Home পঠন-পাঠন মনিকা আলী > ২০টি প্রশ্নের সাক্ষাৎকার এবং ডায়ানাকে নিয়ে মনিকার লেখা >> ভাষান্তর : রাজিয়া সুলতানা

মনিকা আলী > ২০টি প্রশ্নের সাক্ষাৎকার এবং ডায়ানাকে নিয়ে মনিকার লেখা >> ভাষান্তর : রাজিয়া সুলতানা

প্রকাশঃ November 21, 2017

মনিকা আলী > ২০টি প্রশ্নের সাক্ষাৎকার এবং ডায়ানাকে নিয়ে মনিকার লেখা >> ভাষান্তর : রাজিয়া সুলতানা
0
0

মনিকা আলী > ২০টি প্রশ্নের সাক্ষাৎকার এবং ডায়ানাকে নিয়ে মনিকার লেখা >> ভাষান্তর : রাজিয়া সুলতানা
চটজলদি সাক্ষাৎকার

আপনার সবচে’ খারাপ অভ্যেস কোনটি?
-যখন লিখতে থাকি, তখন দিনের পর দিন একই দুর্গন্ধযুক্ত কাপড় পরে থাকাটা।

ভূমিকা

মনিকা আলীর জন্ম ঢাকায়। বয়স এখন উনপঞ্চাশ বছর। বাবা বাংলাদেশের, মা ইংরেজ। বেড়ে উঠেছেন বোল্টনে, পড়াশোনা করেছেন অক্সফোর্ডে। তাঁর বয়স যখন একত্রিশ বছর, তখন থেকে লেখালেখির শুরু। তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম ‘ব্রিক লেন’। দু’হাজার তিন সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটির সুবাদে প্রভাবশালী গ্রানাটা পত্রিকা তাঁকে বেস্ট ইয়াং ব্রিটিশ নভেলিস্ট অব দ্য ডিকেড হিসেবে ঘোষণা দেয়। উপন্যাসটি ম্যান বুকার পুরস্কারের শর্টলিস্টেও স্থান পায়। লেডী ডায়ানাকে নিয়ে লেখা তাঁর চমৎকার উপন্যাস ‘আনটোল্ড স্টোরি’ প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। বর্তমানে তিনি তাঁর পরিবারের সঙ্গে লন্ডনে বসবাস করছেন।
২০টি প্রশ্ন এবং সেইসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন মনিকা আলী

 
[এই প্রশ্ন এবং সে-সবের উত্তরের উৎস : ‘দ্য গার্ডিয়ান’, ২ এপ্রিল ২০১১। প্রশ্নগুলি গার্ডিয়ানের হয়ে করেছিলেন রোজানা গ্রিনস্ট্রিট।]
জীবিত ব্যক্তিদের মধ্যে কে আপনার সবচে’ বেশি প্রিয় এবং কেন?
-ক্লাইভ স্ট্যাফোর্ড স্মিথ আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব। অ্যামেরিকার কারাবন্দীরা- যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবার অপেক্ষায় – তাদের জন্য তিনি সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।
আপনার জীবনের সবচে’ বিব্রতকর মুহূর্ত কোনটি?
-সেটা ঘটেছিল ডেট্রয়টে। সহস্রাধিক লোকের সামনে বক্তৃতা দেবার প্রস্তুতি নেবার সময় এমন অবস্থা হয়েছিল যে প্রায় কেঁদে ফেলেছিলাম।
সম্পত্তির বাইরে সবচে’ ব্যয়বহুল কোন জিনিসটা কিনেছেন আপনি?
-মার্ক লুইস হিগিনসের আঁকা একটা চিত্রকর্ম।
আপনার অধিকারে থাকা সবচে’ মূল্যবান জিনিসটা কী?
– লেখালেখির জন্য যে খাতাটা আমি এখন ব্যবহার করছি সেইটা।
কীরকম জায়গায় বাস করতে পছন্দ করেন আপনি?
– যেখানে সূর্য আলো দেয় এরকম যে কোনও জায়গায়।
লুপ্ত কিছু ফিরিয়ে আনতে পারলে কী ফিরিয়ে আনবেন আপনি – কী হবে সেটা?
