Home গদ্যসমগ্র ভ্রমণ মঈনুস সুলতান > হাইকার্স সার্কেল >> হাইকিং-ভ্রমণ
0

মঈনুস সুলতান > হাইকার্স সার্কেল >> হাইকিং-ভ্রমণ

প্রকাশঃ February 16, 2018

মঈনুস সুলতান > হাইকার্স সার্কেল >> হাইকিং-ভ্রমণ
0
0

মঈনুস সুলতান > হাইকার্স সার্কেল >> হাইকিং-ভ্রমণ

 

ঘণ্টা দুয়েক হলো- আমি দিগন্তে ব্লুরীজ মাউন্টেনের শিলারেখা নিশানা করে হাঁটছি। আমার অবস্থান- যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে শ্যানানডোয়া নামে নদীটির কাছাকাছি হাল্কা অরণ্যে নিবিড় একটি পার্বত্য অঞ্চল। হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় ট্রেইল আমি ভালোই কভার করছি। এলিভেশন নিচু বলে এতক্ষণ প্রান্তরে দীর্ঘ ঘাস ও বড়বড় কিছু গাছপালাও দেখা যাচ্ছিলো। হঠাৎ করে ড্রামাটিকভাবে ল্যান্ডস্ক্যাপ পরিবর্তিত হয়। বড়বড় পাথরের বোল্ডারে জন্য সড়ক অতিক্রম করা দুরূহ হয়ে পড়ে। আতান্তরে পড়ি। ট্রেইলের মানচিত্র ঘেঁটে যে তথ্য পেয়েছি তাতে এদিকে প্রকান্ড সব পাথর ছড়ানো তেপান্তর থাকার কথা না। তবে কী আমি ভুল বাঁক নিয়ে আবার ফিরে যাচ্ছি ওল্ডর‌্যাগ মাউন্টেনের দিকে। ব্যাকপ্যাকে খোঁজাখুঁজি করেও পাই না কম্পাস। প্রকান্ড দুটি জগদ্দল গোছের পাথরের ভেতর দিয়ে যেন কেটে তৈরী করা হয়েছে গোপন এক গিরিপথ। এ আইকনিক দৃশ্যপট যে ওল্ডর‌্যাগ মাউন্টেনেরই অংশ বিশেষ তা চিনতে ভুল হয় না। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেই যে, এবার হাঁটতে হবে উল্টা দিকে। একটু পরিশ্রম হবে, তবে আমি কনফিডেন্ট, সঠিক পথ খুঁজে পাবোই। পাথরের গোপন গিরিপথটি একেবারে নির্জন না। শর্টস্ পর এক মেয়ে-হাইকার অলস পায়ে তা বেয়ে উঠছে। তাকে আমি চিনতে পারি। ঘন্টা খানেক আগে তার সাথে আমার দেখা হয়েছে। ট্রেইলের পাশে মেয়েটি কাঠ কুড়িয়ে তিনটি মাঝারি সাইজের পাথরে চুলা বানিয়ে আগুনের উপর কেটলিতে পানি ফোটাচ্ছিলো। আমি হেঁটে যেতে যেতে তাকে হ্যালো বলেছিলাম। তার হাতে মুখ খোলা গ্রাউন্ড করা কফির প্যাকেট থেকে ছড়াচ্ছিলো চনমনে পোড়া-পোড়া গন্ধ। গ্রীবা বাঁকিয়ে সে জানতে চেয়েছিলো, ি‘ওয়ানা স্টপ এন্ড  জয়েন মি ফর অ্যা কাপ অব কফি? ’কি যেন এক সংকোচে আমি তাকে  ‘থ্যাংক ইউ’ বলে হেঁটে গিয়েছিলাম সামনে। আবার গোপন এ গিরিখাতে তাকে দেখতে পেয়ে খুব উৎসাহে তার দিকে চেয়ে হাত নাড়ি। মেয়েটি ফিরে তাকায় । যেন আমাকে দেখতে পেয়ে বেজায় খুশি হয়েছে এ রকম আকুল হয়ে হাসে। আমার পাঁজরে ব্যাকুল নিঃসঙ্গতা হাহাকার তোলে তীব্রভাবে। কিন্তু দ্বিধাকে আমি জয় করতে পারি না। তাই হাত নেড়ে গুডবাই বলে হাঁটতে শুরু করি উল্টা দিকে।

