Home ছোটগল্প মঈনুস সুলতান >> স্মৃতির নদীজলে মিরর ইমেজ >> ছোটগল্প

মঈনুস সুলতান >> স্মৃতির নদীজলে মিরর ইমেজ >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ September 7, 2018

মঈনুস সুলতান >> স্মৃতির নদীজলে মিরর ইমেজ >> ছোটগল্প
0
0

মঈনুস সুলতান >> স্মৃতির নদীজলে মিরর ইমেজ >> ছোটগল্প

 

প্রচুর গ্রন্থপাঠে, সামাজিকতা ও বুদ্ধিজীবীদের সহবতে কাটিয়েছেন অবসর। অভিজ্ঞতা থেকে সৈয়দ সাহেব জানেন যে- বাম রাজনীতিই জীবনের শেষকথা নয়। মেহদী সম্পর্কে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন, ভেবেছিলেন চলমান রাজনীতির ধারাপ্রবাহে সে যদি সাঁতার কাটতে না পারে, তাহলে চরে উঠে খানিক জিরিয়ে নিয়ে কলেজের ছাত্রজীবন, কবিতা বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিচিত্র ঠিকানায় সে খুঁজে নেবে তার নতুন নিবাস।

গ্রামের গোরস্থান থেকে ফিরে সৈয়দ লতাফত হোসেন বাইরের বাংলাঘরের খোলা বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে একটু জিরানোর চেষ্টা করেন। বারান্দাটি জালিতারে ঘেরা হলেও এখান থেকে দূরের ষাড়ের-গজ পাহাড়ের সবুজাভ নীলচে রেখা পরিস্কারভাবে দেখা যাওয়ার কথা। পাহাড়টি যেন যাদুবলে আউড়ি দিয়েছে। বিরক্ত হয়ে সৈয়দ সাহেব রুমালে চশমার কাচ মোছেন। কাজের মেয়ে টিপয়ে এলাচি লেবুর শরবত রেখে যায়। গেলাস ঢাকা দেয়নি বলে অসন্তুষ্ট হন, কিন্তু এতো ছোট বিষয় নিয়ে কথা বলতে রুচি হয় না। গোরস্থান থেকে হেঁটে ফিরেছেন। তাঁর শরীরের অনেক কিছুই আর হালফিল আগের মতো কাজ করছে না। তবে হাঁটতে পারেন। ভারসাম্যে একটু খামতি হচ্ছে বটে, লাঠিটা থাকলে ভালো হতো। অনেক বছর তিনি চা-গাছের শিকড় দিয়ে তৈরি রূপায় গোড়া বাঁধানো কোঁকড়া হাতলের লাঠিটি ব্যবহার করেছেন। তখন অবশ্য লাঠি ব্যবহারের কোন জরুরত ছিলো না। তবে বস্তুটি তিনি হাতে রাখতেন অনেকটা তাঁর হামেশা পরিধেয় আলিগড়ি পায়জামা ও মোগার সুতায় কাটা ছ’কল্লি কোর্তার আনুসাঙ্গিক হিসাবে। আজকাল হাতে কি যেন হয়েছে, অত্যন্ত প্রয়োজনেও তিনি কিছু মুঠো করে ধরতে পারেন না।
ভেতরে অস্থিরতা হচ্ছে। ঘাড় বাঁকিয়ে তাকান সৈয়দ সাহেব, চোখে পড়ে পিতলের তেপায়ার ওপর রাখা বিদরির কাজ করা ফর্সি হুঁকা। একটু ধুমপানের ইচ্ছা হয়। বিদরি হুঁকাটি তাঁর বাবা’র আমলের। হুঁকাসেবী তিনি নন, তবে যে বছর ভারত ভেঙে হিন্দুস্থান ও পাকিস্তান হলো, রায়টে হাটবাজার ডিসরাপ্ট হলে- কোথাও ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট সিগ্রেটের টিন পাওয়া যাচ্ছিলো না, তখন তিনি দিন কয়েক এ ফর্সি হুঁকায় খামিরা তামাক খান। পরে অবশ্য অনেক বছর পাইপে ইরিনমোর ট্যবাকো স্মোক করেছেন। তারপর কীভাবে যেন হাতের গ্রীপ নষ্ট হয়ে গেলো, আঙুলে আর পাইপ ম্যানেজ করতে পারতেন না। দু’চার দিন সিগ্রেটও ট্রাই করেছেন। বড্ড অর্ডিনারি দেখায়। তার মেজাজের সাথে মানায়নি।
বিকাল শেষ হয়ে আসছে কি? সময় দেখতে তিনি অভ্যাস মতো দেয়ালে তাকান। পেন্ডুলাম-দোলা ঘড়িটি এখনো লাগানো আছে। তার ডায়ালে মাকড়শা জাল পেতেছে। ঘড়িটি বিকল হলো কবে? ১৯৬৫ সালে কি? স্মৃতির নদীজলে মাছের ঘাইয়ের মতো বুজকুড়ি তোলে কিছু ঘটনা; যে বছর কিনা হিন্দুস্থানের সাথে পাকিস্তানের লড়াই হলো, আর আইয়ূব খাঁ রওয়ালপিন্ডিতে বড়াই করে বললো, ‘জং মে বিলকুল জিৎ হো গয়ি হৈ।’
শরবতে চুমুক দিয়ে উঠে পড়তে পড়তে সৈয়দ সাহেব স্মৃতির ব্যাপারটি নিয়ে ভাবেন। একসময় তা ছিলো বেনোজলে ভরপুর নদীর মতো তেজি। চাইলেই তিনি চলে যেতে পারতেন বয়সের ভাটিতে, মনে পড়ার নাও ভাসাতে পারতেন শৈশবের শানবাঁধানো ঘাট থেকে। আজকাল বিষয়টা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিরল প্রজাতির মাছের আচমকা ঘাইয়ের মতো। কবেকার কোন বিষয় নিয়ে কখন বুজকুড়ি কাটবে বলা মুশকিল।
বৈঠকখানায় ঢুকে তিনি মেহগিনির ভারী আলমারির সামনে একটু দাঁড়ান। হাইপাওয়ারের লেন্সের ভেতর দিয়ে ‘চোখের বালি’, ‘বিষাদসিন্ধু’ বা সালিম আলীর ‘বুক অব ইন্ডিয়ান বার্ডস্’ বইগুলোর শিরোনাম পড়তে তাঁর বিশেষ কোন অসুবিধা হয় না। কিন্তু কিঞ্চিত অসাড় হয়ে আসা আঙুলে চাবি ঘুরিয়ে কাচের পাল্লা খুলতে কনফিডেন্স পান না। তাই চেয়ার টেনে বসে পড়েন জানালা ঘেঁষে রাখা পাথরের টেবিলে। ডায়েরিটা খুঁজে পাওয়া যায়। রেস্কিনে বাঁধাই খাতাটি বেশ কয়েক বছরের পুরানো। ১৯৬৯ সালের নিচে পিআইএ’র একটি সবুজ উড়োজাহাজের ছবি। কাঁপা হাতে পার্কার কলমটি তুলতেই খোলা জানালা দিয়ে দেখেন- বকুলের ঝাড় থেকে ঝরে পড়লো দুটি কুসুম। কিন্তু কোন সুবাস ছড়ালো না বলে তাঁর মনে কিসের যেন খামতি থেকে যায়। এরকম অনুভূতি আজ সকালেও তাঁর হয়েছিল মর্নিংওয়াকে যাওয়ার সময়। বৃষ্টি পড়ছিলো, তাই দাঁড়িয়ে ছিলেন সিঁড়ির ছাউনির নিচে। বারিষণের রঙ তো রূপালি হওয়ার কথা, কিন্তু মনে হয়েছিলো আকাশ থেকে ঝরছে কালচে সবুজ বর্ণের জল। তবে কি আবহাওয়া দুষণে পুষ্প হারাচ্ছে সৌরভ, আর আসমানের পানিও হচ্ছে বিবর্ণ? আবহাওয়ার জখম হওয়ার ব্যাপারটা তিনি প্রথম শোনেন মেহদীর কাছ থেকে। সে পত্রিকা থেকে এ বিষয়ে ছাপা একটি প্রবন্ধ পড়ে শুনিয়েছিল। ছেলেটি তো আর কখনো তাঁকে কিছু পড়ে শোনাবে না। মেহদীর কথা ভাবতেই ঝরে পড়ে আরেকটি বকুল। সাথে সাথে মনে পড়ে যায় ফুলটির বোটানিকাল নেইম ‘মিমুশপস ইলেনগি।’ শব্দটি মনে পড়ে যাওয়াতে হারিয়ে যাওয়া বিয়ের আংটি ফিরে পাওয়ার মতো অনুভূতি হয়।
ডায়েরিতে পরপর কয়েকটি পৃষ্ঠায় মেহদীর প্রসঙ্গ তিনি লিখেছেন কয়েকবার। শিরোনাম দিয়ে গুছিয়ে লিখতে তিনি পছন্দ করেন। প্রথম এন্ট্রির টাইটেল হচ্ছে, ‘সংস্কৃতিমনষ্ক ও সম্ভাবনাময়’। স্থানীয় হাই স্কুলের একটি কালচারেল ফাংশনে তাঁকে প্রধান অতিথি হিসাবে ডেকেছিল। অনুষ্ঠানে মেহদী আবৃত্তি করেছিলো কাজী সাহেবের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। চোখ মুদে শুনতে শুনতে তার মনে পড়েছিল বছর পঞ্চাশেক আগে একই কবির লেখা ‘কামাল পাশা’ কবিতাটি এই স্কুলের অনুষ্ঠানে তিনি স্বয়ং আবৃত্তি করেছিলেন। তখন টিনের ছানি দেয়া দালান ওঠেনি। স্কুল ঘরটি ছিলো ছন ও বাঁশ-বেতের।
ক্লাশ টেনের মেহদী তাঁর কাছ থেকে বই ধার চাইতে এসেছিলো। প্রিন্সিপাল ইব্রহিম খাঁ’র ‘ইস্তাম্বুল যাত্রীর পত্র’ বইটির আলগা হয়ে আসা মলাট সে খুব যত্নে গঁদ দিয়ে জুড়ে দিয়েছিলো। তারপর ‘বিষাদসিন্ধু’র আস্ত একটি অধ্যায় সে পড়ে শোনায়। আর তা চোখ মুদে শুনতে শুনতে সৈয়দ সাহেবের মনে পড়েছিলো, কিশোর বয়সে রায়বাড়ির পারিবারিক লাইব্রেরি থেকে বই ধার করে আনার ঘটনা। অক্ষয় কুমার রায় চৌধুরী মহাশয় তাঁর মোম ঘষা গোঁফে তা দিতে দিতে বলেছিলেন, ‘সৈয়দের বেটা প্রমথ চৌধুরীর বইটা হুঁশিয়ারে রাখবে, হারিয়ে গেলে আমার বুক ভাংবে কিন্তু।’
মেহদীর পরিবার তাঁর মতো হাশেমী কওমের সৈয়দ না হলে বলা চলে বনেদি। বিত্ত সম্পদেও বর্ধিষ্ণু। মেট্রিক পাশ দেয়ার পর পর ছেলেটি জড়ালো বাম রাজনীতিতে। সৈয়দ সাহেবের হাতের গ্রিপ তখনো ততো খারাপ হয়নি। কোঁকড়া লাঠি পাকড়ে নিত্যদিন হাঁটাহাঁটি করেন। একদিন মিছিলে মেহদীকে শ্লোগান লিড করতে দেখেন। তারপর তাঁর বৈঠকখানায় নেহরুর আত্মজীবনী ধার চাইতে আসলে স্বদেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি নিয়েও একটু কথাবার্তা হয়। সৈয়দ সাহেব অবাক হন যে, ছেলেটি তাঁর সম্পর্কে বেশ খানিকটা জানে দেখে। তিনি যে গান্ধীজির ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে যোগ দিয়ে মাস তিনেক কারাবন্দী ছিলেন সে সম্পর্কেও মেহদী ওয়াকিবহাল। বলেছিলো, সে একটি সংকলন বের