-দ্য অয়্যার ট্রেইলারের আরেকটা সিরিজ- ওহ! দারুণ হতো তাহলে!
আপনার জীবন নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হলে আপনার চরিত্রে কাকে দেখতে চাইবেন সেই ছবিতে?
-অবশ্যই মারলোন্ড ব্র্যান্ডোকে।
নিজের চেহারার কোন জিনিসটা আপনার সবচে’ বেশি অপছন্দের?
-সূর্যরশ্মিতে আমার ত্বকের অনেক ক্ষতি হয়েছে। আমাকে ভীষণ বুড়ি লাগে দেখতে।
আপনার সবচে’ খারাপ অভ্যেস কোনটি?
-যখন লিখতে থাকি, তখন দিনের পর দিন একই দুর্গন্ধযুক্ত কাপড় পরে থাকাটা।
আপনার পছন্দের পোশাক কোনটি?
-জীনস্।
সবচে’ বাজে কোন কথাটি আপনাকে উদ্দেশ্য করে কেউ কি বলেছেন?
-নাহ। কেউ বলেননি এখনও।
সবচে’ বেশি অপরাধবোধ নিয়ে কোন আনন্দটি উপভোগ করেন?
-বিছানায় শুয়ে শুয়ে লেখা।
নিজেকে বাবা-মা’র কাছে কী কারণে ঋণী মনে করেন?
-হাস্যরস আর পরিমাণবোধের জন্য।
যদি দুঃখ প্রকাশ করতে হয়, কার কাছে সেটা করবেন, কেন করবেন?
-মাধ্যমিক স্কুলে পড়ি যখন, সবাই স্মেলী মেরী বা দুর্গন্ধময় মেরী বলে ডাকতো এক সহপাঠিনীকে। ওর দাঁত-ময়লা রোগ ছিল। তাই দুর্গন্ধ ছিল মুখে- সেজন্য তাকে চিকিৎসাও নিতে হয়েছিল বৈকি! অন্যদের মতো ওকে আমি ওই নামে কখনও গালি দিই নি। কিন্তু সাহস করে ওর পক্ষ নিয়ে কিছু বলিও নি কখনো। সেকথা ভাবলে এখন খারাপ লাগে।
কাকে অথবা কী সবচে’ বেশি ভালোবাসেন?
-চকোলেট।
সেই ভালোবাসার অনুভূতিটা কেমন?
-অদম্য, দুর্দান্ত, অবাধ্য একেবারে।
জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ চুমুটির কথা বলবেন কি?
-হুম। সেটা ছিলো সোহোর একটা ক্যাফেতে। লোকজন তাকিয়ে ছিল মনে হয়। আমি পাত্তাই দিই নি।
কোন কথা বা শব্দটি অভ্যেসবশত বারবার বলে থাকেন?
-আমার বাচ্চারা বলে আমি সবসময় শপথ করে কথা বলি।
নিকৃষ্টতম কোনো কাজের অভিজ্ঞতার কথা বলুন।
-তখন আমি ছাত্রী ছিলাম। বোস্টনে প্রক্রিয়াজাত মাংসের এক কনভেনশনে ‘সালামি’ খেতে দিয়েছিলাম লোকজনদের। যাকে বলে শর্ট স্কার্ট! হায়! সেই পোশাক পরতে হয়েছিল আমাকে ওই কাজটির জন্য।
পারলে অতীতের কী মুছে ফেলতে বা পাল্টে দিতে চাইবেন আপনি?
-অক্সফোর্ডে তিন বছরে যদি দুটোর বেশি লেকচার দিতে পারতাম!
মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন এমন কোনও অভিজ্ঞতা আছে জীবনে?
-হ্যাঁ। ইন্ডিয়ায় একবার রিক্সা থেকে পড়ে গিয়েছিলাম। দিক বদলের সময় বিপরীত দিক থেকে আসছিল গাড়িটা- ভাগ্য ভালো ছিল- বেঁচে গেছি সেজন্য।
জীবনে সবচে’ বড় অর্জন কী আপনার?
