Home পাঠসূত্র মহীবুল আজিজ > আমার বই আমার কথা >> ‘বর্ণসন্তান’ রচনার পটভূমি

মহীবুল আজিজ > আমার বই আমার কথা >> ‘বর্ণসন্তান’ রচনার পটভূমি

প্রকাশঃ December 22, 2017

মহীবুল আজিজ > আমার বই আমার কথা >> ‘বর্ণসন্তান’ রচনার পটভূমি
0
0

মহীবুল আজিজ > আমার বই আমার কথা >> ‘বর্ণসন্তান’ রচনার পটভূমি

 

[সম্পাদকীয় নোট : বর্ণসন্তান কথাসাহিত্যিক মহীবুল আজিজ রচিত উপন্যাস। উপন্যাসটি সম্প্রতি বেঙ্গল পাবলিকেশনস থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এই বই রচনার ইতিবৃত্ত নিয়ে লেখা হয়েছে বর্তমান নিবন্ধটি।]

 

১৯৯১ সালে কয়েক বছরের জন্যে আমাকে ইংল্যান্ড যেতে হয়। নভেম্বরের হিম ঠাণ্ডায় বিশাল নভোতরী আমাকে হিথ্রো বিমানবন্দরে সঁপে দিলে মনে হলো হঠাৎই এক হিমের সাম্রাজ্যে প্রবেশ করলাম। এমন অদৃষ্টপূর্ব ঠাণ্ডার অভিজ্ঞতা সেই প্রথম। আর সেই হিম-অনভ্যস্ত আমাকে দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টার সাক্ষাৎকার-পর্ব পেরিয়ে তবে ঢুকতে হয় বিলেত নামক মাটির দেশে। তারপর এয়ারপোর্টে আরেক অভিজ্ঞতা। ক্যান্টারবারি থেকে আমার বড় মামা এসেছিলেন আমাকে সম্ভাষণ জানিয়ে তাঁদের বাড়ি নিয়ে যেতে। কেম্ব্রিজ থেকে আসে আমার স্ত্রী, যে আরও দুই মাস আগে ইংল্যান্ডে আসে কমনওয়েলথ্ স্কলারশিপ নিয়ে পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি করবার জন্যে। এয়ারপোর্টের রেস্টুরেন্টে অনেকটা সময় বসে থাকবার পরেও শে^তাঙ্গী ওয়েট্রেস আমাদের চা-নাস্তা দিতে বিশ্রী রকমের বিলম্ব ঘটালে মামা বিরক্ত হয়ে উঠে পড়েন। দেখি, একটা সাদা কাগজে অভিযোগ লিখে তিনি সেটা রেস্টুরেন্টের কাউন্টারে জমা দেন। তাঁর বক্তব্য ছিলÑ শে^তাঙ্গী ওয়েট্রেস আমাদের বসিয়ে রেখে আমাদেরও অনেক পরে আসা গ্রাহকদের একের পর এক সার্ভ করে যেতে থাকে। এবং সেই খদ্দেররা সবাই শে^তাঙ্গ। মামা ব্রিটিশ নাগরিক এবং ব্রিটিশ আইনে এমন আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। পরে, রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার নিজে এসে ক্ষমা চাইতে থাকেন। ওয়েট্রেসটিও যারপরনাই দুঃখ ব্যক্ত করে চলে। জীবনে প্রথম বিলেতি নাস্তা ক্রোয়াসঁ আর কফি খেয়ে আমরা ধেয়ে চললাম ক্যান্টারবারির দিকে। পথে যেতে-যেতে মামা বলেন, এই সেই ক্যান্টারবারি একদা যার গল্প শুনিয়েছিলেন জিওফ্রে চসার।

