Home অনুবাদ মাও সে তুং-এর পাঁচটি কবিতা > শামসুর রাহমান অনূদিত >> অগ্রন্থিত অনুবাদ

মাও সে তুং-এর পাঁচটি কবিতা > শামসুর রাহমান অনূদিত >> অগ্রন্থিত অনুবাদ

প্রকাশঃ August 17, 2017

মাও সে তুং-এর পাঁচটি কবিতা > শামসুর রাহমান অনূদিত >> অগ্রন্থিত অনুবাদ
0
0

মাও সে তুং-এর পাঁচটি অগ্রন্থিত কবিতা > শামসুর রাহমান অনূদিত

ভূমিকা > মাসুদুজ্জামান

১৯৭৬ সালের কথা। শামসুর রাহমান তখন দৈনিক বাংলার সহকারী সম্পাদক। ডিআইটি রোডের উত্তর দিকের মোড়টাতে ছিল দৈনিক বাংলা ভবন। ওই ভবনের দোতলায় ছিল সহকারী সম্পাদকদের কক্ষ। সেখানে বসতেন মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, আহমেদ হুমায়ুন, শামসুর রাহমান এবং আরও কয়েকজন। আমি তখন সবে কবিতা লেখা শুরু করেছি। গদ্যও লিখতাম। দৈনিক বাংলার কিংবদন্তি সাহিত্য সম্পাদক আহসান হাবীব, মানে হাবীব ভাইয়ের সঙ্গে এর কিছু দিন আগে ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি কোনো একটা সময়ে ভীরু ভীরু পায়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করে কবিতা দিয়েছি। আর পরিচয়ের প্রায় শুরু থেকেই বিভিন্ন সংখ্যায় আমার একাধিক কবিতা তিনি প্রকাশ করেছেন। গদ্যও লিখেছি কিছু হাবীব ভাইয়েরই নির্দেশে বা অভিপ্রায় অনুসারে। গদ্য লেখকের অভাব এখন যেমন, তখনও এরকমই ছিল। বরং বলা ভালো, অভাবটা আরও বেশি ছিল। কিন্তু একটা পত্রিকাতো আর কবিতা দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। প্রয়োজন পড়তো গদ্যের। হাবীব ভাইয়ের উৎসাহে তাই আমার গদ্য লেখালেখিরও সূচনা ঘটে। তিনিই আমার গদ্যগুলি প্রকাশ করতেন। এইভাবে গদ্য-পদ্য-অনুবাদের সূত্রে হাবীব ভাইয়ের সঙ্গে তখন আমার সম্পর্কটা অনেকটা সহজ হয়ে এসেছে। মনে হয়েছিল, একজন নবীন লেখক হিসেবে আমি তাঁর আস্থা অর্জন করতে পেরেছিলাম। এরকম একটা সময়ে ১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর চীনের মহান নেতা মাও সে তুং (এখন বলা হয় মাও জে ডং) মৃত্যুবরণ করেন। প্রায় সারা পৃথিবী জুড়ে সমাজতন্ত্রে মতাদর্শী মানুষদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে চীনের ভূমিকা বিপরীতধর্মী হলেও মাও সে তুং তখনও একজন শ্রদ্ধেয় নেতা হিসেবে অনেকের কাছেই গুরুত্ব পেতেন। এই মৃত্যুর ঘটনা যেদিন ঘটলো সেদিনই আমি দৈনিক বাংলায় যাই এবং যথারীতি হাবীব ভাইয়ের রুমে ঢুকে একটা চেয়ারে বসতে বললে আমি নিঃশব্দে বসে হাবীব ভাইয়ের সম্পাদনার কাজগুলি দেখছিলাম। হঠাৎ হাবীব ভাইয়ের কি যেন মনে হলো, তিনি আমাকে বললেন, মাও সে তুংয়ের কবিতা পড়েছো? আমি বললাম কিছুদিন আগে একটা সংকলন দেখেছিলাম, আর সেটা রাহমান ভাইয়ের টেবিলে। সঙ্গে সঙ্গে হাবীব ভাই ইন্টারকমে শামসুর রাহমানকে ফোন করলেন। করেই বললেন, আপনি কি অনুগ্রহ করে মাওয়ের কয়েকটা কবিতা অনুবাদ করে দেবেন। প্রত্যুত্তরে, হাবীব ভাইয়ের উদ্ভাসিত শান্ত মুখ দেখে বুঝলাম, রাহমান ভাই রাজি হয়েছেন। আমাকে বললেন, তুমিও পারলে একটা-দুটো কবিতা অনুবাদ করে দাও। প্রস্তাবটা শুনে আমি তো অনেক খুশি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ঘামছি। তবু সাহস করে বললাম, ঠিক আছে হাবীব ভাই করবো। তিনি বললেন, শামসুর রাহমানকে বলে দিচ্ছি তোমাকে সংকলনটা দেবেন, তুমি একটা কবিতা ওর সংকলন থেকে লিখে (তখন ফটোকপির যুগ শুরু হয়নি) নিয়ে যাও। রাতেই অনুবাদ করে কাল আমাকে দেবে। হাবীব ভাই আবার