Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ মাসুদুজ্জামান > ‘মানুষের পরম্পরায়, প্রেমে, বন্ধুতায়…’ বিষ্ণু দে-র কবিতার একটি মানবপাঠ

মাসুদুজ্জামান > ‘মানুষের পরম্পরায়, প্রেমে, বন্ধুতায়…’ বিষ্ণু দে-র কবিতার একটি মানবপাঠ

প্রকাশঃ July 18, 2017

মাসুদুজ্জামান > ‘মানুষের পরম্পরায়, প্রেমে, বন্ধুতায়…’  বিষ্ণু দে-র কবিতার একটি মানবপাঠ
0
0

[সম্পাদকীয় নোট : আজ তিরিশের অন্যতম প্রধান কবি বিষ্ণু দে-র (১৯০৯-১৯৮২) ১১০তম জন্মদিন। কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলেও চিত্রসমালোচক হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। মতাদর্শিকভাবে বিষ্ণু দে ছিলেন মার্কসবাদী, ফলে, মানবিক অনুষঙ্গ যেমন তাঁর কবিতার, ভাবনার বিষয়আশয় হয়ে উঠেছে; তেমনি এলিয়টীয় ক্ষয়িষ্ণু ভাবনার প্রেক্ষাপটে সমকালের কথা তিনি তুলে এনেছিলেন কবিতায়। বিষ্ণু দে’র ১১০তম জন্মদিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তীরন্দাজে এই লেখাটি প্রকাশিত হলো।]

জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রবন্ধ

‘মানুষের পরম্পরায়, প্রেমে, বন্ধুতায়…’

বিষ্ণু দে-র কবিতার একটি মানবপাঠ

মাসুদুজ্জামান

[১]

সবকিছুই নান্দনিক বোধ এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির দ্বারা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। বিস্ময়কর হলেও একটা চিঠিতে কথাটা বলেছিলেন আভাঁগার্দ আন্দোলনের পুরোধা-ব্যক্তিত্ব ফরাসি কবি মালার্মে। বিষ্ণু দে, বলা বাহুল্য, তাঁর শিল্পভাবনাকে এই দুইয়ের দ্বারা পরিস্রুত করে নিয়েছিলেন। একদিকে মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষা, অন্যদিকে এলিয়টীয় নৈর্ব্যক্তিকতা, উভয়েরই সমীপবর্তী ছিলেন তিনি। কিন্তু এলিয়টীয় তির্যক ধর্মসমাজঘটিত দার্শনিকতা নয়, ‘ব্যক্তিসমাজের প্রাণময় আততি’র টানে ইতিহাসের দ্বন্দ্বময় প্রগতিতে আস্থা জ্ঞাপন করেছিলেন। তিনি মনে করতেন শিল্পসাহিত্যের চিরকালীন লক্ষণই হলো ‘চৈতন্য-জ্যাবদ্ধ টান’ যেখানে ‘শিল্পী ও শিল্পবস্তু, বিষয় ও টেকনিকে টান পড়ে জ্যাবদ্ধ ধনুকের টংকারে ধনু ও ছিলার টানের মতো’। সাধারণের জীবনই ছিল তার সৃজনশীলতার উৎস, “জনসাধারণের জীবনে ও আন্দোলনে লেখকের দৃষ্টি যেমন বেশি যাচ্ছে, তেমনি বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যে ও টেকনিকের প্রশ্নেও লেখকেরা মন দিচ্ছেন।”  কবিদের লক্ষ হয়ে উঠেছে ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে জনসংস্কৃতির সেতুবন্ধন :

আজ আমরা শিক্ষিত শ্রেণীর বিড়ম্বিত কাব্যসাধনার চূড়ান্তে এসেছি। আমাদের সংস্কৃতির ক্ষুরধার চূড়ায় সামাজিক সমর্থনের আশ্রয় নেই অথচ সমাজ-জীবনের মরিয়া তাগিদে আমাদের ব্যক্তিত্ববাদের দোরগোড়ায় হানা দিচ্ছে। আজকে তাই কবিকুলকে ভাবতে হচ্ছে বাংলার জনসমাজের চৈতন্যের সঙ্গে, দেশজ সংস্কৃতির সঙ্গে সেতুবন্ধনের কথা।