যেটুকু দুঃখবোধ একটা হাল্কা আস্তরের মত মনে বসে গিয়েছিল সেটা মুছে যেতে বিলম্ব ঘটলো না। মামাদের প্রতিবেশী এক আইরিশ দম্পতির সঙ্গে পরিচয় ঘটলো। নবাগত আমাদের জন্যে তিনি নিয়ে এলেন উলওয়ার্থের চকোলেট। এমন মার্জিত আর মধুর ব্যবহারের স্মৃতি ভোলা যায় না। উইক এন্ডটা কাটিয়ে শেষে কেম্ব্রিজে পৌঁছালাম। আমার স্ত্রী ক্লেয়ার হলের শিক্ষার্থী। সেই সুবাদে হারশেল রোডের একটা চমৎকার বাড়িতে স্থান হলো আমাদের। বাড়ির নাম কেইন্সসাইড হাউজ। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ কেইন্সের বাড়ি ছিল এটি। তাঁরা দান করে দিয়েছিলেন কলেজকে। আমাদের দাম্পত্য জীবন শুরু হলো কেইন্স সাহেবের বাড়ির সেই ঘরে যেখানে থাকতেন কেইন্স স্বয়ং। আমার স্ত্রী মিতু সকালবেলা সাইকেল চালিয়ে তিন কিলোমিটার দূরে ওর কর্মস্থল ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবরেটরিতে চলে যায় আর আমি গিয়ে ঢুকি বিশালাকায় কেম্ব্রিজ য়ুনিভার্সিটি লাইব্রেরিতে। হাজার-হাজার বই সেখানে। লাইব্রেরি খুলতো সকাল নটায়। আমি ঘর থেকে বেরোতাম আটটা পঞ্চাশে এবং লাইব্রেরির দরজা খোলার সঙ্গে-সঙ্গে পাঠকক্ষে গিয়ে হাজির। একদিন একজন শে^তাঙ্গ ভদ্রলোক সেই কালবেলাতেই আমাকে দেখে প্রশ্ন করেন, হ্যালো জেন্টলম্যান, হোয়্যার আর ইউ ফ্রম? পরিচয় দেবার পর তিনি স্মিত স্বরে বলেন, রোজ দেখি তুমি সকাল-সকাল এসে পড়ো, সম্ভবত তুমিই প্রথম রিডার আমাদের লাইব্রেরির। পরিচয় হলো তাঁর সঙ্গে, তিনি কেম্ব্রিজ লাইব্রেরির সহকারী গ্রন্থাগারিক। লাইব্রেরি থেকে ফেরার পথে একদিন দেখলাম, স্টিফেন হকিং যাচ্ছেন। তাঁর হুইল চেয়ার ঠেলে-ঠেলে চলেছেন সেই নার্স যাঁকে তিনি পরে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন ভাষাবিজ্ঞানী সারা হকিং।

ক্লেয়ার হলে একদিন ট্যানার এ্যান্ড এ্যাশবে লেকচার দিতে এলেন বিখ্যাত আফ্রিকীয় ঔপন্যাসিক চিনুয়া এ্যাচেবে। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় হলো। তাঁর সঙ্গে আলাপ হলো প্রায় ঘণ্টাখানেক। কথার ফাঁকে আমাকে বললেন তিনি, তোমরা বড় অবিবেচক জাতি, তোমরা তোমাদের জাতির পিতাকে হত্যা করেছো। সাহিত্য, ঔপনিবেশিকতা, উপনিবেশ-বিরোধিতা এইসব নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতা চলে। আফ্রিকার আরেক ঔপন্যাসিক ফেমিশ রোড খ্যাত নাইজেরিয় বেন ওকরি আসেন কেম্ব্রিজে। সেমিনারের আগে এবং চা-বিরতির ফাঁকে কথা বলার সুযোগ হয় তাঁর সঙ্গে। কোন অহংকার নেই, কোন গাম্ভীর্য নেই। ওকরি কথা বলেন একেবারে ব্রিটিশ কেতায়, আফ্রিকীয় যে-টান নাইজেরিয়া-কেনিয়া থেকে আসা বিদেশী শিক্ষার্থীদের মধ্যে লক্ষ করা যেতো তার বিন্দুমাত্র বেনের ছিল না। আমেরিকা থেকে এসেছিলেন রসায়নে নোবেল-পাওয়া বিজ্ঞানী ডেভিড বাল্টিমোর। তাঁর বিষয় ছিলÑ সবার জন্যে বিজ্ঞান। মুগ্ধ হয়ে তাঁর বক্তৃতা শুনি। ট্রিনিটি কলেজে বক্তৃতা দিতে আসেন অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। তখন তিনি নোবেলও পান নি কিংবা ট্রিনিটি কলেজের ওয়ার্ডেনও হন নি। পরে অবশ্য দুই প্রাপ্তিই ঘটেছিল তাঁর। তাঁর বক্তৃতার শিরোনাম ছিল হোয়াট ইজ ইন্ডিয়া। উপচে-পড়া ভিড়ে তাঁকে শুনি। এসবের মধ্যে চলতে থাকে আমার সাহিত্য-পাঠ। বিশেষ করে গল্প এবং উপন্যাস। পড়ি শোলেম আলাইখেমের ফিডলারস্ অন দ্য রুফ এবং আইজাক ব্যাবেলের ছোটগল্প এবং আইজাক বাশেভিস সিঙ্গারের উপন্যাস একের পর এক। সম্ভবত সিঙ্গারের গোটা পঁচিশেক উপন্যাস আমি পাঠ করি তখন। তারপর একদিন সিঙ্গারের শোশা উপন্যাসটি অনুবাদ করতে শুরু করি। এখানে বলা দরকার, আমি পিএইচডি করছিলাম চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে সমাজবিজ্ঞানী অনুপম সেনের নির্দেশনায়। ছুটিতে কেম্ব্রিজে গিয়ে সেখানকার লাইব্রেরি এবং ব্রিটিশ মিউজিয়ম লাইব্রেরি এবং ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে চলে যাই লেখাপড়া করবার জন্যে। মোটকথা একটা দারুণ মনন ও সৃজনমুখর সময় আমার কাটতে থাকে ইংল্যান্ডে।

