Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ মাসুদুজ্জামান > কে পাবেন ম্যান বুকার পুরস্কার? >> সাহিত্য সংবাদ

মাসুদুজ্জামান > কে পাবেন ম্যান বুকার পুরস্কার? >> সাহিত্য সংবাদ

প্রকাশঃ October 12, 2017

মাসুদুজ্জামান > কে পাবেন ম্যান বুকার পুরস্কার? >> সাহিত্য সংবাদ
0
0

মাসুদুজ্জামান >> কে পাবেন ম্যান বুকার পুরস্কার?

সাহিত্য সংবাদ ও বিশ্লেষণ

সছে ১৭ অক্টোবর ম্যান বুকার সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা করা হবে। গতমাসে শর্টলিস্ট ঘোষণা করা হয়েছে। শর্টলিস্টে আছে ছ’জন ঔপন্যাসিকের ছ’টি উপন্যাস। এদের মধ্য থেকেই একজন পাবেন এই পুরস্কার। কিন্তু তার আগে বুকার পুরস্কার সম্পর্কে কিছু বলে নিই।

বুকার সাহিত্য পুরস্কারটি দেওয়া হয় ব্রিটেন থেকে। ব্রিটেনের ম্যান গ্রুপ এই পুরস্কারটি দেয়। পুরস্কারটি দুইভাবে দেওয়া হয় : একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার : The Man Booker International Prize; আরেকটি ইংরেজি ভাষায় লেখা উপন্যাসের জন্য পুরস্কার : The Man Booker Prize। আন্তর্জাতিক পুরস্কারটি সারা পৃথিবীর ঔপন্যাসিকদের জন্য উন্মুক্ত। তবে এটি দেওয়া হয ইংরেজিতে অনূদিত উপন্যাসকে। যে-কোনো ভাষায় উপন্যাসটি লেখা হোক না কেন, সেটি ইংরেজিতে অনূদিত হলেই কেবল পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হয়। সারা পৃথিবীর ঔপন্যাসিকদের জন্য উন্মুক্ত বলে পুরস্কারটির নাম : The Man Booker International Prize। অন্যদিকে The Man Booker Prize-টা দেওয়া হয় শুধুমাত্র ইংরেজিতে রচিত উপন্যাসের জন্যে। জাতিগত পরিচয়, অর্থাৎ ঔপন্যাসিক যে-দেশেরই হোন না কেন, তাঁর উপন্যাসটি ইংরেজিতে লেখা হতে হয়।

দুটি পুরস্কারের জন্যেই দুটি নিয়ম মেনে পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রথমত, বিচারকদের একটা প্যানেল আছে; দ্বিতীয়ত, পুরস্কার দেওয়ার আগেই তারা একটা শর্টলিস্ট প্রকাশ করে। তারপর কিছু সময়ের ব্যবধানে চূড়ান্তভাবে কোন উপন্যাসটি পুরস্কার পেল, সেটি ঘোষণা করা হয়। হ্যাঁ, পুরস্কার দেওয়া হয় যে বছরে পুরস্কারটি দেয়া হচ্ছে সেই বছরে প্রকাশিত উপন্যাস থেকে। বিচারকমণ্ডলীতে কারা আছেন তাদের নাম-পরিচয়ও প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ বুকার পুরস্কারটি দেওয়া হয় এমন একটা প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, যা স্বচ্ছ, উন্মুক্ত। কোনো কিছুই গোপনে করা হয় না, যেমনটা করা হয় নোবেল পুরস্কারের ক্ষেত্রে। নোবেল পুরস্কারের বিচারকমণ্ডলীতে কারা থাকেন, কোন কোন লেখককে পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করা হবে, তার কোনো কিছুই জানায় না। কিন্তু বুকার পুরস্কারটির ক্ষেত্রে এমনটা করা হয় না। এমনকি শর্টলিস্ট প্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গেও পুরস্কার দেওয়া হয় না। পুরস্কারটি ঘোষণা করা শর্টলিস্ট প্রকাশ করার দুই মাস পরে। এই পুরস্কারের জন্য যেহেতু বুকার আগে থে্কেই শর্টলিস্ট করে ছটি উপন্যাসের নাম ঘোষণা করে দেয়, ফলে যত জল্পনা-কল্পনা ওই ছটি উপন্যাসকে ঘিরেই। এর বাইরে কোনো উপন্যাসের পুরস্কার পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