এ কারণেই সমগ্র বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি, বিশেষ করে ঈশ্বরগুপ্তের প্রাত্যহিক বস্তুনির্ভর মানবিকতা, রবীন্দ্রনাথের হৃদয়বৃত্তিক সূক্ষ্ম সৌকুমার্য, সংবেদ্যতা, বৈশ্বিক মানদ-, অবনীন্দ্রনাথ ও যামিনী রায়ের অইউরোপীয় লোকজ শিল্পঅন্বেষা তাকে যেমন প্রাণিত করেছে, তেমনি হোমার, দান্তে, শেক্সপীয়র, এলিয়ট, পিকাসো, এলুয়ার, আরাগঁ, মায়াকোভস্কি, নেরুদার শিল্পসাহিত্যের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সূত্রে বিষ্ণু দে বুঝেছিলেন, “লেখক শুধুমাত্র কারুশিল্পী নয়, শুধু অনুপ্রেরণায় মত্তও নয়, সমগ্র মানুষ, ব্যক্তিগত ও সামাজিক উভয় ভাবেই।”৪  কোনো সন্দেহ নেই, বিষ্ণু দে’র জীবনার্থ ও নন্দনভাষ্যের প্রকৃত লক্ষ্য ছিল মানুষ, সমগ্র মানুষ- লেখক এবং জনমানুষ উভয়েই। মার্কসীয় বোধে দীক্ষিত হয়ে বিপন্ন ও সংগ্রামী সাধারণ মানুষের জীবনকেই তিনি সৃষ্টি-আবেগের উৎস বলে বিবেচনা করেছিলেন। কবিতা রচনায় বিষ্ণু দে ছিলেন বহুপ্রজ, বিচিত্রপথগামী; তার কবিতাসমগ্রে এই মানুষই নানাভাবে উপজীব্য হয়েছে কাব্যজীবনের একেবারে সূচনালগ্ন থেকেই।

 

[২]

প্রথম কাব্যগ্রন্থ উর্বশী ও আর্টেমিসে (১৯৩৩) বিবিক্ত কবিসত্তা প্রেমের পথরেখা ধরে মানুষের কাছাকাছি আসতে চেয়েছে, “শফরী চোখের সরল চাহনি, চোখের কোলের / কালিমা মায়া চোখ ভুলিয়েছে…।” উর্বশী আর উমাকে তিনি ‘প্রেমপুটে’ পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু প্রেম আজ ঘরছাড়া, জনহীন বালুকার কূলে। কবি হিম-অবজ্ঞায় তার হৃদয়কে বিকল করে রেখেছেন, পৃথিবীর স্তব্ধতায় ডুবে গেছে পূর্বরাগ-সুর। পরিপার্শ্ব বৈরী, কেননা জনশূন্য, মানুষও বিপন্ন :

অদূরে পর্বত কালো আগন্তুক দস্যুর ইঙ্গিত।

জনশূন্য অরণ্যের কণ্টকিত অন্ধকার স্রোতে

স্তব্ধতা মথিত করে পিছু থেকে মর্মরিত ভয়

মুঠিতে আমার ক্লিষ্ট স্নায়ু চেপে মুখে চেয়ে রয়।

(অতিক্রম)

তিনি এসে পড়েছেন এমন এক পৃথিবীতে যেখানে এসে তিনি মানুষের ভাষা বুঝতে পারছেন না, ফলে ত্রিশঙ্কু তার হৃদয় :