মিনিট তিরিশেক হাঁটতেই চলে আসি সম্পূর্ণ শ্যামল এক প্রান্তরে। আমার সামনে ঢেউ খেলানো সবুজ পাহাড়ের উপর ভাসছে থোকা থোকা মেঘ। পরীর দেশের বর্ণাঢ্য সাঁকোর মতো ছোট্ট একটি রঙধনু ঝুলে আছে আকাশে। দীর্ঘ ঘাস মাড়িয়ে হঁটে যেতে যেতে দেখি, পায়ের কাছে ফুটে আছে না দেখা স্বপ্নের মতো বেগুনি রঙের প্রসন্ন একটি ফুল। এ পুষ্প পরিচিত ওয়াইল্ড বেরগামন্ট ফ্লাওয়ার হিসাবে।  ফুলটির নানা এঙ্গেল থেকে তোলা ছবি আমি দেখেছি। এবার খুব কাছে থেকে দেখে মনে হলো- সিনে ম্যাগাজিনে যে স্টার নায়িকার ছবি দেখেছি অনেক, আজ যেন তার সাথে দেখা হয়ে গেলো সামনা-সামনি।

নীরবে হেঁটে যাই আরো মিনিট বিশেক।  আমার চলার সাথে সাথে ল্যান্ডস্কেপও পরিবর্তিত হচ্ছে মৃদু মৃদু। খানিক দূরে তাকিয়ে দেখি,আমি যে প্রান্তর ধরে হেঁটে যাচ্ছি, তার নিচের লেয়ারে গাছপালার ভেতর দিয়ে চলে গেছে নিরিবিলি একটি মেঠো পথ। সড়কটি একেবারে জনহীন না। একজন ঘোড়সওয়ার কদমচালে ছোটাচ্ছে ঘোড়া। দেখতে দেখতে জোড়া ঘোড়ায় চড়ে আরেক যুগল দুলকি চালে চলে আসে আমার ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে। পুরুষটি তার ঘোড়া মেয়েটির কাছাকাছি নিয়ে গিয়ে কী যেন বলে। আমি যেন দূর থেকে মেয়ে ঘোড়সওয়ারের মুখে মৃদুহাসি দেখতে পাই। কিন্তু, সে বোধকরি প্রস্তাবে সাথে সাথে রাজি না হয়ে লাগাম টেনে তার ঘোড়াকে সরিয়ে নিয়ে যায় খানিক দূরে।

এদিকে সড়ক বেজায় নির্জন, তাই ঠুকঠুক করে কাঠঠোকরার খোড়ল বানানোর শব্দ নিঃসঙ্গতাকে আরো গাঢ় করে তুলে। ঠোকরানোর শব্দের সাথে প্রতিধ্বনি মেশে। দেখতে দেখতে ঠোকরানোর শব্দ বাড়ে। মনে হয়, শ্রমিকরা তালে তালে ছোট্ট হাতুড়ি দিয়ে ইট ভাঙ্গছে। খুব একটা খুঁজতে হয় না। বোধ করি, প্রতিটি গাছে লাল ক্রাউন পরা একটি করে কাঠঠোকরা কাজ করছে। এদিকে কিছু দূর পর পর বনের সবুজ ঘাসপাতা ধামসে মাটিতে পড়ে আছে বেশ কিছু গাছের কান্ড। কাঠঠোকরাদের সম্মিলিত শব্দকে অতিক্রম করে আমি জোর কদমে আগ বাড়লে কে যেন বলে উঠে,‘হেই হাইকার, ডোন্ট ওয়াক সো ফার্স্ট, স্টপ এন্ড চিল আউট।’ ঘুরে তাকিয়ে দেখি, পয়পরিষ্কার করা এক চিলতে জমিনে পড়ে থাকা গাছের কান্ডে বসে জনা কয়েক অপরিচিত হাইকার। খুব রঙচঙে আফ্রিকান বাটিকের ফতুয়া পরা মাঝ-বয়সী এক হাইকার পাথরের উপর পাথর সাজিয়ে একটি স্ট্রাকচার বানাতে বানাতে আমার দিকে ইশারা করে বলেন,‘কাম এন্ড জয়েন আস।’ কৃষ্ণাঙ্গ এ মানুষটি কি কারণে জানি হা হা করে হেসে বলেন,‘লুক ম্যান, দিস ইজ নেচার, নো নিড টু রান। এসে আমাদের সাথে বসো, রিল্যাক্স করে ঠান্ডা হও। চিল আউট অ্যা বিট ম্যান।’

