Home কবিতা মল্লিকা সেনগুপ্ত > কবিতাগুচ্ছ >> সঙ্গে মল্লিকাকে নিয়ে সুবোধ সরকারের দুটি কবিতা

মল্লিকা সেনগুপ্ত > কবিতাগুচ্ছ >> সঙ্গে মল্লিকাকে নিয়ে সুবোধ সরকারের দুটি কবিতা

প্রকাশঃ March 27, 2018

মল্লিকা সেনগুপ্ত > কবিতাগুচ্ছ >> সঙ্গে মল্লিকাকে নিয়ে সুবোধ সরকারের দুটি কবিতা
0
0

মল্লিকা সেনগুপ্ত > কবিতাগুচ্ছ >> সঙ্গে মল্লিকাকে নিয়ে সুবোধ সরকারের দুটি কবিতা

 
[সম্পাদকীয় নোট : আজ মল্লিকা সেনগুপ্তের ৫৮তম জন্মদিন। আশির দশকের এই বাঙালি কবি অসাধারণ কিছু কবিতা লিখে গেছেন। নারীর বহুমাত্রিক উপস্থাপনা বাংলা কবিতার ধারায় তাঁর কবিতাকে যে অনন্য বৈশিষ্ট্যে উত্তীর্ণ করেছে, তার তুলনা বাংলা কবিতায় খুব বেশি পাওয়া যাবে না। মল্লিকার কবিতার ভাষার চালটা খুব সহজ, কিন্তু ভাবনার দিক থেকে গভীর। শুধু নারী নয়, সমসাময়িক নানা প্রসঙ্গকে গভীরভাবে ছুঁয়ে গেছে তিনি। এখানে যে কবিতাগুলি প্রকাশিত হলো, তাতেও দেখা যাবে সাম্প্রদায়িকতা থেকে জীবনানন্দ- কোনো কিছুই তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। আবার পুরুষের রচিত কবিতাবিশ্বের যে সীমাবদ্ধতা, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। ২০১১ সালের ২৮ মে ৫১ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি তীরন্দাজের শ্রদ্ধা।

মল্লিকার কবিতাগুলির সঙ্গে এখানে সুবোধ সরকারেরও দুটি কবিতা প্রকাশ করা হলো, যে কবিতা দুটি মল্লিকা এবং তাঁদের দাম্পত্য-জীবন নিয়ে লেখা। পাঠকদের আয়োজনটি কেমন লাগলো, জানালে খুশি হবো।]

 
সাম্প্রদায়িক

আমি      হতেই পারি সাম্প্রদায়িক
তবে       রাত্রিবেলা মাথার কাছে।
গান শোনাতে বসেন এসে
বেগম আখতার
আমি      হতেই পারি সাম্প্রদায়িক
তবে       ছোটবেলায় অসুখ হলে
ওষুধ দিয়ে সারিয়ে দিতেন
আমেদ ডাকতার

আমি      হতেই পারি সাম্প্রদায়িক
তবে       দিনের শেষে চ্যানেল খুলে
শারুখ খানের লম্ফঝম্ফ
দারুণ পিছুটান!
আমি      হতেই পারি সাম্প্রদায়িক
তবে       পাহাড়ি ট্রেন সবুজ বিকেল
ছাঁইয়া ছাঁইয়া সুরে মাতান
এ আর রহমান

আমি      হতেই পারি সাম্প্রদায়িক
তবে       গালিব এবং ওমর খৈয়াম
ছাড়ব না তো আর
আমি      হতেই পারি সাম্প্রদায়িক
তবে       বিদ্যুৎ আর গতি মানেই
বাইশ গজের সবুজ ঘাসে
শোয়েব আখতার

আমি      হতেই পারি সাম্প্রদায়িক
তবে       পর্দা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে
অভিনয়ের চরিত্রেরা
শাবানা আজমির
আমি      হতেই পারি সাম্প্রদায়িক
তবে       কেদার বদ্রী যত আমার
ততই কাশ্মীর

আমি      হতেই পারি সাম্প্রদায়িক
তবে       অভিনেতার মধ্যে প্রিয়
নাসিরুদ্দিন শা
আমি      হতেই পারি সাম্প্রদায়িক
তবে       সাম্প্রদায়িকতার পথে
দারুণ হিংসা।

 

