Home শ্রদ্ধাঞ্জলি মাসুদুজ্জামান > প্রণয় কান্তি, কবি ও একালের সক্রেটিস >> শ্রদ্ধাঞ্জলি

মাসুদুজ্জামান > প্রণয় কান্তি, কবি ও একালের সক্রেটিস >> শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রকাশঃ February 2, 2018

মাসুদুজ্জামান > প্রণয় কান্তি, কবি ও একালের সক্রেটিস >> শ্রদ্ধাঞ্জলি
0
0

মাসুদুজ্জামান > প্রণয় কান্তি, কবি ও একালের সক্রেটিস >> জন্মদিন
প্রণয়, প্রণয় কান্তি। নামটা লক্ষ করুন। পদবী বর্জন করা একজন মানুষ। মানুষই বলবো, পরে তো কবি। প্রণয় ছিলেন এমনই এক কবি, অসাধারণ মানুষ, যিনি নিঃসঙ্কোচে নিজের পদবী বর্জন করেছিলেন। একজন মানুষ যখন সার্বিকভাবে সংস্কারমুক্ত হতে পারেন, তখনই তিনি বর্জন করতে পারেন তার পিতৃপ্রদত্ত পদবী। কোনো বিশেষ ধর্মের নিগড়ে নিজেকে বাঁধতে চাননি বলেই তিনি এই পদবীটা ত্যাগ করেছিলেন।
প্রণয়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ফেসবুকে, সম্ভবত তিন বছর আগে। কীভাবে সেই পরিচয়টা হয়েছিল আজ আর মনে নেই। কিন্তু এটা মনে আছে যে প্রথম থেকেই প্রণয় নিজেকে আমার কাছে যেভাবে মেলে ধরছিলেন, তাতে ক্রমশ মুগ্ধ হচ্ছিলাম আমি। কী চমৎকার সংস্কারমুক্ত একজন মানুষ, কবি। কবিতা তো অনেকেই লেখেন। কবি পরিচয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠাও অর্জন করেন অনেকেই। কিন্তু এদের কাউকে কাউকে দেখি কতটা কূপমণ্ডুক, কতটা অমানবিক, কতটা সাম্প্রদায়িক, কতটা অনাধুনিক। অনাধুনিক বলতে আমি সেই মানুষকেই বুঝি যিনি সংস্কারমুক্ত নন, যিনি মানবিক নন। মানবিক আবার সার্বিক অর্থে। প্রণয়ের ছিল সেই সাধনা, সার্বিকভাবে মানবিক হয়ে ওঠার সাধনা। নিজের জীবনযাপনে, বিশ্বাসে, কবিতায় তিনি এটাই হতে চেয়েছিলেন, হয়েছিলেনও।
আমার এই পর্যবেক্ষণ, শুরুটা করি কবিতা দিয়ে? হাতের কাছে ওর যে বইটা পেলাম সেটার নাম ‘বুদ্ধির মুক্তি ও বেদনা-মাধুরী’। প্রথম যখন বইটা বের হয় আর সেই বছরের একুশের মেলায় ঢাকার আসার পর আমাকে বইটা নিজের হাতে উপহার দেয়, তখন বইটা হাতে নিয়ে এই নামটা আমার ভালো লাগেনি। খটকা লাগে ‘বুদ্ধির মুক্তি’ শব্দ দুটি নিয়ে। প্রণয় আমাকে কি তার কবিতার বই দিল না প্রবন্ধের? বুদ্ধির মুক্তি তো সেরকমই ইঙ্গিত করে। কিন্তু আজ বুঝতে পারি, ওই নামটা প্রবন্ধ-ঘেঁষা হলেও প্রণয় এই শব্দ দুটি কেন কবিতার বইয়ের নাম হিসেবে ব্যবহার করেছিল। প্রণয়ের এটাই ছিল লক্ষ্য, বুদ্ধির মুক্তি। যে-মানুষ সার্বিকভাবে সংস্কারমুক্ত, সব ধরনের সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত, সেই তো তার বুদ্ধিকে মুক্তি দিতে পেরেছেন। হয়ে উঠতে পারেন মানবিক।
এই বইয়ের প্রথম কবিতাটিতে দেখছি এমন সব পঙ্ক্তি, যা এই সংস্কারমুক্তির সাধনা বলে মনে হয় :