কিন্তু নোবেল পুরস্কারের ক্ষেত্রে কী হয়? নোবেলের ক্ষেত্রে যেহেতু শর্টলিস্ট করে কারু নাম ঘোষণা করা হয় না. ফলে, যে যার মতো অনুমান করতে থাকেন- কে পুরস্কার পাবেন তাই নিয়ে। প্রতিবার তাই অসংখ্য নাম উচ্চারিত হতে থাকে। কেউ-ই সঠিক করে বলতে পারেন না কে পাবেন পুরস্কারটি। এই সুযোগে আরেকটি ব্যাপার ঘটে। কে পুরস্কার পাবেন এই নিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়া অনুমানভিত্তিক তালিকা প্রকাশ করে। জুয়াও খেলা হয়। জুয়াটা কেমন এবার বলি। যে প্রতিষ্ঠানটি জুয়ার আয়োজন করে, তারা নানা দিক থেকে বিশ্লেষণ করে নিজেরা একটা তালিকা প্রকাশ করে- প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়… এইরকম ক্রম অনুসরণ করে। তাতে ওই তালিকায় দেখা যায় অসংখ্য নাম থাকছে। প্রথম দিকে যে নামগুলি থাকে, তাদের পক্ষেই যারা জুয়া খেলে তারা বাজি ধরে। কত জন পাঠক বা জুয়ারু কার পক্ষে বাজি ধরছে, তারই ভিত্তিতে কে পেতে পারেন পুরস্কারটি- ক্রম অনুসারে সম্ভাব্য সেই সব লেখকের তালিকা প্রকাশ করা হয়। যেমন এবার ২০১৭ সালে ল্যাডব্রক্স নামের একটা প্রতিষ্ঠান একটা তালিকা প্রকাশ করেছিল, যার শীর্ষে ছিলেন এনগুগি ওয়া থিয়োং’ও। দ্বিতীয় নামটি ছিল মার্গারেট অ্যাটউডের। এর অর্থ হচ্ছে, এনগুগির পক্ষে সর্বোচ্চ সংখ্যক পাঠক পাঠক বা জুয়ারু বাজি ধরেছিল। এটা এমন একটি তালিকা যা তৈরি করা হয় পাঠকদের আকাঙ্ক্ষার উপর, তাদের বাজি ধরার উপর। আমাদের একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে যে এই তালিকাটি তৈরি করে কোনো প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তা নয়, পাঠকদের ওপর জরিপ করে এই তালিকাটা তৈরি করা হয়। এরকম তালিকার কি তাহলে কোনো গুরুত্ব নেই? আছে। সেটা হলো, কোন লেখক আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সবচেয়ে জনপ্রিয় সেটা বোঝা যায়। আর এই তালিকা থেকেই দেখা গেছে গত দশবছরে প্রায় ৫০ ভাগ লেখক পুরস্কার পেয়েছেন। অর্থাৎ তাদের অনুমান পঞ্চাশ ভাগ সত্যি হয়েছে। কিন্তু নোবেল পুরস্কার কমিটি কোন বিবেচনায় কাকে পুরস্কার দেবে, বলা কঠিন। তবে তারা আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান না হলে পুরস্কার দেয় না। হয়তো কম খ্যাতিমান হতে পারেন কিন্তু তাকে আন্তর্জাতিকভাবে পঠিত লেখক হতে হয়। বয়স কম, মাত্র কয়েক বছর ধরে লিখছেন, এরকম লেখকও পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হন না। তাই এবার যখন কাজুও ইশিগুরোকে পুরস্কার দেওয়া হলো, যার চার-চারটি উপন্যাস বুকার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল এবং তিনি একবার পুরস্কারও পেয়েছেন, তিনি যে অজ্ঞাত-অখ্যাত লেখক নন, সেটা বলাই বাহুল্য।

২০১৭ সালের বুকার পুরস্কার : কে পাবেন?