আমার কবিতা আগুনের খোঁজে

আমার কবিতা আলোর চাতক, অন্ধকারের মুনিয়া
আমার কবিতা ছোট পরিবার, বাইরে বিরাট দুনিয়া
কবিতা আমার ঘরসংসার
নদী পাহাড়ের গল্প
আমার কবিতা পারমাণবিক
যুদ্ধ অল্প অল্প
কবিতা আমার ঘরের যুদ্ধ, যুদ্ধশেষের কান্না
আমার কবিতা গণধর্ষিতা, উনুনে চাপানো রান্না
আমার কবিতা দাঙ্গাশিবির
গুজরাট থেকে বাংলা
কবিতা আমার পড়তে বসেছে
অবনের বুড়ো আংলা
আমার কবিতা অসহায় যত পাগলি মেয়ের প্রলাপ
আমার কবিতা পোড়া ইরাকের ধ্বংসে রক্তগোলাপ
কবিতা আমার মেধা পাটকর
শাহবানু থেকে গঙ্গা
আমার কবিতা অলক্ষ্মীদের
বেঁচে থাকবার সংজ্ঞা
কবিতা আমার বিশ্বায়নের মার্জার সরণিতে
কবিতা আমার সুন্দরবনে হেঁটে যায় মধু নিতে
আমার কবিতা মৈত্রীমিছিল
সমানাধিকার কর্মী
আমার কবিতা পথে পথে ঘোরে
অসুখ সর্দিগর্মি
আমার কবিতা ফুটপাথ শিশু, গর্ভে নিহত কন্যা
কবিতা আমার ঝড় দুর্যোগ মহামারি ধ্বস বন্যা
আমার কবিতা যুদ্ধবিরতি
প্রথম চুমুর লজ্জা
কবিতা আমার গর্ভের কোষে
নবজাতকের তরজা
আমার কবিতা মণিপুর জুড়ে নগ্নমিছিলে হাঁটে
আমার কবিতা রান্নাঘরের উচ্ছে-বেগুন কাটে
কবিতা আমার ছেলের দু-ঠোঁট
বাবার স্মৃতির স্পর্শ
কবিতা আমার দুঃখের ভাষা
প্রিয় বিরহের বর্ষ।
কবিতা আমার মর্জিমাফিক যুদ্ধের সঞ্জয়
কবিতা আমার বারবার হারে বারবার পরাজয়।
কবিতা আমার দিনান্তে ডাল
গরম ভাতের গর্তে
আমার কবিতা বাঁচতে শিখেছে
নিজেই নিজের শর্তে।
সেলাম সেলাম জিভ-কাটা-খনা, ব্যাস, বাল্মীকি, দান্তে
আমার কবিতা আগুনের খোঁজে বেরিয়েছে কাঠ আনতে।

 
একশো আলোক বছরে

জীবনানন্দ তোমার জন্য
এত হেনস্থা সইছি
তোমার কবিতা পড়েই তবু তো
মারের ওজন বইছি।

এই পৃথিবীতে কবিতা লেখার
মতন কঠিন অকাজে
এমন ফাপরে জড়িয়ে পড়েছি
তুমিই প্রধান সখা যে!

যোগ-বিয়োগের কঠিন অঙ্কে
এর গালি ওর নিন্দা
ভাবছি তুমিও কত সয়েছিলে,
আমি তো তোমার বৃন্দা।

দূতী শেষকালে, রাই না!
মনের গোপন গভীরে
আমিও চেয়েছি রাধিকা সাজতে
হারিয়ে গিয়েছি ও ভিড়ে।

তুমি চেয়েছিলে অপরূপ এক
সুরঞ্জনার সঙ্গ
চুলে আর চোখে মেধাবিনী ওরা
আমি তো নিছক সঙ গো!

জেলে পাড়া থেকে সঙ বেরিয়েছে
সবাই দেখতে যাচ্ছে
আমি তো শুধুই কবিতা পড়ছি
কিতাব আচ্ছে আচ্ছে

একটি কিতাব রূপসী বাংলা
বনলতা সেন একটি
সাতটি তারার তিমির এবং
নির্জন এক ব্যক্তি।

আলিঙ্গনে তো পাইনি তোমাকে
দারুচিনি দ্বীপ মনের
বর্ণমালায় হিসেব চাইছি
দেওয়া আলিঙ্গনের।

পৃথিবীর ধূলিকন্যা আমরা
কাঁদছি এমন অঝোরে
জীবনানন্দ তোমার জন্য
একশো আলোক বছরে।

 
যুদ্ধ

পুরুষ তুমি কেন যুদ্ধ ভালবাসো!
বানিয়েছিল কেন বর্শা বল্লম!
ঘোড়ার পিঠে চড়ে দিগন্তের ভূমি
দখল করবার ইচ্ছা ঝমঝম

যে তুমি যুগে যুগে কবিতা লিখেছিলে
তোমার পেশি কেন আস্ফালন-প্রিয়?
যে তুমি গোলাপের মুগ্ধ দর্শক
সেই কি হিংসার প্রতীক স্করপিও!