আমি মাটিতে পড়ে থাকা একটি গাছের কান্ডে বসি। বেশ দূরে আরেকটি গাছের কান্ডে একাকী বসে বেজায় বিমর্ষ একজন মানুষ। কৃষ্ণাঙ্গ মানুষটি পাথর বদলিয়ে সাইজের হেরফের করে- ভারসাম্যের দিকে খেয়াল রেখে এক মনে কাজ করেন। দেখতে দেখতে গড়ে উঠতে থাকে এবড়ো খেবড়ো পাথরের এক বিমূর্ত ভাস্কর্য। তাঁর পাশেই বসে আরেক লোক ডালপালা জড়ো করে আগুন করেছেন। এ মানুষটির খসখসে চামড়া ও তাঁর রুক্ষ শরীরকে ঝামা পাথর দিয়ে বানানো মূর্তির মতো দেখায়। তিনি শিকে গাঁথা আলু, মাশরুম, কেপসিকাম, পেঁয়াজ ও গাজর ঝলসাতে ঝলসাতে বলেন, তাঁর নাম ডনাল্ড। পেষায় চাষী তিনি। তাঁর জমিনে প্রচুর সব্জি জন্মে। একা এত কিছু খেতেও পারেন না। জংগলে হাট-বাজারই বা কোথায় যে শাকসব্জি বিক্রি করবেন? তাই মাঝে মাঝে গ্রীল করে হাইকারদের খাওয়ান। ‘ইউ নো গাইজ, মাই ভেজিটেবোলস্ আর অর্গানিক। আমি সার বা কীটনাশক কিছুই ব্যবহার করি না। দে টেস্ট ভেরী গুড,’ বলে তিনি ঠোঁট গোল করে শীস বাজান। তার দু’তিনটা দাঁত মিসিং বলে শীসের ধ্বনি তেমন জমে না। কিন্তু এ শব্দে যেন বিরক্ত হয়ে খানিক দূরে গাছের কান্ডে বসে থাকা বিমর্ষ মানুষটি উঠে দাঁড়ান। তিনি কাউকে কিছু না বলে শুকনা পাতায় সরসরে ধ্বনি তুলে নীরবে হেঁটে যান গভীর বনের দিকে।

হাইকারদের এ সার্কেলে একটি পাথরের উপর বসে আছেন ক্যাথরিন। তাঁর তাম্র বর্ণের চুলে বয়সের রূপালি ব্রোকেড। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি বলে ফেলেন অনেক কিছু। এক সময় পেন্টাগনে যুদ্ধের কাজে লাগে এ ধরনের তথ্য নিয়ে গবেষণা করেছেন। তারও আগে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিক্রি করেছেন খুচরা কসমেটিক। রিটায়ারমেন্টের বছর সাতেক বাকি। ইকোনমি খারাপ যাচ্ছে বলে হালফিল রিয়েল এস্টেটের দালালী করছেন। সঞ্চয় আরেকটু বাড়লেই ইসরাইল হয়ে ঈজিপ্টের সিনাই যাবেন মরুভূমিতে হাইক করার জন্য। তিনি ফ্রিজবির প্লেটে জিনজার দেয়া শর্ট-ব্রেড এর টুকরাগুলো সাজাতে সাজাতে বলেন,‘ লুক গাইজ, এ ব্রেডের রেসিপি র‌্যাশান। আমার মা’য়ের কাছ থেকে পেয়েছি। ট্রাই সাম শর্ট-ব্রেড গাইজ, তোমাদের ভালো লাগলে মা কিভাবে এ রেসিপি পেলেন তা তোমাদের বলবো। দ্যাটস্ অ্যা হৌল এনাদার স্টোরি।’