-বলতে ইচ্ছে করছে বাচ্চারাই আমার জীবনের সবচে’ বড় অর্জন- কিন্তু এভাবে বললে বেশিই বলা হবে।
আপনার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় কোন গানটা বাজালে আপনার ভালো লাগবে?
-লা’ ব্যান্ডের- ‘দেয়ার শী গোজ…’ এই গানটা।

 
মনিকা আলী >> কেন এবং কেমন করে লেখা হলো আনটোল্ড স্টোরী

[সম্পাদকীয় নোট : মনিকা আলীর প্রথম উপন্যাস ব্রিক লেন প্রচুর প্রশংসা কুড়োয়। বুকার পুরস্কারের শর্টলিস্টে স্থান করে নেয় এটি। বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক বিক্রিত বই হিসেবেও লিস্টে নাম ওঠে বইটির। উনিশশ’ সাতানব্বই সালের আগস্ট মাসে প্যারিতে এক ভয়ানক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন ওয়েলসের রাজকন্যা ডায়ানা। সেই মৃত্যুটা যদি নকল বা সাজানো মৃত্যু হতো- আবার নতুন করে শুরু করতে পারতেন ডায়ানা তাঁর জীবন- সেই কল্পনা্র ডানায় হাওয়া লাগিয়ে মনিকা আলী আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে ডায়ানার জীবন নিয়েই লিখেছেন আনটোল্ড স্টোরি

কীভাবে কোন পটভূমিতে উপন্যাসটি লিখেছিলেন, উপন্যাসটি লেখার পর মনিকা আলী সে সম্পর্কে একটা গদ্য লেখেন। লেখাটা প্রকাশিত হয়েছিল ডেইলি মেইল অনলাইন-এর ২০১১ সালের ১৮ মার্চ সংখ্যায়। নিচে সেই লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো।]

ডায়ানার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ভাষণে তাঁর ভাই আর্ল স্পেন্সার বোনের কথা স্মরণ করতে গিয়ে বলছিলেন, ‘আধুনিক যুগের যে মানুষটির পেছনে সবাই সবচে’ বেশি লেগে থেকেছে, দু’দণ্ডের জন্য পিছু ছাড়েননি, তিনি হচ্ছেন ডায়ানা’। এতে অবাক হবার কিছু নেই যে সেজন্যেই বারবার জীবন থেকে পালিয়ে বাঁচবার স্বপ্ন দেখতেন ডায়ানা। যেন পালিয়ে থেকেই কোনোও এক যাদুবলমন্ত্রে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবেন তিনি। আর এই ভাবনায় নিজ দেশের বাইরে অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু রূপকথার গল্পে যেমন সাদামাটা একটা মেয়ে হঠাৎ করে একদিন রাজকন্যা বনে যায়, এই রাজকন্যার সেরকম একটা সাধারণ জীবন পেতে হলে ঠিক ওরকমই একটা রূপকথার গল্পের প্রয়োজন ছিল। আনটোল্ড স্টোরিতে আমি সেরকম একটা মেয়ের সাদামাটা গল্পই লিখতে চেয়েছি।
আমার গল্পে ডায়ানাকে কেন্দ্র করে যে রাজকন্যা- উনি হচ্ছেন সেইরকম একটা কাল্পনিক চরিত্র যে কিনা তার কল্পলোকে আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে দশবছর ধরে অ্যামেরিকার ছোট্ট একট শহরে বসবাস করছে। একবার অতীত জীবনের স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে লন্ডনে থাকাকালের বিভিন্ন সময়ে তোলা ছবিগুলো আবার একনজর দেখার জন্য ম্যাগাজিনের পাতাগুলো ওল্টানোর সময় একটা লেখার ওপর তাঁর চোখ আটকে যায়। আর সেই লেখাটা হচ্ছে তাঁর ‘মৃত্যু’র দশবছর পূর্তি উপলক্ষে হাইড পার্কে তাঁর সন্তানেরা স্মৃতিসভায় কনসার্টের আয়োজন করেছে।
