Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ মাইনুল ইসলাম মানিক >> সন্ডার্সের সাতকাহন >> প্রবন্ধ

মাইনুল ইসলাম মানিক >> সন্ডার্সের সাতকাহন >> প্রবন্ধ

প্রকাশঃ October 21, 2017

মাইনুল ইসলাম মানিক >> সন্ডার্সের সাতকাহন >> প্রবন্ধ
0
0

মাইনুল ইসলাম মানিক >> সন্ডার্সের সাতকাহন  

[জর্জ সন্ডার্স তাঁর লিঙ্কন ইন দ্য বার্দোর জন্য ২০১৭ সালের ম্যান বুকার প্রাইজ অর্জন করেছেন। এই লেখাটি সন্ডার্সের সেই উপন্যাস নিয়ে।]

 

‘আমি উপন্যাসটি লেখার সময় বহুবার থমকে গেছি, ভেবেছি আমি আসলে কী লিখছি। আমি যা লিখছি তা আসলে আদৌ কিছু হয়ে উঠছে কি-না। আমি এখনো, আমি যা…বুঝাতে চাচ্ছি, উপন্যাসটি হয়তো নিজেই বলবে এটি একটা উপন্যাস হয়ে উঠেছে।’

গ্রিক নাট্যকার অ্যারিস্টোফেনিস ‘দ্য ফ্রগস’ নামে একটি নাটক লিখেছিলেন। নাটকে গড ডায়োনিসাস মৃত্যুপরবর্তী  জীবন থেকে ইউরিপিডিসকে ফিরিয়ে আনতে মৃতদের রাজ্য হেডিসে গিয়েছিলেন। গ্রিক পুরানের বিখ্যাত বংশীবাদক অর্ফিউস মৃতদের রাজ্যে গিয়েছিলেন তার প্রেয়সীকে ফিরিয়ে আনতে। হোমারের মহাকাব্য ওডেসিতে পথ ভুলে ওডেসি মৃতদের রাজ্যে প্রবেশ করেছিলেন। সাহিত্যে মৃতদের রাজ্যকে ব্যবহারের এরকম অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু সেসব রচনার প্রতিটি চরিত্রই ছিল কাল্পনিক, এমনকি ঘটনাগুলোও ছিল কাল্পনিক। সেসব লেখায় মানুষের অলৌকিক বিশ্বাসে আঘাত হানার কোনো উদ্দেশ্যও রচনাকারীর মধ্যে পরিলক্ষিত হয়নি। লিঙ্কন ইন দ্য বার্দো উপন্যাসে কথাসাহিত্যিক জর্জ সন্ডার্স প্রচলিত সেসব ধারা ও ধারণাকে ভেঙে দিয়ে একটি বাস্তব চরিত্রের মধ্য দিয়ে অমোঘ বাস্তবতাকে তুলে ধরার প্রয়াস দেখিয়েছেন। উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে তুলে এনেছেন আমেরিকার কিংবদন্তি প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্ককনকে। মৃত্যু ও পূনর্জন্মের মধ্যবর্তী জগত, যেখানে আত্মা শরীর হতে বিচ্ছিন্ন থাকে, তিনি সেই জগতের নাম দিয়েছেন বার্ডো। তিব্বতীয় বৌদ্ধদের প্রচলিত ধারণা হতে তিনি এই নামটি গ্রহণ করেন। আব্রাহাম লিঙ্কনের একমাত্র পুত্র এগারো বছর বয়সী উইলির মৃত্যুর পর খুব ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। এমনকি তাঁর মধ্যে উম্মাদনাও সৃষ্টি হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন তার পুত্র খুব কাতরভাবে অপেক্ষা করছে পিতার জন্য। তিনি অসংখ্যবার তার পুত্রকে ফিরিয়ে আনতে সমাধিস্থলে ছুটে গিয়েছিলেন। আব্রাহাম লিঙ্কনের বাস্তব জীবনের এই ঘটনাকে উপজীব্য করে ৫৮ বছর বয়সী জর্জ সন্ডার্স তাঁর প্রথম উপন্যাস লিঙ্কন ইন দ্য বার্দো লিখলেন। উপন্যাসটি লেখার প্রেক্ষাপট নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে সর্ন্ডাস বলেন :

