Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ মনিরুল ইসলাম / ‘ফুটন্ত গোলাপ’, একজন কাসেম বিন আবুবাকার এবং কিছু জ্বলন্ত প্রশ্ন

মনিরুল ইসলাম / ‘ফুটন্ত গোলাপ’, একজন কাসেম বিন আবুবাকার এবং কিছু জ্বলন্ত প্রশ্ন

প্রকাশঃ April 29, 2017

মনিরুল ইসলাম / ‘ফুটন্ত গোলাপ’, একজন কাসেম বিন আবুবাকার এবং কিছু জ্বলন্ত প্রশ্ন
0
4

মনে মনে একটি মেয়ে খুঁজছিলাম। যে-মেয়ের থাকবে ‘টকটকে ফর্সা গোলগাল মুখ’, ‘টসটসে রক্তিম গোলাপী ঠোঁট’, ‘আপেলের মতো নিটোল গোলাপী গাল’; আর যার ‘তুলতুলে নরম হাতটা’ ধরলে ‘থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে জ্ঞান’ হারানোর উপক্রম হবে। প্রতিটা পরশে অনর্থক কেঁপে উঠে প্রমাণ দিতে চাইবে- এই দেখ : এর আগে কোনো পুরুষ আমাকে ছোঁয় নি। কিন্তু তাকে আর পেলাম কই! পাবোই-বা কী করে? আমি যদি রবীন্দ্রযুগে পড়ে থাকি, তবে কি হবে? আমাকে আসতে হবে বোরখাযুগে। তবেই-না আমি সেই ‘সাক্ষাৎ বেহেস্তের হুর’কে খুঁজে পাব। ওই যে বরফঅলাদের মাইকে একটা গান বাজে না- ‘বোরখাপরা মেয়ে পাগল করেছে, একটা বোরখাপরা মেয়ে পাগল করেছে’- গানটি কি আর এমনি এমনি বাজে?

বোরখাপরা মেয়েদেরকে আমি অবশ্য ‘সেলিমের’ মতো অপছন্দ করি না। বরং বলতে গেলে কী একটু বেশি আকর্ষণ বোধ করি। তবে সিঁড়ির কাছে ‘লাইলীর’ মতো কারো সঙ্গে ধাক্কা না-লাগায় আজও কোনো ফুটন্ত গোলাপ-এর রূপমুগ্ধ হবার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কিন্তু সেলিমের হয়ে গেল! আপনি হয়তো ভাবছেন- আমি সেলিমকে হিংসা করছি। যদি তা-ই ভাবেন, তবে ঠিকই ভেবেছেন। কী করব, বলুন! ‘অমন বেহেস্তের হুরের মতো সুন্দরী ও নিষ্পাপ মেয়েকে’ পাবার জন্য ‘সুলতানা’র মতো একটি মেয়েও যদি বলতে পারে- ‘সেলিম খুব ভাগ্যবান। তার ভাগ্যকে আমি মেয়ে হয়েও হিংসা করছি।’ তবে আমিও কী একটু-আধটু হিংসা করতে পারি না? শুধু কী সেলিমের? সঙ্গে কাসেম বিন আবুবাকারের সৌভাগ্যেও হিংসা হচ্ছে। ইশ রে! কী সৌভাগ্য! বৃদ্ধাবস্থায়ও বিশ্বমিডিয়ার সামনে আর্দ্রকণ্ঠে বলতে পারছেন- ‘মেয়েরা আমাকে নিজেদের রক্ত দিয়ে লেখা চিঠি পাঠায়। অনেকে আবার আমাকে বিয়ে করার জন্য পাগল।’

তো, ‘প্রথম আলো’ ও ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এর পাতায় এএফপি’র রিপোর্টগুলি যখন পড়লাম, তখন তাঁর ফুটন্ত গোলাপ উপন্যাসটি পড়ার জন্য উৎসুক হয়ে উঠলাম। তক্ষুনি মুন্সিপাড়া (দিনাজপুরের) ছুটে গিয়ে বইয়ের দোকানগুলোতে বইটির খোঁজ করলাম। কিন্তু পেলাম না! যাহ! ‘মোল্লাদের লেখা উপন্যাস বিক্রি হয় না’ কথাটি সত্য হয়ে গেল নাকি! তাই বলে হাল ছাড়লাম না। স্টেশনে হকারদের দোকানে ছুটে গিয়ে খুব খোঁজাখুঁজি করলাম। অবশেষে পেলাম, বড্ড বেগ পেয়েই বইটি খুঁজে পেলাম। দোকানি বেচারি বইটিতে জমে-ওঠা ধুলো ঝেড়ে, পঁচাত্তর টাকা গুনে নিয়ে, বইটি আমার হাতে দিলেন। আমি অতিশয় আনন্দে ওখানেই বইটির পাতা ওল্টাতে শুরু করলাম। আর ওখানেই সঙ্গে সঙ্গে আমার আনন্দটা মাটি হয়ে গেল!