আর কদিন পর, ১৭ অক্টোবর বুকার পুরস্কার ঘোষণা করা হবে। পুরস্কারটি দেওয়া হবে মূল ইংরেজিতে লেখা উপন্যাসর জন্য। গত মাসেই বিচারকমণ্ডলী ছটি উপন্যাসের নাম শর্টলিস্টে তুলে ধরেছে। এই ছটি উপন্যাসের নাম, ঔপন্যাসিক, কোন দেশের লেখক আর প্রকাশক-এর তালিকা :

4321 by Paul Auster (US) (Faber & Faber)

History of Wolves by Emily Fridlund (US) (Weidenfeld & Nicolson)

Exit West by Mohsin Hamid (UK-Pakistan) (Hamish Hamilton)

Elmet by Fiona Mozley (UK) (JM Originals)

Lincoln in the Bardo by George Saunders (US) (Bloomsbury Publishing)

Autumn by Ali Smith (UK) (Hamish Hamilton)

এই তালিকার তিন জন নারী, তিনজন পুরুষ। তাদের উপন্যাসের বিষয়বস্তুতেও বৈচিত্র্য আছে। ইংল্যান্ডের গ্রামে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জন্য একটি পরিবার সংগ্রাম করছে- এরকম কাহিনি থেকে শুরু করে দু’জন উদ্বাস্তুর প্রেম, যারা একটা অজানা শহরে আশ্রয় নেওয়ার জন্য ছুটছে- সেরকম গল্পও আছে। তালিকার তিন জন ঔপন্যাসিক আমেরিকান, দু’জন ব্রিটিশ, একজন ব্রিটিশ-পাকিস্তানি। পুরস্কারের জন্য প্রতিযোগীতাও হবে তরুণ আর প্রবীণের মধ্যেও। আমেরিকার দামী লেখক পল অস্টার এবং জর্জ সান্ডার্স যেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তেমনি আছে নতুন মুখের ঔপন্যসিকও। আর সেই নতুন ঔপন্যাসিক হচ্ছেন ২৯ বছর বয়সী ফিওনা মোজলে। মার্কিন নারী ঔপন্যাসিক এমিলি ফ্রিডল্যান্ডের উপন্যাসও প্রথমবারের মতো শর্টলিস্টে স্থান করে নিয়েছে। আলি স্মিথ, তিনি চতুর্থ বারের মতো শর্টলিস্টে ঢুকে পড়েছেন। মহসিন হামিদও দ্বিতীয়বারের মতো বুকারের শর্টলিস্টে স্থান পেয়েছেন। মার্কিন লেখক অস্টার, যার বয়স এখন ৭০ বছর, তাঁর উপন্যাসটিই সবচেয়ে দীর্ঘ, পৃষ্ঠা সংখ্যা ৮৬৬। লেখকের মতে তিনি সাড়ে তিন বছর ধরে গড়ে সাড়ে ছ’দিন ধরে উপন্যাসটি লিখেছেন। দুঃসংবাদ একটাই, অরুন্ধতী রায়ের বহুল আলোচিত উপন্যাস মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস পুরস্কার পাবে না। কারণ, শর্টলিস্টেই বইটা নেই।

১৭ অক্টোবর লন্ডনের গিল্ডহলে একটা ডিনার পার্টিতে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা হবে পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস ও লেখকের নাম। শর্টলিস্টের ঔপন্যাসিকেরা প্রত্যেকে পাবেন ২৫০০ পাউন্ড আর বিশেষভাবে বাঁধাই করা তাঁদের উপন্যাস। বিজয়ী ঔপন্যাসিক পাবেন ৫০০০০ পাউন্ড; সেই সঙ্গে কোনো সন্দেহ নেই, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। পুরো অনুষ্ঠানটি বিবিসি প্রচার করবে।