অনেক বছর আগে ওয়াশিংটন ডিসিতে ভ্রমণের সময় আমার স্ত্রীর কাজিন পাহাড়ে একটি সমাধিক্ষেত্র দেখিয়ে বলেন, ১৯৬২ সালে আব্রাহাম লিঙ্কন প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তার প্রিয়পুত্র উইলি মারা যায়। উইলিকে এই সমাধিক্ষেত্রে সাময়িকভাবে সমাহিত করা হয়। পরের দিনের সংবাদপত্র হতে জানা যায় লিঙ্কন বহুবার সমাধিক্ষেত্রে প্রবেশ করেছিলেন তার পুত্রের দেহটি স্পর্শ করার জন্য। ঘটনাটি শোনার পর আমার মনে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই একটা ইমেজ তৈরি হয়। এই ইমেজ বা চিত্রকল্পটি আমি বিশ বছর ধরে নিজের মধ্যে বহন করেছি। আমার ভয় ছিল যে, আমি ঠিকঠিক ভাবে এটি লিখতে পারবো কি-না। অবশেষে ২০১২ সালে যখন আমি অনুভব করি, যথেষ্ট প্রৌঢ়ত্ব অর্জন করেছি, তখন আমি এটি লেখার চেষ্টা করি। এরই ফলাফল হচ্ছে লিঙ্কন ইন দ্য বার্দো উপন্যাসটি। বইটিতে অলৌকিকতাকে বিশ্বাস করার চিরায়ত নিয়মকে সন্ডার্স ভেঙে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন,‘মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে লিখিত বইয়ের সবচেয়ে বড় দিক হচ্ছে, এসব বিশ্বাসকে যতটা সম্ভব দূরে সরিয়ে রাখা।’

তিন শো আটষট্টি পৃষ্ঠার দীর্ঘ উপন্যাসটি লিখতে সন্ডার্স সময় নিয়েছেন চার বছর। অথচ উপন্যাসটিতে তিনি একটিমাত্র রাতের ঘটনাবলীর অবতারণা ঘটিয়েছেন। বিশ্বসাহিত্যে এমন অনেক রচনা রয়েছে যেখানে একটিমাত্র ঘটনা, একটিমাত্র দিন বা রাত, একটিমাত্র স্থানকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। জেমস জয়েসের বিখ্যাত উপন্যাস ইউলিসিস ১৯০৪ সালের ১৬ জুনের একটি মাত্র দিনের ঘটনাকে ঘিরে হাজার পৃষ্ঠার উপন্যাস। এই উপন্যাসে তিনি অতি সাধারণ চরিত্র ও ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে জাগতিক ধারণাকে উপস্থাপন করেছেন। এক্ষেত্রে সন্ডার্স এক ভিন্ন ধরণের চ্যালেঞ্জেরে মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি সমান্তরালভাবে ইতিহাসের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাগতিক ও পরলৌকিক দুটি জগতকে উপন্যাসে উপস্থিত করেছেন। লিঙ্কনের মতো একজন কিংবদন্তি চরিত্রকে তিনি যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন কি-না তাই নিয়ে সন্ডার্স শঙ্কিত ছিলেন। কিন্তু যেহেতু তিনি এক রাতের ঘটনাকে উপন্যাসে উপজীব্য করেছেন, ফলে তাকে খুব একটা সমস্যায় পড়তে হয়নি বলে মনে করেন তিনি।

আটান্ন বছর বয়সে প্রথম উপন্যাস লিখেই পাঠকের মধ্যে হইচই ফেলে দিলেন সন্ডার্স। নিউইয়র্ক টাইমসইউএসএ টুডের জরিপে উপন্যাসটি মার্চ মাসে আমেরিকার বেস্ট সেলিংয়ের তালিকায় শীর্ষে ছিল। সাহিত্যবোদ্ধারা এই উপন্যাসটিকে এডগার লি মাস্টার্সের বিখ্যাত কবিতার সংকলন স্পোন রিভার অ্যান্থলজির সাথে তুলনা করেছেন। উপন্যাসটি সম্পর্কে নিউইয়র্ক টাইমসে এক মন্তব্যে কোলসন হোয়াইটহেড বলেছেন, ‘এটি উদারতা ও মানবতার উজ্জ্বল সৃষ্টিশীল কর্ম।’ উপন্যাসটি এবার প্রথমে ২০১৭ সালের ম্যান বুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পায় এবং পরে খ্যাতিমান দুই লেখক পল অস্টার ও আলি স্মিথের মতো প্রতিভাবান লেখকদের উপন্যাসকে পেছনে ফেলে পুরস্কার জিতে নেয়। উপন্যাসটি সম্পর্কে বুকার বিচারক কমিটির প্রধান, অর্থাৎ জাজেস অব চেয়ার লোলা ইয়ং বলেছেন, ‘এটি অসাধারণ একটি সৃষ্টিকর্ম। রসময়, বুদ্ধিদীপ্ত ও আবেগী আখ্যানকে তুলে ধরেছে।’ পুরস্কার প্রাপ্তির পর সাংবাদিকদের সঙ্গে এক প্রতিক্রিয়ায় সন্ডার্স বলেছেন, ‘আমি উপন্যাসটি লেখার সময় বহুবার থমকে গেছি, ভেবেছি আমি আসলে কী লিখছি। আমি যা লিখছি তা আসলে আদৌ কিছু হয়ে উঠছে কি-না। আমি এখনো, আমি যা…বুঝাতে চাচ্ছি, উপন্যাসটি হয়তো নিজেই বলবে এটি একটা উপন্যাস হয়ে উঠেছে।’ তিনি তাঁর প্রতিক্রিয়ায় আরো জানিয়েছেন, মার্কিন ঐতিহ্য অনুসারে একটা উপন্যাস তার মলাটের দ্বারা বিশেষায়িত হয়। পুরস্কারগ্রহণ উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘আমরা অদ্ভূত এক সময়ে বসবাস করছি। জগতজুড়ে যে প্রশ্নটা ঘুরপাক খায় তা কিন্তু অতি সাধারণ প্রশ্ন। রীতিকে বাদ দিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করবো, প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া দেখাবো, নাকি বিশ্বাসের আদি অগ্রগতি আর ভালোবাসা নিয়ে অব্যাহতভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাব?’ ম্যান বুকার কর্তৃপক্ষকে পুরস্কার প্রদানের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, এই পুরস্কারটি তাঁর অবশিষ্ট কাজগুলো সম্পন্ন করার আত্মবিশ্বাস জোগাবে।