বেইসবল ক্যাপে বাদাম, কিসমিস, এপ্রিকট ও চকোলেট চিপসের মিশ্রণে তৈরী ট্রেইল মিক্সের প্যাকেট খুলে তা পাথরের উপর রাখতে রাখতে অত্যন্ত খাটো ঝুলের সর্টস্ পরা মেয়েটি নিজেকে বিয়াত্রিস বলে পরিচয় দেয়। চটকদার মেরুন রঙের স্নিকার পরা তার পদযুগল সম্পূর্ণ নিরাভরণ। মিল্ক চকোলেটের মতো মোলায়েম গাত্রবর্ণের এ মেয়েটিকে মনে হয় তার টিচার সময় মতো আসাইনমেন্ট জমা দেয়নি বলে বকেছেন। এখন তার খুব হার্ডটাইম যাচ্ছে, এ ধরনের অভিব্যক্তি ফুটিয়ে সে বলে,‘ আই ডোন্ট হ্যাভ মাচ টু সে গাইজ। রিয়েলি আই ডোন্ট হ্যাভ এনিথিং টু শেয়ার। কিন্তু কেবল একটি কথা, ওয়েসলি আর্থার যে পাথরের উপর পাথর রেখে ব্যালেন্সিং রকের স্কাল্পচারটি তৈরী করলেন, তা আমার খুব ভালো লেগেছে।’ কৃষ্ণাঙ্গ মানুষটির দিকে আংগুলের ইশারা দিয়ে আবার,‘ আই টোটালি লাভ ইট,’বলে সে হাততালি দেয়। ওয়েসলি আর্থার উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে ঝুঁকে মাথা নুইয়ে বলেন,‘বিয়াত্রিস্ , বিউটিফুল গার্ল উইথ লাভলি লেগস্ ।’ তিনি একটু পজ নিয়ে একমনে হা হা করে হেসে বলেন,‘ তোমার পায়ের প্রশংসা করলাম বলে তুমি কি মাইন্ড করছো বিয়াত্রিস? লিসেন, উই আর ইন দ্যা উডস্, বনানীতে সমাজ-সংসারের রীতিনীতি মানার তো কোন দরকার নেই। দ্যা থিংগ ইজ দ্যাট, এরকম চিত্রিত টাটু করা পা আমি কখনো দেখিনি। আমি তোমাকে আর এমবেরেস করবো না। আমার কারবার পাথরের ভারসাম্য নিয়ে। এই যে আমার পাথরে করা ভাস্কর্যের প্রশংসা করলে.. ..এর মাঝে তুমি আসলে কি দেখলে.. জাস্ট টেল আস, প্লিজ।’ বিয়াত্রিস কয়েক পা সামনে এসে স্টোন স্কাল্পচারের সামনে দাঁড়লে তার মসৃণ ঊরুতে খুব বর্ণাঢ্য করে আঁকা ঘোড়া, পালকের শিরোভূষণ পরা নেটিভ আমেরিকান, শঙ্খ ও অক্টোপাসের চিত্রগুলো যেন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সে ওয়েসলি আর্থারের দিকে ভ্রুকুটি করে বলে, ‘ব্লুরীজ এর পার্বত্য অঞ্চলে পাথররাজি পর্যবেক্ষণ করছে অনেক বৃত্তান্ত, কিন্তু তারা নির্বাক, কিছু বলে না। আমিও তাদের মতো, ইয়েস আই হ্যাভ লট ইন মাই হার্ট। মনে আমার অনেক কিছুই জমে আছে…এবং সব পাথর হয়ে আছে, আমি বলতে পারি না। আর বলবোই বা কেন?’