মানুষের অরণ্যের মাঝে আমি বিদেশী পথিক,

মুখোমুখি কথা বলি- চোখে লাগে অটল প্রাচীর।

বিদেশী পথিক আমি এসেছি কি বিধাতার ভুলে

পৃথিবীর সভাগৃহে, বুঝি নাকো ভাষা যে এদের।

(সোহবিভেত্তস্মাদেকাকী বিভেতি)

নেতিতেই আরম্ভ হতে পারে শিল্পীমানসের প্রগতি, বলেছিলেন বিষ্ণু দে নিজেই; উর্বশী ও আর্টেমিসের সর্বশেষ কবিতা থেকেই কী শুরু হলো সেই অভিযাত্রা? দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ চোরাবালির (১৯৩৭) প্রথম কবিতাতেই কবি প্রতিপন্ন করলেন এই উক্তির যথার্থতা- জনসমুদ্রে দেখছেন জোয়ার, কিন্তু হৃদয়ে চড়া আবার একইসঙ্গে সেই অমোঘ আহ্বান, “কোথায় ঘোড়সওয়ার?” মানুষকে এবার তিনি ভাবছেন যুথবদ্ধ, জনসমুদ্রে উন্মথি কোলাহল, কিন্তু লক্ষ্যহীন, ফলে সবশেষে বলছেন :

হে প্রিয় আমার প্রিয়তম মোর,

আয়োজন কাঁপে কামনা ঘোর।

কোথায় পুরুষকার?

অঙ্গে আমার দেবে না অঙ্গীকার?

(ঘোড়সওয়ার)

কে এই প্রিয়? কবি তো পুরুষ, তাহলে কামনার কথা থাকলেও কোনো পুরুষ এই কবিতার উদ্দীষ্ট নয়। এখানে কে কবিকে পুরুষকারের জীবনবেদে উদ্দীপ্ত করবে? খুব স্পষ্ট না হলেও প্রগতিভাবনাই কবিকে উদ্দীপিত করে তুলছে বলে মনে হয়। লক্ষ্যহীন জোয়ারে ভেসে যাওয়া মানুষ কোথাও পৌঁছাতে পারে না, সে জন্যেই চাই কামনার ঘোর আয়োজন, সবকিছু বদলে দেওয়ার অভীপ্সা।

চোরাবালিতেই পাচ্ছি আরও ছড়ানোছিটানো কিছু মানুষ যারা একেবারেই সাধারণ- লিলি, রমা, অলকা, ডলু, সুরেশ, অনিরুদ্ধ রায়, মহাশ্বেতা, সুমি- এদের। এদেরকে ঘিরেই মধ্যবিত্তের অনুচ্চ আশা-আকাঙ্ক্ষা, চটুল আবেগ, প্রাত্যহিক জীবনের রিরংসা আর বিবমীষার কথা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সূক্ষ্ম ব্যাঙ্গাত্মক বাকভঙ্গি :

বিদ্যাদ্বেষী আত্মম্ভরী স্থূল অধ্যাপক;

বুদ্ধিদ্বেষী উদ্ধত শিক্ষক;

কুটিল, সংসারী নারী; লোলচিত্ত বন্ধুরা যাদের,

দ্বিপ্রহর ঘুমে কাটে, পরস্বে যাদের

ঘৃতসুচিক্কণ স্ফীত ঘাড়,

ব্যথিত বঞ্চক আর সাহিত্যের নেশাপেশাদার,

চিত্রকর, ফিলমস্টার, নব্য ব্যারিস্টার

সবই আজ ভালো সবই ভালো।

(প্রথমপার্টি)

মানুষের প্রতি এখনও কী সশ্রদ্ধ হতে পেরেছেন বিষ্ণু দে, কবিজীবনের এই পর্বে? শিখণ্ডির গানে মানুষ প্রসঙ্গে বলছেন :

মানুষ যে পশু, প্রমাণ তার

আহার তার।

মুখব্যাদান, দন্তবিকাশ, চর্বণ, ঠোঁটে হাতে মাখামাখি,

অজীর্ণতা

ইত্যাদি সব কী দারুণ রূঢ় বর্বরতা!

