুলের ঝর্ণাধারা। সে চুল পেঁচিয়ে বান করে বাঁধতে বাঁধতে বলে, ‘উই হ্যাভ ত্রি হানড্রেড মাইলস্ হাইকিং ট্রেইল হিয়ার। এর মধ্যে তিরানব্বই মাইল ট্রেইল উঠে গেছে হাই এলিভেশন দিয়ে। এগুলো কভার করতে লাগবে ১২ থেকে ১৬ দিনের মতো। সো, হোয়ার উড ইউ লাইক টু হাইক?’ আমি জবাবে আকাশে ইশারা দিয়ে বলি, ‘আমি চলে যেতে চাই উপরে একেবারে সামিটের কাছাকাছি।’ তার সাথে এবার আমার চোখাচোখি হলে কেন জানি মনে হয় মেয়েটি বুঝি সত্যিকারের রেঞ্জার না, সে বোধ করি রেঞ্জারের পার্টে স্টেজে অভিনয় করছে! সে এবার খুব কাছে এসে মঞ্চের অভিনেত্রীরা যেরকম তাদের গুণমুগ্ধ দর্শককে অটোগ্রাফ দেয়, ঠিক এরকম ভঙ্গিতে আমার ব্যাকপ্যাক এডজাস্ট করে দেয়। এতে ওজন চারদিকে সমানভাবে ছড়িয়ে গিয়ে পিঠি একটু আরাম বোধ হয়। আমি তাকে থ্যাংক ইউ বলতে গেলে সে চোখে চোখ রেখে বলে, ‘সামিটের কাছাকাছি ১৪,৪১১ ফুট উচ্চতায় অনেকেই আরোহন করে নিস্ক্রিয় ভলকেনোকে চাক্ষুষ করার জন্য। কিন্তু এ জন্য তোমাকে যে হাই এলিভেশনে হাইক করতে হবে নয় মাইলের মতো। এবার না হয় নাই বা উঠলে এতো উপরে। দিস্ ইজ ইয়োর ফার্স্ট টাইম। গো ফর অ্যান ইজি হাইক। ও-কে। টেক ইট ইজি।’

রেঞ্জার্স স্টেশনের কাছ থেকেই শুরু হয়েছে অনেকগুলো হাইকিং ট্রেইল। এর মধ্যে কিছু কিছু সমতল সরল সোজা পয়তাল্লিশ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার ট্রেইলে তরুণী মা’রা তাদের শিশুদের স্ট্রলারে চাপিয়ে – এমন কি বিকলাঙ্গ বা বাতে সল্প-সক্ষম প্রৌঢ়রা হুইল চেয়ারে করে হাইক করতে পারেন। আবার কিছু কিছু ট্রেইল উঠে গেছে উপরের দিকে; এগুলো অতিক্রম করতে লাগে তিন থেকে চার ঘণ্টা। এসব ট্রেইলে হাঁটতে গেলে স্বাস্থ্যগত দিক থেকে শারীরিক তাগত থাকতে হয়। অনেক বাছবিচার করে আমরা রেমপার্ট রিজ ট্রেইল বলে পৌনে পাঁচ মাইল দীর্ঘ ট্রেইল ধরে হাইকিংয়ের বউনি করি। মাঝারি গতিতে হাঁটলেও এ ট্রেইল অতিক্রম করতে আমাদের আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি লাগার কথা না। এই ট্রেইলের সুবিধা হচ্ছে- এটি সংযুক্ত আরেকটি এক ঘণ্টা পয়তাল্লিশ মিনিটের ট্রেইলের সাথে। আমরা ঘণ্টা তিনেক হেঁটে একটু বিশ্রাম নিয়ে পরবর্তী ট্রেইলের শেষপ্রান্তে পৌঁছলে সরোবরে পানীয়-জল পাওয়া যাবে। ওখানে তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটানোর পর ভোরবেলা খুব সহজে দীর্ঘ ট্রেইলে সারাদিনের হাইক করার প্রস্তুতি নিয়ে কদম ফেলা যেতে পারে।