ডায়ানা ভাবতে থাকেন ক্ষণিকের জন্য শান্তি খুঁজতে গিয়ে যে জীবন তিনি বেছে নিয়েছেন, সেখানে রাজপরিবারের জাঁক নেই, গ্ল্যামার, প্রাচুর্য এসব কিছুই নেই। সেজন্য দুঃখও নেই তার। কিন্তু জীবনের সবচে’ মূল্যবান সম্পদ যে সন্তান- তাদেরকে হারিয়েছেন তিনি। গল্পে ডায়ানার চরিত্রে অভিষিক্ত লিডিয়ার সঙ্গে ডায়ানার রয়েছে অনেক মিল। লাখো মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন তিনি। অথচ ব্যক্তিজীবনে প্রত্যাখান, বিশ্বাসঘাতকতায় বারবার ভেঙে গেছে তার মন। এক দুঃসহ জীবন ছিল তার।
ধন-সম্পদ, প্রাচুর্য- কোনো কিছুরই অভাব ছিলনা তার। কিন্তু রাজপ্রাসাদে অবরুদ্ধ নিঃসঙ্গ, আর একা ছিলেন তিনি। মিডিয়া কখনই তাঁর পিছু ছাড়েনি- এটা ছিল একটা ফাঁদ। সেলিব্রেটি হবার কারণে সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁকে নিয়মিত অনুসরণ করতো। এসব কারণে একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। মুক্তির পথ খুঁজছিলেন- শেষে পেয়েও গেলেন একসময়। দারিদ্র্যপীড়িত, হতাশাগ্রস্ত, বঞ্চিত মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের মধ্য দিয়ে জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করলেন।
কিন্তু রাজপরিবারের প্রাচীন প্রথা আর রীতিনীতির শৃঙ্খল তাঁর পায়ে। কঠিন সেসব নিয়মের বেড়াজাল ভাঙতে পারছিলেন না তিনি। ক্রমশ ভেতরে ক্রোধ পুঞ্জীভুত হতে হতে একসময় তিনি বেপরোয়া হয়ে উঠলেন।
ভাবলেন, আর কত? একে তো নিজের ভেতরে রয়ে গেছে তীব্র দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, অন্যদিকে রাজপরিবার থেকে ক্রমাগত চাপের মুখে একসময় প্রতিটা মুহূর্ত রাজকীয় নির্দেশমতো চলতে অস্বীকৃতি জানালেন।
আমার গল্পে তখনই এসে যায় ডায়ানার বিদায় নেবার পালা। আমার গল্পে সৃষ্ট চরিত্রটি প্যারির সেই গাড়ি-দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে না। বরং সাজানো, নকল একটা মৃত্যু দেখানোর স্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, যাতে নতুন একটা জীবনে প্রবেশ করতে পারেন তিনি।
বছরের পর বছর আমি ভেবেছি এরকম একটা ট্রাজেডি না ঘটলে ডায়ানার জীবনটা কেমন হতে পারতো- কী ঘটতে পারতো তাঁর জীবনে? যে-সময়ে তিনি মারা গেলেন সেই সময়টা ছিল তাঁর জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়। চৌরাস্তায় যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ মানবিক অভিযানের পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। অথচ তাঁর ব্যক্তিজীবনে চলছে তখন তুমুল ঝড়, প্রচণ্ড ওলটপালট। বেঁচে থাকলে চল্লিশ এবং চল্লিশোর্ধ্ব সেই বয়সে কীরকম হয়ে উঠতেন তিনি, কতোটা পরিণত হতে পারতেন- এসব নিয়ে আমি ভাবতাম।
এই ভাবনা থেকে ২০০৯ সালের গ্রীষ্মকালে আমি একটা ছোটগল্প লিখব বলে মনস্থির করি। ডায়ানার ওপরে লেখা গাদা গাদা বই কিনে সেগুলো জড়ো করি। তারপর শুরু হয় গবেষণা। এব্যাপারে আমার আগ্রহের শেষ ছিল না। আমি খুব উজ্জীবিত হয়েছিলাম। দুর্নিবার একটা ইচ্ছে আমাকে পেয়ে বসেছিল।