করতে যাচ্ছে, তাতে সৈয়দ সাহেবের সাক্ষাৎকারভিত্তিক বায়ো প্রকাশ করতে চায়। সংকলনের জন্য নামজাদা লেখকদের রচনা সংগ্রহ করতে ছেলেটির জোর সমস্যা হচ্ছিলো। তো তিনি চিঠি লিখে তাকে পাঠিয়েছিলেন কবি দিলওয়ার, গল্পকার শাহেদ আলী ও কবি আফজাল চৌধুরীর কাছে। পয়লা সংখ্যা মোটামুটি ভালোভাবে ছাপা হলেও গোলমাল বাঁধলো দ্বিতীয় সংখ্যা নিয়ে। রাজশাহীর আত্রাই অঞ্চলে আন্ডারগ্রাউন্ড একটি বাম দলের নেতৃত্বে জনযুদ্ধ চলছে, তার বিবরণ দিয়ে ছদ্মনামে সে প্রবন্ধ ছাপালে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন প্রেসঘরে গিয়ে লিটিল ম্যাগাজিনটি জব্দ করে। তাকেও ফেরার হতে হয়। এ ঘটনার তর্পণ করে তিনি রোজনামচায় ‘প্রজন্ম ও পুনরাবৃত্তি’ শিরোনাম দিয়ে লিখেছিলেন। প্রায় বায়ান্ন বছর আগে অত্র এলাকা থেকে সৈয়দ সাহেব ‘সন্দেশ বিচিত্রা’ নামে একখানা ম্যাগাজিন বের করেছিলেন। তাঁর বাপ-দাদার এস্টেটের যে ছাপাখানায় সেরেস্তার টোকা, ফারগ, খাজনার রশিদ ইত্যাদি ছাপা হতো, সেখান থেকে পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যা বের করতে গেলে গোয়েন্দারা তা হুকুম-দখল করে নিয়ে যায় থানাতে। কারণ তিনি কাজী সাহেবের ‘বিষের বাঁশী’ বইয়ের একটি কবিতা পুনর্মুদ্রণ করেছিলেন। বিদ্রোহী কবির পুস্তকটি যে বাজেয়াপ্ত হয়েছে- বিষয়টির তিনি তোয়াক্কা করেননি। তাঁকে দ্বিতীয় দফা লালঘরে যেতে হয়েছিলো মাস দুয়েকের জন্য। রোজনামচার এন্ট্রি লিখতে লিখতে তাঁর মনে হয়েছিলো- পরবর্তী প্রজন্মের সন্তান মেহদীর ভেতর দিয়ে স্রেফ যেন তাঁর জীবনের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।
আন্ডারগ্রাউন্ডে গুপ্ত জীবনযাপন করার সময় মেহদী ধরা পড়ে বছর খানেক জেল খাটে। তাকে ছাড়িয়ে আনতে সৈয়দ সাহেব খানিকটা কাঠখড় পুড়িয়েছেন। নিজে আইজি’র সাথে দেখা করে দেন-দরবার করেছেন। মুক্ত হয়ে সহসা মেহদী যেন বামধারার গুপ্ত রাজনীতিতে আগ্রহ হারালো। তার কাছ থেকেই শুনতেন, বাম দলগুলো নকশালবাড়ির মতো ও পথের বিতর্কে নানা উপদলে বহুধা বিভক্ত হচ্ছে। এ বিষয়টি তিনি লিখেছেন তাঁর রোজনামচায় ‘সমান্তরাল ট্র্যাক’ শিরোনামে। সমান্তরাল প্রসঙ্গে তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন কবি বেনজীর আহমদের সাথে তাঁর সহবতের কথা। তাঁর প্রভাবেই যুক্ত হন তৎকালীন সন্ত্রাসবাদী একটি দলের বলয়ে। দেশবিভাগের সময় মার্কসবাদের দ্বারা প্রভাবিতও হন খানিকটা। একবার কলকাতার খিদিরপুরে কমরেড মণিসিংহের বক্তৃতা শুনতে গিয়েছিলেন। তারপর কী কারণে যেন আগ্রহ হারান।
