Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ মাইনুল ইসলাম মানিক >> ইশিগুরো : প্রতীচ্যের পটভূমি আর প্রাচ্যের ভাবনা যাঁর কথাসাহিত্যের বিষয়আশয়

মাইনুল ইসলাম মানিক >> ইশিগুরো : প্রতীচ্যের পটভূমি আর প্রাচ্যের ভাবনা যাঁর কথাসাহিত্যের বিষয়আশয়

প্রকাশঃ October 6, 2017

মাইনুল ইসলাম মানিক >> ইশিগুরো : প্রতীচ্যের পটভূমি আর প্রাচ্যের ভাবনা যাঁর কথাসাহিত্যের বিষয়আশয়
0
0

মাইনুল ইসলাম মানিক >> ইশিগুরো : প্রতীচ্যের পটভূমি আর প্রাচ্যের ভাবনা যাঁর কথাসাহিত্যের বিষয়আশয়

ব্যাপক জল্পনাকল্পনা চলছিল ২০১৭ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার নিয়ে। বিগত বছরের মতোই এ বছরের সম্ভাব্যদের তালিকায়ও ঘুরেফিরে আসছিল নগুগি, হারুকি, কুন্ডেরা, কো উন, অ্যাটউড, ফসে, মারিয়াস, কাদারে, রথ বা ওটসদের নাম। বাঘাবাঘা সাহিত্যিকদেরকে আড়ালে রেখে নোবেল কমিটি ঘোষণা করলেন কাজুয়ো ইশিগুরো‘র নাম। ইশিগুরোর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির এই ঘোষণা দুনিয়াজোড়া পাঠকদের কাছে একটি চমক এটা খুব সহজেই বলা যায়। নগুগি, কো উন, কুন্ডেরা, অ্যাটউড, মুরাকামি, ফসে, মারিয়াস, কাদারে, রথ বা ওটসদের নাম বেশ কয়েক বছর ধরে খুব জোরেশোরে উচ্চারিত হলেও ইশিগুরোর নাম খুব একটা আলোচনায় উঠে আসেনি। ইশিগুরো নবম ব্রিটিশ সাহিত্যিক এবং আটাশতম ইংরেজি ভাষার লেখক হিসেবে এই বিরল সম্মান অর্জন করলেন। এর মধ্য দিয়ে রুডইয়ার্ড কিপলিং, জন গলসওর্দি, টি.এস. এলিয়ট, বার্ট্রান্ড রাসেল, প্যাট্রিক হোয়াইট, উইলিয়াম গোল্ডিং , হ্যারল্ড পিন্টার এবং ডরিস লেসিংদের কাতারে নাম লেখালেন এই কথাসাহিত্যিক।

সুইডিশ কমিটির মহাসচিব সারা দানিউস পুরস্কার ঘোষণার শেষে সাংবাদিকদের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইশিগুরো কাফকা ও জেন অস্টিনের শৈলীর সমন্বয়ে একটি নতুন শৈলী তৈরি করতে পেরেছেন। আর আপনি সেখানে মার্শেল প্রুস্তকে যোগ করলেই তাকে মন্থন করতে পারবেন। তিনি একজন মহান শুদ্ধতম সাহিত্যিক।

নিজের লেখালেখি সম্পর্কে বলতে গিয়ে ইশিগুরো প্যারি রিভিউকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমি প্রথমে একজন ম্যাজিসিয়ান হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমি অনেকগুলো সুযোগও পেয়েছিলাম। কিন্তু আমার অবস্থা এমন হত যে, মাত্র দু’সেকেন্ডের মাথায় লোকেরা বলে ফেলত- আরে বেটা, এটা তুই পারবি না। সুতরাং আমি ভাবলাম, অন্য কাজ, যেমন রেডিওর নাটক লেখাটাই ভালো। স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর উদ্বাস্তুদের নিয়ে কাজ করার সময় আমি আধঘণ্টার একটি রেডিও নাটক লিখে বিবিসিতে পাঠাই। যদিও নাটকটি তারা প্রচারে অস্বীকৃতি জানায়, তবে উৎসাহ জাগানিয়া সাড়া দেয়। এটা আমার জন্য একটা তিক্ত অভিজ্ঞতা হলেও  সেটাই ছিলো আমার প্রথম একপ্রস্থ তারুণ্যের প্রয়াস।