(শিখণ্ডির গান)

স্বাপ্নিক কবির কখনও কখনও মনে হয়েছে অমরলোকের ইশারা প্রেমিকার চোখে, তবু “চুম্বনতাড়নাকম্প্রবায়ু সিনেমায় মেলে নাকো ডিয়োটিমা।” কি করে এই দিয়োতিমা বা মোনালিসার দেখা পাবেন কবি যারা সৃজন-মননের সমুদ্রমন্থনে কবিকে ‘সংসারের সোনার খাঁচায়’ আবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর পটপরিসরে সাধারণ মানুষের কাছে টেনে নিয়ে যাবে? এখনতো চারদিকে নাগরিক কলরোল আর জীবন-জীবিকার টানে শশব্যস্ত মানুষ :

আশে আর পাশে, সামনে পিছনে

সারি সারি পিঁপড়ের সার

জানিনি আগে, ভাবিনি কখনো

এত লোক জীবনের বলি, মানিনি আগে

জীবিকার পথে পথে এত লোক,

এত লোককে গোপনসঞ্চারী

জীবন যে পথে বসিয়েছে জানিনি মানিনি আগে,

পিঁপড়ের সারি

গৌড়জনের ভিড়াক্রান্ত মধুচক্র হে শহর, হে শহর স্বপ্নভারাতুর।

(টপ্পা-ঠুংরি)

সমর সেনের কাব্যানুষঙ্গে এভাবেই ঔপনিবেশিক শাসনে পিষ্ট কলকাতা আর সেই শহরে বাস করা মানুষের বিপন্নতার কথা উঠে এসেছে বিষ্ণু দে-র কবিতায়। পূর্বলেখ (১৯৪১) শীর্ষক পরবর্তী কাব্যগ্রন্থে এই নাগরিক মানুষের কথাই আরও স্পষ্ট হয় :

জনতার আর্তনাদে অস্বাস্থ্যে ও কোলাহলে ভরে

ধোঁয়ায় মলিন ধ্রুম্রলোচনের পীঠস্থান ঘরে।

(বৈকালি)

চারিধারে সরীসৃপ ধূর্ত নাগরিক

অর্থকামস্বর্গ-ছিদ্র খোঁজে ঘুরে ফিরে।

অর্মরাজ্য লণ্ডভণ্ড, সহস্র শরিক।

অধিকার-ভেদে আর ভেজে নাকো চিঁড়ে!

(চতুর্দশপদী)

কিন্তু একইসঙ্গে চৌরঙ্গি বা নগরজীবন থেকে তাদেরই “সন্ধ্যাতারা ডেকে আনে শ্যামশান্ত ঘরে / সূর্যের শাসনে ক্ষিপ্ত ছত্রভঙ্গ যারা।” সাধারণ মানুষকে অতিক্রম করে কারও প্রাণসত্তায় নিজেকে যুক্ত করতে ইচ্ছে জাগে : “তোমার মনের শুভ্রশিখরে খুঁজেছি বাসা / নীড় আকাশ। / এ নিরাবলম্ব জনতাসাগরে চুকেছে ভাসা / রুদ্ধশ্বাস।”

প্রেমিকার কাছে গিয়ে আশ্রয় খোঁজা, সত্তা সমর্পণের এ হচ্ছে সেই সরল চিরায়ত পথ। জীবনানন্দ দাশ এই উত্তুঙ্গ রোমান্টিকতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন ‘বনলতা সেন’ শীর্ষক অসাধারণ শিল্পোত্তীর্ণ কবিতায়। কিন্তু প্রেমিকা নয়, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সান্নিধ্যেই ঘটেছে বিষ্ণু দে-র আত্মনির্জিত সত্তার মুক্তি :

প্রখর তাপের আগুনের গোলা

সেজেছে মাটি

বিলাসী বর্ষা পাহাড়ের শীতে

পেতেছে ঘাঁটি।

সূর্য হেনেছে পক্ষপাতের

লাখো কৃপাণ।

চলে বীর নয়, হাজারো মজুর

লাখো কৃষাণ।

(বৈকালি)