মেহদীও সশস্ত্র সংগ্রামবাদী রাজনীতিতে আগ্রহ হারালো। তাঁর সাথে দেখা করতে আসতো বটে কিন্তু কথাবার্তা তেমন বলতো না। কালকাতার সিগনেট প্রেস থেকে ছাপা ‘বনলতা সেন’-এর প্রথম সংস্করণখানা খুলে পড়তে পড়তে সে তাঁর পাশে চেয়ারে বসে স্পষ্টত দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। তারপর ধুলামাটি ঝেড়ে পুরানো রেকর্ড প্লেয়ারে চাপালো অনেক বছর শোনা হয়নি এরকম গীতা দত্তের কয়েকটি রেকর্ড। ‘মধুরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে’ বার বার শুনতে শুনতে ছেলেটি ছাদে গুটিগুটি পায়ে হাঁটতে থাকা তক্ষকের দিকে বেমালুম তাকিয়ে থাকলো। এসব আলামতের দিকে নজর দিয়ে মেহদীর মনভুবনে কী ঘটছে সৈয়দ সাহেবের বুঝতে বিন্দুমাত্র বিলম্ব হয় না। বয়সের ব্যবধানের জন্য তাকে তো এ নিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন না। কিন্তু যা অশঙ্কা করছিলেন তাই হলো। মেহদী গোটা তিরিশেক স্লিপিং পিল খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে তাঁর ভাতিজার মোটরকারে করে তিনি জেলা সদরের হাসপাতালে ছেলেটিকে পাঠালেন। স্টমাক ওয়াশ করিয়ে দুর্বল দেহে সে ফিরে এসে একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গেলো। সৈয়দ সাহেবের সাথে দেখা করতে সে তার বাংলাঘরে মাঝেসাজে আসতো বটে, কিন্তু কিছু জিঞ্জাসা করলে রাগি ভঙ্গিতে ঘাড় বাঁকিয়ে অসংযত আচরণ করতো। ‘অভিজ্ঞতার সাদৃশ্য’ শিরোনাম দিয়ে তিনি এ বিষয়টা তার রোজনামচায় ইলাবরেটলি লিখেছেন। রায় মশাইয়ের কনিষ্ঠ কন্যা শ্রীমতি অরুদ্ধতী রায় চৌধুরী উরফে অর্পিতার কাছ থেকে তিনি ‘যোগাযোগ’ বইখানা ধার চেয়ে এনেছিলেন। তার ভেতরের পৃষ্ঠায় ছিলো একটি চিরকুটের সাথে গোটা কয়েক গোলাপের শুকনা পাঁপড়ি। শুনেছিলেন অর্পিতার সম্বন্ধ হচ্ছে পাথরজুড়ির দোজবরে এক বিলাতফেরত জমিদারপুত্রের সাথে। অস্থির হয়ে সরস্বতী পূজা উপলক্ষে ঠাকুরগড়া দেখার অজুহাতে গিয়ে বসেছিলেন রায়বাড়ির মণ্ডপ-ঘরের বারান্দায়। অর্পিতা তার সাথে দেখা করতে আসেনি, রেকাবিতে করেও পাঠায়নি জলখাবার। তবে তেতালার আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর ছোট্ট ঘরের জানালার কাছে বসে হারমনিয়াম বাজিয়ে গেয়েছিলো রবি ঠাকুরের গান- ‘যে ছিলো আমার স্বপনচারিনী।’ ডুরে শাড়ির সাথে ঘটিহাতা ব্লাউজ পরা অর্পিতাকে জানালায় আবছা একটু দেখেছিলেনও। রাতে মেঘমালায় হাহাকার ছড়ানো চাঁদ উঠলে বিষয়টা মনে হয়েছিলো তাঁর সহ্যসীমার অতীত। কাছারি ঘরের অন্ধকার কোণ বেছে তিনি গলায় দড়ি দিয়েছিলেন। দেউড়ীর নেপালী দারোয়ান গোঙানোর শব্দ পেয়ে তার খিঁচানো শরীর নামিয়ে এনেছিলো কড়িকাঠ থেকে।