চাই মুছে যাক ধারণা তোমার
বিয়ে-প্রথার…
এ তো নয় ভালোবাসা
এ তো বিনাশ অস্তিত্বের
আর ভয়ংকর সে যন্ত্রণা সতীত্বের
দূর হোক অনিচ্ছায় কিংবা ইচ্ছা-অনিচ্ছার
এ বীভৎস মিলন
দূর হোক এ দাসত্ব
এ চরম নৈতিকতা।

এই ছিল ‘ভালোবাসার সমীকরণ’, প্রণয়ের কাছে। প্রণয় বলতে তিনি এটাই বুঝেছিলেন, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বর্জন করে নারীকে মানবী হিসেবে পেতে। ভালোবাসার নামে পুরুষের দ্বারা যেভাবে নারী নিগৃহীত হয়, সেই নিগ্রহের হাত থেকে তিনি নারীকে মুক্তি দিতে চেয়েছেন। পুরুষের কাছেই রূঢ় কণ্ঠে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘ওরা কি তোমায় ধর্ষণ শিখিয়েছে?’ নারী যে জরায়ুতে মানবপ্রজন্মকে ধারণ করে চলেছে, পুরুষেরও জন্ম নারীর গর্ভে, এসব কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে পুরুষতন্ত্রকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এই হচ্ছে প্রণয়ের বুদ্ধির মুক্তির, ভাবনার একটা দিক।
প্রথম কবিতার এই ভাবনা, লক্ষ করলেই বোঝা যায়, গড়িয়ে চলেছে ‘পুরুষ নাকি প্রেমিক’ শীর্ষক দ্বিতীয় কবিতায়। পুরুষকে পুরুষ নয়, প্রেমিক হওয়ার আর্তি ঝরে পড়েছে তার এই কবিতায়। এই কবিতার কয়েকটি পঙক্তি এরকম :

তুমি পুরুষ হলে ধর্ম দিয়ে আমায় আমূল বাঁধবে
তুমি প্রেমিক হলে আমায় ভালোবাসার তরে কাঁদবে

তুমি পুরুষ হলে চাইবে উগ্র জাতীয়তাবাদ
তুমি প্রেমিক হলে চাইবে বিশ^ মানবতাবাদ
তুমি পুরুষ হলে বন্ধ করবে আমার সার্বিক বিকাশ
তুমি প্রেমিক হলে মুক্ত থাকবে আমার সকল আকাশ।

এই পঙক্তিগুলো তীব্রভাবে বাইনারি বা বিপ্রতীপ বোধে উজ্জ্বল : ধর্মের বিপরীতে প্রেম, জাতীয়তাবাদের বিপরীতে মানবতাবাদ, বিকাশের পরিবর্তে আকাশে – এসবই হচ্ছে নারী-পুরুষের সম্পর্কে সূত্র। এই ভাবনা, নারীমুক্তিরও যে সূত্র, একটু লক্ষ করলেই সেটা বোঝা যায়। পরের কবিতায় তিনি এই ভাবনাকেই আরও বিশদ করেছেন। এক জায়গায় বলছেন, ‘দেখি পুরুষতন্ত্র / নারীকে বানিয়েছে শুধু সম্ভোগ-যন্ত্র।’ নারীকে বোঝার ক্ষমতা পুরুষ হারিয়ে ফেলেছে। শুধু কী পুরুষ, নারীও পুরুষতন্ত্রকে বুঝতে পারে না : ‘ওরা বুঝতে পারে না ওরাও মানুষ / ধরা দেয় ওরা পুরুষতন্ত্রের বানানো সকল ফাঁদে।’ এই ফাঁদ থেকেই নারীকে মুক্তি দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন প্রণয়।
কিন্তু শুধু বুদ্ধি নয়, যুক্তি নয়, প্রেমাবেগের দ্বারাও প্রাণিত ছিলেন প্রণয় :

আমাদের প্রেম তবে হবে
কবিতার মতো
কখনো হবে না শেষ।

এই অনিঃশেষ প্রেমে কিন্তু বুদ্ধির ছোঁয়া নেই। আছে প্রেমাস্পদের প্রতি দুর্নিবার টান, যার শেষ নেই। এই পুরুষকে নারী কি চিনতে পারছে? পরের কবিতার শুরুতেই তাই লিখলেন :