লজ্জার কথা কী বলব, উপন্যাসটির প্রথম পরিচ্ছেদের প্রথম বাক্যের প্রথম বানানটিই ভুল! অথচ, সেটি ফুটন্ত গোলাপ-এর সপ্তবিংশতিতম মুদ্রণ! কী আর করা! নাই মামার থেকে কানা মামা ভালো ভেবে বইটি নিয়ে ফিরে এলাম ভালো করে পড়বো বলে।

এবার বইটি পড়ার পালা। আমার যেন আর তর সইছে না। অবসর নিয়েই পাতা ওল্টাতে লাগলাম। আর বাক্যে-পর-বাক্যে থমকে যেতে থাকলাম ভুল বানানের ছড়াছড়ি দেখে। শেষমেশ পেন্সিল দিয়ে ভুলগুলো মার্ক করতে-করতে উপন্যাসটি পড়ে শেষ করলাম। তারপর গুনে দেখলাম ১৩৮ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসটিতে ৬৫০টিরও বেশি বানান ভুল! এছাড়া যতিচিহ্ন ও সন্ধি-সমাস-সংক্রান্ত ভুলভাল তো আছেই। বাক্যেরও যা ছিড়ি, পড়তে পড়তে চমকে উঠছিলাম বার বার!

আচ্ছা, ওসব এখন থাক! কী পড়তে গিয়ে কী পড়লাম, সেটাই বরং শেয়ার করি! আগেই বলে নিচ্ছি- আমি কোনো সাহিত্য-সমালোচক নই, তাই ফুটন্ত গোলাপ আদৌ কোনো সাহিত্যকর্ম কী-না, সে-বিষয়ে আমি আলোকপাত করতে চাইছি না। যদিও আমি এটিকে উল্লেখযোগ্য কোনো সাহিত্যকর্ম হিসেবেই পড়া শুরু করেছিলাম। বিজ্ঞজনরা বলবেন, কেন? কেননা বইটা তো উপন্যাস, তাই সাহিত্যকর্ম হিসেবে পড়বো না কেন! আসুন তাহলে বইটা কেমন উপন্যাসপাঠের দিক থেকে পড়ি। এখানে আমি আসলে আমার পাঠোপলব্ধিই শেয়ার করতে চাইছি।

পত্রিকায় ও ‘বিবিসি বাংলা’তে পড়েছিলাম, ‘ইসলামী ভাবধারায় এই মূল্যবোধ-নির্ভর সাহিত্যই তার পাঠকপ্রিয়তার মূল কারণ।’ কিন্তু উপন্যাসটির ভাষায় ফুটে-ওঠা ভাবধারা দেখে ভ্যাবাচাকা খেলাম। একটি জনপ্রিয় ইসলামি উপন্যাস পড়তে গিয়ে যখন পড়ি- “রেহেনা স্যাণ্ডো ব্লাউজ ও শাড়ী পড়েছে। সে শাড়ীটা ভালভাবে সেঁটে নিল। আর সালমা টাইটফিট সালওয়ার কামিজ পরেছে। সরু ওড়নাটা বুকের মাঝখান দিয়ে এঁটে পিছনের দিকে বেঁধে নিল। তাদের ভরাট যৌবন পুষ্ট শরীর খেলার ছন্দে উত্তাল তরঙ্গের মত ঢেউ খেলতে লাগল। ছেলেদের মধ্যে অনেকে খেলা বাদ দিয়ে তাদের দু’জনের যৌবনের উত্তাল তরঙ্গ দেখতে লাগল” (চতুর্থ পরিচ্ছেদ, ৪৭ পৃষ্ঠা); কিংবা “রুবীনার নরম তুলতুলে যৌবন পুষ্ট শরীরের স্পর্শে মহিমের শরীরের অণুকণাগুলো সতেজ হয়ে উঠল। ভাবল, আজ তার মনের ইচ্ছা পূরণ হবে। সে একটা হাত দিয়ে রুবীনার মুখটা নিজের মুখের কাছে এনে ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে বলল, এত ভয় পাচ্ছ কেন? আমিতো রয়েছি। তারপর তার নিচের ঠোঁট চুষতে লাগল। রুবীনা প্রথমে ভয় পেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেছিল, কিন্তু মহিম যখন তার ঠোঁট চুষতে লাগল তখন তার যৌবন জোয়ার উত্তাল তরঙ্গের মত প্রবাহিত হতে লাগল। তার অবস্থা দেখে মহিম তখন পাগলের মত বুকে চেপে ধরে পীষে ফেলার চেষ্টা করল। রুবীনা বলল, প্লীজ মহিম, অতজোরে চাপ দিয়ো না, আমার লাগছে।” (একাদশ পরিচ্ছেদ, ১৩৩ পৃষ্ঠা)