এ হচ্ছে সশ্রদ্ধ প্রত্যর্পণ, সাধারণ মানুষের কাছে। বিষ্ণু দে এর পর আর মানুষের প্রতি বীতরাগ প্রকাশ করেননি। পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ সাত ভাই চম্পায় সংগ্রামী মানুষের কথা বলতে গিয়ে তাই তার কণ্ঠ ঘন হয়ে আসে, রচনা করেন এই পটভূমি, “অন্তহীন নীল আলো ঝরে যায়, গাঢ় নীল আকাশে সঙ্গিন,” তারপর লক্ষ করেন, “দেশে দেশে কৃষাণ মজুর যত ঢেলে দেয় তাদের পৌরুষ।” রাজায় রাজায় এইসময় লড়াই চলে, চাষিদের শূন্য খেতে-খামারে ইঁদুর, “তবু বেঁচে থাকে অমর প্রাণ / এ জনতার।” অমর দেশের মাটিতে মানুষ আজ অজেয় প্রাণ। প্রাচ্য-প্রতীচ্য পুরাণ, লোকজ সংস্কৃতি আর স্বাদেশিক ও বৈশ্বিক ইতিহাসচেতনার সূত্রে কবি অর্জন করেন এই বোধ। তিনি লক্ষ করেন রামের রাজ্যে আর কুরুক্ষেত্রে পৌরুষ ঢেলে দেওয়া হয়েছে, “আকবরশাহি দীনএলাহিতে আমাদের ইতিহাসে / একে ও অনেকে কালোয় শাদায় ঊর্ধ্বায়মান সুর। ফলে রক্তের এই লড়াইতে ‘মৃত্যুঞ্জয় জনতার মিল’, আর “মানুষে মানুষে আজ হাত বাঁধে, হয়ে যায় ছাই / শ্রেষ্ঠীর খাতাঞ্চিখানা, সামন্তেরা দ্বারে তোলে খিল।” এভাবেই কবির ভাবনায় টলে ওঠে ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণে জর্জরিত ভারতবর্ষ ও সমগ্র পৃথিবী।

পরবর্তী স্তরে সন্দীপের চর (১৯৪৭) কাব্যগ্রন্থে ঘটে আরেক ঊর্ধ্বায়ন। মানুষ সম্পর্কে কবির বোধ আরও তীক্ষ্ম ও গভীর হয়ে উঠতে শুরু করে, মানবিক প্রত্যয়ে তিনি আরও স্থিতধী হতে থাকেন। মানুষ-প্রকৃতির দ্বৈরথে মানুষকেই আরাধ্য মনে করে মানুষের অজেয় সত্তা-সংগ্রামকে ঊর্ধ্বে স্থান দিয়ে ঘোষণা করেছেন :

হে প্রকৃতি আমরা মানুষ, নই বনরাজিনীল তালীবন তটরেখা নই Ñ

আমাদেরই কর্মে লেখা আমাদের দুর্গত জীবন

আমাদেরই ভবিষ্য ও স্মৃতি।…

(সন্দীপের চর)

মানুষ নিজেই নিজের নিয়ন্ত্রক, শেক্সপীয়রীয় অভিজ্ঞানকে কী সহজেই না মার্কসীয় ভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন বিষ্ণু দে।

সামাজিক ও রাষ্ট্রিকভাবে পিষ্ট আত্মদীর্ণ অতিসাধারণ মানুষের তাহলে মুক্তি কোথায়? মুক্তি এইখানে, প্রকৃতির সাহচর্যে Ñ “দ্বীপে দ্বীপে একাকার আমেরু মৃত্তিকা আদিগন্ত নীলে।” মাটি ও মানুষ, নদী ও সমুদ্র, অর্থাৎ নিখিল বিশ্ব হয়ে উঠলো মানুষের মুক্তির উৎস :