ইশিগুরো ১৯৫৪ সালে জাপানের নাগাসাকিতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬০ সালে তাঁর পিতা সপরিবারে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। সেই সূত্রে তিনি একজন জাপানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ সাহিত্যিক। ইশিগুরো কেন্ট ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৭৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর লেখালেখিতে মনোনিবেশের জন্য একবছর শিক্ষাবিরতি দেন। ১৯৮০ সালে তিনি ইস্ট অ্যাংলিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮২ সালে ব্রিটিশ সরকার ইশিগুরোকে সে-দেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে। তিনি এ পর্যন্ত মোট চারবার ম্যান বুকার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন তিনি এবং ১৯৮৯ সালে ম্যান বুকার পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৮ সালে টাইমস ম্যাগাজিনের জরিপে ১৯৪৫ সাল পরবর্তী শ্রেষ্ঠ পঞ্চাশ ব্রিটিশ সাহিত্যিকের তালিকায় তিনি স্থান করে নিয়েছিলেন।

কাজুয়ো ইশিগুরোর সাতটি উপন্যাস এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে।  প্রথম উপন্যাস ‘অ্যা প্যাল ভিউ অব হিলস’ প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে। বইটি প্রকাশিত হওয়ার আগেই ফাবের অ্যান্ড ফাবের প্রকাশনীর পক্ষ থেকে তাঁকে অগ্রিম ১০০০ ডলার রয়্যালিটি প্রদান করা হয়। বইটি প্রকাশের বছরেই ‘উইনিফ্রেড হল্টবাই মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করে। এই উপন্যাসটি একজন মধ্যবয়সী জাপানি নারীকে নিয়ে রচিত। ইংল্যান্ডে বসবাসরত এই নারীর নিঃসঙ্গ জীবনের টানপোড়েন বইটিতে লেখক অসাধারণভাবে চিত্রায়িত করেছেন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় ইশিগুরোর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘অ্যান আর্টিস্ট অব দ্য ফ্লোয়টিং ওয়ার্ল্ড’। এই বইটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত। উপন্যাসের চরিত্রে রয়েছেন একজন চিত্রশিল্পী যিনি যুদ্ধে তার সব হারান। তার অর্জন আর বিসর্জনের দ্বন্দ্ব নিয়ে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগুতে থাকে ২০৬ পৃষ্ঠার উপন্যাসটি। এই উপন্যাসে মানুষের মনোজগতের পরিবর্তনও চমৎকারভাবে ধরা আছে। উপন্যাসটি ১৯৮৬ সালের ম্যান বুকার অ্যাওয়ার্ডের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছিল। পরে ‘হুইটব্রেড বুক অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে।

ইশিগুরোর ‘দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে’ বইটির জন্য নোবেল কমিটি তাঁকে নোবেল পুরস্কারের বিবেচনায় আনেন এবং সম্মানিত করেন বলে বলা হয়েছে। এই বইটি ১৯৮৯ সালে প্রকাশের পর একই বছর ম্যান বুকার অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। এই বইটি অ্যান্টনি হপকিন্স ও ইমা থম্পসনের অভিনয়ে ১৯৯৩ সালে চলচ্চিত্রায়িত হয় এবং দুনিয়াজোড়া তুমুল সাড়া ফেলে। এই চলচ্চিত্রটি এ পর্যন্ত আটটি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত একটা চলচ্চিত্র। ইশিগুরোর প্রথম দুটি উপন্যাসের মতোই এই উপন্যাসটিও উত্তম পুরুষে রচিত।  উপন্যাসের মূল চরিত্র স্টিভেন্স লর্ড ডার্লিংটনের অনুগত একজন খানসামা হিসেবে সারাজীবন পার করে দেন। উপন্যাসটি শুরু হয় স্টিভেন্সের পুরনো এক কলিগ, মিস কেনটনের লেখা একটি চিঠি প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে। চিঠিতে কেনটন তার বৈবাহিক জীবনে অসুখী পরিণতির ইঙ্গিত দেন। চিঠিটি পেয়ে স্টিভেন্স পুনরায় তাদের পুরনো সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ উপলব্ধি করেন। স্টিভেন্স বুঝতে পারেন, যদি কেনটনকে পুনরায় তার চাকরিতে বহাল করা যায় তবে এই সম্পর্ক গড়ে ওঠার সমূহ সুযোগ তৈরি হতে পারে। কয়েকদিন পর স্টিভেন্সের নতুন মালিক তাকে নিজের গাড়িটি ধার দেয় এবং স্টিভেন্স বুঝতে পারে এটাই তার জন্য সেরা সুযোগ- পুরনো কলিগের সাথে দেখা করার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ঘটনাক্রমে স্টিভেন্সকে তার মালিকের চরিত্রে অভিনয় করে যেতে হয় এবং একই সাথে কেনটনের সাথে তার নিজের চরিত্রে অভিনয় করে যেতে হয়। বইটির কাহিনি যতই সামনের দিকে এগোয়  ততই কেনটনের সাথে পুরনো দিনের পারস্পরিক সম্পর্ক স্পষ্ট হতে থাকে। যেহেতু যুদ্ধ চলছে, স্টিভেন্স ও কেনটন কেউই পরস্পরকে তাদের প্রকৃত অনুভূতির কথা বলতে পারে না। দুজনের কথোপকথনে রোমান্স থাকলেও তাদের সম্পর্কটি শেষ পর্যন্ত অসংজ্ঞায়িত থেকে যায়। মিস বেন নামে একজন যখন কেনটনকে জানায়, স্টিভেন্সকে বিয়ের কথা বলতে কেনটনের ভুল করা উচিত নয়, তখন কেনটন বেনকে জানিয়ে দেয় সে শুধু তার পুরনো স্বামীকেই ভালোবাসার কথা ভাবতে চায় এবং সে তার অনাগত নাতনীর পৃথিবীর মুখ দেখার অপেক্ষায় আছে। এরপর মালিকের সেবার দিকেই অবশিষ্ট দিনগুলোকে সমর্পণ করেন বেদনাক্রান্ত স্টিভেন্স। এভাবেই চুড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যায় ‘দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে’ উপন্যাসটি।