প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ, এত দূর পড়তে পড়তে ভিমড়ি খাওয়ারই অবস্থা আমার। এরকম না হলে আবার উপন্যাস-পড়া! অবাক না-হয়ে কী উপায় আছে? এ যে ইসলামি ভাবধারায় রচিত উপন্যাস! এ-উপন্যাসেও লেখক কী চমৎকারভাবে কাম-সমকাম আর আদিরসের ভিয়েনে পাঠককে কাহিনির কেন্দ্রে টেনে নিলেন। ষোলকলা চৌষট্টি কলাকেও ছাড়িয়ে গেল।

হ্যাঁ সমকামিতা, পাঠক। ফুটন্ত গোলাপ ওরফে লাইলী আরজুমান বানুর শরীর তিনি এতটাই লোভনীয় করে ফুটিয়েছেন যে, তাতে শুধু সেলিমই নয়; রহিমা ও সুলতানাও তাকে বিয়ে করার আকাঙ্ক্ষা পোষণ ও প্রকাশ করে! রহিমা নিঃসঙ্কোচে লাইলীকে বলে- “সত্যি কথা বলতে কী, আমি যদি ছেলে হতাম, তবে যেমন করে হোক তোমাকে বিয়ে করতামই করতাম। আল্লাহপাক এত রূপ তোমাকে দিয়েছে কী বলব ভাই, আমি মেয়ে মানুষ হয়েও তোমাকে দেখে তৃপ্তি মিটে না।” (চতুর্থ পরিচ্ছেদ, ৪০ পৃষ্ঠা);  আর নবম পরিচ্ছেদে (১১৫ নম্বর পৃষ্ঠায়) দেখি- সুলতানা লাইলীর “গাল টিপে দিয়ে বলল, সত্যি আল্লাহ তোকে এত রূপ দিয়ে বানিয়েছেন, সে আর কি বলব। তিনি যদি আমাকে পুরুষ বানাতেন, তা হলে তোকে হাইজ্যাক করে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করতাম।”

কিন্তু ভয়েই হোক কিংবা অন্য কিছু, রহিমা কিংবা সুলতানা- দুজনের কেউই তাদের কামনা চরিতার্থ করতে পারেনি। লেসবিয়ান হবার সাধ তাদের জেগেছিল বটে; কিন্তু পূরণ হয়নি। এই যে ইসলামি ভাবধারার মধ্যে এই লেখক লেসবিয়ানিজমের ধারণা ঢুকিয়ে দিলেন, এটাকে আমরা কী বলব? বলতে গেলে সম্ভবত এটাই বলতে হয়- তিনি মুসল্লিদের ডেকে মদের পেয়ালা এগিয়ে দিয়ে বললেন : ‘বিসমিল্লাহ বলে পান করুন, সওয়াব হবে!’

না, পাঠক, এটা আমার কল্পনা নয়, লেখকের কল্পনা। তিনি একজন তরুণীকে হোটেল ইন্টারকনের নির্জন কেবিনে এক তরুণের সঙ্গে বসিয়ে দই-মিষ্টি খাইয়েছেন; এবং তার মুখ দিয়েই বলিয়েছেন- “ইসলামের আইন অনুযায়ী যুবক যুবতীদের নির্জনে দেখা করা হারাম” (তৃতীয় পরিচ্ছেদদ, ৩৩ পৃষ্ঠা)। কিন্তু লেখক দেখালেন, ছোঁয়াছুঁয়ি না-হলে প্রেম জমে ওঠে না।