আমরা যে-বাড়িতে থাকতাম সেখানে বিশে^র প্রায় পনেরোটি জাতির ছেলেমেয়ে থাকতো। সকলের সঙ্গেই কথাবার্তা, গালগল্প হতো। সকলেই ছিল বন্ধুবৎসল। এঁদের অনেকের সঙ্গে আমার সাহিত্য বিষয়ে কথাবার্তা জমে উঠতো। একদিন আমার সঙ্গে তর্ক লেগে গেল আমাদের জার্মান বান্ধবী মার্গারেট মেহল্-এর। টিভিতে একটা ডকুমেন্টারি দেখাচ্ছিল যেখানে হিটলারের হত্যাযজ্ঞ দেখাচ্ছিল। সঙ্গে ছিল গোপনে ধারণ করা গোয়েবলস্-এর একটা ইন্টারভিউ। আউশভিচ এবং ডাচাউয়ের বীভৎসতার বিবরণ সত্ত্বেও মার্গারেট বলছিল, এইসব আসলে অতিরঞ্জন। তীব্র প্রতিবাদ করে আমি বলি, আমাদের ক্ষেত্রে পাকিস্তানিরাও এমনটাই বলে থাকে। মার্গারেট ভেবেছিল হিটলারের কর্মকাণ্ড বিষয়ে আমি তেমন কিছু জানি না। কিন্তু একের পর এক সূত্র উত্থাপন করে আমি ওকে বোঝালাম, হিটলার সম্বন্ধে ইতিহাস একবিন্দু মিথ্যে বলে না। মার্গারেটের মধ্যে আমি নতুন প্রজন্মের মনটাকে দেখতে পেলাম যে কিনা ভেতরে-ভেতরে লালন করে আর্য অহংকার। আমাদের ফিনিশ বান্ধবী এ্যান ফিনেল আমাকে জন্মদিনের উপহার দেয় ইতালো ক্যালভিনোর বই এ্যাডাম, ওয়ান আফটারনুন। সেটা পড়ে এমনই অভিভূত হই আমি যে এরপর লাইব্রেরিতে গিয়ে একে-একে পড়তে থাকি ক্যালভিনোর গল্প, উপন্যাস আর সেই বিখ্যাত হোয়াই রিড ক্ল্যাসিক্স। এ্যান খুব পছন্দ করতো বাংলাদেশের খাবার। বলতো, বাংলা কুইজিন বিশে^র সেরা। ফিনিশরা লবন-জলে ভেজানো শুঁটকি খায় গোলমরিচ দিয়ে। আমাদের ঝাল খেয়ে এ্যানের সে কী পরিতৃপ্তি। ঝালের প্রতিষেধক হিসেবে আইসক্রিম খেতে-খেতে সে বলে, তোমদের শুঁটকির তুলনা নেই। তো, কেম্ব্রিজে ডরমেটরির জীবনটা ছিল দারুণ এক ভালবাসার জগৎ। কিন্তু বাইরের রাস্তায় নামলে, বাইরের জীবনের স্রোতে পতিত হলে খানিকটা ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। সেটা আরেক জীবন এবং তা সুখকর নয়।