হাঁটতে গিয়ে ব্যাকপ্যাকে বিস্তর মাল-সামানের জন্য বেজায় ভারী লাগে। তাই আমি কেবলই পিছিয়ে পড়ি। স্কারলেট আমার সাথে সাথে না হেঁটে বেশ জোর কদমে এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। তার এই একলা চলায় আমার বিরক্ত লাগে। সাথে সাথে অভিনেত্রীর মতো নরোম চোখমুখের রেঞ্জার মেয়েটির কথা মনে পড়ে। তার সাথে হাইক করতে পারলে আজকের হাঁটাটুকু উপভোগ করতে পারতাম। স্কারলেটের সাথে আমার সম্পর্কই বা ক’দিনের। আমি কি তার প্রতি পুরোমাত্রায় বিশ্বস্ত? সে যদি এখন গ্রীবা বাঁকিয়ে জিঞ্জেস করে, ‘ডু ইউ লাভ মি? ক্যান আই ট্রাস্ট ইউ?’ আমি সিনসিয়ারলি কি জবাব দেবো? আমার মনে এই মুহূর্তে যা ঘটছে তা কি তাকে বলা সমুচিত হবে?

সামনে খয়েরি ও বাদামি রঙে মিশ্রিত পাহাড়ের জগদ্দল বিস্তার। সড়কের দু’পাশে সারি-বাঁধা পাইন গাছের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, কিংবদন্তির বনস্পতিকুল সৈনিকদের মতো মেতেছে আজ কুচকাওয়াজে। এ দিকে ট্রেইল বাঁকানো সেতুর মতো ঢেউ তুলে তুলে উঠে যাচ্ছে উপরের দিকে। শরীর থেকে এবার জোরেশোরে ঘাম বেরুচ্ছে। পথচলা আবার কঠিন হয়। স্কারলেটের কিন্তু এসবে কিছু হেলদোল নেই। সে দৃঢ় পদক্ষেপে অতিক্রম করে যাচ্ছে একের পর এক সেতুর আকৃতি। তার স্থিতিস্থাপক শরীরের দিকে পেছন থেকে তাকিয়ে মনে হয়- ডলফিন এক লাফিয়ে লাফিয়ে পাড়ি দিচ্ছে তরঙ্গরাজি। আর তাতে জিন্সে রূপালি বেল্ট পরা কোমরের দোলনে ছড়াচ্ছে একধরনের অ্যাপিলময় সংবেদন। ঘণ্টা আড়াই আগে লগ-কেবিনে জিনের সাথে তার দৈহিক অন্তরঙ্গতার কথা মনে আসে। জিনের মতো আমি কেন তার কাছাকাছি যেতে পারছি না- এ ভাবনা আমাকে কুরে কুরে দহন করে।

আড়াই-তিন ঘণ্টার ট্রেইলে আমরা ঘণ্টা চারেক হেঁটে থেমে পড়ি। ট্রেইল এখনো শেষ হয়নি, তবে আর পা চালিয়ে অধিক মেহনত করার মতো তাগত আমার নেই। লাগাতার হাঁটার প্র্যাকটিসের অভাবে পথে থামতে হয়েছে বার কয়েক, তাতে নষ্ট হয়েছে মিনিট পয়তাল্লিশের মতো। খানিক বিশ্রাম নিয়ে শরীরে কুলালেও আর বেশি দূর হাঁটা যাবে না আজ, সন্ধ্যা হয়ে এলো বলে। স্কারলেট কপাল কুঁচকে খানিক ভেবে অবশেষে তাঁবু খাটানো উপযোগী জায়গার সন্ধানে ট্রেইল ছেড়ে আঘাটায় পা দেয়।

আমাদের বেশি দূর কিন্তু যেতে হয় না। পাওয়া যায় তাঁবু খাটানোর মতো সমতল। তবে ঠিক বোঝা যায় না- নিয়ম মেনে এখানে তাঁবু খাটানো সমুচিত কি না? না, রাতে রেঞ্জাররা কেউ এদিকে টহল দিতে আসবে না নিশ্চয়। ব্যাকপ্যাক মাটিতে রাখতেই আমার দেহে বৃষ্টিপাতের মতো ঝেপে নামে সারাদিনের ক্লান্তি। স্কারলেট একাই তাঁবু টাঙায়। কাটা ডালের মতো স্লিপিংব্যাগের উপর ধপ করে পড়ে আমার শরীর। আধো ঘুমের ভেতর শুনি টহল দেয়া ঘোড়ার টগবগানো শব্দ।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ছবির ক্যাপশন

 

–   লগ কেবিন

–   ন্যাশনেল পার্কের তোরণ

–   হাইকাররা ট্রেইলে হেঁটে যাচ্ছে

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close