এবার আমার পালা আসলে আমি হাইকারদের এ সার্কেলে কোন খাবার কন্ট্রিবিউট করতে অপারগতা প্রকাশ করে, অতঃপর একটি পড়ে থাকা পাথরের উপর সিডি ওয়াকম্যান রেখে তাতে মিনিয়েচার স্পিকার জুড়ি। সিডিতে ‘সিনাকা নিন্দা..বিনাকা নিন্দা’ বলে একটি আফ্রিকান মিউজিক বাজতে শুরু হলে আমি বলি, ‘কিছু দিন আগে একটি ট্যাগসেইল থেকে আমি কোয়ার্টার বা পঁচিশ পয়সা দিয়ে এ সিডিটি কিনি। এর কভার পুরানো হয়ে এমন বিবর্ণ হয়েছে যে- বলা মুশকিল এ সঙ্গীত কোথাকার বা কে গেয়েছে?’ ওয়েসলি আর্থার উঠে দাঁড়িয়ে হা হা করে এক মনে হেসে বলেন, ‘হু কেয়ারর্স হোয়াইট ইজ দ্যা নেইম অব দি মিউজিসিয়ান এনিওয়ে। দিস ইজ লাভলি মিউজিক। কাম অন মাই প্রিটি গার্ল উইথ লাভলি লেগস্,’ বলে হাত বাড়লে তাঁর শরীরী বৃত্তের ভেতর ঢুকে পড়ে নেচে ওঠে বিয়াত্রিস। দু’জনে খুব হাল্কা চালে সোয়িং ড্যান্স জাতীয় কিছু নাচছে। বিয়াত্রিসের চোখ আধবোজা। তার পায়ের মৃদু কাঁপনে প্রান্তরে ছুটে যায়- লোহিত অশ্ব, নেটিভ আমেরিকান এক লোক শঙ্খ ফুঁকলে সমুদ্রে সাঁতার কাটে সবুজে নীল মাখা অক্টোপাস। ড্যান্স করতে করতে ওয়েসলি আর্থার বিয়াত্রিসের শরীর পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁর আচরণে মনে হয়, তিনি টিভি সিরিয়েল বা মুভি’র ডিরেক্টার। এ মুহূর্তে তিনি দেখে নিচ্ছেন সম্ভাব্য নায়িকার বডি মুভমেন্ট।

আমরা পাথরের উপর ফ্রিজবি ও বেইসবল ক্যাপে রাখা খাবার, এবং ফার্মারের হাতে ঝলসানো সব্জি খেতে খেতে টুকটাক কথাবার্তা বলি। বিয়াত্রিস কিন্তু কিছু না বলে দাঁড়িয়ে থাকে ম্লান হয়ে আসা অঙ্গারের পাশে। জরুরি কিছু হারিয়ে ফেললে কিছুদিন হাহুতাশ করে মানুষের মন যে রকম শান্ত হয়ে আসে, তার দুচোখে যেন সে ধরনের বিষন্ন প্রবোধ। ওয়েসলি আর্থার একটি পাথর হাতে নিয়ে বলেন, ‘লিসেন গাইজ, পাথরেরও অভিব্যক্তি আছে, ইউ অল আন্ডারস্ট্যান্ড দ্যাট, রাইট। সৃষ্ট জগতের চলমান ঘটনা প্রবাহকে পর্যবেক্ষণ করে, কখনো প্রকৃতির অন্য এলিমেন্ট তথা বাতাস, জল, অগ্নি ও খনিজ চাপের সাথে মিথ¯্ য়া করে বদলে যায় তার আকার, ঘনত্ব ও বর্ণ। বিবর্তিত এ রূপের ভেতর দিয়ে পাষাণ প্রকাশ করে নিজেদের। আমরা মানুষ, পাথরের মতোই প্রকৃতির আরেক অংশ। আমাদের প্রকাশ সব সময় নির্বাক না। তবে কিছু কিছু অভিজ্ঞতা আমাদের মাঝেও পাথরের মতো জমাট বেঁধে থাকে, চাইলে আমরা এগুলোকে বাক্যে বা গল্পে রিলিজ করতে পারি।’ তিনি এবার সকলকে পাথর হাতে নিয়ে একটুক্ষণ নীরবে প্রতিফলন করে নিজের সম্পর্কে কোন অভিজ্ঞতা, স্মৃতি বা উদ্বেগ শেয়ার করতে বলেন।