বলা প্রয়োজন, এটি সন্ডার্সের প্রথম উপন্যাস হলেও তিনি এর আগে অসংখ্য গল্প ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন। এছাড়া আছে একাধিক সংকলনগ্রন্থও। তাঁর লেখায় তিনি আবেগের সফল বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর আবেগিক উপস্থাপন সম্পর্কে প্যারি রিভিউ-এর এক সাক্ষাৎকারে তিনি হেসে জবাব দিয়েছিলেন, ‘আবেগ আমাদের প্রজন্মের ঐতিহ্য।’ কথাসাহিত্য সম্পর্কে আরেক সাক্ষাৎকারে তাঁকে গল্প সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘গল্প হচ্ছে একটি ব্ল্যাকবক্স। আপনি যখন এর ভেতরে প্রবেশ করবেন, গভীর সত্যের আলোকরশ্মী খুঁজে পাবেন।’ তার টেন্থ অব ডিসেম্বর গল্পটি গার্ডিয়ানের বিচারে সর্বকালের সেরা একশত গল্পের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে।

একজন প্রকৌশলী হিসেবে সন্ডার্স তাঁর পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন এবং জিওফিজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ১৯৮৯-১৯৯৬ পর্যন্ত কাজ করেছিলেন। কিন্তু রক্তে যাঁর সাহিত্যের অমিয় সুধা প্রবহমান, তিনি সাহিত্য থেকে দূরে থাকতে পারবেন কী করে। ১৯৮৮ সালে তিনি সাইরাকুজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ১৯৯৭ সালে সাইরাকুজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ২০০৬ সালে তিনি ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ অর্জন করেন যার অর্থমূল্য নোবেল পুরস্কারের অর্ধেক (পাঁচ কোটি টাকা)। একই বছর গাগেনহেইম ফেলোশিপও লাভ করেন তিনি। চারবার অর্জন করেছেন আমেরিকার ন্যাশনাল ম্যাগাজিন অ্যাওয়ার্ড। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্প ও নভেলেট সংকলন সিভিলওয়ার ল্যান্ড ইন ব্যাড ডিক্লাইন। এটির জন্য তিনি হেমিংওয়ে পুরস্কার লাভ করেছিলেন। ১৯৯৭ ‘সালে দ্য ফলস’ ছোটগল্পের জন্য ও‘হেনরি পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৬ সালে ছোটগল্প ‘কমকম’-এর জন্য তিনি ওয়ার্ল্ড ফ্যান্টাসি অ্যাওয়ার্ড ফর বেস্ট শর্ট স্টোরিজ লাভ করেন। ২০০৯ সালে তিনি ছোটগল্পে অবদান রাখার জন্য ‘আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড লেটারস’ অ্যাওয়ার্ড পান। ২০১৩ সালে তিনি পেন পুরস্কার লাভ করেন। একই বছরে তাঁর ‘টেনথ অব ডিসেম্বর’ ছোটগল্পটি বছরের শ্রেষ্ঠ গল্প হিসেবে স্টোরি অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। নিউইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনও এই গল্পটিকে বছরের শ্রেষ্ঠ গল্পের স্বীকৃতি দেয়। ২০১৪ সালে তিনি আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স-এর সদস্য নির্বাচিত হন। বুকারজয়ী প্রতিভাবান এই লেখক ১৯৫৮ সালে আমেরিকার টেকসাসে জন্মগ্রহণ করেন। আগামী দিনের পাঠকরা, কোনো সন্দেহ নেই তাঁর পরবর্তী কাজগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকবে।

সন্ডার্সকে বুকার পুরস্কার পাওয়ার জন্য, এই সুদূর থেকেও অভিনন্দিত করি।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close