মাটির গভীর টানে কালের বিরাট স্রোত

ন্যায়ের অমোঘ স্রোত, জীবনের জনতার আলোকিত অলকানন্দায়

পদ্মায় গঙ্গায়, প্রাণের অনন্ত-স্রোত।

(সমুদ্র স্বাধীন)

সবকিছু ছাড়িয়ে এই মানুষই মাথা তুলে দাঁড়ালো, “পূর্ণসাধ মানুষ মানুষ সত্য যারা সবার উপরে।” সমুদ্রের মতোই মানুষ রুদ্র, স্বাধীন, উন্মুক্ত। স্বাধীন এই মানুষের কাছেই যেতে চাইছেন কবি :

নিয়ে চলো জীবনের নিয়ে চলি উত্তাল ঊর্মিল

প্রতিশ্রুত স্বপ্নবীজ অবিশ্রাম ভাঙনের সাগরসঙ্গমে

সহিষ্ণু ঘটনা স্রোতে, রুদ্র সমুদ্রের, সংগঠনে, স্বাধীন সমাজে

স্বাধীন মানুষ স্বচ্ছ জীবনের, জীবনের উন্মুক্ত পত্তনে

সমুদ্র স্বাধীন।

(সমুদ্র স্বাধীন)

শুধু কি স্বাধীন? এই মানুষইতো প্রাকৃত মানুষ যারা প্রেম মৈত্রী মননের সূত্রে সম্পূর্ণ মানুষ :

মানুষের অতীত প্রাকৃতে মানুষের মনে

প্রেম মৈত্রী মননের পরস্পর নিঃসঙ্গ আশ্লেষে

ঊার্ধক্য মৃত্যুর করুণায়, লোকায়তে অবসরে

লোকোত্তরে সম্পূর্ণ মানুষ।

(সমুদ্র স্বাধীন)

এভাবেই পূর্ণতা পেল বিষ্ণু দে-র মানবীয় বোধ, সন্দীপের চরেই পাওয়া গেল যে মানুষকে, জীবনের মধ্য ও অন্তিম পর্বে সেই মানুষকেই বার বার ফিরে ফিরে পাবো আমরা তার বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থে। এই মানুষ সহজ কিন্তু প্রতিজ্ঞায় প্রতিরোধে দৃঢ়, অমিয় চক্রবর্তীর কবিতার আসঙ্গে তাই লিখলেন :

সহজিয়া মানুষের মনের মাটিতে

বৃষ্টি পড়ে …

বৃষ্টি পড়ে শুধু পোড়ে কংসের নিরেট মাথা

রাষ্ট্রবিদ ভ্রষ্ট মাথা

বৃষ্টি বুঝি পড়ে নাকো স্বর্ণলঙ্কাপুরে

দুঃশাসন উজির কোটাল শুধু বৈশাখের দাহে জ্বলে

(চৈতে-বৈশাখে)

আর তখনই ঘুচে গেল মানুষের সঙ্গে মানুষের ব্যবধান : “আশ্বিন পূজার মিল হল বুঝি ঈদমুবারকে / আনন্দনিষ্যন্দন প্রাতে বিরাট ঈদগাতে।”

অসাম্প্রদায়িক বোধে উত্তীর্ণ কবি হয়ে উঠলেন আরও মানবিক : “আসুক জীবনে রঙে মানবিক আমি চাই আমরা সবাই / সূর্যাস্তে ও সূর্যোদয়ে ইন্দ্রধনু ভেঙে দিই জীবনে ছড়াই।” এখন কবির অন্বিষ্ট :

ব্যক্তির বিন্যাসে নব স্বতন্ত্র আশায় মানুষের আনন্দের আয়ুষ্মান বেশে

এসেছি যাত্রার শেষে ধনধান্যপুষ্পেভরা

আমাদের এ বসুন্ধরায় তোমাদের দেশে শান্তির ঝঞ্ঝায় নিঃসঙ্গ উধাও

মানুষের পরম্পরায়, প্রেমে, বন্ধুতায়, কর্মে, রচনায়।

এ দেশ আমারও দেশ, দুহাত মিলাও।

(অন্বিষ্ট)