সকালবেলা কেম্ব্রিজের ড্রামার স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে আছি লন্ডনের বাস ধরবার জন্যে। চারদিক নিস্তব্ধ আর শুনশান। হঠাৎই কোত্থেকে দুটি ছোকরা এসে আমাকে আক্রমণ করে আমাকে লক্ষ করে জোড়পায়ে লাথি ছুঁড়ে দিয়ে। ‘পাকি পাকি’ বলে তারা আমাকে গালাগাল করতে থাকে। আমি কৌশলে সরে গিয়ে মুহূর্তের জন্যে তাদের আক্রমণ ঠেকাই। বুঝতে পারি এ হলো বর্ণবাদ। এর কথা শুনেছি, শুনে থাকি, এখন জানলাম প্রত্যক্ষত আমি তার শিকার হয়ে। কিন্তু এর অন্য পিঠে ছিল মুগ্ধতা। যেখানটায় ছোকরা দুটি আমাকে আক্রমণ করে ঠিক সেখানেই প্রায় অলৌকিকভাবেই যেন আচমকা হাজির হয় এক বৃদ্ধা। দেখে মনে হয় বয়স কমপক্ষে ষাট। হাতে একটা ওয়াকিং স্টিক। আমার দিকে আগুয়ান ছেলেদুটিকে লক্ষ করে বৃদ্ধা কঠিন ধমকের সুরে দ্রুতস্বরে কীসব বলতে থাকে যেসবের কিছু আমি বুঝি কিছু বুঝতে পারি না। কিন্তু যখন বৃদ্ধা তার লাঠি উঁচিয়ে ছেলে দুটিকে সত্যি-সত্যি তাড়া করে তখনই আমি বুঝতে পারি এর নাম বর্ণবাদ-বিরোধিতা। একটাই মুহূর্ত এবং একই জাতির লোক তারা কিন্তু পরস্পর কী বৈপরীত্য। ছেলে দুটি বিদ্রƒপের হাসি হাসতে-হাসতে চলে গেলে বৃদ্ধা আমাকে বলে, নেভার মাইন্ড ডিয়ার, দে আর ম্যাড এ্যান্ড ইনসেইন! আমি তাকে বলি, মেনি থ্যাংকস্ ফর ইউর কাইন্ডনেস। কিন্তু আমার চোখে তখন ভেসে ওঠে লন্ডন থেকে আনা এবং লন্ডন থেকে প্রকাশিত বাংলা পত্রিকার নানা প্রতিবেদন। বিভিন্ন বর্ণবাদী হামলার ঘটনার বিশদ বিবরণ তাতে। রাতে বাসে-টিউবে-ট্রেনে হামলার শিকার হয় অশে^তাঙ্গ বিশেষ করে এশিয়রা। সমাজে-রাষ্ট্রে বহু সংস্কৃতি বহু ধর্ম আর জাতিগত বিচিত্রতার বাণী প্রচারিত হতে থাকে এবং একই সমান্তরালে ‘স্কিন হেড’রা ঘুরে বেড়ায় ঘৃণার গোপন ছুরি সঙ্গে নিয়ে।