বুকার প্রাইজ ফাউন্ডেশন যে ছটি উপন্যাস শর্টলিস্টে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সেই উপন্যাসগুলি অন্ধ-পাঠকদের জন্য ব্রেইলে বড় আকারে প্রকাশের ব্যবস্থা করেছে, বের করেছে অডিও ভার্সন। ইতিমধ্যে এই দুটি ফরম্যাটে উপন্যাসগুলি পাওয়া যাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠার সোপান বুকার

প্রতি বছর সারা পৃথিবী জুড়ে বুকার পুরস্কার নিয়ে পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়। মিডিয়া ও বুকসেলাররা পাঠকদের আগ্রহের প্রেক্ষাপটে রমরমা ব্যবসাও করেন। বুকার পুরস্কারপ্রাপ্ত ঔপন্যাসিকেরা, অনেক সময় দেখা গেছে নোবেল পুরস্কারও পেয়েছেন, যেমন এবছরই নোবেল পুরস্কার পেলেন বুকারপ্রাপ্ত কাজুও ইশিগুরো। বুকার পুরস্কার পাওয়ার পর আরও যে কয়েকজন ঔপন্যাসিক বিশ্বখ্যাতি পেয়েছেন তারা হচ্ছেন সালমান রুশদি, হিলারি ম্যানটেল, আইরিশ মারডক, ইয়ান ম্যাককিউনের মতো ঔপন্যাসিক।

বুকার ও বাংলাদেশ

প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের কোনো ঔপন্যাসিকের উপন্যাস কি শর্টলিস্টে না হোক প্রাথমিক পর্বে কি বিবেচনায় ছিল? এই তথ্য আমাদের জানার উপায় নেই। কিন্তু অনুমান করতে পারি, যেহেতু ইংরেজিতে তেমন কেউ উপন্যাস লেখেন না, ইংরেজিতে বাংলাদেশের উপন্যাস অনূদিত হয়ে বইয়ের বিশ্ববাজারে স্থান করে নেয় না, ফলে কোনো উপন্যাস যে বিবেচনায় আসবে সেই সুযোগই থাকে না। বিশ্বের নামিদামি প্রকাশনা থেকে বাংলাদেশের অনূদিত উপন্যাস বা মূল ইংরেজি ভাষায় লেখা উপন্যাস যদি প্রকাশিত না হয়, তাহলে বুকার পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হবে না। নোবেল পুরস্কারের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। তবে এইসব পুরস্কার পেতে হবে, এমন কি কোনো কথা আছে? আমি বিশ্বাস করি, আমাদের বাংলা ভাষার ঔপন্যসিকেরা অনেক ভালো উপন্যাস লেখেন, বিশ্বমানের তুলনায় কোনো অংশেই যা ন্যূন নয়। পুরস্কারের জন্য ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করতে হবে, অথবা ইংরেজিতে উপন্যাস লিখতে হবে তাও মনে করি না। লেখক লেখেন সৃষ্টিশীলতার তাড়নায়, পুরস্কারের জন্য নয়। পাঠকেই তার শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। তবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কে কেমন লিখছেন সেটা জানা সম্ভব এইসব পুরস্কারের সূত্রে। আমাদের কাছে এইসব পুরস্কারের গুরুত্ব এইখানে, এর বেশি কিছু নয় বলে মনে করি।

শেষকথা

এবার যিনি বুকার পাবেন, বা যাঁদের নাম শর্টলিস্টে আছে, তাঁদের নামটা মনে রাখলে ভবিষ্যতে এদের কেউ যদি নোবেল পেয়ে যান, তাহলে তাঁকে অজ্ঞাত অখ্যাত লেখক বলে মনে হবে না। আপনাকে বলতে হবে না যে, ‘ওহ্, এই লেখককে তো চিনি না’- যেমনটা এবার শোনা গেছে বুকারপ্রাপ্ত ঔপন্যাসিক কাজুও ইশিগুরো নোবেল পাওয়ার পর!

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close