কিছুক্ষণ পাথর হাতে নিয়ে চোখ মুদে নীরবে বসে থেকে প্রতিফলনের প্রক্রিয়া শুরু করেন আর্থার ওয়েসলি নিজেই। তিনি একা একা খানিক হেসে নিয়ে বলেন,‘লিসেন গাইজ, পাথর ছাড়াও প্রজাপতিতে আমার ইন্টারেস্ট আছে। নিজের ছোট্ট বাটারফ্লাই ফার্মে আমি প্রজাপতি পুষি। মৃত প্রজাপতিদের ফর্মালিনে চুবিয়ে সংরক্ষণ করি আয়নার ফ্রেমে। ব্লুরীজের পার্বত্য অঞ্চলে হাইকে এসে প্রজাপতি ওয়াচ করা আমার জীবনে রুটিনের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। লুক গাইজ, হোয়াট আই ফাউন্ড টুডে’, বলে তিনি তার ব্যাকপ্যাকের আড়াল থেকে বের করেন চারকোনা কাচের ছোট্ট খাঁচা। তাতে উড়ছে সাদা ডানার দৃষ্টিনন্দন একটি প্রজাপতি। তিনি আবার বলেন,‘দিস ইজ কল্ড ক্যাবেজ হোয়াইট বাটারফ্লাই। ইংল্যান্ডে চাষীদের সব্জি ক্ষেতে এ ধরনের প্রজাপতি দেখা যায়। ব্লুরীজ মাউন্টেনে মূলত ইস্টার্ন টাইগার, এডমিরাল এবং সোয়ালো টেইল প্রজাতির বাটারফ্লাই বাস করে। ক্যাবেজ হোয়াইট বাটারফ্লাই এর আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে মাইগ্রেইট করে এখানে আসার কথা না। দিস ইজ স্ট্রেঞ্জ! টোটালি আনএক্সপেকটেড। দু’তিন বছর আগে আমি ব্যাকপ্যাকারদের ম্যাগাজিনে পড়েছিলাম, এক হাইকার নাকি এদিকে ইসাবেল নামে একটি প্রজাপতিকে উড়তে দেখেছে। ইসাবেল প্রজাতির সাক্ষাৎ তো ফ্রান্সের পাহাড়-পর্বতে পাওয়ার কথা। এখানে তাদের আসার কোন প্রশ্নই উঠে না। হাইকার ইসাবেলের ছবি তুলে তা ম্যাগাজিনে ছাপিয়েছে, তারপরও আমি তা বিশ্বাস করিনি। এন্ড লুক হোয়াট আই ফাউন্ড রাইট হিয়ার টুডে। আমি ঠিক জানি না ক্যাবেজ হোয়াইট প্রজাপতির ব্লুরীজে আসার মিস্ট্রি কিভাবে সলভ্ করবো?’

ক্যাথরিন মনে হয় কথা বলার জন্য মুখিয়ে আছেন। পাথর তাঁর হাতে আসতেই তিনি বলেন,‘আমার মা’য়ের কথা একটু বলি। শি হ্যাড অ্যা ফুল লাইফ। গত বছর এদিনে তাঁর মৃত্যু হয়। শি ডাইড পিসফুলি। তাঁর বয়স হয়েছিলো চুরাশি। যে বাড়িতে মা বাস করতেন আমরা তা বিক্রি করে দিচ্ছি। বিক্রির আগে তাঁর স্যুটকেস, লঙ প্লেয়িং রেকর্ডস্, ফিফটিজ মডেলের টেলিভিসন সেট, ফ্যামিলি ফটোগ্রাফসের এ্যলবাম ইত্যাদি পরিষ্কার করতে গিয়ে… গেস্ হোয়াট আই ফাউন্ড। চিলেকোটায় একতাড়া কাগজপত্রের মধ্যে তাঁর হাতে লেখা জার্নাল। র‌্যাশান লিটারেচারের ছাত্রী হিসাবে আমার মা বার কয়েক সাবেক সোভিয়েত ইউনিওনে ভ্রমণ করেন। ফিরে এসে এ ভার্জিনিয়া স্টেটে তাঁর সাথে দেখা হয় টলস্টয়ের গ্রেইট গ্র্যান্ড সান সার্গেই টলস্টয়য়ের সাথে। মা তখন আমার বাবার সাথে বিবাহিত। কিন্তু তিনি লুকিয়ে চুরিয়ে যেতে শুরু করেন রুশ অর্থডক্স চার্চে। দিস ইজ হোয়াট সার্গেই টলস্টয় গেইভ হার এজ অ্যা লিটিল গিফ্ট,’ বলে ক্যাথরিন তাঁর গলায় ঝুলানো রূপার ক্রুশ প্রতীকটি তুলে সবাইকে দেখিয়ে ফের কথা বলেন। ‘সার্গেই টলস্টয় এখনো বেঁচেবর্তে আছেন। এ এলাকাতেই তিনি বাস করছেন। মা তাঁর সাথে দিন কয়েক কেইপ কডের সমুদ্র তীরের একটি কেবিনেও কাটান। কোরিয়ান পেনিনসুলাতে যুদ্ধের সময় বাবা ফার-ইস্টে মিলিটারি সার্ভিস দিতে গেলে মা ট্রেনে চড়ে সার্গেই এর সাথে ঘুরে বেড়ান সারা আমেরিকা। জিনজার শর্ট-ব্রেডের এ রেসিপি মা পান টলস্টয়ের পরিবার থেকে। এ কারণে আমার বাবার সাথে তাঁর ডিভোর্স হয়েছিলো কি না.. জার্নালে..ইউ নো, ইট ইজ নট অল দ্যাট ক্লিয়ার? তাঁদের খুব ঝগড়াঝাটি হতো। মা ডিপ্রেড্ থাকলে তিনি আমাকে নিয়ে ব্লুুরীজে হাইক করতে আসতেন। নাও, দ্যা বিগ কোয়েশ্চন ইজ… আমি বাবার কন্যা না সার্গেই টলস্টয়ের কন্যা? আমার জন্মের বছর বাবা কোরিয়ান পেনিনসুলাতে যুদ্ধ করছিলো!’ তিনি এবার পাথরটি আমার হাতে দিতে দিতে আবার বলেন,‘ওয়েল, এত বছর পর ডিএনএ টেস্ট করে আর এত কিছু জেনে ফায়দা কি? আই উড জাস্ট লিভ ইট দেয়ার।’