পরের পরিচ্ছেদেই কথার সুর পালটে রহিমাকে দিয়ে বলালেন- “যার মধ্যে সবকিছু বিলীন করে দিয়েছ এবং যাকে স্বামী বলে মনে প্রাণে মেনে নিয়েছ, তার সন্তুষ্টির জন্য একটু বেড়াতে গেলে পাপ হবে না।” (চতুর্থ পরিচ্ছেদ, ৪৫ পৃষ্ঠা)। এর একটু পরে, ওই পৃষ্ঠাতেই আমরা দেখি- প্রাইভেট কারে বসিয়েই সেলিম লাইলীর ডান হাতে চুমু খেল; আর “লাইলী কেঁপে উঠল। তারপর হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে চুমো খাওয়া হাতটা নিজের ঠোঁটে চেপে ধরল।”

হ্যাঁ, এভাবেই শুরু হল। অথচ এই একই চুমো যখন অন্য কেউ খায়, তখন সে হয়ে যায় নোংরা, চরিত্রহীন, ইসলাম-ভ্রষ্ট মানুষ। উপন্যাসটিতে রুবীনা তাই যখন মনিরুলের সঙ্গে বাইরে যায়, তখন সে হয়ে যায় বিপথগামী। অথচ চেনাজানার শুরুতেই লাইলী যখন সেলিমের সঙ্গে গভীর রাত করে বাড়িতে ফেরা শুরু করল, তখনও কিন্তু সে নিষ্পাপ বেহেস্তী হুর! কেন?

কারণ শুধু একটাই- লাইলী যখন ডেটিংয়ে যায়, তখন নীল বা গ্রিন রঙের শাড়ি-ব্লাউজের ওপর বোরখা পরে, যা রুবীনা-রেহানারা পরে না। অবশ্য নবম পরিচ্ছেদে এসে আমরা দেখি- সমুদ্র–সৈকতে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া লাইলীকে নিজের হোটেলরুমে নিয়ে এসে ভেজা বোরখাটা খুলে দেয় সেলিম। পরে লাইলীর জ্ঞান ফিরে এলে দুজন দুজনাকে জাপটে ধরে। লেখকের ভাষায়, “সে (লাইলী) ভুলে গেল এখনও তাদের বিয়ে হয় নি।” (১১০ পৃষ্ঠা)। সত্যিই তো, শরীরের টান বড়ো টান; এক নিমিষেই সবকিছু ভুলিয়ে দিতে পারে- লেখক এরকম দৃশ্য লিখে এ-কথাটিই বোঝাতে চেয়েছেন। এভাবে একের-পর-এক উদাহরণ দিতে গেলে ছোট্ট এই লেখায় কুলাবে না; একটি সমালোচনা পুস্তিকা লিখতে হবে।

তবে দু’জন প্রেমিক-প্রেমিকাকে প্রেমের সাগরে ডুবিয়ে তাদের দুজনকে বিয়ের বাঁধনে বেঁধে দেন লেখক; এবং তারপরই আমরা আবিস্কার করি ‘বেহেস্তী জেওর’-এ দীক্ষিত এক গৃহবধূ লাইলীকে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা যে-ধরনের নারীকে বুকে জড়িয়ে ঘুমানোর জন্যই ঘরে আনে, সে-ধরনের এক নারীই লাইলী। যে স্ত্রী ভক্তিভরে তার স্বামীকে বলে- “তুমি যে আমার শাহানশাহ। আর আমাকে আল্লাহপাক সেই শাহানশাহর চরণের সেবা করার জন্য আইনের মাধ্যমে বেঁধে দিয়েছেন।” আর বাসররাত থেকে বেরিয়ে সকালবেলা স্বামী যখন বলল,“’বিয়ের পর মেয়েদের আগের জীবনের সবকিছু পরিত্যাগ করে স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখার কাজ করবে” (নবম পরিচ্ছেদ, ১১৯ পৃষ্ঠা); তখন লাইলী আর কিছু বলতে পারল না। সেলিমের পায়ে সালাম করে স্টেনোর চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে দিল। বহু কষ্টে পাওয়া এই চাকরিটা ছেড়ে দেয়ার পরও তার মনে কোনো মনকষ্ট জাগল না! যদিও সে একবার তার মাকে কথা দিয়েছিল যে, সে তাদেরকে চাকরি করে খাওয়াবে (২৬ পৃষ্ঠা)। অথচ বিয়ের পর তার বিধবা মায়ের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে স্বামীর কথায় চাকরিটা ছেড়ে দিল! এই একটি কারণে তার মনটা অন্তত একটু খারাপ হবার কথা। কিন্তু না, হল না; বরং সে-ই কিনা হাসিমুখে বলছে : “স্ত্রীর কর্তব্য স্বামীর হুকুম মেনে চলা।”(১২২ পৃষ্ঠা)