আমাকে চেনো?
আমি শক্তি
আমি মহাপ্রাণ
আমি আমাকে পাওয়ার জন্যে করি সত্যানুসন্ধান।

এই সত্যানুসন্ধান, বলা বাহুল্য, পুরুষতন্ত্র বর্জিত পুরুষ হিসেবে নিজেকে চিনতে পারা। বুদ্ধির মুক্তি বলতে প্রণয় এটাই বুঝেছিলেন, আত্মমুক্তিই ছিল তার অন্বিষ্ট। এই আত্মমুক্তি ছিল আসলে সব ধরনের সংস্কার থেকে মুক্ত হওয়া। কিন্তু এই মুক্ততার দিকটি কখনই নিরস আবেগহীন বুদ্ধির চর্চা বলে মনে হয়নি প্রণয়ের কাছে। এই বইতে তাই এমন অনেক কবিতা আছে, যে কবিতাগুলি লেখা হয়েছে তীব্র প্রেমাবেগ থেকে, যেখানে বুদ্ধি এসে প্রেমকে ঢেকে দেয়নি। এরকম কয়েকটি কবিতার কিছু পঙ্ক্তি তুলে ধরছি এখানে :

এ পথেই এসো
এ পথেই এসো
যাতে আমার কবিতার কথা মনে পড়ে যায়
যাতে লিখি কবিতা তোমায় দেখে
যাতে বেঁচে থাকে কবিতা
আর আমার চিরদিনের তুমি।

অথবা –

বৃষ্টি, তোমার চোখে তো অনেক জল
আমার জন্য এক ফোঁটা জল ফেলবে?
কেবল আমারই জন্যে?