তোমার ভালবাসা তোমার নিগ্রহ
গরল অমৃত করেছিলাম পান
সে বিষ সেই মধু রক্তে মিশে গেছে
উত্তরাধিকারী আমার সন্তান

ফিরিয়ে নাও ওই উত্তরাধিকার
অস্ত্রসম্ভার মানব বোমাগুলি
বরং শিশুদের যুদ্ধহীন দেশে
কবিতা লিখে রাখো সাজাও রংতুলি

শিশুকে ভালবাসো, আমাকে ভালবাসো
নদীর তীরে তীরে বাঁচার কলরব
আমাকে ছুঁয়ে বলো, যুদ্ধ করবে না
পুরুষ, চলাে আজ রৌদ্র উৎসব

 
পুরুষের গান

আমার প্রেমের ধরন একটু আলাদা
তোমার গোলাপ কাঁটায় আমাকে বিঁধলে
সে কাটা যেন গো তোমারও হৃদয়ে বেঁধে
আমার লাস্য লড়াই তোমার হিল্লে।


পুরুষ তুমি যে আমার কপাল গড়ছ
পুরুষ তুমি যে আমার নৌকো চালাও
পুরুষ তুমি যে ভালবাসা দিয়ে মারো
কে তোমাকে এত অধিকার দিল ঢালাও!


বলেছিলে তুমি চিরদিন ভালবাসবে,
সব মিছে কথা! সব কি শীতের কুয়াশা!
রোদ উঠলেই বাতাসে উধাও
তোমার আদর সোহাগ এমনই দুরাশা!


তোমাকে দেখেছি আকাশের মতো ব্যাপ্ত
তোমাকে দেখেছি রৌদ্রের মতো তপ্ত
তোমাকে দেখেছি পশম আলিঙ্গনে
তোমাকে দেখেছি বরফ এবং আগুনে


পুরুষ তোমাকে ভালবাসি তাই ঝগড়া
নিষ্ঠুর তুমি সনাতন মনোভঙ্গি
বুঝতে পারো না মেয়েরা পাল্টে যাচ্ছে
শুধু তোমরাই আজও রয়ে গেলে জঙ্গি


তোমার জন্য সিথেয় রক্ত চিহ্ন
তোমার সঙ্গে পুড়েছি সতীর চিতায়
তোমার স্মৃতিতে আলোচাল খাওয়া বিধবা

আমার জন্য কী করেছ তুমি মিতা?


তুমি কি আমাকে সত্যিই ভালবাস?
ভালবাস যদি কেন বা বুঝতে পারো না
তোমার মতোই আমিও একটি মানুষ
আমারও রয়েছে রক্তমাংস তাড়না!


ও পুরুষ তুমি এত দাম্ভিক কেন গো!

কখন তোমার পান থেকে চুন খসবে
সেই ভয়ে আমি তটস্থ থাকি, সহসা
তুমি ব্যথা দাও, তুমি দাও শ্লেষ ব্যঙ্গ

 
কবির প্রতি প্রশ্ন

পীনবক্ষা ক্ষীণকটি সুমধ্যমা বিপুল নিতম্বী
তোমাদের মনোমত নারীবর্ণনার এই ছাঁচে গড়া
যেসব মেয়েরা সেই মহাকাব্য থেকে
হেঁটে আসছেন আজ একুশ শতকে
তাদেরও মগজ ছিল ভুলে গেছ, ও পুরুষ কবি?

যাদের ফিগার অত মাপমত নয়
যারা নারীবর্ণনার ঐ ছক ছুঁড়ে ফেলে দিল
যে নারীরা বিপরীত রমণ চেয়েছে,
যে নারীরা সঙ্গিনীর রতিতে বিভোর
পুরুষ সঙ্গীকে যারা প্রভু বলে মানতে নারাজ
যে মেয়ে কবিতা লেখে, তর্ক করে, বিদগ্ধ, বিদূষী
যে মেয়েরা ধান বোনে, ইঁট তোলে, অফিস চালায়
তাদের বর্ণনাযোগ্য শব্দ নেই তোমার কলমে
অর্ধেক বুঝেছ তুমি মহাকবি, মেয়েদের অর্ধেক বোঝনি।

 
সুবোধ সরকার >>

 
[সম্পাদকীয় নোট : সুবোধ সরকারের কবিতা দুটি মল্লিকা সেনগুপ্তকে নিয়ে লেখা। সুবোধ ও মল্লিকা কবিদম্পতি। নিচের দুটি কবিতা মল্লিকা আর তাদের সংসার নিয়ে লেখা। প্রাসঙ্গিক বলে এখানে প্রকাশ করা হলো।]

 
মল্লিকার জন্মদিনে
সাতাশে মার্চের চৈত্র রজনীতে
কী কথা হয়েছিল মাতাল তরণীতে?