এভাবেই চলতে থাকে লাইলীর স্খলিত সংসারজীবন। আর এ-জীবনের দীক্ষা দিতে থাকে রেহানাকে। নিজের হাতের ‘বেহেস্তী জেওর’ বইটি সে রেহেনার হাতে তুলে দিয়ে বলে- “এটা পড়ছিলাম। তুমিও পড়ো। এতে মেয়েদের অনেক শেখার জিনিস আছে।”

আছে বৈকি, অনেক কিছুই শেখার আছে। এই বইতে বেশ স্পষ্ট করে বলা হয়েছে-“সুতরাং স্ত্রীর প্রানপন চেষ্টা করতে হবে যাতে সে স্বামীর মন অধিকার করে থাকতে পারে। এটার উপর স্বামীর চোখের ইশারায় চলা। স্বামী যদি হুকুম করে যে, সারা রাত হাত বেধে দাড়িয়ে থাক, তবে সে তৎক্ষণাৎ তাই করবে। কেননা, দুনিয়া ও আখেরাত দোজাহানের সুখ লাভ নির্ভর করে স্বামীর মনস্তুষ্টির উপর।…স্বামীর মতের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলবে না বা কোনো কাজ করবে না। এমন কি, স্বামী যদি দিনকে রাত এবং রাতকে দিন বলে, তবে তারও প্রতিবাদ করবে না।” (বেহেশ্তী জেওর, দ্বিতীয় জিলাদ, চতুর্থ খণ্ড, ৫৩ পৃষ্ঠা; জুলাই-১৩ খ্রি.)।

হ্যাঁ; একজন উচ্চশিক্ষিতাকে স্খলিত জীবনে উদ্বুদ্ধকরণই লেখক কাসেম বিন আবুবাকারের মূল উদ্দেশ্য, এটা বুঝতে বেগ পেতে হয় না। নারী-স্বাধীনতাকে তিরস্কৃত করাও তাঁর লক্ষ্য, অভিরুচি (তৃতীয় পরিচ্ছেদ, ৩৯ পৃষ্ঠা)। আর আশ্চর্যের বিষয়- এদেশের অসংখ্য তরুণীই নাকি তাঁর বই পড়ে তাঁকে প্রেমপত্র লেখে; আর তাঁকে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে যায়!

নারীর স্খলন, ধর্মীয় বিভ্রান্তি, ধর্মীয় গোঁড়ামি, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই যাঁর লেখার আদর্শ, মতাদর্শ; মধ্যযুগীয় ভাবধারার সেই লেখককে নিয়ে অকস্মাৎ বিশ্বমিডিয়ার এমন মাতামাতিও আশ্চর্যের বিষয়; বেশ রহস্যজনক বৈকি!

যে লেখক তার উপন্যাসে বেশ স্পষ্ট করেই বলেন- “পিতা-মাতা হোক আর স্বামী-স্ত্রী হোক, যে কেউ আল্লাহ ও রাসূলের (দঃ) হুকুম বাইরে আদেশ করলে সেক্ষেত্রে আল্লাহ ও রাসূলের (দঃ) হুকুম অগ্রগণ্য। এমন কি জেহাদের ময়দানে ছেলে পিতা মাতার বিরুদ্ধে এবং স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে এবং আল্লাহর হুকুম মোতাবেক এবং স্ত্রী স্বামীকে হত্যা করতে পারে। ইতিহাসে এর বহু প্রমাণ আছে।” আর প্রমাণ হিসেবে যিনি ম্যাট্রিকে সব বিষয়ে লেটার পাওয়া একটা ছেলেকে বাড়ি থেকে ধর্মের পথে পালিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন- তিনিও কী পরোক্ষভাবে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদকে উৎসাহিত করছেন না? আর জেনেছি, এদেশে তাঁর লক্ষাধিক পাঠক, সবাই মূলত মাদ্রাসা-পড়ুয়া, তাদের মনজমিনে যিনি এই বিষাক্ত বীজ বপন করে দিচ্ছেন, দিনশেষে তিনিও কী-না লেখক হিসেবে বৈধতা পেলেন। তাও দেশীয় মিডিয়া তো বটেই, বিশ্বমিডিয়াতে!