অনেকগুলো দিক ছিলো এর। কিন্তু এদের মধ্য থেকে তিনটি দিক বেছে নিয়ে সেগুলোর ওপরে কাজ শুরু করি। প্রথমটা ছিলো ডায়ানা কেমন করে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিলেন- সেটা দেখতে চেয়েছি।
নিয়ম-নীতির প্রোটোকল আর তাঁর আগে রাজপ্রাসাদে কে কেমন করে সেগুলো মেনে চলেছেন এসব বাধ্যবাধকতার যাঁতাকলে পিষ্ট মানুষদের দেখেছি। এরপর ডায়ানা কীভাবে অবাধ্য হতে শুরু করলেন, অসহনীয় নিয়ম-কানুন মানতে অস্বীকৃতি জানালেন, বিপজ্জনক ঝুঁকি নিচ্ছিলেন- লক্ষ করার চেষ্টা করেছি। ১৯৯২ সালের জুন মাসে সানডে নিউজপেপার-এ অ্যান্ড্রু মরটনের গ্রন্থ ‘ডায়ানা’-তে যেভাবে একের পর এক ডায়ানার জীবনের সত্য ঘটনাগুলো প্রকাশিত হতে থাকে- সেগুলো ছিল ব্যক্তিগত পর্যায়ের। ডায়ানার আচার-ব্যবহারে বেপরোয়া ভাব-অনমনীয়তা এসব প্রকাশ হতে থাকে। ফলে, এতদিনের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় সংস্থাপনের বদনাম হতে থাকে। সত্যিকার অর্থে সেগুলো ছিল অপবাদ। এই কারণে বাস্তবে ডায়ানা জেদী আর অবাধ্য হতে থাকেন। এমনকি তাঁর ‘রয়্যাল হাইনেস’ উপাধি নাকচ করার পূর্ব পর্যন্ত তিনি রাজমর্যাদার দ্বারা বিভিন্ন বিষয়ে বাধ্য থাকতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তাঁর প্রতিদিনের জীবনেও সেই দুর্মর, অনমনীয় ভাব প্রকাশ পেতে থাকে। যেমন, ১৯৯৩ সালের বসন্তকালে অস্ট্রেলিয়ায় ছুটির দিনে স্কী করতে গিয়ে সিকিউরিটি অফিসারের নজর এড়িয়ে হোটেলের ব্যালকনি থেকে বরফের স্তূপের ওপর ঝাঁপ দেন তিনি। গুজব ওঠে সেখানে তিনি প্রেমিকের সঙ্গে রাত কাটাচ্ছিলেন। বোঝাই যায়, তিনি পুলিশের পাহারাকে ঘৃণা করতেন। কারণ, তাঁর ওপর নিবদ্ধ ছিল পুলিশের গোয়েন্দা-চোখ। নিজের ইচ্ছেমতো চলার কোনো স্বাধীনতা তার ছিল না। এ থেকে তিনি মুক্ত হতে চেয়েছিলেন।
দ্বিতীয় যে বিষয়টা আমাকে টেনেছিল- তা হচ্ছে ডায়ানার দুর্বিসহ জীবন। সেজন্যেই অসংখ্য মানুষ সমব্যথী হয়েছিল তার ব্যথায়। ডায়ানার আহার-ব্যাধি অথবা স্বামীর পরকীয়া, বিশ্বাসঘাতকতা- যে কারণেই হোক না- মানুষের বিপুল ভালোবাসা পেতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। এর আগে রাজপরিবারের কেউ তাঁর মতো এতটা সহানুভূতি আর মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেন নি।
পৃথিবীর ‘সবচে’ সুন্দরী রমণী হয়েও স্বামীর দ্বারা প্রত্যাখাত ছিলেন ডায়ানা। স্বাভাবিক কারণেই মানুষ তার বেদনায় সহমর্মী হয়ে ওঠে। টিনা ব্রাউন ডায়ানার আত্মজীবনী লিখতে গিয়ে বলেছেন, ‘বেদনাই তাঁকে উজ্জ্বলতা দিয়েছে, আলোকিত করেছে।’
তৃতীয়ত, যে-ব্যাপারটা আমাকে মুগ্ধ করেছে তা হচ্ছে দম-আটকানো সেই পরিবেশ থেকে, জীবন থেকে পালানোর জন্য ডায়ানার যে ঐকান্তিক প্রচেষ্টা- সেটা। যদিও মানিয়ে নেয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন তিনি। এমন তীব্র-সতর্কাবস্থা, চাপ ছিল তাঁর ওপর যে প্রচণ্ড মানসিক শক্তি না থাকলে কবেই তিনি শেষ হয়ে যেতেন।