পাথর হাতে নিয়ে আমি প্রথমে একটু ধন্ধে পড়ে যাই। কি বলবো? আমার সমস্যা হচ্ছে – যে মুহূর্তে যেখানে যাদের সাথে বসে আছি, এ বিষয়টি আমি তৎক্ষণিকভাবে ঠিক উপলব্দি করতে পারি না। আমার মন কেবলই চলে যেতে চায় কিছু দিন আগে ঘটে যাওয়া দৃশ্যপটে। সব কিছু এতো দ্রুত স্মৃতি হয়ে যায় যে-মাঝে মাঝে আমি ঠিক বর্তমানকে শনাক্ত করতে পারি না। যেমন এখন আমার চোখে ভাসছে দিন কয়েক আগে হাউস অব মিরর বলে দেয়াল জুড়ে আয়না লাগানো একটি ঘর। দূর থেকে আগত এক পর্যটক আয়নায় ছবি তুলছেন প্রতিফলনের। এই যে আমি হালফিল হাইক করে যাচ্ছি পাহাড় থেকে পাহাড়ে, তাঁবু খাটাচ্ছি হ্রদের পাড়ে, যা দেখছি, কথা বলছি যাদের সাথে; তারা যেন চলমান দৃশ্যপটের মতো প্রতিফলিত হচ্ছে আমার মনের আরশিতে। আমি জানি প্রতিফলন ছায়া মাত্র। ছায়ার প্রেক্ষাপটে কিছু একটা কায়ার অস্তিত্ত্ব থাকার কথা। কিন্তু বিষয়টি আগাপাশতলা অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে।

পাথর হাতে ফার্মার ভদ্রলোক থম মেরে বসে থাকেন। একটু আগে তিনি আলু,পেঁয়াজ ও মাশরুম যে শিকে ঝলসিয়েছেন তা হাতে তুলে মাটিতে গেঁথে বলেন,‘ইট ইজ অল আবাউট অ্যা ডিয়ার। এ বেবী ডিয়ার। নট অ্যান এডাল্ট ইয়েট। গায়ে এখনো শিশু বয়সের চিতল ফুটকিগুলো মিলিয়ে যায়নি। দুই মাস আগে আমি এ জংগল থেকে তাকে অসুস্থাবস্থায় রেসকিউ করি।’ ফার্মার কি একটা খটমটে ডিজিজের কঠিন নাম উচ্চারণ করেন। তার বেশ কয়েকটি দাঁত মিসিং বলে আমি শব্দটি ঠিক ধরতে পারি না। তিনি পাথর দিয়ে ঠুকে ঠুকে শিকটি মাটির আরো গভীরে পুঁতে দিয়ে আবার বলেন,‘বাচ্চা হরিণটিকে আমি ঔষধপত্র দিয়ে সারিয়ে তুলি। পেছনের দু’পা দুর্বল হয়ে পড়ায় সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করে। সে জংগলে চরতে যেত, আবার ফিরে আসতো আমার লগ কেবিনে। আমার কেবিন ও ফার্ম ব্লুরীজ পাহাড়ের সীমানা ঘেঁসে। গেল ছয়দিন হয় সে আর ফিরে আসেনি। ভেটেনারিয়ান ডাক্তার আমাকে বলেছে তাকে আরেক কোর্স এন্টিবায়োটিক খাওয়ানো দরকার। পা সবল না হওয়া অব্দি তাকে এরকম জংগলে ছেড়ে দেয়া খুবই রিস্কি। কায়োটি, ববক্যাট বা পুমা আক্রমণ করলে দৌড়াতে পারবে না তো।’