ইশিগুরোর চতুর্থ উপন্যাস ‘দ্য আনকনসোলড’ ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয়।  এই উপন্যাসটিও আগের তিনটি উপন্যাসের মতো একই প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি ‘দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে’র মতো সাড়া জাগাতে না পারলেও সাহিত্যবোদ্ধাদের প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হয়। ৫৩৫ পৃষ্ঠার বইটি ‘সেলটেনহাম পুরস্কার’ জিতে নেয়। বইটি বিশশতকের শ্রেষ্ঠ পঞ্চাশটি ব্রিটিশ উপন্যাসের তালিকায় স্থান করে নিয়েছিল। ইশিগুরোর ‘হোয়েন উই অয়ার অরফানস’ বইটি প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে। এই বইটিও ম্যান বুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছিল। তবে ইশিগুরোর দুর্বল বইয়ের তালিকায় সমালোচকরা এটিকে স্থান দিয়েছেন। ইশিগুরো নিজেও  বলেন, ‘এটা আমার সেরা সৃষ্টিকর্মের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয় ইশিগুরোর ‘নেভার লেট মি গো’ বইটি। এই বইটিও ম্যান বুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছিল। বইটি একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে এবং চলচ্চিত্রায়িত হয়। ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় তার সর্বশেষ উপন্যাস ‘দ্য বারিড জায়ান্ট’। ইশিগুরো সম্পর্কে মুরাকামি একবার বলেছিলেন, তাঁর প্রতিটি উপন্যাস বেশ আলাদা। নতুন নতুন বাঁক নিয়ে পাঠককে মুগ্ধ করে চলেছে।  শৈলী আর কাহিনির বিন্যাসও দৃষ্টি আকর্ষণ করে।  আসলেই তাই, অসাধারণ একজন ঔপন্যাসিক ইশিগুরো। স্মৃতিনির্ভর সমকালীন জীবনের রূপকার তিনি। জাপানি জীবনের কথা তাঁর উপন্যাসে উপজীব্য হয় বলে তাঁকে ডায়াসপোরিক ঔপন্যাসিক বলেও চিহ্নিত করা যায়। প্রাচ্যের অনুষঙ্গই প্রতীচ্যের পটভূমিতে উপস্থাপন করেছেন তিনি।

জাপানি বংশোদ্ভূত ইশিগুরো এ পর্যন্ত বেশকিছু চিত্রনাট্য রচনা করেছেন। তাঁর চিত্রনাট্য ব্যাপক খ্যাতি বয়ে এনেছে। ‘দ্য স্যাডেস্ট মিউজিক অব দ্য ওয়ার্ল্ড’, ‘দ্য হোয়াইট কাউন্টেস’ প্রভৃতি তাঁর বিখ্যাত চিত্রনাট্য। এছাড়াও তার পাঁচটি গল্পগ্রন্থ রয়েছে যেগুলো যে-কোনো পাঠককে আকৃষ্ট করতে সক্ষম । এর বাইরেও রয়েছে তাঁর লেখা অসংখ্য গান যা শ্রোতদের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। বিশ্বব্যাপী আলোচিত অনেক যোগ্য লেখক নোবেল পুরস্কার থেকে বঞ্চিত বলে মনে করা হলেও এবারকার পুরস্কারটি কোনো অযোগ্য ব্যাক্তির হাতে ওঠেনি, একথা জোর দিয়েই বলা যায়।  আমাদের কাছে তিনি অপরিচিত হলেও, বুকারপ্রাপ্ত আর নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত একজন লেখককে গুরুত্বপূর্ণ লেখক বলে মানতেই হবে আমাদের।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close