অনেক সময় তার পক্ষে তা চেপে রাখা সম্ভবও হয়নি। উনিশশ’ পঁচানব্বই সালে প্যানারোমার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ডায়ানা বলেছিলেন, ‘বিয়ের প্রথম দিকে কিছু বন্ধু বলেছিল আমি অস্থির, অসুস্থ। আমার এমন একটা বাড়িতে থাকা প্রয়োজন যেন আমি সেরে উঠি। কারণ, লোকজনের সামনে আমি কখনো কখনো ওদের অপমান আর লজ্জার কারণ হয়ে উঠছিলাম।’
কিন্তু তাদের সেই উদ্দেশ্য সফল হয় নি। ডায়ানাও ওষুধপত্র খেতে অস্বীকার করেন। তবে যখন মানসিক চাপে জর্জরিত থাকতেন, সেই সময়গুলোতে বিকল্প থেরাপি নিতেন। এতে তিনি আসক্তও হয়ে পড়েন। এই থেরাপিতে আবার কাজও হতো।
সহজ-সরল, সাধারণ একটা জীবনের স্বপ্ন দেখতেন ডায়ানা। প্রেমিকদের সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর মতো খেলাটা পছন্দ করতেন তিনি। রান্নাবান্না, কাপড় ইস্ত্রি করা এসব ছিল তাঁর পছন্দের কাজ।
পাকিস্তানি হৃদরোগ চিকিৎসক হাসনাত ছিল তাঁর প্রেম। তিনি যখন লন্ডনের সোহোয় রনি স্কট জ্যাজ ক্লাবে তাঁকে নিয়ে ঘুরতে যান, বাইরে সাধারণ জনতার সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন ডায়ানা। কালো পরচুলা আর গগলস পরে ছদ্মবেশে ঘুরতেন বলে কেউ তাঁকে চিনতে পারে নি। ভীষণ আনন্দ পেয়েছিলেন সেইসব দিনগুলিতে।
তিনি ভেবেছিলেন, অন্য কোনো দেশে গিয়ে বাস করলে যে প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকছেন, তা থেকে বাঁচতে পারবেন। তিনি অন্যান্য দেশের মধ্যে অ্যামেরিকার কথাও ভেবেছিলেন, যেখানে গেলে তাঁর মতো সেলিব্রেটি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারবে। আমি তাই ভাবতে থাকি- এরকমটা হতেও তো পারতো। যদি হতো এমনটি… তাহলে?
ডায়ানার সঙ্গে অনেক মিল থাকলেও আমার উপন্যাসের লিডিয়া চরিত্রটি পুরোটাই কাল্পনিক। বাস্তব রাজকন্যার সঙ্গে লিডিয়ার ছোট ও বড় অনেক পার্থক্য আছে। একটা বড় পার্থক্য হচ্ছে লিডিয়া পেরে গেলেও ডায়ানা কোনওদিনও তাঁর প্রাণপ্রিয় দুই ছেলেকে ছেড়ে থাকতে পারতেন না। লিডিয়া তাঁর যে সাজানো মৃত্যু ঘটিয়েছেন, তা থেকেই সেটা স্পষ্ট হয়েছে।
লোকে লিডিয়া বা ডায়ানার কথা যা-ই ভাবুক না কেন- ডায়ানাকে নিন্দা অথবা ভক্তি যা-ই করুক না কেন- ডায়ানা যে এক নিবেদিত প্রাণ মা ছিলেন- এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ ছিল না। যদিও বন্ধুদের তিনি মাঝে মাঝে বলতেন সন্তানদের মায়া কাটিয়ে কোথাও চলে যাবেন।
সেটা ছিলো ১৯৯৫ সাল। ডায়ানা তাঁর খানসামা পল বারেলকে একটা চিরকুটে লিখেছিলেন, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব রাখে এরকম একজন ‘আমার গাড়ির ব্রেক-ফেইল আর মাথায় গুরুতর আঘাত দেখিয়ে দুর্ঘটনার পরিকল্পনা করছে।’
আমার গল্পের নায়িকা কেবল সন্দেহই করেন না, সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করেন যে গুপ্তচর বিভাগের লোকেরা তাঁকে গোপনে মেরেও ফেলবে। লিডিয়ার যখন স্নায়ুবৈকল্যদশা- তখন তিনি ভাবছেন এবং বিশ্বাসও করছেন- মৃত্যুটা নকল হলে একদিন তাঁর সন্তানেরা মায়ের সঙ্গে মিলিত হতে পারবে। এখন ভাগ্য নিজের হাতেই তুলে নিতে হবে।