‘বাচ্চা হরিণটির গলায় পার্পোল রঙের রিবন বাঁধা। সে এ এলাকাতেই আছে’, বলে তিনি আমাদের ছোট্ট একটি জেরাক্স করা লিফলেট দেন। তাতে হরিণের ছবির নিচে তাঁর লগকেবিনে যাওয়ার মানচিত্র ও ডিরেকশন। তিনি এবার মাটি থেকে শিকটি তুলে নিয়ে কি কারণে খিকখিক করে হেসে উঠেন। বিষয়টি কি ভালো করে বোঝার জন্য আমি তাঁর দিকে নিরিখ করে তাকালে দেখি,হাসি নয় তিনি খোঁয়া যাওয়া দাঁতের ফাঁকে অস্বাভাবিক শব্দ করে কাঁদছেন। রুমালে নাক মুছে অস্পষ্ট স্বরে বলেন,‘নাথিং ওয়ার্ক ফর মি। কুকুরের একটা বাচ্চা জোগাড় করেছিলাম, কায়োটি কেবিনে ঢুকে তাকে মেরে ফেললো। জোড়া কবুতর পুষলাম, তাদের বাচ্চাকাচ্চা হলো, তারপর কি কারেণে যে তারা কোথায় উড়ে গেলো..নাউ ইটস্ দ্যা বেবী ডিয়ার।’

পাথর বিয়াত্রিসের কাছে আসলে সে তা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। খুব ক্লান্ত কন্ঠে সে বলে,‘নো, আই ডোন্ট হ্যাভ মাচ টু শেয়ার ইউথ ইউ গাইজ। যা আমি বলতে চাই তা আমি গুছিয়ে বলতেও পারি না। থাক। তবে ভালো লাগলো এই যে ওয়েসলি আর্থার পাথরের অভিব্যক্তির কথা বললেন।’ তারপর সে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘এন্ড ইউ, দ্যা আননোউন হাইকার, তুমি যে আয়নায় রিফলেকশনের কথা বললে, মনে হলো কিছু যেন আমার মধ্যেও প্রতিফলিত হচ্ছে। খুব কাছে গিয়েও আমি তাকে স্পর্শ করতে পারিনি, পারহেপ্স ইট ইজ অল শ্যাডো, চাইলেই আমি তো ছায়াকে স্পর্শ করতে পারি না।’ সে ক্লিনেক্সয়ে চোখ মুছে পাথর ফিরিয়ে দেয় ওয়েসলি আর্থারের হাতে। তারপর ছোট্ট একটি নোটবুক বের করে আবার বলে,‘গাইজ, ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, আমার নোটবুকে সকলে একটি শব্দ বা দুটি বাক্য লিখে দাও।’ নোটবুক আমার হাতে আসলে আমি চোখ মুদি। এবং তার চিত্রিত পা ও অশ্রুময় চোখের যে ইমেজ আমার নিজস্ব আরশিতে এইমাত্র ছায়া ফেলেছে, তার দিকে ফোকাস করে নির্দ্ধিধায় লিখি- ‘আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু হোল্ড ইয়োর হ্যান্ড, বাট ক্যান উই ওয়াক অন দি গ্রীন গ্রাসি ল্যান্ড?’

নোটবুক তার হাতে ফিরে গেলে বিয়াত্রিস মৃদু হেসে নীরবে আমাকে অবলোকন করে একটু ক্ষণ। তারপর আংগুলের ইশারায় কী যেন দেখায়। আমি ঘাড় ফিরিয়ে তাকাই। দেখি, ঝোপের ওপারে ফুটে আছে থোকা থোকা নীল ফুল। তাতে বসে জোড়া কান সতর্ক করে আমার দিকে চেয়ে আছে একটি তুলতুলে পশমের কাঁচা বয়সী খরগোশ।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close