রাহমান ভাইকে ফোন করলেন। আমি ছুটলাম দোতলায়। গিয়েই দেখি রাহমান ভাই সংকলনের কবিতাগুলি আবার পড়ছেন। আমাকে দেখেই বললেন, কী বিপদ বলেন তো, হাবীব ভাই বলেছেন অনুবাদ করতে, তাঁর কথাতো ফেলতে পারি না। আপনিই বরং সংকলনটা নিয়ে যান, আপনিই অনুবাদ করেন। আমি বললাম, তা কী করে হয়, আমি খুব বেশি হলে একরাতে একটা-দুটো কবিতা অনুবাদ করতে পারবো। হাবীব ভাই চান আপনিই অনুবাদ করেন। আমাকে বলেছেন, চেষ্টা করতে। যথারীতি আমি একটা কবিতা লিখে নিয়ে রাহমান ভাইয়ের অনুবাদকর্মে আর ডিসটার্ব না করে ফিরে এলাম। পরদিন একটা কবিতা নিয়ে হাবীব ভাইকে দিলাম। আমার সামনে পড়তে পড়তেই তার মুখ দেখে বুঝলাম, প্রকাশের হয়তো অনুমোদন পাওয়া গেল। হাবীব ভাই আমার অনুবাদটা প্রেসে পাঠিয়ে দিলেন। বললেন, তখনও রাহমান ভাই তাঁর অনুবাদ দেননি। হাবীব ভাই বললেন, ও এরকমই, দিনের শেষ মুহূর্তে আমি যখন অফিস ত্যাগ করবো, ঠিক তাঁর আগেই দেখো অনুবাদ পাঠিয়ে দেবেন। আর যদি না দেন তোমার কবিতাটাই প্রকাশ করবো। হাবীব ভাইয়ের কথাই ঠিক ফলে গেল। রাহমান ভাই অনুবাদগুলি পাঠালেন একেবারে শেষ বিকেলে, এর মাঝে দু-বার রাহমান ভাইয়ের সঙ্গে হাবীব ভাই কথা বললেন ইন্টারকমে। অপেক্ষার অবসান হতেই অনুবাদগুলি হাতে পেয়েই পড়া শুরু করলেন আর তাঁর মুখ অনেকটা আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে কবিতাগুলি প্রেসে পাঠিয়ে দিলেন। ঠিক এর একদিন পর ১২ সেপ্টেম্বর রাহমান ভাইয়ের ৫টি অনূদিত কবিতা রবিবারের সাহিত্য বিভাগে প্রকাশিত হল। ওই পাঁচটি কবিতার তলায় আমার কবিতাটাও দেখি হাবীব ভাই প্রকাশ করেছেন। রাহমান ভাইয়ের অনুবাদের সঙ্গে আমার অনুবাদ, স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ আনন্দ হয়েছিল সেদিন। তবে আমি শুধু একটা কথাই ভাবছিলাম, এক রাত এবং একটা দিনের প্রায় অর্ধেকটা সময় নিয়ে একটা কবিতা অনুবাদ করতে আমাকে কতটা গলদঘর্ম হতে হয়েছে, আর রাহমান ভাই এই সময়ের মধ্যেই পাঁচ-পাঁচটি কবিতা অনুবাদ করে ফেললেন! হাবীব ভাইয়ের পড়া হলে আমি ওই পাণ্ডুলিপি হাবীব ভাইয়ের কাছ থেকে নিয়ে দেখেছি। মনে হল, একবারে অনুবাদ করেছেন রাহমান ভাই। এক-আধ জায়গায় কাটাকুটি আছে, কিন্তু সেটা তেমন কিছু নয়। দু-একটা শব্দের বিকল্প তিনি কাটাকুটি করে চূড়ান্তভাবে যেটা রাখা দরকার মনে করেছেন সেসবই রেখেছেন। পরে এই অনুবাদ নিয়ে রাহমান ভাইয়ের সঙ্গে অনেক কথা হয়েছে, কিন্তু সেটা আরেক প্রসঙ্গ। আমার জানা ছিল, মৌলিক কবিতা রচনার পাশাপাশি শামসুর রাহমান অন্য ভাষার কবিদের কবিতাও অনুবাদ করেছেন। অনুবাদক হিসেবেও তাঁর পরিচয় ব্যাপক না হলেও একেবারে অনুল্লেখযোগ্য নয়। অনুবাদ, বোঝাই যায়, পছন্দের কবিদেরই সাধারণত করে থাকেন যে-কোনো কবি বা অনুবাদক। শামসুর রাহমানও তাঁর পছন্দের কবিদের কবিতা অনুবাদ করেছেন। এদের মধ্যে আছেন রবার্ট ফ্রস্ট, খাজা ফরিদ, পাবলো নেরুদা, হোর্হে লুই বোর্হেস, পল এলুয়ার, তাদেউশ রোজেভিচ, ই ই কামিংস, কাইফি আজমি এবং আরও অনেকেই। এই তথ্য আমাদের অজানা নয়। এইসব অনুবাদ নিয়ে প্রথমা থেকে একটা বইও বেরিয়েছে শামসুর রাহমান অনুবাদ কবিতা সমগ্র নামে। কিন্তু দেখছি, এই বইতেও শামসুর রাহমান যে মাও সে তুংয়ের কবিতা অনুবাদ করেছিলেন, সেই কবিতাগুলি সংকলিত হয়নি। প্রথমার এই সংকলনটি সেদিক থেকে অসম্পূর্ণ একটা সংকলনই বলবো। তীরন্দাজের পাঠকদের জন্য এখানে সেই পাঁচটি কবিতা প্রকাশ করা হলো।