মানবিক বিপন্নতা থেকে মানুষের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছিলেন কবি, মানুষের কল্যাণভাবনা তাকে প্রাণিত করেছিল মানুষের কাছে পৌঁছুবার। কিন্তু বিপন্নতার বোধেতো আর আত্মবোধন ঘটতে পারে না, মানবিকতার প্রতিষ্ঠাও সম্ভব নয়। ফলে এই বিপন্নতাকে অতিক্রম করে সখ্যে ও কর্মিষ্ঠতার মধ্য দিয়ে কবি মানুষের সঙ্গে মিলিত হতে চেয়েছেন। এই মিলন নিরুদ্দিষ্ট নয়, নয় লক্ষ্যহীন : “পৃথিবীর আমরা মানুষ / আমাদেরই অতীতের স্রোতে গড়ি ভবিষ্যৎ।” কবির তাই অন্তিম অন্বিষ্ট হচ্ছে এমন এক সমাজ বিনির্মাণ করা যেখানে মানুষে মানুষে কোনো ব্যবধান থাকবে না, মিলনই হয়ে উঠবে মৌলিক। মানুষের সঙ্গে কবির এভাবেই ঘুচে গেছে সব ব্যবধান :

অন্তিমের তৃষিত পাথরে

খোদাই আমারও সেই ভবিষ্যৎ, মৃত্যুকে যে হৃদয়ের মৃত্যুকে যে রোখে।

তোমাকে তাই তো চাই, খুঁজি চলো পাহাড়,

মানুষ।

(অন্বিষ্ট)

এই হলো বিষ্ণু দে-র প্রাথমিক পর্বের কবিতা, এসব কবিতাতেই তার মানববোধ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছিল। শুরু থেকেই তিনি ছিলেন মানুষের প্রতি সমর্পিত, পরবর্তী কাব্যগ্রন্থগুলোতে যার তানবিস্তার লক্ষ করবো আমরা। মানুষের প্রতি তার এই যে ঝোঁক, এই বোধ তৈরি হয়েছিল মার্কসীয় চেতনার সূত্রে।৫  

মার্কসের রচনা পড়লে দেখা যায়, মানুষের বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করতে গিয়ে তিনি কয়েকটি চাবিশব্দ ব্যবহার করেছিলেন- ‘প্রবণতা’, ‘তাড়না’, ‘আবশ্যিক শক্তি’, ‘প্রবৃত্তি’, ‘প্রয়োজন’ ইত্যাদি। মার্কসের মানুষ, বলা বাহুল্য, সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত, যে সমাজ দাঁড়িয়ে আছে শ্রেণীবিভক্ত সমাজ আর উৎপাদন সম্পর্কের উপর; আরও স্পষ্ট করে বললে শ্রম এবং পুঁজির সঙ্গেই তার সম্পর্ক। এই মানুষ, মালার্মে যেমন বলেছিলেন, রাজনৈতিক অর্থনীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। বিষ্ণু দে মার্কসের এই রাজনৈতিক অভিজ্ঞানের উপরই আস্থা জ্ঞাপন করেছিলেন। মার্কসই ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিকতার সূত্রে ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, মানুষ ইতিহাসের পর্বে পর্বে নিজেকে বদলে নিয়েছে বা তাকে বদলে যেতে হয়েছে :

তবু দেখি দীর্ঘজীবী মানুষের দীর্ঘ ইতিহাস,

যেখানে বন্ধুর অসংলগ্ন মৃত্যুময় পাথরের স্তূপ,

আর কাঁটা- ঝোপ, লতা, সংশয়, সন্ত্রাস

আকাশে মসৃণ আঁকে আগামী নীলিমা

(পৃথিবীর মানবিক সব অভিলাষ)