বেশ ক’বার লুকিয়ে থেকে শেষে অ্যামেরিকার ছোট্ট এক শহরে বসবাস করতে শুরু করেন তিনি। সেখানে কাজ, বন্ধুত্ব আর নতুন এক জীবন খুঁজে পান। নতুন একটা লোকের সঙ্গে সম্পর্ক হয় তাঁর। তিনি চেহারা বদলে ফেলেন- এরই মধ্যে সাজানো মৃত্যুর দশবছর পার হয়ে যায়।
ডায়ানা ভাবছিলেন যদিও সন্তানদের হারানোর ব্যাপারটা ভুতুড়ে ঠেকছে- অন্তত নিরাপদ লাগছে এই ভেবে যে, তাঁর এই গোপন যাপনের কথা কেউ জানতে পারবে না। ভয় শুধু পাপারাৎসিদের নিয়ে- ওদের কেউ দেখে ফেললে তাকে নিয়ে শুরু হয়ে যাবে ইঁদুর-বিড়াল খেলা।
অবশ্যই রূপকথার গল্পের মতই কল্পনা এটা। এই সূত্রটা আমি ডায়ানার পালিয়ে যাবার স্বপ্ন থেকে নিয়েছি। তবে আমার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে পরিচিতি-অন্বেষণ, নিজের পরিচয়কে খুঁজে ফেরা। মানুষ যা হয়ে ওঠে- কেন, কীভাবে তা ঘটে- যার দ্বারা সে প্রভাবিত হয়- কতটুকু তার সহজাত, জন্মগত, আর কতটুকুই বা পরিবেশলব্ধ- কীসের দ্বারা নির্ধারিত হয়- সেটা আমি খুঁজে পেতে চেয়েছি কল্পনার অনুধ্যান, প্রশ্রয়ী এই গল্পটি সৃষ্টির মধ্য দিয়ে।
বিভিন্ন চাপ আর নানা কারণে জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠলে মনে হতেই পারে, এই জীবন থেকে বের হয়ে নতুন করে আরেকটা জীবন শুরু করলে কেমন হয়? এটা কি অসম্ভব কিছু? রেগি পেরি সিন্ড্রোম যেমন : সমুদ্রসৈকত থেকেই শুরু হোক। সেখানে কাপড়-চোপড় ফেলে রেখে যাও, নিরুদ্দেশ হও। তারপর নতুন করে আবার শুরু করো জীবন।
জীবনের সমস্যাগুলোকে কি আসলেই ঝেড়ে ফেলা যায়? নাকি সম্ভব? আমি তারই অন্বেষণ করেছি। আর সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচে’ বিস্ময়কর নারীকে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে চেয়েছি এইভাবে। ডায়ানার মৃত্যুতে আমার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট মনে আছে আমার। সারাদেশের মানুষের মতো আমিও বিস্মিত হয়েছিলাম। প্রথমে বিশ্বাসই করতে চাই নি। মনে আছে- সেটা ছিল আগস্টের শেষ এক রোববার। সকালবেলা আমার স্বামী বেডরুমে এসে সেই খবরটা দিয়েছিলেন। আমি শুনে বলেছিলাম ‘নাহ! এ হতে পারে না! তুমি যে কী বলো না!’ দেশবাসীর মতো সারাদিন টেলিভিশনের পর্দায় আঁঠার মতো চোখ লাগিয়ে বসেছিলাম। এরপর দিন যায়, সপ্তাহ যায়- তবুও যেন স্বাভাবিক হতে পারছিলাম না।
জাতি সেদিন সার্বিকভাবে অনুভব করেছিল ডায়ানার মৃত্যুকে। ফুলের সমুদ্র দেখেছিল সবাই, হাতে লেখা নোট, মোমবাতি জ্বালিয়ে জেগে তাঁকে স্মরণ, শোকবুকে স্বাক্ষরের জন্য লম্বা লাইন- সব মনে আছে আমার। কেউ কেউ আবার শোকবইয়ে ‘মানসিক ফ্যাসিবাদ’ ঢেলে দিয়েছিল তাদের মন্তব্যে- যা পুরো দেশকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল।
কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিল- ডায়ানা কি সত্যি সত্যি সংবাদমাধ্যমের শিকার হয়েছিলেন নাকি নিজের স্বার্থেই বারবার সেগুলোকে ব্যবহার করে গেছেন?
বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের শ্রদ্ধেয় অনেকের মতে, ডায়ানা ছিলেন ভীষণ আহ্লাদী এক মেয়ে, প্রগলভ, বাচ্চাদের মতো। ফ্যাশন-পাগল, পণ্য-সর্বস্ব। ‘ও-লেভেল’-এর সবকটি সাবজেক্টে যিনি ডাব্বা মেরেছেন আর প্রচলিত নিয়মে ভদ্রমহিলাদের সঙ্গে লাঞ্চ খেতে বসে চ্যারিটি নিয়ে অল্প-বিস্তর কথা বলেছেন।
অতীতের দিকে ফিরে তাকালে লজ্জাই পেতে হয়। আমরা ব্রিটিশরা প্রতিকূল অবস্থায় এভাবেই সাহস আর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলি।
ডায়ানাকে অন্যায়ভাবে দোষারোপ করা হয়েছে। এ জন্য সেই থেকে আমরা শোক করেই চলেছি। কেউ কেউ তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় জনতার প্রবল আবেগকে তিরষ্কার করে বলেছে- ‘এক্স-ফ্যাক্টর’-এ লোকজন যেন কান্নার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। জনগণ কীরকম আচরণ করবে মৃত্যুর পরও যেন ডায়ানার নিয়ন্ত্রণ ছিলো তার ওপর- এরকম অদ্ভুত এক ক্ষোভ দেখিয়েছিল কেউ কেউ।
এরপরও আমরা ব্যর্থ হয়েছি- এটা আমার ধারণা। ওয়েলসের রাজকন্যা যখন সরাসরি তাঁর খাদ্য-ব্যাধি বুলিমিয়ার কথা উল্লেখ করলেন- যখন তিনি একজন এইডস রোগীর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন আর যখন তিনি টেলিভিশন প্রোগ্রামে গিয়ে রাজপ্রাসাদের উঁচু দেয়ালের ভেতরে, নিচটা আসলে কীরকম তা ফাঁস করে দিলেন-তিনি তো আসলে তখন চিরাচরিত রীতির বিরুদ্ধেই বলছিলেন, প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন গোষ্ঠীভিত্তিক বিধানের, একটা সমগ্র সংস্থাপনের বিরুদ্ধে ছিল তাঁর প্রতিবাদ।
ফলে, এমন কিছু কাজ হয়েছিল যার জন্য সাহসের প্রয়োজন ছিল। বাধার প্রাচীর ভেঙে ফেলেছিলেন তিনি। এখন যদি বিবেচনার সঙ্গে এই স্বাধীনতার সদ্ব্যবহার আমরা করতে না পারি, তাহলে সেই ব্যর্থতা অবশ্যই তাঁর নয়- আমাদের নিজেদের।
ডায়ানা যে আমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ হয়ে আছেন, শুধু তা-ই নয়- নিঃসন্দেহে প্রাচীন প্রথাসিদ্ধ অনুপযুক্ত আদর্শকে ভেঙেচুরে নতুন আদর্শ গঠনেও তিনি আমাদের আইকন হয়ে আছেন।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close