কেম্ব্রিজের মার্কেট স্কয়্যারটা ছিল আমার খুব প্রিয় জায়গা। আমরা বলতাম ওপেন মার্কেট। পাওয়া যেতো না এমন জিনিস ছিল না সেখানে। পুরনো বইয়ের স্টলটাতে অনেকটা সময় কাটানো অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। দোকানি মাইকেলের সঙ্গে জমে গিয়েছিল খাতির। এখান থেকে আমি সৌদি ঔপন্যাসিক মুনিফ, কানাডিয় স্কোরোভেকি, য়োসা, সনটাগ, হেলার এরকম সব লেখকের বই কিনেছি। বই কিনে ফিরছিলাম একদিন ক্যাম নদীর ধার ঘেঁষে। আচমকা আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ায় একটা অস্টিন গাড়ি, গাড়ি থেকে নামে দুই তরুণ। শীতকাল থাকায় ওদের পরনে লং-কোট। একজন আমার দিকে এগিয়ে এসে বলে, কুড ইউ স্পেয়ার মি সাম চেঞ্জ? মুহূর্তেই বুঝে নিলাম, ওরা ভিক্ষুক। তবু আমার মধ্যে দ্বিধা দেখে অপর যুবক প্রায় ধমক লাগায় আমাকেÑ না দিলে তোমাকে নদীতে ফেলে দেবো! দ্রুত পকেট হাতড়ে ত্রিশটা সেন্ট দিয়ে দিলাম ওদেরকে। অনুভব করলাম, আরও একটি বর্ণবাদী হামলা থেকে বেঁচে গেলাম। ঠিক এই ঘটনার পরদিন আমার স্ত্রীর ল্যাবমেট হবসন বুলম্যান আমাদের নিমন্ত্রণ করে ওর বাড়িতে। আমরা জানতাম হবসন ওর বাবা-মা’র একমাত্র সন্তান। কিন্তু গাড়িতে যেতে-যেতে ও বলে, আমার ভাইবোনদের দেখলে তোমাদের খুব ভাল লাগবে। ভাবি, ওর আরও ভাইবোন নিশ্চয়ই রয়েছে। গিয়ে দেখি বোন মানে মেক্সিকোর এবং ভাই মানে সিয়েরালিওনের- দুজনেই পরিবারটিতে ফস্টারড্। জেনে এবং দেখে মনটা ভাল হয়ে গেল। এরকম এক মিশ্র অনুভূতি নিয়ে আমি কাল কাটাতে থাকি বিলেতে। মাঝে-মাঝে বেড়াতে যাই লন্ডনে, স্ট্রাটফোর্ড অন-আভন্-এ কি উইন্ডসর ক্যাসল্-এ। কখনও-কখনও উইক এন্ডের রাতে রাস্তায় উল্লাসরত স্থানীয় শে^তাঙ্গ যুবক-যুবতীদের ব্যঙ্গের শিকার হই। একমাত্র হেতু- আমাদের গাত্রাবরণ। মনের গভীর কোণে মিশ্র অনুভূতি ছাপিয়ে কোথাও জমতে থাকে বেদনার মত বিক্ষোভ কিংবা বিক্ষোভের বেদনা।

একদিন পত্রিকার শিরোনামে ভেসে এলো পূর্ব লন্ডনে খুন হয়েছে আলতাফ আলী নামের এক অনতিতরুণ বাঙালি। কয়েকজন যুবক একজোটে হামলা করে তাকে খুন করে পালিয়েছে। কিন্তু হত্যাকান্ডটির কোন মীমাংসা হয় না। কোন ক্লু-ই মিলছিল না হাতের নাগালে। বহুকাল পরে একদিন ধরা পড়ে খুনি। কোন এক ঘোরের মুহূর্তে সে তার বান্ধবীকে নিজের বীরত্ব জাহির করতে গিয়ে বলে যে সে এবং তার বন্ধুরা মিলে খুন করেছিল আলতাফ আলীকে। মেয়েটি সে-কথা জানায় তার মা’কে। শেষে মা এবং মেয়ে মিলে থানায় গিয়ে সমস্ত বিবরণ উপস্থাপন করলে কিনারা হয় আলতাফ আলী হত্যার। এখন পূর্ব লন্ডনে স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে আলতাফ আলী পার্ক। পত্রিকায় সংবাদটি পড়ে অশ্রুসজল হয়ে পড়ি। মনে-মনে স্যালুট জানাই শে^তাঙ্গ সেই মা ও মেয়েকে। আর তখনই একটি গল্প আমার মনের জমিতে ভ্রƒণ হয়ে দেখা দিতে শুরু করে। বছর পাঁচেক বিলেতে কাটিয়ে স্বদেশে ফিরে আসি। কুড়ি বছর ধরে আমি অপেক্ষা করতে থাকি কখন সেই ভ্রƒণ বিকশিত হয়! কুড়ি বছর পরে ২০১৭ সালে লেখা হয় সেই উপন্যাস্ ‘বর্ণসন্তান’ যা আমি বয়ে বেড়াতে আরম্ভ করি বিলেতে এবং যেটির রচনা সম্পন্ন হয় বাংলাদেশে এসে। লিখতে চেয়েছিলাম গল্প কিন্তু লেখা হয়ে গেল উপন্যাস।

 

বর্ণসন্তান
প্রকাশক : বেঙ্গল পাবলিকেশনস

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close