মানুষের অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, মার্কসের কথায়, মানুষ প্রাকৃতিক সত্তাবিশেষ; এই মানুষ যেমন প্রাণময় তেমনি সক্রিয়। প্রবৃত্তির তাড়নাও তার আছে। সে একদিকে যেমন যৌনসংবেদনশীল, অন্যদিকে তার রয়েছে নান্দনিক বোধ। বিষ্ণু দে-র কবিতায় আমরা যে মানুষের কথা পাই সে হচ্ছে এই মানুষ, মার্কসের সমগ্র মানুষ, যান্ত্রিক মানুষ নয়। জীবনবেদ ও আসঙ্গলিপ্সা, সংঘ ও সংগ্রাম, পতন ও অভ্যুদয়, দ্রোহ ও সৌকুমার্য এসব নিয়েই সমগ্র মানুষ। এই মানুষ কখনও ভেঙে পড়ে না, ভেঙে পড়তে পড়তে উঠে দাঁড়ায়, সংগ্রাম করে আত্মপ্রতিষ্ঠিত হতে চায়। এই মানুষ আবার কোনো দেশকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্বব্যাপ্ত; দেশকাল সংলগ্ন মানুষ আর বিশ্বের মানুষ উপজীব্য হয়েছে বিষ্ণু দে-র কাব্যসমগ্রে, গড়ে তুলেছে কবির নন্দনবিশ্ব :

চলেছি দেশ-দেশান্তরে মনের ঘোরে দূর ফেরার,

দু-দুপাশে ছোটে পৃথিবী তার আকাশ ছেড়ে বিপ্রয়াণ,

যেন পালায় মরিয়া ভয়ে আকাল যেন তাড়ায় হেঁকে,

যেন পালায় মড়ক থেকে, ভোলে নিজের কি সম্ভার,

দুপাশে ডাকে আকাশমাটি দুহাতে দেয় কী সন্ধান!

(চলেছি দেশ-দেশান্তরে)

কবিতার ঠিক এই গদ্যভাষ্যই আবার পাওয়া যায় ‘আরাগঁ’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে :

যত কবি আমি জেনেছি সবার মধ্যে আরাগঁই সেই কবি যাঁর আছে সবচেয়ে বড়শক্তি, দানবের বিরুদ্ধে যাবার ন্যায়শক্তি- এবং একদা আমার বিপক্ষেও। তিনি আমার কাছে উদ্ঘাটিত করেছিলেন সত্যের পথ, আজ আবার তিনি উদ্ঘাটিত করলেন সবার কাছেই যারা বোঝে না যে অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই নিজেদেরই জীবনের লড়াই, আশায় প্রস্ফুট জীবনের জন্যে, বিশ্বের প্রতি ভালোবাসার জন্যে।

মানুষের সামগ্রিক জীবনের সূত্রে, বৈশ্বিক সংলগ্নতার সূত্রে এভাবেই পূর্ণায়ত হলো বিষ্ণু দে-র মানবভাবনা ও কাব্যতত্ত্ব।

তথ্যসূত্র

১. উদ্ধৃত, Jacques Derrida, ‘Mallarmé’, Acts of Literature, Routledge, New York and London. Pp. 112.

২. বিষ্ণু দে, ‘বাংলা সাহিত্যে প্রগতি’, জনসাধারণের রুচি, বিশ্ববাণী প্রকাশনী, কলকাতা, ১৯৭৫, পৃ. ২৪।

৩. বিষ্ণু দে, ‘ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত’, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৩।

৪. বিষ্ণু দে, ‘বাংলা সাহিত্যে প্রগতি’, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮।

৫. অরুণ সেন, ‘বিষয় প্রস্তাব’, বিষ্ণু দে স্বভাবে প্রতিবাদে, পশ্চিমবঙ্গ সাহিত্য আকাদেমি, ২০০৯, পৃ. ১৪।

৬. বিষ্ণু দে, ‘আরাগঁ’, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৭।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close