র্যাঁ বোর মতো আমি ছিলাম ছটফটে
সামনে তুমি শুয়ে আমার আফ্রিকা

সামনে নীল নদ সভ্যতার শিখা
প্রথম পৃথিবীতে এগ্রিকালচার।

তখন দেখা হত নদীর বাঁকে বাঁকে
নদীর বাঁকে হত ক্লিভেজ দর্শন

এবং সারা রাত তুমুল বর্ষণ
আমরা ভিজতাম নদীর দুই পারে

এখন নদী নেই হিংস্র পৃথিবীতে
ছেলের স্কুলব্যাগ গোছাতে গিয়ে যদি

কখনও খুঁজে পাও বিরহী কোনও নদী
যেখানে গাঙচিল বসত পিয়ানোয়।

এখন দেখা হয় ব্যাঙ্কে, চালেডালে
নিউক্লিয়ার গাছে বকুল এল ডালে

দু’হাত ভরে তুলি বুড়িবালাম
কুড়ি বছর আগে যে ভাবে কুড়োতাম

যে কথা হয়েছিল মাতাল তরণীতে
আবার হবে নাকি চৈত্র রজনীতে?

 
সংসার

ক্যানসার পাশে নিয়ে শুয়ে আছি জ্যোতির্ময় পাঁচটা বছর,
ফাল্গুনের পাশে এসে শুয়ে থাকে চৈত্র যেভাবে
কিরাতের পাশে থাকে যেভাবে বল্লম
প্রশান্ত বোমার পাশে শুয়ে থাকে রাষ্ট্র যেভাবে।

ক্যানসার শুয়ে আছে পাঁচটা বছর।
বসন্ত এসেছে, ডাকো, ডাক্তারের জন্য বসে থাকে না বসন্ত
এসেছে হেমন্ত, চাই বা না চাই, ধাক্কা মারে হেমন্ত নিজেই
একটা নরক থেকে এসে ঢুকি আর এক নরকে।

পেছনে মাখার কথা লালকালো, মুখে মেখে কান্না লুকোলে?
আ, আমি চোখের জল বিশ্বাস করিনা
বাঁচো, ইরাকের পরে আমরা বাঁচিনি?
আউজভিৎসের পরে কবিতা লিখিনি?

গান করো গান করো চৈত্রসেলে গড়িয়াগগন
গঙ্গার ওপর নাচ আমাদের কলকাতা যেন ব্যাবিলন
পশ্চাতে বিজ্ঞান, বুকে ফোঁড়া নিয়ে বসে আছে মানব সভ্যতা
কোটি কোটি ওষুধের ভ্যান, তবু ক্যানসার সারাতে পারনি।

ট্রমা সেন্টারে কবি ধোপা নেতা ব্যারিস্টার টেনিস তারকা
তাদের চোখের নীচে কালো জল ভূমধ্যসাগর
অনেকেই বাঁচে তবু অনেকে বাঁচে না।
রোরোর কী হবে বলো? ছেলেটার পরীক্ষা সামনে।

তাকে স্কুলে যেতে হবে, বন্ধুদের মতো সেও ক্রিকেট খেলবে
তোমাকেও ছেড়ে যেতে হবে দেশ, আনতে হবে বিশল্যকরণী
ড্রাইভার খেল কিনা, চুরি করে পালিয়েছে লক্ষ্ণীর মেয়ে
ট্রমা সেন্টারে বসে মোবাইলে খোঁজ নাও, আমি বলি থাক।

কেন থাক? আমি তোমাদের মতো বাঁচতে পারি না?
আবার নতুন করে চুল হবে আমার মাথায়
ছেলের বান্ধবী হবে, আমি তাকে বুকে টেনে নেব
আবার বেড়াতে যাব শিলঙ সিমলা।

ক্লাসরুমে নিয়ে চলো, মাথায় কাপড় বেঁধে দেরিদা পড়াব
ছাত্রীদের সঙ্গে ফুচকা, এখনো জীবন মানে হিরের পাতাল।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close