বামধারার রাজনীতি সৈয়দ সাহেবকে আকর্ষণ করেছিলো একসময় তীব্রভাবে। মৌলানা ভাসানী আয়োজিত কাগমারী সম্মেলনেও শরিক হয়েছিলেন। আগ্রহ থাকলেও কোনো কর্মকাণ্ডে তেমন একটা লিপ্ত হয়ে পারেননি। তাঁর দু-একজন বন্ধু, গুপ্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে যুক্ত কমরেড খেতাবপ্রাপ্ত উচ্চবর্গীয় হিন্দু ভদ্রসন্তানরা বলতেন, রাজনৈতিক দিক থেকে সৈয়দ সাহেবের বিশ্লেষণী প্রজ্ঞা আসাধারণ হলেও তাঁর ডিক্লাসড্ বা শ্রেণিচ্যুত হওয়ার কোন প্রয়াস নেই। তো তিনি অনেক বছর বাম-বলয়ের সক্রিয়তার বাইরে থেকে তাদের ছোটখাট সমর্থন জুগিয়েছেন। আইয়ুবি আমলে যখন জোর ধড়পাকড় চলছিলো, কমরেড লালা শরদিন্দু দে বা কমরেড বরুণ রায়ের মতো হুলিয়া লাগানো নেতাদের তিনি শেল্টার দিয়েছেন। আর নিজের জীবনকে ছুটখাট তেজারতী, পৈতৃক সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা ইত্যাদিতে যুক্ত করেছেন। প্রচুর গ্রন্থপাঠে, সামাজিকতা ও বুদ্ধিজীবীদের সহবতে কাটিয়েছেন অবসর। অভিজ্ঞতা থেকে সৈয়দ সাহেব জানেন যে- বাম রাজনীতিই জীবনের শেষকথা নয়। মেহদী সম্পর্কে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন, ভেবেছিলেন চলমান রাজনীতির ধারাপ্রবাহে সে যদি সাঁতার কাটতে না পারে, তাহলে চরে উঠে খানিক জিরিয়ে নিয়ে কলেজের ছাত্রজীবন, কবিতা বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিচিত্র ঠিকানায় সে খুঁজে নেবে তার নতুন নিবাস।
মেহদী বিষয়ে তার উদ্বেগের গুরুতর কিছু কারণ ছিলো। নিঃসঙ্গ ছিলেন সৈয়দ সাহেব। আর মেহদীও তার বাংলাঘরে আসা বাদ দিয়েছিলো। খবর পেতেন কেমন যেন ছন্নের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে সে হাটে-বাজারে। আর রেলওয়ে স্টেশনের বেঞ্চে পত্রিকা হাতে বসে থেকে ফুকছে ক্রমাগত কিংস্টর্ক সিগ্রেট। সময় কাটানোর জন্য বাংলা ও ইংরেজি দু-তিনটি পত্রিকা নিয়ম করে সৈয়দ সাহেব পড়তেন। চোখের জ্যোতি কমে আসার কারণে উপসম্পাদকীয় ইত্যাদি পড়তে তার মেহনত হতো প্রচুর। প্রতিদিন পত্রিকায় দেখতেন রাজনৈতিক কারণে মানুষ খুন-জখম হচ্ছে হামেশা। শ্রেণিশত্রু হিসাবে জোতদারদের গলা কেটে হত্যা করা হচ্ছে উত্তরবঙ্গে। আবার কোথাও বাম উপদলীয় কোন্দলে এবং মতভেদের কারণে পরষ্পরের হাতে