এরকম অনেক কবিতা লিখে গেছেন প্রণয়। তার কবিতা পড়লে মনে হয় পূর্বাপর একজন সংস্কারমুক্ত বুদ্ধিদীপ্ত যুক্তিবাদী প্রেমিক ছিলেন প্রণয়। শুধু নারী-পুরুষের প্রেমকে আবর্তিত করে তার কবিতাগুলি রচিত হয়নি, তার প্রেম প্রসারিত ছিল জাগতিক সব কিছুতেই। কোনো ধরনের গোঁড়ামি বা সংস্কার তাকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। আর এসব কথা তিনি অকপটে ব্যক্ত করে গেছেন কবিতায়। প্রবচনও লিখেছেন তিনি। কবিতাঅন্ত প্রাণ ছিল তার। সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন তিনি, সে রকম তো অনেকেই থাকেন, কিন্তু প্রণয় সাহিত্যের প্রতি তার ছিল গভীর প্রণয়। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে দু-একবার কথা চালাচালি হয়েছে। কিন্তু শুধু সাহিত্য নয়, সাহিত্যের চাইতে মানুষকে সংস্কারমুক্ত করতে পারে যেসব বই বা চিন্তাশীল রচনা, তার প্রতিও প্রণয়ের ছিল দুর্মর আকর্ষণ। এই ধরনের পাঠতৃষ্ণা ছিল প্রবল।
সাহিত্যের প্রতি তাঁর প্রাণের টান যে কতটা গভীর ও আন্তরিক ছিল সেটা বুঝেছিলাম যখন দুঃসহ শারীরিক সমস্যাকে অগ্রাহ্য করে তিনি ঢাকার একুশের বইমেলায় চলে আসতেন। সঙ্গে থাকতেন তার সর্বসময়ের সঙ্গী কবিপত্নী কবি অনুপমা অপরাজিতা আর গৃহকর্মী কিশোরী একটি মেয়ে। এখানে, অনুপমার কথা একটু বলা দরকার বলে মনে করছি। অনুপমা প্রায় কুড়ি বছর সার্বক্ষণিকভাবে অসুস্থ স্বামীকে আগলে রেখেছেন। আমি যতবার দেখেছি, কখনও তাকে বিরক্ত হতে দেখিনি। অনুপমা নিজেও আমাকে বলেছেন, তার কবি হয়ে ওঠার পেছনেও রয়েছে প্রণয়ের অনুপ্রাণনা। প্রায় হাতে ধরে প্রণয় অনুপমাকে কবিতা লেখা শিখিয়েছেন। প্রণয়ের কারণেই তিনি কবি হয়ে উঠেছেন। তার সংস্কারমুক্ত আধুনিক জীবনবোধ গড়ে তুলতেও সাহায্য করেছেন প্রণয়। চিনিয়েছেন পড়িয়েছেন ভালো বই। শুধু কী অনুপমা? তাঁর জীবনবোধের দ্বারা দিক্ষীত হয়েছেন প্রণয়ের অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী। এটাই তো হচ্ছে একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতিকৃতি, যিনি নিজে মানবিক হবেন আর তার ছাত্র-ছাত্রী বা অন্যদের দেবেন আলোর সন্ধান। স্বগৃহে স্ত্রী অনুপমাও সেই আলোকের ঝর্নাধারায় ¯œাত হতে পেরেছিলেন।
প্রণয় আর অনুপমা – কী সৃষ্টিশীলতা কী জীবনবোধ – সব দিক থেকেই ছিলেন পরস্পরের পরিপূরক। ঢাকার একুশের বইমেলাতে এই কবি-দম্পতি একইসঙ্গে প্রতিবছর আসতেন। আর মেলাতে এলেই দেখা হয়ে যেত আমাদের। প্রণয় আমার সঙ্গে দেখা করতেন। সঙ্গে উপহার দিতেন তার বই। কিন্তু নিজের শরীরে দুরারোগ্য একটা ব্যাধি নিয়ে তিনি কী করে ঢাকায় আসতেন, কেনই বা আসতেন, এরকম একটা প্রশ্ন করলে প্রণয় বলেছিলেন, ‘স্যার, এটাই আমার সবচেয়ে আনন্দের সময়।’ আনন্দ কেন? ‘এই যে কত কত লেখক-কবির সঙ্গে মিলিত হতে পারছি, দেখা হচ্ছে, এতেই আমি আনন্দিত হই।’ বইমেলাতে প্রণয়কে দেখেও আমার ঠিক এমনটাই মনে হতো। তার চোখে-মুখে আনন্দের কী দীপ্তি, ঔজ্জ্বল্য! ব্যধির তীব্র ধকল সয়ে যে তিনি ঢাকায় এসেছেন, দু-তিন দিন থাকছেন, বইমেলার ধুলোবালির মধ্যে ঘুরছেন, মানুষের ভীড় বাঁচিয়ে সাবধানে চলছেন, অনিয়মের ফলে তার শরীর খারাপ হচ্ছে, প্রণয়কে দেখে সেটা কখনই মনে হতো না। আমি সেই উজ্জ্বল চোখ দুটি ভুলতে পারি না, যা নিজের নতুন বই প্রকাশের আনন্দে ছিল দ্যুতিময়।
কিন্তু আজ প্রণয় শুধুই স্মৃতি। কিন্তু আমি বলবো, এ আমার বিশ^াস, প্রণয় কখনও হারিয়ে যাবেন না। প্রণয়ের মতো মানুষেরা কখনও হারায় না। তাঁর দ্বারা যে-ই আলোকিত হয়েছেন তিনিই মনে রাখবেন প্রণয়কে। লালন করবেন তাঁর জীবনবোধ। আর তখনই স্মৃতি-বিস্মৃতির ঊর্ধ্বে উঠে প্রণয় বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে।
প্রণয়, সত্যি বড্ড ভালোবেসেছিল মানুষকে। তাঁর নামের অর্থ যেমন প্রেমকে আভাসিত করে, তেমনি তিনি মানুষকেও অনেক ভালোবেসেছিলেন। প্রণয়ের প্রয়াণলেখ লিখতে গিয়ে আজ তাই আমার চোখ দুটি ভিজে উঠছে। নশ্বর তাঁর দেহ এই মাটিতেই মিশে আছে, কিন্তু অবিনশ্বর তাঁর আদর্শ – ধারণ করছি আমরা। প্রণয় ছিলেন একালের সক্রেটিস। এখানেই প্রণয় চিরঞ্জীব। আজ ১ ফেব্রুয়ারি প্রণয়ের জন্মদিন। প্রণয়ের প্রতি আমার গভীর ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা।
ঢাকা
১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close