ফুটন্ত গোলাপ-এর সাহিত্যমান নিয়ে কোনো আলোচনা করতে আমি চাইনি; চেয়েছি আমার পাঠোপলব্ধি শেয়ার করতে। পুরো বইটি পড়েও যখন আমি বুঝতে পারলাম না, এককথায় কাসেম বিন আবুবাকার কী বোঝাতে চেয়েছেন, তখন হঠাৎ করেই আমার চোখ দুটো আটকে গেল বইটির প্রচ্ছদের ওপর। আরে! প্রচ্ছদই তো বইটির সারমর্ম বলে দিচ্ছে। একজন বোরখাহীনার ডান গালটা ঢাকা আছে দুটি ফুলে- একটি লাল, অন্যটি হলুদ। সারমর্মটা হচ্ছে এই “ফুটন্ত গোলাপ” বইটিতে লেখক রক্তারক্তির কথা বলতে চেয়েছেন হলুদ ভাষায়, যার মূল ভিকটিম নারী। মিডিয়াও কী এতে অনেক হলুদাভ হয়ে গেল না! কী বলবেন, মিডিয়া-বিশেষজ্ঞ, পেশাদার সাহিত্য-সমালোচক আর নারীমুক্তির জন্য যারা লড়াই করছেন সেই নারীবাদীরা?

[মূল টেক্সটের বানান অবিকৃত রাখা হয়েছে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(4)

  1. এই যে এতো গুরুত্ব প্রদান! আখেরে আমরা তো কাশেম বি আবু বাকারের ক্যানভাসার হয়ে উঠছি। কলোনিয়াল বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসতে না পারার ফসল এইটা। কে বা কারা টাকার বিনিময়ে একটা নিউজ করেছে সেটা নিয়েচেতো হৈ চৈ করার কিছু আছে বলে মনে করি না। তীরন্দাজ এই কাজটা করছে দেখে আরো হতাশ হলাম।

    1. আশরাফ জুয়েল ভাইয়ের সাথে আমি একমত।

  2. লেখাটা পড়ে খুব ভাল লাগলো। এইভাবে উপন্যাসটির অইসলামিক ভুল কথাগুলো তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ দোস্ত। একজন নারী পাঠক হিসেবে আমারও প্রশ্ন বিশিষ্ট এই লেখক সত্যিই কি নারীমুক্তি চেয়েছেন?

  3. এই লেখা প্রকাশের মধ্য দিয়ে নিয়মিত পাঠক হিশেবে আমার কাছে তীরন্দাজ নীচে নেমে গেলোই বৈকি!
    ডেইলিমেইলের রিপোর্টটি স্পষ্টতই ছিলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।হতে পারে কোনো মোটা অঙ্কের বিনিময়ে ঘটেছে এই কাণ্ড,অথবা বাংলা সাহিত্য নিয়েই সুপরিকল্পিত কোনো উদ্দেশ্য ছিলো,কিংবা এমন একটি প্রকৃত ট্রিভিয়াল ঘটনাকে অলংকারে সাজিয়ে,বিভিন্ন অপব্যাখ্যা হাজির করে পত্রিকাটি আলোচিত হতে চেয়েছে।
    আর আমরা এই বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকারান্তরে তাদের উদ্দেশ্যকেই সফল করে দিচ্ছি।এই রিপোর্টের পর ইতোমধ্যে “ফুটন্ত গোলাপ” লেখকের বই বিক্রি বেড়ে গেছে,তা সোশ্যাল মিডিয়া দেখেই বুঝতে পারি।
    অনেকে দেখলাম কাসেম বিন আবু বাকারের লেখার ধরণকে সাহিত্যের ইসলামীকরণের চেষ্টা হিশেবেও চিহ্ণিত করছে এখন।কিন্তু এটা আসলেই ত্রুটিপূর্ণ অনুমান।ওর অধিকাংশ পাঠকই গ্রাম,বা মফস্বলের।এরা উপন্যাসে ইসলাম পেতে চায় না;ইসলামি ভাবাদর্শের উপন্যাসিকের উপন্যাস পেতে চায়,যা তারা তৃতীয় শ্রেণির ইরোটিকার মতো পড়বে এক হাতে এবং মাঝখানের ইসলামি বয়ান,উক্তিগুলো সচেতনভাবে এড়িয়ে যাবে।

    তীরন্দাজ থেকে এই ধরণের লেখা প্রত্যাশিত ছিলো না।

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close