খুন হচ্ছে তাদের নিজস্ব ক্যাডাররা। পত্রিকা পড়ে বাম রাজনীতিতে আদতে কী চলছে তার ঠিক হদিস পেতেন না। তো বার তিনেক ডেকে পাঠিয়েছিলেন মেহদীকে একটু আলোচনা করে বিষয়গুলোর জট ছোটানোর জন্য। একবার ছেলেটি এসেছিলোও ঘণ্টাখানেকের জন্য। উপদলীয় কোন্দল ও পারষ্পরিক হত্যা বিষয়ে তিনি তাকে সরাসরি সওয়াল করেছিলেন। পরিস্কার কোনো জবাব না দিয়ে অত্যন্ত অশোভনভাবে রেগে গিয়ে মেহদী চা-লাচ্ছি-শিমাই কিছু না খেয়ে উঠে চলে গিয়েছিলো। বিষয়টি নিয়ে রোজনামচায় লিখতে গিয়ে বেশ খানিকটা ভেবেছেন সৈয়দ সাহেব। তাঁর ধারণা হয়েছিলো- ছেলেটি হয়তো এখনো কষ্ট পাচ্ছে তার পরিচিত অত্যন্ত প্রিয় কোন কিশোরীর কথা ভেবে। যার জন্য সে একদিন স্লিপিং পিল খেয়েছিলো, এবং বেঁচে উঠতে হালফিল বিব্রতবোধ করছে রীতিমতো।
ভেবেছিলেন মেহদীর ভেতর দিয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে অনেকটা মিরর ইমেজের মতো তাঁর নিজস্ব জীবনের ধারাক্রম। কিন্তু গেল দু’দিন আগের ঘটনা তাঁর ধারণাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে। বিষয়টা এরকম ঘটবে তিনি তা কখনো ভাবতে পারেননি। রাত একটার সময় ঘুম থেকে জাগিয়ে তাঁকে সংবাদ দেয়া হয়। এগারোটা নাগাদ মেহদী ফিরছিলো রেলওয়ে স্টেশন থেকে। পথে সে স্টেনগানের ব্রাশ ফায়ারে খুন হয়। তদন্ত এখনো শুরু হয়নি, তবে শোনা যাচ্ছে তার একসময়কার সহযোদ্ধা কমরেডরা মতভেদের জন্য তাকে হত্যা করেছে।
জানাজার পর সৈয়দ সাহেব একনজর মেহদীর মুখ দেখেছেন। ব্যথিত হননি তিনি তীব্রভাবে তা অনুভব করে মনে মনে বড় তাজ্জব হয়েছেন! আর ছেলেটির মুখ দেখে তাঁর মনে হয়েছে- মৃত্যু এসেছে খুব অপ্রত্যাশিতভাবে। রোজনামচায় সৈয়দ সাহেব এই ব্যথিত না হওয়ার অনুভূতি যে লোপ পেয়েছে- তা নিয়ে বিস্তারিত লিখতে চান। কিন্তু পার্কার কলমটি কাজ করছে না। উঠে দেরাজ থেকে খুঁজে বের করেন উইংসাঙ বলে আরেকটি চীনা কলম। কিন্তু লিখতে গিয়ে ঠিক কী লিখবেন বুঝতে পারেন না। তবে কী তাঁর মস্তিষ্ক তৈরি করছে না-লেখার উপাদান। ভাবেন, একটু বিরতি নিয়ে আবার রোচনামচার এন্ট্রি লিখবেন। ঠিক তখনই মনে হয়- জানাজায় লৌকিকতা পালন করলেও তিনি মন থেকে মেহদীর মাগফেরাতের জন্য প্রার্থনা করেননি। ভাবেন, মনে মনে এক মর্তবা সুরা ইয়াসিন শরীফ পড়ে তার জন্য দোয়া করবেন। কিন্তু সুরাটিও ইয়াদ করতে পারেন না। তো তবদিল হয়ে নির্বাক হালতে সৈয়দ লতাফত হোসেন বসে থাকেন ইজিচেয়ারে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close