ছবির উৎস : ছবিটি পরের মাসে ২৬ নভেম্বর ১৯৭৬ সালে দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত হয়। এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে ময়মনসিংহের একটা সাহিত্যসভায় শামসুর রাহমান কবিতা পড়ছেন। এই ছবিও পরে আর কোথাও মুদ্রিত হতে দেখিনি।

 

লিউপান পাহাড়ে

আকাশ অনেক উঁচু, মেঘমালা কেমন বিবর্ণ,

আমরা দেখছি বুনো রাজহংসীগুলি হচ্ছে অদৃশ্য দক্ষিণে।

যদি ব্যর্থ হই ঐ মহাপ্রাচীরে

পৌঁছুতে তাহলে আমরা পুরুষ নামের যোগ্য নই,

আমরা যারা ইতিমধ্যে শত শত মাইল করেছি অতিক্রম।

 

লিউপান পাহাড়ের সুউচ্চ চূড়ায়

লাল পতাকারা

পশ্চিমা হাওয়ায় তরঙ্গিত, কী স্বাধীন।

আমরা ধরেছি হাত আছে দীর্ঘ দড়ি

আমরা কখন কক্ষে বাঁধবো ধূসর ড্রাগনকে?

 

শানশানে ফেরা

 

মনে-পড়ে-যাওয়া কোনো আবছা স্বপ্নের মতো

অনেক আগেকার পলাতক অতীতকে আমি অভিশাপ দিই-

আমার ছেলের মাটি, কেটে গেছে বত্রিশটি বছর।

যখন স্বেচ্ছাচারী শাসকের কালো নখগুলি

ওপরে তুলে ধরছিলো ওর চাবুক,

লাল পতাকা জাগ্রত করেছিলো ভূমিদাসকে, যার হাতে টাঙ্গি,

তিক্ত বলিদান দৃঢ় অঙ্গীকারকে করে শক্তিশালী,

যার নতুন আকাশে চাঁদ আর সূর্য়কে জ্বালিয়ে রাখার সাহস জোগায়

কী সুখী। আমি দেখছি ধান আর মটরশুটির তরঙ্গিত ক্ষেত,

আর দেখছি চতুর্দিকে সন্ধ্যার কুয়াশায় বীরদের ঘরে ফেরা।

 

পরীর গুহা

 

গোধূলির গাঢ় দীর্ঘ ছায়ায়

দাঁড়ানো কী দৃঢ় পাইনের শ্রেণী।

বর্ণিল মেঘ উড়ে যায় দূরে, প্রশস্ত, দ্রুত।

অপরূপ রূপে প্রকৃতি নিজেকে

ছাড়িয়ে গিয়েছে পরী গুহায়।

বিপজ্জনক পাহাড় চূড়ায় সুন্দরীতমা

অনন্ত তার বৈচিত্র্যের করে বসবাস।

 

কমরেড কও মোজোকে জবাব

 

চরাচরে ফেটে পড়লো দুরন্ত বৃষ্টি ঝড়,

তাই শাদা হাড়ের স্তূপ থেকে উঠে এলো এক শয়তান।

বিভ্রান্ত সন্ন্যাসী ছিলেন না আলোর পরপারে,

কিন্তু বিদ্বেষপরায়ণ অপদেবতা ধ্বংসলীলায় মেতে উঠবেই।

সোনালি বানর দারুণ রোষে

ঘোরালো তার অতিশয় ভারী লাঠি

আর ফিরোজা পাথরের মতো আকাশ থেকে মুছে গেলো ধুলো।

আজ, যখন আবার দুষিত কুয়াশা উঠে আসছে,

আমরা অভিবাদন জানাই সেই বিস্ময়কর্মা সুউচ্চ কুংকে।

 

টাপোটি

 

লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল, নীলচে-বেগনি, বেগনি-

এই রঙিন ফিতে আকাশে দুলিয়ে নাচছে কি?

বৃষ্টির পরে রোদ ফিরে আসে তেরচা হয়ে

এবং পাহাড় আর গিরিপথ হয়ে যায় আরো গাঢ় নীল।

 

একদা এক উন্মত্ত যুদ্ধ বেধেছিলো এখানে,

গ্রামের দেয়ালগুলি, বুলেটে বিক্ষত,

এখন পাহাড় আর গিরিপথটিকে দিয়েছে সাজিয়ে

এবং ওদের করেছে দ্বিগুণ সুন্দর।

উৎস

রবিবারের সাহিত্য, দৈনিক বাংলা, ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close